ভালোবাসি বলে দাও পর্ব ২

777

গল্পের পরের পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে পরতে চাইলে notification অন করে রাখুন ok বাটনে ক্লিক করে

ভালোবাসি বলে দাও পর্ব ২
Suraiya Aayat

বিরাট এক ব্রেক সহকারে আরিশ ভাইয়া গাড়ি থামালেন। আমি শান্ত হয়ে রইলাম এবার শুধু আমাকে গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে বার করে দেওয়ার অপেক্ষা। তাদের এমন পিরিতী আলাপ কে শুনতে চাই? এদের সাথে আমার যাওয়ার ইচ্ছাটা তামা তামা হয়ে গেছে। ভাবলাম উনি সত্যিই বোধ হয় আমাকে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে বলবেন,

‘আরুপাখি বাসায় যাও, একা, হেটে হেটে, গভীর অন্ধকারে।উহু জীবনে এডভেঞ্চার।’
অপেক্ষারত চাহনিতে আমি আরিশ ভাইয়ার পতিক্রিয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
‘আমার বিয়ে’ গানটা আরিশ ভাইয়ার বুকটা কে একটু হলেও পোড়ালো কি তা আমায় জানতে হবে। আর পুঁড়লেও সেই পোঁড়া স্মেল আমার চাই। ডেভিল মানুষের দিল জ্বলছে।আহা!

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

ওনার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই বুঝলাম যে উনি কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন আমার দিকে। ওনার এ চাহনি মরিচীকার ন্যায় যা বোঝার ক্ষমতা আমার কখনোই হয়নি। ওনার ভ্রম ভঙ্গ করে ফারিন আপু কঠিন স্বরে বললেন,
‘ এই মেয়ে তুমি কি পাগল হলে? এভাবে কেও চেঁচিয়ে ওঠে মাঝ রাস্তায়? আর আমার বিয়ে মানেটা কি? ‘
ওনার সাথে ঝগড়া না করলেই নয়,ওনার সাথে ঝগড়া না করলে ফুপির বানানো কাচ্চি আজ আমার নিশ্চয়ই হজম হবে না। আমিও বিরষ ভঙ্গিমায় বললাম,

‘তোমরা দুজন নিজেদের মতো গল্প করছিলে তাই আমি ভাবলাম আমার বিয়ে গানটা করি। ‘
তৎক্ষণাৎ ফারিন আপুর হাতটা পৌছে গেল আরিশ ভাইয়ার কাধে, আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। আপু কিঞ্চিৎ ন্যাকামির ভঙ্গিমাতে বলে উঠলেন,
‘দিস ইজ টু মাচ আরিশ। তুই এবার কিছু বল। ‘

আমার মস্তিষ্কের কিছু কিছু নিউরোন বিষয়টাকে যেন এখনো মেনে নিতে পারছে না আর সেখানে আরিশ ভাইয়া কি আদেও ওনার কথাটা শুনেছেন? কিন্তু উনি ইশারা করে আমাকে গাড়ি থেকে দ্রুত নামতে বললেন। ইশারা পেতেই আমি বিন্দু মাত্র দেরি না করে নেমে পড়লাম। আমার পিছুপিছু উনিও নামলেন। আমি বাসার দিকে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই উনি খপ করে পিছন থেকে আমার বাহু ধরলেন আটকালেন, আমি চমকালাম না, নির্বিকারে ওনার দিকে চেয়ে রইলাম।

‘ কি হলো হাত ধরলেন কেন? ছাড়ুন আমায়। ‘
উনি এবার যেন আধা রাগ মিশ্রিত ধারায় আমার দিকে চেয়ে রয়েছেন। হাতটা বেশ শক্ত করে চেপে ধরে খানিকটা ওনার দিকে আমাকে টেনে নিতেই ব্যাথা পেলাম আর বেশ চিৎকার দিয়ে উঠলাম,
‘কি হচ্ছে কি হাত ছাড়ুন। বাসায় যাবো আমি। ‘
আমার চিৎকার শুনে ফারিন আপু উনি জানালা দিয়ে উকি মেরে বললেন,
‘লেট হার গো।’ ডিসগাস্টিং মেয়ে। ‘ শেষের শব্দটআ একটু মিউট করে বললেন যাতে কারোর কানে না পৌছায় কারন উনি আরিশ ভাইয়ার কাছে তথাকথিত ভদ্র এবং আমি চূড়ান্ত অভদ্র।

ফারিন আপুর কথা শুনতেই উনি কেন জানি না আমার হাত ছেড়ে দিলেন। মনে মনে হাজারো ঝাড়ি দিয়ে বলতে লাগলাম,
‘নিজের কথায় তো আমাকে নাচিয়ে এখন দেখছি নিজেও অন্যের কথায় নাচেন। ‘
চুপ করে হাতটা কচলাচ্ছি আমি, উনার শক্ত করে ধরা জায়গাটা বেশ লাল হয়ে গেছে। উনি পুনরায় বলে উঠলেন,
‘পিছনে উঠে বসো। নাহলে কালকে থেকে ছয় ঘন্টা করে পড়াবো। ‘
তাহার এমন কথা শুনে আমার সারা শরীর জুড়ে বিদ্যুৎ গতিতে ভয় ছেয়ে গেল। আমি জানতাম যে উনি ছাড়া আমার গতি নেই তবে তিন ঘন্টাটা ছয় ঘন্টা হোক তা কখনো চাইনি আমি। দ্রুত গতিতে সামনের সিটে যেতে নিলেই উনি একটা ধমক দিয়ে উঠলেন,

‘পিছনে বসো। ওদিকে কোথায় যাচ্ছো। ‘
ওনার ধমকে আমি সহ ফারিন আপুও চমকে গেছেন। আমি দ্রুত গাড়িতে উঠলাম। ফারিন আপু বোধহয় ভয়ে আর ওনার পাশে বসার কথা ভুলে গেছেন,যদি ওনাকেও অপমান করেন সেই ভয়ে। আসলে ওনাদের বয়সী মেয়েরা একটু বিচক্ষন আর বুদ্ধিমতী হয়, আমার মতো এমন উড়নচন্ডী নয় তাই হয়তো অপমানিত হওয়ার ভয়ে নিজের সিটেই বসে রইলেন। আরিশ ভাইয়া চোয়াল শক্ত করে গাড়িতে উঠলেন।

এই মানুষটাকে আমি কখনোই বুঝে উঠতে পারিনি। আমার বাবা আর আম্মু নিজেও বোধহয় আমাকে এতো ধমক দিয়ে কথা বলেলনি যতোটা সারাজীবনে উনি আমাকে ধমক দিয়েছেন। আমার তো মনে হয় মাঝে মাঝে হাত পা ছুঁড়ে কাঁদি আর ওনার নামে একরাশ নালিশ করি আর আমার এমন কাওকে দরকার যে আমার এই নালিশ গুলো একনাগাড়ে সহমত দিয়ে শুনবে কিন্তু আমার সেরকম কোন মানুষ নেই যিনি ওনার নামে নিলিশ শুনবেন। আমার ভাষায় যেটা নট সো টুইটুই!

সামনেই টেস্ট এক্সাম তার পর আছে আরিশ ভাইয়ার কাছে বিশেষ প্রি টেস্ট যাতে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কঠিন প্রশ্ন গুলো দেওয়া হয়। তারপর এইচএসসি এক্সাম। আজকে ভাইয়া আসবেন।নিজের কলেজ শেষ করে উনি কলেজ থেকে সোজা আমাকে পড়াতে আসেন। আমার নিষ্পাপ মনে মাঝে মাঝে একটাই প্রশ্ন জাগে,
‘ব্যাটা না পড়ে টপার কিভাবে হয়? ‘

মুখের ভিতর পেন দিয়ে চেবাচ্ছি, এর জন্য প্রায়ই হাতেনাতে ধরা পড়ে ধমক খেতে হয় আমাকে আর এই অবস্থায় উনি দেখলে আর রক্ষে নেই। উনি এসে রোজ আমার হাতের কফি খান তবে আজকে আমার কফি বানানোর মন মানসিকতা একদম নেই তাই আম্মুকে দিয়ে বানিয়ে নিয়েছি তবুও কিভাবে না কিভাবে উনি ঠিক বুঝতে পারেন। মাঝে মাঝে আম্মুর ওপর আমার তীব্র সন্দেহ জাগে যে কোনভাবেই সে তাকে জানিয়ে দেই না তো যে সে কফিটা বানিয়েছে, আমি কফি বানানো তে ফাঁকি দিয়েছি। কিন্তু নিজের মেয়ের সাথে আম্মু এমন দুশমনি করবে? ভাবনাগুলোর অন্ত নেই তার আগেই একটা বড়ো ব্যাগ উনি আমার সামনে এসে রাখলেন।

নিসন্দেহে সেটা তার নিজের ব্যাগ নতুবা আমার জন্য তো তিনি আর এতো এতো গিফট আনবেন না কখনোই। তার মেডিকেল এর বইগুলো আমি দেখি আর অবাক হয়, তা দেখে মনে হয় পড়াশোনা করার থেকে বিয়ে করাটা অনেক সহজ। যদিও ডক্টর হওয়ার ইচ্ছাটা আমার ছোট থেকে হলেও আমার থেকে ওনার আমার পড়াশোনার প্রতি আগ্ৰহ বেশি। মনে পড়ে সেদিনটার কথা যেদিন উনি ওনার এই বিরাট ব্যাগটা আমার সামনে প্রথম এনে রেখেছিলেন আর কৌতুহল বশত আমি প্রশ্ন করে উঠলাম।

‘আরিশ ভাইয়া এতে কি? ‘
উনি তখন অত্যন্ত গম্ভীর কন্ঠে বলেছিলেন’বই। ‘
আমার দেখার ইচ্ছা জাগতেই বেশ জোরাজুরি করে একটা বই বার করেছিলাম। বইয়ের ওজন আমি নিজেই সামলাতে না পেরে আমার হাত থেকে বইটা পড়ে গিয়েছিল। ভীষনরকম একটা ধমকে সেদিন কানের পর্দাটা ফাঁটত ফাঁটতে বেঁচে যাই। তারপর থেকে বইগুলোর ওপর একটা ফোবিয়া এসে গেছে।
বই খাতা দেখলেই আমার যে ঘটনা গুলো মনে করা উচিত না সেগুলো ও মনে পড়ে যায়। আমার চোখএর সামনে একটা তুড়ি বাজিয়ে উনি ইশারায় বোঝালেন,

‘শুরু করা যাক? ‘
আমার ঘোর ভাঙলো। ওনার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে বললাম,
‘ ভাইয়া একটা কথা বলি?’
আমার কথার উনি কোন উত্তর দিলেন না বরং নিজের কথাতে ব্যাস্ত হয়ে গেলেন।
‘চারদিন তোমাকে পড়াতে আসতে পারবো না। তাই আজকে অনেক সময় নিয়ে পড়াবো। একটা স্ট্রং কফি লাগবে আমার চিনি ছাড়া।’

ওনি পড়াবেন না শুনলে অন্যদিন তো খুশিতে মন ভরে যায় কিন্তু আজকে কৌতূহল জাগছে কারনটা ফারিন।
বেশি আগা মাথা না ভেবে প্রশ্ন করলাম,
‘কেন প্রেমিকার সাথে ঘুরতে যাচ্ছেন? ‘
উনি চোখের দৃষ্টিতেই খু/ন করে ফেলবেন এমন এক দৃষ্টিতে তাকালেন, আমি দমে গেলাম এক নিমেষেই। মাথা নীচু করে অ আ পড়ার মতো অনর্গল পড়তে শুরু করতেই উনি আমার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
‘মেডিকেল পারপাসে সিলেট যাচ্ছি। আর কোন প্রশ্ন? ‘
আমি বাচ্চাদের মতো দু দিকে মাথা দুলিয়ে না সম্মতি জানাতেই উনি হঠাৎ অদ্ভুত এক প্রশ্ন করলেন,

‘আরুপাখি! ‘
আমি ভ্রু কুঁচকে জবাব দিলাম,
‘জ্বি? ‘
‘তোমার Wildest Fantasy কি আরুপাখি? ‘
আমি অবাক আর হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে রইলাম ওনার দিকে। এমন প্রশ্ন আগে আমাকে কেও করেনি। তবে আমার ফ্যান্টাসি যেটা সেটা ওনাকে ঘিরেই সেটা কি আমার ওনাকে বলা উচিত?
মনের মাঝেকার একরাশ সংশয় জমিয়ে রেখে ওনার দিকে বাকা চোখে তাকিয়ে বললাম,
‘বলা টা কি ইম্পরট্যান্ট? ‘

উনি ধমক দেওয়ার পরিকল্পনা করেও যেন আর ধমকালেন না আমাকে, বেশ নরম কন্ঠেই বলল,
‘স্টুপিড। জিজ্ঞাসা করেছি আমি, নো এক্সকিউজ! ‘
ওনার এমন শান্ত কন্ঠস্বর শুনে আমি মাঝে মাঝে ওনার ওপর ফিদা হয়ে যায়।
‘আমার ফ্যান্টাসি আপনাকে নিয়ে। ‘
উনি কথাটা শুনে খুশি হলেন নাকি রেগে গেলেন বুঝলাম না। তবে ওনার চোখ জুড়ে একরাশ কৌতূহল দেখলাম আমি।
‘রিয়েলি? তাহলে তো শুনতেই হয় যে আমাকে নিয়েও কারোর কোন ফ্যান্টাসি থাকতে পারে।
আমি একটু পিছিয়ে বসলাম, জানি না উনি তা শোনার জন্য আদতে প্রস্তুত কি না। আমি আমতা আমতা না করে সরাসরি বললাম,

‘আপনাকে এই ডেভিলগিরি নিয়ে আমার এক আকাশ অভিযোগ। আই উইশ আপনাকে নিয়ে কারোর কাছে আমি অভিযোগ করবো আর সে আমার অভিযোগ গুলো মন দিয়ে শুনবে তবে আপনার অভিযোগ আপনাকেই করলে ভালো লাগতো আমার। অভদ্র! ‘
আমার কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই আমার হাতে বেশ জোরে একটা টান দিয়ে ওনার কাছে টেনে নিয়ে এলেন আমাকে, আমার হৃদগতি থেমে আসার উপক্রম। ওনার খুব কাছে ঝুকে আছি আমি, ওনার দৃষ্টি বলছে যেন,

ভালোবাসি বলে দাও পর্ব ১

‘আরুপাখি বলো আমি শুনবো। ‘
কিন্তু তেমনটা হলো না, উনি ওনার কাছে টেনে এনে এক ধমক দিলেন আর আমি চুপ, শুনতে হলো ওনার সেই বিশ্ব বিখ্যাত ডায়ালগ যেটা আমি ওনার প্রত্যেকটা ধমকের সাথে ফ্রি তে পাই।
‘নো মোর ওয়ার্ডস! ‘

ভালোবাসি বলে দাও পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here