Home উপসংহারে তুমি সিজন ২ উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৩

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৩

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৩
রুহানিয়া ইমরোজ

প্রবাহমান সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না৷ স্রোতের ন্যায় উদ্দাম বেগে ছুটে চলে। নতুন সকাল নিয়ে আসে নব্য সূচনার সুসংবাদ। সময়কালটা আর সেদিনকার বিভীষিকাময় ঘটনায় আঁটকে নেই। ইতিমধ্যে প্রায় মাস খানেক সময় পেরিয়েছে। সকল ঝুট-ঝামেলা পেরিয়ে গতকাল রংপুর কলেজ থেকে খিলগাঁও মডেল কলেজে চিত্রাকে ট্রান্সফার করিয়েছেন নিতু মেহবুব। এ কদিনে সে-ও পুরোদস্তুর সুস্থ হয়ে উঠেছে।
শরীরের ক্ষতের সাথে চিত্রার মনের জখমেও জমেছে এক নির্লিপ্ত পারদ। টানা দশদিন নিতু মেহবুবের যত্ন আত্তি এবং কাউন্সিলিং এর ফলে বোকাসোকা মেয়েটা একটু-আধটু বুঝতে শিখেছে। শহুরে জীবন, চালচলন এবং মানুষ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা হয়েছে । ফলস্বরূপ অতিশয় নরম মনের মেয়েটা নিজেকে পাথর বানানোর চেষ্টায় মত্ত কেননা দুনিয়াটা শক্তের ভক্ত আর নরমের যম।

গ্রামীণ জীবনে অভ্যস্ত চিত্রা এখন শহুরে চালচলনের সাথে খাপখাওয়াতে ব্যস্ত। কাজটা যদিও মুশকিল তবে অসম্ভব নয়। জীবনে কিছু পেতে গেলে কিছু হারাতে হয় নতুবা কোনোকিছু হাসিল করা যায় না। সুন্দর জীবনের বিনিময়ে চিত্রাকে তার শখ বিসর্জন দিতে হচ্ছে।
যেমন: গ্রামে থাকাকালীন সময়ে, শীতের সকালে খালি পায়ে শিশিরভেজা ঘাসের উপর হাঁটত অথচ ঢাকায় তেমন একটা শীত পড়ে না। মন খারাপের সময় চিত্রা নদীর কিনারায় বসে দুঃখের গান গাইতো। এদিকে নদী তো দূর, পুকুরের দেখা পাওয়াও মুশকিল। থাকার মধ্যে আছে এক আর্টিফিশিয়াল সুইমিংপুল কিংবা লেক, যার চারপাশে সারাক্ষণ লোকজন কিলবিল করে ।
প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার উপায় নেই। বাতাসে সতেজতা অনুপস্থিত। সবখানে কোলাহল আর গাড়ির হর্নের শব্দ, কোথাও একটু নিরিবিলি জায়গা নেই। যেখানে যতদূর চোখ যায় শুধু কংক্রিটের উঁচু উঁচু বিল্ডিং চোখে পড়ে। সবুজ সতেজ গাছের বদলে দেখা যায় আর্টিফিশিয়াল প্ল্যান্ট। এই কৃত্রিমতা চিত্রার নিকট বিষের মতো ঠেকে।
তবুও এই শহরেই টিকে থাকতে হবে, গড়তে হবে বহুল কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যত৷ নিয়তি কে হারিয়ে সফলতা অর্জন করতে হবে। চোখে হাজারো স্বপ্ন। কতটুকু পূরণ হবে জানা নেই তবে চিত্রা নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করতে চায়। হাল ছেড়ে দিলে মৃত্যু ছাড়া উপায় থাকবে না।

ঘরপোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায় ঠিক তেমনই আজীবন ধরে ঠকে আসা চিত্রা কাউকে বিশ্বাস করতে ভীষণ ভয় পায়। স্বার্থের দুনিয়ায় কেউই কারো নয় তবু নিতু মেহবুব যা করছেন তার জন্য চিত্রা কৃতজ্ঞ সেই কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে জন্মেছে, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা তবে এই মানুষটা কে ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেনা সে। মাঝেমধ্যে বেশ সন্দেহজনক লাগে উনার হাবভাব।
নিতু মেহবুব’কে আপাদমস্তক রহস্যময়ী একজন নারী বলে মনে হয় চিত্রার। খুব অদ্ভুত তার চালচলন। ঠান্ডা মাথায় সামলে নেন সবকিছু। স্বভাবে বেশ শক্ত ধাঁচের। সোজাসাপ্টা কথা বলেন কিন্তু খোলাসা করেন না কিছু। এই ব্যপারটাই চিত্রার মনে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায়।
তাছাড়াও চিত্রার মা তথা চৈতী বেগম কি এমন মহৎ কুরবানি দিয়েছিলেন যার জন্য চিত্রার দায়িত্ব নিতে দু’বার ভাবলেন না তিনি? এই প্রশ্নটা চিত্রা কে কুরে কুরে খায়। নিতু মেহবুব জাবাব দিতে অনিচ্ছুক বিধায় চিত্রা জোরাজোরি করেনি কিন্তু তার সরল মন এখনো ব্যপারটা ভুলতে পারেনি। মা কে খুব অল্পদিন কাছে পেয়েছে চিত্রা। তাই উনার অতীত সম্পর্কে তেমন একটা জানে না। আগ্রহ থেকে নিতু মেহবুবের কাছে কিছু প্রশ্ন রেখেছিল। তিনি জবাব দেওয়ার বদলে কাজের বাহানায় এড়িয়ে গেছেন।
ব্যপারটা কষ্ট দিয়েছে চিত্রাকে। চক্ষুলজ্জায় তা প্রকাশ করেনি। প্রশ্নবাণ থেকে বাঁচার জন্যই বোধহয় আচমকা তাকে ছয় তালায় অনার্স ফোর্থ ইয়ারের এক স্টুডেন্টের সাথে সাবলেটে থাকার জন্য বলেছেন নিতু মেহবুব। সে দ্বিমত করেনি। জোর করে কারও বাসায় থাকার মানে হয় না। কিছু মানুষ এবং সম্পর্ক দূর থেকেই সুন্দর।

দুদিন হলো নতুন ফ্ল্যাটে শিফট হয়েছে চিত্রা। এইখানের সবকিছুই ভীষণ চমৎকার। ফ্ল্যাটটা ফুললি ফার্নিশড৷ দুটো বেডরুম, একটা রান্না ঘর, কমন ওয়াশরুম এবং দুটো খোলা বেলকনি রয়েছে এই ইউনিটে। তার চেয়েও মজার বিষয় হল মাথার উপরের ছাদটা টিনের ছাউনি দ্বারা নির্মিত। বর্ষাকালে আসলে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে টিনের চালে। মনোমুগ্ধকর ছন্দে তরঙ্গিত হবে চারপাশ।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও চিত্রার ফ্ল্যাটমেট মেয়েটা উদ্ভট কিসিমের প্রাণী। নিতু মেহবুব অবশ্য পইপই করে বলে দিয়েছেন, তার ফ্ল্যাটমেট তথা ভূমিকা চৌধুরীর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতে। মেয়েটা নাকি অতিরিক্ত ঘাড়ত্যাড়া এবং বদমেজাজি। এমনিতে শান্ত কিন্তু রাগলে মুখ এবং হাত দুটোই একনাগাড়ে চলে৷
চিত্রা প্রথমে আমলে নেয়নি। ফ্ল্যাটে আসার পর বুঝতে পেরেছে ভূমিকা অত্যন্ত চালাক এবং তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্বের একজন মেয়ে। কোনো কিছুর জন্য কারো সামনে নত হতে নারাজ সে, আপোষ করা তার ধাতেঁ নেই। হয় সে ছিনিয়ে নিবে নয় ছেড়ে দিবে। তার স্পিরিট চিত্রাকে চমকে দিয়েছিল রীতিমতো। একজন মেয়েমানুষ ও এমন হতে পারে সেটা তার ধারণায় ছিল না৷
ভূমিকার সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎটা ছিল লোমহর্ষক। প্রথমবার ফ্ল্যাটে এসে নিজের রুমটা একটু-আধটু ঠিক ঠাক করে নাস্তা বানাতে যায় চিত্রা। নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে বলে একটু পায়েস বানায়। এরমধ্যে ধুপধাপ পা ফেলে রান্নাঘরে হাজির হয় কেউ। চিত্রা কৌতূহলী দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই মেয়েটা রক্তিম চোখে চেয়ে ঝাড়ি মেরে বলে,

-“ হু দ্যা ফা*ক আর ইয়্যু? আমার ফ্ল্যাটে কি করছ?
কন্ঠের মালিক যে কাঁচা ঘুম থেকে উঠে এসেছে সেটা খুব ভালো মতোই বুঝল চিত্রা। সাথে সাথেই কলিজার পানি শুকিয়ে গেল তার৷ ভূমিকার কর্কশ ধমকা ধমকির মাঝে কোনোমতে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“ আমি চিত্রলেখা শিকদার, আপনার নিউ ফ্ল্যাটমেট।
মিনমিনে স্বরে জবাব দেয় চিত্রা। তা শুনে যেন রাগটা আরও চড়ে বসে ভূমিকার মাথায়। মেয়েটার ফর্সাটে মুখ রাগের চোটে লাল টমেটোর মতো হয়ে যায়। তা দেখে চিত্রা শুকনো ঢোক গিলে পুনরায় বলে,
-“ স্যরি আপু, এরপর আর কোনো শব্দ হবে না।
চিত্রা বলার সাথে সাথেই পায়েসের বাটিটা মেঝেতে উল্টে ফেলে রাগে ফুঁসতে থাকা ভূমিকা বলে,

–“ টিট ফর ট্যাট। তোমার স্যরি আমার ঘুম ফেরত দিবে না। তাই তুমিও তোমার ভাগের পায়েস পাবে না। টেক ইয়্যোর স্যরি ব্যাক এন্ড ইউজ ইয়্যোর ব্রেইন অর এলস জাস্ট ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিব এখান থেকে।
সবজি কেনার সামর্থ্য নেই চিত্রার। নিতু মেহবুবের থেকে চাইতেও লজ্জা লাগছিল।তাই রুটি দিয়ে খাওয়ার জন্য পায়েসটুকু বানিয়েছিল চিত্রা। ওটাকে আবর্জনার মতো মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখে রীতিমতো কান্না পায় তার। ভূমিকা তার থমথমে মুখশ্রী দেখে বিরক্ত হয়ে চলে যায়।
ঘটনাটা সামান্য কিন্তু এটা নিয়ে বিচার পর্যন্ত চলে যায় নিতু মেহবুবের কাছে। চিত্রা ভীষণ অবাক হয়। নিতু মেহবুব তাকে বুঝিয়ে বলেন, ভূমিকা এতিম৷ তার বাবা মা কেউই নেয়৷ শাসন এবং পরিবার ছাড়া বড় হয়েছে বলেই এমন স্বার্থপর। তবে তোমাকে ওখানে ওর সাথে মানিয়ে নিয়েই চলতে হবে৷ নাহলে আমি তোমায় আর কোথাও আশ্রয় দিতে পারব না৷

বড্ড গা-ছাড়া ভাবে জানিয়ে দেন নিতু মেহবুব। চিত্রা পড়েছে বিপদে। যে তাকে দু চোখে দেখতে পারে না তার সাথে কিভাবে মানিয়ে গেছিয়ে চলবে ? তবে চেষ্টা করতে তো ক্ষতি নেই। দেখতে দেখতে একটা দিন কেটে যায়।
প্রথম চেষ্টা হিসেবে, পরদিন সকালে স্পেশাল ব্রেকফাস্ট বানিয়ে ড্রয়িংরুমের ছোট্ট টেবিলে ঢাকা রেখে তার উপর স্যরি লেখা চিরকুট চাপকে দিয়ে, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে কলেজের জন্য রওনা দেয় চিত্রা। তার মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। মানুষের মনে জায়গা পাওয়ার বেস্ট উপায় হলো তাকে মজার মজার রান্নাবান্না করে খাওয়ানো।

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ২

নিজের রান্না নিয়ে যথেষ্ট কনফিডেন্ট চিত্রা। ভূমিকা একবার খেলে একটু হলেও ভালো লাগবে তার। এই বাহানায় আস্তে ধীরে নাহয় সম্পর্কটাও স্বাভাবিক করে নিবে। সে ভেবেছিল এভাবেই হয়তো সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে অথচ বেচারি বুঝতেও পারেনি, এই সহমর্মিতাই তাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে৷

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৪