Home মন পবনে বৃষ্টি মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৩

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৩

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৩
তাসনিয়া নুর

ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে মেয়েটি । ডাকু সর্দার ও পরিবারের সকলের দৃষ্টি মেয়েটির দিকে নিবদ্ধ । ডাকু সর্দার ও তার দল এখনও ঠকঠক করে কাঁপছে । এরই মাঝে আনোয়ার মির্জা সন্দেহভাজন দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন মেয়েটিকে। মেয়েটি অন্য কেউ নয় বরঞ্চ তাদের মেহু । শুধু আনোয়ার মির্জা নয় বাড়ির সকলে চিনতে পারল তাকে শুধুমাত্র ডাকাত দল ছাড়া। সাফিন মির্জা আয়ুব মির্জার কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
— আবার কি গন্ডগোল পাকাতে যাচ্ছে এরা?
— চুপ থেকে দেখতে থাক।
সাফিন মির্জা ভাইয়ের কথায় চুপটি মেরে গেলেন। হঠাৎ উপর থেকে ভেসে এল,
— রমলা কোথায় তুই? আজকে তোকে ছাগলের দুধ খাইয়ে মেরে ফেলব।
ডাকু সর্দারের ভ্রু কুঁচকে যায়। সে আহিরকে জিজ্ঞেস করে,

— ছাগলের দুধ খেলে কে মরে?
আহির ফট করে উত্তর দিল,
— আরে ইউনিক ভুত ।যারা দুধ খেলে মরে যায়। এখন কথা না এদের কাহিনী দেখ।
দুতলার ছেলেটিকে দেখে আরেকদফা বাঁজ পড়ল ঘরে । এটা তো আবইয়াজ। যার পরনে নীল লুঙ্গি ও সাদা হাতা কাটা গেঞ্জি। হাতে আবার একটা হারপিকের বোতল। আবইয়াজের অবস্থা দেখে আনোয়ার মির্জা হাসতে নিয়ে ও মুখ চেপে ধরলেন। তার ছেলে কিনা শেষে লুঙ্গি পড়ল। যে ছেলেকে কোনোদিন পরানো যায়নি আজ নিজ থেকে পরল।
আবইয়াজ রাগান্বিত দৃষ্টি নিয়ে মেহুর সামনে এসে দাঁড়াল । সে কটমট চাহনি যেনো সব কিছু ভস্ম করে দিতে প্রস্তুত। আবইয়াজ হারপিকের বোতলটা দেখিয়ে বলল,
— এই হারপিকের বোতল দিয়ে তুই আমাকে মেরেছিলি তাইনা । আজকে তোকে আমি এই লাঠি দিয়ে মেরে আকাশে উড়িয়ে দিব ।
মেহু বুকে হাত গুঁজে,

— তাই নাকি? দেখা আজ তোর পুরুষত্ব ।আমিও দেখব তুই কি করতে পারিস ।
আবইয়াজ গোপনে মেহুকে চোখ মেরে হাতে থাকা লাঠিটা উচিয়ে দিল ডাকু সর্দারের মাথায় এক বারি। পরপর মারতেই থাকল । ডাকু সর্দার নিজের মাথায় হাত দিয়ে কেঁদে বলল,
—- আমারে কেন মারতেছ? আমি বউ না তোর বউ ওইদিকে ।
কিন্তু কে শুনে কার কথা। আবইয়াজ ইচ্ছে মতো মারছেই। এদিকে আবইয়াজকে ভূত ভেবে ডাকাত দল তাদের সর্দারকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো না। সুযোগ বুঝে আহির, মাহির ও হাত পরিষ্কার করছে। আবইয়াজ থামতেই মেহু রেগে গর্জে উঠে,
— তোর এতো বড় স্পর্ধা তুই আমাকে মেরেছিস । দেখাচ্ছি মজা তোকে ।
ভুতনীর কথা শুনে ডাকু হতবাক। এতক্ষণ তো মারল তাকে আর এই মেয়ে বলে কি! চরম হতবাক ডাকু সর্দার । তাকে আরেক দফা হতবম্ব করে দিল মেহু। আবইয়াজের হাত থেকে হারপিকটা ছিনিয়ে নিয়ে বোতলের ক্যাপ খুলে সমস্ত হারপিক ঢেলে দিলো ডাকুর মাথায় । সারা মাথা শরীর ভিজে জবুথবুথ ।
ডাকুর অবস্থা দেখে মেহু হাসতে নিয়েও চেপে যায়। কিছুতেই ধরা পরা যাবেনা।
শুরু হয় আবইয়াজের আবারো মাইর । কিছুক্ষণ পর শুনা যায় পুলিশের সাইরেন। ডাকু সর্দার সচকিত হয়ে ঘুরে দেখে সদর দরজায় পুলিশ দেখা যাচ্ছে। সাথে সাথে ইলেকট্রিসিটি চলে আসে ।পুরো ডাইনিং রুম আলোকিত হয়ে উঠে।
পুলিশ এগিয়ে এসে ডাকু সর্দারকে বলে,

— তোকে অনেকদিন ধরে খুঁজেছি আজকে পেয়েই গিয়েছি । কনস্টেবল ধর এটাকে ।
হতাশাগ্রস্ত ডাকু সর্দারের নজর গেলো আনোয়ার মির্জার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ফিরোজা বেগমর দিকে । অমনি তার চোখ চকচক করে উঠল । কনস্টেবলকে ধাক্কা মেরে ডাকু সর্দার দৌড়ে গিয়ে ফিরোজা বেগমের হাত ধরে ফেলল। আকস্মিক আক্রমনে ভরকে গেলেন উপস্থিত সকলে । ডাকু অশ্রুসিক্ত নয়নে ফিরোজা বেগমকে বলল,
— এতদিন তুমি কোথায় ছিলে রুবাইদা? তোমারে কত খুঁজছি আমি । তুমি না আমারে ভালোবাসতা তাইলে অন্য জনরে কেমনে বিয়া করলা? আজকে আমি ডাকাত হইছি একমাত্র তোমার প্রেমে ছেঁকা খাইয়া। শুনছিলাম তুমি নাকি কোন বড়লোক বুইড়া বেডারে বিয়ে করছ।
সব কথা শুনে আনোয়ার মির্জা কেমন ‘থ’ মেরে রইলেন । সে কি বুড়া? অবশ্যই না। এখনো যথেষ্ট ইয়াং । রাস্তায় নামলে এখনও মেয়েরা তার পিছনে লাইন লাগাবে। আর কথা হলো তার বউয়ের এক্স ছিল? তাও এমন কাইল্লা ডাকাত?
ফিরোজা বেগম যেনো অবাকের চরম সীমানায় । চিনেনা জানেনা এমন লোক কিনা তার প্রেমিক বলে সম্বোধন করছে?

— রুবাইদা চল আজকে তুমি আমার সাথে যাবা।আজকে দেখি তোমার আমার ভালোবাসার মাঝখানে কে আহে।
ডাকু সর্দার টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন ফিরোজা বেগমকে । সবাই এখনো হতবম্ব । কি হচ্ছে এখানে মাথায় ঢুকছে না। এদিকে ডাকু ফিরোজা বেগমকে নিয়ে হাঁটা ধরে ।
আবইয়াজ চিৎকার করে বলে,
— আব্বু থামান ওই ডাকুকে । আপনার বর্তমান বউকে তার এক্স উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি থামান । না হলে আমার ফিউচার ভাইয়ের কি হবে? এখনো আমার ভাই দুনিয়াতে ল্যান্ড করার বাকি। আমি সম্পত্তি নিয়ে মারামারি করব কার সাথে? আব্বুউউউউউ…।
আবইয়াজে চিৎকারে হুশ ফিরে আনোয়ার মির্জার । তিনি দৌড়ে গিয়ে ফিরোজা বেগমের অপর হাত ধরে বললেন,

— এই ছাড় আমার বউকে। দশটা না বারোটা না একটামাত্র বউ আমার তুই ওটাকেও নিয়ে যাবি? না না আমি বেঁচে থাকতে তা হচ্ছে না। শুনিস নি আমার ছেলে কি বলেছে এখনো আমার আরেকটা ছেলে দুনিয়াতে ল্যান্ড করা বাকি।
নিজের কথায় নিজেই হতবম্ব হয়ে গেলেন আনোয়ার মির্জা। এ কি বলে ফেললেন তিনি?
চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলেন শ্বশুর বাড়ির সবাই কেমন তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার শাশুড়ি মাথা নিচু করে ফেলেছে। আর ভাইয়েরা মিটিমিটি হাসছে ।
পুলিশ অফিসার গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকাত দলকে নিয়ে যেতে লাগলেন। অবশ্য তাদের এমন সাহস ও অভিনয়ের জন্য অনেক প্রশংসা করতে ভুললেন না ।
পুলিশ চলে যেতেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন আনোয়ার মির্জা। হঠাৎ মাথা তুলে কটমট দৃষ্টি বউ তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২২

— বজ্জাত ছেলে তোমাকে দেখে নিব আমি।
দ্রুত স্থান ত্যাগ করলেন তিনি। আর বেশিক্ষণ থাকলে লজ্জায় মরে যেতে হবে। আবইয়াজ কাঁধ উচিয়ে বলল,
— যা বাবা আমি আবার কি করলাম?

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৪