মনের আড়ালে পর্ব ৬ || লেখনীতে Alisha Rahman Fiza

1227

মনের আড়ালে পর্ব ৬
লেখনীতে Alisha Rahman Fiza

আমি আর রুপসা মিলে একসাথে আমার বাসায় যাচ্ছি। বাবা যখন আমাকে নিতে আসলো তখন রুপসা মিস্টার রক্তিমকে বললো সে আজ রাত আমার বাসায় থাকবে বাবা শুনেতো মহা খুশি।বাবা রুপসাকে কোলে তুলে বললো রুপসা অবশ্যই আমাদের সাথে।মিস্টার রক্তিম প্রথমে আমতা আমতা করলেও মামা আর বাবার কথা মেনে নিলো আমি রুপসার প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যাগে ভরে নিলাম।তারপর রওনা হলাম বাসার উদ্দেশ্যে বাবা আর রুপসা সারা রাস্তা বকবক করে যাচ্ছে।আমি চুপচাপ বসে শুধু তাদের কান্ডকারখানা দেখছি আর মুচকি মুচকি হাসছি বাবাও রুপসার সাথে মিলে ছোট বাচ্চা হয়ে গেছে।বাসার কাছাকাছি পৌছে বাবা রিক্সা থামাতে বললো আমি বাবাকে বললাম,

~কী হয়েছে?
বাবা বললো,
~আরে রুপসার জন্য কিছু গিফটস নেওয়া উচিত প্রথমবার আমার বাসায় যাচ্ছে।
রুপসা খুশি হয়ে বললো,
~আমার জন্য গিফটস কিনতে যাচ্ছো আমাকেও নিয়ে চলো।
বাবা হেসে বললো,
~অবশ্যই।
আমিও তাদের সাথে নেমে পরলাম তারপর সামনে থাকা দোকানে চলে গেলাম সেখানে অনেক খেলনা রয়েছে।রুপসা দুটো পুতুল নিলো।বাবা তো অনেক খুশি রুপসার পছন্দ দেখে আমরা তিনজন হেঁটে হেঁটে বাসার দিকে রওনা হলাম।বাসায় পৌছে কলিংবেল টিপতেই মা দরজা খুলে রুপসাকে দেখে খুশি হয়ে রুপসাকে কোলে তুলে নিয়ে বললো,

~অধরা,রুপসা তো একদম পুতুলের মতো।
আমি বললাম,
~একদম ঠিক বলেছো মা।
রুপসা বললো,
~এই দ্যাখো আমার হাতে দুটে পুতুল।
মা বললো,
~তাই তো পুতুলটিও একদম তোমার মতো।
রুপসা বললো,
~সত্যি।
মা বললো,
~তিন সত্যি।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আমাদের কথা আওয়াজ শুনে অরুনা তার রুম থেকে বেড়িয়ে আমাদের দিকে চলে আসলে।রুপসাকে দেখে সেও অনেক খুশি হলো রুপসার সাথে সবাই মসগুল আমি রুমে গিয়ে ফোন হাতে নিতেই দেখি মিস্টার রক্তিমের ২২টা মিসকল।আমি ফোন ব্যাক করতেই সঙ্গে সঙ্গে সে রিসিভ করে ধমক দিয়ে বললেন,
~এই আপনি মোবাইে কোথায় রাখেন?সেই কখন থেকে ফোন দিচ্ছি।
আমি বললাম,
~ব্যাগের ভিতরে ছিলো শুনতে পাইনি।
মিস্টার রক্তিম গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
~রুপসাকে মোবাইলটা দিন ওর সাথে কথা বলবো।
আমি বললাম,
~ওতো ব্যস্ত সবাট সাথে কথা বলছে।
মিস্টার রক্তিম ভাব নিয়ে বললেন,
~রুপাকে গিয়ে বলুন তার পাপা ফোন দিয়েছে মোবাইলে ঝাঁপিয়ে পরবে।
আমি তার কথা শুনে মুখ বাঁকিয়ে বললাম,
~দিচ্ছি।

তারপর আমি হলরুমে চলে আসলাম সেখানে গিয়ে দেখি বাবা আর অরুনা রুপসার সাথে খুনশুটি করতে ব্যস্ত। আমি রুপসার দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বললাম,
~তোমার পাপা ফোন করেছে।
রুপসা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো,
~আমি এখন কথা বলবো না পরে বলবো।
রুপসার জবাব শুনে আমার হাসি পেয়ে গেলো নিজেকে কন্ট্রোল করে ফোন কানে নিয়ে বললাম,
~রুপসা এখন কথা বলবে না।
মিস্টার রক্তিম রাগী গলায় বললেন,
~শুনেছি আর বলতে হবে না।
বলেই খট করে ফোন রেখে দিলো আমি রুমে চলে আসলাম আর মিস্টার রক্তিমের অবস্থা বুঝে হো হো করে হেঁসে উঠলাম তারপর ফ্রেশ হতে চলে গেলাম।

রক্তিম বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে রুপসার কথা তার ভিষন মনে পরছে রাতে বার বার সে রুপসার রুমে যায়।মেয়েট মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মেয়েকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে অফিসের সব ক্লান্তি সে একনিমিষে ভুলে যায়।কিন্তু আজ রুপসা নেই তাই তার অনেক খারাপ লাগছে সে বিছানা থেকে উঠে বসে পরলো।তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত ২টা নিশ্চয় অধরা রুপসাকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে।
অধরার প্রতি সে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে তার মেয়েকে এতোটা আপন করে নিয়েছে যে মেয়েটা তার মায়ের অভাব ভুলে গেছে।রক্তিম উঠে বারান্দায় চলে গেলো সেই দূর অজানা আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ভাবলো,

~অধরা কি সারাজীবন আমার মেয়েটাকে আগলে রাখতে পারবে?তারও তো জীবন আছে সেও একসময় চাইবে নিজের জীবনটাকে সুন্দর করে সাজাতে তখন কী রুপসা আমার মতো একা হয়ে যাবে।
নাহ রুপসা একা হবে কেন?আমি তো আছি আর মামাও আছে কিন্তু অধরা রুপসার জীবনে একটা বিশেষ অংশ হয়ে আছে।
এসব ভেবে রক্তিম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো তারপর ভাবলো,
~সময় হলে সব বুঝবো নে এখন রুপসা হ্যাপি এটাই অনেক।

হঠাৎ তার কফির তৃষ্ণা জাগলো সে বারান্দা থেকে রুমে এসে দরজা খুলে রান্নাঘরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।রান্নাঘরে পৌছে সে কফি তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পরলো তখনই কারো গোঙ্গানির আওয়াজ আসলো।রক্তিম ভয় পেয়ে গেলো সে ধীর পায়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আওয়াজটার সন্ধান করতে লাগলো।সে খেয়াল করলো গোঙানির আওয়াজটা তার মামার রুম থেকে আসছে।সে দেরি না করে দৌড়ে চলে গেলো তার রুমের সামনে দরজা খোলা থাকায় সে তাড়াতাড়ি ভিতরে ডুকে দেখলো তার মামা নিচে পরে আছে।মুখ দিয়ে গোঙ্গানির মতো আওয়াজ বের হচ্ছে।

রক্তিম আর দেরি না করে তড়িৎ গতিতে তার মামার মাথার কাছে বসে পরলো তারপর পার্লস চেক করলো।সে বুঝতে পারলো অবস্থা বেগতিক রক্তিম তাড়াতাড়ি তার মামাকে নিয়ে নিচে নেমে পরলো তারপর গাড়ির চাবি নিয়ে বের হয়ে পরলো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে সে গাড়ি ড্রাইভ করছে আর পিছন ফিরে তার মামাকে দেখছে।রক্তিম শুধু ভাবছে তার মামা ছাড়া এ দুনিয়ায় তার আর কেউ নেই যে তাকে আগলে রাখবে।মামার কিছু হয়ে গেলে কে রক্তিমের রাগকে কন্ট্রোল করবে রক্তিমের বুক বার বার কেঁপে উঠছে।
ইতিমধ্যে তারা হাসপাতালে পৌছালো রক্তিম তার মামাকে হাসপাতালে এডমিট করে দিলো।ডাক্তার এসে তার মামাকে চেক করে বললো,

~তার কিছু টেস্ট করাতে হবে আপনি এই মেডিসিন গুলো নিয়ে আসেন।
রক্তিম কাঁপা কাঁপা হাতে মেডিসিনের লিস্ট নিয়ে নিলো তারপর ছুটলো ফার্মেসিতে।
কিছুক্ষন পর সে ফিরে আসলো সব গুলো মেডিসিন নার্সের হাতে দিয়ে দিলো আর জিজ্ঞেস করলো,
~আমার মামা কেমন আছেন?
নার্স বললো,
~দেখুন তাকে চেক করা হচ্ছে আপনি এখানেই অপেক্ষা করুন।
নার্স এতটুকু বলে চলে গেলো রক্তিম চেয়ারে বসে পরলো তার মাথা কাজ করছে না সে চুপচাপ একধ্যানে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে তাকে দেখতে ছন্নছাড়া লাগছে কী থেকে কী হয়ে গেলো কিছুই বুঝতে পারলো না।
একটু পর ডক্টর বের হয়ে আসলো রক্তিম ডক্টরকে দেখে বললো,
~মামা ঠিক আছে?
ডক্টর বললেন,
~দেখেন মিস্টার রায়জাদা আপনার মামার অবস্থা এখন ভালোই আছে তার প্রেসার একদম নিচে নেমে গিয়েছিল আর সে হয়তো কোনো টেনশনে আছে।
যা এ বয়সে করা উচিত না তাই একটু খেয়াল রাখবেন
এতটুকু বলে ডক্টর চলে গেলো রক্তিম আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে তার মামার সাথে দেখা করতে চলে গেলো।

ফজরের আযান কানে আসতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়।চোখ খুলে পাশ ফিরে দেখি রুপসা আমার বুকের সাথে লেগে ঘুমিয়ে আছে।আমি ওর কপালে চুমো দিয়ে ওকে সুন্দর করে শুইয়ে দিলাম তারপর নিজের চুলগুলো হাত খোপা করে নেমে পরলাম বিছানা থেকে।ফ্রেশ হয়ে ওযু করে নামাজে দাড়িয়ে পরলাম কিছুক্ষন পর নামাজ শেষ করে জায়নামাজ উঠিয়ে ভাজ করে কার্বাডে রাখতে যাবো তখনই বাবা আমার রুমের দরজায় টোকা দিয়ে বললো,

~অধরা,দরজা খোল তো মা।
আমি দরজা খুলে দিলাম বাবা ভিতরে ঢুকে একবার রুপসার দিকে তাকিয়ে আমাকে বললো,
~অধরা,রক্তিম এসেছে।
বাবার কথা শুনে আমি ভ্রুকুচকে বললাম,
~এত সকালে?
বাবা বললো,
~এখানে কথা না বলি রুপসা ঘুমিয়ে আছে।
আমি বললাম,
~আচ্ছা আমি আসছি।
বাবা চলে যেতে আমি রুপসার কাঁথাটা ঠিক করে দিলাম তারপর রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। সোফার রুমে গিয়ে দেখি মিস্টার রক্তিম বসে আছে সে আমাকে দেখে বললেন,

~অধরা,রুপসাকে কিছুদিন আপনার কাছে রাখতে পারবেন?
আমি বললাম,
~হ্যাঁ অবশ্যই। আপনি কী কোথাও যাচ্ছেন?
মিস্টার রক্তিম বললেন,
~মামার শরীরের অবস্থাটা বেশ ভালো না সে হাসপাতালে এডমিট তাই আমি ব্যস্ত হয়ে পরেছি তাই আপনি রুপসাকে নিজের কাছে রেখে দিন।
মামার অবস্থা শুনে আমি আর বাবা দুজনই ভয় পেয়ে গেলাম বাবা বললো,
~এখন কী অবস্থা বেশি খারাপ?
মিস্টার রক্তিম বললেন,
~ভালো কিন্তু ডক্টর বলেছে ফুল টাইম রেস্ট করতে।
আমি বললাম,
~আপনি অপেক্ষা করুন আমি আপনার জন্য নাস্তা নিয়ে আসি।
মিস্টার রক্তিম বললেন,

~তার কোনো প্রয়োজন নেই বাসায় গিয়ে করে নিবো।
আমি কিছু বলবো তার আগে মা সেখানে এসে হাজির হলো মা বললো,
~আমার বাসা থেকে কেউ না খেয়ে চলে যাবে সেটা আমার একদম পছন্দ না আর তুমি বাসায় যাবে না বরং এখন হাসপাতাল যাবে তাই না?
মায়ের কথা শুনে মিস্টার রক্তিম বললেন,
~জ্বী।
মা বললো,
~যাও ফ্রেশ হয়ে আসো আমি নাস্তা দিচ্ছি।
মিস্টার রক্তিম আর কোনো কথা বললেন না বাবা তাকে রুমে নিয়ে গেলেন আমি মায়ের কাছে চলে আসলাম।
মা আর আমি নাস্তা রেডি করে টেবিলে সাজিয়ে রাখলাম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ৬.৪৫ বাজে।
আমি রুমে চলে গেলাম সেখানে গিয়ে দেখি রুপসা বসে বসে চোখ কচলাচ্ছে।আমি ওর পাশে বসে বললাম,

~ঘুম হয়েছে?
রুপসা আমার কোলে বসে গলা জড়িয়ে ধরে বললো,
~পাপার কথা মনে পরছে।
আমি মুচকি হেসে ওকে বললাম,
~তোমার পাপা এখানেই আছে।
রুপসা বললো,
~পাপা এসেছে?
আমি বললাম,
~হ্যাঁ।তুমি ফ্রেশ হয়ে নেও তারপর পাপার সাথে দেখা করে নিও।
রুপসা তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে চলে গেলো আমি বিছানা গুছাতে শুরু করলাম।

মনের আড়ালে পর্ব ৫

রক্তিম ফ্রেশ হয়ে রুপসাকে খুজতে লাগলো রান্নাঘরে এসে দেখলো অধরা কাজ করছে। সে ধীর পায়ে সেখানে গিয়া দাড়ালো অধরা তাকে দেখে বললো,
~মিস্টার রক্তিম কিছু লাগবে?
রক্তিম বললো,
~রুপসা কী ঘুম থেকে উঠেছে?
অধরা বললো,
~জ্বী।ফ্রেশ হতে গিয়েছে।
রক্তিম বললো,
~রুপসার খেয়াল রাখবেন ওকে বাহিরের কোনো কিছু খেতে দিবেন না।
অধরা বললো,
~খেয়াল রাখবো।আর শুনুন মা আপনাকে বাসায় এসে খাবার খেয়ে যেতে বলেছে যদি আপনার কাজ বেশি থাকে তাহলে অফিসে পাঠিয়ে দিবে।
রক্তিম বললো,
~আমার জন্য কিছু করতে হবে না বাসায় সার্ভেন্টরা আছে তারা করে নিতে পারবে।
অধরা বললো,
~আমি জানিনা এসব মা জানে।
রক্তিম হেসে বললো,
~তাহলে তো আর কিছু বললেও চলবে না।
তখনই পিছন থেকে রুপসা বলে উঠে,

~পাপা।
রক্তিম পিছন ফিরে মেয়েকে দেখে জড়িয়ে ধরলো।
একটুপর সবাই একসাথে নাস্তা করতে বসলো নাস্তার টেবিলে সবাই কথা বলছে হঠাৎ রক্তিমের ফোন বেজে উঠলো। রক্তিম ফোন রিসিভ করে জানতে পারলো অফিসে অনেক জরুরি মিটিং পরে গেছে।রক্তিম জানালো সে আসছে।রক্তিম নাস্তা করেই ছুটলো অফিসে এদিকে রুপসাকে নিয়ে স্কুলে রওনা দিলো অধরা।

মনের আড়ালে পর্ব ৭