Home মন পবনে বৃষ্টি মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৪

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৪

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৪
তাসনিয়া নুর

সাফিন মির্জা এগিয়ে এসে আবইয়াজের পিঠ চাপড়ে বললেন,
— আজকে তো একদম ফাটিয়ে দিয়েছিস । প্রাউড অফ ইউ, বয়েজ।
মেহু নাক কুঁচকে বলল,
— কিন্তু আব্বু আইডিয়া তো আমার ছিল।
— তাই তো বলি এমন আজাইরা বুদ্ধি কার মাথায় এলো ।
সাফিন মির্জার ফিসফিস কথাটা আবইয়াজ ও মেহু শুনে ফেলল। আবইয়াজ এবার হু হা করে হেসে উঠে। মেহু নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করে। সাফিন মির্জা মেয়ের পিছন পিছন ছুটতে ছুটতে,

— আরে মা আমি তো মজা করছিলাম। শুন মেহু মা দাঁড়া।
কিন্তু কে শুনে কার কথা রাগে দুঃখে দ্রুত রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
গুলবাহার বানু লাঠির ওপর ভর করে আস্তে ধীরে সোফায় বসে পরলেন । দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললেন,
— আজকে কত বড় অঘটন হওয়ার থেকে তোরা বাঁচিয়ে নিলি । পরশু সাইবার বিয়ে এই সময়।
তিনি আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন । আবইয়াজ এগিয়ে গিয়ে গুলবাহার বানুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল,
— আপনি শুধু শুধু চিন্তা করছেন নানু । দেখেন সবকিছু হ্যান্ডেল করে নিয়েছি আমরা। এই মাসেল বডি তো আর এমনি এমনি বানাইনি তাইনা।
আবইয়াজে কথায় হেসে দিলেন তিনি। আবইয়াজকে একটু জ্বালাতে বললেন,
— নাতি দেখি লুঙ্গি পড়েছে। তোকে দেখতে একদম তোর নানার মত লাগছে।
আবইয়াজ এবার নিজের দিকে নজর দেয়। লুঙ্গি তার কোনো কালেই পছন্দ নয়। শুধুমাত্র এই পাগলদের জ্বালায় তাকে এসব পরতে হয়েছে । আবইয়াজ তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ায়। একবার নিজের দিকে তাকিয়ে আরেকবার সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমরা ঘুম পাচ্ছে আমি গেলাম।
আবইয়াজ যেতেই গুলবাহার বানু হেসে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
— যাও তোমরা সবাই যার যার রুমে গিয়ে শুয়ে পরো । কাল আবার অনেক কাজ আছে।
নিজেদের ক্লান্ত শরীর নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো সবাই ।

সকাল এগারোটা। ঘর বাড়ি সাজাতে ব্যস্ত সবাই । আজকে সাইবার মেহেদি সন্ধ্যা। যত আত্মীয় স্বজন ছিল সবাই হাজির। পুরো বাড়ি মাতাম হয়ে আছে। সাইবার মামা বাড়ির সবাই উপস্থিত হলো।সাইবার বড় মামা ছামাদ রহমান তার বউ রিনা বেগম। দুই ছেলে তন্ময়, আহনাফ এক মেয়ে অনিমা । তন্ময় এবার ক্লাস টেনে আর আহনাফ অনার্স ফাইনাল ইয়ার। অনিমা অনার্স সেকেন্ড ইয়ার।
আফিয়া বেগম ভাই ভাবিকে দেখে আবেগে আপ্লুত হলেন । কতদিন পর তাদের দেখা ।
বাহিরে রান্নার দায়িত্ব দেখছিল আবইয়াজ। পরনের সাদা পাঞ্জাবিটা ভিজে একাকার । শীতের মধ্যেও সুর্য তার তেজ দিয়ে রেখেছে আজকে। আবইয়াজের কপাল থেকে টুপটাপ পানি পরছে। তাপে ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে ।
অপরদিকে আহির প্যান্ডেলের কাজ তদারকি করছে । দুই ভাইয়ের অবস্থা নাজেহাল।
আর এদিকে মাহির বসে বসে খাবার গিলছে। তার জন্য দুনিয়া বড়ই শান্তির ক্ষেত্র । খাবার খাচ্ছে আর বসে বসে চিন্তা করছে কিভাবে একটা মেয়ে পটানো যায়। বিয়ে বাড়িতে যদি কিছু সুন্দরী মেয়ের দেখা মিলে।
আহিরের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে ।এই মুহূর্তে পানি না খেলে বেঁচে থাকা মুশকিল হয়ে পরবে। আহির চারদিকে কাউকে খুঁজতে থাকে। অবশেষে তার চোখে পরে চিত্রা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। পরনে একটা হালকা নীল রঙা থ্রি-পিস। চিত্রাকে দেখতে পেয়ে আহির ডাক দিল,

— চৈত্রের খরা এদিকে আয় একটু ।
এতো মানুষের সামনে এমন সম্বোধনে চিত্রার রাগ উঠে যায়। বড় বড় কদম ফেলে আহিরের কাছে গিয়ে কর্কশ কন্ঠে জানতে চাইল,
— কি হয়েছে? এমন ষাঁড়ের মতো ডাকছো কেনো?
— আমি ষাঁড়?
— না তুমি জলহস্তী, গন্ডার, ভাল্লুক, উগান্ডার প্রবাসী।
আহির জোরে শ্বাস টেনে বলল,
— দেখ আমি ঝগড়া করার মোডে নেই। আমাকে এক গ্লাস পানি খাওয়া জলদি।
চিত্রা পানি আনলো ঠিকই তবে আহিরকে খেতে দিল না, পুরো পানি ঢেলে দিলো তার মাথায়। দিয়েই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল । হাসতে হাসতে বলল,
— আর আমার নাম নিয়ে বেঙ্গ করবে? হু?

কিন্তু আজ আহির বড্ড নির্লিপ্ত। চিত্রা হাসতে হাসতে ভ্রু কুঁচকে তাকায় আহিরের দিকে । কি ব্যাপার আজকে কিছু বলছে না কেনো?
আহির কেমন শীতল চোখে চিত্রার দিকে তাকিয়ে চলে যায় ভিতরে।
চিত্র শুষ্ক ঢুক গিলে ভাবে, আজ কি একটু বেশিই করে ফেলেছে?
এদিকে সূর্যের অতি তাপ সহ্য করতে না পেরে ঘরে ঢুকে আবইয়াজ । হাঁটতে হাঁটতে তার চোখে পড়ে মেহু ও আহনাফ হেসে হেসে কি যেনো কথা বলছে। কিন্তু ওদের হাসি সহ্য হলো না আবইয়াজের। মনে মনে এক ফন্দি আটে । পিছনে দুই হাত নিয়ে উপরের দিক তাকিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে এগিয়ে যায় সেদিকে। কৌশলে নিজের ডান বাহু দিয়ে মেহুকে ধাক্কা মারে । ভেবেছিল পরার আগেই তাকে জড়িয়ে নিবে। কিন্তু তার ধারনার হলো উল্টোটা । আবইয়াজ ধরার আগেই আহনাফ মেহুর হাত ধরে ফেলে।

— তুমি ঠিক আছো?
আহনাফের প্রশ্নে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
— হ্যাঁ ঠিক আছি।
— কিসের ঠিক আছি হ্যাঁ?
আবইয়াজের ধমকে কেঁপে লাফিয়ে উঠল মেহু ও আহনাফ । মেহু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে আর আহনাফ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। আবইয়াজ এবার নিজের থেকে বলতে আরম্ভ করে,
— কি ঠিক আছে হ্যাঁ? দেখে চলতে পারিস না বেয়াদপ মেয়ে? দিলি তো আমার পাঞ্জাবি খারাপ করে । এখন এই ঝোলের দাগ আমি কিভাবে ঠিক করব?
— ঝোলের দাগ? কি আজেবাজে বকছেন? আমি কখন ধাক্কা দিলাম আপনি নিজেই তো দিলেন। আর ঝোল কোথায় পেলেন?

— চুপ থাক বেশি বুঝিস? আবার বড়দের মুখে মুখে তর্ক দিচ্ছিস।
আবইয়াজ আবারো ধমকে কথাটা বলে হনহনিয়ে হাঁটা ধরে সামনে । আহনাফ মেহু আর্শয হয়ে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
আনোয়ার মির্জা সোফা থেকে উঠে যেতে যেতে ডাক দিয়ে বললেন,
— ফিরোজা একটু উপরে আসো তো ।
সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় কথাটা কানে যায় আবইয়াজের। সে হাই তুলে চিৎকার করে শুনিয়ে বলল,
— আব্বু আমার কিন্তু ভাই-ই চাই । বলে দিলাম।
আনোয়ার মির্জা তেড়ে আসতে আসতে বললেন,
— হতচ্ছাড়া দাড়াঁ তুই ।
— আমি দাঁড়ালেই তো কিছু হয়ে যাবে না তাইনা। আমার ভাই এনে দিন।
আনোয়ার মির্জার চোখে পড়ে ইতোমধ্যে সবাই এখানে উপস্থিত হয়ে গিয়েছে। লজ্জায় তার মাথা যায় যায় অবস্থা। আনোয়ার মির্জা কটমট দৃষ্টিতে আবইয়াজের দিকে তাকিয়ে রইলেন । আবইয়াজ সেদিকে তোয়াক্কা না করে চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে উপরে চলে যায়।

সন্ধ্যায় চারদিকে মানুষ ছোটাছুটি করছে। কেউ কেউ আবার আড্ডায় মশগুল । এমন সময় দারোয়ান জহির প্যান্ট শার্ট পরে হাজির। ফাহিম তো তাকে দেখে রীতিমতো অবাক । সবসময় লুঙ্গি পরা লোকটা আজকে প্যান্ট পড়েছে। আবার চোখে কালো সানগ্লাস।
এদিকে জহির নাটকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে আসছিল । হঠাৎ কিছু একটার সাথে বারি খেয়ে মুখ থুব্‌ড়ে পরে ।
ফাহিম হেসে বলে,
— বেশি ভাব নিলে যা হয়।

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৩

জহিরের এমন সাজের একমাত্র কারণ জরিনা। এমন শার্ট প্যান্ট পরা বাবুসা তার নাকি । জরিনাকে ইমপ্রেস করার জন্য আজকে ডান্স ও শিখে এসেছে। জহির ইশারা করতেই ফাহিম মিউজিক বাজিয়ে দিল । গানের তালে তালে জহির বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে নাচতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তার মনে পড়ে আবইয়াজকে একদিন দেখেছিল এক পা আরেক পা থেকে দূরে করে কি জানি করছিল। জহির ও সেটাকে ডান্স স্টেপ ভেবে যেই নিজের পা আরেক পা থেকে ফাঁক করল অমনি ‘ফটটটট’ করে কিছু ছিড়ে যাবার শব্দ শুনা গেলো। জহির চোখ বড় বড় করে নিজের পিছন তাকিয়ে দেখলো প্যান্টের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একেবারে ফেটে গিয়েছে। ভিতরের ছোট প্যান্টটাও দেখা যাচ্ছে ।
সবাই ইতোমধ্যে হাসিতে ফেটে পরেছে । লজ্জায় জহির পিছনে হাত দিয়ে ঢাকার ব্যর্থ প্রয়াস ।
জরিনা দূর থেকে মুখ ভেংচি কেটে বলে,
— উউউ বুইড়ার যৌবনে লাড়া দিছিল । এক্কেরে ভালা হইছে । তলা ছিড়া সব দেহা যাইতাছে ।

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৫