Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৫

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৫

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৫
মুশফিকা রহমান মৈথি

ভারী শব্দ কানে আসতেই সারা শরীর কেঁপে উঠলো কাঞ্চনের। ঘাড়ের ঠিক এক ইঞ্চির ব্যবধানে স্নিগ্ধের মুখশ্রী তা টের পেতে একটুও ভুল হলো না৷ ঘাড়ের উপর ভেজা কিছুর অনুভূতি হলো। পেছনে ঝট করেই তাকাতে পারলো না। শুকনো ঢোক গিলে নিজের মনকে স্বাভাবিক রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করেই তাকালো কাঞ্চন। পেছনে ফিরতে তার মাথাটা হালকা করে স্পর্শ করলো স্নিগ্ধের ঝুকে আসার থুতনিতে। খুব হালকা তবুও কাঁপলো কাঞ্চন মাথা তুলে স্নিগ্ধের চোখে চোখ রাখলো সে। লম্বায় তার উচ্চতা কম নয়। মেয়েদের পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতা মোটেই কমের মধ্যে পড়ে না। তবুও স্নিগ্ধের কাছে তাকে ছোটই লাগে। ফলে স্নিগ্ধকে ঝুঁকতে হয়। স্নিগ্ধর দিকে তাকাতেই এক দফা ধাক্কা খেলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধর গায়ে কোনো জামা নেই। একটা কালো ট্রাউজার পরা সেম গলায় ঝুলছে সাদা তোয়ালে, অথচ সে একটিবারও মাথা মুছছে না। ফলে চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। সেই পানির কিছুটা তার কাঁধেও পড়েছিলো হয়তো। স্নিগ্ধের পেটানো শরীর ভেজা। সূর্যের তাপে শুভ্র রঙ্গ জ্বলে অনেকটা তামাটে হয়ে গেলেও এখনো তাকে পাকিস্তানি পাঠানদের সারিতে রাখলে ভুল হবে না। যদিও তারা লখনৌ এর নবাবী নসল তাও কিভাবে যেন তাদের গঠনে পাঠানী একটা রওয়াব আছে।

কাঞ্চন চোখ সরিয়ে নিলো। লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে গেছে। কাঁপা স্বরে বললো,
“কি বলছো, আগামাথাহীন কথাবার্তা!”
“আগামাথাহীন নাকি? কিন্তু গ্রুপ চ্যাটে তো অন্যকিছুই দেখলাম!”
কাঞ্চন শুকনো ঢোক গিললো। স্নিগ্ধ আরোও কাছে এগিয়ে গেলো। দূরত্ব মিটিয়ে ফেলেছে অনেকটাই। হাত হাতে টেনে ধরলো কাঞ্চনের কোমরটা। একটু চাপ দিতেই কাঞ্চন ছটফটিয়ে উঠলো। ছাড়ানোর চেষ্টাও করলো কিন্তু সেই সিমেন্টের হাত ছাড়ানো কি এতো সহজ। উপর থেকে আজ তো খাওয়া দাওয়া লাটে উঠেছে। স্নিগ্ধ এক পেশে হাসলো, তারপর তার মাথাটা কাঞ্চনের কানের কাছে এসে বললো,
“মিসেস পটনভীর এতো কিঙ্ক সেটা তো জানা ছিলো না! ব্যাপার না আজ তার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিব। প্রমিস! আফটার অল আমি যে ফিট সেটা তো আমার বউয়ের জানা প্রয়োজন।”
শেষ কথাটা আরোও ভারী স্বরে বললো যেন স্নিগ্ধ। কাঞ্চনের বুক কাঁপছে। স্নিগ্ধের মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। তার গাঢ় দৃষ্টি ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। কাঞ্চন তার হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত। আর স্নিগ্ধ ব্যস্ত তার ফেকুচন্দ্র বউকে দেখতে। কাঁধ থেকে ডান হাতটা দিয়ে চুল গুলো সরালো সে। আজ একটা শাস্তি বউটার প্রাপ্য। কাঞ্চন কেমন অস্থির কণ্ঠে বললো,
“তোমার ভুল হচ্ছে স্নিগ্ধ ভাই, একটা ছোট মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গেছে। আমার কথাটা শুনো!”
“হ্যা আমি শুনছি।”

বলেই কোমড়ে শক্ত হাতে চাপ দিলো স্নিগ্ধ। স্নিগ্ধের মুখশ্রীতে রাগ নেই। তবে তার দৃষ্টি খুব ভয়ংকর। বাঘ যেমন তার শিকারকে ধরাশায়ী করে লেজে নাচায় ঠিক সেভাবেই স্নিগ্ধ কাঞ্চনের দিয়ে তাকিয়ে আছে। কাঞ্চনের অবস্থা তাকে পৈশাচিক আনন্দ দিচ্ছে। কাঞ্চন অসহায়ের মতো বললো,
“আসলে হয়েছে কি! রঙ টাইমে মেজো চাচীর এন্ট্রি হয়েছে। আমার কথাটা শুনো!”
“শুনছি তো! আমার কান খাড়া, মিসেস পটনভী! আমাদের কাছে অগাধ সময়। আমি সারারাত আপনার কথা শোনার জন্য আছি। আপনার কথা, আপনার ছটফটানি.. ইউ নো হোয়াট আই মিন! খুলে বলার নিশ্চয়ই প্রয়োজন নেই।”
“ওমা বড় ফুপু যে!”
বলেই একটা চিৎকার দিলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ একটু নড়েচড়ে উঠলো। ফলে হাতের বাঁধন ঢিলে হতেই সে তার হাতের নিচ থেকে এক ছুট দিলো। দরজাটা বেশি দূরে না। এক দৌড়ে বেরিয়ে গেলে আর স্নিগ্ধ তাকে হাতে পাবে না। দরকার হলে আজ পটনভী মঞ্জিলের বাগানের গাছে রাত কাটাবে সে। এই মঞ্জিলের কোথাও সে থাকবে না। আর একটু। কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা কাজে দিলো না। লম্বাটে পা গুলো ধপাধাপ করে হেটে কাঞ্চনের দরজার কাছে পৌছানোর একটু আগেই ধরাম করে দরজাটা লাগিয়্র উপরের ছিটকিনি দিয়ে দিলো। দু হাত দিয়ে কাঞ্চনকে ঘিরে দাঁড়ালো। কাঞ্চন কিছু সময় দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। নির্জীব দরজাটাকেও নিজের মতো অসহায় লাগলো।
স্নিগ্ধ মুখটা নামিয়ে কানে ঠোঁট চেপে বললো,

“পালাচ্ছিস কেন! নিজের চোখে নিজের বরকে পরীক্ষার সুযোগ কিন্তু সবসময় মিলবে না।”
বলেই তার কানে একটা কামড় বসিয়ে দিলো আকস্মিক। ফলে আহ করে কান চেপে ধরলো কাঞ্চন। তেজী চোখে তাকিয়ে বললো,
“কি সমস্যা তোমার?”
“আমারই তো সমস্যা! আমার বউ কষ্টে আছে! পুরো গুষ্টি তাতে উঠে পড়ে লেগেছে আমার লুঙ্গি খোলার তালে, আমার ছাড়া কার সমস্যা!”
“দেখো স্নিগ্ধ ভাই!”
“দেখছি তো!”
বলেই কাঞ্চকে একেবারে দরজার সাথে মিশিয়ে ফেললো স্নিগ্ধ। গমগমে স্বরে বললো,
“আমার মধ্যের সিংহটাকে তুই জাগিয়েছিস৷ চ্যালেঞ্জটা তুই ছুড়ে মেরেছিস। এখন গুষ্টির সামনে নিজের পুরুষত্ব তো প্রমাণ করতে হবে। সো Endure me, মিসেস পটনভী”
ভারী শরীরটা ধাক্কা দিতে লাগলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ তাও নড়লো না এক বিন্দু। কাঞ্চন ছটফটিয়ে বললো,

“স্নিগ্ধ ভাই, ভালো হচ্ছে না কিন্তু! প্লিজ সরো।”
স্নিগ্ধ তার হাতজোড়া খপ করে ধরে ফেললো। তারপর দরজায় চেপে ধরলো একসাথে। এতোটাই জোরে ধরলো যে কাঞ্চনের হাত লাল হয়ে গেলো। ব্যথায় চোখে পানি চলে এলো। ফলে গর্জিয়ে উঠলো,
“কাল না বলছিলে তোমার আমার দেহের প্রতি লোভ নেই!”
“সেটা আমার এখনো নেই। কিন্তু এখন কথাটা আমার সম্মানের উপর চলে এসেছে কি না! নিজের গর্তে নিজের পড়তে কেমন লাগে সেটার মজাটাও একটু পা”
“আমি কিন্তু তোমাকে ঘৃণা করবো!”
“এখন যেন খুব ভালোবাসিস?”
কাঞ্চন নাক চোখ খিঁচিয়ে তাকালো স্নিগ্ধের দিকে। কি ভেবে বা পাটা দিয়ে লাথি মারতে উদ্ধত হতেই খপ করে স্নিগ্ধ তার পাটা ধরেই শূণ্যে তুলে ফেললো। কাঞ্চন ভয়ে তার গলা চেপে ধরলো৷ কাঞ্চনের কাজে স্নিগ্ধ হিনহিনে স্বরে বললো,

“বেশি লায় দিয়ে ফেলেছি বলে এখন গলা টিপে ধরছিস!”
কাঞ্চন তার গলা আরোও জোরে চেপে ধরে বলল,
“তোমাকে মেরে ফেলছি না তোমার ভাগ্য!”
“যা তোর হাতে মরলাম ই না হয় আজকে। তার আগে শ্রদ্ধেয় বাসরটা সারা যাক!”
বলেই একপ্রকার বিছানায় ছুড়ে ফেললো কাঞ্চনকে। কাঞ্চন উঠে বসেই একরকম খিঁচিয়ে উঠে বসলো। সেও হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী- এখানে তো তার চিরশত্রু। স্নিগ্ধ তার কাছে আসার আগেই সে ক্ষিপ্র বেগে হাতের কাছে যা পেলো একে একে ছুড়ে মারতে লাগলো। স্নিগ্ধ তা প্রতিরোধ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। প্রথমে বালিশ, কাঁথা এরপর বিছানার উপর দাঁড়িয়ে সরাসারি সাইড টেবিলের ল্যাম্পটা উঠিয়ে বললো,

“এবার মাথায় মেরে দিব কিন্তু! এক পা এগোবে না।”
স্নিগ্ধ ফোঁশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেই কাঞ্চনের পায়ের নিচের বিছানার চাঁদরটা ধরে একটা হ্যাচকা টান দিলো। অমনি কাঞ্চন ধপাস করে বিছানায় পড়ে গেলো। আর সিংহের মত স্নিগ্ধ তার উপর এক প্রকার ঝাপিয়ে তার হাত এবং পা নিজের শরীর দিয়ে এপে ধরে ভারী স্বরে বললো,
“এবার? সব জারিজুরি শেষ?”
কাঞ্চন এবার যেন প্রায় কেঁদেই দিলো,
“আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি তোমার বোনের উপর বিরক্ত হয়ে ওইটা বলেছিলাম। আমি জানতাম না এই চাপা যে ব্রেকিং নিউজ হয়ে যাবে। আমি কান ধরছি। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও।”
কাঞ্চন মুখ বাঁকিয়ে কান্নার ঢং করলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই আড়চোখে দেখলো স্নিগ্ধ শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কান্নার শব্দ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে স্নিগ্ধ মাথা কাত করে বললো,
“শেষ! হয়েছে সব নাটক! নাকি আর কিছু বাকি আছে!”
কাঞ্চন একটা ফোঁশ করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। নড়তে চড়তে পারছে না। তারপর হাল ছেড়ে বললো,
“বেশ, তোমার যা শাস্তি দেওয়ার আমি মাথা পেতে নিব!”

“যা শাস্তি দিব?”
কাঞ্চন যেন হাল ছেড়ে দিলো। চোখ জ্বলছে। চোখ বন্ধ করে বললো,
“হ্যা!”
“তাহলে গাল পাত”
কথাটা শুনতেই কাঞ্চনের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। শুকনো ঢোক গিলে বললো,
“মারবে?”
“হ্যা”
“সত্যি মারবে!”
স্নিগ্ধ নীরব। কাঞ্চনের অবাক লাগলো না। এই সিমেন্টের বস্তা সব করতে পারে। কিন্তু ওই ভারী হাতের থাবাটা খেলে ওর গাল ভেঙ্গে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তাই চোখ খিঁচে শুয়ে রইলো সে। অপেক্ষা করতে লাগলো মারের। কিন্তু মারের বদলে গালে একটা উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ পেলো যেন। সারা শরীর কেঁপে উঠলো কাঞ্চনের। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল উষ্ণ রক্তের স্রোত৷ খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির স্পর্শে গাল ছিলে যাচ্ছে। বুকের ভেতর কালবৈশাখী ঝড় আঁছড়ে পড়লো। নড়েচড়ে উঠতেই স্নিগ্ধ তার হাত চেপে ধরলো। স্নিগ্ধ খুব আলতো করে চুম্বন আঁকলো। তারপর কানের কাছে বললো,

“মিসেস পটনভীকে তো ক্রিমিনালের মতো শাস্তি দেওয়া যায় না। তাকে শাস্তিটা দিতে হবে আদরে। যেন তার গা পিত্তি জ্বলে যায়।”
কথাটা শেষ হবার আগেই মাথা দিয়ে তীব্র ভাবে একটা টাক বসালো কাঞ্চন স্নিগ্ধের মাথায়। আকস্মিক আক্রমনে মাথাটা একেবারে শূন হয়ে গেলো। ফলে স্নিগ্ধ কপাল চেপে পাশে কাত হয়ে গেলো। টাকটা অনেক জোরেই লেগেছে। জ্বলে যাচ্ছে কপাল। এদিকে কাঞ্চন তখনও গাল মুছতে ব্যস্ত। একরাশ ক্ষোভ নিয়ে সে তাকিয়ে রইলো। স্নিগ্ধ উঠে কিছু বলতে যাবে তখনই ধরাম ধরাম করে দরজায় ধাক্কা পড়লো। মনে হচ্ছে দরজাটা ভেঙ্গে ফেলবে। স্নিগ্ধ কাঞ্চনকে স্মিত স্বরে বললো,
“তোকে পরে দেখছি।”
বলেই কপাল ঘষতে ঘষতে দরজা খুললো সে। দরজা খুলতেই অঞ্জনা, রিদম প্রায় হুমড়ি খেয়ে ভেতরে এসে পড়লো। ঘরের লণ্ডভণ্ড অবস্থা আর এলোমেলো কাঞ্চন এবং অর্ধনগ্ন স্নিগ্ধকে দেখে তারা ঠিক কি আঁচ করলো বোঝা গেলো না। রিদম লুকিয়ে একবার কাঞ্চনকে থাম্বস আপ শো করলো। এদিকে অঞ্জনা ব্যগ্র গলায় বললো,

“স্নিগ্ধ ভাই তোমার আম্মু!”
“আম্মুর কি হয়েছে?”
স্নিগ্ধ উদগ্রীব হয়ে শুধালো। রিদম তখন বললো,
“অতি এক্সাইটমেন্টে ফুপির সিড়ি থেকে পা মচকে ফেলেছেন।”
“কিভাবে হল?”
“ওই তোমার বউভাতের এরেঞ্জমেন্ট দেখছিলেন। কথা বলতে বলতে স্টেপ মিস করে পড়ে গেছেন!”
স্নিগ্ধ এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না। আলমারি থেকে একটা টি শার্ট বের করে তা গলায় ঢুকাতে ঢুকাতে বেরিয়ে গেলো। কাঞ্চনও নিজেকে পরিপাটি করে ছুটলো স্নিগ্ধের পেছনে।
বড়ফুপুর পাটা মচকেছে। ঘর ভর্তি মানুষ। সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো। বড়ফুপু একটু স্থুলকায়ার নারী। বছরের তিনশত পঞ্চাশ দিন তার কোনো না কোনো অসুস্থতায় তিনি ভুগেন। স্বামী মারা গেছেন অনেক ছোট বয়সে। তখন সানিয়ার বয়স তিন মাস। জুলফিকার পটনভী তার বড় মেয়ের প্রতি একটু বেশি দূর্বল। তাই কন্যার স্বামীহারা হওয়ার পর আহ্লাদটাও একটু বাড়িয়েই দিলেন। জুলফিকার পটনভীর আহ্লাদের কারণে বাড়িতেও সে আহ্লাদী। ফলে পা মচকে যাওয়ায় ব্যতিব্যস্ত হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক না।
কাঞ্চন এসে দেখলো বড়ফুপু মুখটা ঝুলিয়ে রেখেছেন। ছেলের বৌভাত কালকে অথচ তিনি বিছানায়। ডাক্তার ডাকা হলে তিনি এসে প্লাস্টার করে গেছেন। ডাক্তার পটনভী মঞ্জিলেই আছেন। অঞ্জনার বাবা, মাহিউল্লাহ পটনভী। তাই ওভাবে হাতড়াতেও হয় নি।
কাঞ্চনকে দেখেই বড়ফুপু হাত বাড়িয়ে বলে উঠলেন,

“দেখ তো কি একটা বিপদ হলো! কালকে আমার কত কাজ এখন আমাকে বসে থাকতে হচ্ছে!”
কাঞ্চন এসে তার পাশে বসে বললো,
“দোষ তো তোমার ফুপু। আমাকে বলো না লাফাতে, নিজেই তো লাফাতে লাফাতে দুনিয়া উজার করে দিচ্ছো!”
স্নিগ্ধ একবার মায়ের দিকে তাকালো। কিছু একটা বলতে যাবে মা অসহায় গলায় বললো,
“আমি ইচ্ছে করে পড়ি নি। কখন যে কথার মধ্যে সিড়ি এলোমেলো হল খেয়াল করি নি। বকিস না তুই!”
স্নিগ্ধ একটা ফোঁশ করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,
“এখন এমন করলে হবে! কিছুদিন পর নাতী-নাতনী পালতে হবে না? আমি তোমার ভাতিজীকে একবিন্দু ভরসা করি না। দেখা যাবে গাছে উঠে বসে আছে বাচ্চা সমেত! আমার বাচ্চাদের উড়িয়েও দিতে পারে। সেখানে তোমার এমন বেখেয়ালি হলে হবে মা? একটুর জন্য ফ্রাকচার হয় নি। নয়তো কি ভোগান্তিটা হত, বুঝতে পারছো!”

বড়ফুপু ছেলের মৃদু শাসনে মাথা নত করে ফেললেন। সরফরাজ পটনভী সকলকে নাকের ঢগার হুংকারের উপর রাখলেও নিজের মাকে একেবারে বাচ্চার মতো করে শাসন করেন। তার জীবনে তার মায়ের প্রাধান্য সর্বাধিক। কাঞ্চন সেটা খুব ভালো করে জানে। হয়তো এই বিয়েটাও সেই কারণেই করা। মাকে খুশি করা একপ্রকার। মা বলেছে আমার কাঞ্চনের মত বউমা চাই তাই সেও অমত করে নি। কাঞ্চন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। যখন সবাই এক এক করে ঘর ছাড়লো তখন কাঞ্চন বলে উঠলো,
“আমি থাকছি ফুপুর সাথে, একা একা উনি কি করে থাকবেন। আমি বরং উনাকে দেখে রাখবো।”
কথাটায় সবাই রাজী হলো। শুধু স্নিগ্ধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো তার দিকে। ঘর থেকে বের হবার সময় কাঞ্চনের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো,
“শাস্তিটা তোলা রইলো! এরপর আর কোনো ত্যাদরামিতেও কাজ দিবে না।”
কাঞ্চন জমে গেলো। গালের সেই উষ্ণ চুমুটা একটা দুঃস্বপ্নের মতো তার মাথায় ছেপে গেছে। গা শিরশির করছে। স্নিগ্ধ এক পেশে হাসলো। তারপর বেরিয়ে গেলো সোজা। বের হবার সময় অবশ্য রিদম, পৃথুলা, ইকরাম, অঞ্জনা সবগুলোকে একটা হিমধরানো দৃষ্টির অনুভূতি দিয়ে গেলো। রিদম পৃথুলার কাঁধে মাথাটা ঠেকিয়ে বললো,
“বাপরে! কি কান্ডটাই ঘটলো আজকে। জান গলায় এসে গেছিলো আমার। মনে হচ্ছিলো প্যান্টেই হেগে দিব!”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৪

পৃথুলা তাকে এক ধাক্কা দিয়ে নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে বললো,
“দূরে যায়ে মর। আবাল কোথাকার!”
“শাকচুন্নী! নিষ্ঠুর একেবারে!”
গতরাতটা যতটা না চাঞ্চল্যকর হলো সকালটা আরোও বেশি উত্তেজনাময়। প্রীতির খোঁজ পাওয়া গেছে। সে একটা ছেলেকে বিয়ে করে রীতিমত গাজীপুরের রিসোর্টে হানিমুন করছে…….

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here