Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৭

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৭

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৭
ছায়া

সিকিউরিটি গার্ড চলে যাওয়া মাত্রই পরিবেশ আবার আগের মতো টানটান হয়ে উঠল।দুজন পুরুষ দুজনের চোখে একই দাবি “ইলা… আমার” ইলা দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না… হাত কাঁপছে… বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন কানে বাজছে। লিয়ান ধীরে এক পা এগিয়ে এল আরিয়ানের দিকে চোখে যন্ত্রণা, রাগ, যুদ্ধের ঝড় নিয়ে
লিয়ানঃ- তুমি কে হ্যাঁ?কে যে ইলাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছো?
আরিয়ান ঠাণ্ডা অত্যন্ত স্থির ভাবে আছে তার ভেতরের আগুন শুধু চোখে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করছে না।
আরিয়ানঃ- ওর স্বামী আমি আর তোমার ভাষা ঠিক করো।
আরিয়ান এক ইঞ্চিও নড়ল না বরং আরও সোজা হয়ে দাঁড়াল।লিয়ান আরিয়ানের কথা শুনে হাসল যে হাসি মানুষ হৃদয় ভেঙে গেলে দেয়।

লিয়ানঃ- স্বামী ওকে এভাবে ভয় পাইয়ে রাখো কষ্ট দাও আর স্বামী সাজো? আমি স্টেজ থেকে দেখেছি ও ভয়ে কাঁপছিল… তোমার ওভাবে হাতে ধরাতে কষ্ট পাচ্ছিলো তবুও তুমি ছারোনি।
লিয়ানের কথা শুনে ইলার দুই চোখ বড় হয়ে গেল।
আরিয়ান ঠাণ্ডা হয়ে গেল পুরোপুরি তার চোখের ভেতরের আগুন ভয়ংকর রূপ নিল।
আরিয়ানঃ- ও ভয় পেয়েছিল তোমার জন্য। তুমি যে দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছিলে সেটা কোনো সভ্য মানুষের না।
লিয়ান ঝাঁক মেরে সামনে এসে আরিয়ানের কলারের কাছে মুখ আনতেই ইলা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল
ইলাঃ- লিয়ান থামো
কিন্তু লিয়ান শুনল না উল্টো ইলার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো
লিয়ানঃ- সিজুকা তুমি ভয় পেও না আমি আছি এই লোকটা তোমার কিছু করতে পারবে না
আরিয়ান এবার ভয়ংকর শান্ত স্বরে বলল
আরিয়ানঃ- আর একটা শব্দ করলে দেখিয়ে দেবো তোমাকে তোমার জায়গা।
দুজনের মাঝের বাতাস যেন আগুনে ফেটে যাচ্ছে।

মানুষ জন দূর থেকে তাকিয়ে আছে কিন্তু কেউ কাছে আসছে না। সবাই প্রোগ্রাম দেখায় ব্যস্ত হঠাৎ লিয়ান বাঁ হাতটা তুলে আরিয়ানের দিকে ঠেলে দিল এক ঝটকায় দুজনের শরীর ঠোকাঠুকি হয়ে প্রায় মারা মারির মতো অবস্থা।এ দৃশ্য দেখে ইলার মাথায় যেন বজ্রপাত হলো।ইলার মাথা ঘুরে গেল শ্বাস আটকে আসছে ইলার আর তারপর ইলা দম তুলে, ভয়, রাগ, অপমানে সব এক হয়ে ইলাকে ঝড়ের মতো হতে বাধ্য করল। ইলা এগিয়ে গিয়ে এসে একটা ভীষণ জোর থাপ্পড় সোজা লিয়ানের গালে বসিয়ে দিলো।
হাওয়াও যেন থেমে গেল লিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গালটা লাল,চোখ বড় হয়ে গেঁে হৃদপিণ্ডের ভিতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। আর ইলা রাগ, আর ভয় একসাথে নিয়ে চিৎকার করে উঠল
ইলাঃ- তুমি এটা কি করছো লিয়ান? তুমি কে আমার জীবনে ঢুকে এভাবে আদেশ করার?তুমি কে যে আরিয়ানের সাথে মারামারি করতে যাবে?তুমি কে আমাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলার।

লিয়ানঃ- সিজুকা… আমি… আমি শুধু…
ইলাঃ- চুপ একটা শব্দ না তুমি যা করেছো এটা সুস্থ মানুষ করতে পারে না তুমি মানুষিক ভাবে অসুস্থ।
আমার বিয়ে হয়েছে আমি আমার স্বামীর সাথে কিভাবে কথা বলব দূরত্বে দাঁড়াব সেটা তুমি ঠিক করার কে? তুমি আজকে আমার সম্মান আমার সম্পর্ক সব বিপদে ফেলেছো।
লিয়ানের চোখে পানি চকচক করতে শুরু করছে বুকটা ওঠানামা করছে।সে কথা বলতে চাইল কিন্তু ইলা কথা বলার সুযোগ দিলো না। ইলা আরেক ধাপ কাছে গিয়ে আঙুল তুলে বলে
ইলাঃ- আমি তোমাকে কখনো এমন কিছু বলিনি যে তুমি এই অধিকার দেখাবে আমার উপরে। আর তোমার সাথে দেখাই তো আমার সেদিন হলো। আর কি বলেছিলে ৫ বছরের পরিচয়। আমি তখন বাচ্চা ছিলাম। আমি কি তোমাকে কখনো বলেছি আমি তোমার সাথে প্রেম করবো। আমার জন্য অপেক্ষা করো।
লিয়ান মাথা নিচু করে ফেলে কিন্তু চোখের পানি পড়ে যায় মেঝেতে।আরিয়ান তখনও দাঁড়িয়ে শান্ত,কিন্তু চোখে ইলাকে নিয়ে স্পষ্ট উদ্বেগ একসময় ইলা হেঁচকি তুলে বলল
ইলাঃ- আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাই না।কিন্তু আজ তুমি আমার সামনে আমার স্বামীর সাথে মারামারি করতে গেছো এটা আমি ক্ষমা করতে পারব না।

(লিয়ান নিঃশ্বাস টেনে ফিসফিস করে বলল)
লিয়ানঃ- আমি তোমাকে হারাতে চাইনি সিজুকা আমি শুধু… তোমাকে… খুব
ইলাঃ- হারানোর মতো কিছুই ছিল না লিয়ান আমি তোমাকে বন্ধু ভাবি শুধু বন্ধু তার বেশি কিছু কখনো ছিল না, নেই, থাকবেও না।
এই কথাটা লিয়ানের বুকে ছুরি হয়ে ঢুকল তার মুখ ভেঙে গেল ভেতরটা চুরমার হয়ে গেলো। আরিয়ান ধীরে ইলার পাশে এসে দাঁড়াল দূরত্ব রেখে কিন্তু সাপোর্টের মতো।সে লিয়ানকে দেখে শান্ত স্বরে বলল
আরিয়ানঃ- তুমি এখন চলে যাও ইলা কাঁদছে।
লিয়ান মাথা তুলল না তার চোখের ভেতর হাহাকার, যন্ত্রণা আর অজানা অন্ধকার ঘুরছে।এক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো

লিয়ানঃ- সিজুকা তুমি আজ আমাকে থামালে। কিন্তু মনে রাখবে যা আমার তা আমি ছিনিয়ে আনতে পারি।
ইলার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল আরিয়ান এবার কঠিন দৃষ্টিতে হুমকির স্বরে বলল
আরিয়ানঃ- ভুলেও এটা চেষ্টা করবে না তাহলে তুমি নিজেই শেষ হয়ে যাবে।
দুজনের চোখে আবার বজ্রপাত হলো।লিয়ান মুখ ঘুরিয়ে, ভাঙা কণ্ঠে, চোখ ভেজা রেখে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে সরে গেল দূরে গানের শব্দ, মানুষের ভিড়ে লিয়ান মিলিয়ে গেলো। আরিয়ান নিঃশব্দে দুই হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে একটা কথাও বলে না। কিন্তু তার চোখে স্পষ্ট লেখা “এখন থেকে তোমাকে আমি রক্ষা করব কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না” ইলার গা দিয়ে ঘাম পড়ছে।চোখ দুটো লাল,নিশ্বাস ভারী এত কাঁদতে কাঁদতে পুরো শরীর কেঁপে যাচ্ছে।
আরিয়ান তার সামনে দাঁড়ানো কিন্তু হাত বাড়াচ্ছে না।

কারণ সে স্পর্শ করলে ইলা যদি আবার ভয় পায়। শুধু শান্ত কণ্ঠে বলল
আরিয়ানঃ- ইলা… শান্ত হন প্লিজ ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
ইলাঃ- আমি…আমি এমন কখনো চাইনি…আমি কাউকে আঘাত করতে চাই না।আমি কেন এমন জীবন পেলাম।
যাকে আমি চাইলাম সে আমাকে চাইলো না মাঝ খান থেকে এরা সবাই গেনজাম শুরু করে দিছে।
তার কথা মাঝপথে থেমে যায় হেঁচকির কারণে।
আরিয়ান মুঠো হাত চেপে ধরল নিচে।তার ভেতরে আগুন রাগ,দখলের তীব্র তৃষ্ণাসব একসাথে তাকে জ্বালাচ্ছে কিন্তু ইলার সামনে সে নিজেকে ধরে রাখছে।
আরিয়ানঃ- আপনি কিছু করেনি যে আপনাকে বুঝেনি যে ঠকে গেছে।
আরিয়ানের কণ্ঠে অদ্ভুত কোমলতা কিন্তু চোখে আগুন। ঠিক তখনই হালিমা অন্য দিক থেকে দৌরে আসে
হালিমাঃ- ইলা…

হালিমা দৌড়ে এসে ইলাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
ইলা আর দাঁড়াতে না পেরে হালিমাকে জরিয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
হালিমাঃ- হায় আল্লাহ কী হয়েছে কে কাঁদাইছে? আমার ঐ লিয়ান ফিয়ানকে একটুও সহ্য হয় না।
ইলাঃ- হালিমা আমার সাথে কেনো এমন হয় বার বার।
হালিমা ইলার মাথা হাত বুলিয়ে ঠান্ডা শ্বাস ফেলল।
হালিমাঃ- আরে বাবা ভয় পাস না আমি আছি। তোর কিছু হবে না। আগে পানি খেয়ে নে তারপরে আমরা হলে ফিরে যাবো।
হালিমা ইলাকে ধরে নিয়ে যেতে লাগল ধীরে ধীরে।
ইলা হালিমার হাতে আঁকড়ে ধরে আছে।যেন ভেঙে যাওয়া কাঁচের টুকরো। হালিমা যাওয়ার আগে আরিয়ানকে একবার দেখে বলল
হালিমাঃ- ভাইয়া আপনার কিছু বলার থাকলে কাল বলিয়েন আজ ও অনেক ভেঙে পড়েছে। আজ আপনি যান।
আরিয়ান কিছু বলল না শুধু মাথা নিচু করল।কিন্তু চোখে ঝড়।ইলাকে নিয়ে হালিমা চলে গেল,আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে।কিন্তু তার গলার ভেতর শব্দ আটকে আছে। একসময় সে মাটির দিকে তাকিয়ে হাত মুঠো করে দাঁত চেপে আছে।

আরিয়ান শ্বাস ভারী হয়ে উঠল তার চোখের নিচে সেই কালো অন্ধকার ছায়া যেখানে দখল হিংসা আর রাগ একসাথে ঘোরাফেরা করে।
অন্যদিকে লিয়ান বাসায় ঢোকার মুহূর্তেই দরজাটা ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করল।ঘরটা অন্ধকার একটা ছোট লাইট জ্বলছে দেয়ালের পাশে। তার গলার ভেতর থেকে হাহাকারের মতো শব্দ বের হয়
লিয়ানঃ- “সে আমাকে বন্ধু ভেবেছে আর আমি.. আমি তাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি।
লিয়ানের চোখে পানি থামছে না এক সেকেন্ডে তার দুনিয়া বদলে গেছে। সে তাকাল কোণায় রাখা তার প্রিয় গিটারটার দিকে। যেটা তার লাইফের প্রথম গিটার ছিলো ( ছোট বেলায় যখন ইলা বলেছিলো তার গিটার অনেক পছন্দ তখন লিয়ান এই গিটারটা কিনেছিলো) যেখানে খোদাই করে লিখা আছে সিজুকা।
লিয়ানের হাত কাঁপল চোখে ভরে উঠল রাগ আর যন্ত্রণা লিয়ান গিটারটা তুলে কোণার টেবিলে জোরে আছাড় মারল। গিটারের কাঠ ভেঙে চৌচির তার নিজের বুকের ভাঙনের মতো।

কিন্তু লিয়ান থামল না আরও একবার আছাড় মারলো আরও একবার এভাবে ৪-৫ বার আছাড় মেরে গিটারটা ভেঙে মেঝেতে ফেলে দিলো। তারের শব্দ বেদনাদায়কভাবে কেঁদে উঠল।
লিয়ান হাঁটু গেড়ে বসে ভাঙা গিটারের টুকরো হাতে নিল চোখ দিয়ে পানি পড়ছে ঝরনার মতো।
লিয়ানঃ- সিজুকা তুমি কেন আমাকে এমন মৃত্যুর মতো অনুভূতি দিলে…? আজ থেকে তো আমি মরে গেলাম।
কিন্তু রাগ থামলো না তারপর হঠাৎ লিয়ান দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দাঁড়াল রাগে মাথা ঘুরতে লাগল। তার নিশ্বাস দ্রুত ভয়ংকর হয়ে গেলো। এক মুহূর্তও চিন্তা না করে সে দেয়ালে প্রচণ্ড জোরে ঘুষি মারল।
একটা ভয়ংকর শব্দ উঠল তার হাত ফেটে গেল। রক্ত ছিটকে পড়ল দেয়ালে কিন্তু লিয়ান থামলো না।আবার আরেকটা ঘুষি মারলো কিন্তু তবুও রাগ কমছে না আবার ঢাম.. ঢাম…তার হাত রক্তে ভিজে গেছে। কিন্তু সে যেন ব্যথা অনুভবই করছে না। বুকের ভেতরের কষ্ট যেনো থামছে না তাই সে দেয়ালে ঘুষি মেরে যাচ্ছে
যেন নিজের ভেতরের ঝড় থামাতে চায়। শেষে ক্লান্ত হয়ে দেয়ালে হেলে পড়ে নিচে বসে গেল। রক্তে ভেজা হাতটা কোলে নিয়ে আছে।

চোখে অশ্রু আর ভাঙা গিটারটা পাশে পড়ে আছে।তার ভেতরে শুধু একটা শব্দ প্রতিধ্বনি করছে “ইলা… ইলা… ইলা…” আর তার চোখ ধীরে ধীরে অন্ধকারে তাকিয়ে ফিসফিস করে উঠল
লিয়ানঃ- চাইলে তোমাকে ভুলতে পারতাম সিজুকা কিন্তু এখন এটা প্রেম না এটা আমার পাগলামি হয়ে গেছে।
কিছুক্ষ্যপর:
লিয়ান নিজের রুমে আলো নিভিয়ে বসে আছে হঠাৎ দরজাটা ধীরে খুলে গেল লিয়ানের মা এসেছে তিনি প্রথমে ভাঙা গিটার দেখলেন তারপর দেয়ালের রক্ত এক সেকেন্ডেই বুকটা ধক করে উঠল
মিসেস চৌধুরীঃ- আল্লাহ্‌… লিয়ান এ কি অবস্থা?
তিনি দৌড়ে ছেলের পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন।
কাঁপা কণ্ঠে লিয়ানের রক্তাক্ত হাত ধরলেন।
মিসেস চৌধুরীঃ- এটা তুমি করেছ নিজের হাতের এ কি অবস্থা করেছো তুমি। এই শেখালাম তোমায় বাবা?
এভাবে নিজেকে শেষ করতে হয়?
লিয়ান ধীরে চোখ তুলল চোখের ভেতর শুধু ভাঙা মানুষ টা আর কিছু দেখা যাচ্ছে না ধীরে ফিসফিস করে বলল
লিয়ানঃ- মা ও আমাকে বন্ধু বলে আর আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি যাকে পুরো মন দিয়ে চাই সে আমাকে বন্ধু ভাবে।

তার কণ্ঠ মৃত মানুষের মতো হয়ে গেছে মিসেস চৌধুরীর চোখে পানি এসে গেল তিনি লিয়ানের মাথা বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
মিসেস চৌধুরীঃ- আরে বাবা প্রেম মানে দখল না।যে তোমার জন্য না তাকে জোর করে পাওয়া যায় না। কিন্তু এর জন্য নিজের রক্ত ঝরাতে হয় না।তুমি আমার একটাই ছেলে তোমায় হারাবার ভয় আমার বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আমি এর থেকেও ভালো কাউকে খুজে এনে দিবো তোমার জন্য।
লিয়ান চোখ বন্ধ করে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল জোরে চিল্লায় চিল্লায় কান্না করতে শুরু করলো
লিয়ানঃ- মা আমার খুব কষ্ট হচ্ছে খুব।
মিসেস চৌধুরী তার ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
মিসেস চৌধুরীঃ- জানি বাবা জানি কিন্তু কষ্টের ওষুধ নিজেকে আঘাত করা না। চল হসপিটালে যাই আগে হাতটা দেখাই রক্ত বন্ধ করতে হবে।

তিনি জোর করে দাঁড় করালেন লিয়ানকে তার পরে পানি দিয়ে পরিস্কার করে দিলেন হাতটা।
মিসেস চৌধুরীঃ- তুমি এখনই হাসপাতালে চলো একটুও কথা বলবে না।
লিয়ান মাথা নত করে রইল কিছু বলল না মিসেস চৌধুরী গাড়ি ড্রাইভ করে ছেলেকে নিয়ে হসপিটালে গেলো।
ড্রেসিং রুমে বসে লিয়ান চুপচাপ হাত বাড়িয়ে রেখেছে
নার্স তার কাটা, ফোলা, ফেটে যাওয়া জায়গা গুলো পরিষ্কার করছে কিন্তু লিয়ান নিজের দুনিয়ায় নেই।
সে ফিসফিস করতে শুরু করল
“সিজুকা তুমি কেন আমাকে থামালে? তুমি কেন ওর হাত ধরলে আমি তোকে হারাতে চাইনা সিজুকা।
নার্স থমকে গেল লিয়ানের কথা শুনে মিসেস চৌধুরী তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি চোখ নামিয়ে ফেললেন যেন তিনি তার ছেলের কষ্ট শুনতে চান না
কিন্তু লিয়ান থামল না।

“তুমি আমার নও সিজুকা, তুমি আমার সম্পর্কে জানো না, কিন্তু আমার সবকিছু সবটা জুরেই শুধু তুমি।
নার্স চোখাচোখি করল লিয়ানের মায়ের সঙ্গে একটা অসহায় সহানুভূতি।মিসেস চৌধুরী নিঃশ্বাস টেনে বললেন
মিসেস চৌধুরীঃ- লিয়ান… চুপ করো তোমার মন ভেঙেছে মাথা তো ঠিক আছে নিজেকে হারিও না।
কিন্তু লিয়ান শুধু দূরে তাকিয়ে ফিসফিস করতেই থাকলে যেনো মনে হচ্ছে সে অনেক একটা জগতে চলে গেছে “আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না”
মিসেস চৌধুরী এবার চোখ মুছে বললেন
মিসেস চৌধুরীঃ- প্রেম যদি নিয়তি হয় ফিরে আসবে।
না হলে তুমি আরও ভালো কাউকে পাবে। কিন্তু মার কোল খালি করে যাওয়ার মতো ভুল কোরো না লিয়ান।
তার কথা শুনে লিয়ান আর কিছু বলল না নার্স ব্যান্ডেজ প্যাঁচিয়ে দিল পুরো হাতে। ব্যান্ডেজ শেষে
হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে এল লিয়ান।হাতটা ব্যথায় করছে কিন্তু তার গায়ে লাগছে না।
রাতের ঠান্ডা আবহাওয়া রাস্তা নিস্তব্ধ লিয়ান ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল চোখ শূন্য ঠিক তখন একটা বাইকের শব্দ লিয়ান মাথা তুলল। দূরের হাইওয়ের ধারে স্ট্রিট লাইটের আলোয় সে দেখল।
একজন লোক বাইকের পিছনে বসে আছে।

কালো শার্ট আর সেটা আর কেউ নয় আরিয়ান।
কেউ তাকে নিয়ে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। বাইকটা দ্রুত গতিতে দূরে চলে যেতে থাকল।লিয়ান স্থির দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল।তার চোখে আবার সেই ভয়ংকর ছায়া ফিরে এল ধীরে ধীরে তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল
লিয়ানঃ- আমার অকে লাগবে তুই ওর জগ্য না ওর এমন একজন কে লাগবে যে ওকে হারাবে না অনেক ভালবাসবে আমার মতো।
বাইকের লাইট অন্ধকারে মিলিয়ে গেল আর লিয়ানের চোখে একটাই শব্দ ফুটে উঠল “আমি হারব না” লিয়ানের বুকের ভেতর ধড়ফড় করা আগুন যেন আশেপাশের সব বাতাসকে গরম করে দিচ্ছিল।
মিসেস চৌধুরী সবে বেরিয়েছেন হাতের রক্ত এখনো সাদা কাপড় ভিজিয়ে লাল করে ফেলছে ঠিক তখনই লিয়ান গাড়ির দরজা খুলে বসে একটা কথাও বলল না। তার মা চমকে উঠে বললেন,
মিসেস চৌধুরীঃ- লিয়ান কোথায় যাস আমাকে বাসায় নিয়ে যা।
কিন্তু লিয়ান তখন একদম অন্য জগত।চোখে অদ্ভুত এক অন্ধকার ঠোঁটের কোনে টেনে ওঠা ভয়ংকর হাসি।
লিয়ান শুধু বলল,

লিয়ানঃ- মা, তুমি বাসায় যাও আমি পরে আসছি।
মায়ের ডাক,চিৎকার,অনুরোধ কিছুই আর কানে ঢুকলো না।ইঞ্জিন গর্জে উঠলো এক সেকেন্ডে গাড়ি ছুটে গেলো হাসপাতালের গেট পেরিয়ে।
দূর থেকে লিয়ান দেখল আরিয়ান একটি বাইকের পেছনে বসে কোথাও যাচ্ছে। এবার সিওর হয়ে নিলো এটা আরিয়ান। তার পরে বাইকের সামনে একজন লোক চালাচ্ছে ভিড়ের মধ্যে স্পষ্ট দেখা না গেলেও আরিয়ানের শরীরের ভঙ্গিমা সে চিনে ফেলল মুহূর্তে।
লিয়ান গাড়ির গতি এক ঝটকায় বাড়িয়ে দিলো হাসিটা আরো গভীর হলো এক ধরনের অসুস্থ বিপজ্জনক দানবীয় হাসি। নিজের ক্ষত ভুলে,ব্যথা ভুলে,সবকিছু ভুলে সে শুধু একটাই বাক্য ঠাণ্ডা স্বরে বলল “আরিয়ান… গুড বাই এবার ইলা চিরতরে আমার”

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৬

মুহূর্তেই গাড়ি ছুটে গেলো রাস্তায় বাতাস চিৎকার করলো রাস্তার আলোগুলো একের পর এক পেছনে সরে গেলো। আর তারপর “ধাম” একটা প্রচণ্ড গর্জন।
আরিয়ানদের বাইকটা sideways উড়ে গেলো রাস্তার এক পাশে।
আরিয়ান ছিটকে পড়ে সোজা পাশের কংক্রিটের দেয়ালে সজোরে ধাক্কা খেলো। তার শরীরটা গড়িয়ে গিয়ে নিথর হয়ে পড়ে রইল। দূর থেকে শুধু দেখা গেলো লিয়ানের গাড়ি এক ঝটকায় বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো যেন কিছুই হয়নি এক সেকেন্ড দেরি করলো না একবারও ফিরে তাকালো না।রাস্তায় শুধু ধুলো উড়লো আর নিস্তব্ধতা।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৭ (২)