Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৮

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৮

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৮
মুশফিকা রহমান মৈথি

শক্তপোক্ত হাতের মধ্যখানে চিকন কটিদেশটা আরেকটু চেপে ধরলো। স্থির চোখজোড়া একে অপরের মাঝে নিবদ্ধ। দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চির। পেটের কাছটার সেলাই এ চাপ পড়ছে। অথচ আহত মানুষটির বিকার নেই। কাঞ্চন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখের পাতা ফেলতে সে ভুলে গেছে। স্নিগ্ধ নামক এই অনুভূতিহীন মানুষটির দম্ভ এবং অহংকারের পরিসীমা তাকে বিস্মিত করছে। কোনো মানুষ কি এতোটাও আত্মমুগ্ধ হতে পারে? স্নিগ্ধকে না দেখলে হয়তো জানতেও পারতো না কাঞ্চন। তার চোখে সেই আত্মপ্রেম স্পষ্ট দেখতে পেলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধের সেই নার্সেসিস্ট চোখজোড়ায় চোখ রেখেই দৃঢ় স্বরে উত্তর দিলো,
“আমি তোমার অংশ নই। আমি, তুমি নই। আমি তোমার মতো ইগোস্টিক নই। আমি তোমার মতো অহংকারী নই। আমি তোমার মতো সাইকোপ্যাথ নই।”

“কত প্রমাণ চাই তোর?”
“মানে?”
“তুই আমারই স্বরুপ- কত প্রমাণ চাই?”
কাঞ্চনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। স্নিগ্ধ তার ক্যানোলাযুক্ত হাতটা রাখলো কাঞ্চনের গলার কাছে। আলতো করে আঙ্গুল ঘুরাতে ঘুরাতে প্রগাঢ় কণ্ঠে বললো,
“কেডসের সোলে ব্লেড কে রাখে ওয়াইফি? স্বাভাবিক মানুষ?”
কাঞ্চন চুপ করে রইলো। তার স্থির দৃষ্টি প্রখর। স্নিগ্ধ মাথাটা সোজা করলো৷ তার চুলের মুঠো এখনো কাঞ্চনের হাতে। সে সজোরে তার টেনে ধরে আছে। একটুও ঢিল দেয় নি। অথচ৷ চিকন হাতের এই চুল টানা, পিঁপড়ার টানের মতো লাগছে তা স্নিগ্ধের কাছে। সে নাকটা কাঞ্চনের থুতনির কাছটায় ঠেকিয়ে বললো,
“ইউ আর জাস্ট লাইক মি, ওয়াইফি। তোর ইগোর উচ্চতা বুর্জ খলিফা না হলে এখনো অবধি আমার উপর অভিমান করে থাকতি না।”
মানুষ কতটা অহংকারী হলে অপর মানুষের ঘৃণা টের পায় না। কাঞ্চন মৃদু হেসে বললো,
“ভুল হচ্ছে তোমার। আমি তোমার উপর অভিমান করে নেই। আমি তোমাকে ঘৃণা করি।”
“ঘৃণা মাঝে মাঝে ভালোবাসার থেকেও প্যাশনেট হয়। কাউকে তীব্রভাবে ঘৃণা করার জন্যও প্রচুর নিষ্ঠার প্রয়োজন। সেই নিষ্ঠা প্রেমিককেও মাথা নত করে। আমাদের বিয়ের গাড়ির ফুয়েলটা না হয় ঘৃণাই হোক। বেশি মাইলেজ দিবে।”

“ইউ আর ম্যাড!”
“আই নো। আই এম ম্যাড এবাউট নট গেটিং হোয়াট ইজ মাইন।”
কাঞ্চনের রাগে গা কাঁপছে। নাকের পাটা ফুলিয়ে বললো,
“আমি তোমার সম্পত্তি না।”
“তুই আমার অংশ।”
“এতো দর্প ঠিক না। যখন আমাদের ডিভোর্স হবে তখন তোমার এই দর্প ভেঙ্গে গুড়ো হয়ে যাবে।”
“আমার দর্প ভাঙ্গতে হলেও তোকে একটা বছর আমার বউ হতে হবে। শুধু নামের বউ না, কামের বউ। আমার সাথে সংসার করতে হবে। সকালে তোর ঘুম ভাঙ্গবে আমার বুকে, রাতে আমার বুকে ঘুমাতে হবে। আমার যখন ইচ্ছে আমি তোকে ছুঁবো, তোর জীবনের প্রতিটি কোনায় উপর আমার আধিপত্য থাকবে। সহ্য করতে পারবি তো? আই ডোন্ট থিংক সো।”

স্নিগ্ধের ঠোঁটের কোনে জ্বালাময়ী হাসি। কাঞ্চনের চুল থেকে পায়ের নখ অবধি জ্বলছে। স্নিগ্ধ তার থুতনিতে নাকখানা চেপে ধরে বুক ভরে শ্বাস নিলো। নাকখানা সরালো না। বরং স্বর আরোও খাঁদে নামিয়ে বলল,
“আমার মত পার্ফেক্ট হাসবেন্ডের লজিক্যাল ভুল ধরতে তোর জীবন পেরিয়ে যাবে। বরং এই একটা বছরে তুই আবার আমার প্রেমে পড়ে যেতে পারিস। এটা তুইও ভালো করে জানিস। তাইতো তুই ভয় পাচ্ছিস। ভয় পাচ্ছিস আমার সাথে সারাটাজীবন জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায়। এই একটা অমিল আছে আমাদের। মনের ব্যপারে তুই দূর্বল। হেরে যাবার ভয়ে তুই মাঠ ছেড়ে পালাস।”
আত্মসম্মানে আঘাত হানা যদি গুণ হয় তবে এই লোকটাকে গুণী তকমা দিতেই হবে। সূক্ষ্ণ, বিষাক্ত সুঁইয়ের খোঁচার মতো লাগছে এই লোকের কথাগুলো। কাঞ্চন তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। তারপর গজরাতে গজরাতে বললো,

“আমাকে চ্যালেঞ্জ করো না স্নিগ্ধ ভাই!”
“চ্যালেঞ্জ নিতে পারিস তুই? জানা ছিলো না। থাক যা তুই নিতে পারিস না, সেটা আমি তোকে করবোও না।”
“তোমার কি মনে হয় তুমি কোনো জান্নাতের হুরপরা, আমি তোমার প্রেমে পড়ার জন্য হেঁদিয়ে আছি! এক বছর কেন, এক যুগ গেলেও আমার মাথার চুল তোমার প্রেমে পড়বে না। আমি তো অনেক দূরের কথা। তোমাকে আমি ঘৃণা করি। এবং কবর পর্যন্ত করবো।”।”
স্নিগ্ধর হাসি প্রসারিত হলো। থুতনিতে হালকা কামড় দিয়ে বললো,
“আমার আদর পেলে এই জেদ ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে, আমার পাঁজরের হাড্ডি।”
“তুমি-ই না বলেছিলে, আমার টিংটিঙ্গে শরীরের প্রতি তোমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। এখন সেই দম্ভ কোথায় স্নিগ্ধ ভাই! আমার তো মনে হয় কেস উলটো। একচুয়ালি ইউ আর অবসেসড উইথ মি।”
স্নিগ্ধের হাসি মিলিয়ে গেলো না। বরং দৃষ্টি ধপ করে জ্বলে উঠলো। কেমন অবাধ্যতায় ঘেরা বুনো চাহনী। ভারী স্বরটা আরোও ভারী করে বললো,

“নিজের একমাত্র স্ত্রীর প্রতি অবসেসড হওয়াটাই তো পারফেক্ট হাসবেন্ডের গুণ। আমি লয়াল হাসবেন্ড। শুধু আমার হালাল ওয়াইফের শরীরের প্রতি গলি।”
বলেই থুতনিতে একটা চুমু খেলো। সারা শরীর ঝনঝন করে উঠলো কাঞ্চনের। সেই বুনো দৃষ্টি, পুরু ঠোঁটের স্পর্শে শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ বয়ে গেলো। তার মুখের দিকে পূর্ণদৃষ্টি স্নিগ্ধের। ধীর গলায় বললো,
“ইউ কান্ট রেজিস্ট মি, পাঁজরের হাড্ডি। রিয়ালিটি মেনে নে। তুই হেরে যাবি।”
নিজের আত্মসম্মানের দেওয়ালে তীব্র আঘাত অনুভূত হলো কাঞ্চনের। বুকটা কেমন মুচড়ে উঠলো। নীল ব্যাথা অনুভূত হলো। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে সে নিজেকে সামলে নিলো। মুখ কঠিন করে বললো,
“তুমি আমাকে চেনোই না স্নিগ্ধ ভাই। আমি তোমাকে সাদা খাতায় লিখে দিতে পারি আমি হারবো না। তুমি ছুঁলেও আমার কিচ্ছু যায় আসে না, আসবে না। এক বছর তোমার নকটা বউ হতে হবে, আমি হব। তবে এক বছর পর তুমি নিজ থেকে আমাকে ডিভোর্স দিবে। এই এক বছরে তোমাকে আমি গ্যালাক্সির ভ্রমণ করাবো, দেখে নিও।”

“তাহলে ডিল অন?”
“অন”
স্নিগ্ধ হেসে বললো,
“একটা ট্রায়াল দিবি নাকি?”
“কি?”
“কিস মি! আমিও দেখতে চাই তোর উইলপাওয়ার!”
কথাটা শেষ হতে পারলো না তার আগেই কাঞ্চন ইচ্ছে করে স্নিগ্ধের সেলাইয়ের পাশে চাপ দিলো। কাঁচা সেলাইয়ে হাত লাগতেই স্নিগ্ধের নির্লিপ্ততা খসলো। ভ্রু কুঁচকে গেলো। চোয়াল শক্ত হতেই কাঞ্চনের কোমড় ছেড়ে দিলো সে। কাঞ্চন তার পায়ের উপর থেকে উঠে গেলো। স্নিগ্ধের পা অবশ হয়ে এসেছে। এতোটা সময় নিজের স্ত্রীর সাথে কথার জাল বুনতে ব্যস্ত থাকার দরুন নিজের সদ্য অপারেশনের কথাটাই বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো। এখন শরীর জানান দিচ্ছে তুমি একজন রোগী। ছোট হলেও তোমার অপারেশন হয়েছে।
কাঞ্চন স্নিগ্ধ থেকে দূরে দাঁড়ালো। ব্যান্ডেজ বিহীন হাতটা নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে তার গা মুছিয়ে দিয়েছে। স্নিগ্ধর মুখটা ব্যাথায় নীল হয়ে আছে। সেলাইয়ে চাপ দেয় নি কাঞ্চন। তাও হয়তো চাপ লেগেছে। মানতেই হবে, ব্যথা সহ্য করার দূর্দান্ত ক্ষমতা তার। কাঞ্চন অবাক হলো লোকটি একটু টু শব্দ করে নি। গা স্পঞ্জ করার পর একটা পরিষ্কার জামা পরিয়ে দিলো কাঞ্চন। কঠিন গলায় বললো,

“ওয়ার্ডবয় তোমার প্যান্ট চেঞ্জ করে দিবে। এর থেকে বেশি কিছু আশা করো না। একদম সেলাইয়ে গুতো দিয়ে দিব।“
স্নিগ্ধ থমথমে গলায় বললো,
“ইউ আর টু এনোয়িং টু রেজিস্ট!”
লোকটি সুস্থ থাকলে তার গর্দান ভেঙ্গে ফেলতো, খুব ভালো করে সেটা জানে কাঞ্চন। তাই ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললো,
“একজন হালাল ওয়াইফ হিসেবে আমার দায়িত্ব নিজের স্বামীর দোষগুলো শুধরে দেওয়া। অপারেশন হয়েছে তোমার, একটু ঘটে ঢোকাও। এটা হাসপাতাল, তোমার রঙ্গ করার জায়গা না!”
স্নিগ্ধর ব্যথায় কুঞ্চিত মুখশ্রীতে একটা বাঁকা হাসি ফুটলো। গা এলিয়ে বললো,
“তুই আমার পাঁজরের-ই হাড্ডি, একারণেই একটু বেশি বাঁকা।”

ডাক্তার এলেন শেষ বিকালের দিকে। স্নিগ্ধের ব্যান্ডেজ পরিবর্তন করা হলো। সেলাইয়ের অবস্থা ভালো। ডাক্তার এসে ভালো করে পরীক্ষা করে কাঞ্চনকে বললেন,
“প্যাশেন্টের সেলাই ভালো আছে। আশা করছি পাঁচদিনেই খুলতে পারবো। উনাকে একটু সাবধানে রাখবেন যেন ইনফেকশন না হয়। কোনো প্রকাশে সেলাইয়ে চাপ পড়বে এমন কিছু করা যাবে না। সেলাই শুকানোর জন্য বেশি করে লেবু খাওয়াবেন। ব্যান্ডেজ খোলার পর গোসল করবে তা আগে না।“
ডাক্তারের কথার মধ্যে কঠিন চোখে তাকালো সে স্নিগ্ধের দিকে। একটু পূর্বে এই লোকটা তাকে নিজের কোলে নিয়ে বসে ছিলো। কাঞ্চন ইতস্তত করে বললো,

“স্পঞ্জ করা যাবে তো!”
“হ্যা, গরম তো অনেক। স্পঞ্জ করবেন। ওয়ার্ড বয়দের বলতেই হবে।“
ডাক্তার চলে গেলেন। স্নিগ্ধের এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশনটা ঝুলিয়ে নার্স চলে গেলো। কাঞ্চন সোফায় গিয়ে বসলো। “নেই কাজ তো পটনভী ভাঁজ” গ্রুপে টুং টুং করেই যাচ্ছে। স্নিগ্ধ ভাইয়ের খোঁজ নিতে সবাই ম্যাসেজ করছে। কাঞ্চনের খাবার এখনো আসে নি। বলে সে সেখানে ম্যাসেজ করলো,
“রিদম আর তাশদীদের বাচ্চার বাপেরা, আমার খাবার কই?”
তাশদীদ সাথে সাথেই রিপ্লাই করলো,
“বা** বকো না। তোমার আর তোমার বরের কামলা তো আমরা। জ্যামে বসে আছি। আইতেছি।“
অঞ্জনা তখন অনলাইনে ছিলো। তাশদীদের ম্যাসেজ দেখে সে চিরচির করে উঠলো,
“হোয়াট দ্যা ফা** তাশদীদ, ল্যাঙ্গুয়েজ ঠিক কর।“
“ওরে আমার বাঙ্গালী, ভাতেরে কয় অন্ন। তা মিস বিলেত ফেরত বিল্লি “ফা**” কি শুদ্ধ ভাষা?”
এবার তাশদীদ ভাষাগত ক্লাস শুরু করলো,

“শোন বিল্লি, বা** হলো একটা এক্সপ্রেশন। এটা ভাষা না। ভালো লাগতেছে না, “বা**র জীবন”। কাউকে চুপ করাতে হবে, “বা** অফ যা।“ এই যে তুই আমাকে মনে মনে গালি দিচ্ছিস, সেটাও “বা**” বলেই। লাইফের বিশ্রী সব মোমেন্টকে তুই এক শব্দ দিয়ে বর্ণনা করতে পারবি। তোর আংরেজি গালিতে ঐটা নাই মেমসাহেব। বা** বলায় যে শান্তি সেটা তোর ওই আংরেজি গালিতে নেই।“
মানে এরা পারেও কাঞ্চন গ্রুপে ম্যাসেজ দেখছে। তার ক্ষুধার চোটে মাথা ঘুরাচ্ছে অথচ তার গুণে মানে সেরা বড়চাচার ছেলে গালি নিয়ে লেকচার দিচ্ছে। এদিকে অঞ্জনা ক্ষেপে লাল টমেটো হয়ে গেছে। একদম ক্যাপিটাল হরফে ইংলিশে ম্যাসেজ করছে। ওকালতি পরার কারনে তার বিতর্ক ক্ষমতা বেড়ে গেছে। সে লিখলো,
“শোন, কথার একটা মর্যাদা আছে। ইংরেজি গালি শুনতে শব্দের মতোই লাগে। কিন্তু ওর বাংলা গালি কানে বিষের মত লাগে। তেমন আমার তোকে বিষের মত লাগে।“

“কিন্তু আমার তো বলতে সেই লাগে। ভাব আমাদের বিয়ে হলে কি চমৎকার কম্বোনেশন হবে। ইংরেজি মেম মিটস বাঙ্গালী বাবু।“
“আমি তোদের পরিবারেই বিয়ে করবো না। আমাকে পাগলে কামড়ায় নি। আর তোকে? জীবনেও না। আমি দরকার করে চিরকুমারী থাকবো।“
“যাও বিল্লি, তোর জন্য এখন থেকে আমি বিশুদ্ধ গালি দেব। ননভেজ। বাঙ্গী চলবে? নাকি ঢেড়সের বিঁচি? তুই যা বলবি তাই।“
“মরে যা।“

তাশদীদ এবং অঞ্জনার এই কাঁটাকাঁটি ছোটবেলা থেকেই চলমান। ঠিক কি বিষয়ে শুরু হয়েছিলো সেটা মনে পড়ছে না। তাশদীদকে অঞ্জনা পছন্দ করে না। করার কথাও না অবশ্য। তার ঠোঁটকাঁটা, অবাধ্য ছেলে তাশদীদ। অঞ্জনা কাজিনদের মধ্যে বেশ সুশীল বলা যায়। মিথ্যে বললেও দশবার বিড়বিড় করে ক্ষমা যায় স্রষ্টার কাছে। স্বাভাবিক দুজনের স্বভাবে আসমান জমিনের পার্থক্য। তাশদীদ অঞ্জনাকে উত্যক্তও করে ভীষণ। ফলে তাদের মধ্যে কথা কাঁটাকাটি বেশি হয়। কাঞ্চন একটা ম্যাসেজ করেছিলো। কিন্তু এতো ম্যাসেজের মধ্যে তার ম্যাসেজ হারিয়ে গেলো। বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো গ্রুপ থেকে। স্নিগ্ধ তখন ঘুমে। কাঞ্চন কিছু সময় তার দিকে তাকিয়ে রইলো। একটু আগে জেদের বসে সে বলে তো দিলো সে একবছরের ডিলে রাজী কিন্তু এখনই মেজাজ খারাপ হচ্ছে। মনে হচ্ছে সে একটা মস্ত ভুল করে ফেলেছে। দেওয়া মাথা টাক দিতে ইচ্ছে করছে। ধ্যাত ভালো লাগে না।

প্রীতির বিয়ের তারিখ শুক্রবার ছিলো। কিন্তু সেটাকে এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। জুলফিকার পটনভী আদেশ করেছেন। জুলফিকার পটনভী স্নিগ্ধর প্রতি একটু বেশি সদয়। তাই তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিবেন সেটা ঘরের প্রতিটা প্রাণ জানতো। তবুও একটা বিয়ে পিছিয়ে দেওয়া মোটেই ভালো লাগলো না ফরহাদ পটনভীর। সব বুকিং নতুন করে করতে হচ্ছে। আত্মীয়দের বলতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রীতির শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। তারা যদিও বিষয়টাকে খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছেন, তবুও কথা তো থেকেই যায়। প্রীতির আপন ভাই নয় স্নিগ্ধ। তার থাকা বা না থাকায় বিয়েতে কিছু যায় আসে না।

প্রীতিও বিষয়টাতে দাদাজানের উপর অভিমান করেছে। অনেকবার কাজিনমহলেও সে ক্ষোভ ব্যক্ত করেছে। অঞ্জনা, পৃথুলার সাথে খুব একটা বনিবনা নেই প্রীতির। সানিয়ার সাথে ভালোই খাতির। বিকেলবেলা লনের দোলনায় বসেছিলো অঞ্জনা এবং পৃথুলা। পৃথুলা প্রজেক্টের কাজ করছিলো। অঞ্জনা তাশদীদের সাথে তর্ক। ঠিক ওই সময়ে প্রীতি রাগান্বিত ভঙ্গিমাতে এলো। তার ফর্সা মুখটা রক্তিম হয়ে ছিলো। এসেই ধপ করে বসলো সে। সানিয়া এলো একটু পর। হাতে একটা আমের বাটি। প্রীতিকে সে আমের বাটিটা এগিয়ে বললো,
“প্রীতি আপু রাগ করো না। ভাইয়া ছাড়া কি বিয়ের অনুষ্ঠান করবা তুমি?”
“কি যায় আসে সানিয়া? এখন সব কিছুর বুকিং করতে হবে। পার্লার, মেহদির মেয়ে, ফেশিয়াল সব কিছু। তোর বিয়ে হয় নি, তুই বুঝবি না। আফনান ভালো বলেই এইসব নাটক মেনে নিয়েছে। আমার শ্বশুরবাড়িকে অপমান করা হচ্ছে না তুই বল? ভাই সবাই কি পটনভী?”
পৃথুলা এবং অঞ্জনা সরু দৃষ্টিতে প্রীতি উরফে নাটুকে অনুপমার দিকে চেয়ে রইলো। পৃথুলার ধৈর্য্য কম তাই সে রোবটের গলায় বলেই ফেললো,

“বিয়ে তো হয়েই গেছে প্রীতি আপু, এতোটা ঢং করতেছো কেন?”
সানিয়া মাঝ খান থেকে ফাল মেরে উঠলো,
“পৃথুলা বিহেভ। প্রীতি আপু তো ভুল বলে নি। সব হয়েছে কাঞ্চনের জন্য। ও কিডন্যাপ না হলে এসব কিছুই হতো না। না ও কিডন্যাপ হইতো, না ভাইয়া গুলি খেতো।“
পৃথুলা এবার লাগামছাড়া হয়ে গেলো,
“উলটা হাতের থাবড়া খাইছোস সানি? আমি উঠে এসে কিন্তু মারুম তোরে। তুই জানিস ওই টাইমে ও কিসের মধ্য দিয়ে গেছে? আর কাঞ্চনের উপর দোষ দিচ্ছিস কেন? ও কিডন্যাপ তোর ভাইয়ের জন্যই হইছে। তাই গুলি খাওয়া স্নিগ্ধ ভাইয়ের পাওনা ছিলো।“

“পৃথুলা খবরদার।“
“তুই খবরদার। নয়ত এখন ই তোর চুল কেটে দিবো। পরে বিয়ে করতে হবে না তোর।“
প্রীতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো পৃথুলার দিকে। একটা গমগমে স্বরে বলে উঠলো,
“শোন পৃথুলা, আজ আমার সাথে যা যা হচ্ছে সব কাঞ্চন এবং স্নিগ্ধ ভাইয়ার জন্য। ও না থাকলে আজকে আমার বিয়েটা খুব সুন্দর করে হত। আমার এমন পালাতে হত না।“
অঞ্জনা এবং পৃথুলা বেকুবের মতো চেয়ে রইলো প্রীতির দিকে। এই মহিলা হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকা থেকে নাগিন কি করে হয়ে গেলো বুঝতে পারছে না।

রাত প্রায় বারোটা। স্নিগ্ধ ঘুমে। মাত্র তার এন্টিবায়োটিক শেষ হয়েছে। কাঞ্চন সোফাট কাম বেডটায় শুয়ে আছে। ঘুম আসছে না। স্নিগ্ধ নামক লোকটা আজ সারাটাদিন তাকে খুব যন্ত্রণা দিয়েছে। তার উপর ভর করে সে হেটেছে। এতো দামড়া নব্বই কেজির ভার কাঁধে নিতে হয়েছে কাঞ্চনের। কাঞ্চন যখন দাঁত মুখ খিঁচে ছিলো তখন সে হেসে বলেছে,

একটা রোগীর যত্ন করা অনেক কঠিন। হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সে। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছে। অথচ ঘুম আসছে না। কি বিপদ। প্রীতি আপুর বিয়ে পিছিয়েছে। সে খাওয়া নাওয়া ছেড়ে ঢং করছে। গ্রুপে বিষয়টা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। কাঞ্চন তার বিপরীতে শুধু একটা ম্যাসেজ করেছে,
“ভালো হয়েছে। মরুক গা।“

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৭

মোবাইলটা সাইডে রেখে চোখটা বন্ধ করতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে কানে গোঙ্গানির শব্দ এলো। তড়াক করে চোখ মেললো কাঞ্চন। শব্দের উৎস খুঁজতেই মাথা তুলতেই দেখলো স্নিগ্ধ গোঙ্গাচ্ছে। লাইট জ্বলছে। ঘর আলোকিত। স্নিগ্ধর শরীর তরতর করে ঘামছে। কাঞ্চনের কপালে ভাঁজ পড়লো। উৎকুণ্ঠা ঠাঁই পেলো তার মুখশ্রীতে। স্নিগ্ধর বেডের কাছে গেলো সে। দুবার ডাকলো। লোকটি সাড়া দিলো না। কপালে হাত রাখতেই কেঁপে উঠলো কাঞ্চন। তীব্র জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে সে…………

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here