মহামায়া পর্ব ২
তুশকন্যা
❝…Pag pag dolun re dagmag si main chalti hoon_____
Jagmag lau si jalti____ tere naino ki kaisi madira___
Tharr tharr kaanpu re ___tere peer se chipti.
Chandan pe naag si lapti.
Main behosh____ tu nasha
Aisi moh ki dasha.
Mere chain rain nain apne saath le gaya______❞
ম্লান আলো-অন্ধকারে ভেসে থাকা বিশাল অডিটোরিয়ামের ভেতর আজ যেন এক ভিন্ন রকম আবহ জমে উঠছে। স্টেজের উপর ঝলমলে সোনালি ও নীল রাঙা আলো পাল্লা দিয়ে একে-একে তাল মিলিয়ে জ্বলে উঠছে। মাঝেমধ্যেই সাউন্ড সিস্টেমের বেস টোনে থরথর করে কেঁপে উঠছে কাঠের মেঝে।
পর্দার আড়ালে থাকা সাউন্ড বক্স থেকে ভেসে আসছে গানের শেষ ভাগ,
❝Nainowale ne___aah!
Nainowale ne! Nainowale ne____ chheda mann ka pyala.
Chalkaai madhushala.
Mera chain rain nain apne saath le gaya…❞
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আর সেই গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মিশে যাচ্ছে,মঞ্চের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা আনায়ার প্রতিটি পদক্ষেপ। সাদা রঙের ভারী ঘেরওয়ালা আনারকলি—যার প্রতিটি ভাঁজ যেন আলোর ঝলকে একেকটি ঢেউয়ের ন্যায় দুলে উঠছে। কাঁধের ডান দিক থেকে নেমে আসা গাঢ় লাল-সোনালী বেনারসি ওড়নাটা—কোমরের একপাশে আলগোছে গিট্টু দিয়ে বাঁধা।
তার চলার সঙ্গে সঙ্গে যা, হালকা করে দুলে উঠছে প্রতিনিয়ত।একই সাথে দুলছে, কোমর পর্যন্ত গড়িয়ে পড়া লম্বা বিনুনি। পুরো বিনুনি জুড়ে গাঁথা সাদা বেলীফুলের মালা। নড়াচড়ায় তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে সামনের সারির দর্শকদের মাঝে; মাথার উপরের অংশে বসানো দু’তিনটি র’ক্তলাল গোলাপ। যা দূর হতে দেখতে অনেকটা, আলোয় ঝলসে ওঠা জ্বলন্ত কেন্দ্রবিন্দুর ন্যায়।
আনায়ার নাচের ভঙ্গি নির্ভুল। চোখের দৃষ্টি কিংবা অভিব্যক্তিতে…গানের প্রতিটি লাইন কিংবা সুরে সঙ্গে সঙ্গে মিল চলছে রেখে আবেগের খেলা। কিন্তু তবুও ভিতরে কোথাও যেন এক অদৃশ্য ক্লান্তি চেপে বসেছে। শ্বাস দ্রুততর হচ্ছে, গলার কাছে অস্বস্তি জমছে। অথচ সে একটুও ভঙ্গুরতা প্রকাশ করছে না।
মঞ্চের সামনের দিকে গাঢ় কাঠের টেবিলে বসা বিচারকেরা মনোযোগের সহিত তাকে দেখছেন। তার ক্লাসিক্যাল নাচ, বরাবরই সবাইকে মুগ্ধ করে।
এছাড়া স্টেজের চারপাশে থাকা ক্যামেরা ক্রু-রা প্রতিটি অ্যাঙ্গেলে শুধু তার দিকেই ফোকাস করছে। আনায়ার এভাবে স্টেজে ক্লাসিক্যাল ডান্স পারফরম্যান্স করাটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখনই তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা শুরু হতে লাগে, ওমনই সে প্রচন্ড ঘাবড়ে যায়। যেন মূহুর্তেই সব বিগড়ে যাবে।তবে বরাবরের মতো এবারও সে নিজের যথাসাধ্য চেষ্টায়—নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে চাইছে।
স্টেজের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে আনায়ার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু—আলো,শিখা,সাবা,তাজিম,সায়েম ও রনক। আনায়া সহ তারা সবাই মিলে মোট সাত জন। এছাড়া সর্বক্ষেত্রে তারা একসাথে থাকে বিধায়,তাদের টিমের একটি বিশেষ নামও রয়েছে। তা হলো চিল্যাক্স স্কোয়াড। গ্রুপের নামও যেমন উদ্ভট,তাদের কাজকর্মও তেমন উদ্ভট।
তবে বর্তমানে একজন ব্যতীত সকলের চোখেই গর্ব ও খানিকটা উদ্বেগের মিশ্রণ। এই দলের মাঝে সাবা নামক একজন বিশেষ ব্যক্তি রয়েছে।যে সবার চেয়ে খানিকটা ভিন্ন। সকলের হতে তার হাবভাব, চালচলন কিংবা অভিব্যক্তি সবই ভিন্ন। দেশের নামকরা শিল্পপতির মেয়ে হওয়ায়, তার আত্নঅহংকারও যেমন বেশি—তেমনি নিজেকে আর সবার চেয়ে আলাদা ভাবা কিংবা বিশেষ করে তাদের গ্রুপের মাঝে থাকা সবচেয়ে নমনীয় সদস্য আনায়ার প্রতিও তার অহেতুক কিছু ক্ষো”ভও রয়েছে।
এই ক্ষোভের বিশেষ কোনো কারণ নেই। ছোট হতেই আনায়া অনেক বেশি নমনীয় কিংবা নাজুক স্বভাবের। অত্যধিক পরিমানের হৈ-হুল্লোড় করার মতো মনোভাব তার নেই। এবং এই স্বভাবের কারণে সাবা ব্যতীত গ্রুপের আর সকলেই তাকে একটু বেশিই পছন্দ করে। আবার এই ডান্স প্রোগামে আনায়ার পাশাপাশি সে নিজেও পারফরম্যান্স করেছে। সাবার বাবা আর আনায়ার বাবা পরিচিত হওয়ায়, দুজনের মাঝে জানাশোনা সম্পর্ক রইলেও,সাবা যেন কোনোমতেই আনায়াকে খুব একটা পছন্দ করতে পারে না।
এই যেমন তারা একই ডান্স ক্লাব থেকে, এই প্রোগামে পার্টিসিপ্যান্ট করেছে। তার বাকি ফ্রেন্ডগুলো তাদের দুজনের জন্যই এখানে এলেও,সবাই যেন আনায়ার প্রতিই বেশি আগ্রহী। আবার আনায়া তার চেয়ে পড়াশোনাতেও যথেষ্ট ভালো। মূলত এই কারণেই সাবা আনায়াকে সহ্য করতে পারে না।
অডিটোরিয়ামের পেছনের সারি পর্যন্ত দর্শকে ঠাসা।কেউ কেউ মোবাইলে ভিডিও করছে, কেউ শুধু হাততালি দিয়ে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে।
গানের শেষ লাইন শেষ হতেই আনায়া এক শেষ ঘূর্ণিপাকে আবর্তিত হয়ে থেমে যায়।তৎক্ষনাৎ তার পরনের গাউনটির ঘের, বাতাসে এক পাক ঘুরে নিচে নেমে আসে।
মুহূর্তেই গমগম করে ওঠে হাততালির শব্দ।বিচারকরা প্রশংসাসূচক মাথা নেড়ে কিছু লিখে রাখেন কাগজে। আনায়া স্টেজের দিকে কুর্নিশ জানিয়ে ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরে আসে। তার বুকে শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামা স্পষ্ট। শ্বাসকষ্টের পুরনো সমস্যাটা আজ আবার যেন তীব্র হয়ে উঠেছে। তবে সে তা কাউকেই বুঝতে দিচ্ছে না। নিজেকে যথাসাধ্য সামলে রাখার তীব্র প্রচেষ্টা তার।
আনায়া স্টেজের সিঁড়ি বেয়ে নামতেই, ‘আলো’ তাড়াহুড়ো করে তার হাতে ইনহেলার গুঁজে দেয়। সে কোনো কথা না বলে তা ঠোঁটে ধরে এক গভীর টান নেয়। ঠাণ্ডা ওষুধি বাতাস বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়তেই ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয় তার। এরপর সে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে, চুপচাপ বসে পড়ে পাশের বেঞ্চে।
মাথাটা ঝিমঝিম করছে। চারপাশের হট্টগোল যেন মুহূর্তের জন্য দূরের কোনো গুঞ্জনে মিলিয়ে গিয়েছে। আনায়ার এলোমেলো নিঃশ্বাসে তার বন্ধুরা কিছুটা বিচলিত হয়৷ রনক গিয়ে তার জন্য পানির বোতল আনে। শিখা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আলো তার হাত দুটো নিজের হাতে টেনে নিয়ে, তালু দিয়ে ঘষে মালিশ করে দিতে থাকে৷ তাজিম কিংবা সায়েম—তারা দুজনও যথেষ্ট চিন্তিত ভঙ্গিতে তার দুপাশে দাঁড়িয়ে।
তবে একমাত্র স্বাভাবিক রয়েছে সাবা। আনায়ার সামনেই খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে, মুখ বাকিয়ে বিরক্তির অভিব্যক্তিতে তাকিয়ে তাকিয়ে সবার কার্যক্রম দেখছে। তারকাছে এইসব কিছুই স্রেফ আদিখ্যেতা ব্যতীত আর কিছুই মনে হচ্ছে না।
রনক পানির বোতলটা এনে আনায়াকে দিতেই,আনায়া কিছুটা পানি খেয়ে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। তাজিম এসে তার উদ্দেশ্য বলে,
“কি রে আনু, ঠিক আছিস তো?”
আনায়া শুধু মাথা ঝাকিয়ে বোঝায়,সব ঠিক আছে। তার অভিব্যক্তিতে সকলে প্রশান্তির শ্বাস ফেলে। তবে তৎক্ষনাৎ সাবা সামনে হতে কিছুটা এগিয়ে এসে,আনায়ার উদ্দেশ্যে বলে,
“জানিসই তোর শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে। একটু দৌড়ঝাঁপ করলেই শ্বাসকষ্ট উঠে যায়। সেখানে তোর সবকিছুতেই নাচতে হবে কেন, বলতো? আঙ্কেল তো তোকে কতবার বলেছে এসব নাচটাচ ছেড়ে দিতে। অথচ তুই তার কথাও শুনিস না। সবসময় অবাধ্য হয়ে কাজকর্ম করিস দেখেই,সারাদিন হাঁপানি রুগীর মতো হাঁপাতে থাকিস,যত্তসব!”
সাবার কথায় আনায়া সহ বাকি সকলেই মুখ তুলে তার দিকে তাকায়। আনায়ার অভিব্যক্তিতে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকলেও, বাকি সকলেই যেন তার কথায় বিরক্তি প্রকাশ করছে।
এদিকে সবাইকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে, সাবা গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে,
“কি হলো?সবাই এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? আমি কি কোনো ভুল বলেছি নাকি?”
—“না, তুই কোনো ভুলকিছু বলিসনি। এখন শুধু নিজের ইঁদুরমুখীর মতো মুখটাকে বন্ধ রাখ।”
তাজিমের এহেন কথায়,নিমিষেই সাবা রেগে যায়। চেতে গিয়ে কিছু একটা করে বসবে, তার পূর্বেই গ্রুপের একমাত্র নিশিষ্ট ব্যক্তি রনকরে হালকা ধমকে সে সম্পূর্ণ চুপ হয়ে যায়। আর কথা না বাড়িয়ে বিষয়টাকে এখানেই সমাপ্ত করে।
প্রোগাম শেষে হাতে একটা গোল্ডেন কালারের ট্রফি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আনায়া৷ চোখ-মুখে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। সূর্যের অত্যধিক তাপে ফর্সা ত্বক, ধীরে ধীরে গোলাপি বর্ন ধারন করেছে। নিজের ভাবুক ভঙ্গিতে তার গালের বাম পাশে খানিকটা গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দেখতেও দূর হতে বেশ লাগছে। তবে আজ সে অনেকটাই খুশি। প্রোগামে কয়েক ক্যাটাগরিতে প্রাইজ দেওয়া হয়েছে—যার মাঝে ক্লাসিক্যাল ডান্সের জন্য পুরষ্কারটা সে-ই পেয়েছে।
কিন্তু সাবা কোনোকিছু না পাওয়ায়, তার মনমেজাজটাও কেমন যেন নুইয়ে গিয়েছে। ছোট থেকে নাচটা তারা দুজন একসাথেই শিখেছে, অথচ প্রতিবার কোনো কম্পিটিশন হলে বরাবরের মতো আনায়াই জিতে যায়। আর আনায়া এটাও জানে যে, এসব কারণে সাবা তাকে পছন্দ করেনা—যে ব্যাপারটা আনায়াকেও বেশ কষ্ট দেয়।
আনায়ার এসব ভাবনা চিন্তার মাঝেই,আলো আর রনক এলো তার জন্য আইসক্রিম নিয়ে। যদিও তার আইসক্রিম বা ঠান্ডা কিছু খাওয়াটা নিষেধ। কিন্তু বেচারী এই নিষেধাজ্ঞা মানতে পারে না। বন্ধুদের মাঝে সকলেই তার এসব ছোটখাটো ব্যাপারে স্ট্রিক্ট হলেও,সে প্রতিবারই তার ইনোসেন্ট কথাবার্তা আর আবদারে সবটা ম্যানেজ করে নেয়। কেননা বাড়ি থেকে সে বেশি একটা বের হতে পারে না, আবার বাড়ির বাহিরে বের না হওয়া ব্যতীত তার কপালে আইসক্রিমও জোটে না।
আলো আনায়ার হাতে আইসক্রিম ধরিয়ে দিতেই আনায়া খুশিতে বিস্তৃত মুচকি হাসে। হাসির দরূন গালের ডান পাশে খানিকটা ছোট ও বাম পাশে বড় আকারের টোল ফুটে ওঠে। ওর হাসিতে রনক বলে,
“এই যে ডিম্পল কুইন,এটাই শেষবারের মতো ওকে? আর কখনো আইসক্রিমের জন্য জেদ করলে দেখিস তোর কি করি!”
রনকের কড়া শাসনের অভিব্যক্তিতে আনায়া আবারও মুচকি হাসে। তখনই আবার আলো বলে ওঠে,
“আনায়া, তুই কবে বড় হবি বল তো? তোর নিজের প্রতি এতো বেখায়েলীপনা দেখলে, আমাদের চিন্তা হয়।”
আলোর এমন নিস্পৃহতার মাঝেই,আনায়া কিছুটা ভারী শ্বাস ফেলে বলে,
“আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি। কিন্তু তোরাই ভাবিস আমি ছোট। এতে আমার কি দোষ?”
রনক আনায়ার মাথার পেছনে আলতো করে হাত চাপড়ে দিয়ে বলে,
“হ,তুই তো অনেক বড় হয়েছিস। দুদিন বাদে বিয়ে করে বিদ্যাশ যাবে—আমাদের আনায়া আফু। এরপর সে বড় না হলেও,তা আমাদের দেখার বিষয় না। কেননা তখন তো আফুকে সামলাতে, আমাদের জামাইবাবু থাকবে, তাই না?”
রনকের কথা শুনে আনায়ার পাশাপাশি আলোও হেসে ফেলে। এরইমাঝে আবার দূর হতে তার বাকি বন্ধু-বান্ধবীরাও চলে আসে। সবাই গিয়েছিল অডিটোরিয়ামের ক্যান্টিনে। বাহিরে অনেক রোদ থাকায়, তারা সবাই আনায়াকে গাছের নিচে বসিয়ে রেখে গিয়েছিল। কিন্তু আনায়া একা একা বোরিং হচ্ছিল বিধায়,নিজ থেকে তাদের দিকে এগিয়ে আসে।
অডিটোরিয়ামের পাশে বিশাল বড় ঘাসে মোড়ানো মাঠ রয়েছে। সেখানে রয়েছে বড়সড় এক ছায়াযুক্ত গাছ। তারা সবাই মিলে সেই গাছের নিচেই বসে রয়েছে।
সবার পরনে স্বাভাবিক পোশাক রইলেও,আনায়া আর সাবার পরনে ডান্স কস্টিউম। একইসাথে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারায়, আনায়ার অভিব্যক্তি ফুরফুরে মেজাজের হলেও—সাবার বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। হাতে একটা কোল্ড ডিংকস এর ক্যান নিয়ে চুপচাপ বসে রয়েছে সে। কিন্তু তার তীক্ষ্ণ, বিরক্তিকর দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত আনায়ার দিকে। যেন পারলে সে এই মূহুর্তে আনায়াকে দুমড়েমুচড়ে খেয়ে ফেলে। তবে এমন কিছুই করতে পারবে না বিধায়, বাধ্য হয়েই সে চুপচাপ বসে রয়েছে। যদিও সে জানে এটা হয়তো আনায়ার জীবনের শেষ ডান্স প্রোগাম ছিল, কিন্তু এই শেষবারেও আনায়াকে জিততে দেখে…এবং নিজের এই হারকে সে কোনো মতেই মেনে নিতে পারছে না।
সবাই যে যার মতো হাসিঠাট্টা করছে। সবে মাত্র তারা প্রত্যেকেই নিজেদের এইচএসসি দিয়েছে। এইচএসসির পর সাধারণত সকলেই এডমিশনের প্রিপারেশন নেয়, কিন্তু তাদের সবার মাঝে এসব নিয়ে তেমন কোনো চিন্তা নেই।
সাবা, তাজিম,সায়েম—তিন জনেই তিন ভিন্ন ভিন্ন সম্রান্ত পরিবারের ছেলে মেয়ে। ফলাফলস্বরূপ পড়াশোনা নিয়ে আপাতত তাদের বিশেষ কোনো চিন্তা নেই। কিছুদিন পর দেশের নামকরা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েই,ভার্সিটি লাইফ কাটিয়ে দেবে। এরপর তাদের ক্যারিয়ারের চিন্তাভাবনার দায়িত্বটা না হয়, তাদের পরিবারেরই।
ওদিকে রনক,আলো কিংবা শিখা—তাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একরকম নয়। আলো আর রনক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হলেও,শিখা একটি নিন্মবিত্ত পরিবারের মেয়ে। যথারীতি তার জীবনযাত্রার ধরনও বাকিদের হতে ভিন্ন। রনক আর আলো যেখানে এইচএসসি দেওয়া মাত্রই, তুমুল গতিতে এডমিশনের জন্য তথাকথিত নানান কোচিং-এ প্রস্তুতি নিচ্ছে, তেমনি শিখার কোনো কিছুই করা হয়ে উঠছে না। তবে নিজেদের বন্ধুদের জন্য, তারা আজ তাদের সব কাজকর্ম ফেলেই এখানে ছুটে এসেছে।
বাংলাদেশের এডুকেশন সিস্টেম অনুযায়ী, মধ্যবিত্ত পরিবারের বেশিরভাগ স্টুডেন্টই উচ্চমাধ্যমিকের পর—এডমিশনের প্রিপারেশন নেয়। বাকি যাদের ফিনানশিয়াল স্ট্যাটাস মোটামুটি ভালো,তারা ছুটে চলে বিশ্বের নানান প্রান্তের নানান দেশে। এছাড়া কেউ চলে যায় দেশের সুনামধন্য প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোতে। আবার শিখার মতো নিন্মবিত্ত পরিবারের সন্তানরা হয়তো এভাবেই চুপচাপ রয়ে যায়। বাড়ি হতে আর্থিক কিংবা মানসিক সাপোর্ট না এলে,তাদের শেষ গন্তব্য হয়ে যায় শ্বশুড় বাড়ি ওরফে পরের বাড়ি।
অবশ্য আনায়ার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। শিখার আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকলেও,তার এই বন্ধু-বান্ধবীদের সহায়তায়,সে তবুও ভবিষ্যতে পড়াশোনাটা কোনোমতে চালিয়ে নিতে পারছে কিংবা পারবে। কিন্তু আনায়ার সবকিছু থেকেও—তার এখন সবকিছুই ছেড়ে দিতে হবে।
আর ক’দিন বাদেই তার বিয়ে। ছেলে হলো দেশের নামকরা এক মন্ত্রীর, একমাত্র সন্তান ❝রেহান আহমেদ চৌধুরী❞। রেহান বর্তমানে বিদেশে রয়েছে,এবং বিয়ের পর আনায়াকে সে তার সাথে করেই নিয়েই দেশ ছাড়বে। এদিকে আনায়ার পরিবারও তাই স্পষ্ট তাকে করে বলে দিয়েছে—যদি বিয়ের পর রেহান তাকে পড়াশোনার অনুমতি দেয়, তবেই সে পরবর্তীতে নিজের পড়াশোনাটা চালিয়ে নিতে পারবে। কিন্ত তার আগে আনায়ার পড়াশোনার দৌড় উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্তই। যে কারণে স্টুডেন্ট হিসেবে অত্যন্ত ভালো হওয়া সত্ত্বেও, আনায়া এখন হাত গুটিয়ে চুপচাপ বসে। কেননা সেও নিজেকে বুঝিয়ে দিয়েছে—তার গল্পটা হয়তো আর সবার মতো নয়।
সবার হাসি, ঠাট্টা-তামাশার মাঝেই, রনক এবার আনায়ার উদ্দেশ্যে বলে,
“আনু! তোকে একটা কথা বলার ছিল।”
আনায়া তার কথায়,গুরুত্বের সহিতে তাকিয়ে বলে,
“হুম,বল। কি বলবি?”
রনক এবার আলোর দিকে তাকায়। আলো যেন বুঝে যায়,রনক কি নিয়ে কথা বলতে চাইছে। তাই আলোই এবার নির্বিকারে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলে,
“তুই কি রেহান ভাইয়ের সাথে তোর পড়াশোনার ব্যাপারে কথা বলেছিস?… শোন আনু, তুই কিন্তু স্টুডেন্ট হিসেবে যথেষ্ট ভালো। আঙ্কেল এখন সাপোর্ট দিচ্ছে না, ইট’স ওকে। কিন্তু আমার মনে হয় রেহান ভাই বিষয়টা বুঝবে। তুই প্লিজ অন্তত তোর সব স্বপ্ন এভাবে বিসর্জন দিস না।”
আনায়া দুজনের কথায়, ভারী শ্বাস ফেলে মলিনভাবে মুচকি হাসে। এছাড়া আর তার বলারই বা কি আছে? স্বপ্ন ছিল উচ্চমাধ্যমিকের পর নিজের স্বপ্ন পূরণে দেশের সনামধন্য পাবলিক প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। অথচ এখন তাকে সব ছেড়ে এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে।
আনায়া কিছু বলছে না দেখে রনক,তার উদ্দেশ্য বলল,
“আঙ্কেল আর ক’টা মাস পরও, তোর বিয়েটা দিতে পারত। পড়াশোনা না করিস, অন্তত বুয়েটের পরীক্ষাটা তো দিতে পারতি।”
রনকের আফসোসের অভিব্যক্তিতে আনায়া মুচকি হেসে বলে,
“পড়াশোনাই যখন করতে পারব না, তখন বুয়েটে পরীক্ষা দিয়ে আর কি হবে? বাবা তো স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে,সে আমাকে আর পড়াতে চায় না। আর পড়ালেও এসব ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরে কখনোই না। অবশ্য নাচটাও বাবা কখনোই পছন্দ করেনি। এজ ইউজুয়ালি…আমাকে এটাও ছেড়ে দিতে হচ্ছে।আর হয়তো আজই সেই শেষ সুযোগ ছিল।”
নিস্পৃহে বলতে থাকা আনায়ার কথা শেষ হতে না হতেই, সাবা খানিকটা রুক্ষ স্বরেই বলে ওঠে,
“আঙ্কেলকে কেনো দোষ দিচ্ছিস? আঙ্কেল তো তোর ভালোর জন্যই এসব করেছে। তোর যে শুরু থেকেই শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে,এটা জানার পরও তুই নাচটাকে কন্টিনিউ করেছিস।এটা অবশ্যই তোর দোষ। প্রতিবার নাচতে গিয়ে শেষমেশ যখন অসুস্থ হয়ে যাস, এই দোষের ভাগ তুই কাকে দিবি?
আর এতো কেনো পড়াশোনা নিয়ে আফসোস করছিস? মিস্টার রেহান আহমেদ তো অ্যাব্রডে যথেষ্ট ভালো পজিশনের জব সেক্টরে রয়েছে। তাকে বিয়ে করে দেশ ছাড়াটা আর এমন কি। সারাজীবন সুখে থাকবি, খাবি-দাবি,ঘুরবি… তোর লাইফ একদম স্যাটল্ড। আমার মতে আঙ্কেল যা করছে,একদম ঠিকই করছে।”
সাবার এহেন কথাবার্তা শুনে প্রত্যেকের মেজাজ বিগড়ে গেল। এ মেয়ের কথাবার্তার ধরন এমন কেনো,তা কেউ বুঝতে উঠতে পারে না। সব ব্যাপারে নাক গলানোর অভ্যাস এর চিরকাল।
তবে সাবাকে কেউ কিছু বলার পূর্বেই,আনায়া স্বাভাবিক ভাবেই মুচকি হেসে বলে,
“ঠিকই বলেছিস। বাবা যা করছে একদম ঠিক করছে। আমারই ভুল! আমার বোঝা উচিত ছিল,আমার জীবনটা আর সবার মতো নয়।”
এইটুকু বলতেই আনায়া মলিনতায় মুচকি হেসে ভারী শ্বাস ফেলে। নিমিষেই চারপাশটায় অদ্ভুত বিষাদে ছেয়ে যেতেই,সকলেই চায় পরিবেশটাকে স্বাভাবিক করতে। আর সে চেষ্টাতেই, সায়েম হুট করে বলে ওঠে,
“আরেহ্ সবাই এসব আলাপ-আলোচনা ছাড়। হাতে সময় কম। একটা সিরিয়াস টপিকে কথা বলতে হবে?”
সায়েমের কথা শুনে আনায়া সহ আরো কয়েকজন তার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায়। ওমনি সায়েম বলতে লাগল,
“শোন সবাই, আর অল্প কিছুদিন পর আনায়ার বিয়ে। আগামীতে আমাদের এডমিশনের ব্যাপার স্যাপারও রয়েছে। মোটামুটি আমরা খুব দ্রুতই নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। এরপর হয়তো আর কোনোদিন এভাবে একসাথে হওয়ায় সুযোগ হবে কিনা জানিনা। আর আনায়া যেহেতু সোজা দেশই ছাড়বে…সেক্ষেত্রে নিশ্চিত হয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না। এইজন্য আমি, আলো,তাজিম, আর রনক মিলে একটা প্ল্যান করেছি। এবার শিখা,আনায়া আর সাবা—তোদের এই প্ল্যানে কি মন্তব্য তাই জানাবি।”
আচমকা এমন কথাবার্তায় সাবা,আনায়া কিংবা শিখা তিনজনই কিছুটা অবাক হলো। এরা আসলে কিসের প্ল্যান করেছে? এরইমাঝে শিখা আর সাবা একত্রে বলে ওঠে,
“কিন্তু প্ল্যানটা কি?”
রনক এবার বিস্তৃত হেসে বলে,
“আমরা বান্দরবান যাবো। খুব বেশি হলেও—অন্তত সাতদিনের ট্রিপে।”
তার কথা শুনে নিমিষেই সাবা,আনায়া আর শিখার মাঝে মিশ্র অনূভুতি প্রকাশিত হয়৷ শিখা যেন খানিকটা বিস্মিত। ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে তো তার রয়েছে, কিন্তু… একটা বড়সড় কিন্তু তার জন্য থেকেই যাচ্ছে। ওদিকে আবার সাবার কাছে প্ল্যানটা অদ্ভুত। বিশেষ করে বান্দরবন যাওয়ার কথাটাই যেন তার কাছে বিরক্তিকর লাগছে। তার মতে, ওটা কি কোনো যাওয়ার জায়গা হলো?
এদিকে আনায়া একদম নিশ্চুপ। যেন সে ওদের এই প্ল্যানের ব্যাপারটা আগেই আন্দাজ করে ফেলেছিল। কিন্তু সে ভাবছে,এই পরিস্থিতিতে এটা কি করে সম্ভব হবে।তার বাবা তো মানবেই না৷ অন্য সময় হলে ভিন্ন কথা ছিল। কিন্তু ক’দিন বাদে বিয়ে, তার উপর লোকেশনও ঢাকা হতে বহুদূর। সবমিলিয়ে তার মুখশ্রীতে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ।
এদিকে তাজিম সাবাকে এভাবে ভাবনা-চিন্তা করতে দেখে, খানিকটা সন্দিহান স্বরে বলে,
“কিরে সাবা? তুই কি যাবি না ভাবছিস? তাহলে ঠিক আছে, আমরা বরং বান্দরবান যাই। তুই না হয় সুইজারল্যান্ড চলে যাস।”
তাজিমের কথা শোনামাত্রই সাবা ক্ষেপে যায়। রাগান্বিত স্বরে বলে,
“যাস্ট শাট আপ। যদিও লোকেশনটা আমার পছন্দ হয়নি। কিন্তু আমি যাব।”
সাবার অভিব্যক্তিতে তাজিম মিটমিট করে মুচকি হাসে। ওদিকে শিখার উদ্দেশ্যে রনক জিজ্ঞেস করে,
“তোর কি মতামত?… শোন,তুই যাস্ট বল তুই যাচ্ছিস। বাকিসব কিছুর দায়িত্ব আমাদের। তোকে কিছুই করতে হবে না।”
খানিকটা কোঁকড়া চুল ও শ্যামলা বর্ণ সম্পন্ন, মেয়েটা ঠোঁটের কোণায় হাসি ঝুলিয়ে বলে,
“ঠিক আছে, আমিও যাব তোদের সাথে।”
শিখার মতামত পেতেই চারপাশে খুশিতে জেগে ওঠে। তবে আনায়ার দিকে নজর পড়তেই আবারও সবাই সিরিয়াস হয়। তাজিম আনায়ার উদ্দেশ্যে বলে,
“আনু! এবার তুই বল। প্লিজ কোনোমতেই না করতে পারবি না।”
আনায়া তার নিজের মতামত দিতে গিয়ে, দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। তার চোখে মুখে চিন্তার ছাপ।কিছুটা ইতস্ততভাবেই সে বলল,
“বলছিলাম…বাবা কি আমায় যেতে দেবে? আমার তো মনে হয় না।”
—“তুই চিন্তা করিস না। তুই বাড়ি গিয়ে আঙ্কেলকে বল। যদি সে না মানে তবে বাকি ব্যবস্তা আমি করব।”
আনায়ার কথা শেষ হতে না হতেই, আচমকা সাবার কথা শুনে সকলে খানিকটা চমকে তার দিকে তাকায়। সাবা কয়েকবার চোখের পাপড়ি ঝাপটে নিস্পৃহে বলে,
“কি হলো? সবাই এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?”
সায়েম এবার সাবাকে জিজ্ঞেস করে,
“তুই কি ব্যবস্তা করবি?”
সাবা ভারী শ্বাস ফেলে, নির্বিকারে বলতে লাগল,
“কি করবো আবার? আনায়ার কথা আঙ্কেল না মানলে, আমি বাবাকে বলে আঙ্কেলকে ম্যানেজ করাবো। দ্যাটস্ ইট…প্রবলেম সলভ।”
সাবার কথা শুনে সবাই খুশিতে উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। যেন সত্যি সত্যিই তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে, প্ল্যান সাকসেস হতে শুরু করেছে। কেননা বাবার একমাত্র আহ্লাদী মেয়ে সাবা—একবার কোনো কিছুর উদ্দেশ্যে জেদ ধরলে, তা সে কোনো না কোনো ভাবে হাসিল করেই নেবে।
এবার সকলেই উচ্চস্বরে চিল্লিয়ে বলে ওঠে,
“সো গাইস, লেট’স গো টু বান্দরবান…ইয়াহু!”
চট্টগ্রামের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সমকালীন আভিজাত্যের অপূর্ব মিশেলে তৈরি, এহসান পরিবারের আসল পৈতৃক আবাস। বন্দরনগরীর অভিজাত এলাকায়, সমুদ্রের নোনাধরা বাতাস ও সবুজ গাছপালায় ঘেরা সেই বিশাল ভিনটেজ-আধুনিক ডুপ্লেক্স বাড়িটি যেন, সময়ের দু’টি যুগকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে। বাইরের স্থাপত্যে এখনো রয়ে গেছে ঔপনিবেশিক আমলের মজবুত কাঠের বারান্দা, খোদাই করা স্তম্ভ, আর সিঁড়িঘরে কারুকাজ করা নানান প্রাচীন নকশা। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই পাওয়া যায় সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা, মার্বেল ফ্লোরিং, ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি কিংবা অভিজাত সাজসজ্জার অপূর্ব ছোঁয়া।
এ বাড়ির বর্তমান কর্তা হলেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ❝ভাহিদ এহসান❞। এহসান পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান তিনি। তাঁর ব্যক্তিত্বে রাজনীতির দৃঢ়তা, ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা এবং সামাজিক নেতৃত্বের স্বাভাবিক দৃপ্ততা মিলেমিশে বিরাজ করে। এই বাড়িতে তাঁর সঙ্গী হয়েছেন তার মা—পরিবারের প্রবীণতম নারী।যাঁর হাতে এখনো পরিবারের ঐতিহ্য আর রীতিনীতি অটুট রয়েছে। এবং সাথে রয়েছে স্ত্রী ❝কাশফিয়া এহসান❞। রাশিয়ান বংশভূত রূপকথার সেই তথাকথিত রাশিয়ান পরীর মতো তার সৌন্দর্য।যিনি নিজ গুণে উচ্চশিক্ষিত, পরিশীলিত এবং সমাজে সমানভাবে সক্রিয় এক নারী।
তবে এই ক’জন ব্যতীতও পরিবারের আরও এক বিশেষ সদস্যের উপস্থিতি রয়েছে।কাশফিয়ার একমাত্র ভাইয়ের মেয়ে ❝আলেসিয়া ম্যারিন রোজ❞। যার রক্তে মিশ্র ঐতিহ্যের ছোঁয়া। রূপে ও ভঙ্গিমায় বিদেশি সৌন্দর্যের আভা। আর ব্যক্তিত্বে এক অদ্ভুত রহস্যময়তা। আলেসিয়া যেন এই আভিজাত্যপূর্ণ বাড়ির নীরব অথচ শক্তিশালী এক চরিত্র।
তার নামটাও যেমন,সে দেখতেও ঠিক তেমন—এক জ্যান্ত তরতাজা র’ক্তলাল গোলাপের ন্যায় তার সৌন্দর্য। সমস্ত পুষ্পবাগানের মধ্যখানে ফুটে থাকা এক বিশেষ আকর্ষণীয় গোলাপের ন্যায়ই তার ব্যক্তিত্ব। কথাবার্তা খুব অল্পই বলে সে। প্রয়োজন ব্যতীত তাকে খুব একটা হাসিঠাট্টা কিংবা কথা বলতে দেখা যায় না। তার হাসির ধরনওটাও খুবই মাধুর্যসাধক। যে কোনো পরিস্থিতিতেই ঠোঁটের কোণায় এক মৃদু মুচকি হাসি।
অবশ্য চেহেরার গঠনে কাশফিয়া এবং তার সাথে অনেকটা মিল রয়েছে।তবে কাশফিয়াকে সেভাবে রাশিয়ান বলে চিহ্নিত করা না গেলেও, রোজকে সর্বপরি ভীনদেশী বলেই চিহ্নিত করা যেতে পারে। বিশেষ করে রোজের গাঢ় লালচে রঙের চুলগুলো তার অন্যন্য সৌন্দর্যের মাঝে অন্যতম।
এই সকাল বেলায় এহসান বাড়িতে অন্যরকম এক আবহ বিরাজ করছে। যে যার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত। এদিকে বাদামী রঙের পাঞ্জাবীতে এক সুদর্শন মধ্যবয়স্ক পুরুষ—বাড়ির ড্রইং রুমের সোফায়,পায়ের উপর পা তুলে গম্ভীর্যের সহিত বসে রয়েছে। হাতে তার খবরের কাগজ। খানিকটা সময় পরপর চোখের চমশাটা ঠেলে দিয়ে, বারংবার খবরের কাগজের ছোট ছোট লেখায় মনোযোগী হবার চেষ্টা করছে।
এই গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে থাকা মানবের নামই ❝ভাহিদ এহসান❞। সকাল হলেই খবরের কাগজ নিয়ে বসাটা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। কিন্তু এই মূহুর্তে তার মন-মেজাজটা তেমন ভালো নয়। সকালের চা-টা এখনো তার কপালে জোটেনি। কিন্তু এ নিয়ে সে কাউকে কিছুই বলছে না।নিজের উপর বিরক্তি ও মনঃক্ষুণ্নতা নিয়েই বারংবার খবরের কাগজে মনোযোগী হতে চাইছে। কিন্তু চা ছাড়া তো তার দিন শুরু হবে না। একইসাথে কোনো কিছুতেই মন বসবে না।
ভাহিদ খানিকটা বিরক্ত হয়ে, হাতে থাকা নিউজপেপারটা জোরপূর্বক এলোমেলো ভাবে ভাজ করে টেবিলের উপর রাখে। ভারী শ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়াতে নেবে—ঠিক তৎক্ষনাৎ একটা চায়ের কাপ এসে তার দৃষ্টিতে দৃশ্যমান হলো।
ভাহিদ মুখ উঁচিয়ে দেখতেই দেখে, কাশফিয়া তার সমানে চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে। পরনে সাদামাটা সুতি শাড়ি। গাঢ় কালচে বাদামী রঙের চুলগুলো খোপা করে বাঁধা। তার হাবভাব কিংবা অভিব্যক্তিতে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়৷ কখনো মনে হয় সে ভীনদেশী, আবার মনে হয়—না! সে একদম খাঁটি বাঙালী।
মূলত বহু বছর হতে এদেশে থাকতে থাকতেই, তার হাবভাব,চালচলন,অভিব্যক্তি সবই অনেক বেশি পরিবর্তন হয়েছে। সে যেমন রুশ ভাষাও খুব ভালোমতো বলতে পারে, তেমনি বাংলাটাও তার একদম স্পষ্টভাবে উচ্চারণ হয়।ফলাফলস্বরূপ, বাহিরের অনেকেই প্রথম দেখায় তাকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। যেমনটা হয় একইভাবে রোজের সাথে।
কাশফিয়াকে এভাবে চুপচাপ গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকতে দেখে, ভাহিদ ভারী শ্বাস ফেলে। আজকের দিনে এসে তার বয়সটা বেড়েছে হয়তো অনেকবেশি,কিন্তু আজও এই ভাহিদ শিকদার তার যৌবনকালের প্রেমিকা কিংবা তার সন্তানের জননী কাশফিয়ার প্রেমে মাতোয়ারা। এক কথায় যাকে বলা হয়,বউ পাগল। তাই সকাল সকাল বউয়ের এমন মুখশ্রী তাকে অসন্তুষ্ট করল।
কাশফিয়ার হাত থেকে ভাহিদ চায়ের কাপটা নিয়ে, তাতে চুমুক দিয়ে পুনোরায় ভারী শ্বাস ফেলে। কিছু একটা ভেবে নিয়ে বলে,
“রোজ ভার্সিটির এসাইনমেন্ট করছে?”
নিমিষেই কাশফিয়ার চোখমুখ গম্ভীর হয়। দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ায়,
“কেনো? আমার হাতের চা কি বি’ষের মতো লাগছে?”
ভাহিদ মাথা উঁচিয়ে একপলক কাশফিয়াকে দেখে নিয়ে, পরক্ষণেই মুচকি হেসে তার হাতটা আলতোভাবে ধরে নিজের পাশে বসায়৷ এবং নমনীয় স্বরে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আওড়ায়,
“কাশফি!বয়স হচ্ছে তোমার। নতুন বউয়ের মতো কথাবার্তা বলার অভ্যাসটা কমিয়ে ফেলো।”
কাশফিয়া ভাহিদের দিকে খানিকটা সময় রাগান্বিত চাহনিতে তাকিয়ে থাকার পর, ভারী শ্বাস ফেলে শান্ত হয়। তবুও কিছুটা ক্ষেপা স্বরে বলে,
“জ্বী,ঠিকই বলেছো। বয়স হচ্ছে আমার। বুড়ি হয়েছি আমি। ক’দিন বাদে লাঠি নিয়ে চলতে হবে। তখন তোমার আমাকে আরো পছন্দ হবে না। কারণ আমি বুড়ি হলেও তুমি তো তরতাজা জোয়ান থাকবে তাই না?”
ভাহিদ আবারও হেসে ফেলল। গাল ভর্তি ছোট ছোট আধা পাকা চাপা দাঁড়ি। কিছুটা গোলগাল ফর্সা চেহেরা। খানিকটা সময় পরপর গম্ভীর্যের মাঝেই মুচকি হেসে ওঠায়, দেখতে বেশ লাগছে।
—“কাশফি, আমি জোয়ান থাকি বা না থাকি। তুমি সারাজীবন আমারই থাকবে। বহু কষ্টের ফল তুমি। তোমাকে অনেক সাধনা করে আমি আমার জীবনে পেয়েছি৷ দুনিয়া এদিক থেকে ওদিক গেলেও, তুমি শুধুই আমার।আর তুমি আজীবন আমার চোখে ততটাই সুন্দরী থাকবে—যতটা প্রথম দিন দেখেছিলাম।”
ভাহিদের কথার সুর পাল্টেছে। তা আন্দাজ করা মাত্রই কাশফিয়া ইতস্ততবোধ করেছে। বুড়ো হয়ে এক পা কবরে চলে যাচ্ছে, তবুও এ লোকের রংতামাশা শেষ হয়না। কাশফিয়া গলা ঝেড়ে কেশে নিয়ে বলে,
“হয়েছে, হয়েছে,এবার কাজের কথা বলো।”
কাশফিয়ার কথা ঘুরানোর ব্যপারটা ভাহিদের কাছে স্পষ্ট। সে আনমনেই কিছু একা ভেবে মুচকি হাসে। পরক্ষণেই আবার চায়ের কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে, গম্ভীর স্বরে বলল,
“কোন কাজের কথা বলছো?”
—“কোন কাজের কথা মানে…?আহ্! আমার আর ভালো লাগছে না।”
—“কেনো আবার কি হলো?”
—“কেবলই তো বললে আমার বয়স হয়েছে।তাহলে এটাও বলে দাও, আর কত একা একা সংসার সামলাবো?”
—“তো এই বয়সে সতীন চাইছো? সামলাতে পারবে তো? অবশ্য আরেকটু আগে বললে ভালো হতো। দেখে শুনে… ”
ভাহিদের কথা শেষ হতে না হতেই, কাশফিয়া টেবিলের উপরে ভাজ করে রাখা নিউজ পেপারটা মুঠো করে চেপে ধরে, পুনোরায় টেবিলের উপরে শব্দ করে ফেলে দেয়। বোঝাই যাচ্ছে,ভাহিদের উল্টোপাল্টা কথায় নিমিষেই সে রেগে গিয়েছে।
—“তোমার হলে, এবার আমি বলি?”
কাশফিয়ার চাপা কণ্ঠস্বরে, ভাহিদ শুধু মাথা নাড়ায়। ওমনি কাশফিয়া ভারী শ্বাস ফেলে বলতে লাগল,
“বয়স হয়েছে, একা হাতে বাড়ির এতোকাজ করা সম্ভব নয় আমার। তাই বলছি…এবার ছেলের বউ এনে দাও। আর কিচ্ছু চাই না আমার।”
—“ছেলেই যেখানে আজ অব্দি বাড়ি ফিরলো না, সেখানে তুমি ছেলের বউ চাইছো? অবশ্য আমার জানা মতে তোমার ছেলের বউ এ বাড়িতেই আছে।”
—“মানে?
—“মানে হলো, তোমার বুড়ো ছেলের জন্য, বাগানের সবচেয়ে কচি গোপাল প্রস্তুত হচ্ছে। এই যা আরকি!”
ভাহিদের কথার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে, কাশফিয়া কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে,
“ছিহ্,এসব কি ধরনের কথা কথাবার্তা?”
—“কি আশ্চর্য, খারাপ কি বললাম৷ তুমি যে তোমার ছেলের জন্য রোজকে…”
—“হুঁশ! চুপ করো। কতবার বলেছি এখনই এসব কথা বলবে না। আর আমার ছেলেকে বুড়ো বলো কোন আক্কেলে?কখনো নিজের চেহেরা আয়নায় দেখেছো?”
ভাহিদ আর কিছুই না বলে, দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চায়ের কাপে মনোযোগী হয়। ওদিক কাশফিয়া কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তার পর,পুনরায় অস্থির হয়ে ওঠে।
—“ওতো কিছু জানি না। আমার কথা গায়ে লাগাচ্ছো না, ঠিক আছে। এবার অন্তত নিজের মায়ের কথাটা শোনো!”
—“আমার মা আবার কি বলেছে?”
—“আম্মার শখ হয়েছে নাতীর ঘরের পুতি-পুতনি দেখবে। এবার না হয় তারই ব্যবস্তা করো।”
—“কি আশ্চর্য! এসব কথা আমায় বলে লাভ আছে? ছেলের বউ না হয় ঘরেই আছে, কিন্তু ছেলে তো নেই। দুটো এক না হলে,পুতি-পুতনি কি আমি হাঁটে থেকে বাজার করে আনব?”
—“আহা! মেজাজ খারাপ করো না আমার। সবার সাথে তো ঠিকভাবেই কথা বলো। যত রংতামাশা শুধু আমার বেলাতেই শুরু হয়।”
—“আহ্,কাশফি। তুমি যে আমায় কেনো বোঝো না।”
—“বুঝিনা যখন তখন আর বোঝার প্রয়োজনও নেই। কাজের কথা বলো। ছেলেটাকে কবে দেশে আনবে বলোতো? এক যুগ পেরিয়ে গিয়েছে,অথচ ওকে সামনে থেকে দেখার মতো সুযোগ হলো না আমার৷ মা হয়ে আর কত সহ্য করব আমি?”
ভাহিদ কাশফিয়ার দিকে নিস্পৃহে চেয়ে থাকে।কাশফিয়ার বুক ভার হয়ে এসেছে।অন্তরালে বিষাদের পাহাড় জমে গিয়েছে। অথচ তার কিছুই করার নেই। নিজের পেটে ধরা একমাত্র ছেলেটা বছরের পর বছর বিশ্বের এক প্রান্তে পড়ে রয়েছে।পাভেল তাও এতোগুলো বছরে দু’একবার দেশে এসেছিল। অথচ ভিভান সেই যে গিয়েছে,আজও তার দেশের ফেরার নাম নেই।
ভাহিদ খানিকটা সময় নিয়ে, পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়ে বলে,
“তো আমাকে কি করতে বলো?”
—“কি করতে বলব মানে? ছেলে কি আমার একার? আর কত… বলো তো? সামান্য ফোন-টোনও তো করতে দেখি না তোমায়।”
—“কি বলতে চাইছো?”
এবার ভাহিদ যেন কাশফিয়ার কথায় অনেকটাই বিরক্ত। একইসাথে তার কন্ঠস্বরও হলো রুক্ষ। সে আবারও গম্ভীর্যের সহিত বলতে লাগল,
❝আমার কথা না হয় বাদই দিলাম—যে ছেলে নিজের মায়ের সাথেই সপ্তাহে একদিনের বেশি কথা বলে না, সে নাকি আমার এক কথায় ঐ ইউরোপ ছেড়ে দেশে ফিরবে।❞
ভাহিদের মনঃক্ষুণ্ন কথার স্বরে, কাশফিয়া কিছুটা নমনীয়তার সহিতে বলে,
❝তাই বলে,সারাজীবন পরিবার ছেড়ে একমাত্র ছেলেটা দেশের বাহিরেই পড়ে থাকবে? আর বাপ হয়েও,তুমি কিছুই করবে না?❞
কাশফিয়ার কথায় ভাহিদ কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যের সাথে মুচকি হেসে বলে,
❝হাহ্,পরিবার!ও পরিবারের মানে বোঝে? এসবের কোনো মূল্য আছে ওর কাছে?…আর এখন তুমি বলছো, আমি নাকি কিছু করিনি। গত কয়েকবছর ধরে কি কম চেষ্টা করেছি আমি? তোমার ছেলে আমাকে বাপ হিসেবে মানলে তো! কুকুর বিড়াল মনে করে কিনা, কে জানে!”
—“ছিহ্,কিসব কথাবার্তা বলছো? ভিভান কি এখনো আগের মতোই রয়েছে নাকি…”
—❝কাশফি! পুরোনো কথা মনে করিও না। ও যে আমার নিজের ছেলে,তা ভাবতে গেলে—আজও আমার ঘৃ”ণাবোধ হয়।❞
নিমিষেই কাশফিয়া সম্পূর্ণ চুপ হয়ে যায়। ওদিকে ভাহিদ খানিকটা রেগেমেগেই উঠে চলে যায়। এদিকে দূরের সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল রোজ। সব কথা না শুনলেও, কাশফি আর ভাহিদের শেষের কথাবার্তাগুলো ঠিকই শুনেছে সে। নিমিষেই তার মনটাও বিষিয়ে যায়। সে যে কতগুলো বছর হলো—অথচ এখন অব্দি তার ভিভান ভাইকে চোখের সমানে দেখার সুযোগ হলো না।
এই নিয়ে তার মনের মাঝেও আফসোস কমতি নেই। খুব ছোট বেলায় ভিভানের সান্নিধ্য পেয়ছিল সে। অতঃপর দীর্ঘ এক বিরতী। এক ভয়ানক ঝড় এসে, অন্ধকারের মাঝেই সবকিছু তছনছ করে দেয়। এরপর আর আলোর সন্ধানটুকু কেউ পায়নি। সবাই শুধু এখন অপেক্ষায়। শুধু তারই অপেক্ষায়।
বড় হওয়ায় পর ভিভানকে সামনাসামনি না দেখলেও, মাঝেমধ্যে যখন পাভেল তাদের ওখানকার নিত্যদিনের নানান ছবি পাঠাতো—ওসব পরিবারের সাথে দেখতে দেখতেই এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হয় তার মাঝে। ফলাফলস্বরূপ আজ সে ভাই রূপক ভিভানের অপেক্ষায় নয়—বরং এরচেয়ে উর্ধের,ভালোবাসার একতরফা নামক সম্পর্কের অপেক্ষায় রয়েছে।
রোজ সবেমাত্র ভার্সিটিতে পড়ে। এবং ছোট বেলা থেকেই সে এই বাড়িতে তার ফুপির কাছে থাকে। সেক্ষেত্রে সম্পর্কে সে ভিভান তথা কেনীথের মামাতো বোন হয়। অন্যদিকে পাভেল হলো কেনীথের মামাতো ভাই। বিষয়টা অবাক করার মতো কিছুই না। পাভেল আর রোজ একে-অপরের নিজের ভাইবোন। রোজের জন্মের সময়ই তার মা মা’রা যায়। এবং তাদের বাবা-মা দুজনেই ভীনদেশী। তাদের মা ছিলেন স্কটল্যান্ডের, এবং বাবা ছিলেন রাশিয়ান।
তবে ছোট থেকেই পাভেল কেনীথের অনেক বেশি ভক্ত হয়, সে তার সাথে এদেশেই থাকতো। কিন্তু রোজ কয়েকটি বছর ছিল তার বাবার সাথে রাশিয়ায়। অতঃপর খুব অল্প কয়েক বছরের মাঝেই, রোজের বাবাও মা’রা যায়।
এরপর থেকে কাশফিয়া তার ভাইয়ের মেয়েকে, নিজের মেয়ের মতোই নিজের কাছে রেখে মানুষ করেছে। তার ছেলে ছিল দুটো।একটা নিজের গর্ভে ধারন করা কেনীথ, অন্যটা ছোট বেলা থেকেই ছেলের মতোই নিজের কাছে রাখা পাভেল। কিন্তু মেয়ের জন্য আফসোস তার বরাবরই ছিল। যথারীতি এই রোজকেই সে তার নিজের মেয়ে বানিয়ে নেয়।
এদিকে রোজের চেয়ে কেনীথ বয়সে তার দ্বিগুণ হলেও,রোজের যেন এ নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। বরং সে চিন্তিত এই ভেবে যে, তার এই অনুভূতির নামটা আদতে কি দেওয়া যায়? শুধুই একতরফা ভালোবাসা, নাকি কাউকে সামনে হতে ঠিকঠাক না দেখে,তার ভেতরটাকে না চিনেই ভালোলাগার এক অদ্ভুত অসম একতরফা ভালোবাসা!
ঢাকার অভিজাত মহল্লার অন্যতম প্রভাবশালী এবং আলোচিত এক পরিবার হলো এই এহসান পরিবার। শহরের প্রাণকেন্দ্রে, বিস্তৃত জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে তাদের আধুনিক প্রাসাদতুল্য বাসভবন। যেন রাজকীয় ঐশ্বর্যের সাথে মিশে গিয়েছে সমকালীন স্থাপত্যের সূক্ষ্ম রূপলাবণ্য। উঁচু লোহার সোনালী গেইট পেরিয়ে ঢুকলেই, চোখে পড়বে শীতল পাথরের মোজাইক বিছানো প্রশস্ত প্রাঙ্গণ। দুই পাশে সাজানো বিরল প্রজাতির গাছপালা, আর মাঝখানে বিশাল এক ফোয়ারা।
এই প্রাসাদ সমতুল্য বাড়ির মালিক বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রী তথা তারেক শিকদার।ব্যবসায়িক বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সামাজিক মর্যাদার এক অনন্য ব্যক্তিত্বের মানুষ তিনি।সর্বদা গাম্ভীর্যে মোড়া তাঁর ব্যক্তিত্ব। তেমনি আপনজনদের প্রতিও তিনি, নিত্যান্তই এক শক্ত খোলসে মোড়ানো।
এই এহসান পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি নয়।অথচ ছোট্ট হলেও তারা যেন এক অমূল্য রত্নভাণ্ডারের মতো। বড় মেয়ে আনায়া এহসান, যৌবনের প্রারম্ভে পা দেওয়া এক নমনীয় স্বভাবের তরুণী। আভিজাত্যের ভেতরেও রয়েছে তার নিজস্ব স্বপ্ন ও দৃষ্টি।তবে সেসব হয়তো বরাবরের মতোই নিজের অন্তরালেই থেকে যায়। কেননা এতো অভিজাত পরিবারের বড় মেয়ে হলেও,তার স্বয়ং স্বাধীনতার পরিধিটা খুবই কম। একপ্রকার নেই বললেই চলে।
অন্যদিকে ছোট মেয়ে ইনায়া এহসান—সবে মাত্র এসএসসি দিয়েছে। এখনো কলেজে ওঠার সময় হয়নি তার। অথচ এক ঝলকে দেখে কেউ বুঝতে পারবে না, এই মেয়ের ব্যক্তিত্ব ঠিক কেমন।
বাবার মতোই কঠোর স্বভাবের সে। প্রয়োজন ব্যতীত অতিরিক্ত কথা বলা তার নিত্যান্তই অপছন্দ। সবসময় গম্ভীর্যের সাথে চুপচাপ রইলেও,তার কন্ঠস্বর শুধু বাড়ি কিংবা তার বাবার ছোট হতে বড় যে কোনো রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসাহিক ব্যপারেই শোনা যায়।
এইটুকু মেয়ে রাজনীতির কি বোঝে তা কারোরই মাথায় ঢোকে না। অথচ তার কথাবার্তা, চালচলন—বরাবরই তারেকের পছন্দ বিধায়,সে তাকে সর্বক্ষেত্রেই অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে রেখেছে।
ইনায়া এমনিতে দেখতে ভারী মিষ্টি।কাঁধ পর্যন্ত ঘনো কালো চুল। অত্যধিক ফর্সা চেহেরা,টানা টানা চোখ, ছিমছাম দেহের গঠন—অথচ এমন মিষ্টি চেহেরায় সর্বদা গম্ভীর্য বিরাজ করে বিধায়,তাকে আনায়া হতে অনেকটাই আলাদা করা যায়। আনায়া যেখানে মিষ্টিভাষী,নমনীয়—সেথায় ইনায়া ঠিক তার উল্টো। সে অল্প কথা বললেও, তার প্রত্যেকটা কথা যে কারো গায়ে তীরের মতো বিঁধতে সক্ষম।
তারেক এহসানের দুই মেয়ে হওয়ায় তার বরাবরই শখ ছিল, এটা ছেলের।তবে ইনায়া বড় হতে হতে সে শখটাও যেন অজানায় মিলিয়ে গিয়েছে। কেননা ইনায়াকেই সে একটি দায়িত্বশীল ছেলের মতোই গড়তে চায়। যেখানে তারেক এহসানের পথ ফুরাবে, সেখান থেকেই যেন ইনায়ার পথচলা শুরু হয়।
আর এই সংসারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তাঁদের মা—অনামিকা(অনিমা)চৌধুরী অনু। মার্জিত রূপ ও শান্ত স্বভাবের নারী তিনি। পারিবারিক পরিসরে তাঁর যত্নশীলতা, এহসান বাড়িটিকে শুধু এক রাজকীয় আবাস নয়, বরং এক উষ্ণ আশ্রয়ে পরিণত করেছে।
তারেক এহসান প্রচন্ড গম্ভীর্যসম্পন্ন ব্যক্তি হলেও, তার এই গম্ভীর্যের মাঝেই এই মানুষগুলোর জন্য এক বিশেষ ভালোবাসার স্থান রয়েছে। একইসাথে তার স্ত্রীর প্রতিও সে যথেষ্ট কঠোর। কাশফিয়ার মতো চাইলেই, অনিমা কখনো তারেকের উপর দিয়ে কথা বলতে পারেনা। এ সাধ্য তার নেই। কেননা এমনটা করা মানে, তারেক শিকদারের প্রতি আরসপর্দা দেখানো।অথচ এই অনামিকাকেও তারেক এহসান সবসময় এক বিশেষ নামে ডাকে। তা হলো “অনিমা”। এ যেন নামের মাঝেই তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
বিকেল হয়ে এসেছে। তারেক এহসান আজ তার বাড়ির ড্রইং রুমে বসেই, তার পারসোনাল এসিসট্যান্ট সাফিনের সাথে—কিছু দরকারি বিষয়ে কাগজপত্র নিয়ে কথাবার্তা বলছেন।পরনে তার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি।
অন্যদিকে ঠিক একই জায়গায় সোফার আরেক কোণায়, পায়ের উপর পা তুলে বসে রয়েছে ইনায়া। হাতে তার আইপ্যাড। খুব মনোযোগ সহকারে পেন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাবনা-চিন্তার পর কিছু একটা নোট করছে সে। মোটামুটি সে তার কাজে ভীষণ ব্যস্ত। কাঁধ পর্যন্ত চুলগুলো পরিপাটি করে গোছানো, পরনের কালো রঙের গাউনটাও সাধারণের মাঝেও আভিজাত্যে মোড়ানো।
এসবের মাঝেই আবার আনায়া বাড়িতে এসে প্রবেশ করল। পরনে সেই আগেরই ডান্স প্রোগামে পড়ে যাওয়া জামাকাপড়। কেননা সারাদিন পরে এইমাত্র তার বাড়িতে আসার সুযোগ হয়েছে। অনেক আগে আসতে চাইলেও,তার বন্ধুদের জন্য কিছুই করে উঠতে পারেনি। ওদিকে আবার সাবা তো রয়েছেই—কথায় কথায় সবকিছু ম্যানেজ করার দায়িত্বে। সে আনায়াকে পছন্দ না করলেও তার বাকি বন্ধুরা যেন তাকে সর্বদা পছন্দ করে—এটা সাবা সবসময়ই চায়। এইজন্যই না চাইলেও সে অনেকসময় আনায়ার হেল্প করে দেয়।
আনায়া বাড়িতে ইতস্ততভাবে প্রবেশ করে। ড্রইং রুমে যে এইসময় তার বাবা-বোন একত্রে বসে থাকবে,তা সে মোটেও আশা করেনি। অদ্ভুত এক সংকোচ বোধ হচ্ছে। কিছুটা ঘাবড়েও গিয়েছে সে।
এদিকে আনায়া ধীর পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।তারা বাবা কিংবা বোন দুজনেই নিজেদের কাজে ব্যস্ত। আনায়া ভাবলো এই বাহানায় সোজায় দোতলায় চলে যাওয়াটাই ঠিক হবে।
যেমন ভাবনা তেমন কাজ। সে তার বাবা-বোনের পাশ কাটিয়ে যেতেই, পেছন হতে গম্ভীর এক স্বরে সে সম্পূর্ণ চমকে ওঠে৷
—“এই তোমার আসার সময় হলো?”
আনায়া পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখে,তার বাবা সহ ইনায়া ও সাফিন তার দিকে একনজরে তাকিয়ে রয়েছে। নিমিষেই আনায়া ঘাবড়ে গিয়ে কিঞ্চিৎ ঢোক গেলে। মাথা নুইয়ে সে তার বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়।
তারেক এহসান গম্ভীর চাহনিতে তার দিকে তাকিয়ে। মেয়েটা সারাদিন রোদে,ধুলোয় থেকেই নিজের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছে। এসব দেখে তার মাঝে মিশ্র অনূভুতি জাগে৷ খানিকটা আনায়ার প্রতি বিরক্তি,একইসাথে কিছুটা অসহায়বোধ। আর কয়েকটা দিনই মেয়েটা তার নিজের কাছে। অতঃপর চলে যাবে কোনো এক ভীনদেশে। মনের মাঝে মেয়েকে নিয়ে অনেক অনুভূতি জাগলেও,তারেক এহসানের শক্ত খোলসের নিচে সবই চাপা পড়ে যায়।
—“তাহলে, তোমার নাচ-গানের পর্ব,আজই শেষ হলো তাই তো?”
আবার এক গম্ভীর স্বরে, আনায়া মৃদু কেঁপে ওঠে। বুঝ হওয়ায় পর থেকেই আনায়াকে তার বাবাকে অনেক বেশি ভয় পায়। তার একেকটা কথা, আনায়ার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শাসনের ন্যায়৷ যথারীতি এখনও বিষয়টা তার ব্যতীক্রম নয়। আনায়া চুপচাপ রইলেও,সে ভেতরে ভেতরে ঠিকই ঘাবড়ে গিয়েছে।
আনায়া নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে, শুধু মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
“জ্বী বাবা।”
আনায়া জানে আজকের পর আর তার হয়তো কখনো নাচ করার সুযোগ হবে না। একইসাথে হবে না তার পড়ালেখা করার সুযোগ। হয়তো হতেও পারে, যদি ভবিষ্যতে তার স্বামী ওরফে রেহান চায়। কিন্তু বাবার বাড়িতে তার সকল শখ-স্বপ্নের পূর্ণ সমাপ্তি আজ এখানেই হয়েছে।
তারেক শিকদার আর বিশেষ কিছু না বলে,আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“যাও রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। তোমার মা, তোমার খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে। কাল না হয়,তোমার সাথে আবার কথা হবে।”
আনায়া তার বাবার কথামতো চলে যেতেই নিয়েছিল,তবে বাবার বলা শেষ কথায় সে থমকে যায়। সে কিছুটা কৌতুহলী স্বরে বলে ওঠে,
“কাল মানে…তুমি কি এখনই চলে যাচ্ছো বাবা?”
—“হুম,আরেকটু পরই বাহিরে বের হবো। তুমি তো জানোই আমার ফিরতে অনেক রাত হবে। সেক্ষেত্রে তোমার সাথে কাল দেখা হওয়া ব্যতীত, কোনো উপায় নেই।”
তারেকের স্বাভাবিক কথা শুনেও, আনায়া দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। সে কিছু বলতে চাইছে তবে বুঝতে পারছে না, এখনই বলা ঠিক না৷
এদিকে তারেক পুনোরায় নিজের কাজে মনযোগী হয়েছে। অন্যদিকে ইনায়ার নজরও তার আইপ্যাডে। আর আনায়া নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে ভাবছে, কি করা যায়।
এরইমধ্যে ইনায়া তার আইপ্যাডে নজর রেখেই, আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“আপু,তুই কি কিছু বলবি?”
আনায়া আনমনে ছিল বিধায়, নিমিষেই ইনায়ার গম্ভীর কন্ঠস্বরে কিঞ্চিৎ চমকে ওঠে। ওদিকে ইনায়ার কথা শুনে তার বাবারও তার দিকে মাথা উঁচিয়ে তাকিয়েছে—সুদর্শন ব্যক্তিত্বের সাফিনও তাই।
এদিকে এসবের মাঝে আনায়া বিচলিত হয়ে পড়েছে। তার ইতস্তত অভিব্যক্তিতে তারেক যেন অনেকটাই আন্দাজ করে ফেলে৷ সে সাফিনের উদ্দেশ্যে বলে,
“সাফিন, আপাতত তুমি যেতে পারো।”
সাফিনও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে,নিস্পৃহে জায়গা ত্যাগ করে। এরইমাঝে আবার ইনায়াও তার দিকে গুরুত্বের সহিত তাকিয়ে রয়েছে। যেন আনায়া খুব শীঘ্রই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবে,এবং তাতে তার নিজস্ব মতামতও লাগতে পারে।
তারেক তার সকল কাজকর্ম রেখে,উঠে আনায়ার সম্মূখে এসে দাঁড়ায়। হাত দুটো পেছনে মুঠো করে রেখে, গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“কিছু বলার থাকলে বলতে পারো।”
আনায়া কিছুটা ইতস্তত ভঙ্গিতেই ভাবতে থাকে, এইমূহূর্তে এসব কথা বলা ঠিক হবে কিনা। যদি তার বাবা সরাসরি মানা করে দেয়!তবুও আনায়া দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়েই, মাথাটা খানিক ঝুকিয়ে বলে,
“বাবা, আমার সব ফ্রেন্ডরা ঠিক করেছে বান্দরবান যাবে। তাই…”
—“তাই তুমিও যাবে, তাই তো?”
আনায়া আর কিছুই বলার সাহস পেল না। নিজের বাবার এহেন শান্ত-গম্ভীর কথাতেই,তার কান্না চলে এসেছে। আনায়া নিজেকে কোনোমতে সমালে নিয়ে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। তবে তার পূর্বেই আচমকা তারেক শিকদার, একের পর এক গম্ভীর ও ক্ষি”প্ত স্বরে বলতে লাগল,
“তোমার সাহস কি করে হয়, এসব কথা এসে আমাকে বলার? হুঁশ আছে তোমার? ক’দিন পর তোমার বিয়ে, অথচ তোমার সে চিন্তে নেই। নাচ-গান,পড়াশোনা,ঘুরাঘুরি—এসব দিকেই তোমার মনোযোগ? হ্যাঁ,এমন তো নয় যে এসব বিষয়ে আমি তোমাকে সবসময় বাঁধা দিয়েছি। তোমার শখ ছিল নাচ করার, আমি তার পারমিশন দিয়েছি। পড়াশোনা করতে চেয়েছিলে,আমি করিয়েছি। আর কি চাইছো তুমি? পাত্রপক্ষের সামনে আমার মাথা কাঁটা যাক?”
আনায়ার প্রতি তারেকের এমন বিহেভিয়ার নতুন নয়। আনায়ার বুঝ হবার পর হতে, সে তার বাবাকে এই রূপেই দেখে আসছে। কিন্তু এসব যেন শুধু তার জন্যই বরাদ্দ। কেননা ইনায়ার জন্য তার বাবা তো একদম স্বাভাবিক। বরং আর সকল বাবার মতোই। আনায়া আজও বুঝতে পারেনি, তাদের দুই বোনের মাঝে কেনো এই বৈষম্য করা হয়।
আনায়া সবমিলিয়ে প্রচন্ড ঘাবড়ে গিয়েছে। যেন জানতো, এমন কিছুই হবে। তার মাথা ক্রমশই নুইয়ে পড়েছে। চোখ বেয়ে অনর্গল পানি ঝড়ছে। কোনো শব্দ না হলেও,তার ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ স্পষ্ট। আনায়া নিজের হাতদুটো মুষ্টি করে সামলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারছে না। এরইমাঝে তারেক আবারও বলে,
“আনায়া তুমি…”
—“বাবা,থামো…!”
তারেকের কথা শেষ হবার পূর্বেই, ইনায়ার কন্ঠে তারেক থেমে যায়। কথায় মাঝে কথা বলায়, তারেক তার দিকে চোখ গরম করে তাকালেও—ইনায়ার যেন তাতে কিছুই এসে যায় না। কারণ সে জানে,আর যাই হোক—তার বাবা তার উপর চড়াও হবে না।
ইনায়া এসে আনায়ার সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“আপু, বান্দরবান লোকেশনটা একটু বেশিই দূরে হয়ে যাচ্ছে। তোর ফ্রেন্ডদের বল, কাছে কোথাও ট্রিপের ব্যবস্তা করতে। আই হোপ,বাবা তখন তোকে যেতে মানা করবে না।”
তারেক রাগান্বিত চাহনিতে, দুজনের দিকে তাকিয়ে। ইনায়ার কথার পর সে আর কিছুই বলছে না। এরইমাঝে তার যেন কিছু একটা স্মরণে এলো। যা সে পূর্বে খেয়াল করেনি।
এদিকে আওয়াজ শুনে তারেকের স্ত্রী অনিমা এগিয়ে এলো। সারাদিন পর মেয়েকে, এমন বাড়ির মধ্যে স্থানে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে অনেকটাই বিস্মিত।তারেকের হাবভাবেও বুঝে গেল,ঘটনা কি! মেয়েটা বাড়িতে আসতে না আসতেই, বাপ তার মেয়েকে বকাবকি শুরু করে দিয়েছে।
অনিমা তারেকের প্রতি বিরক্তি, ক্ষো”ভ নিয়েই সেদিকে এগিয়ে যায়। দ্রুত আনায়ার কাছে গিয়ে,তাকে দু’হাতে আগলে ধরে। আনায়া মায়ের সান্নিধ্য পেতেই,তৎক্ষনাৎ তার বুকে মুখ লুকায়। সে চায় না, এখানে বসে বসে ছোটদের মতো কাঁদুক। কিন্তু নিজেকে তো সামলাতেও পারছে না।
—“ওকে ঘরে নিয়ে যাও।”
এদিকে তারেকের মেজাজ আরো বেশি রুক্ষ হয়েছে। হঠাৎ কি হতে কি হলো, তা যেন কেউই বুঝতে পারল না। তবে অনিমাও আর নিজের রাগ সামলাতে না পেরে বলল,
“কেমন বাপ আপনি? দু’দিন বাদে মেয়েকে বিয়ে দেবেন করে করে,এখনও ওর জীবনটা নিয়ে পুতুলের মতো ছিনিমিনি খেলছেন? কি পাপ করেছিল আমার মেয়ে? কোনো দোষ না করেও, কেনো ওকে আজও এতসব কিছু সহ্য করতে হচ্ছে? এসবই কি ওর প্রাপ্ত।”
—“অনিমা, ওকে ঘরে নিয়ে যাও।”
পুনোরায় তারেকের রুক্ষ গম্ভীর কন্ঠে, অনিমা আরো বেশি ক্ষি”প্ত হয়। সে আবারও বলে ওঠে,
“না, নিয়ে যাব না। মেয়ে তো আপনার দুটোই। একটাকে মু্ক্তি দিলে, আরেকটাকে কেনো সারাজীবন ঘরে বন্দী করে রাখলেন?”
—“অনিমা! ফালতু কথা বলো না। যা জানো না, তা সম্পর্কে কথা বলতে এসো না।”
অনিমা এবার তারেক হতে নজর সরিয়ে, ইনায়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
“এরে ইনা! কি হয়েছিল?”
মায়ের এমন ক্ষি”প্ত চেহেরা দেখে, ইনায়া ভারী শ্বাস ফেলে বলে,
“আপুর ফ্রেন্ডরা মিলে ঠিক করেছে, বান্দরবান যাবে। তো এইজন্যই…”
ইনায়ার কথা শেষ হতে না হতেই, অনিমা তারেকের দিকে তাকিয়ে ক্ষি”প্ত স্বরে আওড়ায়,
“তো যাক না, বন্ধুদের সাথে বান্দরবান! কি হয়েছে তাতে? মেয়েটাকে বিয়ে দিলেই তো, দুদিন বাদে দেশ ছাড়বে। আর কখনো কি সুযোগ হবে…”
অনিমার কথা শেষ হয়না। বরং তার পূর্বের তারেক শিকদার পুনোরায় চড়াও হয়ে বলে ওঠে,
“যাস্ট শাট আপ! হুঁশ আছে তোমার? কি বলছো মাথায় আছে? ও বান্দরবান যেতে চাইছে!… অনিমা! বান্দরবান কিন্তু চট্টগ্রামেই। বিষয়টা মাথায় রেখো।”
মহামায়া পর্ব ১
এ কথা বলামাত্রই তারেক শিকদার স্থান ত্যাগ করে। একপ্রকার প্রচন্ড রাগ নিয়েই, সে বাড়ির সীমানা পেরিয়ে যায়।এদিকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অনিমা। তারেকের কথার উদ্দেশ্য, শেষমেশ সে ঠিকই বুঝতে পেরেছে।
ইনায়া চুপচাপ দাড়িয়ে রইলেও, অনিমা অজান্তেই আনায়াকে আঁকড়ে ধরে ঠোঁট চেপে কেঁদে ওঠে। অথচ আচমকা তার কান্নার কারণ, আনায়া কিংবা ইনায়া কেউই বুঝে উঠতে পারে না।
