মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৫
শ্যামলী রহমান
সারাটি বিষন্নতায় কেটেছে।দেওয়ান বাড়ির প্রায় সকলের মনে হারানো মানুষের স্মৃতি মনে করে কেঁদেছে। আফসোস বড় কঠিন জিনিস। সব ফুরলেও আফসোস ফুরোস না। মনে হয় যদি এমনটা না করতাম তাহলে হয়তো তেমনটা হতো না।আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তাই হবে। আমরা কেউ তা পরিবর্তন করতে পারবো না। পারবো কেবল আফসোস করতে।বাড়ির পাশে পুকুরের ধারে শিমুল গাছ আছে।শিমুলে গাছে লাল রঙা শিমুল ফুলে ভরে গেছে। মিথি আর রিতি সন্ধ্যা হওয়াতে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে ছিলো। তখনই একটা শিমুল ফুল পড়লো। রিতি দৌঁড়ে গিয়ে নিয়ে আসলো।মিথির হাতে দিয়ে বলল,
“বসন্তের সব ফুল লাল হয় কেন আপা?
শিমুল লাল, কৃষ্ণচূড়া লাল, পশাল ও লাল।
মিথি ফুলটা নেড়েচেড়ে উত্তর দিলো,
“কারণ বসন্ত রঙীন বলে।
বসন্ত আসে ফুলের সমারোহ নিয়ে,প্রেমিক প্রেমিকার মনে ভালোবাসার উচ্ছাস নিয়ে।কুকিলের ডাক,গাছের নতুন রূপ,ফুলের মতোয়ারা সুবাস।
সবই রঙিন,রঙিন লাগে না?এজন্যই হয়তো লাল সব কিছু। মানুষ বলে ভালোবাসার প্রতিক লাল।
এতটুকু বলতেই হঠাৎ মিথির মনে পড়লো প্রহরের বলা কথাটা।সবাই জীবনে বসন্ত কি আসলেই রঙিন?প্রহর ভাই যে বলেছিলো,
“সবার জীবনে বসন্ত রঙীন হয়ে আসলেও,
আমার জীবনে বসন্ত আসে কেবল ঝরা পাতার মৌসুম নিয়ে।
ঝরাপাতা বলতে কি ফুফি চলা যাওয়াকে বুঝিয়েছিলো?হতে পারে তার মৃত্যু বার্ষিকী তো এই বসন্তেই পড়ে। সে একবার আশে পাশে তাকালো কাউকে নজরে পড়লো না। রিতিকে জিজ্ঞেস করলো,
“প্রহর ভাইকে দেখেছিস?
“হুম দেখেছিলাম। একটু আগে তার বন্ধুরা মিলে গ্রামের ওই দিকে গেলো। আজকাল তুমি পিয়াস ভাই কে বাদ দিয়ে প্রহর ভাইয়ের খোঁজ কেন করো বলো তো?
মিথি হকচকিয়ে গেলো। রিতির কথা বোধগম্য হলো সামান্য। আমতা আমতা করে বলল,
“ক কেন খোঁজ নেওয়া বারণ?পিয়াস ভাই যেমন তিনিও তো তেমন।
“না তিনি তেমন নয়। পিয়াস ভাই বেশি ভালো। প্রহর ভাই তো সব সময় কেমন গম্ভীর হয়ে থাকে।
“গম্ভীরতার কারণ জানলে এমন বলতি না।উনার দুঃখ কষ্টের কি শেষ আছে? তোর বাবা মা না থাকলে কেমন লাগবে?
এতটুকু বলতেই রিতি আতকে উঠলো,বলল,
“না,না আব্বা আম্মা শত বছর বেঁচে থাকুক। আম্মা বকা দিলেও ভালোবাসে। সে না থাকলে ভালোবাসবে কে?আমায় খাওয়াবে কে?তার মতো কেউ ভালেবাসতে পারবে না।
“তাহলে বুঝ উনার কেউ নেই।তাহলে কেমন হয়ে থাকবে?
রিতি একটু ভাবলো। তার মন খারাপ হলো।হয়তো বুঝতে পারলো।
“চল বাড়ি যাই।
রিতি হাত ধরে উঠে আসলো।রিতিকে পড়তে বসানোর দায়িত্ব মিথির। এখন তাকে নিয়ে পড়তে বসবে। রিতি সেই জন্য বাড়ি থেকে বই আনতে গেলো।মিথি দাঁড়িয়ে রইলো দরজার কাছে।তখনই প্রহর ও তার বন্ধুরা গ্রামের দিক থেকে আসছে।
দুজন কি যেন বলছে আর হাঁসছে প্রহর র্নিলিপ্ত।
মিথি তাদের দিকে তাকালো। পাভেল খেয়াল না করলেও আসিফ দেখলো, বলল,
“দেখ প্রহর তোর শুকতারা সন্ধ্যার আকাশে না থেকে জমিনে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রহর এক পলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো।
পাভেল আসিফ কে চোখের ইশারায় চুপ করতে বলল।
মানিক সাহেব তখনই বাইক নিয়ে ফিরলো।
বাইকের শব্দে ওরা তিনজনে অন্য সাইটে গেলো।
মিথি বাবার আসাতে দৌঁড়ে গেলো।হাতের ব্যগটা নিয়ে বলল,
“দাও আমি নিয়ে যাই।তুমি বাইক নিয়ে নিয়ে এসো।
মানিক সাহেব একবার প্রহর ও তার সাথের ছেলে গুলোর দিকে তাকালো। তার পর মিথির উদ্দেশ্য বলল,
“এমন রাত বিরাতে বাড়ির বাহিরে এসো না আম্মা।
মানুষের মতিগতি ভালো নাও হতে পারে। কে ভালো কে খারাপ তা কি বুঝা যায়?
মিথি ঠিক বুঝলো না। তবে আর প্রশ্ন ও করলো না।
মানিক সাহেব জোরেই বলেছিলেন বিধায় প্রহর সহ ওরা দুজনেও শুনতে পেলো।তাদের খানিকটা অপমানিত বোধ হলো। এমন নিচু চিন্তা ভাবনা তাদের কল্পনাতেও আসে না। মানিক সাহেব তাদের ঠিক মতো চিনে না তাই কি এমন বললো?নাকি অন্য কারণ ও আছে?
“ভেতরে চল।
প্রহর গমগমিয়ে এগিয়ে গেলো।পাভেল আর আসিফ ও তার পিছু পিছু ছুটলো।
সানোয়ার দেওয়ান এবার একা এসেছে। শিহাবের পরীক্ষা চলছে বলে স্ত্রী ছেলেকে রেখে রিদিতা কে নিয়ে এসেছে।এবার থাকবে এক সপ্তাহের মতো অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে অনেক বলে। সায়েদা বানু সেজো ছেলের পাশে বসে আছে। সানোয়ার মায়ের হাত খানা ধরে বলল,
“আম্মা একবার শহরে চলো।দেখে আসো শহর কেমন,কিছুদিন থেকে আসতে।
“না বাবা শহরে যাইতে চাই না। মুই এনেই ভালো আছি।
সায়েদা বানু নাকচ করলো। শহরের নাম শুনলে তার কেমন লাগে।শহরে কখনো পা না রাখলেও লোকমুখে শুনেছে শহর নাকি বিষাক্ত। সারাদিন ঘরে থাকতে হয়।গ্রামে ওখানে ওখানে গল্প করা,ভালো না লাগলে বাহিরে হাওয়ায় মন ফুরফুরে করা।এসব ওখানে নেই। শহরের বাতাস নাকি বিষাক্ত,হুট করে গেলে বমি পাবে। এসব তো শাহিনের মায়ের থেকে শুনেছে। ছেলের বাড়ি গেছিলো থাকতে কিন্তু কয়দিন পর ফিরে এসেছে।
গ্রামের শান্ত,বিশুদ্ধ পরিবেশে জীবনের নব্বই শতাংশ পার করে দেওয়া কেউ হুট করে শহরে গেলে মন বসাতে পারবে না এটা স্বাভাবিক।
সানোয়ার কল এলো। ফোন বাহির করে নাম্বার দেখে বলল,
“আম্মা অফিস থেকে কল এসেছে। কথা বলে আসছি।
সানোয়ার চলে গেলো। তখনই আগমন হলো শমসের দেওয়ানের।এসেই স্ত্রী’র পানে চেয়ে বলল,
“বুঝলে গিন্নি পায়ের গোড়ালিটা খুব ব্যথা করছে।একটু তেল মালিশ করে দাও তো।
সায়েদা বানু সেই থেকে স্বামী ভক্ত। কোনো কথা ফেলেনা আগে এবং এখনো।তিনি বিছানা থেকে উঠে গেলেন।শমসের দেওয়ান ততক্ষণে খাটের ওপর শুয়ে পা লম্বা করে দিলো।তেলের ছোট বাটিটা এনে তেল মালিশ করে দিতে দিতে বলল,
“সানোয়ার তো কইলো এক সপ্তাহ পর যাবে। সোলায়মান সেদিন বললো সেই বিষয়ে কিছু করলে তাড়াতাড়ি করো নয়তো ছেলেটা তো থাকতে পারবে না।
“আজ নয় কাল এ বিষয়ে আলোচনা হবে। মানিক কে বলা আছে কাল সন্ধ্যায় আলোচনা হবে।
রাতে খাওয়ার জন্য ডাকা হচ্ছে।খাবার টেবিলে সকলে উপস্থিত হলো।আজ আরো দুটো মানুষ বাড়তি হয়েছে এজন্য টেবিলে চেয়ার কম পড়েছে।
প্রহর বসেনি পাভেল আর আসিফ ও দাঁড়িয়ে। শমসের দেওয়ান উঠে পড়লো।
“তোমরা বসো আমি পরে খাবো।
প্রহর কিছু বলার আগে মিলন বলল,
“দাদু তুমি বসো আমি উঠছি।সোনিয়া খাবারটা আমার ঘরে নিয়ে এসো। শমসেরে দেওয়ান বসে পড়লো। অরুণা বিরক্ত হলো সাথে সোনিয়াও।
ছেলেকে ধীরে ধীরে বলল,“এতো দরদ কেন?সব ভালোবাসা প্রহর আর পিয়াস তুই কি পেয়েছিস?
এতো ভালো মানুষ হতে হবে না।
মিলন বিরক্ত হলো মায়ের কথায়।কেন যে প্রহর কে তার মা পছন্দ করে না তা অল্প স্বল্প বুঝতে পারে।কিন্তু প্রহর অন্য রকম মানুষ।
প্রহর ও পাভেল আর আসিফ বসে পড়লো। সুচরিতা মেরিনা খেতে দিচ্ছে।অরুণাও দিচ্ছিলো কিন্তু প্রহরদের দিকে আসলো না। বাটি রেখে ওপাশে চলে গেলো। খাওয়ার মাঝে সাহার দেওয়ান প্রহরের উদ্দেশ্য বলল,
“শুনলাম চাকরির পরীক্ষা দাও চাকরি কি হচ্ছে না?চাকরি না হলে পড়াশোনা করে টাকা নষ্ট করে কি লাভ? পিয়াসের তাও একটা গতি হয়েছে।
প্রহরের খাওয়া থেমে গেলো। পাভেল আর আসিফ ও হাত থামিয়ে রাখলো।প্রহর মুঁচকি হাসলো,বলল,
“চেষ্টা করছি কিন্তু ভাগ্য খারাপ।
তবে ভালো হয়েছে এই কারণে হলেও মানুষ চিনতে শিখছি।টা…
প্রহরের কথা কেড়ে নিয়ে পিয়াস বলে উঠলো,
“পড়ালেখা শুধু চাকরির জন্য করে না চাচ্চু। পড়ালেখা মূলত শেখার জন্য, জানার জন্য করে।
হ্যাঁ জীবনে চলার জন্য কর্মের প্রয়োজন আছে। চেষ্টা করছে আজ হয়নি কাল হবে।তাছাড়া ওর পড়ালেখা তো শেষ হয়নি।
পিয়াসের উত্তরে শমসের দেওয়ান সহ সোলাইমান ও সুচরিতা বেগম ও খুশি হলো। কেবল মুখ কালো করে অরুণা আর সাহার।সেলিম নিরব ভূমিকা পালন করছে।তার বলার অনেককিছু থাকলেও বলতে পারছে না। কেবল প্রহরের দিকে এক পলক তাকালো।বোনের মতোই নিশ্চুপ স্বভাবের হয়েছে সবকিছু সহ্য করে যায় মুখ ফুটে বলে না কিছু।
আসিফ পিয়াসের এই কথা শুনে খুশি হলো পাভেলের কানে কানে বলল,
“ভিলেন হলেও ভালো আছে।এজন্যই মনে হয় ছাড়তে চাচ্ছে।
পাভেল কোনো কথা বললো না। সকলে চুপচাপ খেতে শুরু করলো।আসিফের হঠাৎ শার্লিনের দিকে নজর গেলো।শাহানারা পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
দুজনের চোখাচোখি হলো। আসিফ চোখ ছোট করে রেগে তাকালো।শার্লিন মুখ বাঁকিয়ে ঘরে চলে গেলো।
মিথির মন খারাপ। কয়েকদিন হলো অনিমার সাথে দেখা হয় না।স্কুল শেষ হলে বন্ধুত্ব নাকি শেষ হয়ে যায় অনেকে বলে। তবে কি সত্যি তাই?অনিমার বাড়ি পাশের গ্রামে হলেও দেখা হচ্ছে না কারণ সে তো বাড়ি থেকে পাশের গ্রামে যেতে পারবে না।
“কি হয়েছে আমার আম্মার মন খারাপ কেন?
মানিক সাহেব কে দেখে মিথি নড়েচড়ে বসলো। মন খারাপ নিয়ে জবাব দিলো,
“আব্বা কতদিন হলো অনিমা কে দেখিনা মনে হচ্ছে। এতদিন তো কখনো না দেখা হয়ে থাকিনি।
মানিক সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। হেঁসে বলল,
“ঠিক আছে কাল আনিসুল ভাই কে বলে আনিমা কে নিয়ে আসবো।
মিথির মন খারাপ উধাও হলো।গম্ভীর মুখে হাঁসি ফুটে উঠলো। মানিক সাহেব কে জড়িয়ে ধরলো।
“ধন্যবাদ আব্বা।তুমি সবচেয়ে ভালো।
“হ আর আমি সবচেয়ে খারাপ।
বারান্দা থেকে কথাটা মোহনিয়া বেগম বলল।
মিথি মায়ের দিকে চেয়ে দাঁত চেপে হেঁসে বলল,
“না তুমি ভালো, তোমার বংশ ভালো। আমার আব্বা ভালো না আব্বার বংশ ভালো না তাই না আম্মা?
মোহনিয়া বেগম চোখ গরম করে তাকালো।
মানিক সাহেব মেয়ের সাথে হেঁসে চলছে।
“তোরা বাপ বেটিতে মিলে আমার বংশের নামে নিন্দা কর। আমার বাপ ভালো ভালা না তোর বাপ।
“সংসার করছো কেন বলোতো?তুমি বলেই সংসার করছো তাই না?
আগুনে ঘি পড়লো। মানিক সাহেবের কথায় মোহনিয়া বেগম চোখ পাকালো। ঘরের দরজা থেকে বাহিরে গেলো। বাবা মেয়ে উচ্চ সরে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো। মানিক সাহেব খানিকক্ষণ মেয়ের হাঁসি দিকে তাকিয়ে রইলো।
এমন হাঁসি মেয়ের ঠোঁটে সব সময় দেখতে চান।
রাতে ঘুমানোর আগে প্রহর তার ব্যক্তিগত ডাইরিটা বাহির করলো। লিখছে তার নিত্যদিনে অভ্যাস মতো কবিতা।আজ মা’কে নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করছে।লিখছে তাকে নিয়ে চোখের কোনে জল টলমল করলেও ঝরছে না।পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই, শুধু সহ্য করে নিশ্চুপ থাকতে হয়। নোনাজল লুকিয়ে হাঁসতে হয়।
“কি লিখছিস?কবিতা নাকি চিঠি?
“কিছু দুঃখ,কিছু অনুভূতি,যা কবিতা হয়ে ডাইরির পাতায় থাকে বন্দি।”
পাভেলের প্রশ্নের উত্তর দিয়েই প্রহর ডাইরি বন্ধ করলো। শুয়ে পড়লো আসিফের পাশে। পাভেল নিশ্চুপ থেকে বলে উঠলো,
“দুঃখ আর অনুভূতি গুলো প্রকাশ করা উচিত।
“কার কাছে?যে অনুভূতির মায়াজালে আমার হৃদয় বন্দি?নাকি যে দুঃখের কারণ?
“ধরে নে তারই কাছে।হতেও পারে অনুভূতি আর দুঃখ পরিবর্তে একমুঠো সুখ উপহার পেলি।
আমি যতদূর জানি যারা কবিতা লিখতে জানে,তাদের অনুভূতি প্রকাশ করার মাধ্যমের অভাব হয় না।ভয় তাদের ছোঁয় না,তবে তুই ভয় পাস কেন?মেয়েটাকে ভালোই লাগলো। অনুভূতির মূল্য দিতেও পারে।
প্রহর চোখ বন্ধ অবস্থায় বাঁকা হাসলো। পাভেলের উত্তরে বলল,
মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৩+১৪
“অনুভূতির পরিনতি জানতে চাই না। সে ভালো থাকলেই হবে।আমি ভয় পাই না। আমি শুধু চাইনা আমার জন্য কেউ দুঃখ পাক,খুশিতে ভাটা পড়ুক।
পাভেল বুঝলো এর সাথে কথা বলে লাভ নেই। আসিফ ইশারায় চুপ করতে বলল।যা হবে দেখা যাবে আজকের দিনটা যাক কালই কিছু হবে।
নতুন দিনের নতুন কিছুর আশায় চোখ বুজলো।
সত্যি কি নতুন দিন আনন্দের হবে?নাকি আধাঁরে ঢেকে যাবে।
