মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২
তাসনিয়া নুর
ছাদে উঠতেই এদের বেহাল দশা দেখে আতঙ্কে উঠলেন আনোয়ার মির্জা । পিছন থেকে চিত্রা ঠেলেঠোলে এগিয়ে এসে আহিরকে এই অবস্থায় পরে থাকতে দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পরে ।হাসির শব্দ কানে আসতেই আহির সেদিক তাকিয়ে বাড়ির মানুষকে দেখতে পেয়ে সস্ত্বী পায়। দৌড়ে গিয়ে আনোয়ার মির্জার পিছনে লুকিয়ে সামনের দিকে আঙুল তাক করে বলে
— বড় চাচ্চু দেখেন সামনে ভূত তাড়াতাড়ি নিচে চলুন না হলে আপনার ঘারটা মটকে দিবে । তখন আপনি হয়ে যাবেন কেল্লা ফতে ।
আহিরের কথা শুনে কপালে বারি দিয়ে মাহির আপন মনে বিড়বিড় করে বলে
— আমার ভাই আবেগে কেল্লা ফতে হয়ে গেছে কোথায় কি বলবে গাধাটা সেটাও ভুলে গেছে।
— এইখানে হচ্ছেটা কি?? এত বড় ছেলে হয়ে এইভাবে রাত বিরেতে চিৎকার চেঁচামেচি করার মানেটা কি? আর তোমাদের এই অবস্থা কেনো?
আনোয়ার মির্জার প্রশ্নে একটু আগের ঘটনা মনে পড়ে গেল মাহিরের। বাড়ির সদস্যদের দেখে হুট করে কথাটা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিল । এর মাঝেই আহির চিৎকার দিয়ে বলে উঠে
— বড় আব্বু আমরা ভূত দেখেছি ওইযে সামনে ।
আহিরের কথা শুনে আনোয়ার মির্জা সামনে তাকালেন। ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে আলোতে এগিয়ে আসলো মেহু। আনুয়ার সাহেব মেহুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন
— এতো রাতে তুমি ছাদে কি করছো মেহু??
— ঘরে একা ভালো লাগছিলোনা তার উপর আজকে চাঁদনি রাত তাই ভাবলাম ছাদ থেকে একটু ঘুরে আসি। আসতেই দেখলাম আহির ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছে যখনই উনার কাছে গেলাম উনি ভূত ভূত বলে দৌড় দিলেন আর এমনভাবে দৌড়াচ্ছিলেন লাগছিল উনি অলিম্পিক গেমে অংশগ্রহন করেছেন ।
কথাটা বলতেই হেসে ফেললো মেহু। মাহির পুরো ব্যাপারটা আচ করতে পেরে গলা খাকারি দিয়ে বলে
– আর বলবেন না বড় আব্বু এই ছেলেটাকে কত করে বুঝালাম ভূত প্রেত বলতে কিছু হয় না এভাবে ভয় পাশ না কিন্তু এই ছেলে আমার কথা শুনলোইনা।
মাহির কে এভাবে পল্টি নিতে দেখে অবাক হয়ে গেলো আহির, বলে কি এই ছেলে নিজে প্রথমে ভূত ভূত বলে চিৎকার করে দৌড়ালো আর এখন কিনা সবার সামনে হিরো সাজছে দাড়া তুই
-– তা এতই যখন জানিস সব বুঝিস তাহলে এভাবে পাগলা গরুর মতো দৌড়াচ্ছিলি কেনো আর ভূত গো বাঁচাও গো বলে চিৎকার কেনো করছিলি?? এই মেহু তুই বল এই মাহির করেছেনা?
আহির প্রশ্নটা মেহুর দিকে তাকিয়ে করে। মেহু উপর নিচ মাথা দুলালো যার মানে আহির যা বলছে সব সত্যি। আনুয়ার সাহেব ভালোভাবে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে গম্ভীর স্বরে বলেন
— হয়েছে এখন যে যার রুমে যাও এতো রাতে ছাদে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
নিজের কথা শেষ করে তিনি স্থান ত্যাগ করলেন। ফিরোজা বেগম সবার দিকে তাকিয়ে বললেন
— কি যে করিস না তোরা যা এখন তাড়াতাড়ি যা পরে না আবার তোদের বড় আব্বু রেগে যায়।
সবাই যার যার মত রুমে চলে গেল। ঘরের ভিতর ঢুকে চারপাশ একবার ভালো করে দেখে নিল আহির এতক্ষণ মাহিরের জন্য সবার সামনে সাহসী হওয়ার অভিনয় করলেও এখন রুমে ঢুকতেই প্রচন্ড গা ছমছম করছে । অপরদিকে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ব্যালকনিতে চলে গেলো মেহু। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে সামনে থাকা জারুল গাছটার দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে হেসে উঠল, গাছটা দেখতেই বোঝা যায় বহু পুরোনো দিনের গাছ হয়তোবা বহু অজানা জিনিসের সাক্ষী এই গাছ । মেহু ভিতরে ঢুকে এবার ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।
মির্জা বাড়ি বহু পুরোনো জমিদারি বাড়ি তিনতলা এই বাড়িটি নির্মান করেছেন রশিদ মির্জা। বাড়ির বাপাশে বহু পুরোনো দিনের একটি জারুল গাছ রয়েছে ঠিক তার একটু সামনে পরিত্যক্ত এক পুকুর। রশিদ মির্জা গত হয়েছেন এগারো বছর আগে যাওয়ার আগে তিনি বলে গিয়েছেন তার তিন ছেলে যেনো সবসময় একসাথে থাকে কখনো আলাদা না হয়, বাবার শেষ ইচ্ছা পালন করতে পরিবারকে আগলে রেখেছেন আনুয়ার মির্জা। রশিদ মির্জা তিন ছেলে আনুয়ার, আয়ুব, সাফিন তাদের স্ত্রী যথাক্রমে ফিরোজা, সায়মা, মুন । আনুয়ার মির্জার দুই সন্তান( চিত্রা, আবইয়াজ) আয়ুব মির্জার তিন সন্তান ( আহির, মাহির, মাইরা) সবশেষে ছোট ছেলে সাফিন মির্জার এক সন্তান মেহু ।
রাত দুইটা কি আড়াইটা আহিরের ঘুম ভেঙ্গে গেলো পেটে প্রচণ্ড চাপ পেয়েছে তাড়াতাড়ি ওয়াশরূমে যেতে হবে যেই উঠতে নিবে হুট করে রাতের ঘটনাটা মনে পরে গেলো। যেভাবে বসেছিল ঠিক সেভাবে আবার শুয়ে পড়লো শটান হয়ে, একবার ডায়ে তো একবার বায়ে তাকালো তেমন কিছু দেখতে না পেয়ে যখন উঠতে নিবে সেই মুহূর্তে বাহির থেকে কুকুরের আওয়াজ ভেসে আসলো আহির ঝট করে কম্ফর্টের নিচে ঢুকে দুয়া দুরুদ পড়া শুরু করে। কিছুক্ষন পর চোখ লেগে আসলে ঘুমের দেশে তলিয়ে যায়।
ঘুমের মধ্যে শ্বেতশ্বতে ভাব অনুভব হতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় আহিরের আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে বসে আবারো নিচে ভিজা অনুভত হওয়ায় কম্ফর্টা সরাতেই থমকে যায় আহির। আম্মা গো বলে চিৎকার দিয়ে সাথে সাথে নিজের মুখ চেপে ধরে, কেউ দেখলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে আর ওই চিত্রা জানলে তো আর তার ইজ্জত থাকবেনা বলবে এতো বড় দামড়া বুইড়া কিনা ঘুমের মধ্যে মুতে দিয়েছে ছিহ তখন কি বিছরি ব্যাপারটাইনা হবে । এখন কি করবে যেভাবেই হোক কাউকে জানতে দেয়া যাবেনা যেই ভাবনা সেই কাজ আহির তাড়াতাড়ি করে ব্যাটসিট তুলে ওয়াশরুমে গেলো।
মির্জা বাড়ির সামনে বড় এক বাগান রয়েছে সকাল সকাল ফুলের শোভেসিত বাগানে হরেক রকমের ফুলের সুন্দর্য উপভোগ করছে মেহু পাশে রয়েছে চিত্রা আর মাইরা। যখন থেকে ওদের মনে হচ্ছে মেহুর সাথে জ্বীন রয়েছে তখন থেকেই মেহুর আশেপাশে থাকতে খুব ভয় হয় ওদের তার মধ্যে রাতের সেই কাহিনী যদিও সেটা তখন মিটমাট হয়ে গেছিল তবু ও তারা এখনও পুরো ব্যাপারটা জানেনা আজকেই আহির থেকে জানতে হবে কাহিনী। কথাটা আনমনে ভাবতে লাগলো চিত্রা ।
— চিত্রা দেখ কি সুন্দর লাগছে ওই গোলাপটাকে একদম সব থেকে ভিন্ন তাই না?
মেহুর প্রশ্নে মাথা নাড়ালো চিত্র
— হুমম।
— একজন মালী খুব যত্ন সহকারে ফুলের গাছকে বড় করে তুলে, যখন গাছে ফুল ফুটে তখন সেই মালিই ফুলটাকে অযত্নে ছিড়ে ফেলে । ফুলটা তখন মুষরে যায় তার পাপড়িগুলো ঝরে পরে কোনো এক অজানায়। আমাদের জীবনটাও ঠিক একই রকম কেউ একজন আমাদের খুব ভালোবাসা দেখায় খুব যত্নে আগলে রাখে তারাই আবার হুট করে ওই ফুলটার মতো আমাদের দুম্ড়ে মুষরে দেয় ।
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১
মেহুর প্রতিটি বাক্য খুব মনোযোগ সহকারে শুনলো চিত্রা পুরোটা কথায় কি ছিল জানা নেই তবে প্রত্যেকটা বাক্য তাকে খুব প্রভাবিত করেছে। মেহু তার দেড় বছরের ছোট কিন্তু কখনো সেই রকম ভাবে মিশেনি ওরা সবসময় সমবয়সীদের মতো চলেছে ।হুট করে এই মেয়ের এতো পরিবর্তন ধরতে পারলোনা চিত্রা। এখন আবার কেমন গভীর গভীর কথা বলছে এই পরিবর্তনের পিছনের রহস্য কি? আসলেই কি মেহুকে জ্বীন ধরেছে নাকি ব্যাপারটা অন্য কিছু?? আর কিছু ভাবতে পারলোনা চিত্রা।
