ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৩
বেলা শেখ
“গিফট ফেরত আনলে যে?”
আনিকা গিফট বক্সের দিকে চেয়ে বলল, “নিলো না।”
“নিলো না মানে?” আরিয়ান অবাক না হয়ে পারলো না। আনিকার দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসে। এই বুঝি রুমঝুম রবে বারিধারা বইতে শুরু করে দেয়। আরিয়ান সুক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “দুজনের আবার লেগেছিল?”
আনিকা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো ক্ষণ। বলল, “উই আর নট মেড ফর ইচ আদার।”
“আনিকা কি হয়েছে? ভোর কিছু বলেছে? নাকি ভাই আবার…”
“কেউ কিছুই বলে নি আব্বু!”
“তাহলে?”
“তাহলে কিছুই না। হঠাৎ মনে হলো আমরা একে অপরকে ভালোবাসি কিন্তু একে অপরের জন্য তৈরি হইনি।”
আরিয়ান হাসলো মেয়ের কথায়। উঠে এসে কাঁধ জড়িয়ে আগলে নিলো। স্নেহের সুরে বলল, “ ভালোবাসা টালোবাসা কিছুই না। ঝগড়াঝাঁটির জন্য হলেও একে অপরের সাথে লেগে থাকতে, কাজিন তোমরা তাই একটু টান তৈরি হয়েছে!”
আনিকা চোখ ডলে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যুত্তরে বলে, “টানটা একটু বেশিই দৃঢ় আব্বু। আর তোমাদের ধারনা ভুল। আমি ভোরকে ভালোবাসি, সত্যিই ভালোবাসি। আগে যদিওবা একটু দ্বিধায় ভুগছিলাম আজকের পর আর দ্বিধা রইলো না।”
আরিয়ান মেয়ের মাথায় ঠোঁট চেপে ছোট্ট চুমু দেয়। জিজ্ঞেস করে, “হয়েছে টাকি আনিকা? চোখে পানি কেন?”
আনিকার ঠোঁট ভেঙে আসতে চাইলেও ঠোঁটের কোণে হাসি লেপ্টে নেয়। বাবার প্রশ্নের জবাবে বলে, “ আমি বড্ড দেরি করে ফেললাম। আমারই ছিলো, আমি একটু হেলা করতেই তা অন্যকেউ পেয়ে গেলো। এই আফসোস নিয়ে আমি কিভাবে বাঁচবো বলো তো?”
আরিয়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ। আনিকা নাক মুখ ডলে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। সফলও হয়।
“মামুনি, সবটা না বললে আমি তো বুঝবো না কি হয়েছে!”
“তুমি আগেই বুঝলে না, এখন কি করে বুঝবে আব্বু? আনিবুড়ি আর ভোরের জন্য লাল টুকটুকে বউ সাজবে না। তোমরাই জিতে গেছো। কনগ্র্যাচুলেশনস আব্বু।”
আরিয়ান বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে মেয়ের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে রইলো। আনিকা টলমল পায়ে দোতলায় চলে আসে। নিজ ঘরে যেতে নিয়েও মোড় ঘুরিয়ে তাঁর বেস্ট এনিমির ঘরে চলে যায়। ঘরটা ফাঁকা হলেও এ ঘরে তাঁর ঘ্রাণ এখনও পাওয়া যাচ্ছে। সে দরজা লাগিয়ে বিছানায় বসে রইলো চুপচাপ টুপটাপ। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল ক্ষণ। অরুণাভের নাম্বার থেকে অল আসছে। বেশ কিছু মিসড কলও উঠে আছে। সে ফোন সুইচ অফ করে রেখে দিলো আলগোছে।
“এই অ্যাড্রেসে চলে যাবি। বাবার কথা বললেই হবে। তিন মাসের ভাড়া অ্যাডভান্স নেয় ওনারা। বাবা এক মাসের অগ্রিম দেওয়ার কথা বলেছে।”
অরুণাভ কার্ড পকেটে রেখে বলল, “থ্যাংকস বাডি! আমি তো চোখে সর্ষে ফুল দেখছিলাম। কোথায় যাবো কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।”
মোহন বন্ধুর পাশে বসে বলল, “এখন সব খুলে বল। আই মিন টু সে খুলে বল তবে জামাকাপড় না, ঘটনা। হে হে হে!”
অরুণাভের নিজেকে যথাসম্ভব ঠান্ডা রেখে নুডুলস মুখে পুরে নিল। স্বাভাবিক সুরে বলল, “তোকে কে বললো সব!”
মোহনলাল হামি তুলে বলল, “তোদের হটিনটি বয়েস গ্রুপে আমিও এড ছিলাম বাডি!”
অরুণাভ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। মোহন উতলা কণ্ঠে বলল, “বাডি জলদি বল। আমার আর ধৈর্য্যে কুলাচ্ছে না।”
অরুণাভের মুখটা ম্লান হয়ে আসে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তপুর বার্ডডে ছিলো। সেই উপলক্ষে পার্টি। পার্টিতে বিয়ার তো কমন জিনিস। কম বেশি সবাই টেস্ট করে। রবিন কোত্থেকে যেন দুই বোতল ব্র্যান্ডি মদ এনেছিল। আর বিভানের বাপের গাঁজার ব্যবসা আছে। সবাই ওকে জোরাজুরি করেছিল একটু হলেও যেন গাঁজা বাবার সবাইকে দর্শন করায়। তো সে অল্প গাঁজা এনেছিল। যদিও আমরা বিশ্বাস করি নি ওটা গাঁজা। ভেবেছিলাম বোকা বানাচ্ছে। যাইহোক প্রতিবারের মতোই নাহিদের খালি ফ্ল্যাটে পার্টির আয়োজন করে ওঁরা। ইন্টারমিডিয়েট ব্যাচের অধিকাংশই ইনভাইটেড ছিলো। আমিও মিস করি নি। তবে মেজাজ বিগড়ে যায় টুটুলের সাথে ওই ডাঈনী টাকে দেখে। শালা ওকে এনে আমাকে পাত্তাই দিচ্ছিলো না। আর পার্টির সব ছেলেরা সুন্দরী মেয়ে পেয়ে চোখে হারাচ্ছিলো। আমি নিজের মতো এনজয় করছিলাম। পার্টি ভালোই চলছিলো। সবাই এনজয় করছিলো। হৈ হুল্লোড় একটু বেশিই হচ্ছিলো। পাশের ফ্ল্যাটের এক আঙ্কেল কয়েকবার এসে সতর্ক করে গিয়েছিল। একপর্যায়ে ওনার সাথে নাহিদের কথাকাটাকাটি হয়।।”
মোহন খানিকটা ধীমে আওয়াজে বলল, “নাহিদ কোত্থেকে মেয়ে এনেছিল শুনলাম? আমাকে ডাকতে পারতি। আমিও একটু এনজয় করতাম!”
অরুণাভ ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকালো। মোহন কাঁচুমাচু মুখ বানায়। তারপর ক্লোজ আপ হাসি দিয়ে বলল, “বয়সটাই এমন বাডি! ওভাবে তাকানোর কিছু নাই। উপরন্তু আমার গার্লফ্রেন্ডও নাই! একটু ডাকলেই পারতি।”
“লজ্জা করে না তোর?”
মোহনের মুখটা চুপসে যায়। পরক্ষণেই তেতে উঠে বলে, “তোর তো খুব লজ্জা! তাই ওই পত্রলেখাকে নিয়ে ঘরে…”
“শাট আপ মোহন! ওটা যাস্ট একটা ডেয়ার ছিলো।”
আচানক অরুণাভ গর্জে ওঠে। মোহন জিভে কামড় বসায়। আমতা আমতা করে বলে, “যেটাই হোক, কাজটা ঠিক হয় নি। এরকম জঘন্য ডেয়ার কেন মেনে নিলি!”
অরুণাভ যেমন গর্জে উঠেছিল তেমনি চুপসে গেলো। মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। মোহন বন্ধুর কাঁধ জড়িয়ে সান্ত্বনা দেয়। অরুণাভ বিষন্ন সুরে বলে, “সবাই ডেয়ার এন্ড ডেয়ার খেলছিল। চিরকুটে দুটো নাম উঠেলো। আমার আর ওঁর! আমি তখনই আত্মসমর্পণ করি, আমি এ ডেয়ার পূরণ করবো না। এতে যা পানিশমেন্ট দেওয়ার দে! শালারা মানে নি। সবাই গুসুর ফুসুর করে ডেয়ার দিলো। ডাঈনীটার সাথে বদ্ধ ঘরে আধ ঘণ্টা থাকতে হবে, নাহলে প্রোপোজ করতে হবে।”
“প্রোপোজ করতি। যাস্ট আই লাভ ইয়্যু বলার ছিলো।”
অরুণাভ বন্ধুর দিকে তাকায়। ম্লান হেসে বলে, “আই লাভ ইয়্যু—কথাটা ওতটাও সস্তা না। যে যাকে তাকে বলে দিবো। যাকে ভালোবাসি তাঁকে বলতে আমার দুই বছর লেগেছিলো। যাকে ঘৃণা করি তাঁকে তো বলার প্রশ্নই আসে না। তাই সেকেন্ড অপশন মেনে নিলাম। আধঘণ্টারই তো ব্যাপার। কিন্তু কে জানতো এই আধঘণ্টা পুরো জীবনের ফাঁস হয়ে গলায় আঁটকে যাবে।”
অরুণাভের গলা কাঁপে। বুকটা খাঁ খাঁ করে। কথা খুঁজে পায় না। আনিকার ফ্যাকাশে মুখটা চোখে ভাসে। মোহন বন্ধুর পিঠে চাপড় মেরে বলল, “পুলিশ কে ইনফর্ম করেছিলো?”
“ওই আঙ্কেল বোধহয়। মেয়ে দুটোকে চিনে ফেলাতেই যত ক্যাচাল হয়েছে। নয়তো বিয়ার মদ এগুলো কিছুই না। অধিকাংশ এলিট শ্রেণীর ছেলেমেয়েদের কাছে এসব নর্মাল বলেই বিবেচিত। তাছাড়াও আমরা সবাই এডাল্ট।”
অরুণাভ থামলো। মোহন কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “পুলিশ যখন এলো তখনও তোরা ওই ঘরে আটকে ছিলি?”
অরুণাভের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। বলে, “হ্যাঁ, পুলিশের ভয়ে সবাই আমাদের কথা ভুলেই বসেছিল। স্টাডিরুমে ছিলাম আমরা। ওনারা পুরো ফ্ল্যাট সার্চ করে। চিঠিপত্রকে কাভার্ডে লক করে দিই আমি। চাবি জানালা দিয়ে ফেলেও দিয়েছিলাম। সেই মুহূর্তটাই জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ মুহূর্ত মনে হয়েছিল। বাইরে হৈচৈ, ভেতরে নিস্তব্ধতা। মনে হচ্ছিল, কাভার্ডের ভেতর থেকে যদি সামান্যও শব্দ হয়, তাহলে সব শেষ। তবুও কনফিডেন্ট ছিলাম কিন্তু পুলিশ সার্জেন্ট ছিলো আব্বুর পরিচিত। ভয়টা বেড়ে কয়েকগুণ। ঘর তল্লাশি করল। কাভার্ড খোলার চেষ্টা করে। লক দেখে চাবি চাইল। আমি বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে জবাব দিলাম—চাবি কোথায় আমি কিভাবে বলব। আপনি আব্বুর পরিচিত তাই আমি এ ঘরে লুকিয়ে ছিলাম। শালার পুত আমাকে চিনতে পারে। নাহিদের কাছে চাবি চায়। নাহিদ ঘাবড়ে জানায় চাবি হারিয়ে ফেলেছে। সন্দেহ সেখান থেকেই শুরু। কাভার্ডে লাঠি দিয়ে জোরে জোরে আঘাত করে। মেয়েটা বোবা বলে স্বস্তি। কিন্তু স্বস্তি বেশিক্ষণ টিকলো না। লকে বন্ধুক ঠেকায়। সব শেখানেই শেষ। উনি চিঠিপত্রকে ওই মেয়েগুলোর সঙ্গী ভেবেছিল। লেডি পুলিশ বেচারিকে মেরেছেও।”
“থাম থাম থাম! কাভি ডাঈনী, কাভি চিঠিপত্র আবার কাভি বেচারি! বাডি তোমার কথার ধরণ ভালো না।”
মোহন সিরিয়াস কথার মাঝে বাম হাত ঢুকিয়ে দিলো। এ ছেলে এমনই। সবেতে মজা খুঁজে বেড়ায়। অরুণাভ চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে। ঝাঁঝালো স্বরে বলে, “মেজাজ গরম করাবি না।”
“আচ্ছা তারপর বল!”
অরুণাভ নুডুলসের সবটুকু মুখে পুরে নেয়। সারাদিন অভুক্ত থাকায় ক্ষুধা একটু বেশিই। মোহনকে বলে আরেকটু আনাবে নাকি? নাহ্ থাক। ছোচামি হয়ে যাবে। সে পানি খেয়ে বাকি টুকু ভরিয়ে নিলো। স্পোর্টস ব্যাগ কাঁধে তুলে বলল, “তারপর আর কি! আব্বুকে ডেকে বৃত্তান্ত শোনালো। আমি বারবার বলেছিলাম, যাস্ট ডেয়ার ছিলো। সেরকম কিছুই না। আব্বুর বন্ধু আরেক বদমাইশ। আব্বুকে উস্কে দিয়েছিল। আমি হাজারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি আব্বু আমার একটা কথাও শোনে নি।”
“তো তোকে বাধ্য করা হয়েছে বিয়ে করতে। কিন্তু পত্রলেখা? ও রাজি হলো কেন? ওঁর গার্ডিয়ান কিছু বলে নি?”
“সবার গার্ডিয়ান এলেও ওঁর বাড়ি থেকে কেউ আসে নি। পুলিশ ওকে বাজারি মেয়ে ভেবে ওই মেয়ে দুটোর সাথে চালান করে দিচ্ছিলো। আব্বুর দয়া হলো। সঙ্গে নিয়ে এলো! আমি ভাবলাম হোস্টেলে ড্রপ করে দিবে। কিন্তু গাড়ি থামলো কাজি অফিসের সামনে। ব্যস আমার জীবনটাকে সার্কাস বানিয়ে ছাড়লো।” থামলো অরুণাভ। একটু জিরিয়ে নিয়ে বলল, “ইয়্যু নো না, হাউ মাচ আই লাভ আনি! রাগ অভিমান যাই থাকুক, ভালোবাসা তো আর কমে যায় নি। আব্বু সব জেনেও আমাকে জোরজবরদস্তি বাঁধনে বেঁধে দিলো।”
“তাই তুই রাগ করে বাড়ি ছাড়লি!”
অরুণাভ বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বলল, “আসি, থাক।”
মোহন বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “স্যরি বাডি। গরীবের বাড়িতে থাকতে বলতে পারছি না। মা বন্ধু বান্ধবদের বাড়িতে আসা পছন্দ করে না। দুটো বোন আছে বাড়িতে…”
“আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড বাডি। যাস্ট চিল না? কাল ঘুরে আসিস আমার ওখানে। জমিয়ে আড্ডা দেবো কেমন?’
“ওকে বাডি!”
“অ্যানা বোধহয় তোর বোনের কাছে। এনে দে!”
মোহনলাল অ্যানাকে নিয়ে আসে। অরুণাভ তাঁর একমাত্র সঙ্গীটিকে বুকে জড়িয়ে নেয়। মোহন নাক মুখ কুঁচকে নেয়, “মেয়েদের মতো বিড়ালের শখ আছে জানতাম না তো!”
অরুণাভ বিড়ালের গালে গাল ঘষে সোহাগ করে। বন্ধুকে জানায়, “ও বিড়াল না। সি’জ মায় লিটল বেইবি। মায় কিউটি আ্যানা! আই লাভ হার বাডি। আর বিড়ালের শখে জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন অন্যায়।”
মোহন বন্ধুকে দরজা অবদি এগিয়ে দেয়। অরুণাভ যেতে যেতে বলল, “আব্বু হয়তো ফোন টোন করবে। খবরদার কিছু বলবি না। প্রমিজ কর?”
“আমি না বললেও আঙ্কেল ঠিকই খোঁজ পেয়ে যাবে। বাই দা ওয়ে তোর বেইবির আম্মাজান পত্রলেখা কোথায়?”
অরুণাভ চোখ রাঙালে মোহন জিভ কাটে। মাথা চুলকে হেসে বলে, “মায় মিশটেক! ভাবী কোথায়?”
“বা/ই/ঞ্চো/ত, তোর ভাবীর নিকুচি করি।” অরুণাভ দাঁত কিড়মিড় করে। মোহন দরজা বন্ধ করতে করতে বলে, “তোর বউ, যা খুশি কর আমার কি!”
অরুণাভ রাগে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। আপনমনে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অ্যানাকে শুনিয়ে শুনিয়ে পত্রলেখার পিন্ডি চটকায়। খালি টেক্সি পেতেই উঠে পড়ে। ড্রাইভারকে ঠিকানা জানিয়ে সিটে গা এলিয়ে চোখ বুজে নেয়। হঠাৎ কোথা থেকে মন খারাপী উড়ে এসে জুড়ে নেয় মন বাগিচা। ভাসা ভাসা চোখ দুটো ভিজে উঠতে চায়। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে ফোন বের করে। জিরো ম্যাসেজ, জিরো ফোন কল। মনটা আরেকটু বিষিয়ে ওঠে। জানালার পাশ ঘেঁষে বসে উদাস চেয়ে রয় ব্যস্ত শহরে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামছে। আকাশেরও বুঝি মন খারাপ করেছে?
কালো ওড়নায় মুখটা আরেকটু ঢেকে নেয় পত্রলেখা। মুখাজুড়ে ঘোর অমাবস্যা। চোখে তীব্র প্রতীক্ষা! সে চোখ বারবার বাম দিকের রাস্তায় শত মানুষের ভিড়ে খুঁজে চলে চেনা মুখ! সে ‘আসছি’ বলে চলে গেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরুলো। তবুও আসছে না কেন? নাকি আসবে না! তাঁকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলো।
“আইলো না তোর সোয়ামি?”
ছাকেরা বানুর কথায় পত্রলেখা না বোধক মাথা নাড়লো। ছাকেরা বানু পানের পিক ফেলে হাসলেন। ঠোঁট দুটো লাল টুকটুকে। মনে হচ্ছে এখনি কারো তাজা রক্ত চুষে খেয়েছেন।
“আইবোও না। হেয় দুপুরের কতা। ওহন রাইত বাজে বারোটা। আসার হইলে এতক্ষণে আইতো। হেতি ভাগছে রে মনু। তোর কপাল ফুডা!”
পত্রলেখার মুখে তখনও আশারা উঁকি ঝুঁকি দেয়। সে আসবে বলেছে। ছাকেরা বানু আবার বললেন, “ওহন কই যাবি ভাবলি? আমি ওহন বাড়ি যামুগা। রাইত মেলা হইছে! তার উপর বিষ্টি বিস্টি ভাব, বেচাকিনি নাই। সুমন, সব গোছগাছ কর চটপট।”
ছাকেরা বানু পেটের তাগিদে মেয়ে মানুষ হয়েই ফুটপাতে চা-পান সিগারেট বিক্রি করেন। বাসস্ট্যান্ডের পাশে হওয়ায় টুকটাক ভালোই বেচাকিনি হয়। সে-ই পয়সায় তাঁর আর পাঁচ বছরের ছেলেটার দিনকাল ভালোই চলে। ছেলেকে স্কুলেও পাঠানো যায়। দুপুর থেকে দোকানে বসে পত্রলেখাকে খেয়াল করছিলেন তিনি। ছিমছাম গড়নের বেশ সুন্দর দেখতে। চেহারায় বিদেশি বিদেশি একটা ভাব আছে। বাঙালি লাগে না। বৈদ্যুতিক পুলের পাশে খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে ছিলো, কারো অপেক্ষায় ছিলো এমনটা মনে হলো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায় অথচ কেউ আসে না। মেয়েটাও নড়ে না সেখান থেকে। সন্ধ্যা হলেও না। একা রাস্তায় এক যুবতী মেয়ে দাড়িয়ে। দেখতে অসুন্দর হলেও তো হায়েনারা ওঁৎ পেতে থাকে। সেখানে এই মেয়ে হুর পরী। তিনি ছেলেকে পাঠালেন। মেয়েটা কথা বলে নি, নড়েও নি। তিনি ক্ষুব্ধ হন। চুলোয় যাক বলে নিজ বেচাকিনিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একটু পর মেয়েটাই এগিয়ে আসে। ইশারা ইঙ্গিতে কিছু বলে। তিনি বুঝতে পারলেন মেয়েটা বোবা। তিনি কতক্ষণ চেয়ে ছিলেন মেয়েটার মুখ পানে। এতো সুন্দর মেয়ে নাকি বোবা। আল্লাহ পাকের লীলা খেলা বোঝা দায়। ছেলের খাতা পেন্সিল এনে দিলেন ভাববিনিময়ের জন্য। সাহায্যের জন্য ফোনটাও দিলেন। কিন্তু বোকা মেয়েটা স্বামীর ফোন নাম্বার জানে না। হায় কপাল!
চালা বিহীন দোকান মোটা পলি কাগজে মুড়িয়ে রশি দিয়ে বাঁধেন মা ছেলে। পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“বাপের বাড়ি কোনহানে তোর? কাছেহুন্তে হইলে রাইখ্যা আসি।”
পত্রলেখা আবারও রাস্তায় তাকায়। সে আসবে না বুঝতে পারে। তবুও অবুঝ মন আশা রেখেছিল। সে সুমনে খাতায় পেন্সিল দিয়ে হোস্টেলের ঠিকানা লিখে দেয়। ছাকেরা বানু বানান করে করে শব্দ জুড়লো। তারপর বলল, “এ তো অনেক দূর। এক কাম কর, রাইত আমগোর বস্তিতে থাইকা ভোর হইলে যাইস।”
ক্ষণিকের পরিচয়, অথচ মনটা কত উদার। এই অচেনা শহরে মানুষের ফুরসত কই অন্যদের দিকে তাকানোর? মানুষকে সাহায্য করার প্রবণতা দিনকে দিন লোপ পাচ্ছে। মানুষ টাকা ছাড়া একগ্লাস পানিও খাওয়ায় না। সেখানে ছাকেরা বানু তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে। পত্রলেখা সায় জানালো।
“তাইলে পায়ে পায়ে হাঁটেক। সুমনের হাতটা ধর। কাইল্ল্যা বইলা ঘিন্না করিস না।”
পত্রলেখা সুমনের দিকে তাকালো। সুমন দূর রাস্তার দিকে আঙুল তুলে বলল, “মা ওই দেক একটা সুন্দর পোলা কারে জানি খুঁজে।”
ছাকেরা বানু চমকান। রাস্তার অপরপাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে এক যুবক। এদিকেই তাকিয়ে। তিনি পত্রলেখার দিকে তাকান, কিন্তু মেয়েটা নেই। ছুটে গেছে। তিনি মুচকি হাসলেন। ছেলের হাত মুঠোয় ভরে বললেন, “আন্ধার হইলেও ওঁর সোয়ামি আইছে। তোর বাপে আর আইলো না রে সুমন!”
রাস্তায় দাঁড়িয়ে অরুণাভ বিরক্তের শ্বাস ফেলে। শক্ত কিছু বলতে নিবে ভারী কিছু এসে বুকে আঁছড়ে পড়ে। নাক মুখ কুঁচকে নেয় সে। হাত দিয়ে ঠেলে সরাতে চায়। পত্রলেখা আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে নেয়। অরুণাভ বিরক্তের চরম সীমান্তে পৌঁছালেও প্রকাশ করলো না। মেয়েটার গায়ের কাঁপন টের পাচ্ছে, কাঁদছে মেয়েটা। সে না আসলে কি হতো?
“যখন দেখলে আসছি না, চলে যাওয়া উচিত ছিলোনা? তুমি কি আসলেই এতোটা মাথা মোটা? আমি যদি না আসতাম?”
মেয়েটার কান্না থামার নাম নিচ্ছিলো না। তাঁকেও ছাড়ছিলো না। জোঁকের মতো আকড়ে ধরেছে। জোঁক ছাড়াতে লবণ তো লাগাতেই হতো। তাই ঝাড়ি দিলো। পত্রলেখা সরে আসে। ওড়নায় নাক মুখ ঘষে রাগী রাগী দৃষ্টিতে তাকাল। অরুণাভের বাম হাত মুঠোয় ভরে হাত ঘড়ির দিকে ইশারা করল।
অরুণাভের চোখের আকার বড় হয়। তাঁকে রাগ দেখাচ্ছে! কি সাহস! সে দাঁত কটমট করে বলে, “দশ মিনিট…বিশ মিনিট তারপর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেই বোঝা উচিত ছিলো আমি আসবো না।”
পত্রলেখা তর্জনী আঙ্গুল ভূমির দিকে তাক করে পরপর হাতের পাঁচ আঙুল ঘুরিয়ে কিছু বোঝালো। অরুণাভ বুঝলো যেন। একটু অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল, “এসেছি কারণ… মানে…” থামলো কিছুপল। তারপর ঝাঁঝের সাথে বলল, “অমানুষ না আমি। সিওর হতে এসেছিলাম চলে গেছো নাকি।”
পত্রলেখা অসহায় চোখে চায়। তাঁর কাছে একটা পয়সা অবদি নেই সে কি করে যাবে? আর কেন যাবে? ‘চলে যাও’— বললে চলে যেতো। ‘আসছি দুই মিনিটে, এখানেই থেকো’—বলার মানে কি তাহলে? সে অরুণাভের বুকে আঙুল ঠেকায়। অরুণাভ জ্বলেপুড়ে ওঠার আগেই সরিয়ে নেয়। হাতের সাহায্যে লাভ শেপ বানায়। অরুণাভ রাগে ফেটে পড়ার আগেই লাভ শেপ ভেঙে ফেলে, এরপর নিজের দিকে আঙুল তুলল।
অরুণাভের বৈদ্যুতিক পোলের সাথে মাথা ঠোকরাতে ইচ্ছে করে। বিরক্তিকর বিরক্তিকর অতঃপর মহা বিরক্তিকর। সে ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “ ইয়্যু রুইন মায় হোল লাইফ। আ’ল নেভার ফরগিভ ইয়্যু।”
পত্রলেখা মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আসে। অরুণাভ খুবই বিরক্তিকর চাহনি নিক্ষেপ করে হাঁটা দেয়। রিকশা ডাকে, ভাড়া মিটিয়ে উঠে বসে। অথচ পত্রলেখার হেলদোল নেই। ঠায় দাঁড়িয়ে। অরুণাভের কপালে ভাঁজ পড়ে। বিদ্রুপের স্বরে বলে, “ইনভাইটেশন কার্ড পাঠিয়ে ওঠার কথা বলতে হবে?”
পত্রলেখা মুখ ফিরিয়ে নেয়। অরুণাভের নিজের গালে নিজেরই থাপড়াতে ইচ্ছে করে। সে রাগ সংবরণ করে বলে, “উঠে আসো।”
পত্রলেখা মুখ ফিরিয়ে রেখেই উঠে বসলো রিকশায়। চাপা রিকশায় দুজন, গায়ে গা লাগবে স্বাভাবিক। অরুণাভ গা বাঁচিয়ে বলল, “খবরদার চিপকাবে না। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবো।”
পত্রলেখা মুখ বাঁকিয়ে বুড়ো আঙুল দেখায়। অরুণাভ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নেয়। এ কোন পাগলের ঘরের পাগলকে সে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে! মননে বাবার প্রতি এক রাশ অভিমান জন্মে। এমনটা না করলেও পারতো!
অরুণ সরকার ডাইনিং টেবিলে কনুই ঠেস দিয়ে বসে। টেবিল হরেক পদের খাবারের দখলে। অথচ চেয়ার গুলো ফাঁকা পড়ে আছে। মেয়েকে আসতে দেখে সোজা হয়।
“বাকিরা কই?”
অরুণিতা বাবার মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসে বলল, “ডাকলাম উঠলো না। রাগ দেখালো। ঘুমিয়ে পড়েছে।”
“না খেয়ে কেন ঘুমাবে! সারাদিন কিছুই খায় নি। আশ্চর্য রাগ রাগের জায়গায়। খাওয়ার বেলায় কেন রাগ দেখাবে? নিজের সাথে যে আরেকটা প্রাণ আছে তাঁর কথা ভাববে না? এতো কেয়ারলেস মানুষ হয়?”
অরুণ কণ্ঠে উপচেপড়া রাগ। অরুণিতা প্লেট সিধা করে ভাত নেয়। অরুণ বলে, “ওলাফকে নিয়ে আসতে?”
“সেও ঘুমিয়ে পড়েছে।”
অরুণ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। চলে যেতে উদ্যত হলে অরুণিতা ডাকলো, “পাপা?”
অরুণ মেয়ের দিকে তাকায়। অরুণিতা অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। অস্বস্তি লুকাতে নাকের ডগায় আঙুল ডলে বলল, “তুমি খাবে না?”
“তুমি খেয়ে নাও!” অরুণ বলতে বলতে চলে গেলো। অরুণিতা একা বসে রইলো ডাইনিংয়ে। খালি চেয়ার গুলো দেখে নিলো একপল। একা একা খাবার খেলে পেট ভরে, তবে মন ভরে না।
রাগ করে মেয়ের ঘরে ঘাঁটি গাড়া পাতার পুরনো স্বভাব। আজও সে মেয়ের ঘরেই অবস্থান করছে। অরুণ মেয়ের ঘরে এসে দেখে মহারানী সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রহর মায়ের গলা জড়িয়ে হা করে ঘুমাচ্ছে। অরুণ বিছানায় বসে ঝুঁকে এলো। পাতার বাহু ঝাঁকিয়ে ডাকলো কতক্ষণ। কুম্ভকর্ণের ঘুম ঢাক ঢোল না পেটালে ভাঙে? অরুণ সরকার হাসলো। আদুরে মুখটা স্নেহাতুর হাতে বুলিয়ে দিলো। কপালে চুমু দিয়ে বলল,
“পাতাবাহার শুনছো?”
পাতা নড়েচড়ে উঠলো। ঘুমের ঘোরেই অরুণের হাত সরিয়ে অল্প কাত হয়ে শোয়। অরুণ আবারও হাত বাড়ায়। গলার নিচ দিয়ে হাত গলিয়ে উঁচুতে তুলে। পাতা তৎক্ষণাৎ চোখ মেলে তাকালো। বড় বড় চোখ দুটোয় ভয়ের আভাস। অরুণ গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ধীমে আওয়াজে বলে, “রিল্যাক্স, আমি ছাড়া আর কে! ডোন্ট বি আফ্রেইড মেরি জান।”
পাতার চোখের আকার স্বাভাবিক হয়। বাচ্চা পেটে আসার পর থেকেই মেয়েটা অল্পতেই ভয়ে বেকাবু হয়ে আসে। আবার অতি সামান্য বিষয়েই রেগে চেঁচামেচি শুরু করে। এই বয়সে প্রেগনেন্সি খুবই কঠিন বিষয়!
“ওঠো, খেয়ে তারপর ঘুমিও।”
পাতা চোখ মুখ ডলে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। কিছু না বলে আবারও বালিশে মাথা রেখে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়। অরুণ কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলে, “রাগ আমার উপর। আমাকে কষ্ট দাও মাথা পেতে নেবো। পেটের ভেতর যে আছে তাঁকে কেন কষ্টে রাখছো? ভদ্র মেয়ের মতো খেয়ে তারপর রাগ দেখাও। নাহলে আমি রেগে যাবো।”
পাতা নিশ্চুপ। অরুণ কম্ফোর্টারের ঢাকা ফোলা পেটে হাত রাখে। ঠান্ডা গলায় বলে, “ওঠো না?”
অরুণ কতক্ষণ অপেক্ষা করলো ওঠার। নাহ্ হেলদোল নেই। সে বলল, “এখানে খাবে? আনবো খাবার? আমি খাইয়ে দিই, খাবে না?”
পাতা মুখ ফিরিয়ে নেয়। অরুণ বসিয়ে দেয় তাঁকে। বসার সুবিধার্থে পিঠের নিচে বালিশ দেয়। এলোমেলো চুল গুছিয়ে খোঁপা বেঁধে দিলো। কপালে চুমু দিয়ে বলল,
“খাবার আনছি, ভালো মেয়ের মতো খেয়ে নিবে। নাহলে আমি রেগে যাবো কিন্তু!”
পাতা কিছু বলে না। অরুণ একটু পরেই খাবার নিয়ে হাজির। অনেক দিন পর নিজ হাতে তুলে খাইয়ে দেয়। পাতা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে খাবার খায়। ক্ষুধা তাঁর না লাগলেও তাঁর ভেতরে বেড়ে ওঠা প্রাণের ছিলো। তাঁকে কষ্ট দেওয়ার মানেই হয় না। অরুণ মুচকি হেসে বলে,
“আমি অনেক আগে বন্ধুদের সাথে একটু আকটু চাখতাম। খেতাম না কিন্তু, শুধু চেখে দেখতাম। তাও বন্ধুদের হাজার বার জোরাজুরির পর। বলেছিলাম না একবার তোমাকে? তুমি সেই যে নিষেধ করলে তারপর আর ওদের হাজার জোরাজুরি কাজ করে নি। ছুঁয়েও দেখি নি। বন্ধুদের কসম!”
পাতা ভ্রু কুচকালো। মনে করার চেষ্টা করে। হ্যাঁ তাদের এনিভার্সারিতে লোকটা খেয়েছিল। তখনও একই কথা আওড়েছিলো। সে থমথমে সুরে বলল, “গু একটু খান আর বেশি, গন্ধ তো বের হবেই।”
অরুণ সরকার নাক ছিটকে নেয়, “তুমিও না। খাওয়ার সময়… বাদ দাও তো।”
“বাদ কেন দিবো! এক কাজ করুন একদিন বাড়িতে অ্যারেঞ্জ করুন। শুধু আপনারা বাবা ছেলে খাবেন? আমরা বাকিরা কেন বঞ্চিত হবো।”
অরুণ সরকার শান্ত চোখে চায় পাতার দিকে। মুখচোপা রক্তিম, চোখ দুটো ফুলে আছে। ঘনঘন নাক ডলছে। সে টিস্যু দিয়ে নাকের সর্দি মুছে বলল, “বয়স থাকলে দুজনে না হয় দুই বোতল খেয়ে টাল্লি হয়ে হাহা হিহি করতাম। বুড়োকালে মানাবে না।”
পাতা হাসলো না। কটাক্ষ করে বলল, “বুড়ো হবেন আপনি। ওই যে সোহরাব ছেলেটা? আমাকে অরুর বড় বোন ভেবেছিল। ভোরের বন্ধু মোহনলালকেই দেখুন। ক্রাশ খেয়ে বসে আছে। প্রহরের ক্লাস টিচার ভাব জমাতে আসে। খুঁজলে এরকম অহরহই মিলবে। তাহলে নিজেই ভাবুন।”
অরুণ সরকারের মুখের নকশা বদলায়। পাতার ফুলো পেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “এরপরও বুড়ো বললে পাঁচ নাম্বারের জন্য তৈরি থেকো।”
পাতার চোখ মুখে রাগ টগবগিয়ে ওঠে। শুকিয়ে যাওয়া ঘা আবারও তরতাজা হয়ে ওঠে। অরুণ তৎক্ষণাৎ আত্মসমর্পণ করে বলে, “যাস্ট কিডিং।”
“লজ্জা থাকা উচিত!”
“আ’ম সো স্যরি!”
পাত দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “আমি ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যেতে পারি না, বাকি গার্ডিয়ানরা মুখ টিপে হাসে। ভারী পেট নিয়ে ছেলের সামনে যেতে আমি লজ্জায় মরে যাই। আপনার মজা পায়, তাই না?”
অরুণের মাথা নত হয়ে আসে। পাতার হাতে হাত রেখে বলে, “আবার কাঁদে! স্টপ ক্রায়িং!”
পাতা হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে। অরুণ টিস্যু পেপার দিয়ে গাল মুখ মুছে নাক আবারও পরিষ্কার করে দিলো। কেঁদে কেঁদে ঠান্ডা লাগিয়ে নিয়েছে। সে প্রসঙ্গ বদলে বলল, “আমি কিন্তু এখন ওসব খাই না!”
“খেতেন তো!”
“ছেড়ে দিয়েছি… তুমি বলেছিলে বলে।”
পাতা কপালে বিরক্তের ভাঁজ। সে বিশ্বাস করলো না। অরুণ নিজ কথাকে সুধরে নিয়ে বলল, “তোমাদের সাথে এক যুগ বেশি বাঁচার লোভে ছেড়ে দিয়েছি, স্বার্থের জন্য।”
পাতা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না। অরুণ চোয়াল চেপে বাচ্চাদের মতো এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বলল, “একটু হাসো না? সারাদিন হাসতে দেখিনি!”
পাতা ঝটকায় হাত সরায়। অরুণ পায়ের তালুতে সুরসুরি দেয়। পাতা বিরক্ত হয়ে পা টানে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “দরজায় অরু দাঁড়িয়ে।”
অরুণ সরকার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেয়ের দিকে ফিরলো। অরুণিতা তাদের অস্বস্তিতে ফেলতে মুচকি হাসলো, “রং টাইম! একচুয়ালি আই ফরগট টু নক। ইটস্ মায় রুম, আফটার অল। স্যুড আই লিভ ওর…?”
অরুণ সরকার স্বাভাবিকতার সাথে প্রত্যুত্তর করলো, “কাম ইন।”
“থ্যাংকস, আ’ম সো স্লিপিইই!” দুই হাত শূন্যে তুলে হামি তোলে অরুণিতা। বিছানায় ছোট ভাইয়ের পাশে গা এলিয়ে দেয়। পাতা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “দাঁত কেলানোর কি আছে?”
অরুণিতার হাসি চওড়া হয়। পাশ ফিরে মা বাবার দিকে তাকায়। সহাস্যে বলে, “আই’ম প্রোবাবলি দ্য ওনলি চাইল্ড হু লাইকস ওয়াচিং দেয়ার পেরেন্টস আর্গিউ। ইয়্যু টু ক্যারি অন।”
পাতা চোখ রাঙায়। অরুণিতা থোরাই ডরায়। গলা অবদি কম্ফোর্টার টেনে হামি তুলে। অরুণ পাতার মুখে খাবার দিয়ে মেয়ের উদ্দেশ্যে বলল, “ওলাফকে ডাকো। রাতে না খেয়ে ঘুমাতে নেই।”
অরুণিতা ভাইকে ডেকে তুলে। প্রহর চোখ পিটপিট করে বোনের গলা জড়িয়ে বিড়বিড় করে। অরুণিতা কান খাঁড়া করতেই শুনতে পায়। সাপের মতো শিশ শিশ করছে। তারমানে শিশি দিবে। অরুণিতা চেঁচিয়ে ওঠে। প্রহর ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। চোখের আকার বড় বড়। ঘনঘন পলক ঝাপটে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ওঠে। অরুণ গম্ভীর গলায় বলে, “এভাবে চেঁচানোর মানে কি?”
“শিশি দিচ্ছিল।”
“তাই বলে এভাবে চেঁচায়? ছেলেটা ভয় পেলো না?”
অরুণিতার মুখটা গম্ভীর হয়ে আসে। কিছু না বলে বিছানার এক কোণে শুয়ে পড়ে। অরুণ বাঁকা চোখে চায়। পাতা ছেলেকে বুকে টেনে নেয়। গায়ে হাত বুলিয়ে বলে, “কিছু হয় নি বাবা। কাঁদে না!”
প্রহর কান্না থামতে সময় লাগলো না। মায়ের ওড়নায় গাল মুছে জলভরা চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। অরুণ বাহু মেলে কাছে ডাকলো। প্রহর গেলো না। মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে নিলো।
“আমার অবহেলা প্রহরের আবার কি হলো শুনি? রাগ করেছে বাবাটা?”
“হ্যাঁ।” প্রহরের সহজ-সরল স্বীকারোক্তি।
“অধমের অপরাধ?”
প্রহর মায়ের বুকে লুকিয়ে থেকেই অভিমানী স্বরে বলে, “তুমি আমার বোবা বউকে ভাইটুসের বউ বানিয়ে দিয়েছো। আমি অনেক রেগে আছি। তোমার উপর, ভাইটুসের উপর।”
অরুণ সরকার হাসলো, “তুমি তো পিঙ্কিকে পছন্দ করো।”
“হ্যাঁ, পিঙ্কি খুব ভালো। আমার সব কথা শোনে। আমি লেইট হলে আমার জন্য জায়গা রাখে। ওঁর টিফিন থেকে আমাকেও ভাগ দেয়। তাই আমি ওকে বলেছিলাম, আমার বউ হবে? ও হ্যাঁ বলেছিল!”
অরুণ সরকার ছোট ছোট চোখে চায়, “সোজা বউ বানানোর প্রস্তাব দিলে? পাপা মাম্মামের পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলে না?”
“মাম্মামকে বলেছিলাম আমি।”
অরুণ মিছে রাগ করার ভান ধরে বলল, “যাও ছোট সরকার। আমিও অনেক রাগ করলাম।”
“তোমার রাগে আমার বয়েই গেছে!”
“সেটাই, আমার রাগ, গোস্বা, মন খারাপীতে কারো বয়ে যায় না। যখন থাকবো না, খুব দূরে চলে যাবো তখন মনে পড়বে আমার কথা।”
ব্যস কথারা সেখানেই ফুরোলো। কেউ কিচ্ছুটি বললো না। সবার মুখেই মেঘ অল্পস্বল্প জমেছে।
মাঝারি আকারের একটি রুম। কোনো আসবাবপত্র নেই, নেই বৈদ্যুতিক ফ্যান। শুধু এলইডি বাল্ব জ্বলছে। ঘরের এককোণে স্পোর্টস ব্যাগ। সেথায় মাথা রেখে মেঝেতে শুয়ে ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং তুলে ফোনে ‘টকিং টম’ গেম খেলছে। টমকে খাওয়াচ্ছে, সাজুগুজু করে দিচ্ছে, নিত্যনতুন ড্রেস পরিয়ে দিচ্ছে! পত্রলেখার হাসি পেলো। তবে মুখ ফুটে হাসি বেরুলো না। ক্ষুধায় পেটের ভেতর গুড়গুড় শব্দ করছে। সে পেট চেপে কাঁদো কাঁদো মুখে বিড়ালের দিকে তাকায়। মালিকের মতোই মেজাজি আর অহংকারী। একটু ভাব করতে গিয়েছিল, খামচে রক্ত বের করে দিয়েছে। পত্রলেখা হাতের ক্ষতস্থানে ফুঁ দেয়।
অ্যানা মালিকের গা ঘেঁষে বসে স্যান্ডউইচের টুকরো চাটছিলো। হঠাৎ চাটা বন্ধ করে পত্রলেখার দিকে তাকায়। লেজ নাড়িয়ে গায়ের পশম খাঁড়া করে মিউ মিউ ডাকলো। অ্যানার এহেন প্রতিক্রিয়ায় অরুণাভ ফোন থেকে দৃষ্টি হটিয়ে পত্রলেখার দিকে তাকায়।
“এ্যাঁই মেয়ে, অ্যানার খাবারে নজর কেন দিচ্ছো? চোখ সরাও বলছি। অ্যানার পেট খারাপ করবে।”
পত্রলেখা মুখ ফিরিয়ে নেয়। চোখ দুটোয় রাগ, অভিমান। অরুণাভ মোবাইলে মনোযোগ ফিরিয়ে আনলো। মিনিট দুই পর আড়চোখে পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে বলল, “চাইলে স্যান্ডউইচটা খেতে পারো। অ্যানার জন্য এনেছিলাম। অ্যানার পক্ষে তো সবটাই খাওয়া সম্ভব না। আর তুমি যেভাবে ওঁর খাবারে নজর দিচ্ছো। বেচারি অসুখে না পড়ে।”
পত্রলেখা দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে নিয়েছিলো। অরুণাভের কথায় চোখ মেললো। অরুণাভ স্যান্ডউইচের পার্সেল স্প্রিং গাড়ির মতো ঠেলে দেয়।
“ভালো স্যান্ডউইচ। আমি একটু ছিঁড়ে অ্যানাকে দিয়েছিলাম শুধু।”
ভাব তরঙ্গ পর্ব ২২
পার্সেলটা পত্রলেখার কাছে এসে থামে। পত্রলেখা হাতে নেয় না। আবার ফিরিয়েও দেয় না। সে অনুভব করে ক্ষুধা মানুষকে যা কিছু করতে বাধ্য করে। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর পত্রলেখা চোরা দৃষ্টিতে অরুণাভের দিকে তাকায়। ফোনে ডুবে আছে। সে সন্তপর্নে পার্সেল নেয়। নিঃশব্দে পার্সেল খুলে স্যান্ডউইচে কামড় বসায়। সজারু দৃষ্টি মানবের পানে। দেখে নিলে লজ্জায় নাক কাটা যাবে। তাড়াহুড়োয় গলাধঃকরণের চেষ্টায় হঠাৎ হিচকি উঠে যায়। পত্রলেখার চোখের আকার বড় হয়।
অরুণাভ কপাল কুঁচকে চাইলো ক্ষণ। হাতের কাছের পানির বোতল পূর্বের মতোই গড়িয়ে দিয়ে বলল, “খবরদার মুখ লাগিয়ে খাবে না।”
পত্রলেখা ঢকে ঢকে পানি পান করে স্বস্তির শ্বাস ফেললো। তবে হিচকি কমলো না। নানুমা বলে, যখন কেউ মন থেকে স্মরণ করে, তখন হিচকি উঠে। তাঁকে আবার কে অন্তরের অন্তঃস্থলে থেকে স্মরণ করছে?
