মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৪
তাসনিয়া নুর
চিত্রা আজকে বিন্দু মাত্র রাগ দেখালো না। বরং শান্ত মস্তিষ্কে হাই তুলে মাইরাকে বললো ,
— মাইরা আমাদের বাসায় বেডার মতো দেখতে কিছু বেডি আছে বুঝেছিস যার কাজ হচ্ছে সারাদিন অন্যের বিষয়ে নিজের বা হাত ঢুকিয়ে দেওয়া ।
আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না সে। সকাল সকাল এই গাধার সাথে ঝগড়া কে করবে? চিত্রার দিকে তাকিয়ে আহির ভেংচি কেটে,
— চুন্নি কোন খানের এই মেয়ের নাম চিত্রা না রেখে চুন্নি রাখা দরকার ছিল।
আহির এবার মাইরার কাঁধে হাত রেখে হতাশ স্বরে,
— জানিস যখন এই চুন্নি মেয়ে হয়েছিলো তখন নাকটা ছিল একদম চেপ্টা। এরে প্রথম দিন দেখেই আমি বড় আব্বুকে বলেছিলাম এই মেয়ের নাম চুন্নি আক্তার চচ্চরি রাখতে কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমার কথা কেউ সেদিন শুনেনি। যখন আমি কেঁদেকুটে ভাসিয়ে দিলাম তখন বড় আব্বু বললো ঠিক আছে ওর নাম আমরা তোমার চচ্চরির বদলে চিত্রা রাখব ।
‘হায়’ আহির হতাশার শ্বাস ফেলে দুধারে মাথা নাড়ে । মাইরা চোখ মুখ কুঁচকে ঝারা মেরে আহিরের হাত কাধ থেকে সরিয়ে দেয়। বিরক্তি মিশ্রত কন্ঠে বললো,
— তোমার এই কাহিনী শুনতে শুনতে বিশ্বাস করো আমার নাড়ি ভুড়ি কলিজা কিডনি সব মিক্স হয়ে চটপটি হয়ে গেছে । দেখি সরো সামনে থেকে।
আহির আবারো ভেংচি কেটে বিড়বিড় আওড়ালো,
— মীরজাফরের বংশধর সব ।
সবাই তৈরি হয়ে নিজেদের ব্যাগ প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে ডাইনিং রুমে উপস্থিত হয় । বিয়ে যেহেতু এক সমাপ্ত পরে তাই আপাতত তারা চলে যাচ্ছে। বিয়ের দুদিন আগে বাড়ির কর্তা গিন্নিরা যাবে। সায়মা বেগম ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বোঝানোর স্বরে বললেন,
— তোদের দায়িত্বে মেয়েগুলোকে দিচ্ছি । দেখে দেখে রাখবি এদের। ওদের যেনো কোনো সমস্যা না হয়।
— এদের আবার কি সমস্যা হবে বরঞ্চ দেখা যাবে এরাই কোনো কান্ড ঘটিয়ে বসে আছে ।
আয়ুব মির্জা খবরের কাগজ পড়তে পড়তে উত্তর দিলেন। আহির বাবার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে,
— আস্ত একটা হিটলার বাপ।
বাহিরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে আজ ড্রাইভ করবে আবইয়াজ। আবইয়াজের সাথে সামনে বেসেছে আহির । একে একে সবাই গাড়িতে উঠার পর আবইয়াজ গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ি আপন গতীতে চলছে পিছনে ফেলে যাচ্ছে চেনা প্রকৃতি। তবে গাড়ির ভিতর বিরাজ করছে নিরবতা । মাহির এবার একটা চিপসের প্যাকেট খুলে খাওয়া আরম্ভ করে । চিত্রা বিরক্তি নিয়ে বললো,
— কি ভূতের মতো সব চুপচাপ বসে আছো। বোরিং ফিল হচ্ছে।
আহির পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে ভাবুক স্বরে,
— আমাদের চৈত্রের খরার বোরিং ফিল হচ্ছে ইমম কি করা যায়?
আহির কিছুক্ষণ ভাবার এক্টিং করে এবার গলা খাকারি দিয়ে গেয়ে উঠে,
~ মাহির খাচ্ছে চিকেন তান্দুরি
তার পাশে বসা চিত্রা মুটকি
হার মেনেছে দুনিয়ার সব মুটকি
চিত্রা হচ্ছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মুটকিইই
ওহো মাহির খাচ্ছে চিকেন তান্দুরিইইইই..~
— ইম তুই তো গানটাকে আলু ভর্তা বানিয়ে দিলেন। নাকি লিরিক্স পারছ না? কোনটা ? শুন আমি গেয়ে তোকে শুনাচ্ছি,
~ রুম্পা চলেছে একা পথে সঙ্গী হলে
দোষ কি তাতে হার মেনেছে রাজমিস্ত্রি…
মাহিরের গান শেষ করার আগেই চিত্রা চিপস এর একটা প্যাকেট আহিরের দিকে ছুড়ে মেরে,
— তুই মুটকি তোর বউ মুটকি তোর তোর…..
রাগে চিত্রার শরীর কাঁপছে । প্রচণ্ড রাগী মেয়েটা পান থেকে চুন খসলেই রেগে যায়। তবে আহির সেদিকে পাত্তা দিলো না। সে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বললো,
— এসব আঠারো প্লাস গান এই আদহাম মির্জা আহির গায়না । ছি ছি কি অশ্লীল।
আবইয়াজ কার ড্রাইভ করতে করতে বলে,
— আহ তোরা থামবি । ঝগড়া না করলে তোদের পেটের ভাত হজম হয়না তাই না?
সকলে একজোটে বলে উঠে,
— নাআআ ।
কিছুক্ষণবাদে গাড়িতে আবারো পিনপিন নিরবতা। বাহিরে রোদের দেখা মিলেছে। বাহিরে প্রচণ্ড হিমেল হাওয়া যার দরুন গাড়ির গ্লাস অফ করে রাখা । কিছুদূর যাওয়ার পর বিরাট জ্যামের দেখা মিলে। আহির বসে বসে শিষ বাজাচ্ছিল , হুট করে কোথা থেকে এক মাতাল এসে গাড়ির গ্লাস ধাক্কাতে শুরু করে আর নাচা আরম্ভ করে । গাড়ির ভিতরে সবাই ভ্রু কুঁচকে সেদিকে দৃষ্টি তাক করে। আহির কিছু একটা ভেবে গাড়ি থেকে বের হয়, উপর নিচ মাতালটাকে পর্যবেক্ষণ করে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— সমস্যা কি?
মাতালটা দু দিকে কোমর দুলিয়ে নেচে উঠে, মাথায় হাত দিয়ে গান গাইতে থাকে। মাতালটার দেখাদেখি আহিরের নাচের তাল উঠে গিয়েছে ইতোমধ্যে, সে হাত দিয়ে মাতালটার টাকলা মাথায় তবলা বাজিয়ে গেয়ে উঠে,
‘ নেশা নেশা লেগেছে প্রেমের নেশা
তাই মজনু দিবে লায়লাকে শশা’
আবইয়াজ তাড়াতাড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে আহিরকে টেনে গাড়ি ভিতর ঢুকায় । এদিকে চিত্রা, মাইরা, মেহু হেসে কপোকাত । মাহির আহিরের দিকে ঝুঁকে মাথায় চাটা মেরে বললো,
— একটু আগে কে যেনো বলছিল ছি কি অশ্লীল আঠারো প্লাস সং এখন কি বলবি হ্যাঁ? নিজে যে মাঝ রাস্তায় হাজারো মানুষের ভিড়ে চৌষট্টি প্লাস সং গেয়ে আস্লি ।
আহির নিজের কলার টেনে ভাব নিয়ে বললো,
— ওসব আর্টিস্টদের ব্যাপার তুই বুঝবিনা।
আবইয়াজ এবার আহিরের দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— আর্টিস্টের রুচির এত দুর্ভিক্ষ যে শেষ পর্যন্ত একটা মাতালের সাথে ছি ছি ।
—- যে যেমন তার রুচিও তেমন ।
চিত্রার খুচা মারা কথায় আহির রেগে যায়, বেশ শুরু হয়ে গেলো আবারো এদের ঝগড়া। মাহির কানে হেডফোন লাগিয়ে ফেলে কে শুনবে এদের এতো বকবক।
প্রায় ছয় ঘন্টা জার্নির পর অবশেষে তারা পৌঁছে যায় আবইয়াজ, চিত্রার নানার বাড়ি। শহরের তোলনায় গ্রামের পরিবেশে ঠান্ডা বেশি । এক এক করে সবাই গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। চিত্রার নানা বাড়ি দুতলা তবে বাড়িটা দেখতে একদম কলকাতার বাড়ির মতো। চারদিকে দেয়াল দিয়ে ঘেরা, দেয়ালের সাথে রাস্তার দিকে ঝুঁকে আছে বিরাট এক কাঠগোলাপ গাছ, অধিকাংশ সময় ফুলের কারণে গাছের পাতা দেখা মুশকিল হয়ে পড়ে। বাড়ির পিছনে রয়েছে ছোটখাটো জঙ্গলের মতো তার ঠিক পিছনে ভাঙ্গা পরিত্যক্ত পুকুর।
চিত্রাদের ভিতরে ঢুকতে দেখে এগিয়ে আসে বাড়ির দারোয়ান জহির। লোকটার বয়স পয়তাল্লিশ গিয়ে ঠেকেছে । মাহির এক ভ্রু উচিয়ে লোকটার দিকে তাকায় কেননা এই লোকটাকে তার রবোটের চেয়ে কম মনে হয়না। চলাফেরা কথাবার্তা সব রবোটের মতো। জহির তাদের সামনে এগিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
— দেন আপনাদের ব্যাগ গুলা আমার কাছে দেন।
মাহির ঠিক বুঝতে পারলোনা লোকটা ধমক দিচ্ছে নাকি সাহায্য করতে এসেছে। চিত্রা কারো অপেক্ষা না করে ভিতরে দৌড়ে চলে যায়। ভিতরে ঢুকে দেখে সাইবা নিচেই আছে, চিত্রা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে ফেলে। আকস্মিক আক্রমনে সাইবা তাল সামলাতে ব্যর্থ হয় যার ফলে তারা উল্টে পিছনে থাকা সোফায় উল্টে পড়ে। চিত্রার নিচে সাইবা থাকায় ব্যাথায় সে হালকা আর্তনাদ করে উঠে । আহির ঘরে ঢুকে এদের অবস্থা দেখে সাইবার মাথার সামনে গিয়ে ব্যথাতুর স্বরে,
— আহারে বেচারি মেয়েটা বিয়ের আগেই পঙ্গু হয়ে গেলো। এখন এরে কে বিয়ে করবে, এই চিত্রা মুটকি তুই কিভাবে পারলি মেয়েটার এতো বড় সর্বনাশ করতে?
চিত্রা আস্তে ধীরে সইবার উপর থেকে উঠে বসে। তবে আহিরের সাথে তর্কে জড়ায় না । এতো খুশির দিনে এর সাথে ঝগড়া করে মুড কে অফ করবে?
চিত্রার দুই মামা। বড় মামা খলিল আহমেদ আর ছোট মামা বশির আহমেদ । বড় মামা খলিল এর দুই ছেলে এক মেয়ে আর ছোট মামার এক ছেলে এক মেয়ে। চিত্রার নানা মারা গিয়েছে গত তিনবছর আগে তবে নানি এখনো বেঁচে আছে।
চিত্রার দুই মামী আফিয়া ও বর্ষা চিত্রাদের দেখে হাসি মুখে এগিয়ে আসেন। নানি গুলবাহার হেসে চিত্রা, আবইয়াজের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
—- তোমরা আসছো এতো দিনে এই বুড়ির কথা মনে পড়লো?
চিত্রা নানির গলা জড়িয়ে বললো,
— যে সবসময় মনের ভিতর ঢুকে বসে থাকে তাকে নতুন করে কিভাবে মনে করব?
— হ্যাঁ কিউটি চিত্রা একদম ঠিকই বলেছে ।
গুলবাহার বেগম হেসে বলে উঠে,
— ভালোই তো পেকে গিয়েছো । আমার নাতনি কথা বলতে শিখে গেছে। আফিয়া বর্ষা যাও বাচ্চাদের রুমে নিয়ে যাও একটু ফ্রেশ হোক তারপর খেতে দাও।
রাত বারোটা গ্রামে অবশ্য একে গভীর রাত বলা হয়ে থাকে। রুম জুড়ে পায়চারি করছে আবইয়াজ। নতুন জায়গায় তার কিছুতেই ঘুম আসেনা প্রথমদিন। এভাবে ঘরে পায়চারি করতেও ভালো লাগছেনা তাই ভাবলো একটু বাহির থেকে ঘুরে আসা যাক। রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে করিডরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকায় অন্ধকার ছাড়া তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। বাড়িটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। আবইয়াজ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। তবে দরজার কাছে আসতেই তার ভ্রু কুঁচকে যায় মনে সন্দেহের দানা বাদে । এতো রাতে দরজা খুলা কেনো? তবে কি বাহিরে কেউ গিয়েছে? নাকি চোর ঢুকলো?
আবইয়াজ বের হয়ে চর্তুদিক তাকায় তবে তেমন কিছু চোখে পড়ে না। সস্ত্বির নিশ্বাস ফেলে সামনের দিকে হাঁটা ধরে। একটু সামনে আগাতেই কারো ফিসফাস কন্ঠস্বর কানে আসে। আবইয়াজ আরেকটু সর্তক হয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কিয়ৎক্ষন বাদে তার নজরে আসে এক নারী মূর্তি, অন্ধকারে তেমন একটা বুঝা যাচ্ছে না তবে মেয়েটার পরনে সাদা কাপড় মাথায় ঘুমটা দেয়া তবে লম্বা চুলগুলো ওরনা ভেদ করে কোমরে এসে ঠেকেছে । আবইয়াজ ধীর পায়ে সামনের দিকে আগায় । বাহিরে কনকনে শীতল হাওয়া বইছে ।
পিছনে ক্রমশ কিছু এগিয়ে আসার শব্দে ভয় পেয়ে যায় মেহু। এমনিতে রাত বারোটা তার উপর সে বাহিরে একা। মেহু আস্তে ধীরে নিজের মাথা পেছনে ঘুরায় , আবইয়াজ ততক্ষণে বেশ কাছে চলে এসেছে। মেহু পিছনে ঘুরতেই দুজনের দৃষ্টি মিলে যায়। এতো কিছু খেয়াল না করে মেহু জুড়ে চিৎকার দিয়ে উঠে তার সাথে আবইয়াজ ও চিৎকার দিয়ে উঠে ।
প্রচন্ড পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে মাহিরের তাই পানি খাওয়ার জন্য নিচে নেমে এসেছিল। সেই মুহূর্তে বাহির থেকে কারো চিৎকার ভেসে আসায় সেও ‘ভূত ভুত’ বলে চিৎকার দিয়ে বাহিরে বের হয়। মাহিরকে চিৎকার করতে দেখে মেহু আবইয়াজের চিৎকার আরো বেড়ে গিয়েছে । মাহির আবইয়াজ ও মেহুর সামনে গোল গোল ঘুরতে ঘুরতে চিৎকার করছে,
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৩
— ভূত ভূত ভূত…
আবইয়াজ এবার চিৎকার থামিয়ে বললো,
— কোথায় ভূত? কার ভূত? কোন ভূত?
মাহির চিৎকার থামিয়ে কোমরে হাত দিয়ে বললো,
— আমি কি জানি। তোরা দুজনইতো রাতের আঁধারে চিৎকার করছিস।
— আর তুই ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো চিৎকার করতে করতে চলে আসলি?
আবইয়াজের প্রশ্নে মাহির মাথা চুলকে দাঁত কেলিয়ে হাসে । আসলেই তো সে কেনো চিৎকার করছিলো?
ঠিক সে মুহূর্তে তাদের থেকে কিছুদূর থেকে ভেসে আসে আহিরের চিৎকার….
