মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৫
তাসনিয়া নুর
জহির লজ্জায় দৌড়ে সেখান থেকে চলে গেলো। বাড়ির ছেলেরা আজ পরেছে গ্রে-কালার পাঞ্জাবী আর মেয়েরা ল্যাভেন্ডার শাড়ি । হলরুমে দাঁড়িয়ে আবইয়াজ, আহির গছিপ করছিলো ।
— দেখেছিস আমাকে আজকে কত
হ্যান্ডসাম লাগছে। মেয়েরা আজ বুঝি আমাকে দেখে ক্রাশ খেয়ে বেহুশ হয়ে যাবে।
আহিরের কথার পিঠে আবইয়াজ ক্রুর হেসে,
— বেহুশ হবে না রে। তোর মতো ছাগলকে দেখে নিজেদের কপাল চাপড়াবে । ভাববে কোন দুঃখে এখানে এসেছিল।
— শালা মিরজাফরের বংশধর ।
কথাটা কানে যেতেই আবইয়াজ আহিরের কলার চেপে দাতেঁ দাতঁ পিষে বলল,
— এই শালা মানে কি হ্যাঁ? তোর মতো রামছাগলের কাছে আমি কোনোদিন আমার বোন দিব না।
আহির নিজের কলার ছাড়িয়ে,
— তোর অমন চুন্নি মার্কা দেখতে বোনকে চাই-ও না আমার ।
— ঠিক আছে কথাটা যেনো মনে থাকে।
কথা শেষ করতেই আবইয়াজের নজর যায় সিঁড়ির দিকে । সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে আসছিল মেহু। পরনে তার মভ-ল্যাভেন্ডার রঙের এক মায়াবী অর্গানজা শাড়ি। লাইটের আলোয় শাড়ির টিস্যু সিল্কের জমিন চিকচিক করছিল। শাড়ির রুপালি সুতোর কারুকাজ করা সরু পাড়টি তার প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে তাল মিলিয়ে দুলছে।
মেহুর ঘন চুলগুলো সুনিপুণ এক খেজুর বেণী করে সামনে এনে রেখেছে । কানে বিঁধিয়ে রেখেছে খুব সাধারণ একজোড়া দুল, গলায় ঝুলছে সরু একটি চেইন যা তার গ্রীবার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মুখে সাজগোজের কোনো বাড়াবাড়ি নেই। স্রেফ ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক, চোখে কাজল ও আইলেনার ।
এই সামান্য সাজেই তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন স্বর্গভ্রষ্ট কোনো অপ্সরা নেমে এসেছে ধরণীর ধুলোয়। আবইয়াজ দূর থেকে সেই রূপ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের পলক পড়ছে না, নিশ্বাস যেন খানিকটা আটকে গেছে। বিমোহিত নয়নে, একদৃষ্টে সে তাকিয়ে রইল মেহুর দিকে ।
মেহু নামতেই চোখ যায় তার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে থাকা আবইয়াজের দিকে। মেহু সেসবে পাত্তা না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বাহিরে অনুষ্ঠানে চলে গেল। শুধু রেখে গেল বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আবইয়াজকে ।
আহির তখন থেকে আবইয়াজকে পর্যবেক্ষণ করছিল। আহির সামান্য এগিয়ে গিয়ে আবইয়াজের কানে হিসহিসিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— ব্রো, আর ইউ উইন লাভ ইউথ মেহু?
আহিরের কথা কানে যেতেই হুশ আসে আবইয়াজের । আবইয়াজ চোখ পাকিয়ে,
— উলটা-পালটা কথা বললে একদম মাটির নিচে গেড়ে দিব ।
— আমাকে গেড়ে দিলে তো আর সত্যি পরিবর্তন হয়ে যাবে না। তুই স্বীকার করিস অথবা না করিস আমি তো জানি তুই মেহুকে ভালোবাসিস ।
— স্টপ ইয়ার, মেহু আমার বোনের মতো।
আহির আবইয়াজের কাঁধে হাত রেখে শান্ত স্বরে আওড়ালো,
— হ, তুই বোন বোন করতে থাক আর আরেকজন এসে তাকে বিয়ে করে তোকে বাচ্চার মামা বানায় দেক। তখন বুঝবি কতো ধানে কত মরিচ।
আবইয়াজ কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আহিরের পানে। আহির হাই তুলে বাহিরে যেতে যেতে গেয়ে উঠে,
মেহু ও মেহুরে তুই অপরাধী রে, আমার
আবইয়াজ ভাইকে তুই মামা বানায় দিলি রে,
আমার আবইয়াজ ভাই এখন দুঃখ রাখবে
কই? তার দুঃখরা এখন লজ্জায় টাংকিতে
দেয় ডোব ।
এদিক – সেদিক ঘুরছে মেহু । হঠাৎ তার সামনে এসে আহনাফ মুচকি হেসে বলে,
— মেহু, ইউ লুক সো প্রিটি ।
মেহু কিছুটা ইতস্তত বোধ করল। এর জায়গায় অন্য কেউ হলে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিতো, কিন্তু যেহেতু চিত্রার মামাতো বোনের কাজিন তাই কিছু বলল না। সামান্য মাথা নেড়ে বলল,
— ধন্যবাদ ।
আহনাফ মেহুর দিকে ঝুঁকে এসে,
— এমন শুষ্ক ধন্যবাদ কে দেয়?
মেহু পিছিয়ে গিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
— দুঃখিত, আপাতত আমার কাছে তেল, পানি, মধু কিছুই নেই যে ধন্যবাদকে সেখানে ভিজিয়ে আপনাকে দিব । তাই এখন এই শুষ্ক ধন্যবাদটুকু রাখুন ।
মেহুর উত্তরে আহনাফ থতমত খেল।
দূর থেকে সব দেখছিল আবইয়াজ। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তাদের কাছে এগিয়ে এসে ধমকে,
— মেহুউউউ ।
আবইয়াজে হঠাৎ ধমকে কেঁপে উঠে মেহু, আহনাফ । মেহু ভ্রু কুঁচকে ভাবে, হয়েছে কি এনার আজকে? এমন উদ্ভট আচরন কেনো করছে?
— কি হলো ডেকেছি শুনতে পাসনি? তোকে চিত্রা ডাকছে । যা এখান থেকে ।
—- তো এটা সুন্দর করে বললেই তো চলে। এমন ধমকা-ধমকি কি আছে ।
মেহু মুখ ভেংচি কেটে সেখান থেকে চলে যায়। মেহু চলে যেতেই আবইয়াজ দু আঙুল কপালে ঘষে আহনাফের উদ্দেশ্যে বলল,
— মেহু থেকে দূরে থাকবে।
আহনাফ ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,
— কেনো?
— আমি বলেছি তাই।
— তুমি বলার কে? মেহুর তো সমস্যা নেই তাহলে তোমার কেনো এতো সমস্যা হচ্ছে?
আবইয়াজের রাগ মাথায় চরে গেলো। সে আরেকটু এগিয়ে আহনাফের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
— বিকজ সি ইজ মাইন । আই লাভ হার ।
উচ্চতায় আবইয়াজ আহনাফের চেয়ে একটু লম্বা। আহনাফ আবইয়াজের চোখের দিকে তাকিয়ে রয় কিছুক্ষন । তারপর বাঁকা হেসে বলল,
— আই অলসো লাভ হার। এর মানে কি মেহু আমার হয়ে গিয়েছে?
— মুখ সামলে মেহুর নাম নিজের মুখে নিবি না।
— একশতবার নিবো আর মেহুকে পটিয়ে তোর সামনে দিয়ে উড়াল দিয়ে নিয়ে যাবো দেখিস ।
— তোকে…..
আর কিছু বলার আগেই আহনাফ দৌড়ে পালায়। যতই সাহস দেখাক এই মুহূর্তে আবইয়াজের চোখ দেখে তার কলিজা কাপছেঁ । কিন্তু তার মানে এই না যে সে মেহুকে ছেড়ে দিবে। কিছুতেই না। প্রথম দেখায় মেয়েটাকে তার ভালো লেগে গিয়েছে। যেভাবেই হোক মেহুকে নিজের করে ছাড়বেই।
স্টেজে বসে আছে সাইবা । হাতে তার মেহেদি পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশে থাকা কাজিনরা এটা-ওটা বলে তার মজা নিচ্ছে । এখানে বসে থাকলেও ননীর মন এখানে উপস্থিত নেই। তার চোখ অধীর আগ্রহে কারোর জন্য অপেক্ষা করছে। এতো কষ্ট করে যার জন্য এতো সাজগোজ তাকে দেখাতে হবে না? কিন্তু মহারাজার দেখা মিললে তো ।
চিত্রা সেলফি তুলেছিল । হঠাৎ তার দৃষ্টি গেলো দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আহিরের দিকে। হাতে কলড্রিংকের গ্লাস । হেসে হেসে অবনির সাথে কথা বলছে। চিত্রা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। তারফর ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সামান্য হেসে বলল,
— আহির ভাই একটা সাহায্য লাগতো তোমার যদি একটু..
চিত্রার বাকি কথা না শুনে আহির অবনির দিকে তাকিয়ে বলল,
— বনি, আমার একটু কাজ আছে আসছি।
আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না আহির । চিত্রা কিছুটা অপমান বোধ করল। সে কি এতো বড় অন্যায় করে ফেলেছে যে তার সাথে কথাই বলছেনা। এই প্রথম আহিরের ব্যবহারে চোখ টলমল করে উঠল চিত্রার। সবসময় ঝগড়া করতে থাকা পার্টনার হুট করে এমন উদাসীন হয়ে গেলে আর যাই হোক সহ্য হয় না।
—- আমাকে কেমন লাগছে আজকে?
নারী রিনরিনে কন্ঠস্বর কানে আসতেই পিছনে ঘুরে তাকায় মাহির । ননী তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে একটা লাজুক হাসি। হাত দিয়ে বারবার চুল কানে গুজছে । মাহির জোরে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে । এ মেয়েকে নিয়ে সে কোথায় যাবে জানেনা। মাহির এতোটা অবুঝ না যে কিছু বুঝেনা। সবই বুঝে সে । বুঝে ও অবুঝ সেজে থাকে। বয়সের তোপে এমন আবেগে ভাসাটা স্বাভাবিক । কিন্তু সে তো কোনোদিন পাত্তা দেয়নি তারপরও কেনো মেয়েটা এভাবে তার পিছু পিছু ঘুরে বেড়ায়?
তার মনে যে এই মেয়েকে নিয়ে বিন্দুমাত্র অনুভূতি নেই সেটা কিভাবে বুঝাবে?
— কি হলো? কিছু বলছেন না যে।
— কারণ আমি বলে না করে দেখাতে চাই।
ননী ফট করে মাথা তুলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— মানে!!
— ওয়েট।
মাহির গিয়ে একটা গান বাজিয়ে দিল। আর ননীকে ইশারা করে বলল,
— দিস ইজ ফর ইউ ।
গানটা শুনতেই ননী বেক্কল বনে গেল । এ কেমন প্রশংসা?
কেননা ডেকসেটে যে গানটি বাজছিল ।
~ছি ছি ছি রে ননী, ছি ছি রে
ননী ছি রে ছি রে ছি~
দূর থেকে আহির চিৎকার দিয়ে বলল,
— কি বালের গান লাগিয়েছিস । চেন্জ কর ।
আহিরের বিরক্তিমাখা কন্ঠস্বর পেয়ে গান পরিবর্তন করে ফেলে ফাহিম ।
এদিকে স্টেজে উঠে ননীর মামাতো বোন মাইশা মাইকে বলল,
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৪
— হ্যালো, হ্যালো গাইস আমরা একটা গেম খেলব ।আজকে একজোড়া কাপল এই স্টেজে উঠে আমাদের ডান্স করে দেখাবে। লাইটের আলো যার উপর তাকেই ডান্স করতে হবে। সো স্টার্ট।
লাইটের আলো গিয়ে পড়তে নেয় আহনাফ ও মেহুর উপর কিন্তু তার আগেই মেহুকে ধাক্কা দিয়ে তার জায়গায় দাঁড়িয়ে পরে আবইয়াজ। মেহু ধাক্কা সামলাতে না পেরে চিত্রার উপর আছড়ে পরে ।
এদিকে সবাই আবইয়াজ ও আহনাফকে দেখে সবাই হতবাক। কেউ কেউ আবার মুখ চেপে হাসছে এরা কাপল?
আবইয়াজ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে নিজেও হতবাক। এ কেমন বেইজ্জতি ।
আহনাফ আবইয়াজ একসাথে বলে উঠে তারা ডান্স করবেনা। কিন্তু কেউ মানতে নারাজ। খেলার রুল্স তাই ওদের ডান্স করতেই হবে। শেষে বাধ্য হয়ে আবইয়াজ, আহনাফ স্টেজে উঠে পরে।
এদিকে আনন্দমুখর পরিবেশে সকলের অগোচরে গেট দিয়ে চোরের মতো ঢুকে পড়ে দুজন লোক।
