মনের কোণে শেষ পর্ব

513

গল্পের পরের পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে পরতে চাইলে notification অন করে রাখুন ok বাটনে ক্লিক করে

মনের কোণে শেষ পর্ব
আফনান লারা

নাবিল যেন কোনো কথাই শোনেনি।শুনলেও এক কান দিয়ে নিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে ফেলেছে।
লিখি আরও কিছুক্ষণ বকবক করে শুয়ে পড়েছিল।নাবিল তখন ওর গায়ের সাথে লেগে বসে বললো,’আর এমন হবেনা লিখু।।আসলে ভালবাসো নাকি বাসোনা সেটা বুঝতেই এত কিছু করা’
‘কি বুঝলেন?’
‘অনেক ভালবাসো’
‘মোটেও না’
‘আমার যা বোঝার তা বুঝে গেছি আর কথা কেটে লাভ নেই।’

বাসা ভর্তি মেহমানে গিজগিজ করছে আজ।অনাবিলের পক্ষের মেহমান আবার রুহুল আমিনের পক্ষের মেহমান।বিয়েতে বউকে খুঁজে পাওয়া যায় কোণার এক রুমে।
সেখানে সে বউ সেজে বসে থাকে।
আর এই বাড়িতে নতুন বউ স্টোর রুমে উঠে বসে গা ঢাকা দিয়েছে।তার কারণ কিছু সময় বাধে বুঝবেন।
অনাবিল আজকে একটা শেরওয়ানি পরেছে ছেলের রিসিপশানে।সেখানে বুকের জায়গায় একটা ব্রুচ লাগিয়েছিলেন যেটা কিনা দেখতে অসম্ভব সুন্দর ছিল।সেটাই খুঁজে পাচ্ছেন না অনেকসময় ধরে।
তাকে ব্যস্ত দেখে সবাই লেগে গেলো ওটা খুঁজতে।তার সেই ব্রুচটা লিখি নিয়েছে।
শ্বশুরের একটা জিনিস চুরি করার ইচ্ছা ছিল ওর।আজ সেটা সে পূরণ করলো।নাবিল চুরির কথা শুনলে ওকে এসে ধরবে এটা সে জানে আর তাই এখানে উঠে বসে আছে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

খুঁজে না পেয়ে অন্য একটা ব্রুচ পরে তিনি অনুষ্ঠানের কাজে চলে গেছেন।এদিকে চুরি হবার কথা নাবিলের কানেও পৌঁছে গেছে।সে সবেমাত্র তৈরি হয়ে রুম থেকে বের হয়েছিল।চুরির কথা শুনে লিখির নাম ধরে ডাকতে ডাকতে প্রতিটা রুমে সে উঁকি দিয়ে দেখছে ও আছে কিনা।
মানুষে গমগম করছিল পুরো বাসায়।দাঁড়িয়ে থাকার জায়গাও নেই কোথাও।নাবিল লিখিকে কোথাও পায়নি দেখে কল করলো কিন্তু সে রিসিভই করেনি।রিনতি ওকে এসে জানালো লিখিকে সে স্টোর রুমে উঠতে দেখেছে একবার।ব্যস হয়ে গেলো, নাবিল সেখানে এসে হাজির।লিখি বসে বসে মাথার চুলের পিন খুলছিল একটা একটা করে।পার্লারে ২৮টা পিন ওর মাথায় লাগানো হয়েছে।ওগুলো লাগানোয় মনে হচ্ছিল মাথা খেয়ে ফেলছে ধীরে ধীরে।
নাবিল কাছে এসে উপরে তাকিয়ে বললো, ‘এই নামো বলছি’
নাবিলের ডাক শুনে লিখি আরও ভেতরের দিকে চলে গেছে।

‘কি হলো শুনতে পাওনা?যদি আমি ওখানে আসি তো তোমার খবর করে দিবো।বাবার ব্রুচ তুমি নিছোনা?কি করবা ওটা দিয়ে?ওটা বেচে বড়লোক হয়ে যাবে?আমি জানি তুমি ওটা চুরির উদ্দেশ্যে নাওনি বরং অন্য কিছু ভেবে নিয়েছো, সেটার রহস্য বের করতে চাইনা আপাতত, নিচে নামো এখন’
লিখি চুপ করে বসে আছে যেন সে ওখানে নেই।
নাবিল টেবিল টেনে এনে ওটাতে উঠে সে নিজেও স্টোরে ঢুকে গেছে।
নাবিলকে উঠতে দেখে লিখি ভয়ে মুচরে গেছে।নাবিল শুধু খপ করে ওর হাতটা ধরে এক টান দিলো।তারপর ওকে নিচে নামিয়ে ওর থেকে ব্রুচটা কেড়ে নিয়ে সে বললো,’আজ তোমার খবর আছে লিখি।বিয়ে বাড়িতে এই টাইপের দুষ্টুমি করার ফল তুমি পাইবা।’
লিখি ব্রুচটা দিতে চাইলোনা,নাবিল জোর করে নিয়ে চলেও গেছে।নাবিলের এরুপ ব্যবহারে লিখির মন খারাপ হলো।সে চেয়েছিল শ্বশুর মশাই নিজে এসে বকুক।তার বকুনি খেতে ওর ভীষণ ভাল লাগে।এদিকে নাবিল সব কিছুতে পানি ঢেলে দিলো।আবার বলে নাকি খবর আছে।কি খবর আছে?

জনাব অনাবিল ব্রুচটা পেয়ে নাবিলের কাছে জানতে চাইলেন কই পেয়েছে।নাবিল বললো টেবিলেরর নিচে তখনই লিখি এসে বললো,’আমি নিয়েছিলাম আঙ্কেল।আমি চুরি করেছিলাম।এইবার বকুন আমাকে’
অনাবিল গম্ভীর ভাবে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে নাবিলকে বললেন,’তোমার বউয়ের দুষ্টামি কমাতে বলেছিলাম না?’
নাবিল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। লিখি গাল ফুলিয়ে বললো,’ফেরত দেওয়াই উচিত হয়নি।দেন আমি ফেলে আসি’
অনাবিল ব্রুচটা গায়ে পরে বললেন,’নাবিল আজ রাতে কষিয়ে একটা চড় মারবা ওর গালে।তাহলে দেখবা সারাজীবন ওর শয়তানি কমে থাকবে।বুঝতে পেরেছো?’
নাবিল মাথা নাড়ালো।বাবা চলে গেছে, লিখি গালে হাত দিয়ে নাবিলের সামনে এসে বললো,’আপনি সত্যি আমায় চড় মা*রবেন?’
‘বাবার আদেশ।কম দুষ্টামি তো করোনি’
‘তাই বলে মা/রবেন?’
‘হুম।এখন যাও ভদ্র বউয়ের মতন বসে থাকে সোফায়’।

রিসিপশান শেষে নিয়ম অনুযায়ী লিখি আর নাবিলকে বরিশাল যাওয়ার কথা থাকলেও রুহুল আমিন বললেন কদিন পর আসতে।কারণ কালই ওরা জার্নি করে এতদূর এসেছে।পরপর জার্নি ঠিক হবেনা।
তাই তারা সবাই চলে গেছেন।লিখি আর নাবিল ঢাকাতেই রয়ে গেলো।রাতে সামিয়ার কথামতন নাবিলের রুমটাকে ফুল দিয়ে সাজানো হলো।হইহুল্লড় হলো।
লিখি গালে হাত দিয়ে বসে বসে ভাবছে নাবিল না জানি সত্যি সত্যি চড় বসিয়ে দেয়।চিন্তায় তার কিছু ভাল লাগছেনা।ইচ্ছে করছিল বাবার সাথে বরিশাল চলে যেতে।
রাত ঠিক সাড়ে দশটার দিকে নাবিল আসলো রুমে।লিখি গালে হাত রাখা অবস্থায় খাটের সাথে লেগে বসে পড়েছে।নাবিল দরজা লাগানোর সময় সে তোতলাতে তোতলাতে বললো,’যদি আমাকে চড় দিছেন তো আমি কালই বাপের বাড়ি চলে যাব’
নাবিল মিটমিট করে হাসতে হাসতে দরজা লাগালো।তারপর ধীর পায়ে লিখির পাশে এসে বসলো।লিখি সিওর নাবিল ওর বাবার কথা মতন একটা দিবেই চড়।
সে ভাবছিল চড়ের পর কি করবে কিন্তু তার এতসব ধারণা নিমিষেই ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে নাবিল।ওর খুব কাছে এসে গালে চড়ের বদলে একটি মিষ্টি আদর মিশিয়ে দিয়ে সে আবার সরে গেছে।লিখি লজ্জায় লাল হয়ে নাবিলের দিকে তাকিয়ে থাকলেও নাবিল আরও লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল।

‘বাবার কথামতন তোমাকে চড়টা দিলে হয়ত তুমি সারাজীবন এই চড়টা মনে রাখতে,কিন্তু আমি তোমায় বিষাদ স্মৃতি দিতে চাইনি বলেই এটা করলাম।মাইন্ড করিওনা’
লিখি লজ্জায় টইটুম্বুর হয়ে ছিল বলে কোনো জবাব দেয়নি।নাবিল আবার বললো,’আমি জানি তুমি এরপর আরও চুরি করবে,ঘরেই করবে সেটাও জানি।বাধা দেবোনা।কারণ তোমার দুষ্টুমি আমার ভাল লাগে,আশা করি এই স্বভাব দিয়েই তুমি বাবার মনজয় করে নিতে পারবে।একদিন বাবাই তোমার এই চঞ্চলতাকে খুঁজবে।মিস করবে’
কেটে গেছে অনেকগুলো বছর।অনাবিল এখন আর বদমেজাজি নেই,তিনি এখন প্রাণচঞ্চল মানুষ।কারণ অবশ্য আছে,সেই কারণ হলো তার বড় ছেলের ঘরে দুটো নাতি।একজন ক্লাস টু তে পড়ে আরেকজন সবে পাকা পাকা কথা বলা শিখেছে।
ওদের ঢাকায় রেখে লিখি আর নাবিল বরিশালে গিয়েছিল।রুহুল আমিনের শরীর খারাপ।তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।তাই দুজনে মিলে তাকে দেখতে গেছেন।
এদিকে অনাবিল অফিসের কাজটাও করতে পারছেননা তার নাতিদের জ্বালানোতে।
তাদের একজনের নাম কানন আরেকজনের নাম কর্ণ।

সবচাইতে দুষ্টু হলো কানন।সে সারাদিন দাদুভাইয়ের দাঁড়ি টানবে।ঝুলেও থাকে প্রায় সময়।
এই তো এই বিকেলবেলা তিনি লুকোচুরি খেলছিলেন ওদের সাথে দূরের আম গাছটার পেছনে খিলখিল করে হাসি শোনা যায়।দুজন মিলে ওখানে লুকিয়েছে।লুকানোর আর জায়গা পায়নি তারা।দুজনের মুখ না দেখা গেলেও হাত দেখা যাচ্ছে।জনাব অনাবিল ফিক করে হেসে পা টিপে টিপে ওদিকে গিয়ে খপ করে দুজনকে ধরে ফেলেছেন একসাথে।
হাসাহাসির রই লেগে গেলো সেখানে।হঠাৎ তার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।আজ তিনদিন তিনি লিখি নাবিলকে দেখেননা।লিখি থাকলে ও সমেত দুষ্টুমি করত।সেদিনের নাবিলের বলা কথাটাই সত্য হলো।তিনি লিখির দুষ্টুমি টাই অনেক বেশি মিস করেন।
তাই তো এখন চারিদিকে লিখিকে খুঁজে বেড়ান।
কপালের ঘাম মুছে বাগানের একটা চেয়ার বেছে বসলেন তাতে।হাঁপ ছেড়ে ফোন নিয়ে নাবিলকে একটা কল করলেন।নাবিল জানালো তারা আজ ফিরে আসছে।রুহুল আমিন এখন সুস্থ আছেন।

তিনি একবার লিখির সাথে কথা বলতে চাইলেন।
”হ্যাঁ আঙ্কেল বলুন,কেমন আছেন?’
‘আমাকে একবার বাবা বলবে?’
কথাটা শুনে লিখি আশ্চর্য হলো।এত বছর সে আঙ্কেলই বলতো।আজ হঠাৎ এই কথা শুনে সে বুঝতে পারলোনা তিনি এ কথা কেন বললেন।
‘আচ্ছা বাবা,এবার একটু বিকালের নাস্তাটা করে নিন’
অনাবিল হাসলেন।হাসি থামিয়ে কলটা রাখলেন।লিখি কিভাবে যে বুঝলো তিনি নাস্তা করেননি।কানন কান লাগিয়ে শুনছিল লিখি কি বলে।আর কর্ণ বসে বসে ঘাস টানছে।সবুজ সবুজ ঘাস!! মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে,খেয়েওছিল কিন্তু একদিন আম্মু ওকে গরু বলায় তার গায়ে লাগছে কথাটা এরপর থেকে সে আর ঘাস খায়না।

লিখি নাবিলের কাঁধে মাথা রেখে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল আর নাবিল ড্রাইভ করছে।
কিছু সময় পরপর লিখি নাবিলের হাতে নখ দিয়ে খাঁমছাচ্ছিল, ওকে ডিস্টার্ব করতে দারুণ লাগে তার।নাবিলও এরকম। সব সহ্য করে যায়।
একটা গান চলছিল।গানটির নাম মনের কেণে।
লিখি খুব মনযোগ দিয়ে গানটি শুনছিল দেখে নাবিল বললো,’জানো তোমার জায়গা আমার কাছে কোথায়?’
‘কোথায়?’
‘মনের কোণে,যে কোণে আর কেউ জায়গা নিতে পারেনি, পেরেছো কেবল তুমি’
‘আচ্ছা আমরা কোথাই যাচ্ছি?এই পথটা তো ঢাকার না।ভুলে গেলেন নাকি?’
‘কল্পনাতে ভেলায় ভেসে
ঘুরবো আমি তুই’
‘ভেলায় ভাসবেন?কোথায় ভেলা?’
লিখির কথা শুনে নাবিল গাড়ীটা থামালো।দরজা খুলে নিচে নেমে ঘুরে এসে লিখিকেও গাড়ী থেকে নামালো।

এরপর ওর হাত ধরে সামনের দিকে নিয়ে এসেছে সে।সামনে একটা বিল।সেটাতে ভেলা আটকানো। একটা লোক ও ছিল,নাবিলকে দেখে উঠে চলে গেলো লোকটা।তারই ভেলা হয়ত।নাবিল লিখির হাত ধরে ভেলার কাছে এসে উঠালো ওকে।
লিখি প্রতিনিয়ত অবাক হচ্ছে।ভেলায় উঠে বসে বললো,’সব ঠিক করা ছিল নাকি?’
‘হুম ম্যাডাম।তারিখ কত মনে আছে?’
‘ওহহহহ হো ভুলেই গেছিলাম আজ তো আমাদের বিবাহবার্ষিকী ‘
‘ জ্বী ম্যাডাম,এবার বসে থাকুন আমি চালাই’
‘ভেলা চালাতে পারবেন?’
‘এ আর এমন কি!শুধু বাইবো।বসে থাকো তো।’
লিখি গালে হাত রেখে নাবিলের দিকে চেয়ে রইলো।নাবিল বিলের মাঝে এসে নিজেও বসলো লিখির পাশে।
বিলের চারপাশে সুপারি গাছ। এই বিল শেষ হলে ওপারে আরেকটা বিল।লিখি মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সবকিছু।নাবিল ওর ঘাঁড়ে হাত রেখে বললো,’দৃশ্য না দেখে আমাকে দেখোনা।এমন আনরোমান্টিক হয়ে গেলে কেন?’

মনের কোণে পর্ব ৩৭

লিখি ব্রু কুঁচকে এবার নাবিলের দিকে তাকালো।ওর গাল টিপে দিয়ে বললো,’২বাচ্চার মা আমি,মাথায় ঘুরতেছে কতক্ষণে বাসায় যাব।’
‘আমি যে এত কষ্ট করলাম তার বিনিময়ে কিছুই কি পাব না?’
লিখি মুখ বাড়িয়প নাবিলের গালে একটা চুমু দিয়ে বললো’নিন বাসর রাতের সেই আদর আমি ষোলআনা ফেরত দিলাম।আর কিছু লাগবে?’
নাবিল গালে হাত দিয়ে শক লাগার মতন লিখির মুখের দিকে চেয়ে রইলো।মনের কোণেটা কেঁপে উঠলো।এই শুকনো চুম্বন কেড়ে নিলো মনের কোণের গোটা জায়গাটি।
তার দখলে এসে গেছে সেই দলিল।মালিকানা কেবল এই মেয়েটির।

সমাপ্ত

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here