Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮২

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮২

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮২
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সময় বুক পকেট থেকে ছিটকে পড়ল ফোনটা। সামান্য স্পর্শ লাগাতে ভাঙা স্ক্রিনে শেষবারের মতো জ্বলে উঠল একটা ছবি।
নিভুনিভু ঘোলাটে চোখে ছবিটার দিকে তাকালো প্রণয়। মুখ থেকে খুব আস্তে, অস্ফুটে বেরিয়ে এলো—
“রক্তজবা”

শিকদার বাড়ির ড্রয়িং রুমজুড়ে অসংখ্য মানুষের আনাগোনা আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে বিলাপ করার শব্দে সুখের ঘুমটা ভেঙে গেলো প্রিয়তার। মুখ তেত হলো বিষণ।
সে বিরক্তি নিয়ে চোখ কচলে বাহিরে পা রাখতেই দেখলো শিকদার বাড়ির সকলের চোখে পানি। অনুসরী বেগম বার বার জ্ঞান হারাচ্ছেন। কিছুই বুঝতে পারলো না প্রিয়তা, সব কিছু মাথার তিন হাত উপর দিয়ে উড়ে গেলো।
প্রিয়তা কৌতূহল নিয়ে সিড়ি বেয়ে নামতেই দেখল সবাই মিলে একটা জায়গায় জটলা পাকিয়ে দাড়িয়ে আছে। কে যেনো বার বার আহাজারি করে বলছে—

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আহা গো, এতো অল্প বয়সে পোলাটা চলে গেলো, এখন কী যাওনের সময়।”
মহিলাটার কথায় গায়ের পশম দাড়িয়ে গেলো। প্রিয়তার, দৌড়ে সামনে যেতেই থমকে গেলো।
শিকদার বাড়ির মাঝবরাবর সাদা কাফনে মুড়িয়ে বাঁশের খাটিয়ায় শুয়ে রাখা হয়েছে কাউকে। দৃশ্যটা দেখতেই কলিজাটা ছ্যাত করে উঠলো প্রিয়তার।
মোহগ্রস্থের মত সামনে পা বাড়াতেই বাতাসে ভাসা ধূপের গন্ধ নাকে লাগলো। দম বন্ধ হয়ে এলো তার,লাশের মুখ থেকে কাপড় সরে গেলো সাথে সাথেই—
“নাহ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্”

চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসল প্রিয়তা। নিস্তব্ধ কক্ষে তার চিৎকারের ধ্বনি প্রতিফলিত হলো আরো ভয়ঙ্কর ভাবে। দর দর করে ঘামছে প্রিয়তা, শরীর বেয়ে নামছে শীতল স্রোত। পরনের জামা কাপড় ভিজে উঠেছে ইতিমধ্যে। কাঁপতে কাঁপতে আসে পাশে তাকালো প্রিয়তা। সুদূরে কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আজানের সুমধুর ধ্বনি। প্রিয়তা শুষ্ক ঢুক গিলে তাকালো দেয়াল ঘড়ির দিকে— রাত ৩টা বেজে ৪৫ মিনিট। এবার চারদিকের মসজিদ গুলোতে এক সাথে শুরু হয়েছে ফজরের আজান।
প্রিয়তার শরীর বরফের ন্যায় ঠান্ডা। হাপরের মতো ওঠানামা করছে তার বুক, থর থর করে কাঁপছে হাত-পা সহ সমগ্র শরীর। গায়ে প্রয়োজনীয় বলটুকুও পাচ্ছে না প্রিয়তা। মনে হচ্ছে সে যেন ইহজগতেই নেই। এটা কী দেখলো সে? কার লাশ দেখলো? তার প্রণয় ভাইয়ের! স্বপ্নটা কল্পনায় পুনরাবৃত্তি হতেই পুনরায় গা কাটা দিলো,আঁতকে উঠে চিৎকার দিল প্রিয়তা।
প্রিয়তা এটাকে সপ্ন ধরে বসে রইল, অথচ সে জানলই না যে এই হাড় হিম করা শিউরে ওঠা স্বপ্নটা আসলে সপ্ন নয়— ওই মুহূর্তে পৃথিবীর আরেক প্রান্তে সত্যিই তার প্রিয়জন নিঃশ্বাস হারাচ্ছে।

চারদিকে গুলা বারুদ আর তাজা রক্তের এক ভয়াবহ রণক্ষেত্র। মানুষের গোঙানির শব্দ, আর্ত চিৎকার যা রাতটাকে করে তুলেছে অভিশপ্ত। অন্ধকার রাতটা যেন গিলতে এসেছে সমস্ত সুখ।
শ্বাস ফেলার যো নেই। পিচ ঢালা রাস্তা গড়িয়ে গড়িয়ে রক্তের নদী বয়ে যায় বহুদূর। পুলিশি সাইরেন, পেট্রোল কার আর শত শত সেনা মিলে ঘিরে ফেলেছে বলিষ্ঠ দেহের পুরুষটাকে। পাহাড়ের মতো বিশাল শরীরটা আজ কত অসহায়, যে বুক দিয়ে সর্বক্ষণ আগলে রাখত তার জান পাখিকে সেই বুকে আজ বিশাল ক্ষত, তাজা রক্ত ঝরছে চুঁইয়ে চুঁইয়ে।

থেকে থেকে কেঁপে উঠছে প্রণয়, শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। হয়তো কোন শব্দ আওড়ানোর তাড়ানোর কণ্ঠনালী নড়েছে বার বার। হয়তো এখনো গলায় দলা পাকিয়ে আসছে কিছু কথা। দুচোখের কার্নিশ ভর্তি জল। হয়তো তার পাপিষ্ঠ রুহ এই দেহের মায়া ত্যাগ করতে পারছে না। যদি সে একবার এই দেহ ছেড়ে দেয় তো আর কোনোদিন তার জানকে দেখতে পাবে না।
হারানোর ভয় তার রুহটাকে বেঁধে রেখেছে শক্ত করে।
প্রণয় এর হাতটা নড়ছে। ভেতরটা মৃত্যু যন্ত্রণা ছটফট করছে নাকি কে জানে। তার কাতর চোখ দুটো একসমুদ্র তৃষ্ণা নিয়ে তাকাচ্ছে দূর আকাশে।
বুকের ভেতরের অবুঝ হৃদপিণ্ডটা বুঝি এখনো ধুক ধুক করেছে কিসের আশায়? তার জান পাখিকে আরেকবার ফিরে পাওয়ার আশায়? কিন্তু তাই কি আর হয়।

ওই বুকবরাবর যে এখন কুড়ি পঁচিশ খানা বন্দুকের নল তাক করা, শুধু একবার ট্রিগারে চাপ দিলে চোখের নিমিষেই ঝাঁঝরা হয়ে যাবে কারো ঘর কারণ নিরাপদ আশ্রয়স্থল। জীবনের অন্তিম ক্ষণে দাঁড়িয়েও হেসে ফেলল প্রণয়। এরা এতো নিষ্ঠুর কেন! এরা আঘাত করার জন্য শরীরে এত এত জায়গা থাকতে এরা খুঁজে খুঁজে তার বুকটাকেই বেছে নেয়। সেই জায়গাটাকেই বেছে নেয় যেখানে আঘাত করলে ভীষণ কষ্ট পায় প্রণয়।
ওরা যদি একবার জানতো ওখানে আঘাত করলে কতটা কষ্ট পায় প্রণয় তাহলে বোধ করি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারতো না। এভাবে কারো ঘর ভেঙে রক্তাক্ত করতে। তার অবুঝ জানটা কে শান্তিতে বুকের খাঁচায় থাকতে দিতো।
মৃত্যু পথযাত্রী মানুষ নাকি প্রতিনিয়ত পানির তৃষ্ণায় ছটফট করে। অথচ প্রণয় ছটফট করছে তার মায়াবিনীর মুখটা একবার দেখার তৃষ্ণায়। একটাবার ছুঁয়ে দেওয়ার তৃষ্ণায়, একটাবার বুকে ঝাপটে ধরে ভালোবাসি বলার তৃষ্ণায়। চোখের সামনে সবটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে প্রণয়ের।
ফোর্স দলবদ্ধভাবে শুট করার প্রস্তুতি নিতেই গুলির তীব্র শব্দ ভেসে এলো কাছে পিঠে থেকে। একমুহুর্ত মনোযোগ ছুটে গেল সবার।

সকলের একত্রে দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো কালো রঙের টেসলা গাড়িটির উপর। গাড়ির লকে পরপর দুবার সুট করে বেরিয়ে এলো শুদ্ধ। তার রক্তবর্ণ আগ্রাসী চোখ দুটো যে কারো বুকে কাপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
প্রত্যেকে অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে শুদ্ধর দিকে। ডক্টর চৌধুরীর মত সেলিব্রেটি ডক্টর কে চিনেনা এমন কেউ নেই, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে তার সম্মুখীন হওয়ার আশা কেউ করেনি।
শুদ্ধ সূক্ষ্ম নজরে চাইলো ফোর্স এর দিকে। প্রত্যেকটা সোলজারের হাতেই একে ৪৭। আর শুদ্ধর হাতে কেবল প্রণয়ের দুটো রিভলভার।

তাদের মনোযোগ ভঙ্গ হওয়ার সময় দিল না শুদ্ধ। ভিড়ের মধ্যে ফায়ার করা শুরু করলো আচমকা। একের পর এক রক্তাক্ত নিথর দেহ লুটিয়ে পড়লো পিচ ঢালা রাস্তায়। পুলিশ কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের ঘিরে ফেলল শতাধিক ব্ল্যাক ফোর্স কার। পোকার মতো বিরবির করে নেমে এলো ব্ল্যাক ফোর্স বা কালো রাইফেল দারি সহস্রাধিক গার্ড। ব্যাপারটা এত দ্রুত হলো যে সোলজাররা ঠিক মতো ব্যাপারটা বুঝে ওঠার সময় পেল না।
শুদ্ধ মিস্টার পিউরসন আর গার্ডরা মিলে হামলে পড়লো জার্মান সেনাদের উপর। মুহূর্তেই বেঁধে গেল ভয়াবহ সংঘর্ষ।
জার্মান আর আমেরিকান সেনাদের কেউ যে আর বেঁচে ফিরবে না তাতে নিয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই।
তবে এই সংঘর্ষ কেবল এক পাক্ষিক নয়। দুই পক্ষেরই নিহতের সংখ্যা বাড়ছে হুহু করে। মশা মাছির মতো জীবন্ত মৃত দেহগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে মাটিতে।

ড্রেনের পানিতে রক্তের ধারা মিলে যাচ্ছে ঝর্ণার মতো।
শুদ্ধ আর জাভেদ এত এত লাশের ভিড়ে পাগলের মতো খুঁজছে প্রণয়কে।
খুঁজতে খুঁজতে দূর থেকে প্রণয়ের মুখটা আবছা দেখা মাত্রই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল শুদ্ধ। তার প্রাণের বন্ধু বা শত্রু যাই হোক নিথর হয়ে পড়ে আছে রক্তভেজা রাস্তায়।
হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে প্রাণপণ তার দিকে দৌড়ে যেতে নিল শুদ্ধ। কিন্তু তার নিকট পৌঁছানোর পূর্বেই দেখতে দেখতে তার চোখের সামনেই পরপর আরও তিনবার শুট করে দিল প্রণয়ের বুকবরাবর, সেই একই জায়গায়।
এমন দৃশ্য দেখা মাত্রই মাঝ পথেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো শুদ্ধ। প্রণয়ের বিশাল পেশিবহুল শরীরটা দুবার ঝাঁকি দিয়ে নিথর হয়ে গেলো।

দূরে দাঁড়িয়ে আসমান জমিন কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল শুদ্ধ। পাগলের মতো ছুটে এলো জাভেদ।
শুদ্ধ উদভ্রান্তের ন্যায় দৌড়ে গেল প্রণয়ের কাছে। যেতে গিয়ে উষ্টা ও খেলো দু তিনবার। হাঁটু মোড়ে পাশে বসে পড়লো শুদ্ধ বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। অতঃপর প্রণয়ের নিথর শরীরটা বুকে জাপ্টে ধরে বিশাল একটা চিৎকার দিয়ে উঠল।
প্রণয়ের হৃদপিন্ডের উষ্ণ রক্তে ভিজে উঠছে শুদ্ধ। সেদিকে তার খেয়াল নেই। পাগলের মতো প্রণয়ের শরীরটা ঝাকাতে ঝাকাতে বিলাপ করতে শুরু করলো কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে বলল—
“ভাই, এই ভাই, ভাই চোখ খোল, উঠ তাকা আমার দিকে দেখ আমাকে, তোকে ডাকছি তো আমি।”
“তুই তো ছোটবেলা থেকে আমার সব কেড়ে নিয়েছিস, আমার সুখ, আমার ভালোবাসা, আমার শৈশব, আমার প্রতিটা পছন্দ — সব কেড়ে নিয়েছিস। যা কিছু আমার ভালো লাগতো, সেই সব কিছু তোর চাই।
আর ভাগ্যের জোরে তুই সেসব পেয়ে ও যেতি, অভিযোগ করার জায়গা ছিল না আমার।
তবু ও তো তোকে ভালবাসি বল।

সব তোকে দিয়ে দিয়েছি, তাহলে কেনো আমাকে ছেড়ে যেতে চাস?
একদম মরার কথা কল্পনাতে ও আনবি না। তুই মরতে পারিস না।”
প্রণয় নিথর শরীরটা বুকে জড়িয়ে আরও জোরে চিৎকার দিয়ে উঠল শুদ্ধ—
প্রণয়ের রক্তে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে শুদ্ধ, তার আর্ত চিৎকারে আশেপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।
নিশাচর প্রাণীগুলো যেন কাঁদছে নিরবে।
শুদ্ধ প্রণয় এর নির্জীব শরীরটা কে ঝাকাতে ঝাকাতে বকছে —
“তুই মরতে পারিস না ভাই, তোর জানের কথা ভেবে হলে ও তুই মরতে পারিস না।
আমি নাহয় তোর শত্রু, কিন্তু ওই মেয়েটার কথা একবার ভাববি নাহ্।
তুই মরলে ওকে কে দেখবে, তোর জানকে কে দেখবে? বল? কে রক্ষা করবে তাকে, কে আগলাবে, কে ভালবাসবে?
আমি তো পারব না। আমার এত ঠেকা পড়েনি, পরের বউকে দেখে রাখব।”
“এই ভাই, উঠ না। তোকে ছাড়া ওই মেয়েটা একদম অসহায়। তুই তো জানিস ও তোকে কতো ভালোবাসে। তোকে ছাড়া বাঁচবে কী করে?
তোর লাশের ভার আমি তো সয়ে নেব, কিন্তু ওই মেয়েটা সইবে কী করে।”

“প্রণয়… এই প্রণয়।
ছেড়েই যখন যাবি, তাহলে আমার ভালোবাসা কেড়ে নিলি কেন? আর নিলি তো এতো ওযত্নে ফেলে যাচ্ছিস কেন।
ও তো আমাকে ভালোবাসে না? বোঝার চেষ্টা কর।”
নীরবে পাশে দাঁড়িয়ে কান্না করে দিয়েছে জাভেদ।
শুদ্ধর পাগলামি শান্ত করা যাচ্ছেই না।
জাভেদ শুদ্ধ র কাঁধে হাত রাখলো, নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে বললো —
“নিজেকে সামলান স্যার, আপনি এমন করলে আমরা কোথায় যাব।”
শুদ্ধ এসব শুনলোই না, আকাশ পানে তাকিয়ে আর্তনাদ করে বলল —

“হে আল্লাহ, তুমি তো করুণার সাগর, তুমি চাইলে হয় না এমন কিছু নেই। তুমি একটু সদয় হও মাবুদ। প্রয়জনে তুমি আমাকে নিয়ে যাও। দেখো, এই দুনিয়াতে সবাই থেকে ও আমার কেউ নেই।
আমি একা। আমায় কেউ চায় না, কেউ ভালোবাসে নাহ্। আমি মরেও কারো কিছু যাবে আসবে না। আমি মরলে কেউ কাঁদবে না। হয়তো দাফন করে আসার পর আর কেউ মনে ও করবে না।
কিন্তু ও মরলে — ও মরলে ওই নিষ্পাপ মেয়েটা পাগল হয়ে যাবে, শেষে মরে ও যাবে।
মাবুদ, তোমার এই পাপিষ্ঠ বান্দাকে জীবন ভিক্ষা দাও।”
শুদ্ধ কথা বলতে বলতে লক্ষ্য করল প্রণয়ের শরীরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমছে। শুদ্ধ চিৎকার দিয়ে উঠল —
“অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছ, জাভেদ?”
“ইয়েস স্যার।”

“ইডিয়েট! এত দেরি লাগে কেন আসতে? আমার ভাই তো মরে যাবে।”
জাভেদও শব্দ করে কান্না করে দিল। নিজের অন্নদাতা বড় ভাইকে এমন রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে তার।
সিকদারদের বংশ মর্যাদা, সিকদারের অহংকার, তাদের গৌরব, তাদের রক্ত আজ ধুলোবালিতে মিশে যাচ্ছে।
চারিদিকে লাশের স্তূপ আর বারুদের গন্ধ। ইমার্জেন্সি সাইরেন বাজিয়ে ঝড়ের বেগে এসে থামল সাদা অ্যাম্বুলেন্সটা। শুদ্ধর সাদা শার্ট রক্তে ভিজে একদম জবজবে। সে পাগলের মতো চিৎকার করছে —
“স্ট্রেচার আনো! জলদি!”

প্রণয় কে এক সেকেন্ডের জন্য ও ছাড়ছে না শুদ্ধ। উন্মাদনা তার বেড়েই চলেছে। ভয় একটাই — যদি বেইমানি করে, ছেড়ে দিলে যদি আর ফিরে না আসে। প্রণয়ের নিথর শরীরটা তুলতে বেগ পেতে হচ্ছে চারজনকে। শুদ্ধ র মনে হচ্ছে সে কোন মানুষ নয়, এক ধসে পড়া পাহাড়ের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছে।
অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর প্রণয়ের মাথাটা নিজের কোলের ওপর টেনে নিল শুদ্ধ। বরফের মতো ঠান্ডা হাতটা নিজের দুহাতের তালুতে ঘষতে ঘষতে পাগলের মতো বলতে লাগল —
“আমার সাথে বেইমানি করিস না। আর একটু ভাই, আর একটু সময় দে আমাদের। তোর জানের কসম, ফাঁকি দিস না। ও তোর পথ চেয়ে বসে আছে।
তুই না কথা দিয়েছিস ওর কাছে ফিরবি?
নিজের পায়ে হেঁটে ফির ভাই, যেভাবে গেছিলি। সাদা কাফনে মুড়ে লাশ হয়ে ফিরিস না, মেয়েটা সহ্য করতে পারবে না!”

প্রতাপশালী শরীরটা আজ নিস্তেজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে পড়ে আছে। ঘণ্টা খানেক আগেও যে মানুষটা হাসছিল, কথা বলছিল, সেই মানুষটাই এখন দেখতে দেখতে মিলিয়ে যাচ্ছে।
শুদ্ধ নিজে ও একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার হয়ে আজ ছেলেমানুষী করছে। মেডিকেল সাইন্স এর এত এত বই পড়া সত্বেও আজ মেডিকেলের স্পষ্ট সাইনগুলো মেনে নিতে সে মোটেও রাজি নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ঊর্ধ্বে গিয়ে সেও আজ আধ্যাত্মিক কিছু একটার উপর বিশ্বাস বেঁধে রেখেছে।
ড্রাইভার সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে দিয়েছে। রাস্তার দুপাশে ল্যাম্পপোস্টগুলো তীরের মতো পেছনে ছুটে যাচ্ছে।
হাসপাতালে পৌঁছানো মাত্রই ট্রলি নিয়ে ওয়ার্ডবয়রা ছুটে এল। করিডোর দিয়ে ট্রলিটা যখন এগোচ্ছে, চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটা শুদ্ধর বুক চিরে কলিজায় গিয়ে আঘাত আনছে।
ওটি-র দরজার সামনে যেতেই নার্সরা শুদ্ধকে আটকে দিল।
“সরি স্যার, ভেতরে ঢোকা নিষেধ।”

চেঁচিয়ে পুরো করিডোর মাথায় তুলে ফেললো শুদ্ধ। তার শব্দচয়নের তীব্রতা আর পাগলামির গতি দেখে নার্সরা আর বাধা দেওয়ার সাহস করল না।
ডাক্তার চিন্তিত, দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত। অনেক খুঁজেও পালস পাচ্ছেন না তিনি, নিঃশ্বাস তো আর পড়ছেই না। হাত-পা সহহ শরীরের প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বরফের ন্যায় ঠান্ডা। ডাক্তার শুদ্ধর দিকে নিরাশ চোখে তাকাতেই চেঁচিয়ে উঠল শুদ্ধ। ক্ষ্যাপা সিংহের ন্যায় তেড়ে গিয়ে বলল —
“একদম উল্টোপাল্টা কথা বলার চেষ্টা ও করবেন না। ওর কিছু হতেই পারে না। আমার ভাইয়ের কিছু হতেই পারে নাহ্!”
ডক্টর বুঝানোর ভঙ্গিতে বললেন —

“ডাক্তার চৌধুরী, নিজেকে সামলান। মনকে শক্ত করুন, আপনি তো সব দেখতেই পাচ্ছেন।”
কথাটা শোনা মাত্রই আরও বেশি উগ্র হয়ে উঠলো শুদ্ধ —
“ওয়াট দ্য ফাক! মনকে শক্ত করব মানেটা কি? আপনি কী বলতে চাচ্ছেন, আমার ভাই মরে গেছে?
আপনার কতো বড় কলিজা, আপনি আমার ভাই কে মৃত বলছেন! জীবিত মানুষকে খুন করার ব্যবসা খুলে বসেছেন নাকি? একবার আমার ভাই ঠিক হতেদিন, আমি ও দেখব আপনারা কিভাবে এখানে হসপিটাল চালান!”
“ডাক্তার চৌধুরী—”
“জাস্ট শাট আপ! দ্রুত ইলেকট্রিক শক দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।”
ডাক্তার ভয় পেয়ে গেলেন। দ্রুত নার্সকে ডেকে বললেন —
“সিস্টার—”

ওটির নীলচে আলোর নিচে প্রণয়ের পেশীবহুল বিশাল দেহটাকে বড্ড অসহায় দেখাচ্ছে। সার্জিক্যাল লাইটের অতিরিক্ত আলোয় জ্বলজ্বল করছে নিষ্পাপ একখানা মুখ। বুকের বাঁ পাশে পর পর চারটা গর্ত, গুলি এখনো বিধে আছে বুকের গভীরে।
চারপাশের পরিবেশটা যান্ত্রিক শব্দে ভারী হয়ে উঠেছে। কার্ডিও মনিটরে পর পর তিনটা দীর্ঘ সরলরেখা স্থির হয়ে আছে, যার অর্থ — হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ।
ডক্টর ঘামছেন। এই পেশেন্ট হয়তো মৃত্যুর খুব সন্নিকটে, কিংবা মৃত। কিন্তু তবুও তিনি শেষ চেষ্টাটা করতে চান। তিনি হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে চিৎকার করে নার্সকে বললেন —
“ডেফিব্রিলেটর চার্জ করো! দ্রুত!”

যান্ত্রিক ঘড়ঘড় শব্দে মেশিনটা চার্জ হতে শুরু করল। ডক্টর ইস্তিরির মতো দেখতে দুটো প্যাডেল হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলেন প্রণয়ের দিকে। উনার চোখ দুটো বারবার ঘুরে ফিরে যাচ্ছে প্রণয়ের মুখের উপর। পেশাদারিত্বের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে উনার ৫০ বছরের সুদীর্ঘ ক্যারিয়ার জীবনের। অনেক তো পেশেন্ট দেখেছেন তিনি, তবে এতটা নিখুঁত চেহারার কাউকে তিনি দেখেননি। ভীষণ মায়া লাগে। চেহারার গড়নে এমন কিছু তো একটা আছে, যা খুব আকর্ষণীয়।
ডক্টর আর মুখের দিকে তাকালেন না প্রণয়ের।

“চার্জ টু ২০০ জুলস… ক্লিয়ার!”
শব্দটা শেষ হতে না হতেই প্যাডেল দুটো প্রণয়ের রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত বুকের ওপর সজোরে চেপে ধরলেন ডক্টর। সাথে সাথে এক মুহূর্তের জন্য প্রণয়ের নিথর দেহটা প্রবাহিত তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গের চাপে কেঁপে উঠল প্রচণ্ডভাবে। বিছানা থেকে দেহটা কয়েক ইঞ্চি ওপরে উঠে আবার আছড়ে পড়ল।
ডক্টর প্রচণ্ড আশা নিয়ে তাকালেন কার্ডিও মনিটরের দিকে। কিন্তু না! একই সেই সরল রেখার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটল না। হার্ট রেট জিরো, ব্লাড প্রেসার জিরো। সবকিছু জিরোর কোঠায়। এই রোগী মৃত ছাড়া আর কী!
বাইরে থেকে শুদ্ধর বুকফাঁটা আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে এখনো —
“ভাই! তুই কথার খেলাপ করিস না, ফিরে আয় ভাই!”
ডক্টর অধৈর্য হয়ে দাঁতে দাঁত চাপলেন, আবার বললেন —
“হচ্ছে না! হচ্ছে না! চার্জ টু ৩৬০ জুলস! নাও, হারি আপ!”

পর পর আরও দুবার সেই তীব্র শক। প্রণয়ের শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল আবার। ঠিক সেই মুহূর্তে ওটির জানলার বাইরে থেকে ভোরের প্রথম আলোটা ফুটতে দেখা গেল। চারদিকের মসজিদগুলো থেকে একযোগে শুরু হলো ফজরের আজান, ভারী বাতাসে মিলেমিশে যাচ্ছে সেই সুমধুর আজানের রেশটুকু।
ডক্টর নিজের শেষ প্রচেষ্টাতেও নিরাশ হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দৃষ্টিপাত করলেন নিথর শরীরটার দিকে। হৃদপিণ্ড চিরতরে থমকে গেছে — মৃত সে, আর কোনো সন্দেহ নেই। সাদা চাদরটা দিয়ে মুখ ঢেকে দিলেন ডক্টর।
হতাশা নিয়ে পেছন ঘুরতেই যাবেন, ঠিক তখনই নিস্তব্ধ ঘরে শোনা গেল সঞ্জীবনই শব্দ —
“বিপ… বিপ…”

শব্দটা শুনে বিস্ময়ে থ হয়ে গেলেন ডক্টর। পিছনে তাকিয়ে আরো বেশি আশ্চর্য হলেন।
মনিটরের সেই সোজা রেখাগুলোতে বিবর্তন এসেছে হঠাৎ করেই। লাইন গুলো ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো লাফিয়ে উঠছে। পালস রেট, হার্ট রেট, ব্লাড প্রেসার — সবকিছুর সংখ্যা এক দুই করে দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। থমকে যাওয়া হৃদপিণ্ডটা যেন হঠাৎ করে সচল হয়ে উঠেছে কোন এক জাদু বলে।
ডক্টর বিস্ময়ে হতভম্ব বলে উঠলেন —
“oh my god how is can’t possible! He is back!”

তৎক্ষণাৎ প্রণয়ের বা হাতের তর্জনীটা কাঁপলো বোধহয় সামান্য।
তার থেকে হাজার মাইল দূরে নিজের ঘরে, ঘামে ভেজা শরীরে প্রিয়তা পড়ে আছে সেজদায়। জায়নামাজে মাথা ঠেকিয়ে ডুকরে কাঁদছে। তার ভেতরটা কাতরাচ্ছে অসহ্য যন্ত্রণায়, কন্ঠে কাতরতা।
কথাগুলো অস্পষ্ট, ভাঙ্গা ভাঙ্গা। তবুও যতোটুকু বুঝা যায়, প্রিয়তা দুই হাত তুলে মোনাজাতে বলছে —
“তাকে সহি সালামত আমার কাছে ফিরিয়ে দাও মাবুদ। আমার ভালোবাসাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। তুমি তো জানো কতো পরীক্ষার পর তাকে আমি পেয়েছি — না না তোমার করুণায় পেয়েছি! এটা কেমন স্বপ্ন ছিলো, এটা কী দেখালে মাবুদ? আমার কলিজায় যে এতো জুর নেই?”
চোখ বুঝতেই গড়গড় করে অশ্রু গড়িয়ে নামলো প্রিয়তার গাল বেয়ে। চোখের সামনে নিষ্ঠুরভাবে ভেসে উঠলো আবারো সেই স্বপ্নটা —
সাদা কাফনে মুড়ানো বাঁশের খাটিয়ায় শুইয়ে রাখা নিজের প্রাণপ্রিয় পুরুষটাকে দেখতেই।
আবারো চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালো প্রিয়তা।

সকাল ৬ টা। শিকদার বাড়ির গার্ডেন এরিয়া তীব্র উৎকন্ঠা নিয়ে পায়চারি করছে প্রিয়তা।
দুদন্ড কোথায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না, আঙুলের মাথা ওড়না পেচাতে পেচাতে এদিক থেকে ওদিকে ছুটে যাচ্ছে। মূলত সে অপেক্ষা করছে তার প্রণয় ভাইয়ের।
শীত অনেকটাই কম, ঠান্ডা এখন আর হাড়ের ভেতর অবধি পৌঁছায় না।
গায়ে পাতলা একটা সাদা কামিজ প্রিয়তার, মাথায় সাদা ওড়না।
পায়ে চটি নেই, নগ্ন পায়ে কদম ফেলে হাঁটছে কচি ঘাসের উপর।
নামাজ সেরেই এখানে চলে এসেছে প্রিয়তা, তার প্রণয় ভাই কাল রাতে বলেছে যে সে আসছে, তারমানে যখন তখন আসলো বলে।

প্রিয় মানুষটাকে আবার ফিরে পাওয়ার আনন্দ, কাছে পাওয়ার উত্তেজনা, নিঃশ্বাস নিতে ও কষ্ট হচ্ছে প্রিয়তার।
শিশির ভেজা স্নিগ্ধ পরিবেশ, মিষ্টি সকালটা ভরে উঠেছে জানা অজানা পাখির কলকাকলিতে।
তার দৃষ্টি গেট পেরিয়ে সামনের রাস্তায় — হিসেব অনুযায়ী এতক্ষণে তো চলে আসার কথা।
অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকাচ্ছে বারবার।
অনেকক্ষণ যাবৎ অপেক্ষা করতে করতে আর ধৈর্য ধরতে পারছে না প্রিয়তা। ভেতরটা মরে যাচ্ছে অস্থিরতায়। অবুঝ মনটা শুধু বায়না ধরছে, শুধু চাইছে — প্রণয় ভাই কখন আসবে আর কখন তাকে জড়িয়ে নেবে বুকে, কখন সে উষ্ণ ক্লান্ত বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, নাক ঘষবে, উষ্ণ আলিঙ্গনে দূর করবে সব যাতনা।

প্রিয়তা ভাবতে ভাবতেই দেখলো একটা কালো রঙের গাড়ি ঢুকছে শিকদার বাড়ির গেট দিয়ে।
গাড়িটা দেখা মাত্র হৃৎপিণ্ড ছলাৎ করে উঠলো প্রিয়তার, ঠোঁটে ফুটে উঠলো ঝলমলে হাসি।
উল্লাস করার সময় পেলো না সে, ছুটে গেলো। তবে গাড়িটার কাছে আসতে আসতে মুখের হাসিটুকু মলিন গেলো প্রিয়তার, বদলে সেথায় জায়গা করে নিলো শরতের এক টুকরো কালো মেঘ।
গাড়ি থেকে নেমে এলো দুটো গার্ড। প্রিয়তার চোখের দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু করলো।
অনন্য ভঙ্গিতে সম্মান প্রদর্শন করে একটা বক্স এগিয়ে দিলো প্রিয়তার দিকে, নিচু স্বরে বলল—
“গুড মর্নিং ম্যাম, স্যার আপনার জন্য এটা পাঠিয়েছেন।”
প্রিয়তা অবাক নয়নে তাকালো বক্সটার দিকে, তবে বিন্দু মাত্র আগ্রহ দেখালো না সেটার প্রতি। তীব্র অধৈর্য হয়ে বললো—

“উনি কোথায়? আমার প্রণয় ভাই কোথায়?”
গার্ড দুটো আড়ষ্ট হল, মাথা নিচু হয়ে এলো আরো খানিকটা। বসের ওয়াইফের সাথে মিথ্যে বলতে গলা কাঁপছে তাদের।
এদের নীরবতা দেখে প্রিয়তা অস্থির হলো। তুলনামূলক উঁচু গলায় বললো—
“কি হলো? চুপ করে আছেন কেন? বলছেন না কেনো আমার প্রণয় ভাই কোথায়? এটা নিয়ে তো আপনাদের আসার কথা নয়?”
গার্ড দুজনের মধ্যে একজন অত্যন্ত নরম গলায় বলল—
“সরি ম্যাম, আমরা কিছু জানি না। স্যার আমাদের এই চকলেট বক্সটা দিয়ে বললেন আপনার কাছে পৌঁছে দিতে, এর বাইরে আমরা কিছু জানি না।”
প্রিয়তার দুই চোখে পানি টলমল করে উঠলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার ফল এমন বিষিয়ে যেতে দেখে বুক ভেঙে এলো কান্নায়। ফোন বের করে দেখলো অফলাইন।
গার্ড দুটো একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বললো—
“তাহলে আমরা আসি ম্যাম।”

বলে প্রিয়তার হাতে বক্সটা ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো গার্ডস দুজন।
প্রিয়তা তাদের আর কিছু বলারই সুযোগ পেল না।
তার গাল গড়িয়ে টপ টপ করে ঝরছে তপ্ত অশ্রু।
প্রিয়তা বক্সটা খুলে দেখলো — সে যেমনটা চেয়েছিল ঠিক তেমন অনেকগুলো চকলেট।
চকলেট গুলো সরাতেই একটা চিরকুট নজরে এলো প্রিয়তার। ভাঁজ করা কাগজটা খুলতেই দেখলো গুটি কয়েক বাংলা অক্ষর, সুদক্ষ লেখনীতে লেখা—
“আমার অভিমানী কলিজা-টা,
এই নাও তোমার চকলেটের পাহাড়! খুব তো আবদার করেছিলে, এবার খুশি তো?
নাও এখন একটু মিষ্টি করে হাসো তো দেখি। তোমার মিষ্টি ঠোঁটের ওই এক চিলতে হাসিটাই তো আমার সুখ, আমার ভালো থাকার প্রেরণা। চকলেটগুলো তুমিই খাও, তবে ভালোবাসাটা কিন্তু আমার জন্যই রেখো।
ইতি — তোমার প্রণয় ভাই”

আমার ভালোবাসাকে একদম কাঁদাবে না কিন্তু।
প্রিয়তা নাক মুখ ফুলিয়ে ফুপিয়ে উঠল শব্দ করে।
এর পর কেটে গেলো আরও তিনটা দিন। পুরো ৭২ ঘণ্টা পেরোনোর পরও প্রণয় আর একবারও যোগাযোগ করেনি, তার তরফ থেকে আর কোনো কল বা মেসেজ আসেনি। কাঁদতে কাঁদতে অনিদ্রা আর অনাহারে প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে প্রিয়তা।
প্রণয় যতই দূরে থাকুক আর যতই সমস্যা থাকুক, প্রিয়তার উপরে কিছু নয়, সে কখনোই এভাবে কিছু না বলে হারিয়ে যায় না। দিনের কোনো না কোনো সময় ঠিকই ফোন করে, কণ্ঠে অনেকটা তৃষ্ণা নিয়ে বলে—
“ভালোবাসি রক্তজবা।”
অথচ আজ তিনটা দিন হলো — দেখা তো দূরে থাক, তার কণ্ঠটাও শুনতে পায়নি প্রিয়তা। অথচ পাষাণ মানুষটা সেই দিন আগে বলেছিল — এক্ষুনি আসছি জান।

প্রিয়তার সবকিছু বিষ লাগে, সে আর একটু ও বাড়িতে থাকতে পারে না। পাগলের মতো ছুটে যায় প্রণয়ের অফিসে, কিন্তু ওখানে কেউ কিছুই বলতে পারে না, চিনে না, বিদায় পাত্তা ও দেয় না প্রিয়তা কে।
প্রণয়ের অফিসের বারান্দায় বসে বাচ্চাদের মতো বিলাপ করছে প্রিয়তা, ডুকরে উঠছে মাঝে মধ্যে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলিয়ে অবস্থার নাজেহাল করে ফেলেছে। ফর্সা মুখটা দেখাচ্ছে লাল টুকটুকে।
গেটের পাহারারত মধ্যবয়স্ক সিকিউরিটি গার্ড অনেকক্ষণ যাবত দেখছেন একটা মেয়ে বসে বসে কাঁদছে। এমন ফুলের মতো মেয়েকে কাঁদতে দেখলে যে কারোরই মন ব্যতীত হবে, মায়া লাগবে।

ওনারও তাই হল। তিনি আর ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না, এগিয়ে গেলেন মেয়েটার নিকট।
মেয়েটাকে কাছ থেকে দেখে বুঝলেন ভীষণ অল্প বয়সী একটা মেয়ে, হবে হয়তো উনার মেয়ের সমবয়সী। এত ছোট একটা মেয়েকে এখানে বসে এভাবে কাঁদতে দেখে তিনি ভীষণ অবাক হলেন। মেয়েটাকে দেখতে শুনতেও তো গরীব মনে হচ্ছে না, তাহলে এভাবে কাঁদছেই বা কেন? দেখে তো বেশ ভালোই বড় ঘরের মেয়ে বলে মনে হচ্ছে।
ভীষণ অবাক হলেন তিনি। ডাকবেন কি ডাকবেন না দনা মনা করতে করতে অবশেষে ডেকেই বসলেন—
“আম্মা, আপনি কে? এখানে বসে কাঁদছেন কেন?”
অপরিচিত কারো কন্ঠ শুনে গুঠিয়ে গেল প্রিয়তা। রক্তিম নীলাভ চোখ দুটো তুলে তাকালো উনার দিকে।
মেয়েটার চোখের রং দেখে ঘাবড়ে গেলেন তিনি। চোখ দুটো এত পরিমাণ লাল যে মনে হচ্ছে বন্ধ করলেই তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়বে।

উনি বুঝলেন ব্যাপারটা গুরুতর। তিনি আর দাঁড়ালেন না, ফটাফট বসে পড়লেন প্রিয়তার পাশে। সন্তান স্নেহে মাথায় হাত রাখলেন, অতি আদুরে গলায় বললেন—
“আহা কেঁদো না মা, পুতুলের মত মুখখানা তো কাঁদতে কাঁদতে শেষ করে দিয়েছো। তুমি কি চাকরির জন্য এসেছো? তোমার কি চাকরি হয়নি? সেজন্যই কি কাঁদছো? আসলে মা কি বলতো, এই কোম্পানিতে চাকরি পেতে হলে অনেক অনেক পড়তে হয়। কিন্তু তোমাকে তো ছোট বলে মনে হচ্ছে, কেঁদো না মা কেঁদোনা।”
উনার আদুরে প্রশ্রয় পেয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠলো প্রিয়তা। গুনগুনিয়ে করা কান্না এখন শব্দে রূপান্তরিত হচ্ছে।
মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক মুশকিলে পড়ে গেলেন। মেয়েটাকে এভাবে ফেলেও যেতে পারছেন না, বড্ড মায়া লাগছে।
তিনি প্রিয়তার মাথায় হাত রেখে আবার বললেন—
“আচ্ছা মা, তুমি কেঁদো না। আমি এই কোম্পানির ম্যানেজার মানে স্যারের পি এ-র সাথে কথা বলে তোমাকে একটা চাকরি পাইয়ে দেবো না?”

প্রিয়তা দুই পাশে মাথা নাড়লো। এতক্ষণে মুখ খুললো, হেঁচকি তুলতে তুলতে বললো—
“আমার চাকরি লাগবে না চাচা, আমার প্রণয় ভাইকে লাগবে।”
মেয়েটার কথা শুনে কিঞ্চিৎ ভরকালেন ভদ্রলোক। মেয়েটা চাকরির জন্য আসেনি, নামটা কী যেনো নিলো।
তিনি বিষয়টা ভালোমতো বুঝতে বললেন—
“আম্মা বুঝলাম না, তুমি চাকরির জন্য আসোনি?”
প্রিয়তা আবারো দুই পাশে মাথা নাড়ালো।
“তাহলে কেন এসেছো?”

ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো প্রিয়তা। থেমে থেমে ক্রন্দনরত কণ্ঠে বললো—
“প্রণয় ভাইয়ের জন্য এসেছি।”
মুখ হা হয়ে গেলো ভদ্রলোকের। তিনি বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইলেন—
“তুমি স্যারের বোন?”
প্রিয়তা আবারো দুই পাশে মাথা নাড়ালো।
“তাহলে?”
“আমি উনার স্ত্রী।”
মুহূর্তেই লোকটির চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছায়া নামল। সর্বপ্রথম মুখ থেকে বেরিয়ে এলো — প্রণয় শিকদার বিবাহিত!
অতঃপর চোখ বড় বড় করে তাকালেন মেয়েটার দিকে। ছোট্ট খাট্ট বাচ্চা একটা মেয়ে, হয়তো ওনার মেয়ের থেকেও এক দুই বছর ছোট হবে — এই মেয়েটা নিজেকে প্রণয় সিকদারের স্ত্রী দাবি করছে।
এই বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি প্রণয় সিকদারের স্ত্রী ভাবা যায়? এটা যেন বিশ্বাস করতে কোথাও একটা কষ্ট হল উনার, তবে মেয়েটার চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে না সে মিথ্যে বলছে।
আবার মনে হলো হতে ও পারে। আবরার শিকদার প্রণয় তার ব্যক্তি জীবন সম্পূর্ণ প্রাইভেট রাখেন, তা কখনোই জনসাধারণের সামনে আসে না, মিডিয়ার ল্যামলাইট কাড়াতে পারে না। তাই তার স্ত্রী বা পরিবার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা ও যায় নাহ্।
তিনি নিজেকে স্বাভাবিক করে প্রিয়তার উদ্দেশ্যে বললেন,
“স্যার এর জন্য কাঁদছো কেন মা?”
প্রিয়তা দুই হাতে মুখ চেপে ধরল। ফুপাতে ফুপাতে বলল—
“উনি উনি ৪ দিন আগে ফিরে আসবেন বলে এখনো ফিরেননি চাচা। আমি উনার কোনো খবর জানি না, এটাও জানি না উনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন। এখানে সবাইকে কত করে জিজ্ঞাসা করলাম, সিকিউরিটিভ ভেতরেই যেতে দিল না।”

বলতে বলতে ডুকরে উঠলো প্রিয়তা। নোনা জলের স্রোতে গাল, গলা, বুক ভেসে যাচ্ছে।
রহমত মিয়ার মায়া হয় মেয়েটার উপর। সিকিউরিটি চিনতে পারেনি তাই হয়তো ভেতরে যেতে দেয়নি। তবে প্রণয় শিকদারের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না শুনে ভ্রু কিছুটা কুচকালো ওনার।
আজ কমদিন তো চেনেন না তাকে। প্রায় ১২ বছর হতে যায় এই কোম্পানিতে চাকরি করছেন। এই কোম্পানির একদম শুরুর সময় থেকে আছেন, তাই আবরার শিকদার প্রণয় সম্বন্ধে বিস্তার না হোক অল্প কিছু ধারণা তো আছেই।
মেয়েটার কান্না সহ্য হচ্ছে না উনার। উনি মালিক এর বউ শুনে ভয় পেয়ে সরে গেলেন না, বরং প্রিয়তার মাথায় হাত রেখে আগের মতোই স্নেহ সুলভ কণ্ঠে বললো—
“তুই একটু চুপ কর মা, দুই মিনিট শব্দ করিস না।”
প্রিয়তা ফ্যালফ্যাল করে তাকালো।
রহমত মিয়া নিজের বাটন ফোনটা বের করে কল লাগালেন ম্যানেজার তথাপি আবরার শিকদার প্রণয় এর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট জাভেদ এর নাম্বারে।

বেশ কয়েক বার রিং হওয়ার পরে ও অপর পক্ষ থেকে কোন জবাব এলো না। ফোন ধরলো না জাভেদ।
তৃতীয় বার, চতুর্থ বার, পঞ্চম বারের বেলায় গিয়ে ফোন রিসিভ হলো।
জাভেদ ব্যস্ত কণ্ঠে তাড়া দিয়ে বললো—
“জ্বী চাচা বলেন।”
রহমত আলী একবার প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললেন—
“স্যার কোথায়?”
জাভেদ চুপ করে রইলো।
চোখ বড় বড় করে ফোনের দিকে তাকালো প্রিয়তা। উত্তেজনা দমিয়ে অধৈর্য চিত্তে জবাবের অপেক্ষা করতে লাগলো। কাঙ্খিত ব্যক্তির সম্বন্ধে জানার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো কান দুটো।
রহমত মিয়া ফের বললেন—

“কন বাজান, স্যার কোথায়?”
জাভেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো—
“ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল হসপিটালে।”
জবাবটা শোনা মাত্রই বুকের ভেতর ধক করে উঠলো প্রিয়তার। কথা বলার জন্য উদ্যত হতেই রহমত আলী ইশারায় শব্দ করতে বারণ করলেন।
কন্ঠে চিন্তার রেশ টেনে বললেন—
“হসপিটাল কেন বাজান? স্যার এর কি কিছু হইছে?”
জাভেদ কিছু বলতেই যাচ্ছিল, তার পূর্বে পাশ থেকে ডক্টরের কথা শোনা গেল—

“দীর্ঘ ৭৫ ঘণ্টা পর আপনাদের পেশেন্ট এর সেন্স ফিরেছে, তবে আংশিক। তিনি এখনো পুরোপুরি সেন্সে আসেননি, তার জন্য আরো তিন থেকে সাত দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের আনা গেছে। বিপদ মুক্ত ইনশাল্লাহ। আল্লাহর অশেষ রহমতে এই যাত্রায় উনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন। চারটা বুলেট এর চারটাই উনার হার্টে লেগেছিল, তাও এক সাইডে। হার্ট সম্পূর্ণ থেমে গিয়েছিলো। তাই এই নিয়ে দ্বিতীয় বার উনার হার্ট পাল্টাতে হলো। মনে রাখবেন, হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট একটা অত্যন্ত জটিল সার্জারি। ঘন্টার পর ঘন্টা সময় লাগে, বারবার করা যায় না। এবার হার্টের বিশেষ খেয়াল রাখবেন, নাহলে তৃতীয় বার আর আরম্ভ হবে নাহ্। তবে বলতেই হবে উনার হায়াত আছে, আল্লাহর রহমত আছে। নাহলে আমরা তো উনাকে মৃত ঘোষণা করে দিয়েছিলাম। কিভাবে এই অসাধ্য সাধন হলো, কেবল আল্লাহই ভালো জানে। এই নিন আপনাদের বিল। আর পেশেন্ট এর নামটা কি যেন?”
“আবরার শিকদার প্রণয়।”

“ওকে, বিল আর এই মেডিসিনগুলো কাউন্টার এ জমা করে দিন।”
ডাক্তারের কথাগুলো শেষ হতেই কল কেটে দিলেন রহমত আলী। অজান্তে উনারও চোখের কোণ ভরে উঠেছে। তিনি ব্যথাতুর চোখে তাকালেন প্রিয়তার দিকে।
মেয়েটা একদম নিষ্প্রাণ পাথরের মূর্তি হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। যেন কোনো শব্দ, কোনো বাক্য তার কান অবধি পৌঁছায়ই নি।
রহমত আলী চিন্তিত হয়ে বললেন—
“আম্মাজান, আপনি ঠিক আছেন—”
রহমত আলী কথা শেষ করতে পারলেন না। উনার চোখের সামনেই বসা অবস্থায় ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লো প্রিয়তা।
অতিরিক্ত শক পেয়ে মেয়েটাকে জ্ঞান হারিয়েছে। মেয়েটাকে এভাবে অজ্ঞান হতে দেখে প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেলেন রহমত আলী।
প্রিয়তার গালে আলতো চাপড় দিতে দিতে ভয়ার্ত কণ্ঠে ডাকলেন—

“আম্মা, আম্মা।”
সাড়া দিল না প্রিয়তা।
বহু চেষ্টার পর অবশেষে জ্ঞান যখন ফিরল তখন তাকে সামলানোই হয়ে পড়ল বিরাট এক রণযোগ্য।
জ্ঞান ফেরা মাত্রই কোন দিকে না তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলো প্রিয়তা। তার আর্তনাদের শব্দে দাঁড়িয়ে অবস্থায় কেঁপে উঠলো উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ।
প্রিয়তা কারো তোয়াক্কাই করলো না।
রহমত আলী প্রিয়তার পাশে বসে নরম গলায় বললেন—
“আপনার বাসার মানুষকে কি খবর দেই, আম্মাজান? আপনি কাঁদবেন না দয়া করে।”
অফিস ভর্তি স্টাফ—তাদের চোখে অবিশ্বাস। তারা প্রত্যেকেই বিস্মিত, হতম্ভম্ব। সকলে চোয়াল ঝুলিয়ে হা করে তাকিয়ে আছেন ছোট্ট খাট্ট গড়নের পুতুলের মতো মেয়েটার দিকে। তাদের হয়তো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে—এটা তাদের বসের ওয়াইফ।

আবরার শিকদার প্রণয় এমন একজন ব্যক্তি যার ইমোশন দেখতে পাওয়া তো দূরের কথা, তার চেহারার ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হতেই খুব কম মানুষ দেখেছে। সেখানে তার বউ এভাবে ঘর ভর্তি মানুষের সামনে গলা ফাটিয়ে কাঁদছে।
এই মেয়ের ম্যাচিউরিটি লেভেল বলছে এই মেয়ের নাক টিপলে ও হয়তো দুধ বেরোবে। এত চাইল্ডিস বিহেভিয়ার এতো ছোট মেয়েকে তাদের বস বিয়ে করেছে—কেমনে বিশ্বাসযোগ্য এটা!
এতো বড় এজ গ্যাপ—না না, এটা তো রীতিমতো জেনারেশন গ্যাপ।
তাদের আশাহত হওয়ার কারণটা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। কারণ কল্পনায় তাদের বসের স্ত্রী ছিল তাদের বসের মতোই পারফেক্ট সর্বগুণ সম্পন্ন এক পরিণত নারী। আর বাস্তবে বেরোলো তার সম্পূর্ণ বিপরীত—এই মেয়ের বেবী ফেস আর বেবি স্কিন এখনো স্পষ্ট।

বয়স কত হবে—১৬‑১৭ নাকি ১৮‑১৯, নাকি তার থেকে একটু কম, নাকি একটু বেশি—সঠিক ধরা যায় না।
প্রিয়তার অবস্থা বেগতিক দেখে চিন্তিত হলেন সকলে। ভয়ও পেলেন অনেকটা। এসব ঘটনা জানতে পারলে বস কি তাদের আস্ত রাখবে!
সময় এর সাথে সাথে প্রিয়তার চিৎকার, চেঁচামেচি, আর্তনাদ, বিলাপ—কোনোটাই থামছে না বরং বাড়ছে তা চক্রবৃদ্ধি হারে। ইতিমধ্যে জ্ঞান হারিয়েছে আরো তিনবার।
ভীতিগ্রস্ত জনগণের মধ্যে কে যেন শিকদার বাড়িতে ফোন করেছে।
তার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ঝড়ের বেগে এসে হাজির হলো প্রেম।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে ডাকলো—

“বোনু!”
বারান্দার এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুজে বাচ্চাদের মতো শব্দ করে বিলাপ করছে প্রিয়তা। তার ঘন কালো চুলের রাশি অযত্নে অনাদরে লুটিয়ে পড়ছে ধুলোবালি মাখানো মেঝেতে।
বোনের বিমর্ষ, বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আর্তনাদ করে উঠলো প্রেম। ছুটে গেলো প্রিয়তার কাছে। হাঁটু গেড়ে বসলো বোনের পাশে।
তাদের এই জীবন্ত পুতুলটা তার ভাইয়ের কত যত্নের, কতো আদরের, প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়। সেই পুতুলটা নাকি এই নোংরা ধুলো বালিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে!
আহ্ ভাই তুই কোথায় এই দৃশ্য কলিজায় সয় না।
বোনের বুকফাটা আর্তনাদ দেখে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না প্রেম। বোনের মাথায় হাত রাখতেই অশ্রুসিক্ত জ্বলজ্বলে চোখে ভাইয়ের দিকে তাকালো প্রিয়তা।
প্রেম কিছু বলার পূর্বেই ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে। ভাইকে জাপ্টে ধরে পাগলের মত বলতে লাগলো—
“আমি মরে যাবো ভাইয়া। আমার প্রণয় ভাইয়ের এতটুকু ও কিছু হলে আমি মরে যাবো। তোমার ভাইয়ের এই নিষ্ঠুরতা আমায় শেষ করে দেবে। সে কিভাবে পারলো আমাকে একা রেখে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে? সে কী জানে না তাকে ছাড়া তার রক্তজবা ঝরে যাবে।”

প্রেম বোনকে বুকে চেপে ধরল। মিছে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল—
“বোনু, বোনু, শান্ত হ প্লিজ কলিজা একটু শান্ত হয়ে যা।”
প্রিয়তা আরো জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো—
“আমার বুকটা পুড়ে যাচ্ছে ভাইয়া। আমার কলিজাটা ছিড়ে যাচ্ছে। আমার প্রণয় ভাই মৃত্যুর সাথে লড়ছে তাহলে তোমরা আমাকে কেনো বাঁচিয়ে রেখেছো? আমার প্রণয় ভাইয়ের বুকে ৪ টা গুলি লেগেছে তাহলে আমার বুকটা কেনো অক্ষত? আমার প্রণয় ভাইয়ের নাকি গুলি লেগেছে— আমার জান কি বেঁচে আছে ভাইয়া? আমার কলিজা কি বেঁচে আছে? তার কিছু হলে আমার জন্য আলাদা করে কবর খুঁড়ো না ভাইয়া। আমাকে ও আমার প্রণয় ভাইয়ের বুকে শুইয়ে দাফন করে দিও। সাথে কবরের উপর খোদাই করে লিখে দিয়ো তারা একে অপরকে ছাড়া বাঁচতে পারবেনা,তাই তারা মৃত্যুর পরে ও একসাথে।”

প্রেম নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। বোনকে ঝাপটে ধরলো শক্ত করে।
এই খবরটা তারা তিন দিন আগেই পেয়েছে। শিকদার বাড়ির সকল পুরুষ সদস্যই এই বিষয়ে অবগত, কেবল জানে না প্রিয়তা। ইচ্ছে করেই জানানো হয়নি তাকে।
এই খবর শুনলে তাকে সামলানো যাবে না, পাগলামি করবে, চিৎকার চেঁচামিচ করবে—বলে জানানো হয়নি তাকে। না জেনেই মেয়েটা এই তিনদিন যে উন্মাদনা দেখিয়েছে আর যে পাগলামিটা করেছে!
প্রিয়তা কাঁদতে কাঁদতে বলল—

“আমাকে আমার জানের কাছে নিয়ে চলো ভাইয়া। আমাকে আমার প্রণয় ভাইয়ের কাছে নিয়ে চলো। তোমার বুকে আমি শান্তি পাচ্ছিনা। আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমি আমার প্রণয় ভাইয়ের বুকে যাবো। বিশ্বাস করো আমার নিঃশ্বাসটা গলার কাছে এসে আটকে আসছে। মনে হয় মারা যাচ্ছি। বুকে খুব কষ্ট হচ্ছে ভাইয়া। জানো ভাইয়া, ওরা আমার প্রণয় ভাইকে গুলি করেছে, আমার জানকে গুলি করেছে। ওরা তো গুলিটা আমার বুকে ও চালাতে পারতো বলো। ওরা কেন আমার প্রণয় ভাইকেই বেছে নিলো কেনো তাকে এতো নির্দয় ভাবে আঘাত করলো? কেন এতো কষ্ট দিলো? আমার জানটা না জানি কত ব্যাথা পেয়েছে!”

এসব পাগলামি আর সহ্য হচ্ছে না প্রেমের। অসহায় কণ্ঠে বললো—
“শান্ত হয়ে যা বোন, তুমি এমন পাগলামি করিস না। ভাইয়ার জ্ঞান ফিরেছে। ভাইয়া একদম ঠিক আছে। ফিরে আসবে তো তোর কাছে। শান্ত হয়ে যা লক্ষ্মীটি।”
ক্ষেপে গেল প্রিয়তা। মেজাজ হারিয়ে বললো—
“তুমি আমায় নিয়ে যাবে না তো বেশ, যেতে হবে না। আমি বুঝে গেছি তোমরা সবাই খারাপ। তোমরা কেউ চাও না আমি আমার প্রণয় ভাইয়ের কাছে যাই। আচ্ছা, আমার কাউকে লাগবে না। আমি একাই যাবো।”
হঠাৎ প্রিয়তাকে উগ্র হয়ে উঠছে দেখে ভয় পেয়ে গেল উপস্থিত জনগণ। প্রিয়তা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো প্রেমকে, উঠে দাঁড়ালো।

কেউ কিছু বোঝার আগেই এক ছুটে গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেলো।
এহেন কাণ্ডে বোকা বনে দাড়িয়ে রইলো সকলে। গেটের বাহিরে ব্যস্ত সড়ক—প্রতি সেকেন্ডে শত শত যানবাহন ছুটে যাচ্ছে।
ভয়ে হৃদপিণ্ড মুচড় দিয়ে উঠলো প্রেমের। দৌড়ে পিছু নিলো প্রিয়তার।
মেইন রোডের মাঝ দিয়ে বেসামাল গতিতে, চোখ মুছতে মুছতে ছুটে যাচ্ছে প্রিয়তা অজানা গন্তব্যে। টলমলে পা এদিক থেকে অধিক হলে সোজা গিয়ে পড়বে চাকার নিচে। আশেপাশে সামনে পিছে বড় বড় গাড়ি—তার পায়ের গতিতে সামঞ্জস্য নেই।
উল্টো দিক থেকে ছুটে আসছে দ্রুতগামী ট্রাক। হর্ন দিচ্ছে অনবরত, কিন্তু হুঁশ নেই প্রিয়তার।
অনেকটা কাছে চলে এসেছে ট্রাকটা। ধাক্কা মারতেই যাবে—তার আগেই হ্যাঁচকা টানে উল্টোদিকে ফেলে দিল কেউ।
তাল সামলাতে পারলো না প্রিয়তা। মুখ থুবড়ে পড়লো পিচ ঢালা রাস্তায়। মুহূর্তেই হাঁটু আর কনুইয়ের তুলতুলে চামড়া ছিড়ে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো।

পথচারী লোকের ঢল নামলো রাস্তায়। জটলা পাকিয়ে গেলো এক মুহূর্তে। ভিন্ন জন উঁচু নিচু বিভিন্ন কথা বলছে, কিন্তু এসবে কোনো ধ্যান নেই প্রিয়তার। সে বোকা চোখে তাকাচ্ছে সবার দিকে—যেন সে এদের কথার কিছুই বুঝতেই পারছে না।
দেখতে দেখতে আবারো জ্ঞান হারিয়ে মাঝরাস্তায় লুটিয়ে পড়লো প্রিয়তা। তার শিমুল তুলর ন্যায় দেহখানা পড়ে রইলো ধুলা মাখা রাস্তায়।
জটলা দেখে ছুটে এলো প্রেম। বোনকে আবারো জ্ঞান হারিয়ে অচেতন হতে দেখে ভেতরটা কুকিয়ে উঠলো যন্ত্রণায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রিয়তার অবচেতন শরীরটা গুটিয়ে কোলে তুলে নিলো।
বোনের বিবর্ণ মুখটার দিকে তাকিয়ে বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার।
মাঝে মাঝে এদের দেখে অবাক না হয়ে পারে না প্রেম। অনেক ভালোবাসা সে দেখেছে, অনেক ভালোবাসার উদাহরণ তাদের বাড়িতেই আছে।

কিন্তু এমন ভালোবাসা, বা এতো ভালোবাসা, এতো পাগলামি ভরা উন্মাদনা, এত আত্মত্যাগ, এত সমর্পণ, এত যন্ত্রনা—কোনো মনুষ্য জাতের মধ্যে আজ পর্যন্ত দেখেনি প্রেম।
এটা প্রেমের সাধারণ কোনো সংজ্ঞা তে পড়ে না। স্বাভাবিক কোন মানুষ এতো ভালোবাসতে পারে নাহ্!
এটা কি আদৌ কোনো ভালোবাসা? বা ভালোবাসার কোনো ক্যাটাগরিতে পড়ে?
আচ্ছা, এরা মানসিকভাবে সুস্থ আছে তো?
মাঝে মাঝে সন্দেহ জাগে প্রেমের মনে। কারণ ভালোবাসার প্রখরতা যতই তীব্র হোক—এমনটা কখনোই হয় না। সত্যি কথা হয়তো এটাই—এদের মধ্যে কোনো ভালোবাসাই নেই, যা আছে পুরোটাই এদের নেশা, এদের অবসেশন, এদের অ্যাডিকশন।

ভালোবাসাবাসীর সীমানায় এরা অনেক আগেই পেরিয়েছে। ভালোবাসা নামক তুচ্ছ একটা শব্দ দিয়ে এদের সম্পর্কের গভীরতা আর মাপা যাবে না। কারণ এখন আর এদের মধ্যে ভালোবাসা নেই, এখন এরা এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে কোন মানুষের পৌঁছানো একদম উচিত না। বাড়াবাড়ি রকমের কোন কিছুই ভালো না—এদেরটা ওই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছে।

যেখানে তীব্র মাদকাসক্ত কোনো ব্যক্তি যেমন একদিন তার প্রিয় মাদকটা ছাড়া থাকতে পারে না—তার দম বন্ধ হয়ে আসে। রক্তের সাথে নেশা না মিশাতে পারলে শরীর থাকে ভয়াবহ শাস্তি দেয়, মৃত্যুসম যন্ত্রণা দেয়। সে তখন আর মানুষ থাকে না, দিন দুনিয়া ভুলে যায়। ওই মাদকের জন্য তাকে দুনিয়া জ্বালিয়ে দিতে বললে—তাই দেবে। মারতে বললে মারবে, মরতে বললে মরবে—তবু ও মাদক তার লাগবেই।
এই আসক্তি তার জীবনের নয়, তার মরণের নেশা।
এদের অবস্থাও ঠিক তাই। এরা একে অপরের প্রাণঘাতী নেশা—যা রক্তে মিশলে সুখ দেয় আর না মিশলে মৃত্যু দেয়। বহু জন্ম পেরিয়ে যাবে তবু চাইলেও কাউকে এমন ভালোবাসা যাবে না।
কথায় আছে না—যেটা আমরা সব থেকে বেশি চাই, সেটাই সবার আগে হারাই। যত্নে গড়া জিনিসটা হারিয়ে যায়, অযত্নে বেড়ে ওঠা লতাপাতা থেকে যায় আজীবন। অতিরিক্ত ভালোবাসা সুখ বয়ে আনে না। এদের বেলায় এসে প্রচলিত প্রবাদটা প্রমাণিত হয়ে গেলো।

বাড়িতে নিয়ে গিয়ে প্রিয়তাকে বেঁধে রাখাও সম্ভব হচ্ছিল না। আজকের মতো এতটা উগ্র আচরণ প্রিয়তা তার এত বছরের জীবনকালে আর একদিনও করেনি। সে এতটাই উগ্র, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যে এমনি ছেড়ে রাখলে সে হয়তো কাউকে মেরে ফেলবে, নাহলে নিজেই মরে যাবে। নিজের না হলে অন্যের চরম ক্ষতি করে দেবে — এই ভয়ে তাকে দুই পাশ থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে আছে প্রীথম ও প্রেম। দুই জোয়ান মিলেও ছোট্ট একটা মেয়ের শক্তির সাথে পেরে উঠছে না। অমানবিক শক্তি ভর করেছে যেনো।

বোনের কান্নায় কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। প্রেম, প্রীথম, অরণ্য, সমুদ্র, রাজ — সবার, তাদের ছোট্ট বোনটার শিমুল তুলার ন্যায় নরম নরম হাত‑পায়ে শক্ত দড়ির বাঁধন দিতে তাদের বুক কাঁপছিল। এই পাশবিক কাজটা যেন তাদের দ্বারা কিছুতেই হবে না। ভাগ্যিস চার গিন্নি বাড়িতে নেই, নাহলে এতজনকে কীভাবে সামলাতো তারা।
বোনের গলাফাটানো চিৎকার সইতে সইতে দম বন্ধ হয়ে আসছে প্রীথমের। তার ছোট্ট বোনটা যেই মরণ যন্ত্রণা পাচ্ছে, এই যন্ত্রণার এক অংশ ও হতো তারা অনুভব করতে পারছে না। তার মানে তো এটা নয় যে তারা তাদের ভাই কে ভালবাসেনা, তবু ও এই মেয়েটার যন্ত্রণা এত তীব্র কেন।
প্রিয়তা নিজের সকল ইগো, রাগ, জেদ, অভিমান সব ছেড়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল প্রীতমের পা। কাঁদতে কাঁদতে শ্বাস আটকে আসছে প্রিয়তার। সে প্রীতমের পা জড়িয়ে ধরে করুন কন্ঠে আর্তনাদ করতে করতে বলছে —

“ভাইয়া, হয় তোরা আমায় মাটি দিয়ে আয়, নাহলে তোরা আমায় আমার প্রণয় ভাইয়ের কাছে নিয়ে যা। দুটো থেকে একটা কর, এখুনি কর, মুক্তি দে আমায়।
হয় আমাকে আমার জানের কাছে নিয়ে যা, নাহয় আল্লাহর নামে কুরবানী দিয়ে দে। তবু ও আমার কলিজায় একটু শান্তি দে!”
প্রিয়তার অবস্থা দেখে মাথা ঘুরছে প্রিয়স্মিতার। সকল ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে নিমিষেই। প্রণয় এখনো মরেনি তাতেই এমন করছে, আর যদি সত্যি সত্যি মরে যেত!
প্রিয়স্মিতা ভাবনা সমাপ্ত করতে পারল না। দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রীথম হাত ধরে টেনে তুলল প্রিয়তাকে। এলোমেলো চুল, রক্তবর্ণ চোখ আর ফর্সা মেয়েটা সম্পূর্ণ লাল হয়ে গেছে, কেবল কাঁদতে কাঁদতে। এসব আর সহ্য হলো না প্রীথমের। নিজের কলিজার এমন পরিণতি দেখার থেকে মরে যাওয়া ঢের ভালো।
প্রীথম টানতে টানতে প্রিয়তাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে পেছন পেছন ছুটল সবাই।

রাজ ভয়ার্ত কণ্ঠে জানতে চাইল —
“কোথায় যাচ্ছ মেজদা?”
প্রীথমের স্পষ্ট উত্তর —
“যার কাছে গেলে আমার বোন শান্তি পাবে।”
“কিন্তু—”
“কোনো কিন্তু নয়, প্রেম।”
বেশি বলতে হলো না। ছুটে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে আনল প্রেম।
বোনকে নিয়ে পেছনের সিটে উঠে বসল প্রীথম। টেনে বুকের মাঝে নিয়ে মাথায় হাত বুলাতে লাগলো বোনের মাথায়, নরম গলায় বললো —
“আর কাঁদিস না পাখি, যাচ্ছি তোর প্রণয় ভাইয়ের কাছে।”
প্রিয়তা ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল।
বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স থেকে ইস্তাম্বুল এয়ারলাইন্সে রাত ১০টায় পৌঁছালো তারা। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার ফ্লাইট জার্নি। তুরস্কের মাটিতে পা রাখতেই প্রিয়তার অস্থিরতা আর ছটফটানি বেড়ে গেল কয়েক গুণ। প্রিয়তাকে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে হাসপাতাল নিয়ে পৌঁছালো প্রেম ও প্রীথম।

রিসেপশনে আসতেই দেখা হয়ে গেল শুদ্ধর সাথে। প্রিয়তমার বিষাদমগ্ন আধাঁরে মুখটা চোখে ভাসতেই থমকে গেল শুদ্ধ। মায়াবিনীর এরূপ বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে অন্তর পুড়ে ছাই হলো।
প্রিথম কিছু বলার পূর্বেই প্রিয়তার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল। দৌড়ে শুদ্ধের নিকট চলে গেল প্রিয়তা। শুদ্ধর চোখে তাকিয়ে আর্তনাদ করে বলল —
“কোথায় আমার প্রণয় ভাই?”
নোনা পানিতে চোখ ঝাপসা হলো শুদ্ধর। আড়ালে চোখ মুছে বলল —
“আসো আমার সাথে।”
প্রিয়তা প্রীথম আর প্রেমের দিকে তাকালও না। উদভ্রান্তের মতো ছুটে গেল শুদ্ধর পিছু পিছু।
আইসিইউ-এর বাইরে এসে দাঁড়ালো শুদ্ধ। প্রিয়তা জল টলটলে চোখে অস্থির হয়ে শুধালো —
“কোথায়?”

আঙুলের ইশারায় ভেতরের দিকে ইশারা করল শুদ্ধ। আইসিইউ-এর দরজায় কাঁচ লাগানো, ফলে বাইরে দাঁড়িয়েই ভেতরের সবটা পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়।
শুদ্ধর আঙুলের ইশারা অনুসরণ করে কাঁচের ওপাশে তাকাতেই প্রিয়তার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসলো শীতল স্রোত।
কাঁচের স্বচ্ছ আবরণের ওপারে এক ধূসর জগত—যান্ত্রিক নিস্তব্ধতা। শীতল কক্ষটির মাঝ বরাবর সাদা ধবধবে বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে আছে তার প্রাণের পুরুষটা, তার নিঃশ্বাসের অক্সিজেন, তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

চোখ উপচে পানি গড়িয়ে নামলো প্রিয়তার। তার সুখের নীড়, তার একমাত্র ঘর, তার সংসার, তার প্রিয় বুকটা এখন কয়েক স্তর সাদা ব্যান্ডেজের নিচে ঢাকা পড়েছে। যে জায়গাটা সে পৃথিবীর সব থেকে বেশি নিরাপদ বোধ করে, যে জায়গায় মাথা রেখে সে পৃথিবীর সবটুকু সুখ একত্রে পায়, সেই জায়গাটা আজ ক্ষতবিক্ষত।
মুখের ওপর শক্ত করে বসানো স্বচ্ছ অক্সিজেন মাস্ক। তার প্রতিটা ক্ষীণ নিঃশ্বাসের সাথে মাস্কের ভেতরটা ঘোলাটে হয়ে উঠছে প্রতিবার, আবার পরক্ষণেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
দুহাতের শিরায় ক্যানুলা লাগানো। কোনোটা দিয়ে স্যালাইন যাচ্ছে, তো কোনোটা দিয়ে চলছে কড়া অ্যান্টিবায়োটিক। বাম হাতের তর্জনীতে একটা লাল আলো জ্বলছে-নিভছে, যা যান্ত্রিকভাবে জানান দিচ্ছে যে মানুষটা এখনো বেঁচে আছে।

মাথার শিয়রে রাখা মনিটরে সবুজ রঙের তিনটা রেখা ঢেউয়ের মতো একবার উঠছে, আবার নামছে। সেই যান্ত্রিক “বিপ… বিপ…” শব্দটাই এখন এই ঘরে প্রতিমুহূর্তে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
প্রিয়তা দেখল, প্রণয়ের সেই উদ্ধত আর তেজোদীপ্ত চেহারায় এখন এক অদ্ভুতুড়ে প্রশান্তি। চোখ দুটো বোজা, দীর্ঘ পাপড়িগুলো স্থির হয়ে আছে। কোনো এক অজানা ব্যথায় তার কপালটা মাঝে মাঝে সামান্য কুঁচকে উঠছে, আবার পরক্ষণেই শান্ত হয়ে যাচ্ছে।
প্রিয়তার মনে হলো, তার প্রণয় ভাই সত্যি কথা রেখেছে। সে ছেড়ে হারিয়ে যায়নি, ফিরে এসেছে প্রিয়তার কাছে, যেমন কথা দিয়েছিল।
প্রিয়তা দরজা ঠেলে ঢুকে যেতে চাইলে খপ করে তার হাত ধরে ফেলল শুদ্ধ। ব্যথাতুর কণ্ঠে বলল —
“ভেতরে যাওয়ার পারমিশন নেই প্রিয়া। ও ঘুমাচ্ছে। ওর বডি মাত্র রেসপন্স করতে শুরু করেছে। ও কিন্তু চোখ মেলতে বা কথা বলতে পারে না এখনো। কড়া অবজারভেশনে রাখা হয়েছে।”
প্রিয়তা অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল কাঁচের দরজার ওপারে। তার বুকটা জ্বলে যাচ্ছে, তার মানুষটাকে একটু কাছ থেকে দেখার জন্য, ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য।
প্রিয়তা অনুরোধ করতে নিলে শুদ্ধ পরিষ্কার জানালো —

“পারমিশন নেই প্রিয়া।”
আর কিছু বলতে পারলো না। প্রিয়তা নিঃশব্দে ঠোঁট কামড়ে কেঁদে উঠলো। বোধ করল, কণ্ঠ দিয়ে শব্দ বের করার মতো সামর্থ্য তার আর নেই।
কাঁচের দরজায় হাত রাখল প্রিয়তা। বাইরের হিমশীতল কাঁচের ওপাশে তার সর্বস্ব শুয়ে আছে, তার পুরো পৃথিবীটা নীরব হয়ে পড়ে আছে বিছানার উপর। তাকে ছুঁতে পারছে না প্রিয়তা। তার কণ্ঠ শুনতে পারছে না, তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মনের সকল অভিযোগ-অভিমান উগড়ে দিতে পারছে না।
এক অদ্ভুত হাহাকার প্রিয়তার কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে তবুও পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
দেখার প্রয়োজন নেই, প্রিয়তার শারীরিক-মানসিক অবস্থা বলে দিচ্ছে, সে কতটা পাগলামি করে এখানে এসেছে। নাহলে এখানে তাকে কখনোই আনা হতো না।

শুদ্ধ এক পলক প্রিয়তার দিকে তাকাল—মেয়েটা দৃষ্টিতে কতটুকু আকুলতা নিয়ে চেয়ে আছে প্রণয়ের দিকে। যেন হাজার বছরের তৃষ্ণার্ত চাতক তার কাঙ্খিত এক বিন্দু পানির দিকে শত জনমের পিপাসা নিয়ে তাকিয়ে আছে।
প্রণয়ের প্রতি প্রিয়তার এই মারাত্মক ভালোবাসার ব্যাপারটা যতবারই স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করে শুদ্ধ, ততবার হৃদয়টা আরও বেশি বিধির্ণ হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে, ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। পাগল মনটা মানতেই চায় না, যে এই নারী তার নয়, অন্যকারো। এই নারী তাকে নয়, অন্য কাউকে পাগলের মত ভালবাসে, উন্মাদের মতো ভালোবাসে।
মাঝে মাঝে রমণীর হাত ধরে বাচ্চাদের মতো অভিমানী গলায় বলতে ইচ্ছে হয় —

“এত বৈষম্য কেন গো আমার প্রতি? এতটা অবিচার কেনো ওকে? যতটা ভালোবাসলে, তার ১০০ ভাগের এক ভাগও কি আমাকে ভালোবাসা যেত না?”
প্রিয়তা বাইরে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে। তক্ষুণি ডাক্তার এলেন চেকআপের জন্য। তিনি ভেতরে যেতে নিলেই পেছন থেকে ডেকে উঠল প্রিয়তা —
“ডক্টর!”
ডক্টর ফিরে তাকালেন, সামনে দাঁড়ানো মেয়েটার দিকে। প্রিয়তা শ্বাস আটকে বলল —

“ওনার কাছে কখন যেতে পারব, ডক্টর?”
ডক্টর কিছুক্ষণ চুপ থেকে দেখলেন মেয়েটার ভেতরের ছটফটানি। অশ্রুভেজা চোখে চরম আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ডক্টরের জবাব না পেয়ে আহত হলো প্রিয়তা। কণ্ঠে ফের আকুলতা নিয়ে বলল —
“এখুনি একটু ওনার কাছে যেতে পারব তো, ডক্টর? বেশিক্ষণ নয়, জাস্ট একটুখানি। ১ মিনিট।”
কথা বলতে বলতে মেয়েটার কান্না করে দেওয়ার ধরন দেখলেন ডক্টর। প্রিয়তা আবার কিছু বলার পূর্বেই ডক্টর বলে উঠলেন —
“আপনার নাম কি রক্তজবা?”
ডক্টরের কথা শুনে আরও জোরে কান্না পেয়ে গেল প্রিয়তার। ঠোঁট কামড়ে ধরে শব্দ রোধ করল। সম্মতিমূলক মাথা ওপর-নিচ ঝাঁকিয়ে আবারও চাইল প্রণয়ের দিকে। মৃদু কান্নার ছন্দে তিরতির করে কাঁপছে শরীর।
ডক্টরের বিস্ময়ের অন্ত রইল না। তিনি মাথা থেকে পা পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন সামনে দাঁড়ানো মেয়েটাকে। তিনি স্পষ্ট করে দেখতে পেলেন, আসক্তির কী মারাত্মক অসুখে ভুগছে দুজন, যাকে মেডিকেল ভাষায় বলে ‘Codependency syndrome’।

“ডক্টর!”
প্রিয়তার ডাকে স্তম্ভিত ফিরল ডক্টরের। তিনি আইসিইউ-এর ভেতরে প্রবেশ করতে করতে বললেন —
“আপনি ভেতরে আসতে পারেন। আপনার কণ্ঠ বা স্পর্শ পেলে উনি আরও দ্রুত রিকভার করবেন।”
বলে ভেতরে চলে গেলেন ডক্টর। প্রিয়তার অশ্রুসিক্ত ভেজা চোখ দুটিতে খুশির ঝিলিক দিয়ে উঠল। প্রিয়তাকে হাসতে দেখে খুশি হয়ে গেল শুদ্ধও।
প্রিয়তার চোখের পাপড়ি কাঁপছে, বুক ধুকপুক করছে। শরীরের সবটুকু শক্তি যেন কেউ শুষে নিয়েছে। ভারী কাঁচের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল প্রিয়তা। বাইরের থেকে ভেতরের টেম্পারেচার তুলনামূলক কম। প্রতিটা কদমে অনুভূত হচ্ছে, কেউ তার প্রাণশক্তি শুষে নিচ্ছে ধীরে ধীরে।
সে যত কাছে এগোচ্ছে, প্রণয় ভাইয়ের বিশাল অবয়বটা তত বেশি পরিষ্কার হয়ে ধরা দিচ্ছে তার নিকট। তার অস্তিত্বের অনুভূতি গলার কাছে নিঃশ্বাস আটকে দিচ্ছে।

প্রিয়তা না ছুঁয়ে চোখ বন্ধ করেও এখন সে দিব্যি অনুভব করতে পারছে তার জানকে।
বিছানার একদম কিনারে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল প্রিয়তা। বুকটা অসম্ভব রকম কাঁপছে। গাল বেয়ে টুপ টুপ করে গড়িয়ে পড়ছে পানি। চোখ দুটো আর কত কাঁদবে, এবার বুঝি পানির বদলে রক্তই ঝরবে।
প্রিয়তা শব্দ রোধ করতে দুই হাতে মুখ চেপে ধরল। পাশের টুলে বসে ফুঁপিয়ে উঠল। নিঃশব্দ কান্নার তালে তালে দুলছে তার তনু শরীর। নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারছে না মেয়েটা।
নিজের কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে রাখল প্রণয়ের হিমশীতল হাতের ওপর। তাকে ছুঁয়ে দিয়ে যেন নিজেই কেঁপে উঠলো। সেই স্বস্তিদায়ক চেনা স্পর্শটা গায়ে লাগতেই ভেতরের সব কান্নায় যেন এক মুহূর্তে ফুলস্টপ লেগে গেল প্রিয়তার।
অশ্রু টলমলে লাল চোখে তাকাল প্রণয়ের শুভ্র মুখখানির দিকে। অতটুকু স্পর্শ পেতেই মনে হচ্ছে, ভেতরের অর্ধেক জখম সেরে গেছে।

আস্তে করে ক্যানুলা লাগানো হাতটা তুলে তার উল্টো পিঠে চুমু খেলে প্রিয়তা সময় নিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখলো ত্বকে। চোখ বন্ধ করতেই গড়গড় করে নেমে আসল উষ্ণ স্রোত।
এত যন্ত্রণার পর একটা মাত্র চুমুতে কী এই আগ্নেয়গিরি শান্ত হবে। প্রিয়তা নিজেকে সামলাতে পারলো নাহ্। টুকটুক করে অসংখ্য চুমু খেল হাতটাতে। মনটা চাইল, ওই জখম বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে যার ব্যথা তার বুকেই ফিরিয়ে দিতে।
নিষ্ঠুর একটা মানুষ, সে কি আর ব্যথা পায়? সে তো শুধু ব্যথা দিতে জানে। এত এত বছর, এত এত যন্ত্রণা দিয়েও তো তার মন ভরেনি, এখন শুধু নিঃশ্বাস আটকে মরা বাকি।
এসব ভাবতে ভাবতে প্রিয়তা কখন হাত বাড়িয়ে দিল প্রণয়ের গালে, নিজেও বুঝল না। আলতো করে স্পর্শ করল খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলোতে। ধীরে ধীরে বৃদ্ধাঙ্গুল বুলিয়ে দিতে দিতে প্রণয়ের হাতটা টেনে রাখল নিজের গালে। ব্যথাতুর কণ্ঠে বলল —

“এবার খুশি হয়েছেন তো? নিশ্চয়ই আপনি খুব খুশি হয়েছেন। খুশি হওয়ারই কথা আপনাকে আমি চিনি না? আপনি আমার জাত শত্রু। আপনি সব সময় তক্কে তক্কে থাকেন, কীভাবে প্রিয়তাকে একটু কষ্ট দেওয়া যায়, কিভাবে প্রিয়তাকে একটু কাঁদানো যায়, তাই না? নির্দয়, নিষ্ঠুর, অমানবিক লোক একটা! আমাকে এত যে জ্বালান, কষ্ট দেন, আমি মরে গেলে এতো পাগলের মতো কে ভালোবাসবে আপনাকে? কে সব সময় বিড়ালের মত পেছন পেছন ঘুরবে?”
“জান, এক জীবনে তোমাকে ভালোবাসার শাস্তি আর কতবার দেবে? এক গরু আর কতবার জবাই দেবে?”
বলতে বলতে প্রণয়ের কপালে কপাল ঠেকাল প্রিয়তা। বন্ধ চোখের পাপড়ি ছুঁয়ে স্বচ্ছ পানি গড়িয়ে পড়ল প্রণয়ের গালে।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮১

ধীরে ধীরে প্রণয়ের দু চোখের পাতায় সময় নিয়ে ভেজা চুমু আকলো প্রিয়তা, অতঃপর গালে, কপালে, আস্তে আস্তে করে সারা মুখে ঠোঁট ছুঁয়ালো। এবার বুঝি জ্বলন্ত কলিজাটা একটু বরফ লাগলো প্রিয়তার। এই স্পর্শগুলো পেতে যদি আরেকটু দেরি হতো, তাহলে নিশ্চিত দম আটকেই মরে যেত প্রিয়তা।
খুব আস্তে করে বুকের উপর ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিসিয়ে বলল —
“সারা জীবন না খেয়ে থাকলে ও, আমি ভাতের অভাবে মরব না, কিন্তু এক মুহূর্তও যদি আপনি আমায় ফাঁকি দেন, মরন যে অনিবার্য, আপনার শূন্যতা, তীব্রতা কতটুকু আপনি বোধ করি, তা কোনদিন উপলব্ধি করতে পারবেন না।”

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৩