ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪০
ছায়া
আর্মির ইন্টারোগেশন রুমটা যেন ইচ্ছা করেই এমন বানানো মেটাল টেবিল,সোজা সাদা আলো চোখে আঘাত করে,চারদিকে নিঃশব্দ ঠান্ডা বাতাস।লিয়ান হাতকড়া পরা অবস্থায় চেয়ারে বসে আছে।মুখে অদ্ভুত এক শান্ত হাসি।তার সামনে বসে আছেন।অফিসার রায়হান চোখে অভিজ্ঞতার ভার কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই।রায়হান ধীর অথচ ধারালো কণ্ঠে বললেন
রায়হানঃ- লিয়ান তুমি জানো তুমি কী করেছ? আরিয়ান খান একজন এক্টিভ ডিউটি আর্মির মেজর।
লিয়ান ধীরে মাথা নিচু করে বসে আছে। কিছুক্ষণ নিরব থেকে ঠোঁটের কোণে সেই ভয়ংকর হাসি নিয়ে বলল
লিয়ানঃ-আমি শুধু ইলাকে ভালোবাসি স্যার। বাকি কে কী সেটা আমার দেখার বিষয় না।
একজন অফিসার ধমক দিয়ে উঠল
“ইউ হ্যাভ লস্ট ইওর মাইন্ড”
লিয়ান হঠাৎ মাথা তুলে তাকাল চোখে কোনো অনুশোচনা নেই শুধু দখলের আগুন।
লিয়ানঃ- ইলা অন্য কারো হাত ধরে বাঁচতে পারবে না।ইলা শুধু আমার প্রয়োজন হলে… আবারও কাউকে সরিয়ে দেব।
রুমে হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এল অফিসার রায়হানের কপালের শিরা টানটান হয়ে উঠল। এই ছেলেটা একদম খাঁটি সাইকোপ্যাথ।
রায়হানঃ- তুমি জানো তুমি যেটা করেছো সেটার জন্য তোমার ফাঁসি হইতে পারে?
লিয়ান হালকা কাঁধ ঝাঁকাল
লিয়ানঃ- ইলা ছাড়া আমার এ জীবন অর্থহীন স্যার।
সব অফিসার একে অপরের দিকে তাকাল এই ছেলেটা ভয় পায় না।এই ছেলেটা ভালোবাসা কে অস্ত্র বানিয়েছে।রায়হান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন
রায়হানঃ- ওর পরিবারকে ডাকা হোক বিশেষ করে ওর মাকে।
একজন আর্মির মেজর লিয়ানের মাকে ফোন করে। কিছুক্ষণ পর ইন্টারোগেশন রুমের দরজা খুলে গেল।ভেতরে ঢুকলেন এক মধ্যবয়সী নারী চোখে ক্লান্তি, মুখে গভীর অপরাধবোধ লিয়ানের মা ফারহানা চৌধুরী। ছেলেকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখেই তার চোখ ভিজে উঠল।
ফারহানাঃ- লিয়ান…
লিয়ান প্রথমবারের মতো একটু নড়েচড়ে বসল চোখ নামিয়ে ফেলল।রায়হান সরাসরি বললেন
রায়হানঃ- ম্যাডাম আপনার ছেলে একজন আর্মি অফিসারকে হত্যার চেষ্টা করেছে। আপনি কিছু বলতে চান?
ফারহানা চৌধুরী ব্যাগ খুলে কাঁপা হাতে একটা মোটা ফাইল বের করলেন।টেবিলের ওপর রেখে বললেন
ফারহানাঃ- স্যার আমার ছেলে অসুস্থ মানসিকভাবে।
এইটা আজকে না ৭ বছর ধরে সবাই অবাক হয়ে গেল।ফারহানা চৌধুরী ফাইল খুললেন মেডিকেল রিপোর্ট, সাইকিয়াট্রিক ইভ্যালুয়েশন প্রেসক্রিপশন সব কিছু বের করে টেবিলে রেখে দিলো
ফারহানাঃ- সাত বছর আগে একটা মেয়েকে ও খুব ভালোবাসতো।
ফ্ল্যাশব্যাক সাত বছর আগেঃ
লিয়ান তখন একদম আলাদা ছিলো হাসিখুশি, বিশ্বাসী পড়াশুনায় অনেক ভালো। তখন লিয়ান ক্লাস নাইন এ পড়তো। লাইফে প্রথম ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি হয়েছিলো। মেয়েটা তার ক্লাস মেট ছিলো। লিয়ান ছোট থেকেই অনেক জেদি ও যেটা চায় সেটা যে কোনো ভাবে তাকে দিতে হয়।
লিয়ান একদিন বাসায় এসে বলে ও আবিদা নামে একটা মেয়েকে ভালোবাসে আর বিয়ে করলে তাকেই বিয়ে করতে চায়। আমি ভেবেছি ও বাচ্চা তাই হয়তো এমন করছে পরে ঠিক হয়ে যাবে। তার দুইদিন পরে লিয়ান একটা ডায়মন্ড এর রিং কিনে এনে বলে আজ ও আবিদাকে প্রপোজ করবে বিয়ের জন্য।
আমি বলেছিলাম এত তারাতাড়ি কেনো লিয়ান দুইজনই পড়াশুনা করো তারপরে নাহয় এই সব। কিন্তু লিয়ান সেই ছোট বয়সে বলেছিলো সে হারাম সম্পর্কে যেতে চায় না। তাই আমিও আর কিছু বলিনি যেহেতু ওর বাবা নেই। তাই আমি সম্পর্কটা মেনে নিয়েছিলাম।
লিয়ান একটা ক্যাফেতে বসে আছে হাতেসেই ছোট রিং বক্স। লিয়ান আবিদার জন্য অপেক্ষা করে আছে। হঠাৎ দরজা খুলে ঢুকল আবিদা কিন্তু একা না তার হাত ধরে ভেতরে ডুকে আরেকজন ছেলের। লিয়ান আবিদার সাথে অন্য ছেলেকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে যায়।আবিদা লিয়ানের কাছে এসে চোখে চোখ রেখে বলে
আবিদাঃ- লিয়ান আই এম সরি আমি ওকে ভালোবাসি।
সেই শব্দগুলো যেন বুলেটের মতো লিয়ানের বুকে ঢুকেছিল। লিয়ান আর একটা কোথাও বলেনি সেখান থেকে চলে এসেছে। ফারহানা চৌধুরী লিয়ান কে জিগ্যেস করলে লিয়ান কিছু না বলেই নিজের রুমে ডুকে যায়।
কয়েকদিন পর জানা যায় লিয়ানের সব টাকা নিয়ে আবিদা অন্য ছেলের সঙ্গে শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। লিয়ান যা যা দামি জিনিস গিফট করেছিলো সেগুলো সব কিছু নিয়ে পালিয়ে যায়।
লিয়ান সেটা শুনার পরে রাতে লিয়ান ঘরের আয়না ভেঙে ফেলেছিল নিজের হাত কেটেছিল চোখে ছিল শূন্যতা। আবিদা ছিলো একটা ফ্রোড ও লিয়ান এর টাকাকে ভালোবেসে ছিলো। কিন্তু লিয়ান বিয়ের কথা বলাতেই তার আসল রুপ বেরিয়ে আসেন।
লিয়ান তখন থেকেই চুপ হয়ে যায় কারো সাথে কথা বলতো না নিজের রুমে থাক্তো একা একা কথা বলতো একা একা হাসতো। ওই ঘটনার পর থেকেই ও বদলে যায় স্যার। ডাক্তার বলেছে ও যাকে ভালোবাসে তাকে নিজের সম্পত্তি ভাবে।
বর্তমানঃ
দুই বছর টানা ট্রিটমেন্ট এর পরে লিয়ান সুস্থ হয়ে বাসায় আসে। এর পর থেকে আমি লিয়ানের মধ্যে পরিবর্তন দেখেছি কিন্তু কোনো হিংস্রতা দেখিনি। কিন্তু মাঝে মাঝে ও পাগলামি করে কিন্তু কিছু দিন ধরে সিজুকা নামে কারো জন্য অনেক পাগলামি করছে।
রায়হান ফাইল উল্টাতে উল্টাতে গম্ভীর গলায় বললেন
রায়হানঃ- কিন্তু অসুস্থতা কাউকে খুনের লাইসেন্স দেয় না মিসেস চৌধুরী।
লিয়ানঃ- আমি খুনি না স্যার আমি শুধু আমার জিনিস ফেরত চাই। আমি আমার ইলাকে ফেরত চাই।
সবাই শিউরে উঠল ফারহানা বেগম চোখ মুছলেন।
ফারহানাঃ- স্যার আমি অনুরোধ করছি ওকে চিকিৎসার সুযোগ দিন। জেলে দিলে ও আরও ভয়ংকর হয়ে যাবে।
রায়হান চুপ করে লিয়ানের দিকে তাকাল তারপর ধীরে বললেন
রায়হানঃ- এভাবে আমরা তাকে ছেড়ে দিতে পারি না তদন্ত চলবে মেডিকেল বোর্ড বসবে। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার ইলা এখন থেকে আর্মির প্রোটেকশনে থাকবে।
লিয়ানের চোখ হঠাৎ লাল হয়ে উঠল রায়হান এর কথা শুনে লিয়ান ফিসফিস করে বলল
লিয়ানঃ- কেউ আমাকে ওর থেকে আলাদা করতে পারবে না কেউ না।
ক্যামেরার লাল আলো জ্বলছে রেকর্ড হচ্ছে সব। লিয়ানের মা অনেক রিকুয়েস্ট করেছে কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।শেষে রায়হান ফারহানা চৌধুরীকে জানালো এটা মেডিকেল বোর্ড আর আরিয়ান সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না আপাতত লিয়ান আমাদের কাছে থাকবে।
আর অন্যদিকে ICU তে আরিয়ান মৃত্যুর সাথে লড়ছে।ইলা আরিয়ানের পাশে বসে ছিলো আরিয়ান ইলার একটা আঙুল শক্ত করে ধরে আছে। হঠাৎ ডাক্তার আর দুজন মিলিটারি অফিসার এক সাথে ডুকলো রুমে তাদের মুখে আতঙ্ক, দুশ্চিন্তা, আর হাজার প্রশ্ন ইলা দাঁড়িয়ে গেল।
ডাক্তার ভিতরে এসে
ডাক্তারঃ- আপনাকে এখন বাইরে যেতে হবে।
ইলা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকলো আরিয়ান ইশারায় বার বার বলছে না যেতে কিন্তু ইলা আরিয়ান এর থেকে বিদায় নিয়ে ICU থেকে বেরিয়ে আসলো।গেটের বাইরে সবাই দাড়িয়ে আছে সাবিহা বেগম এগিয়ে এসে বলল
সাবিহাঃ- ইলা মা, তুই ঠিক আছিস তো?
নাফিযাঃ- মা রে আমার ছেলেটা ও কেমন আছে?
ডাক্তার বাইরে বের হয়ে এসে শান্তভাবে বলল
ডাক্তারঃ- রোগীর অবস্থা এখন স্টেবল।কিন্তু তাকে একদম স্ট্রেস না দেওয়া জরুরি।রোগীর সাথে একজন থাকতে থাকতে পারবে শুধু।
সবাই একসঙ্গে তাকাল সেই একজনের দিকে ইলা। ICU এর ভিতরে আরিয়ান তখনো আধা চেতন অবস্থায় ফিসফিস করে সাজু কে বলল “ইলা কোথাও যাবে না আমি যতদিন না সুস্থ হচ্ছে সে আমার সাথেই থাকবে।
আরিয়ানের কথা শুনে সাজু এর সাথে ডাক্তারও অবাক হলো কিন্তু মাথা নাড়ল “তাহলে আপাতত ইলাই থাকবে ভেতরে তাহলে।
সাজু বাইরে এসে সবার উদ্দেশ্যে বলল আরিয়ান চায় তার সাথে তার সহধর্মিণী ইলা থাকুক।পরিবারের সবাই চুপ কেউ কোনো শব্দ করল না।কারণ সবাই প্রথমবার বুঝল এই কয়েক দিনে আরিয়ান ইলাকে নিজের করে নিয়েছে। কারণ জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে যাকে চাইছে সে একটাই মানুষ ইলা।
কাউকে এতটা ভালো না বাসলে কেউ এভাবে বলতে পারে না। ডাক্তার ইলাকে ভেতর যাওয়ার পার্মিশন দিলো ইলা ভেতরে গিয়ে আবার চেয়ারে বসল আরিয়ানের হাত ধরে রাখল। আরিয়ান হালকা নড়ল কণ্ঠ ভাঙা কিন্তু স্পষ্ট
আরিয়ানঃ- ইলা আমার হাত ছাড়বেন না।
ইলা আরিয়ানের হাত চেপে ধরে বলল “মরণেও না” তারপর ইলা আরিয়ানের কপালে চুমু দিল আরিয়ান চোখ বন্ধ করল শান্তির নিঃশ্বাস এই প্রথমবার আরিয়ান ইলার স্পর্শ পেলো।
( হয় ইলাও আল্লাহর উপরে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে আরিয়ানকে মেনে নিয়েছে। আজ এই পরিস্থিতির জন্য কোনো না কোনো ভাবে ইলা নিজেকে দ্বায়ী করে)
আরিয়ানঃ- আপনি কাঁদছেন কেন?
ইলা তারাতাড়ি চোখ মুছে ঠোঁট কামড়ে মাথা নেড়ে বলল,
ইলাঃ- কই না তো কাঁদছি না।
আরিয়ান চোখ বুজে হালকা হাসার চেষ্টা করল ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেল।
আরিয়ানঃ- মিথ্যে বলবেন না আপনি কাঁদলে আমার বুকটা বেশি ব্যথা করবে।
ইলার চোখ ভিজে উঠল সে আর কিছু বলতে পারল না। শুধু তার কপালের কাছে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। ডাক্তার ইশারা করতেই ইলাকে বের হতে হলো।দরজা বন্ধ হওয়ার আগেও আরিয়ান ফিসফিস করে বলল
আরিয়ানঃ- আমি বলছি না আপনি যাবেন না কোথাও।
ইলাঃ- যাবো না একটুও না আপনি রেস্ট নিন আমি বাইরে বসে আছি।
Time Skip………
পরেরদিনঃ
আইসিইউ থেকে আরিয়ানকে HDU-তে শিফট করা হয়েছে।অবস্থা এখনো সিরিয়াস কিন্তু লাইফ থ্রেট নেই। ইলা রাতভর এক মিনিটের জন্যও ঘুমায়নি।চেয়ারে বসে বসেই ঘুম এসেছে তবুও চোখ খোলা রেখেছে হাতে এখনো বিয়ের দিন পড়িয়ে দেয়া আরিয়ানের ছোট্ট রিংটা ধরা। নার্স এসে ডাকল ইলাকে
“ম্যাডাম আপনি ভেতরে যেতে পারেন কিন্তু বেশি কথা বলবেন না।
ইলা উঠে দাঁড়াল চোখে ক্লান্তি, মুখে ফ্যাকাশে রঙ তবু চোখে একরাশ জেদ ভেতরে ঢুকতেই আরিয়ান চোখ খুলল।
আরিয়ানঃ- আপনি এখনো আছেন আমি তো ভেবেছিলাম আপনি হয়তো আমাকে বাচ্চার মত শান্তনা দিয়ে চলে গেছেন।
ইলাঃ- আপনি যতদিন হসপিটালে আছেন আমি কোথাও যাচ্ছি না।
আরিয়ানঃ- কিন্তু আপনি তো দেখছি সারারাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। এভাবে চললে তো আমার বদলে আপনি রুগি হয়ে যাবেন।
ইলাঃ- আপনি কথা বলবেন না ডাক্তার মানা করেছে।
আরিয়ানঃ- তাহলে আপনি ও কথা বলবেন না, আমি শুনবো না আর কোথাও বলবো না।
ইলা এক সেকেন্ড থমকে গেল তারপর বিরক্ত স্বরে বলল,
ইলাঃ- এই অবস্থাতেও দুষ্টুমি যাচ্ছে না আপনার।
(আরিয়ান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানল)
আরিয়ানঃ- বাঁচলে তো দুষ্টুমি করবোই।
ইলাঃ- আপনি তো আগে এমন ছিলেন না তাহলে হঠাৎ এমন ব্যবহার করছেন কেনো। মাথাটা কি পাবনা চলে গেছে নাকি?
আরিয়ান কষ্ট করে হাত তুলল ইলা সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটা ধরে ফেলল।
আরিয়ানঃ- মাথা মাথার জায়গায় আছে একা একা বোরিং হচ্ছি তাই ভাবলাম আপনার সাথে টাইম পাস করি।
ইলাঃ- কি আপনি আমার সাথে টাইম পাস করছেন প্লে-বয়, লুইচ্চা কোথা কার।
আরিয়ানঃ- বউ এর সাথে টাইম পাস করলে বুঝি মানুষ লুইচ্চা আর প্লে-বয় হয়।
ইলা বউ কথা শুনে কিছুটা লজ্জা পেয়ে যায়। ইলা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে রাগী স্বরে বলে
ইলাঃ- চুপ থাকুন বেশি কথা বললে আমি চলে যাবো।
আরিয়ানঃ- না না যাবেন না আমি কথা বলছি না এই দেখুন একদম চুপ।
দু’সেকেন্ড পর আবার ফিসফিস আরিয়ান বলল
আরিয়ানঃ- কিন্তু আপনি রাগ করলে খুব সুন্দর লাগে দেখতে আপনাকে “ইলাফুল”
ইলাঃ- মিস্টার রাক্ষস প্লিজ চুপ থাকেন নাহলে আমি গেলাম।
ইলা ঘুরে দরজার দিকে যাচ্ছিলো হঠাৎ দেখে নার্স দূর থেকে তাকিয়ে হাসছে।
“দেখছি রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে”
ইলা লজ্জায় মাথা নিচু করল আরিয়ান চোখ বন্ধ করে শান্ত স্বরে ইলাকে বলল,
আরিয়ানঃ- জানেন এই হাসপাতালে সবচেয়ে ভালো ওষুধটা আপনি।
ইলা তার কপালে হাত রেখে খুব আস্তে বলল,
ইলাঃ- আপনি সত্যি অসুস্থ হয়ে গেছেন সাথে মাথাটাও গেছে। আর আমি আপনাকে সুস্থ করেই ছাড়বো।
আরিয়ান চোখ বন্ধ রেখেই ফিসফিস করে বলল
আরিয়ানঃ- তাহলে আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হবো না আপনাকে বিরক্ত করার জন্য।
ইলাঃ- একদম চুপ
আরিয়ানের ঠোঁটে শান্ত হাসি মনিটরের বিপ বিপ শব্দের মাঝেও একটা জিনিস পরিষ্কার এই মানুষটা আর একা নেই।এই লড়াইটা সে জিতবেই কারণ তার পাশে আছে ইলা।
Time Skip…..
HDU রুমে বিকেলের আলোটা জানালার কাঁচ ভেঙে ভেতরে ঢুকেছে।এই সবকিছুর মাঝেই ইলা একটা ট্রে হাতে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। ট্রের ওপর অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, গজ, কটন। এগুলো নার্স নিয়ে আসছিলো কিন্তু ইলা নার্স এর থেকে এগুলো নিয়ে বলে সে পারবে এই গুলো করে নিতে তাই নার্স বলে গেলো
“হাত-পায়ের ক্ষতগুলোতে আজ থেকে হালকা করে ক্রিম লাগাতে হবে সাথে বুকেরটাতে সাবধানে লাগাতে হবে।
( ইলা এই কারণেই নার্স কে এই কাজ গুলো করতে দেয়নি। যেহেতু এখন আরিয়ান ইলার স্বামী তাই ইলা চায় না তার স্বামীকে কাউ টার্চ করুক)
ইলা মাথা নেড়ে সব বুঝে নিয়েছে কিন্তু এখন দাঁড়িয়ে হঠাৎ তার বুকটা ধুকপুক করতে শুরু করল। তবুও আরিয়ানের কাছে গেলো কিন্তু কোনো কথা না বলে চুপ করে দাড়িয়ে আছে। আরিয়ান আধশোয়া অবস্থায় তাকিয়ে আছে। চোখে সেই চেনা দুষ্টু ঝিলিক ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি।
আরিয়ানঃ- কী হলো এত সিরিয়াস মুখ দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
ইলাঃ- ডাক্তার বলেছেন ক্ষতগুলোতে ক্রিম লাগাতে।
আরিয়ানঃ- ওহ তাহলে আজ আমার কেয়ারটেকার আপনি?
ইলাঃ- চুপ থাকবেন বেশি কথা বললে আমি নার্স ডাকবো কিন্তু।
আরিয়ান নাটকীয়ভাবে ঠোঁটে তালা লাগানোর ভঙ্গি করল।
আরিয়ানঃ- ঠিক আছে একদম চুপ।
ইলা প্রথমে আরিয়ানের হাতের দিকে গেল। ইলার আরিয়ানের ক্ষতটা দেখে বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।ইলা খুব আলতো করে ক্রিম লাগাতে লাগল “ব্যথা লাগছে” আরিয়ান চোখ বন্ধ করে শান্ত স্বরে বলল,
আরিয়ানঃ- নার্স হলে ব্যথা লাগে কিন্তু আপনার হাতে লাগলে কিছুই মনে হচ্ছে না।
ইলা কিছু বলল না শুধু মনোযোগ দিয়ে কাজ করল। তারপর পায়ের ক্ষত একই যত্ন একই নীরবতা নিয়ে ক্রিম লাগালো।সব শেষ করে ইলা দাঁড়িয়ে পড়ল।হঠাৎ বুঝল আর একটা জায়গা বাকি সেটা আরিয়ানের বুকে।
ইলা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল চোখ তুলছে না, কথা বলছে না। আঙুলগুলো অকারণে গজের কাপড় মুচড়ে যাচ্ছে।আরিয়ান ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকাল।
আরিয়ানঃ- কী হলো এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো আবার?
(ইলা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল)
ইলাঃ- ওখানে মানে আপনার বুকে একটা ক্ষত আছে।
আরিয়ানঃ- ওটা লাগাবেন না?
আরিয়ানের মুখে এই কথা শুনে ইলার কান লাল হয়ে উঠল।
ইলাঃ- মানে আমি কিভাবে?
(আরিয়ান বুঝে ফেলল তবুও দুষ্টু স্বরে বলল)
আরিয়ানঃ- ডাক্তার তো আপনাকেই দায়িত্ব দিয়েছেন।
(ইলা চোখ নামিয়ে খুব আস্তে বলল)
ইলাঃ- শার্টটা একটু খুলতে হবে যে।
আরিয়ান চোখে মজা নিয়ে ধীরে ধীরে শার্টের বোতাম খুলতে লাগল।প্রতিটা নড়াচড়ায় ইলার বুক ধুকপুক করছে। আরিয়ানের শরীর থেকে শার্ট সরতেই ইলা অনিচ্ছা শর্তেও চোখ তুলে তাকাল।এবং এক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে গেল।
আর্মির নিয়মিত ট্রেনিং আর জিমে গড়া শরীর দেখে চওড়া কাঁধ,শক্ত বুক,স্পষ্ট পেশির রেখা। ক্ষতের দাগ তবুও সেই শরীরের ভেতর লুকানো শক্তি আর সাহস যেন চোখে পড়ছে ।ইলা হঠাৎ চোখ নামিয়ে নিল ইলার গাল লাল হয়ে গেছে বুক কাঁপছে আরিয়ান খুব শান্ত স্বরে বলল,
আরিয়ানঃ- ইলা ফুল এত লজ্জা কেন?
(ইলা রাগী স্বরে বলল)
ইলাঃ- তাকাবেন না এভাবে আমার দিকে।
আরিয়ানঃ- কিন্তু আপনি তো তাকিয়েই ফেললেন আমার দিকে।
ইলা কিছু না বলে কটনে ক্রিম নিল হাত কাঁপছে।খুব আলতো করে আরিয়ানের বুকে ক্রিম লাগাতে লাগল যেন একটু বেশি চাপ পড়লেই সে ভেঙে যাবে।তার আঙুলের স্পর্শে আরিয়ান চোখ বন্ধ করে ফেলল নিঃশ্বাস একটু গভীর হয়ে এলো।আরিয়ান কে এভাবে দেখে ইলা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
ইলাঃ- ব্যথা লাগছে?
(আরিয়ান চোখ বন্ধ রেখেই বলল)
আরিয়ানঃ- না অদ্ভুত শান্তি লাগছে।
আরিয়ানের মুখে এমন কথা শুনে ইলা কাজ শেষ করে দ্রুত হাত সরিয়ে নিল “হয়ে গেছে” আরিয়ান চোখ খুলে তাকাল।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৯
আরিয়ানঃ- ইলাফুল আপনি জানেন যুদ্ধের পরে সৈনিকের সবচেয়ে বড় শক্তি কী?
ইলাঃ- কী?
আরিয়ানঃ- একটা নির্ভর যোগ্য হাত যে হাতটা তাকে আবার বাঁচতে শেখায়।
ইলার চোখ ভিজে উঠল সে আর কিছু বলল না শুধু শার্টটা এগিয়ে দিল।আরিয়ান শার্ট পরতে পরতে মৃদু হাসল।
আরিয়ানঃ- যদি আমি সুস্থ হয়ে যাই তার পুরো কৃতিত্ব আপনার।
ইলাঃ- আপনি সুস্থ হবেন আমি থাকতে থাকতে আপনাকে কিছু হতে দেব না। আমি আপনাকে সুস্থ করেই ছাড়বো।
HDU রুমের বাতাসে তখন শুধু মনিটরের শব্দ নয় দু’টা হৃদয়ের নীরব প্রতিজ্ঞাও ভেসে বেড়াচ্ছে।
