Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৫

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৫

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৫
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

মুড়ল মোশাই এবার এদের দিয়ে কি করবো? এদের যেহেতু বিয়ে দিয়ে দিয়েছি, তাহলে এবার এদের ছেড়ে দেই কি বলুন? আচ্ছা, শিক্ষা হয়েছে বাচাদের আর মনে হয় না এ জনমে নষ্টামি করবে, বলে উত্তরের প্রত্যাশায় লোকটা তাকালো মুড়লের দিকে। গ্রামের সকলে ও অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে আছে রায় শোনার আশায়।
তখনকার ৫০ জনের কিছু সংখ্যক জনসংখ্যা বেড়ে গিয়ে এখন ৫০০ জনের কাছাকাছি। লোকেদের নানাবিধ বিশ্রী মন্তব্য আর কথাবার্তায় অস্বস্তি বাড়ছে তাদের দুজনের মধ্যে। এটাই হচ্ছে গ্রামের লোকেদের বিশেষত্ব—কোথাও কোনো মুখরোচক ঘটনা আভাস পেলেই দলবল সমেত হুমড়ে পড়ে তারা।

মোড়ল লোকটা প্রণয়–প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় সায় জানিয়ে বললো— “ঠিক আছে, এদের যেহেতু বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে আর মারধর না করাই ভালো। হয় ছেড়ে দেওয়া হোক তাদের।”
প্রণয় এখনো চোখ কটমট করে তাকিয়ে আছে প্রিয়তার দিকে যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দেবে বেচারিকে।
কিন্তু প্রিয়তার চামড়ায় আজকে ভয়ডর লাগছে না। “কি জানি কি হয়েছে,” সে তো প্রণয়ের ওই ডেঞ্জারাস লোকটা দেখে ও ক্রাশ খেয়েছে!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

প্রিয়তা কে গাল হা করে ভ্যবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রণয়ের রাগটা বাড়লো। কানেকাছে ঠোঁট নিয়ে দাঁত কটমট করে বললো— “I swear, আজকে তোকে শুধু একবার হাতের কাছে পাই। জান, একবার শুধু এদের হাত থেকে ছাড়া পাই, তার পর তোর শরীর থেকে সব হাড়-হাড্ডি ছাড়িয়ে মাংস আলাদা করে দেবো। মাইন্ড ইট…”
চাপা গলায় মৃদু শাসানীতে ছোট্ট পরাণ টা ছলাৎ করে উঠলো প্রিয়তার। মায়াবী নেত্রের ভারী পলক ঝাপটে চোখ তুলে তাকালো সম্মুখের পুরুষালী গভীর চোখে।
আচানক ণ্ঠনালীতে কম্পন অনুভব করলো প্রিয়তা প্রণয় এখনো চোখে চোখ রেখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বাদামি দুই চোখের গভীরে—”কি মারাত্মক নেশা!

” নেশা–নেশা দুই চোখের দিকেই তাকিয়ে পুনরায় প্রেমে আচাড় খেয়ে পড়ল প্রিয়তা। লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে সকলের অগোচরে অলতো করে চেপে ধরলো প্রণয়ের হাত, কানের কাছে মুখ নিয়ে শুনিয়ে শুনিয়ে গাইতে উঠলো—
“ছেলে, তোর নেশা–নেশা চোখে যেন আগুন জলে… বুকের ওই নেশা–নেশা চোখে যেন আগুন জলে… সেই আগুনে পুড়তে আমার ভালো লাগে…”
ভয়ের পরিবর্তে প্রিয়তার এমন রিঅ্যাকশন দেখে চোখ কপালে তুলে ফেললো প্রণয়। এত বড়ো বড়ো কাণ্ড করে ও মেয়েটার মাঝে ভয়ভীতির বিন্দুমাত্র নেই! সে অদৃশ্য হাতে নিজেই নিজের কপাল চাপড়ালো। বুঝতে পারলো এতদিন দুধ কলা দিয়ে সে ইচ্ছাধারী নাগিন পুষেছে যে যখন তখন, যেখানে সেখানে রূপ পাল্টে তাকেই কট খাইয়ে দেয়।

জ্যোৎস্না–মাখা রাতে ধানক্ষেতের ভিজে কর্দমাক্ত আঁইল দিয়ে হেঁটে চলেছে প্রণয় ও প্রিয়তা। কয়েক হাজার একর জমিজুড়ে বিস্তৃত সবুজ ধানজমি। অন্ধকার রাতে চাঁদের রুপোলি আলোয় কাঁচা ধানের শিশগুলো চকচক করছে। জমিনের ফাঁকফোকর থেকে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।
প্রণয় সে–সবের ধ্যানে নেই। সে প্রিয়তার ছোট্ট মখমলে হাতটা নিজের বৃহৎ হাতের মুঠিতে চেপে ধরে, গাড়ির দিকে না গিয়ে ক্ষেতের উল্টো দিকের আঁইল ধরে হাঁটছে।

একদম নিশ্ছুপ হয়ে গেছে ছেলেটা। বুঝে উঠতে পারছে না কিছু সময়ের ব্যবধানে তার জীবনে কি থেকে কি ঘটে গেল। কি ভেবে রেখেছিল আর কি হয়ে গেলো—”যা হলো তা কি সত্যি ঠিক হয়েছে?” এটা যে কফিনের শেষ পেরেক, তা ভালই বুঝতে পারছে প্রণয়। আজ এত বছরের ধৈর্যের পর, এত এত যন্ত্রণার পর, আল্লাহ শেষ পর্যন্ত তার মনের দোয়া কবুল করছে। তার ভালোবাসার ফুলটা তার নামে লিখে দিয়েছেন। কিন্তু এর জন্য সে আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করবে নাকি ফরিয়াদ জানাবে, সেটাই বুঝতে পারছে না।
যে সর্বনাশ ঠেকাতে সে এতগুলো বছর নিজেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করেছে, ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষা দিয়েছে, আজ এক লহমায় তার এত বছরের ধৈর্যের পাহাড় ধ্বসে পড়লো।
প্রণয় আর কিছু ভাবতে পারছে না। মনটা চাচ্ছে মেয়েটাকে মাথার উপর থেকে তুলে একটা আছাড় মারতে, কিন্তু পুতুলের মতো মায়াবী মুখটা যতবার দেখছে, ততবারই কঠোর মনটা গলে গলে যাচ্ছে।
অন্তরটা অভিমান করে বলছে— “ছলনাময়ী,”

কিন্তু মুখে যতবারই কিছু বলার চেষ্টা করছে, ততবারই কন্ঠ আটকে আসছে, চোখ চলে যাচ্ছে তার নিষ্পাপ মুখের পানে। বছরের পর বছর প্রেম দহনের নীল অগ্নিতে পুড়ে দগ্ধ হয়ে আসছ তার হৃদয়, এখন আর পারছে না।
এ কেমন যন্ত্রণা—এই মেয়েটা দূরে থাকলে যন্ত্রণা দেয়, কাছে আসলে আরো বেশি যন্ত্রণা দেয়। চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে মেয়েটা।অবুজ মনের চাওয়া-পাওয়া বাড়তে বাড়তে আকাশ ছুঁয়ে ফেলে।
এত কষ্ট কেন দেয় মেয়েটা? সে কি জানে? তার উপস্থিতি কতটা উন্মাদন করে তুলে প্রণয়কে, সে কী বুঝে না তার সুরভীতো দেহের গন্ধে কতোটা পাগল হয়ে যায় প্রণয়? কী ভয়াবহ নেশা চড়ে যায় তার।
কিন্তু নিজে এতটা দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও, তো সে কখনো এই মেয়েটাকে পাওয়ার আশা করেনি। নিজের অনিশ্চিত জীবনের সাথে জড়িয়ে মেয়েটার জীবনে ও অনিশ্চয়তা ডেকে আনতে চায়নি। তাহলে… তাহলে
এই বোকা মেয়েটা কী বুঝলো? সে নিজের হাতেই নিজের কতো বড় সর্বনাশ করে দিলো—ফুল ভেবে সে কাঁটাস্তুপ আপন করে নিলো। এই কাঁটার আঘাত কী সহ্য হবে তার, প্রণয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তাদের দুজনের ভবিষ্যৎ,।আর কিছু হওয়ার বাকি নেই। অসহায়ত্বে প্রণয়ের শরীরের শিরায় শিরায় বিষের মত ব্যথা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
পথ চলতে চলতে প্রিয়তার মাথায় ফট, আবার একটা দুর্দান্ত আইডিয়া চলে এলো। সে প্রণয়ের বাহু ঝাঁকিয়ে উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বললো— “একটা কথা শুনবেন প্রণয় ভাই?”

প্রণয় আনমনে জবাব দিল— “বল।”
প্রিয়তা মাথার ওড়না টেন লজ্জা পাওয়ার ভান ধরল। মাথা নিচু করে বলল— “আগে বলুন, বকা দেবেন না, তাহলেই বলবো।”
“বদমাইশি করলে শুধু বকবো না, ধানগাছের সঙ্গে বেঁধে ছাল ছাড়িয়ে নেবো!”
প্রিয়তা মুখ ছোট করে ফেলল, আঙুলের মাথায় ওড়নার কোনা পেঁচাতে পেচাতে বললো— “এঁহ্… আমি যেন উনাকে ভয় পাই আর কি। শুধু–শুধু ভয় দেখাবেন না।”
“আচ্ছা, ভয় পাস না, তাহলে তো মেপে দেখতেই হচ্ছে, তোর কয়ে কেজি সাহস বেড়েছে?”
“হ্‌ম্‌ম্‌, আনুন আনুন, আমি কি ভয় পাই নাকি।”
প্রণয় ওকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে বলল— “কি ব্যাপার হু, এতগুলো বছর পর ছোট্ট বদমাশটা আবার উঁকি দিচ্ছে মনে হচ্ছে?”
প্রিয়তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। কিয়তক্ষণ চুপ থেকে দীপ্ত কণ্ঠে বললো— “মুক্তি পেয়েছে, সে যন্ত্রণার বিষাক্ত শিকল থেকে মুক্তি পেয়েছে।”
কোন এক নিষিদ্ধ মানুষকে ভালোবাসার অপরাধে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। সে কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি, তার জীবনে আবারো কখনো সুখের সূর্যোদয় হবে। সেই নিষিদ্ধ মানুষটাও কোন একদিন তার একান্ত হয়ে ধরা দেবে।

উত্তর শুনে বুকটা ধক করে উঠলো প্রণয়ের। অপরাধবোধের নীলছে ব্যাথা পাঁজরের হাড়ে হাড়ে ছেয়ে গেল। সত্যিই তো সেই আসল অপরাধী তারজন্যই তো সারাদিন হাসতে থাকা মেয়েটা একসময় হাসতে ভুলে গিয়েছিল। আবদার করা ছেড়ে দিয়েছিল, ইচ্ছাকৃত কত শত কষ্ট দিয়েছে সে তার প্রাণপাখিকে কিন্তু ও তো তাও আজ অভিযোগ করতে পারছে, তার সব কষ্টের কথা উজাড় করে দিতে পারছে তার ভালোবাসার মানুষের কাছে। কিন্তু প্রণয় কী পারবে, তার বিশাল যন্ত্রণার একটা ভাগও তার ভালোবাসার মানুষের সাথে ভাগাভাগি করতে?
প্রিয়তা পুনরায় অতিষ্ঠ হয়ে হাত ঝাঁকিয়ে বললো— “এই যে, শুনুন না!”
“হুম, বল।”
প্রিয়তা সব সিরিয়াস নেস ছুড়ে ফেলে, আবারো মুখে লাজুক ভাব ফুটিয়ে তুলল। আমতা আমতা করে বলল— “চলুন না, এখানেই ফরজ কাজটা সেরে ফেলি।”
“প্রণয় হাটা থামিয়ে দিয়ে ঘাড় কাত করে তাকালো প্রিয়তার দিকে। সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বললো—কি ফরজ কাজ?”

প্রিয়তা প্রণয়ের বাহু জড়িয়ে ধরে লজ্জায় নেতিয়ে পড়ল। মাথা নিচু করে মিনমিনে গলায় বললো—
“নিয়ম অনুযায়ী আজ আমাদের বাসর রাত। ওই শালারা বিয়ে করিয়ে দিলেও আমাদের বাসর করতে দেয় নাই, তাই…”
প্রণয় কন্ঠে বিস্ময় নিয়ে শুধালো—
“তাই কী?”
জ্যোৎস্না রাতে প্রিয়তার ফর্সা গাল দুটো রক্তিম হয়ে উঠতে পরিষ্কার দেখতে পেল প্রণয়। প্রিয়তা বাহুতে মুখ লুকিয়ে বলল—
“আসেন, আমাদের ইউনিক বাসরটা ধানখেতে সারি—বাসরের জগতে নতুন ইতিহাস গড়ি।”
প্রিয়তা কথা শেষ করার পূর্বেই খুক খুক করে কেঁশে উঠলো প্রণয়। চোখ বড় বড় করে তাকালো প্রিয়তার লজ্জা-লজ্জা মুখের পানে।
প্রিয়তা একই এক্সপ্রেশন নিয়ে ফের বললো—

“আমাদের বাসরটা নিয়ে আমি অনেক উত্তেজিত হয়ে আছি প্রণয় ভাই। আমি গল্পে পড়েছি—গল্পের নায়করা আদাড়ে-বাদাড়ে, বাঁশবাগানে, ঝোপঝাঁড়ে—যেখানে সেখানে উত্তেজিত হয়ে বাসর সেরে ফেলে! এমনকি এই লিস্ট থেকে বাদ যায়নি চাঁদ, মঙ্গল গ্রহ সহ অন্যান্য এক্সো প্ল্যানেট… কবে জানি শুনবো ব্ল্যাক হোলে ও দ্য গ্রেট অমুক-তমুক-শামুক-ঝিনুক ভাইদের কেউ একজন বাসর সেরে ফেলেছে! কেবল এই ধানখেতটাই বাকি আছে। না জানি কে কবে এই জায়গাটাও সীল মেরে দেবে… চলুন, তার আগে আমরাই সীল মেরে দেই!
বলুন বলুন, বুদ্ধিটা ভালো না? আর তাছাড়া…”
বলে থামলো প্রিয়তা। থুতনিতে হাত রেখে কয়েক সেকেন্ড স্ক্যান করল প্রণয়ের মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে। গর্বে বুকর ছাতি ফুলিয়ে বলল—

“হাহ! আমার জামাই গল্পের নায়কদের থেকে কোন অংশে কম নয়। আমার জামাইয়ের ফিগারের কাছে গল্পের নায়কদের ফিগার ও ফেল—ড্যাম হট এন্ড সেক্সি ফিগার!”
প্রিয়তার কথা শুনে এবার বিষম লেগে গেলো প্রণয়ের।
প্রিয়তা তৎক্ষণাৎ পিঠ চাঁপড়াতে চাঁপড়াতে দ্রুত বলে উঠলো—
“ষাঁট! ষাঁট! কোন শাকচুন্নি জানি আমার জামাইয়ের নাম স্মরণ করে বেশি কষ্ট হচ্ছে জান? পানি খাবে বাবু?”
প্রিয়তার কথায় ও আচরণে প্রণয়ের এবার ভিমড়ি খাওয়ার উপক্রম। সে কাশতে কাশতে বসে পড়লো আইলের ওপর।
প্রিয়তা ওর পাশে বসে বুকে মালিশ করতে করতে বললো—

“ধীরে ধীরে শ্বাস নাও জান। গল্পের নায়করা বলে—বউ চুম্মা দিলে নাকি তাদের কষ্ঠকাঠিন্য ও ঠিক হয়ে যায়। তোমার তো সামান্য কাশি, আমি কি তোমারে ঠাইস্যা একখান চুম্মা দিমু?”
প্রণয় হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে প্রিয়তার দিকে—এই মেয়েটা এতো পাকনা, কিন্তু কেমন আলাভোলা সেজে থাকতো! তার নাম দেওয়াটা সার্থক মনে হচ্ছে; সে সত্যিই একটা ‘ইচ্ছাধারী নাগিন’ পুষে রেখেছিল!
প্রিয়তা গাল লাল লাল করে বললো—
“এভাবে কি দেখো জান? সরম লাগে তো আমার…”
প্রণয় ঈষৎ রাগান্বিত হওয়ার ভান ধরে বললো—
“খুব পেকেছিস তুই! আর একটা পাকাপাকা কথা বললে লাল লাল গাল দুটো কামড়ে খেয়ে নেবো!”
লজ্জায় আরো খানিকটা নেতিয়ে গেলো প্রিয়তা। দুই হাতে প্রণয়ের কোমর জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে বললো—

“শুধু গাল কেন? আপনি চাইলে পুরো আমিটাকেই খেয়ে ফেলতে পারেন…”
প্রণয় এবার স্থির চোখে তাকালো টলটলে নীলাভ্র চোখের গভীরে। ঠান্ডা কন্ঠে শীতল সতর্ক বাণী ছুড়ে বলল—
“ভেবে বলছিস?”
এক বাক্যে একদম চুপ হয়ে গেলো প্রিয়তা। চরম লজ্জায় গরম ভাতের মতো নরম হয়ে গলে গেলো প্রণয়ের বুকে। নিজের বলা বেফাঁস কথাগুলো ভেবে আরো বেশি লজ্জা হাঁসফাঁস করে উঠলো মেয়েটা। অতিরিক্ত খুশিতে ভুলভাল বকে ফেলেছে। এখন মন চাচ্ছে—এই মানুষটার বুকের ভেতর ঢুকে লজ্জা নিবারণ করতে।
আচ্ছা, সত্যি কী—কারো বুকের ভেতর ঢুকে পড়া যায়? ইশ, যদি যেতো! তাহলে বাহিরের এই টক্সিক দুনিয়ার প্রতি কোন ইন্টারেস্ট ছিলো না প্রিয়তার। সে সত্যি সত্যি তার প্রণয় ভাইয়ের মধ্যে হারিয়ে যেত।
পরম শান্তিতে আপনা আপনি চোখ বুজে এলো প্রণয়ের। নরম স্পর্শ গুলো জলন্ত হৃদয়ের কোনায় কোনা শান্তি বর্ষন করছে। এতো তৃপ্তি, এত শান্তি, এত সুখ—এ যেন কেন মহা দুর্লভ বস্তু! যা পৃথিবীর অন্যত্র কোথাও মিলবে না। এই সুখের সন্ধানে পুরো দুনিয়া জ্বালিয়ে দিলেও ফলাফল থাকবে শূন্য।

বাচ্চা একটা মেয়ে, ছোট ছোট হাত আর ছোট্ট একটা মুখ—তবু আল্লাহ তার সব সুখ-শান্তি বন্দি করে এই মেয়েটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এই মেয়েকে ব্যতীত যেন পৃথিবীর শান্ত শীতল বাতাসও বিষাক্ত ও দূষিত মনে হয়।
এতো মায়া কেন লাগায় মেয়েটা? কেন বারবার প্রণয়কে ভালোবাসার কাঙ্গাল বানায়? এই মেয়েটাকে দেখলে পরে যে বড়ো বাঁচতে ইচ্ছে হয়… নিজেকে উজাড় করে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়…
প্রণয় আর ভাবলো না। প্রিয়তাকে দুই হাতে জড়িয়ে নিল বুকের গভীরে। উষ্ণ ললাটে তপ্ত চুমু এঁকে দিয়ে আস্তে করে বললো—

“আমার রাজকন্যা, তোমার সুখের জন্য আজ থেকে আমি সব কোরবান করব। নিজের শেষ নিঃশ্বাসেও তোমাকে ভালোবাসবো। যত জীবন বাঁচবো, তোমাকে বুকের সাথে আগলে রাখবো। আর কাউকে আঘাত করতে দেবো না তোমায়, আর কাউকে কষ্ট দিতে দেবো না। খুব খুব ভালোবাসবো তোমায়।”
ঈষৎ কেঁপে উঠে আরো শক্ত করে জাপটে ধরলো প্রিয়তা। ব্যাস! এই জীবনে তার আর চাওয়ার কিছুই নেই… কিছু নাই।
“প্রণয় ভাই…”
“হুঁ? পাখি?”
“আমাকে আপনার বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলুন প্রণয় ভাই… আমি আর এক সেকেন্ডও আপনার থেকে দূরে থাকতে চাই না… আমি আর এক সেকেন্ডও আপনার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হতে চাই না… অনেক দুঃখের পর আমি আপনাকে পেয়েছি… আপনি শুধু আমার… আমার… শুধু আপনাকে চাই। আপনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ‘আমি’ নামক বিষটা ছড়িয়ে দিতে চাই…”

কথাগুলো শ্রবণ করে ঠোঁট কামড়ে হাসলো প্রণয়। আরো কাছে টেনে নিলো ছোট্টো পাখিটাকে।
ছোট্টো পাখিটা তার বিষাক্ত সে প্রেমের দহন সইতে না পেরে বারবার ছুটে এসেছে তার দুয়ারে… কিন্তু সে…
“ও প্রণয় ভাই… আমাকে আর কষ্ট দেবেন না তো? প্লিজ… বলুন না… আর ধৈর্য নেই আমার…”
কথাগুলো বলতে বলতে ফুপিয়ে কান্না করে দিলো প্রিয়তা। প্রণয়ের বুকের শার্ট খামচে ধরে আবারো অঝোরে চোখের পানি ফেলতে লাগলো।
প্রণয় কোমর চেপে ধরে উঠিয়ে কোলে বসালো। চোখের পানিতে ভেজা ছোট চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিলো সযত্নে।

ভিজে গালে বৃদ্ধাঙ্গুল বুলিয়ে চুমু খেলো শব্দ করে। ধীরে ধীরে নাক আর ঠোঁটের উষ্ণ নরম স্পর্শ এঁকে দিলো সারা মুখে। অসক্তি বাড়াতে বাড়াতে মেয়েটা তাকে পাগল বানিয়ে ছাড়লো শেষ পর্যন্ত।
প্রণয়ের ছোট ছোট আদরে আরো প্রশ্রয় পেয়ে গেলো প্রিয়তা। এতো দিনের জমানো কান্নাগুলো গলা দিয়ে উগরে আসতে চাইছে।
নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারলো না প্রিয়তা। প্রণয়ের গলায় মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে ধারালো নখধারা খামচে ধরলো প্রণয়ের প্রশস্ত পিঠ।
চোখের পানিগুলো টপটপ করে প্রণয়ের সাদা শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে।
তবু নিরব থাকলো প্রণয়। দীর্ঘ চুলের গুছায় হাত বুলাতে বুলাতে ধীর স্থির কণ্ঠে বলে উঠলো—
“তোকেই আজ বাধা দেবো না জান। কাঁদ তুই যত ইচ্ছা—আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদ। চিৎকার দিয়ে কাঁদ। এটাই তোর শেষ কান্না। আজকের পর থেকে তোর প্রণয় ভাই আর তোকে কখনো কাঁদতে দেবে না—অন্তত সে জীবিত অবস্থায় তো নয়।

তোর কষ্ট হবে এমন কিছু আর তোর প্রণয় ভাই কক্ষনো করবে না।
তোর সব কথা শুনে চলবে। তুই যা বলবি তাই করবে। প্রয়োজন হলে তোর কথায় উঠবে-বসবে।
নিজের শেষ নিঃশ্বাস অবধি বুকে বেঁধে রাখবে। তোকে এক মুহূর্তের জন্যও দূরে যেতে দেবে না… আদর করবে… ভালোবাসবে… তুই যেমন চাইবি তেমন!
তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল ময়না মাখি…”
আশ্বাস শুনে কান্না থামিয়ে দিলো প্রিয়তা। প্রণয়ের শার্টে নাক-মুখ মুছে হেঁচকি তুলে বললো—
“কথা দিচ্ছেন?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে ফেললো প্রণয়। কান্নার তুড়ে লাল হয়ে যাওয়া টমেটোর মতো গাল দুটো টেনে দিয়ে শূন্য কণ্ঠে গান ধরলো—

“কথা দিলাম… তোকে একলা না রাখার… হবো ছায়াদের মতো সঙ্গী… আমি তোর…”
ঘড়ির কাঁটায় হয়তো রাত দুটো। মধ্যরাতের সুনশন নীরবতা কক্ষে বিরাজমান, বাইরে ঘন কুয়াশা পড়ছে।
নভেম্বর মাস, তাই হয়তো ঠান্ডা–টাও ভালোই ঝাঁকিয়ে পড়েছে চার পাশে।
একটা কম্বলে ঠান্ডা ধরে না, তাই একটু বেশি শীত লাগছে শ্বেতার। ঘুমের মধ্যেই বারবার গুটিয়ে যাচ্ছে আবির্ভাবের উষ্ণ, গরম, প্রশস্ত বুকে।
আবির্ভাবও নড়ে ওঠলো ঘুমের মধ্যেই। দুই হাতে বুকে টেনে মিশিয়ে নিলে নরম, তুলতুলে, আদুরে শরীরটা।
দু’জনেই গভীর তন্দ্রামগ্ন—ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া, নিশুতি রাতের নীরবতা, আর বুকের মাঝে জড়িয়ে থাকা ভালোবাসার মানুষ! কে… জানি, বলেছিল— “সুখী হতে টাকা লাগে না।” সে হয়তো আজকের দিনটা জানতো, তাই এমনটা বলেছিলো।
কিন্তু তাদের এই সুখের নিশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না—বিকট একটা চিৎকারে একসাথে ধড়ফড়িয়ে শুয়া থেকে উঠে বসলো দু’জন।

বাহির থেকে কারো তীব্র কান্না, আহাজারি আর বিলাপের শব্দে কান-মাথা জ্বালা-পোড়া হয়ে যাচ্ছে দু’জনের।
শ্বেতা ঢুলু ঢুলু চোখে তাকালো অভির্ভাবের দিকে।
এই এক নিত্য জ্বালা—সে পুনরায় অভির্ভাবের বুকে লুঠিয়ে পড়ে বললো,
“আপনাকে না বলেছিলাম তুলো কিনে আনতে? রাতে কানে দিয়ে ঘুমাবো। দেখলেন তো—এখন চিত্‌কারে রীতিমতো কানে দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসার উপক্রম!”
অভির্ভাব ভারী নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। শ্বেতাকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
“এভাবে বলো না, my love… সে অসুস্থ। আমাদের গিয়ে দেখা উচিত। এভাবে দিনের পর দিন চোখের সামনে কাউকে তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেখতে পারবো না আমরা… তুমি জানো তো।”
সাথেসাথেই লাফিয়ে সজাগ হতে গেলো শ্বেতা। সোজা হয়ে বসে আতঙ্কিত দৃষ্টি মেলে তাকালো অভির্ভাবের পানে।
অভির্ভাব পুনরায় বুকে টেনে নিয়ে বললো,

“আমি তো দেখলেই বুঝতে পারবো ওর প্রবলেমটা কী… তাই আমার মনে হয়, আমার আর চুপ করে বসে থাকা উচিত না—আমার ওকে গিয়ে দেখা উচিত।”
বলে বিছানা থেকে নামতে নিলো অভির্ভাব।
সাথে সাথেই খপ করে তার বাহু আকড়ে ধরলো শ্বেতা। ভয়ার্ত চোখে দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি প্রকাশ করলো।
অভির্ভাব বুঝলো মেয়েটার ভয় এর কারণ। কিন্তু সে যে নিরুপায়—এভাবে নিজের পেশাকে অসম্মান করতে পারবে না সে। আবির্ভাব শ্বেতার ফুলো ফুলো গালে ঠেসে একটা চুমু খেয়ে বললো,
“সবার উপরে আমার একটাই পরিচয়, my love… আর সেটা হলো—আমি সাধারণ মানুষের সেবক। আমি একজন ডাক্তার। কেউ শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখে ও মুখ লুকিয়ে বসে থাকা যায় না। মানুষ হিসেবে আবির্ভাব রায় চৌধুরী স্বার্থপর হলে ও… ডাক্তার হিসেবে আবির্ভাব রায় চৌধুরী কক্ষনো স্বার্থপর হতে পারবে না।”

বাইরে তীক্ষ্ণ শব্দটা এবার আরও জুড়ালো হলো।
শ্বেতার চোখে পানি চিকচিক করছে।
অভির্ভাব ঘরের দরজা খুলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
শ্বেতার নিজেরই নিজের কপাল চাপড়াতে মন চাচ্ছে—সারা দুনিয়া থাকতে এই বাড়িতেই পাগল থাকতে হলো! না জানি এবার তাদের কত বড় বিপদে পড়তে হয়!
এমন নয় যে শ্বেতা লোকটাকে সাহায্য করতে চায় না—
কিন্তু এখানে কিছু করলে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ হতে দু’ মিনিটও লাগবে না।
শ্বেতা আর ভাবতে পারলো না—ছুটে গেলো অভির্ভাবের পেছন পেছন।
বাইরে ঘন কুয়াশার সাথে চার পাশে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। পদ্দার বাড়ির পূর্বের পুকুরঘাট পেরিয়ে চার দিক খোলা টিনের চালার মধ্যভাগের পিলারে শক্ত, মোটা লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে কাউকে।
সে প্রতিনিয়ত গলা ফাটিয়ে চিত্‌কার করছে আর জোরে জোরে কাঁদছে।

শরীরের ধুলোবালি মাখা ময়লা কাপড় আর এলোমেলো, জট পাকানো চুলের জন্য মুখটা দেখা যাচ্ছে না।
তার এক পাশে পদ্দার সাহেব আর তাঁর স্ত্রী দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছেন।
এই বাড়িতে আবির্ভাবরা এসেছে প্রায় ২৫ দিন, কিন্তু এক রাতেও তারা ঠিক মতো ঘুমাতে পারেনি চিৎকার আর কান্নার জন্য। লোকমুখে শুনেছে পদ্দার সাহেবের একমাত্র মেয়েটা নাকি পাগল। এর জন্য রাত হলে চারপাশের কেউ ঠিক মতো ঘুমাতে পারে না। যেই রাত গভীর হয় সেই চিৎকার–কান্না আর আহাজারি শুরু হয়।
আবির্ভাব অনেক বার চেয়েছে মেয়েটাকে দেখতে, কিন্তু শ্বেতা কখনো আসতে দেয়নি, কারণ আবির্ভাব তাকে medically advise দিলে বা ওষুধ suggest করলে তাদের ধরা পড়তে দু’দিন লাগবে না।
তাই ওর মনের ভয়টা ও নেহাত ভুল নয়। কিন্তু কী করার? আবির্ভাব যে শপথ নিয়েছে অসুস্থ মানুষের সেবা করার—সবার আগে তার পরিচয়, সে এখন ডাক্তার। এভাবে অসুস্থ রোগী চোখের সামনে দেখে–ও ডাক্তাররা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না, তাই আজ আবির্ভাব ও পারেনি।

আবির্ভাব শান্ত চোখে মেয়েটাকে দেখতে দেখতে এসে ধীর পায়ে দাঁড়ালো পদ্দার সাহেবের পাশে।
মেয়েটি এখনো অসাভাবিক আক্রমণাত্মক আচরণ করছে।
আবির্ভাব মেয়েটার পানে চোখ রেখে ঠান্ডা কণ্ঠে জানতে চাইল,
“ওনার আসল সমস্যা কী, চাচা?”
পদ্দার সাহেব জলভরা নয়নে আঙুলে আগায় চশমা ঠেলে তাকালেন সামনের লম্বা–চওড়া গড়নের ছেলেটার দিকে।
আচলে মুখ গুঁজে তৎক্ষণাৎ হুহু করে কেঁদে উঠলেন মনোয়ারা বেগম।
শ্বেতা ও হন্তদন্ত হয়ে এসে দাঁড়ালো আবির্ভাবের পাশে।
পদ্দার সাহেব হাত উঠিয়ে পাঞ্জাবির হাতায় চোখ মুছলেন। নিজের আদরের মেয়েটার দিকে তাকালে কোনো মতেই বুক ধরাতে পারেন না তিনি।
আবির্ভাব পুনরায় প্রশ্ন করল—

“কি হয়েছিল ওনার? আর ওনাকে এভাবে বেঁধে রেখেছেন কেন? কেন ডাক্তার দেখাননি?”
পদ্দার সাহেব সামনে দাঁড়ানো ছেলেটার কৌতূহলী চোখের দিকে তাকালেন। কী বলবেন বুঝতে পারলেন না।
শ্বেতা আবির্ভাবের বাহু চেপে ধরল। অশ্রু–শিক্ত চোখ দুটো দু’পাশে নেড়ে বুঝালো—
“এমন কিছু কোরো না, যাতে এদের সন্দেহ হয়।”
আবির্ভাব শ্বেতার অভ্যক্ত কথাগুলো বুঝল, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সামনে পিলারে বাধা মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েটার দিকে চেয়ে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল—
“আপনার মেয়ে কি হঠাৎ করে বড় কোনো মানসিক আঘাত পেয়েছে? যেটা সে মানতে বা সহ্য করতে পারেনি?”
পদ্দার সাহেব ভেতর ভেতর কেঁপে উঠলেন। আবির্ভাব শ্বেতার হাত সরিয়ে ধীর–কদমে এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে।
পদ্দার সাহেব আতকে উঠে বললেন—

“ওর কাছে যেও না বাবা, ও মানুষ চিনতে পারে না!”
আবির্ভাব শুনলো না, সোজা গিয়ে মেয়েটার সামনে হাঁটু মুড়ে বসল।
খুব নিকটে কারো উপস্থিতি আঁচ করে হঠাৎই একদম চুপ মেরে গেল মেয়েটি। সকল বিলাপ থামিয়ে একদম শান্ত হয়ে গেল।
আবির্ভাব মেয়েটার হাতের নাড়ি চেপে ধরতেই কেঁপে উঠল মেয়েটি। মুখের ওপরের এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকালো আবির্ভাবের দিকে।
সাথে সাথেই কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে ঘটে গেল এক অপ্রত্যাশিত কাণ্ড—
সে দৃশ্য দেখে রাগে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো শ্বেতা। কেউ কিছু বোঝার আগেই ধাক্কা মেরে মেয়েটিকে সরিয়ে দিল আবির্ভাবের থেকে।
বিস্ময়ে হতবম্ব হয়ে গেল সকলে। আবির্ভাব শ্বেতার মুখের দিকে চেয়ে দেখল— শ্বেতা ক্রোধে ফেটে পড়ছে, মনে হচ্ছে পাগল মেয়েটাকে এখনই কাঁচা চিবিয়ে খাবে!
আবির্ভাব দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে শ্বেতার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলল—

“কি করছো, মাই লাভ? ওনাদের সামনেই ওনাদের মেয়েকে hurt করছো! এর ওপর মেয়েটা অসুস্থ।”
এই কথায় গরম কড়াইতে পানি দেওয়ার মতো ছ্যাত করে উঠলো শ্বেতা। ক্রোধে ফুঁসে উঠে বলল—
“তো কি? আদর করবো ওই মেয়েটাকে? দেখছেন না, জাতে পাগল হলেও তালে ঠিকই আছে। দেখলেন না—সামনেই যেতেই আপনাকে কীভাবে খপাত করে ধরলো!”
অন্য একটা মেয়ের কাছে নিজের মেয়ের সম্বন্ধে এমন কথা শুনে লজ্জায় মাথা নিচু করে নিলেন পদ্দার সাহেব। অসহস্ত কণ্ঠে বললেন—

“তুমি যেমনটা ভাবছো, তেমনটা নয় মা…”
ওনার কথার মাঝেই পুনরায় আবির্ভাবের হাত টেনে ধরল মেয়েটি। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠল—
“তুমি এসেছো ইন্দ্র! আমি জানতাম তুমি আমার কাছে ঠিক ফিরে আসবে!”
শ্বেতা পুনরায় ঝাড়া মেরে হাত সরিয়ে দিল। এক পলক মেয়েটার উৎফুল্ল মুখের দিকে চেয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল আবির্ভাব।
পদ্দার সাহেবের সম্মুখে এসে স্পষ্ট কণ্ঠে জানতে চাইল—
“আসল ঘটনা কী, চাচা? কে এই ইন্দ্র?”
পদ্দার সাহেব ইতস্তত করতে করতে একপর্যায়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। মেয়ের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন—

“…ইন্দ্রনীশ এই এলাকারই ছেলে, যাকে আমার মেয়ে মন–প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল।”
আবির্ভাব ভ্রু কুঁচকাল। সন্দেহান্বিত গলায় জানতে চাইল—
“ইন্দ্রনীশ নামটা সনাতনী না?”
পদ্দার সাহেব ওপর–নিচ মাথা ঝাকালেন—
“হ্যাঁ… ছেলেটা হিন্দু ধর্মের ছিল—ইন্দ্রনীশ ভট্টাচার্য।”
“তারপর কী হলো?”
**“ইন্দ্রনীশ ছিল এই এলাকার সুনামধন্য ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে। আমি জানি না বাবা, কোথা থেকে কতদূর কী হয়েছে… কিন্তু হঠাৎ একদিন দূর থেকে জানতে পারি, ভট্টাচার্য বাড়িতে নাকি অনেক বড় ঝামেলা লেগেছে। কী নিয়ে—জানতাম না, তাই আগ্রহ দেখাইনি।

এরপর থেকেই মানুষ কেমন চোখে যেন তাকাতে লাগল আমাকে। দেখলেই কানাগুঁষো করত, ফিসফিসিয়ে কিছু বলত—বুঝতাম না। ঠিক দু’দিন পরে ইন্দ্রনীশের বড় জেঠু অনিমেষ ভট্টাচার্য আমাদের বাড়িতে আসেন। সেদিন ওনাকে দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম।
কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও ভাবতে পারিনি—নিজের ঔরসজাত সন্তানের জন্য সেদিন জীবনের প্রথম এমনভাবে অপমানিত হতে হবে আমাকে।
আমার মেয়ে আমার এত বছরের অর্জিত সকল মান–সম্মান একনিমিষে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল।
পুরো এলাকায় ‘ধিঃ ধিঃ’ পড়ে যায়। আমার মেয়ে নাকি ব্রাহ্মণ বাড়ির ছেলের সাথে—কত রকম কথা মানুষ বানিয়ে–বানিয়ে বলতে শুরু করে।
মেয়েকে বাধ্য হয়ে ঘরে আটকে রাখি, তবুও মানুষ শান্ত হয় না। গ্রামের মানুষের স্বভাবই তাই—তিলকে তাল করা। এক পর্যায়ে বিচার–সালিশ বসে। আর একবাক্যে সকলে বলে—

‘এই গ্রামে থেকে এসব অনাচার হবে না।
এক জন, দশ জনকে নষ্ট করবে—তাই কী হয়?
মেয়েকে এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে দিতে হবে, না হলে গ্রাম ছাড়তে হবে।’
আমরা কোথায় যেতাম বাবা? আমাদের এই গ্রাম ছাড়া কোথাও কেউ নেই। আর মেয়েটাও বিয়ের উপযুক্ত ছিল, তাই তাদের দেওয়া প্রথম রাস্তা–ই বেছে নেই। এক না একসময় তো মেয়েকে বিয়ে দিতেই হতো।
তারপর…

তারপর মেয়ের বিয়ে দেবার জন্য অনেক পাত্র দেখি। কিন্তু কোনো পরিবার আমার মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিতে রাজি হয় না। এমন নয় যে আমার মেয়ে দেখতে–শুনতে খারাপ ছিল—আমার মেয়ের মতো মেয়ে এই পুরো গ্রামে দুটো ছিল না! তবুও কোনো পরিবার প্রস্তুত ছিল না আমার মেয়েকে ছেলের বউ করতে।
কারণ ততোদিনে অনেক বদনাম হয়ে গিয়েছিল। আর তারা দু’জন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। পালিয়ে যেতে গিয়ে ধরা পড়েছিল।
তখন সামাজিক চাপ এত বেড়ে গিয়েছিল যে—তাকে আর আমি বাসায় রাখতে পারতাম না। তাই বাধ্য হয়ে পাশের মসজিদের ইমামের সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে হয়েছে। ওই ইমাম নিজেও আমার মেয়ের উপযুক্ত ছিলেন না—বয়স হয়তো তাঁর ৪৫ বা তারও অধিক। ঘরে দু’টো বউ আর বাচ্চা–ও ছিল!
সব জেনে–শুনে আমার মেয়েটাকে মুখ বেঁধে পানিতে ফেলে দেই…
আমি যে অসহায়, হতদরিদ্র… আমার এত সামর্থ্য নেই মেয়েকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার। এই বাড়িটা ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। একমাত্র মেয়ে ছিল—জীবনের সম্বল ভেবে ছিলাম অনেক বড় ঘরে বিয়ে দেবো। আলাপও আসতো। কিন্তু মেয়ে পড়ার বাহানা দিয়ে রাজি হতো না।

জানো বাবা—মেয়েটা আমার বিয়ের দিন পা জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছিল… যেন তাকে বিয়ে না দেই।
ওই ছেলেটাও সেদিন পাগলের মতো চিৎকার করে কেঁদেছিল। কিন্তু তাকে ও বেঁধে রাখা হয়েছিল। কী পাশবিক আচরণ করেছিলাম সেদিন ছেলে–মেয়ে দু’টোর ওপর। তাদের এক ফোঁটা কান্নাও সেদিন কেউ শুনতে চায়নি।
ব্রাহ্মণ পরিবার ভেবেছিল তারা হয়তো মুক্তি পেয়ে যাবে। কিন্তু মানুষ যা ভাবে, সবসময় কি আর তা হয়?
বিয়ের পরের দিন ঘরের দরজা ভেঙে ভেতর থেকে ইন্দ্রনীশের লাশ বের করা হয়। তরতাজা যুবক ছেলেটা এক রাতেই সকলকে ছেড়ে চলে যায়।

আর এই কথা শোনা মাত্রই আমার মেয়েটা সেই যে মানসিক ভারসাম্য হারায়… আজ অবধি এমনই।
এমনকি কাউকে চিনতেও পারে না। ইন্দ্রনীশের মতো চেহারার কাউকে দেখলে ‘ইন্দ্র’ বলে জড়িয়ে ধরে।
অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি… কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। ডাক্তাররা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—
‘ওর পৃথিবীতে ইন্দ্রনীশ ব্যতীত অন্য কিছু আর অস্তিত্বই রাখে না।’”
নিচে একটিও বাক্য না বদলে, শুধু দাঁড়ি–কমা ঠিক করে এবং সব ডায়লগকে “ ” এর মধ্যে সাজিয়ে পুরো অংশটি সঠিকভাবে সাজানো হলো—

পোদ্দার সাহেব বলতে বলতে ঝড় ঝরিয়ে কেঁদে উঠলেন। শ্বেতা ও আবির্ভাব সবটা শুনে তব্দা খেয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। বাকরুদ্ধ হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকালো। এসব শুনে ভয়ে হাত–পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। শ্বেতার আবির্ভাব শ্বেতার অবস্থা বুঝে শক্ত করে ওর হাতের মুঠো চেপে ধরলো। চোখের ইশারায় বুঝালো—“এমনটা আমাদের সাথে কখনোই হবে না।”
বলা ভালো মেয়ে, পোদ্দার সাহেবের মেয়েটার নাম চন্দ্রা। আবির্ভাব চন্দ্রার অবস্থা দেখে শ্বেতাকে নিয়ে ঘরে চলে এলো। একটা সাদা কাগজে কিছু মেডিসিনের নাম লিখে পোদ্ধার সাহেবের হাতে দিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বললো—“এই ওষুধগুলো কিনে আনবেন, বাকিটা আমি দেখবো।”
পোদ্ধার সাহেব অবাক হয়ে কাগজটার দিকে তাকিয়ে বললেন—“তুমি ওষুধ লিখতে জানো?”
আবির্ভাব কোনো দ্বিধা না রেখেই বললো—“আমি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। খুব নামকরা নয়, তবে মোটামুটি ভালোই পারি। আপনি যদি আমার উপর বিশ্বাস রাখেন, তাহলে এই ওষুধগুলো একটু এনে দিন। বাকিটা আমি দেখছি।” বলে আবির্ভাব তার ঘরে চলে গেল।

পোদ্ধার সাহেব সন্দিহান চোখে তাকিয়ে রইলেন তার যাওয়ার পানে। হাতে থাকা চিরকুটটা খুলে দেখলেন—হিজিবিজি কিছু লাইন লেখা। তিনি আর বেশি ভাবলেন না, নিজের ঘরে চলে গেলেন।
“আহা ভাই! শীতের সকালে এক কাপ চায়ের কাছে বউয়ের একটা গরম গরম চুমু—পুরো ফেল!”
ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপে উষ্ণ এক চুমুক দিয়ে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে কথাখানা বললো রাজ।
ড্রয়িংরুমের টু–সিটার সোফাতে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে রাজ। তার এক পাশে তন্ময় ও অন্য পাশে অরণ্য।
অরণ্য গরম গরম ভাপা পিঠা নলেন গুড়ে চুবিয়ে মুখে পুরে নিলো। চিবোতে চিবোতে তন্ময়ের উদ্দেশ্যে বললো—“বুঝলি পার্টনার, শেয়াল যখন মুরগি ধরতে গিয়ে ঝাঁটার বাড়ি খেয়ে আসে, তখনই মনের দুঃখে এসব বলে!”
তন্ময় দ্রুত সম্মতি জানিয়ে ‘হ্যা’ সূচক মাথা নাড়লো। রাজের কাঁধ চাপে মুখ চুন করে বললো—“একটু ভুল বলে ফেলেছিস পার্টনার, আমাদের শ্রদ্ধেয় বড় ভাইয়ের মুখটা তো দেখ!”

অরণ্য খাওয়া থামিয়ে দিলো। দুঃখী দুঃখী মুখ করে তাকালো রাজের দিকে।
রাজ ভ্রূ কুঁচকে দুই ভাইয়ের বাড়াবাড়ি দেখছে।
তন্ময় চোখ মুছার ভান ধরে বললো—“আসলে যতই চেষ্টা করো, শাক দিয়ে কি আর মাছ ঢাকা যায়? মাছের লেজটা ঠিকই বেরিয়ে যায়! আমাদের শ্রদ্ধেয় বড় ভাই মুরগি ভেবে সাপের গর্তে হাত ঢুকিয়ে সক্কাল সক্কাল ছোবল খেয়ে মুখ ঝুঁলিয়ে এসেছেন!”
প্রীতম অভিরাজকে কোলে নিয়ে তাদের পাশে এসে বসতে বসতে বললো—“সকাল সকাল শুরু হয়ে গেছে বুড়ো বাঁদরদের বাড়াবাড়ি!”

“অ্যাম্মু, এক কাপ কফি দাও তো”—বসে বসে হাঁক ছাড়লো প্রেম। সমুদ্র ওর পাশে বসেই ম্যাগাজিন পড়ছে।
“এখনই দিচ্ছি, আব্বু।”
দেখতে দেখতে সদমান শিখদার, খালিদ শিখদার, সাজিদ ও সোহেব শিখদারও গায়ে শাল পেঁচিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে বসলেন।
বাপ–চাচাদের দেখে ভদ্র হয়ে গেল সকলে।
অনুসরী বেগম সকলকে চা–নাস্তা এনে দিলেন।
কুয়াশা জমে ঝাপসা হয়ে গেছে রান্নাঘরের জানালার কাচ। তনুশ্রী বেগম, অনন্না বেগম ও অর্থি বেগম রান্নাঘরে শীতকালীন পিঠা বানানোর জন্য চালের গুঁড়ি মেখে চলেছেন। আজ শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটি, তাই দুপুরের রান্নায় বিশেষ আয়োজনে বেস্ত শিখদার বাড়ির গিন্নিরা।
অনুসরী বেগম ভেটকি মাছ নুন–হলুদ–সরষে বাটা দিয়ে ম্যারিনেট করতে গিয়েই—
হঠাৎ বাড়ির ডোরবেল বেজে উঠলো।
তিনি হাত জোড়া থাকায় ছোট বোনকে উদ্দেশ করে বললেন—“অনু, যাওল তো, গিয়ে দরজাটা খুলে দেখ কে এসেছে।”

অনন্না বেগম ও তাই করলেন। শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। দেখলেন—ততক্ষণে তন্ময় দরজা খুলে দিয়েছে।
অনন্না বেগম গভীর উৎসাহ নিয়ে তাকালেন বাইরে।
তন্ময় এই কাক ভোরে শুদ্ধ আর প্রিয়স্মিতা কে বাহির থেকে আসতে দেখে অবাক হয়ে বললো—“এই আপা আর দুলাভাই! এই ঠান্ডার মধ্যে তোমরা বাইরে থেকে আসছো? আম্মাজানরা দেখে একটা মারও পিঠের বাইরে পড়বে না?”

প্রিয়স্মিতার গায়ে কোনো শীতনিরোধক বস্ত্র নেই, কেবল শুদ্ধ মেডিকেল অ্যাপ্রনটা জড়ানো।
অনন্যা বেগম মেয়ের এই খামখেয়ালি দেখে চটে গেলেন। দ্রুত মেয়ের দিকে এগিয়ে এসে বললেন—“কি রে প্রিয়, তোর কি কোনোদিন বুদ্ধি হবে না? এই ঠান্ডার মধ্যে তুই এই অবস্থায় খালি গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস? একবার ঠান্ডা লাগলে কি হবে বুঝতে পারছিস?”
বলতে বলতে হঠাৎ কন্ঠ থেমে গেলো অনন্যা বেগমের। চোখের সামনে চরম আশ্চর্যজনক কিছু দেখে মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। তাঁর পায়ের নিচের শক্ত জমিন টুকরো যেন সরে গেলো।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৪

উনার ঠিক দুই হাত সম্মুখে শুদ্ধ–প্রিয়স্মিতা দাঁড়ানো। তাদের পাশাপাশি এসে দাঁড়ালো আরেক যুগল।
তন্ময় চোয়াল ঝুলিয়ে হাঁ করে চেয়ে রইলো ওদের চারজনের দিকে।
প্রিয় আপুর মতো একরকম হুবহু দুজনকে দেখতে দেখতে চোখ ঘুরিয়ে ঠাস করে মাটিতে উল্টে পড়লো তন্ময়।
“কি রে, কে এসেছে?” বলতে বলতে এগিয়ে এলেন অনুসরী বেগম। দ্বিতীয় কিছু বলার আগে সামনে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনিও।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৬

1 COMMENT

  1. Apu next part ta tara tari diyen plz
    Ajker part ta kub valo laglo donnobad
    ❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤❤️❤️❤️❤️❤️

Comments are closed.