Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ২২

মহামায়া পর্ব ২২

মহামায়া পর্ব ২২
তুশকন্যা

স্কুলে পৌঁছানো মাত্রই এক ভারী আর অস্বস্তিকর পরিবেশ মাওরাকে গ্রাস করে নিল। করিডোর থেকে শুরু করে ক্লাসরুম—সর্বত্রই গোপন ফিসফাস। ‘হেলিশ বিস্টস্’-এর লিডার ভিভিয়ান এহসানের হাতে এক কলেজ ছাত্রের নির্মমভাবে পিষ্ট হওয়ার খবরটা যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। মাওরা যখন জানতে পারল তন্ময়ের হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং তাকে আধমরা করে ফেলে রাখা হয়েছিল, তখন তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হলো।

সবার বাঁকা চাউনি আর আড়ালে করা আলোচনা-সমালোচনাগুলো তীরের মতো তার বুকে বিঁধছে। অপমানে আর কষ্টে মাওরার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
​কোচিংয়ে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা তার ছিল না। স্কুল ছুটির পর সে সরাসরি নিজের মেসে ফিরে আসে। এদিকে ভিভিয়ান যথারীতি কোচিং সেন্টারের সামনে তার গ্যাং নিয়ে মাওরার অপেক্ষায়। সময় পেরিয়ে গেলেও মাওরাকে না দেখে সে বিচলিত হয় না, বরং তার চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক অস্থির কাঠিন্য। খবর নিয়ে যখন সে জানল মাওরা আজ আসেনি, তখন কোনো কালবিলম্ব না করে সে বাইক ছুটিয়ে মেসের সামনে এসে থামল।
​বাইক থেকে নেমেই সে মাওরাকে ফোন করল। কণ্ঠস্বরে সেই চিরচেনা আধিপত্য বজায় রেখে কেবল বলল,
“নিচে আসো। এখনই।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

​মাওরা নিচে নেমে এল ঠিকই, কিন্তু তার অবয়বে আজ কোনো ভীরুতা নেই। সে ভিভিয়ানের মুখোমুখি দাঁড়াল, কিন্তু তার দৃষ্টি অন্য কোথাও নিবদ্ধ। ভিভিয়ান শুরুতে কিছুটা অবাক হলো। মাওরার এই মৌনতা তাকে বিচলিত করার বদলে আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তুলল। সে এক পা এগিয়ে মাওরার বাহুটা শক্ত করে চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর হিংস্রতায় সে গর্জে উঠল,
“আজ কোচিং এ যাওনি কোনো?”
মাওরা নিরুত্তর দাঁড়িয়ে থাকে। ভিভিয়ান রাগে দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ায়,
“আমার কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন? কী হয়েছে তোমার?”
​ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে গেল এক অপ্রত্যাশিত কান্ড। ভিভিয়ানের জোর খাটানোর চেষ্টা মাওরার ভেতরের জমে থাকা সব ক্ষোভকে এক লহমায় উস্কে দিল। কোনো কিছু ভাবার আগেই মাওরা সজোরে এক চড় বসিয়ে দিল ভিভিয়ানের গালে।

​মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল।
​ভিভিয়ান এহসান! এই বয়সেও যার সামনে বাঘা বাঘা মানুষ কথা বলতে সাহস পায় না, সে এখন একটি মেয়ের হাতে চড় খেয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার গালের রক্তিম দাগটা যেন অগ্নিশিখার মতো জ্বলছে। শুরুতে সে থমকে গেলেও, তার সহজাত সেই গম্ভীর হিংস্রতা চোখের পলকে ফিরে এল। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ ধারণ করল, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
কিন্তু মাওরা আজ অকুতোভয়। স্কুল আর মেসের মানুষের দেওয়া মানসিক যন্ত্রণা তাকে এতটাই ভঙ্গুর করে দিয়েছে যে, মৃত্যুভয়ও যেন তাকে স্পর্শ করতে পারছে না।
​মাওরা ভিভিয়ানের চোখের দিকে সোজাসুজি ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকাল। কান্নায় ভেঙে না পড়ে, চাপা স্বরে ধারালো গলায় বলল,

“তুমি নিজেকে কী ভাবো ভিভিয়ান? তুমি কি মানুষ নাকি কোনো পিশাচ? তোমার এই দম্ভ, এই গ্যাং আর এই নোংরা আধিপত্য আমাকে প্রতিদিন তিলে তিলে মারছে। আজ মেসের প্রতিটা মানুষ আমার দিকে আঙুল তুলছে,আজেবাজে বকছে শুধু তোমার জন্য। আমি নাকি তোমার সাথে বিছানা অব্দি গিয়েছি, নয়তো তোমার মতো এতো বড় মাপের মানুষ আমার জন্য অন্যকাউকে আধমরা বানায় নাকি? এমন কিছু বাদ রাখেনি, যা ওরা বলছে না।
তুমি কাউকে আঘাত করে নিজেকে বীর ভাবো, কিন্তু আসলে তুমি একজন বিকৃত মস্তি”ষ্ক-মানসিকতার কাপুরুষ। আমার জীবনটা নরক বানিয়ে দিয়ে এখন এসেছো অধিকার দেখাতে?”

​ভিভিয়ান কোনো কথা বলল না। তার ভেতরের ক্রোধ যেন এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির ন্যায় ফুঁসছে। যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে। কিন্তু মাওরা তাকে আর কোনো সুযোগ না দিয়ে দ্রুত পায়ে মেসের ভেতরে চলে গেল। তার প্রস্থান পর্যন্ত ভিভিয়ান সেখানে দাঁতে দাঁত পিষে, জ্যান্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
​মাওরা চোখের আড়াল হতেই ভিভিয়ান ক্রোধে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে একপ্রকার কাঁপছে। কপালে উপচে পড়ছে ঘাম। এমন অপমান সে জীবনে কখনো সইতে শেখেনি, তবুও সে নিজেকে যথাসাধ্য স্থির রাখার এক আপ্রাণ চেষ্টা করে চলল।

শহরের এক অভিজাত এলাকায় অবস্থিত বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটি বাইরে থেকে যতটা শান্ত, ভেতরের পরিবেশ ততটাই গুমোট আর উত্তপ্ত। পরিবারের বিত্ত-বৈভবের বদৌলতে কলেজ পড়ুয়া ভিভিয়ান আর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের এই আস্তানাটি আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধায় ঠাসা। কিন্তু আজ সেই আভিজাত্যের দেয়ালে দেয়ালে যেন এক অদৃশ্য অস্থিরতা আছড়ে পড়ছে।
​নিজের ঘরের বিছানার এক প্রান্তে জ্যান্ত মূর্তির ন্যায় বসে আছে ভিভিয়ান। দুহাতের কনুই হাঁটু বরাবর ঠেকিয়ে সে সামনের দিকে ঝুঁকে আছে, আর অস্থিরতায় তার পা দুটো অনবরত কেঁপে চলেছে। বাম হাতের আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট, আর ডান হাতে ব্রান্ড নিউ স্মার্টফোন।

রাত আটটা বাজতে চলল, অথচ সন্ধ্যা থেকে শতবার চেষ্টা করেও সে মাওরার নাগাল পায়নি। মেয়েটা একবারের জন্যও ফোন তুলছে না। যেন স্বেচ্ছায় নিজেকে এক দুর্ভেদ্য দেয়ালের ওপাশে সরিয়ে নিয়েছে।
​রাগে আর ক্ষোভে ভিভিয়ানের অবস্থা তখন বিপর্যস্ত। অ্যাশট্রেতে পড়ে থাকা নয়টি সিগারেটের ফিল্টার তার তীব্র অস্থিরতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। দশ নম্বর সিগারেটটা ধরিয়ে সে সজোরে এক টান দিল, ফুসফুস ভরে ধোঁয়া টেনে নিয়ে তা ঘরের গুমোট বাতাসে মিশিয়ে দিল।
কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা অবিন্যস্ত চুলগুলো এখন আরও বিশৃঙ্খল, পরনের কালো টিশার্ট আর ট্রাউজারও অবিন্যস্ত। ভিভিয়ানের এই রুদ্রমূর্তি দেখে রুমের ভেতর থাকা ফারহান আর আরাফও কিছুটা তটস্থ। তারা তাকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করলেও মনের কোণে এক গোপন সংশয়—রাত বাড়ার সাথে সাথে ভিভিয়ান আবার কোন নতুন পাগলামি করে বসে!

​ঠিক তখনই রুমে প্রবেশ করল নুহাশ আর জুনায়েদ। তাদের হাতে বিশেষ কিছু একটা আড়াল করা। ভিভিয়ান বা অন্য কেউ সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। তারা দুজনও কোনো কথা না বাড়িয়ে ঘরের এক কোণে ফ্লোরে গোল হয়ে বসে পড়ল।
​এদিকে এতো চেষ্টার পরও,মাওরা ফোন না ধরায় হঠাৎ নীরবতা ভেঙে ভিভিয়ান তার তীব্র আক্রোশে হাতের ফোনটি সামনের দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে মারল। প্রচণ্ড শব্দে ফোনটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ফ্লোরে আছড়ে পড়ল। নিজের মাথাটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরল সে, যেন ভেতরের যন্ত্রণাটুকু দুহাতের চাপে পিষে ফেলতে চাচ্ছে।
​নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকা নুহাশ এবার কিছুটা ঠাট্টা মিশিয়ে ভিভিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল,

“আরেহ ছাড় তো! ওইসব মেয়ে মানুষের পাল্লা বাদ দিয়ে আমাদের সাথে যোগ দে। মন মেজাজ এক নিমেষে ফ্রেশ হয়ে যাবে।”
​ভিভিয়ান শুরুতে কথাটি কানেই নিল না, কিন্তু ফারহান হুট করে নুহাশ আর জুনায়েদের ওপর চটে উঠল। সে বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোরা নিজেদের কাজ কর না! শুধু শুধু ভিভিয়ানকে এসবের মধ্যে ডাকছিস কেন?”
​ফারহানের অতি সাবধানী সুর আর নুহাশের রহস্যময় হাসি ভিভিয়ানের কৌতূহল উসকে দিল। সে কপাল কুঁচকে তাদের দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখের সেই রক্তিম দৃষ্টি স্থির হলো ফ্লোরে বসে থাকা বন্ধুদের হাতের ওপর। অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে সে জিজ্ঞেস করল,

“কী করছিস তোরা ওখানে?”
​নুহাশ হাসতে হাসতে সাদা কাগজে মোড়ানো একটি বিশেষ প্যাকেট খুলে ধরল। ইশারায় তাকে কাছে ডেকে বলল,
“টেনশন নেওয়ার কোনো দরকারই নেই। এটা একবার ট্রাই করে দেখ, সব জাগতিক সমস্যা আর দুশ্চিন্তা কর্পূরের মতো উড়ে যাবে।”
​ফারহান পুনরায় বাধা দিতে চাইল, ভিভিয়ানের উৎসুক হাবভাব দেখে সে বারবার নিষেধ করতে লাগল। কিন্তু ভিভিয়ান তখন কোনো কথা শোনার অবস্থায় নেই। তার জীবনের এই চরম অস্থিরতায় সে যেন কোনো এক চোরাবালির সন্ধান করছে। সে অত্যন্ত শীতল ও গুরুগম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“ওটা কী জিনিস? কোত্থেকে এনেছিস তোরা?”
​এরপর কোনো দ্বিতীয় চিন্তা না করেই ভিভিয়ান তাদের সাথে ফ্লোরে গিয়ে বসল। সাদা কাগজে মোড়ানো সেই উপাদানগুলো ছিল মর*ণনেশা ড্রা*গ। আগে সিগারেটের প্রতি তীব্র আসক্তি থাকলেও, ড্রাগের জগতে ভিভিয়ান কখনো পা বাড়ায়নি।কিন্তু আজকের এই মানসিক বিপর্যয় আর মাওরার অবজ্ঞা, তাকে এক নিমিষেই ভয়ং*কর পরিণতির দিকে ঠেলে দিল।
আর এই মুহূর্ত থেকেই বোধহয় ভিভিয়ানের জীবনের এক নতুন এবং অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হলো—যেখানে তার দম্ভ-আধিপত্য এখন এই মা*রাত্মক নে*শাদ্রবের মাঝে বিলীন হতে শুরু করেছে।

অতীতের সেই ধোঁয়াটে আর কণ্টকাকীর্ণ স্মৃতিগুলোর মায়াজাল ছিন্ন করে হুট করেই বাস্তবে ফিরে এল ভিভিয়ান। এসব ঘটনার আজ বেশ কিছুদিন হয়ে গিয়েছে।
এহসান মঞ্জিলের নিজের বিশাল ঘরে বিছানায় শুয়ে সে এতক্ষণ যেন এক অন্ধকার ঘোরের মধ্যে ছিল। চোখের পাতা দুটো মেলতেই ঘরের নরম আলো তার দৃষ্টিতে ধরা দিল। সেই উন্মত্ত যৌবন, মাওরার সেই চড়, আর ড্রা*গের নেশায় ডুবে যাওয়ার সূচনার দিনগুলো এখন কেবলই স্মৃতির পাতায় বন্দি এক দীর্ঘশ্বাস।
​ভাবনাগুলো স্তিমিত হয়ে এল যখন রুমের দরজায় কারো পদশব্দ শোনা গেল। ভিভিয়ান উঠে বসল। দেখল তার মা কাশফিয়া ঘরে প্রবেশ করছে। হাতে খাবারের প্লেট। আর তার আঁচলের আড়াল ধরে, গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে ছোট্ট আনায়া।
​কাশফিয়া অত্যন্ত মমতাময় স্বরে ডাকল,

“আব্বা, অনেক বেলা হলো। নাও, খেয়ে নাও তো এবার।”
​মায়ের এই ‘আব্বা’ ডাকটা ভিভিয়ানের কঠিন হৃদয়ের কোনো এক কোণে বোধহয় এখনো প্রশান্তি জাগায়। কাশফিয়া আনায়াকে সাথে নিয়ে যেতে চাইলে ছোট্ট মেয়েটি তার শাড়ির আঁচল আরও শক্ত করে চেপে ধরল। আধো-আধো গলায় সে যেতে মানা করল,
“আমি বাইয়া কাচে তাকবো।”

কাশফিয়া মিষ্টি হেসে আনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অতঃপর ভিভিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাইয়াকে যেন বিরক্ত কোরো না, লক্ষ্মী মেয়ের মতো চুপচাপ বসে থেকো। ঠিক আছে আম্মা?”
​আনায়া বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। ভিভিয়ান বিছানা থেকে নেমে হাত ধুয়ে এসে খেতে বসল। তার গম্ভীর মুখাবয়বে কোনো বিশেষ পরিবর্তন না থাকলেও আনায়ার প্রতি তার এক প্রচ্ছন্ন কোমলতা সবসময়ই থাকে। খাবারের প্লেট সামনে নিয়ে শুরুতেই সে মাংসের বড় লেগ পিসটা সযত্নে সাদা ভাত দিয়ে মুছে নিয়ে, আনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।
​আনায়া বড় বড় চোখ করে পিসটার দিকে তাকিয়ে রইল ঠিকই, কিন্তু ছোট্ট মাথাটা নেড়ে মানা করে দিল।

—“না… খাব না।”
​ভিভিয়ান ভ্রু সামান্য কুঁচকে অনুচ্চ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কেন?”
​আনায়া এবার তার আধো-আধো মিহি গলায় জানাল,
“মা জাননে বকা দিবে।”
​বোঝা গেল, মেয়ের খাওয়ার ব্যাপারে মায়ের কড়া শাসন কাজ করছে। ভিভিয়ান তার সহজাত সেই ভারিক্কি-অটল গাম্ভীর্য বজায় রেখেই উত্তর দিল,
“আমি থাকতে তোকে কেউ বকা দেবে না। কিন্তু আমার কথা না শুনলে…”
​ভিভিয়ান নিজের কথা শেষ করে না। ভ্রু উঁচিয়েই বুঝিয়ে দেয় যা বলার।বড় ভাইয়ের সেই অভয়বাণী শাসনের সুর যেন কাজ করল। আনায়া আর দ্বিধা করল না। সে ভিভিয়ানের কোলে উরুর একপাশে উঠে বসল এবং তার প্লেট থেকেই পরম নিশ্চিন্তে খেতে শুরু করল।

রাত গভীর হতেই এহসান মঞ্জিলের অন্দরে এক নিবিড় স্তব্ধতা নেমে এল। ভিভিয়ান যখন দিনের ক্লান্তি শেষে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ছোট্ট আনায়া এক অদ্ভুত জেদ ধরে বসল—সে আজ তার ভিভান ভাইয়ের সাথেই ঘুমাবে।
সাধারণত নিজের নির্জনতা আর ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ে ভিভিয়ান অত্যন্ত সচেতন, কিন্তু এইটুকু শিশুর অবুঝ আবদারের কাছে তার সেই কাঠিন্য যেন কিছুটা নমনীয় হলো। কোনো উচ্চবাচ্য না করে সে আনায়াকে নিজের পাশেই শুইয়ে দিয়ে চোখ বুজল।

​তবে ঘুমের আয়োজনে এক সূক্ষ্ম বিরোধ দেখা দিল। আনায়া আলো ছাড়া ঘুমাতে পারে না, অন্যদিকে ভিভিয়ানের প্রয়োজন ঘুটঘুটে অন্ধকার। শেষ পর্যন্ত আনায়ার কথা চিন্তা করে তাকে নিজের আজন্ম অভ্যাস বিসর্জন দিতে হলো; সাইড টেবিলের এক কোণে মৃদু আলোর ল্যাম্পলাইটটা জ্বালিয়ে রেখে সে শুয়ে পড়ল।
এদিকে আজ পাশে তার ভিভিয়ান ভাইয়া আছে বিধায় আনায়ার মনে এক বিচিত্র অনুভূতি। রুমের ভেতর ঝকঝকে আলো না রইলেও, সে মোটেও ভীতু হলো না।কারণ তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভীতিকর এবং রহস্যময় মানুষটি হলো ভিভিয়ান নিজেই। এইটুকু বয়সেই সে বুঝে নিয়েছে,তার ভিভান ভাইয়া যেখানে থাকে, সেখান থেকে খোদ ভূত-প্রেতও তাকে দেখে ভয়ে সাত হাত দূরে পালাবে।
​ভিভিয়ানের বাম পাশের বলিষ্ঠ বাহুডোরে আনায়া চুপটি করে শুয়ে আছে। ক্লান্তিতে ভিভিয়ানের চোখ বুজে এলেও আনায়া তাকে ছাড়ার পাত্র নয়; হুট করেই বলতে লাগল,

“বাইয়া গুল্প ছুনবো, বাইয়া গুল্প গুল্প…”
ভিভিয়ান কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়ে, ঘুম জড়ানো ভগ্নস্বরে আওড়ায়,
“উঁহু… ঘুমিয়ে পড় তারা। অনেক রাত হয়েছে।”
—“না, না, আমি গুল্প ছুনবো…বেছি না, শুদু একতা, একতা গুল্প ছুনবো।”
ভিভিয়ান ভারী শ্বাস ফেলল। চোখ বুঁজে থাকা অবস্থাতেই নিচু আর ভারিক্কি স্বরে হান্সেল আর গ্রেটেল-এর গল্পটা বলতে শুরু করল। একইসাথে আনায়ার পিঠে অনবরত মৃদু ছন্দে হাত চাপড়ে দিচ্ছিল, যেন সে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে।
​ভিভিয়ান যখন নিবিড় ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই অতি মনোযোগের সাথে গল্প শুনতে থাকা আনায়া হুট করে তার প্রশস্ত বুকের ওপর চড়ে বসল। নিজের ছোট্ট নরম দুহাতে সে ভিভিয়ানের খোঁচা খোঁচা চাপ দাড়িযুক্ত গাল দুটো আঁকড়ে ধরে, অত্যন্ত কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

​”বাইয়া, ওই দাইনিতা পরে কী কসসিলো? হাসেল আর গাতেলকে মেরে খেয়ে ফেলসিলো?”
​ভিভিয়ান নিজের ঘুম জড়ানো চোখ মেলে ছোট্ট আনায়াকে দেখল। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় মনের গহীনে কিঞ্চিৎ বিরক্তি দানা বাঁধলেও সে তা প্রকাশ করল না। এই বিচ্ছুটা যে কখন ঘুমাবে হবে, তা তার জানানেই। সে আনায়াকে নিজের বুকের ওপরই দুহাতে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরে,গল্পের বাকি অংশটুকু শোনাতে লাগল—
​”উঁহু, গ্রেটেল অনেক চালাক ছিল। ডাইনিটা যখন গ্রেটেলকে আগুনের… ”
​গল্পের মাঝ পর্যায়েই ক্লান্ত-শ্রান্ত ভিভিয়ানের কণ্ঠস্বর ক্রমশ ঝিমিয়ে এল। এক সময় দেখা গেল, ভিভিয়ানের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখেই আনায়া নিশ্চিতে ঘুমিয়ে পড়েছে।

​পরদিন সকালবেলা। ভোরের মৃদু আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে প্রবেশ করছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভিভিয়ানের ঘুম ভাঙল এক অস্বস্তিকর অনুভূতিতে। ঘুম থেকে উঠেই তার চোখমুখ কুঁচকে গেল। খেয়াল করে দেখল, তার বুকের নিচে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে ঘুমন্ত আনায়া। আর সে নিজে আনায়ার ছোট্ট পেটটায় মুখ গুঁজে ঘুমিয়েছিল। নিজের অবিন্যস্ত একঝাঁক এলোমেলো চুলের আড়ালে যেন পুরো আনায়াটাই ঢাকা পড়েছিল।
​কিন্তু ভিভিয়ানের কপালে তখন সন্দেহের চিন্তায় ভাজ পড়েছে। সে ভ্রু কুঁচকে অনুভব করল, তার টিশার্ট আর বিছানার চাদরে এক ধরনের শীতল আর ভেজা ভাব। হুট করে বিছানায় হাত চেপে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতেই সে চমকে উঠে বসল।

মহামায়া পর্ব ২১

পরক্ষণেই খেয়াল করল, আজ রাতে আনায়ার পরনে কোনো ডাইপার ছিল না। এবং সে তার অবধারিত কাজটি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বিছানাতেই সেরে ফেলেছে।
​নিজের পরিচ্ছন্ন বিছানা আর পোশাকের এই দশা দেখে ভিভিয়ানের সেই সহজাত গম্ভীর হিং*স্রতা যেন মুহূর্তেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
সে দাঁতে দাঁত পিষে, নিজের সবটুকু গাম্ভীর্য ঢেলে দিয়ে সজোরে চেঁচিয়ে উঠল—
​”তারাআআআআআ!”

মহামায়া পর্ব ২৩