মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩৪
তাসনিয়া নুর
— তোর কারনে আজ আমার পুরুষত্বের উপর আঙুল উঠল ।
আহিরের কথায় আবইয়াজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
— হারামি চুম্মা চুম্মি তুই আমাকে জোর করে করছিলি আর এখন সব দোষ আমার উপর দিচ্ছিস?
— তো তোকে কে বলেছে চুম্মা দে গু দে এসব পাসওয়ার্ড দিতে ।
— একশতবার দিব তোর কি?
— তাহলে আমিও একশতবার চুম্মা দিব ।
— হালা গে কোথাকার।
আহির মুখ বাঁকিয়ে টেবিল থেকে ল্যাপটপটা হাতে নিতেই আবইয়াজ ছো মেরে সেটা নিয়ে নিলো ।
— আমার ল্যাপটপ দিয়ে কি কাজ তোর।
— কাজ আছে দে না ভাই একটু।
— না দিব না।
— কেনো তুই কি আমাকে অ-ট্রাস্ট করিস?
আবইয়াজের কুঁচকানো ভ্রু আরও কুঁচকে গেল।সে অবুঝভাবে জিজ্ঞেস কৱল,
— অ-ট্রাস্ট মানে?
— আরে অ-ট্রাস্ট অ-ট্রাস্ট , যেটা ভেঙে গেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না গরুমার্কা দেবদাস হয়ে যায়।
— ওটা অবিশ্বাস হবে মূর্খ।
আহির কোমরে হাত দিয়ে ঝগড়া করার মতো করে বলল,
— এটা বাংলা ও ইংরেজি মিক্স ভার্সন ক্ষিশিত পোলা । তুই বুঝবিনা।
আবইয়াজ এবার রেগে ওর দিকে তেড়ে আসতে নিলে আহির ভো দৌড় মারে ।আবইয়াজ বিড়বিড় করে কিছু গালি দিয়ে দেয়। পরমুহূর্তে মনে পরে মেহুর ভুল আগে ভাঙাতে হবে, কথাটা ভেবেই আবইয়াজ ভৌ দৌড় মারে ।
তীব্র অস্বস্তি নিয়ে ননীর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাহির। মন খুঁতখুঁত করছে । কখনো বলছে যা আবার কখনও বলে গিয়ে কি বলবি ওকে?
গত কয়েকদিন ধরে ননী মাহিরকে ইগনোর করেই যাচ্ছে। কিন্তু কেনো যেনো সেটা মাহিরের সহ্য হচ্ছে না। তাই আজকে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে ননীর সাথে যেভাবেই হোক কথা বলতে হবে।মাহির কিছুক্ষন বাহিরে দাঁড়িয়ে থেকে হাসফাস করতে করতে রুমে ঢুকে পড়ল। রুমে ঢুকে ননীকে দেখতে না পেয়ে ভ্রু আপনা-আপনি কুঁচকে গেল । মাহির চারদিক ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বারান্দার দিকে পা বাড়াল । বারান্দায় যেতেই মাহিরের দৃষ্টি আটকায় হালকা বেগুনি থ্রি-পিস পরিহিতা ননীর পানে, যে আনমনে বাহিরে তাকিয়ে থাকতে ব্যস্ত। মাহির এবার গলা হালকা খাকারি দিয়ে বলল,
— এখানে কি করছো?
ননী পিছনে না ঘুরেই প্রতুত্তর করল,
— আপনি এখানে কি করছেন?
ননীর এহেন প্রশ্নে মাহির চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষন সেখানে পিনপিন নিরবতা বিরাজমান রইল।ননী তখনও পিছন ঘুরে তাকালো না, সেভাবেই দাঁড়িয়ে মাহিরের উত্তরের অপেক্ষায় থাকল। মাহির সেই নিরবতা ভেদ করে বলল,
— তুমি আমাকে ইগনোর করছো কেনো?
— আপনি তো সেটাই চাইতেন যেনো আমি আপনার থেকে দূরে থাকি। তাই আপনার যেনো আর বিরক্তিবোধ না হয় তাই যথাসম্ভব আপনার থেকে দূরে থাকি।
— কিন্তু আমি চাইনা তুমি দূরে থাকো।
মাহিরের কথা শুনে ননী তরিৎবেগে তার দিকে ফিরে প্রশ্ন করল,
— কেনো?
মাহির চুপ করে ননীর চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল। মাহির থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে ননী ছলছল নয়নে মাহিরকে আবারো জিজ্ঞেস করল,
— কেনো আপনি চান না আমি আপনার থেকে দূরে থাকি? বলুন।
মাহির ননীর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পা ঘুরিয়ে সেখান থেকে চলে গেল নিঃশব্দে। মাহিরের যাওয়ার পানে তাকিয়ে ননীর চক্ষু থেকে দু-ফোটা অশ্রুকনা গড়িয়ে পড়ল, সে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড়য়ে বলল,
— বলুন মাহির ।
বিগত ত্রিশ মিনিট ধরে মেহুকে বুঝিয়ে যাচ্ছে আবইয়াজ, কিন্তু মেহুর একটাই কথা সে পুরুষ না অন্য কিছু। মেহুৱ মুখে নিজের ব্যাপারে এরকম কথা বারবার শুনে নিজেকে অনেক কষ্টে কন্ট্রোল করে রেখেছিল আবইয়াজ। কিন্তু শেষে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। এক ধাক্কায় মেহুকে বেডের উপর ফেলে নিজে তার উপর আধশোয়া হয়ে মেহুর দুহাত চেপে ধরে। আবইয়াজের আকস্মিক আক্রমনে থতমত খেয়ে যায় মেহু।সে কখনো ভাবতে ও পারেনি আবইয়াজ এমন কিছু করবে, জানলে কখনও আবইয়াজকে রাগাতো না । অতিরিক্ত রাগে আবইয়াজের কপালের শিড়া ফুলে উঠেছে । সে দাতেঁ দাতঁ পিষে বলল,
— খুব বাড় বেড়েছিস ।থাপড়ে একদম সবকটা দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদপ । আরেকবার আমার পুরুষত্বে আঙুল তুললে একেবারে দেখিয়ে দিবো আসল পুরুষ কাকে বলে।
কথাটা বলে আবইয়াজ মেহুর উপর থেকে উঠে হনহনিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। মেহু দুহাত দিয়ে বুক চেপে ধরে, অসম্ভব ভাবে কাপছেঁ।ধুকধুকানি বন্ধই হচ্ছে না । আবইয়াজকে কখনো এতোটা রাগতে সে দেখেনি যার ফলে ভয়টা একটু বেশিই পেয়েছে।
মেহুর রুম থেকে বের হওয়ার পর আবইয়াজের কানে কারো ফিসফাস কন্ঠস্বর ভেসে আসে। আওয়াজকে অনুসরন করে সামনে যায়। চিত্রার রুম থেকে ভেসে আসছিল আওয়াজ। আবইয়াজ দরজা খুলতেই শুনতে পায়,
— সরি বেবি।
চিত্রাকে বলা আহিরের এমন কথা শুনে আবইয়াজ রেগে দরজা ঠাস করে খুলে দ্রুত পায়ে রুমে ঢুকে পড়ল । আহির ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে লাফ দিয়ে চিত্রার গা ঘেসে দাড়িয়ে গেল । এমন দৃশ্য দেখে আবইয়াজ চারদিক পর্যবেক্ষণ করে এক কোন থেকে ঝাড়ু বের করে আহিরের দিকে তেড়ে গেল। আহির ভয়ে চিত্রার পিছনে লুকিয়ে বলল,
— এই ভাই ঝাড়ু পেটা করবি নাকি? এখন তো আমি কিছু করিনি।
আবইয়াজ ফুসতে ফুসতে বলল,
— তুই আমার বোনকে বেবি কেনো ডেকেছিস?
আহির ভয়ে শুষ্ক ঢুক গিলে বলল,
— আরে আমি বেবি কখন বললাম, আমি তো বলেছি সর গুওয়ালি ।
চিত্রা রেগে এবার আহিরের দিকে ঘুরে বলল,
— ভাইয়া একে মারো, মারতে মারতে আজকে মেরেই ফেলো ।তোমার বোন তোমার সাথে আছে।
তারপর আর কি দুই ভাই-বোন মিলে আহিরকে কেলিয়ে দিলো । শেষে আহির নিজের কোমড় ধরে কাদুকাদু হয়ে বলল,
—- আর আসব না চিত্রার ঘরেতে
দুই ভাই-বোন মিলে মেড়েছে আমাকে
এখন আমি পাছায় ধরে বিরহে কাঁদি রে ।
সবেমাত্র ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছিল অর্ক।ফোনে টুং শব্দ হতেই সে এগিয়ে গিয়ে বেডের উপর থেকে মোবাইলটা হাতে নিলো।মোবাইলটা হাতে নিতেই দেখল মাইরা ম্যাসেজ পাঠিয়েছে সে যেনো বাসার পিছনে জারুল গাছটার সামনে তার সাথে দেখা করে।ম্যাসেজটা পড়ে অর্কের ভ্রু কুঁচকে গেল।সে বুঝতে পারলো না মাইরা এই সময় কেনো দেখা করতে চাচ্ছে তা ও ঘর থেকে বাহিরে ।অর্ক এবার সময়টা দেখে নিলো এগারোটা বাজে। অর্ক মোবাইলটা পকেটে নিয়ে বাহিরের দিকে হাঁটা ধরল।
জারুল গাছের কাছে পৌঁছে দেখতে পেলো মাইরা ততক্ষণে সেখানে উপস্থিত। অর্ককে নিজের কাছে আসতে দেখে মাইরা কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
— এতো রাতে আমাকে এখানে কেনো ডেকেছেন।
মাইরার কথা শুনে অর্কের চোয়াল ঝুলে যাবার উপক্রম ।বলে কি এই মেয়ে নিজে তাকে ডাকলো আর এখন কিনা বলছে সে কেনো ডেকেছে।
— মাথা ঠিক আছে? তুমি নিজেই তো আমাকে ম্যাসেজ দিয়ে আসতে বললে।
— আপনি…
মাইরার কথা সম্পন্ন করার আগেই দেখতে পেলো আহির, মাহির, চিত্রা এদিকেই আসছে ।ওদের আসতে দেখে মাইরা ভয় পেয়ে বলল,
— ওরা এখানে আসছে? আমাদের ধরতে??
অর্ক ও সেদিকে তাকিয়ে রইল। আহির এসে ওদের দুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
— তোরা এখানে কি করছিস?
মাইরা ফট করে বলে ফেলল,
— আমাকে অর্ক ভাই ডেকেছে।
অর্ক চোখ বড় বড় করে বলল,
— আমি কখন ডাকলাম? তুই নিজেই তো আমাকে ম্যাসেজ দিলি।
অর্ক এবার ওদের তিনজনকে জিজ্ঞেস করল,
— কিন্তু তোরা এখানে কেনো এসেছিস?
— আমাকে চিত্রা ডেকেছে।
চিত্রা আহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
—নিজে আমাকে ডেকে আমার নাম দিচ্ছো কেনো?
আবইয়াজ ওদের থামিয়ে বলল,
— ওয়েট ওয়েট ওয়েট যদি আমরা একে অপরকে না ডেকে থাকি তাহলে আমাদের ডেকেছেটা কে?
— আমরা ।
কারো শক্ত কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই আহির, মাহির, মাইরা, চিত্রা, আবইয়াজ, অর্ক উপরে তাকাতেই ওদের শরীর হীম হয়ে আসে। চারদিকে মৃদুমন্দ বাতাস আরো ঠান্ডা করে দিচ্ছে। মাইরা ভয়ে “ওমাআআআআ” বলে চিৎকার করে সামনে থাকা অর্ককে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে চিত্রার কাছে দৌড় দেয় ।মাইরার ধাক্কা সামলাতে না অর্ক উল্টে নিচে পরে গেল। আবইয়াজ, আহির, মাহির এখনো হা হয়ে গাছে ডালে বসে থাকা মেহু ও ননীর দিকে তাকিয়ে আছে। যাদের পরনে সাদা শাড়ি ও সাদা ব্লাউজ, লম্বা চুলগুলো সামনে এনে রেখেছে চোখের উপর নিচ গাঢ় কালো যেনো কাজল দিয়ে একে রেখেছে। হাতে থাকা ল্যাগ পিস যেটা মেহু ও ননী কামড়ে খাচ্ছে।
মাহিরের হুশ আসতেই সে চিৎকার করে বলল,
— মেহুর ভূত আমার ননীকে ধরেছে রেএএএ।
মাহির এক পাশ হতেই তার পা গিয়ে পড়ে অর্কের হাতের উপর। অর্ক দাতঁ পিষে আর্তনাদ করে উঠে।অর্কের আর্তনাদ শুনে মাহির ভয়ে চিৎকার দিয়ে এলোপাতাড়ি অর্কের পিঠে ধামধুম কিল বসাতে থাকে । তারপর গাছের উপর তাকাতেই দেখে ননী তার দিকে দাতঁ দেখিয়ে কটমট আওয়াজ করছে মাহির ভয়ে অর্ককে আরো কয়েকবার মেরে টান দিয়ে পিছনের শার্ট ছিড়ে ফেলে ।
একদিকে ভূতের ভয় অপরদিকে মাহিরের এমন নিষ্ঠুর মার খেয়ে অর্ক ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে বলে উঠে,
— ভাই তোদের হাত সাফ করার জন্য কি শুধু আমাকেই পাস।
অন্যদিকে আহির ভয়ে চিৎকার করতে করতে আবইয়াজের কোলে উঠে পড়েছে। আহির কোলে উঠার পর নিজের হাতে ভেজা অনুভূত হতেই আবইয়াজ আহিরের পানে তাকায়। আহির তার দিকে নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে বলল,
— সরি ব্রো । কন্ট্রোল করতে পারিনি।
আবইয়াজের হাতটা আবইয়াজের নাকের কাছে নিয়ে আহির বলল,
— গন্ধ নেই ব্রো একদম পিওর, বি-ব্রেথ না হলে শুকে দেখ।
হাতটা আবইয়াজের নাকে লাগতেই তার বমি এসে পড়ে। কোনো রকমে নিজেকে সামলে নেয় আবইয়াজ। অন্য কিছু শুনতে না পেলেও মাঝের কথাটা শুনতে পেয়ে চিত্রা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— বি-ব্রেথ মানে কি?
আহির আবইয়াজের কোলে থেকেই চিত্রাকে বোঝানোর স্বরে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল,
— বি মানে বি আর ব্রেথ মানে শ্বাস = বিশ্বাস। মূর্খের দল ইংলিশ ও জানিস না।
চিত্রা রেগে ফুস হয়ে বলল,
— তোকে যে ইংলিশ শিখিয়েছে তার মাথায় গরুর গোবর পরুক।
ওদের চিৎকার শুনে বড়ড়া ততক্ষণে নিচে আসছে দ্রুত পায়ে । সাফিন মির্জা বিরক্তি নিয়ে বললেন,
— এদের জ্বালায় শান্তিতে একদিন ও ঘুমাতে পারি না। আল্লাহ জানে এদের কি খেয়ে জন্ম দিয়েছিলাম। যদি জানতাম তাহলে সেই জিনিসটা বাংলাদেশ থেকে উপড়ে ফেলে দিতাম।
পাশ থেকে আয়ুব মির্জা বলে উঠেন,
— হ বাংলাদেশ তো তোর বাপের ।
— হ আমার বাপের-ই ।
— আহ চুপ কর তোরা ।
আনোয়ার মির্জার ধমকে তারা চুপ হয়ে গেলেন।
সেখানে পৌঁছে আয়ুব মির্জা কিছু বলতে যাওয়ার আগেই মাহির চিৎকার করে বলল,
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩৩
— আব্বু ভুত ভুত গাছের উপর দুই পেত্নী।
ছেলের চিৎকার শুনে আয়ুব মির্জা ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলেন ।অতি ভয়ে কানে হাত দিয়ে গোল গোল ঘুরতে আরম্ভ করলেন। সাফিন মির্জা তো ভয়ে আনোয়ার মির্জার কাঁধে উঠে গেলেন।
