মহামায়া পর্ব ৫
তুশকন্যা
সকাল সকাল নায়রা অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। ডার্ক অলিভ কালারে ফর্মাল প্যান্ট আর ওভারকোটের সাথে অফ হোয়াইট কালারে সিল্কের শার্ট।পায়ে YSL এর উঁচু কালো রঙের হিল। চুলগুলো হালকা মেসি বান করা। ঠোঁটে বরাবরের মতো ডার্ক শেডের লিপস্টিকের প্রলেপ।
নায়রা রেডি হয়ে নিচে আসে। একহাতে অফ হোয়াইট কালারে ব্লাডেনের ছোট্ট ব্যাগ, অন্যহাতে কালো সানগ্লাস। আগামীকাল কেনীথ আর পাভেল বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। যথারীতি পাভেল তার প্রয়োজনীয় কাজগুলো শেষ করতে, অনেক আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। তবে কেনীথের বিষয়ে সে নিশ্চিত হয়ে কিছু বলতে পারছে না।
গতকাল অনেক রাত অব্দি তার রুমের লাইট জ্বলছিল। নায়রা ধরেই নেয়, কেনীথ হয়তো সারারাত জেগেছে। তাই আজ আর সে অফিস যাবে না। এই ভাবনায় সে রুম থেকে বের হতে নেবে এমন মূহুর্তে,আচমকা কেনীথের দেখা মেলে। দোতলা হতে ঘুম ঘুম চোখে হেলেদুলে নিচে নামছে। পরনে কালো রঙের টিশার্ট আর টাউজার।
কেনীথকে দেখে নায়রা থমকে দাঁড়ায়। খানিক তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“দেখে তো মনে হচ্ছে ঠিকঠাক ঘুম হয়নি। এখনই এলি কেনো?”
কেনীথ হাই তুলে গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“অফিসে যাচ্ছিস?”
প্রশ্নের উত্তরে, পাল্টা প্রশ্ন! কেনীথের এই আজব স্বভাবে সে অভস্ত্য। তাই নায়রা স্বাভাবিক স্বরেই জবাব দেয়,
“হুম! তুই যাবি?”
কেনীথ নিস্পৃহে আওড়ায়,
“পাঁচ মিনিট ওয়েট কর। আমি রেডি হয়ে আসছি।”
এই বলে সে সিঁড়ি থেকেই পুনরায় দোতলায় চলে যায়। অন্যদিকে নায়রা হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ব্রাশ করতেই তো এর পাঁচ মিনিট লেগে যাবে। পুরোপুরি রেডি হবে কতক্ষণে?
নায়রা বিরক্ত হলেও,সেখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। হাতে থাকা কালো-সোনালী রঙের ঘরিটার দিকে তাকিয়ে,সময় গুনতে লাগল। ঠিক পাঁচ মিনিট পর কেনীথ হাজির হলো। কিন্তু তার বেশভূষায় নায়রা আবারও হতাশ।
কালো রঙের একটা হুডি পড়ে,হাতদুটো পকেটে গুঁজেছে। হুডির টুপিটা দিয়ে সম্পূর্ণ মাথা ঢাকলেও,সামনের বেরিয়ে থাকা চুলগুলো এখনোও এলোমেলো। কালো রঙের প্যান্টটা চেঞ্জ করে নতুন করে পড়েছে কিনা, এই নিয়ে নায়রার সন্দেহ আছে। চোখ-মুখ ভাবভঙ্গিও বেশ গম্ভীর। যেন ব্রাশটা করে, মুখে পানিয়ে ছিটিয়েই চলে এসেছে।
কেনীথ নিচে নামতেই,নায়রা তার উদ্দেশ্যে বলল,
“এভাবেই যাবি?”
—“হুম।”
তার এহেন নির্বিকার অভিব্যক্তিতে নায়রার আর কিছু বলার থাকে না। তবে পায়ের দিকে নজর পড়তেই সে বলল,
“পায়ে তো জুতো নেই। খালি পায়ে যাবি?”
কেনীথ নায়রায় আগে আগে পথ ধরে, এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“না,বাহিরে স্লিপার আছে।”
কেনীথের এ কথার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে, নায়রায় চোখ-মুখ নিমিষেই শক্ত হয়। আক্রোশে চাপা স্বরে,সে কেনীথের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“ভিইইইইইই!”
তার গলার আওয়াজে কেনীথ পেছনে ফিরে নিষ্ফল চাহনিতে নায়রাকে একপলক দেখে। পরক্ষণেই নিস্পৃহে বাড়ি হতে বেরিয়ে যায়। নায়রাও হতাশ হয়ে তার পেছন পেছন ছুটে যায়।
এবারও গাড়িটা নায়রা ড্রাইভ করছে, আর পাশে কেনীথ বসে বসে একপ্রকার ঝিমাচ্ছে। নায়রা ফ্রন্ট মিররে তাকে একপলক দেখে নিয়ে বলল,
“মেডিসিন নিয়েছিস?”
কেনীথ আনমনে আওড়ায়,
“হুম।”
—“বাড়িতে থাকলেই পারতি। মেডিসিনের রিয়াকশন হচ্ছে বোধহয়।”
এই বলেই নায়রা কিছুক্ষণের জন্য থামে। অন্যদিকে কেনীথ এখন নির্বিকারে বসে। কিছুটা সময় অতিবাহিত হবার পর, নায়রা আবারও বলে,
“মাথার ব্যাকসাইটে কি এখনো ব্যাথা করে?”
কেনীথ আবারও আনমনে জবাব দেয়,
“হু…মাঝেমধ্যে…।”
নায়রা ফ্রন্ট মিররে কেনীথকে অপলকভাবে চেয়ে দেখার পর, ভারী শ্বাস ফেলে। পুনরায় দুজনের মাঝে পিনপতন নীরবতা জমে। নায়রা ইচ্ছে করেই আর পুরোনো কথা তুলতে চাইলো না। শুধু এইটুকুই বলল,
“ঘুমের সময়টা চেঞ্জ কর। কাল রাতেও সারারাত জেগে ছিলি। এতে তোর ভালোর ভালো কিছুই হচ্ছে না, বরং উল্টো ক্ষতি হচ্ছে।”
কেনীথ আর কিছুই বলেই না। তবে অদ্ভুত ভাবে সামান্য তির্যক হেসে মৃদু স্বরে আওড়ায়,
“ক্ষতি হচ্ছে!”
মিউনিখ শহরের প্রান্তে,আলিয়াঞ্জ এরিনা থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে এবং BMW Welt এর কাছাকাছি হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে, অবস্থিত ব্লাডেন হেডকোয়ার্টারস। জায়গাটা সাধারণ কোনো শিল্পাঞ্চল নয়,বরং এক বিস্তীর্ণ কর্পোরেট ক্যাম্পাস।যেখানে গ্লাস আর স্টিল এর মিশেলে তৈরি বহুতল ভবনগুলো দূর থেকেই আলাদা করে নজর কাড়ে। চারপাশে যতদূর চোখ যায়, বিস্তীর্ণ ক্যাম্পাস ঘিরে সাজানো সবুজ ল্যান্ডস্কেপিং , ঝরনা ফোয়ারা আর মার্বেল টাইলস এর ওয়াকওয়ে। রাতে সব আলো জ্বলে উঠলে সম্পূর্ণ জায়গাটা যেন কোনো সাই-ফাই সিনেমার হাই-টেক সিটি।
ব্লাক-রেড গ্লাস টাওয়ারের ন্যায় দেখতে ব্লাডেনের মূল ভবন। যা বিস্তীর্ণ এক জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এই ব্লাডেন ইন্ডাস্ট্রির কয়েকটি সাব সেক্টর থাকলেও,তা সবটাই এই এক জায়গায় অবস্থিত। যেখানে কেনীথের ব্লাডেন মিউজিক স্টুডিও হতে নায়রার ব্লাডেন বিউটি কিংবা পাভেল কর্তৃক ব্লাডেন টেক্সটাইল ডিভিশন সেক্টর—সবই রয়েছে একত্রে। যদিও সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে রেখেছে,ব্লাডেন ম্যাকানিক্যাল সেক্টর। এছাড়া প্রতিটি সেক্টরের জন্য বিশেষ ল্যাবগুলো তো রয়েছেই।
কেনীথ আর নায়রা একসাথে কার থেকে বেরিয়ে, অফিসের দিকে এগিয়ে যায়৷ বিশাল ভবনের ঠিক আট তলায় তাদের মূল চেম্বার। নায়রা তার নিজস্ব শৈলীতে হেঁটে চলেছে। তার হাঁটাচলা কিংবা ভাবভঙ্গি সবই একটু ভিন্ন ও আকর্ষণীয়। অন্যদিকে কেনীথ এবার কিছুটা স্বাভাবিক হয়। কালো হুডির টুপিটা টেনে, মাথাটা খানিক ঝুঁকিয়ে,শিরদাঁড়া সোজা করে এগিয়ে যেতে লাগল। হাত দুটো বরাবরের মতো হুডির পকেটেই। বেশভূষায় আহামরি কোনো কিছু না থাকলেও,এটাই যেন তাকে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
দু’জনকে দেখামাত্রই কালো পোশাকের আবরণে মোড়ানো ছয়জন বডিগার্ড তাদের ঘিরে ধরে জায়গা করে দেয়। দুজনে নির্বিকারে এগিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু লিফট অব্দি পৌঁছানোর আগেই চারপাশের আবহ কিছুটা পরিবর্তন হয়। নায়রা মাথা না ঘুরিয়েই, চারপাশের সবটাই নিজের শান্ত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে। এবং একপলক আড় চোখে কেনীথ কে দেখে। তার যা বোঝার তা সে বুঝে গিয়েছে। কেনীথের মাথা নুইয়ে গম্ভীর ভাবে হাঁটতে দেখেও,সে অজান্তেই মৃদু হাসে।
বর্তমানে জার্মানিতে শীতের মৌসুম না এলেও,এই শীত প্রধান দেশে এমন সময়ও বেশ ঠান্ডা জমে চারপাশে। যথারীতি অফিসের কমবেশি সকলেই ফর্মাল ড্রেসের উপরে বড়সড় আকারে ট্রেঞ্চকোট কিংবা ওভারকোট পড়েছে। কিন্তু এটা কোনো মূখ্য বিষয় নয়। ঘটনা ঘটেছে,মেয়েদের মাঝের বেশিরভাগই নিজের ওভার কিংবা ট্রেঞ্চ কোটে মুখ ঠেকে মিটমিট করে হাসছে। তারা যে কেনীথকে দূর হতে দেখেই হাসাহাসি করছে, তা আর নায়রার বুঝতে বাকি নেই।
এটা প্রতিবারই ঘটে। এখানকার বেশিরভাগ মেয়েরই বয়স কম। যথারীতি বিশাল একাংশ তাদের ভিকের জন্য পাগল হয়ে থাকে।আর কেনীথ যেহেতু সহজে অফিসে আসে না, তাই তাকে দেখামাত্রই এদের উত্তেজনা বেড়ে যায়। আবার পাভেলও এর ব্যক্তিক্রম নয়। কিন্তু সে অবশ্য এই সুযোগে মেয়েদের সাথে গিয়ে টুকটাক ফ্ল্যার্টিং করে আসে।
অন্যদিকে অবিস্মরণীয় সম্ভ্রমময়ী রমণী নায়রায় দিকে ছেলেদের নজর পড়বে না, এমনটা তো হয়না। অফিসের পুরো পুরুষগোষ্ঠীই যেন তার রূপে মাতোয়ারা। একইসাথে তার কর্তৃত্বপরায়ণতায় দিশেহারা। তারা শুধু দূর হতে নায়রাকে একঝলক দেখতেই পারবে,এরচেয়ে বেশি কিছু করার দুঃসাহস কারো নেই। কিছু করার সামান্য চেষ্টা করা মাত্রই, অফিস হতে চিরতরে তাকে বের হয়ে যেতে হবে। আর নায়রার বিশেষ ইচ্ছে হলে,তার ফিউচার ক্যারিয়ারও বর’বাদ।
তারা দুজন নির্বিকার ভঙ্গিতে লিফটের সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু লিফটের দরজা খোলামাত্রই দু’জন স্তব্ধ। পুরো একদল মেয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ লিফট ভর্তি হয়ে রয়েছে। কেনীথের নজর সম্পূর্ণ নিচের দিকে থাকলেও,নায়রা অনিমেষই মৃদু হেসে ফেলল।
অন্যদিকে মেয়েগুলো এতোদিন পর কেনীথকে অফিসে দেখে সম্পূর্ণ হতভম্ব। একইসাথে একেকজনের ভেতরে যেন উত্তেজনার জোয়ার বইছে। কিন্তু যত যাই হোক,এখানে ম্যানারলেস আচরণ করা মানেই সর্বনাশ। তাই বাধ্য হয়েই প্রত্যেকে তাদের স্বপ্নের পুরুষকে নিজেদের এতো সান্নিধ্যে পেয়েও একদম চুপটি করে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অথচ তাদের নজর ঠিকই যথাযথ স্থানে রয়েছে।
নায়রা জানে,কেনীথ বিরক্ত হলেও এখান থেকে যাবে না। ভাবগম্ভীর্য এমন রাখবে যেন,আশেপাশে কিছুই হচ্ছে না৷ যথারীতি দুজনে লিফটের ভেতরে শান্ত ভঙ্গিতে প্রবেশ করে। তবে নায়রা শুরুতেই একবার বিস্তৃত হেসে, মেয়েদের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“হাই গার্লস্,হোয়াটসঅ্যাপ। আল্লেস্ গুট?”
(মেয়েরা,কি খবর তোমাদের? সব ঠিক তো?)
নায়রার আন্তরিকতায় সকলেই মাথা নুইয়েই জবাব দেয়,
“ডাঙ্কে, গ্নেডিগে ফ্রাউ, উন্স গেট্ এস্ গুট।”
(ধন্যবাদ ম্যাম,আমরা সবাই ভালো আছি)
নায়রা আর বেশি কিছু না বলে মুচকি হাসে। ব্লাডেন ইন্ডাস্ট্রিতে কমবেশি অনেক দেশের মানুষজন কাজ করে। তবে এখানে বেশিরভাগ সময় সকলেই জার্মান ভাষাতেই কথা বলে। কেননা এখানে জার্মান ভাষা জানাটা একপ্রকার বাধ্যতামূলক। নয়তো শুধুমাত্র নিজস্ব মাতৃভাষা কিংবা ইংরেজি দিয়ে জার্মানিতে টিকে থাকা একপ্রকার অসম্ভব। এর অন্যতম কারণ হলো, জার্মানরা সাধারণত নিজেদের ভাষাকে অনেক বেশি ভালোবাসে। তাই তারা সচারাচর এই ভাষা ব্যতীত অন্যকোনো ভাষা জেনে থাকলেও, বলতে ইচ্ছুক নয়।
পুরো সময়টায়, লিফটে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করল। কেউ একবারও নিজের মুখ খুলল না। কিন্তু নায়রা আর কেনীথের পেছন ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা, একদল মেয়ের অতিমাত্রায় মৃদুস্বরে ফিসফিস করাটাও স্পষ্টভাবেই তাদের কেনীথ কিংবা নায়রার কর্ণগোচর হলো। কিন্তু দুজনের একজনও বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া না করেই,নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতেই দৃঢ় পায়ে লিফট হতে বেরিয়ে পড়ল।
এদিকে নায়রা শুরুতেই আটতলায় অবস্থিত, তাদের কনফারেন্স রুমে এসে প্রবেশ করল। তার পেছন পেছন দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো কেনীথ। কোনোমতে গ্লাসডোরটা ঠেলে দিয়ে, প্রচন্ড বিরক্তির সাথে ভেতরে এসে, হাইব্যাক চেয়ারে বসে গা এলিয়ে দেয়। মাথা হতে হুডির টুপিটা টান দিয়ে খুলে, বিরক্তির স্বরে দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ায়,
“আঃ, ফা’কিং গ্রোস!”
নায়রা নির্বিকারে ফাইল চেক করতে বসেছে। আচমকা কেনীথের এহেন অভিব্যক্তিতে সে নিস্পৃহে বলে উঠল,
“কি হলো আবার?”
কেনীথ চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আধশোয়া থাকা অবস্থাতেই,আঁড়চোখে একবার নায়রাকে দেখে। পরক্ষণেই নজর সরিয়ে নির্বিকারে আওড়ায়,
“হাঁটুর বয়সী মেয়েগুলো এমন নির্লজ্জের মতো বিহেভিয়ার, কিভাবে করে?…হাহ্, ডিজগাস্টিং!”
নায়রা মুখ তুলে কেনীথকে একপলক দেখে। পরক্ষণেই মৃদু তির্যক হেসে বলে,
“তুই না হয় জানিস, ওরা তোর হাঁটুর বয়সী। কিন্তু ওরা তো আর জানে না—তুই ওদের চাচার বয়সী।”
এহেন কথা বলামাত্রই নায়রা পুনরায় নিজের কাজে মনোযোগী হয়। অন্যদিকে কেনীথ দাঁতে দাঁত পিষে, নায়রার দিকে বিরক্তির চাহনিতে তাকিয়ে আওড়ায়,
“সুইঠি!”
নায়রা আবারও নির্বিকারে হেসে জবাব দেয়,
“সরি,বাট ইট’স ট্রু!”
কেনীথ নায়রাকে খানিকক্ষণ চাপা চাহনিতে তাকিয়ে দেখার পর, ভারী শ্বাস ফেলে আওড়ায়,
“আ’ম যাস্ট থার্টি ফাইভ! এটাকে চাচার বয়সী বলে না।”
—“তো কি হয়েছে,ওরা তোকে পঁচিশ বছরের ছোকরা ভাবলেও,তুই তো শেষে ঐ বিয়ে না করা সিঙ্গেল চাচা…।”
নায়রার কথা শেষ হতে না হতেই,কেনীথ ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“মিস নায়রা ইমানি! আপনি প্লিজ বলবেন,আপনার নিজের এইজটা কত? আর আমার ভুল না হলে,আপনি এখনও সিঙ্গেল রয়েছেন।”
নিমিষেই নায়রা চুপ হয়ে যায়। কেনীথের দিকে চাপা নজরে কিছুটা সময় তাকিয়ে থাকে। কেনীথও এবার মৃদু তির্যক হাসে।অন্যদিকে নায়রাও হুট করে অতিরঞ্জিত ভঙ্গিতে বলতে লাগল,
“মিস্টার ভিকে! প্রথমত মেয়েদের বয়স পাবলিক প্লেসে জানতে চাওয়া একটা ম্যানারলেস ব্যাপার। আর দ্বিতীয়ত,যুগে যুগে অনেক মহীয়সী নারীগণ পুরো জীবন সিঙ্গেল থেকেই কাটিয়েছে। ধরে নিন, আমিও তেমন কিছুই! কিন্তু আপনি কোন মহাপুরুষ? পুরো জীবনে এক পিস ভালো কাজ করেছেন কিনা, তা সাবমেরিন দিয়েও তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
কেনীথ আর কিছুই বলে না। ভারী শ্বাস ফেলে, ডেস্কের উপর থাকা চেরির গ্লাস বোলটা নিজের দিকে কাছে টেনে নেয়। অতঃপর চেরি খেতে খেতেই, নায়রার উদ্দেশ্যে বলল,
“পাভেল কোথায়?”
—“ভার্সিটিতে…।”
—“আজ ওর ক্লাস আছে?”
—“না, সামনের উইকে তো আছে। তোরা যেহেতু দেশে যাচ্ছিস, এজন্য ছুটি নিতে গিয়েছে।…সাথে বলল,আরো এক্সট্রা কিছু কাজ আছে।”
আবারও দুজনের মাঝে পিনপতন নীরবতা জমে। কেনীথ তার ল্যাপটপ নিয়ে কাজে বসে যায়। অন্যদিকে নায়রাও প্রচন্ড মনোযোগী হয় নিজের কাজ করছে। আরো বেশ কিছু সময় অতিক্রম হবার পর, নায়রা হঠাৎ-ই বলে উঠল,
“ভি! আমার একটা প্রশ্নের উত্তর চাই। ঐ মেয়েটাই কি সেই মেয়ে?”
কেনীথ আশেপাশে না তাকিয়েই জবাব দেয়,
“কোন মেয়ে?”
—“যার চোখের ছবি এঁকে তুই ডাস্টবিনে ফেলেছিলি।”
নিমিষেই কেনীথের হাত থেমে যায়। ল্যাপটপের স্ক্রিন হতে নজর সরিয়ে,নায়রার দিকে ফিরে তাকায়। এবং পরক্ষণেই বলে ওঠে,
“আবার কেনো এই বিষয়ে…”
কেনীথের কন্ঠস্বর রুক্ষ হয়ে এসেছে। সে তার কথা সম্পূর্ণ করার আগেই,নায়রা বলে উঠল,
“কারণ আমি জানতে চাইছি। তুই এতো বছরেও কেনো নরমাল হতে পারছিস না। প্রতিবার একটা না একটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।”
কেনীথ নায়রার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর, অনিমেষই আওড়ায়,
“আমি এ ব্যাপারে কথা বলতে চাই না।”
—“কিন্তু কেনো? এতো বছর তোর সাথে সাথে ছিলাম। অথচ তোর সম্পর্কে আমরা তেমন কিছুই জানিনা।”
কেনীথ এবার কিঞ্চিৎ ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“কিছুই জানিস না মানে,আমি তোকে…”
—“যেটুকু বলেছিস, ওটা খুব বেশি হলেও টেন পারসেন্ট। বাকি নাইটি পারসেন্ট তুই এখনও আড়াল করে রেখেছিন।”
নায়রার এহেন তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তিতে, কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে আওড়ায়,
“এমনটাই মনে হয় তোর?”
—“অফকোর্স! তুই যদি…”
—“আ…! গাইস, আমি একটা অকাজ করে এসেছি।”
আচমকা পাভেলের কন্ঠস্বরে দুজনেই মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে ফিরে তাকায়। ফর্মাল ড্রেসে সুট-বুট পড়ে দাড়িয়ে রইল,দেখে মনে হচ্ছে এই মূহুর্তে কোথাও মা’রামা’রি কিংবা ধ্বস্তাধস্তি করে এসেছে। তাকে অদ্ভুত ভাবে হাপাতে দেখে, নায়রা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“কি হয়েছে তোর? কোথায় গিয়েছিলি?”
পাভেল শুরুতেই কিছু না বলে, সোজা চেয়ারে বসে গা এলিয়ে দেয়। অতঃপর পাশ থেকে একটা পানির বোতল টেনে নিয়ে, ঢকঢক করে প্রায় সবটাই খেয়ে ফেলে।এদিকে তার এসব আচরণে নায়রা কিছুটা অবাক হয়। কেনীথ তার উদ্দেশ্যে নির্বিকারে আওড়ায়,
“বক্সিং ক্লাবে গিয়েছিলি?”
পাভেল কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বলল,
“হুম!”
এবার নায়রা কিছুটা ক্ষিপ্ত স্বরে বলে,
“তোকে না নিষেধ করা হয়েছিল? এরপরও কেনো ওখানে গিয়েছিস? তোর এখনও মা’রামা’রি করার এতো কিসের শখ?”
নায়রার কথায় পাভেল কিছুটা বিরক্ত হয়ে আওড়ায়,
“ইমু আমার খালাম্মা! আমি এতসব কিছু ছেড়ে বক্সিং এর জন্য ক্লাবে যাইনি। ঐ বজ্জাত হেনরিককে চিনিস তো? জ্যাকের চামচা। ঐ ইডিয়ট আর আমার বাইক রাইডিং ক্লাবের এক গাধা… ডিটার। এরা দুজন মিলে আমাকে উষ্কে দিয়েছিল।এরপর এক কথায় দুই কথায় ওখানে গিয়ে…”
—“মা’র খেয়ে এসেছিস তাই তো?”
নায়রার এহেন কথায় পাভেলের চোখ-মুখ কুঁচকে যায়। একপ্রকার ক্ষিপ্ত হয়ে সে তার উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“শা’লী তুই আমাকে ভাবিসটা কি? কয়েকবছর আগেও আমি ঐ বক্সিং ক্লাবের চ্যাম্পিয়ান ছিলাম। তোদের কথামতো ওসব ছেড়ে দিয়েছি মানে এই না যে,আমি যার তার হাতে মা’র খেয়ে আসব।”
নায়রা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে বলল,
“ফাস্ট অফ অল,ভাষা সংযত কর!”
নায়রার এহেন অভিব্যক্তিতে পাভেল থামে। নিজেকে শান্ত করে মুখ ঘুরিয়ে নিতেই,নায়রা আবারও বলে,
“গুড, এখন এটা বল। তুই আমাকে এসব উল্টোপাল্টা নামে ডাকা বন্ধ করবি কবে?”
—“ম’রে গেলেও না।”
—“পাভেল!”
পাভেল নির্বিকারে তার দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়,
“খারাপ কি! একটু তো ইমু নামেই…”
—“আমি কতবার বলেছি,হয় আমাকে নায়রা বলবি নয়তো ইমানি। কিন্তু এসব ইমু-টিমু বলে ডাকবি না!”
পাভেল কথা বাড়িয়ে আরো কিছু বলতে যাবে।তার আগেই কেনীথ গম্ভীর স্বরে বলল,
“স্টপ! কিসব শুধু করেছিস দুজনে?
কেনীথের বিরক্তির অভিব্যক্তিতে দুজনেই পুনরায় নিজেদের কাজে মনোযোগ দেয়। তবে এরিমধ্যে পাভেল আবারও বলে,
” ব্রো! ওদের দুটোর কিছু করা উচিত।”
কেনীথ কাজে ব্যস্ত ভঙ্গিতেই আওয়াজ,
“বেশি বাড়াবাড়ি করলে,আমাদের স্টুডিওতে নিয়ে আয়।”
—“সত্যি আনবো?”
কেনীথের এহেন কথায় পাভেল বেশ খুশি হলো। তবে নায়রা মুখ তুলে দুজনকে একপলক দেখে নিয়ে,খানিক রাগান্বিত স্বরে বলতে লাগল,
“খবরদার! যাওয়ার আগে এসব কিছুই করবি না তোরা। দেশ থেকে ফিরে আয়, তারপর এসব হবে। প্রয়োজনে তোদের সাথে আমিও ওদের মুখে দুটো পাঞ্চ মা’রব। তবুও এখন এসব ঝামেলা করবি না।”
নায়রার কথায় আর পাভেলের কিছু বলা হলো না। কেনীথও চুপ থেকে বিষয়টা এড়িয়ে গেল। তবে খানিকক্ষণ বাদেই পাভেল বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“জ্ঞানদাত্রী খালাম্মা!”
রাতের আকাশে আলোকিত আকাশপথের নীচে, মিউনিখ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সরু করিডরগুলোতে মানুষের চমৎকার ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। যাত্রীদের পায়ে পা মিলিয়ে চলাফেরা, লাগেজ ভ্যানের আওয়াজ, রেডিও থেকে ছড়ানো মনোরম অ্যানাউন্সমেন্টের শব্দ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা তৈরি হয়েছে। এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে কেনীথ আর পাভেল দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাকপ্যাক ও লাগেজ হাতে নিয়ে।
কেনীথের পরনে কালো রঙের টিশার্ট, তার উপর জড়ানো কালো রঙের জ্যাকেট। প্যান্ট কিংবা জুতো সবই এখন কালো। অন্যদিকে পাভেলের বেশভূষাও প্রায় একই রকম। শুধু তার টিশার্টের রংটা ধূসর। অন্যদিকে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে নায়রা। বরাবরের মতো এই রাতের বেলাতেও,সাধারণের মাঝেও সাড়ম্বরপূর্ণ।
তিনজনের অভিব্যক্তিতে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। বিশেষ করে কেনীথ সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। পাশে পাভেল বেশ উচ্ছ্বসিত চিত্তেই,ফ্ল্যাইটের অপেক্ষায় সময় দেখছে। এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্ল্যাইট জার্মানির মিউনিখ হতে রাত সাড়ে দশটার দিকে ছাড়বে। দুবাইয়ে চার ঘন্টার বিরতি সহ প্রায় সাড়ে চৌদ্দ হতে পনেরো ঘন্টার দীর্ঘ সফর শেষে,এটি আনুমানিক আগামীকাল বিকেল পাঁচটা নাগাদ ঢাকায় পৌঁছাবে। এবং তারা আজ এই ফ্ল্যাইটেই দেশে ফিরছে।
ফ্ল্যাইট বোর্ডিং টাইম ইতিমধ্যে প্রায় শেষ। এখন আর দেরি করে লাভ নেই। এবার দুজনকে যেতে হবে। নায়রাও আর কোনো বাঁধা না দিয়ে,হাত ঘড়িতে সময়টা একঝলক দেখে নিয়ে,ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“তবে আর কি। সাবধানে যাস। পৌঁছে আমায় একটা ফোন করিস।…তোদের মিস করব অনেক।”
নায়রার কথা শেষ হতে না হতেই, পাভেল বলে উঠল,
“তুইও সাবধানে থাকিস। আর একটু ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করিস। দিন দিন সুতা কিরমী হয়ে যাচ্ছিস।”
আচমকা পাভেল হতে এমন সম্মোধন পেয়ে,নায়রার চোয়াল শক্ত হয়। নিজেকে কোনো মতে সামলে নিয়ে কড়া কন্ঠে বলল,
“ইডিয়ট! এটাকে জিরো ফিগার বলে। জানিস,এর জন্য আমাকে কতকিছু মেইনটেইন করতে হয়!”
নায়রার অভিব্যক্তিতে পাভেলের বিশেষ কোনো হেলদোল হলো না। সে একই সুরে পুনরায় বলল,
“হ্যাঁ,হ্যাঁ,ঐ একই কথা…সুতা কিরমী!”
—“আ….পাভে…”
নায়রা আক্রোশে আরো কিছু বলতে নিবে,তার পূর্বেই পাভেল তার কাছে এগিয়ে গিয়ে,একহাতে আগলে জড়িয়ে ধরে বলল,
“হয়েছে থাম,আর রাগারাগি করিস না।”
নায়রা ভারী শ্বাস ফেলে,দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে কেনীথও তার দিকে এগিয়ে এসে,একহাতে আগড়ে আনমনে আওড়ায়,
“আসছি তবে। নিজের খেয়াল রাখিস।”
—“তুই-ও! দুজনেই তাড়াতাড়িই ফিরে আসিস। পারলে দুজনে একটা করে বউ-ও নিয়ে আসিস। এতো বছরেও বিদেশীগুলো তো আর পছন্দ করলি না। তাহলে না হয়,দেশীই থাকুক। অন্তত এক যুগ হতে, তোদের রান্না করে খাওয়ানোর দায়িত্ব থেকে, মুক্তি পাবো আমি।”
এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি পৌঁছাতে খুব একটা সময় লাগল না দুজনের। ভাহিদ তার ছেলেদের জন্য, এয়ারপোর্টেই গাড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছিল। দু’জন প্রায় সন্ধ্যারাতেই ‘এহসান মঞ্জিল’-এ এসে প্রবেশ করে। বাড়িতে প্রবেশ মাত্রই এক এলাহী তোলপাড় শুরু হয়ে যায়।
কেনীথ আর পাভেল যে বাড়ি ফিরছে,এটা শুধুমাত্র ভাহিদ জানতো। সে ইচ্ছে করেই,কাউকে এই বিষয়টা বলেনি। দুজন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। পাভেলের ভেতর অনেক বেশি এক্সাইটমেন্ট কাজ করলেও,নির্বিকারে রয়ে যাওয়া কেনীথ তার বর্তমান অনুভূতি সম্পর্কে অবগত নয়। সে নিজেও জানে না, এতো বছর পর এখানে এসে, সে আদৌও খুশি কিনা।
এদিকে সন্ধ্যা বেলায় বাড়ির সকলে তাদের নিত্যদিনের কাজে ব্যস্ত ছিল। কাশফিয়া পাপড়িকে ঘর গোছানোর নানান নির্দেশনা দিচ্ছে,একইসাথে নিজেও কাজ করে চলেছে।
পাপড়ি হলো এই বাড়ির এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এতিম হওয়ায় সে ছোট থেকেই এহসান মঞ্জিলে এই পরিবারের সাথে থাকছে। বয়স তার খুব বেশি না। ষোল-সতেরো হবে হয়তো। রোজ আর পাপড়ি দুজনে বোনের মতোই থাকে।আবার কাশফিয়াও দুজনকেই মেয়ের মতোই ভালোবাসে। তাছাড়া কাশফিয়ার নিত্যদিনের কাজে রোজ যেমন তাকে সাহায্য করে, তেমনি পাপড়ির ক্ষেত্রেও ব্যতীক্রম নয়।
কিন্তু পাপড়ি মেয়েটার এক বিরাট সমস্যা আছে। তাকে শত চেষ্টা করেও,এই বাড়ির লোকজন ঠিকমতো পড়াশোনা করাতে পারেনি। কোনোমতে সিক্স,সেভেন অব্দি পড়ে,সে একদম কড়াভাবে সিন্ধান্ত নেয় যে—সে আর এই পড়াশোনা করবে না। এছাড়া তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো বিয়ে করা। বলতে গেলে এটাই তার জীবনের একমাত্র স্বপ্ন। সেক্ষেত্রে পড়াশোনা নামক উটকো ঝামেলার কি দরকার? কোনো এক রূপকথার রাজপুত্র এসে তাকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। এ-ই ব্যতীত তার জীবনে আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।
এমনিতে মেয়েটা দেখতে বেশ সুন্দর। গোলগাল ফর্সা চেহেরা,উচ্চতায় সে বেশি লম্বা না হলেও,তার বাদামী রঙের চুলগুলো একদম হাঁটু অব্দি লম্বা। সাথে সে বেশ চঞ্চল প্রকৃতির। এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার, সে পুরোপুরি বাঙালী নয় বরং পাকিস্তানি বংশভূত।
এহসান মঞ্জিলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই যেন এটা। এক বাড়ির কমবেশি সকল সদস্যই, বংশভূত ভাবে ভিন্নদেশী।
ড্রইং রুমে আপাতত তারা দুজন ব্যতীত আর কেউ ছিল না। রোজ ভেতরের কক্ষে নিজের কাজে ব্যস্ত। আর ভাহিদ আচমকা এক প্রয়োজনে বাড়ির বাহিরে গিয়েছে। এরিমধ্যে দুজনের আগমন ঘটে।
কাশফিয়া কাজের খেয়ালে সদর দরজার দিকে ফিরে তাকাতেই দেখে,ঝাপসা আলোয় দুটো অবয়ব দাঁড়িয়ে। নিমিষেই তার কপাল খানিক কুঁচকে যায়। পরনের শাড়ির আচলে হাতটা কোনোমতে মুছে নিয়ে, কয়েক’পা এগিয়ে আওড়ায়,
“আসসালামু আলাইকুম, আপনারা কে…”
কাশফিয়ার কথা সম্পূর্ণ হয়না। তার পূর্বেই সে পুরোপুরি স্তব্ধ মূর্তির ন্যায় থমকে দাঁড়ায়। ছায়া দুটো স্পষ্ট অবয়বে তার সামনে দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু কাফশিয়া যেন তার চোখ-কে বিশ্বাস করতে পারছে না।
অন্যদিকে কাশফিয়াকে আশেপাশে না পেয়ে, পাপড়ি পেছন ফিরে তাকায়। দরজার কাছে দুটো লম্বাচওড়া বিশাল দেহের ব্যক্তিতে দেখে,তার কপাল কুঁচকে যায়। সে দূর হতেই কাশফিয়ার উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“বড় আম্মা,এরা কারা?”
কাশফিয়া নিরুত্তর থেকে, কাঁপা কাঁপা শরীরে সম্মূখে এগিয়ে যায়। নিজেকে তার হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মনে হচ্ছে। একটা না, দুইটা না, এক যুগের চেয়েও বেশি সময় এই মানুষটা তার থেকে দূরে। সে তার গর্ভের সন্তান, তবুও সে এতো বছর দূরে থেকেছে। ছেলেকে একবার সচক্ষে দেখতে,একবার দেশে ফেরাতে তার কতশত প্রচেষ্টা ছিল। সবই যেন আজ অতীত। তার মনের ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছে। তার ছেলে সত্যি সত্যি আজ তার সচক্ষে দাঁড়িয়ে। এটা সত্যি হলেও,কাশফিয়া মানতে পারছে না।
দেশ ছাড়ার পর, পাভেল খুব বেশি হলে ২-৩ বারই দেশে এসেছিল। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও, কাশফিয়া পাভেলকে নিজের কাছে পেয়েছে। কিন্তু নিজের গর্ভের ছেলেকে,সে শত চেষ্টা করেও কাছে আনতে পারেনি।
অন্যদিকে কেনীথও আজ সম্পূর্ণ স্তব্ধ তার মা-কে দেখে। অনেক গুলো বছর তো হলো…রাগ-ক্ষোভ কিংবা অভিমান থাকলেও তা তো শুধু তার বাবার প্রতিই ছিল।কিন্তু এই যে, মা-কে শুধু শুধু কষ্ট দিয়ে সে এতো বছর দূরে থাকল—এটা কি আদৌও ঠিক হয়েছে?
কেনীথ জানে না, আপাতত এসবের কিছু নিয়ে সে ভাবতে কিংবা জানতেও চাইছে না। এসবের হিসেব-নিকেশ পড়ে হবে। সে অপলকভাবে শুধু তার মা-কেই দেখছে।
এরিমধ্যে কাশফিয়া তাদের সম্মূখে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখে-মুখে এখনও বিস্ময়ের রেশ। সে একবার পাভেলকে দেখে,তো কখনো কেনীথকে। সে নিজের দু’হাত বাড়িয়ে কাঁপাকাঁপা স্বরে আওড়ায়,
“আব্বা!”
কেনীথ অজান্তেই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। দৃঢ় চাহনিতে সে তার মায়ের দিকে চেয়ে থাকে।অন্যদিকে খুশিতে পাভেলের চোখের কোণায়, জল এসে ভিড় জমিয়েছে।
কাশফিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারেনা। সে অকস্মাৎ ঝাপটে জড়িয়ে ধরে কেনীথকে। কেনীথ অজান্তেই খানিক কেঁপে উঠলেও,নিজেকে সামলে নেয়। একইসাথে কাফশিয়া অন্যহাতে আঁকড়ে ধরে পাভেলকে। অতঃপর নিমিষেই হাও মাও করে কেঁদে ওঠে।
“আব্বা!… আমার বাপ দুইটা৷… আমার আব্বারা!”
কাশফিয়াকে এভাবে ভেঙ্গে পড়তে দেখে পাভেল বেশ অবাক হয়। তাকে পাশ হতে আগলে জড়িয়ে ধরে বলে,
“এ্যাই মামুনী! এভাবে কাঁদছো কেনো। আমরা সত্যি সত্যি এসেছি তো।”
পাভেল অনেক বুঝিয়েও তাকে শান্ত করতে পারে না। অন্যদিকে কেনীথ শুধু আলতোভাবে মা’কে একহাতে আঁকড়ে নিয়ে,আওড়ায়,
“মা শান্ত হও।”
কেনীথের কথায় কাশফিয়া মুখ তুলে কেনীথের দিকে তাকায়। এক মূহুর্তও সে স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না। সে পুনরায় কেনীথের গলা আঁকড়ে ধরে আওড়ায়,
“ভিভান! আব্বা! কেনো করিস তুই এমন৷ আব্বা!…”
এই বলতে না বলতেই,সে আবারও কেঁদে ফেলে। অন্যদিকে পাপড়ি দূর হতে এসব হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। কিছুক্ষণ বাদেই সে বুঝতে পারে,এখানে কি ঘটছে। ফলাফলস্বরূপ সে আচমকাই চেঁচিয়ে ওঠে,
“ও আল্লাহ গো! রোজ আপাই,দেখো এইডা কারা আসছে। বড় ভাইসাবরা আইছে। পুরাই সিনামার নায়কের নাহাল দেহা যায়।”
আচমকা এহেন চিৎকারে পাভেল আর কেনীথ দু’জনেই চমকায়। সম্মূখে তাকিয়ে দেখে,দূরে একটা অল্প বয়সী গাউন পড়া মেয়ে,ছাড়ু হাতে দৌঁড়ে বাড়ির ভেতরের দিকে যাচ্ছে। আর এমন উদ্ভট সব কথাবার্তা বলে চেঁচাচ্ছে।
বাড়ির সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির হাত-পা মালিশ করতে ব্যস্ত রোজ। সাধারণ দিনের মতোই তার পরনে লালচে ও কালো রঙের ভেলভেট গাউন। লাল রঙের এক গোছা চুল কোমড় অব্দি ছড়িয়ে আছে। চুলগুলো বারবার সামনে এসে পড়ছিল বিধায়,রোজ তা স্বযত্নে একত্রে করে বড়সড় এক আলগা খোঁপা বাঁধিয়ে ফেলল। পরক্ষণেই লেগে পড়ল নিজের যথাযথ কাজে।
অন্যদিকে এই বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিটি হলো,ভাহিদ শিকদারের মা। মাথা ভর্তি আধপাকা সাদা-কালো চুল। চোখেমুখে বার্ধক্যের ছাপ। তবুও অদ্ভুত সুন্দর তিনি। শরীরটা ইদানীং বেশ খারাপ হচ্ছে বিধায়,তিনিও নানান দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছে। মৃত্যু নিয়ে তার চিন্তা নেই। চিন্তা হলো তার এতোগুলা নাতিপুতি নিয়ে। একটারও যে বিয়ে-শাদি হওয়ার খবর নেই। আর এমন অবস্থায় সে যদি দুনিয়া ছাড়ে,তবে এই জীবনের আর কি বা মানে রইল।
তিনি বেশ দুশ্চিন্তার ভঙ্গিতে রোজের উদ্দেশ্যে বলল,
“রোজ! আমার না এখন অনেক টেনশন হচ্ছে। এই বয়সে ম’রার আগে, আমার এতো টেনশন করাটা কি ঠিক হচ্ছে? তোরা তো কিছুই করিস না।”
তার কথায় রোজ কিছুটা চিন্তিত স্বরে আওড়ায়,
“কি হয়েছে দাদী-মা! তোমার কি খুব বেশি খারাপ লাগছে? বড়-বাবাকে ফোন করব? ডাক্তার ডাকবো?”
—“ধুর মাইয়া! বেশি বুঝুস তুই। এতো ডাক্তার ডাইকা টাকা খাওয়াইয়া লাভ কি? একদিন তো ম’রেই যাবো।”
—“কিন্তু…”
—“আগে আমারে বলতে দে। আমার বহু আগে থেকেই স্বপ্ন,আমার নাতী দুইটা আর তোর বিয়ে নিজ চোক্ষে দেখার৷ জানিনা কপালে কি আছে… নাতী দুইটা তো এই জীবনে আর দেশে আসলো না। এখন আছোস তুই। তোর বিয়েটা দেখে গেলে,আমি ম’রেও শান্তি পাবো। ও হ্যাঁ,পাপড়ির কথা ভুইলাই গেছি। মাইয়াটার ছুডো থেকেই মাথার মধ্যে বিয়ের পোঁকা জমছে। জায়গামতো ওর বিয়ে দেওয়াটাই এখন ফরজ।”
রোজ চুপচাপ কথাগুলো শোনার পর, আনমনেই হেসে ফেলল। নিমিষেই তার স্নিগ্ধ লালচে-গোলাপি রঙের ঠোঁটের কোণায় মুচকি হাসির তীক্ষ্ণ রেখা ফুটে উঠল।রোজের চোখের মণিগুলো কিছুটা লালচে, কেনীথের মতোই। স্বভাবিকভাবেই রোজের রূপ ও ভাবভঙ্গি সবাইকে আকৃষ্ট করে। আর এই মুহূর্তে তা দাদী-মার মনেও বেশ প্রশান্তি এনে দিল।
মেয়েটাকে সে ছোট বেলা থেকে নিজের আশেপাশেই বড় হতে দেখেছে। এতোটা শান্ত, বুদ্ধিমতী আর অপূর্ব সৌন্দর্যের মেয়ে সে আর চারটা দেখেনি। যেন সারাদিন রোজের দিকে তাকিয়ে থাকলেও কারো মন ভ’রবে না। তিনি বিস্তৃত মুচকি হেসে আনমনেই বলে উঠল,
“মাশাল্লাহ!”
তার কথায় রোজ মাথা উঁচিয়ে তাকায়। তার ঠোঁটের কোণায় থাকা হাসিটাও মিইয়ে গিয়েছে। রোজ কিছু বলবে,এর পূর্বেই আচমকা এক বিকট শব্দ হলো।হয়তো কেউ ধপাস করে পড়ে গিয়েছে। রোজ শুরুতে কিছু না বুঝতেও, বয়স্ক দাদী-মা ঠিকই বুঝতে পারলেন, এ পাপড়ির আগমনের পূর্বাভাস। নিশ্চিত কিছু একটা হয়েছে। আবার না-ও হতে পারে। এই মেয়ে সামান্য হাঁটাচলাতেও ঝড়-তুফান বইয়ে দেয়।
তার এমনই চিন্তাভাবনার মাঝেই, আচমকা ঝাড়ু হাতেই কোনমতে উল্টেপাল্টে দৌড়ে ভেতরে প্রবেশ করল পাপড়ি৷ তাকে অত্যাধিক পরিমাণে হাঁপাতে দেখে, রোজ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“কি হয়েছে, পাপড়ি? মনে হলো আসার সময় কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়েছিলে? ব্যাথা পা-ও নি তো?”
পাপড়ি রোজের এহেন কথার তোয়াক্কা না করেই, বিস্ময়ের সহিত বলে উঠল,
“রোজা আপাই!তুমি রাখো আমার কথা। ঐ দিকে গিয়ে দেখো,কি হয়ে গেছে।”
তার এহেন অভিব্যক্তিতে দাদী-মা খানিক বিরক্তি নিয়ে বলল,
“এ ছেমড়ী! আসল কথা না বইলা এমন হাঁপানি রোগীর মতো করা বন্ধ কর। কি হইছে ভালো মতো ক!”
পাপড়ি শুরুতে দাদী-মায়ের দিকে চেয়ে কপাল কুঁচকে ফেললেও,পরক্ষণেই কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে পুনরায় অতিরঞ্জিত ভঙ্গিতে,ঝাড়ু সহ দুহাত দু’দিকে ছড়িয়ে বলতে লাগল,
“বাড়িতে দুইটা হেব্বি সুন্দর বেটা মানুষ আসছে। পুরাই নায়কের মতো দেখতে।”
—“বেটা মানুষ… নায়ক…মানে কোনো নায়ক আসছে? এই ভাহিদও কেমন মানুষ। কিসব লোকজন বাড়িতে আনে,মাবুদই জানে।”
দাদী-মায়ের বিরক্তিতে পাপড়ি হতাশ হয়ে আওড়ায়,
“আরে দাদী-আম্মা! আমি বলছি নায়কের মতো দেখা যায়। কিন্তু তারা তোর তোমারই…”
পাপড়ির কথা শেষ হতে না হতেই,আচমকা একঝাঁক কোঁকড়ানো চুল বিশিষ্ট মাথা,দরজা হতে উঁকি দিয়ে বলে,
“হেই সুইটহার্ট!”
আচমকা ভিন্ন কারো কন্ঠস্বরে তিনজনে মুখ ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকায়। আচমকা পরিচিত এক মুখকে সম্মূখে দেখে,রোজের পাশাপাশি দাদী-মাও বিস্ময়ের সাথে তাকিয়ে থাকে। অন্যদিকে পাপড়ি এক লাফে বিছানায় চড়ে,দাদী-মায়ের পেছনে গিয়ে লুকায়। পাভেল আর হেলাফেলা না করে, স্ব-শরীরে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে সোজা দাদী-মাকে জড়িয়ে ধরে। ওমনি দাদী-মা খুশিতে আত্মহারা হয়ে আওড়ায়,
“আমার হার্টঅ্যাটাক!”
তার এহেন কথা শুনে আনমনেই পাভেল হেসে ফেলে বলল,
“তোমার জন্য বিশাল এক সারপ্রাইজ এনেছি। বলো তো কি হতে পারে?”
দাদী-মা আর এই মূহুর্তে কিছু ভেবে খুঁজে পেল না। পাভেলকে পেয়েই সে আত্মহারা। আবার কতগুলো বছর পর স্বচক্ষে দেখছে তাকে। এটা কম বড় সারপ্রাইজ? এই বয়সে সত্যি সত্যি না তার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়।
এরিমধ্যে পাভেলের নজর পড়ে রোজের দিকে। বোন তার কত বড় হয়েছে গিয়েছে। সারাটা জীবন সে তার থেকে দূরে দূরেই থাকল। বড় ভাই হওয়ার কোনো দায়িত্বই সে পালন করেনি বললেই চলে। এ নিয়ে রোজের কোনো আক্ষেপ নেই। সে তার ভাইকে অনেক ভালোবাসে। যতদূরেই থাকুক না কেনো,পাভেল যে তার বড় ভাই এটা তো আর অস্বীকার করার নয়।
পাভেল তার সুইটহার্টকে রেখে সোজা রোজের কাছে যায়। রোজ তার দিকেই চেয়েছিল। তার চোখে জল চিকচিক করছে। পাভেল তার সম্মূখে দাঁড়ানো মাত্রই সে একপ্রকার ঝাপটে তাকে জড়িয়ে ধরল। উচ্চতায় পাভেল বেশ লম্বা হলেও,রোজ খানিকটা খাটো। যথারীতি তাকে বিছানা হতে দাঁড়িয়েই পাভেলের গলা আঁকড়ে ধরতে হলো।
রোজের হুট করে কান্না জুড়ে দেওয়ায়, পাভেল তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“এই পাগলির মতো কাঁদিস না৷ আমি এসেছি তো। কত বড় হয়ে গিয়েছিস। আগেরবার যখন দেখে গেলাম তখন কত্ত পিচ্চি ছিলি। এখন তো পুরো আমার সমান হয়ে গিয়েছিল।”
—“হাহ্, মজা করো না তুমি। তুমি যে আসবে, একবারও বলোনি কেনো আমায়?”
রোজের অভিমানী স্বরে, পাভেল বিস্তৃত হেসে বলল,
“বললে তো আর সারপ্রাইজ দেওয়া হতো না।”
তাদের দুজনের কথোপকথন দেখে দাদী-মা ও পাঁপড়ি বিস্তৃত হাসে। কতবছর পর আবার ভাইবোন একসাথে হয়েছে। দেখতেই বুক শান্তিতে জুড়িয়ে যাচ্ছে। এরিমধ্যে আচমকা দরজার কাছে আরো এক বলিষ্ঠ দেহের অবয়ব এসে দাঁড়ায়। এবং খানিকটা শান্ত-গম্ভীর ভঙ্গিতে মৃদু হেসে বলে,
“জান আসবো?”
বৃদ্ধা দাদী-মা আনমনে মুখ ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকায়। কিন্তু নিমিষেই তার কপালে ভাজ পড়ে যায়। বিস্ময়ে চোখ তার ছানাবড়া। বুঝতে পারছে না, এই মূহুর্তে তার কি করা উচিত। শরীরের অবস্থা খারাপ বিধায়,সহজে বিছানা হতে উঠতেও পারছে না। তবে তার ভাবগতিকে স্পষ্ট বোঝা যায়,সে কেনীথকে দেখে সম্পূর্ণ হতভম্ব।
তাকে অদ্ভুতভাবে ছটফট করতে দেখে,কেনীথ পা বাড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। অন্যদিকে দাদী-মা উঠে আসতে নিলেই,কেনীথ দ্রুত গতিতে তার কাছে গিয়ে বলল,
“আরে আরে,তুমি বসো,আমি আসছি তো।”
কেনীথ গিয়ে আলগোছে তার পাশে,ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসল। এবং কিছুটা মলিনভাবেই মৃদু হেসে বলল,
“আমার নূরজান! মিস করছিলাম তোমায়। শুনলাম,আমার বিরহে আপনি নাকি অসুস্থ!”
মূলত সবার এই প্রাণপ্রিয় দাদী-মায়ের পুরো নাম নূরজাহান সুলতানা। আর বিশেষ ভাবে কেনীথের কাছে সে পরিচিত তার নুর কিংবা জান হিসেবে। আজ থেকে এক যুগেরও বেশি সময় আগে শেষবারের মতো নাতীকে সচক্ষে দেখেছিল নূরজাহান। এরপর আর শত চেষ্টা কিংবা আকাঙ্ক্ষার পরও সে তার নাতীকে নিজের কাছে পায়নি।
হিসেবে তার নাতি-নাতনীদের শেষ নেই।ভিভান, রোজ,পাভেল কিংবা পাপড়ি—সকলকেই সে সমান নজরে দেখে। কিন্তু তবুও তো ভিভানই এই এহসান বংশের একমাত্র উত্তরাধিকার। এহসান বংশের রক্ত তো শুধু তার মধ্যেই বিদ্যমান।
ভিভিয়ান এহসানকে এই দেশে কেউ কেনীথ নামে চেনে না। ‘কেনীথ’ হলো সার্টিফিকেট এর পাশাপাশি কাশফিয়ার দেওয়া তার জন্মনাম। এছাড়া পারিবারিক নামে সে পরিচিত শুধুমাত্র ভিভান নামে। এই নাম দিয়েছিল কেনীথের দাদা আহমদ এহসান। সে সূত্র ধরেই,এখনও পরিবারের সবাই তাকে ভিভান বলেই ডাকে। অন্যদিকে স্কুল, কলেজের বন্ধুবান্ধব কিংবা সার্টিফিকেট সহ সর্বক্ষেত্রে তার নাম ছিল ভিভিয়ান এহসান। একইসাথে ভ্যাম্পায়ার কেনীথ কিংবা ভিকে পরিচয় নিয়েও তার এই পরিবার কিংবা দেশের মানুষজন অবগত নয়। বলতে গেলে,বছরের পর বছর বিদেশে পড়ে থেকে পাভেল আর কেনীথ কি করে—এটাও কেউ সঠিক ভাবে জানে না।
নুরজাহান তার ভিভানকে দু’হাতে মুখ সহ গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করে—এটা সপ্ন নাকি বাস্তব। তার চোখ জুড়ে পানি টলমল করছে।এমন অবস্থায় সে পাভেলের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“ওরে হার্ট অ্যাটাক! এটা কি সত্যিই আমার হার্টবিট?”
পাভেল রোজ হতে নজর সরিয়ে, পাশে ফিরে হেসে বলল,
“ঠিকই ধরেছো। ওটা তোমারই হার্টবিট।”
পাভেলের কথা শুনে,রোজও পাভেলের সম্মূখ হতে মাথা হেলিয়ে,একপলক কেনীথের দিকে তাকায়। নুরজাহানের মতো বিস্ময়ে তার চোখও ছানাবড়া। তার ভিভান ভাই সত্যি সত্যি এসেছে? এটা তার কোনোমতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। এতো বছরের অপেক্ষার অবসান যে আজ এভাবে হবে,তা হয়তো কেউই কল্পনা করেনি। কিন্তু রোজের মোটেও সাহস হলো না, এই বিশাল বলিষ্ঠ দেহের ব্যক্তিটির মুখোমুখি হয়ে দুটো কথা বলার। যথারীতি, সে পাভেলের ছায়ার আদলেই নিজেকে আড়াল করে একপ্রকার লুকিয়ে কেনীথকে দেখতে থাকে।
এদিকে কেনীথ নুরহাজানের হাত দুটো এক করে, নিজের মুঠোয় আঁকড়ে ধরে, নিস্পৃহে বলল,
“নূরজান…! মিস করিছলাম তোমায়। ইচ্ছে হলো একবার দেখে আসি। তাই এলাম।… আর ইউ হ্যাপি নাউ?”
কেনীথের অভিব্যক্তিতে বিশেষ কোনো আনন্দ উচ্ছ্বাসের আভাস নেই। যতটুকু করা প্রয়োজন, সে যেন ঠিক ততটুকুই করছে। এখন পর্যন্ত অবশ্য তার বাবার সাথেও দেখা হয়নি। এছাড়া বাকিদের মতো মোটেও সে খুব বেশি আবেগী হতে পারছে না। তবে এটাও ঠিক যে,তার এখানে আসার পর হতে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে। যার সম্পর্কে কেনীথের বিস্তর কোনো ধারণা নেই।
এদিকে কেনীথের কথার প্রতিত্তোরে নূরজাহান বলল,
“খুশি মানে,আমার তো মন চাচ্ছে ঢাক-ঢোল নিয়ে নাচানাচি করতে।… কিন্তু তুমি আবার চইলা যাবা না তো?”
কেনীথ তার নূরজানের দিকে আনমনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণেই মলিন হেসে আওড়ায়,
“আজই তো এলাম। এখনই যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলছো? নতুন বফ জুটিয়েছো তুমি?”
আচমকা কেনীথের এহেন তীক্ষ্ণ কথায়, নূরজাহান হেসে উঠল। সে অতিরঞ্জিত ভঙ্গিতে বেশ জোর গলায় বলল,
“এই নূরজাহানের চরিত্র, ফুলে মতো পবিত্র। তোমারে ছাইড়া এই নূর আর কোনো কালেই, কারো দিক ফিরা চাইব না।”
এই বলেই সে নিজেও হেসে ফেলল। এদিকে নূরজাহানের গায়ের পাশ ঘেষে ঘাপটি মে’রে বসে আছে পাপড়ি। লুকিয়ে লুকিয়ে সে সবাইকেই ঘেঁটেঘুটে দেখছে। এরিমধ্যে কেনীথের নজর তার দিকে পড়ে। সে কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকে বলল,
“একটু আগে তুমিই না আমাদের দেখে চিৎকার করছিলে?”
কেনীথের কথায় পাপড়ি ঘাবড়ে যায়। তবে মূহুর্তেই মাথাটা আড়াল হতে বের করে, দাঁত বের করে বিস্তৃত হাসে। এদিক থেকে নূরজাহান বলে,
“ও পাপড়ি! তোমাদের মতো ওই-ও আমার নাতনী। কাজকর্মে হুঁশ একটু কমই আছে। কিন্তু এমনিতে মাইয়া মাশাল্লাহ।”
নূরজাহান হতে নিজের প্রসংশা পেয়ে,পাপড়ির মন গর্বে ভ’রে উঠল। বাড়ির সবাই তাকে মন-প্রাণে এই বাড়ির মেয়ের মতো ভালোবাসলেও,নূরজাহান মাঝেমধ্যেই ক্যাচক্যাচ শুরু করে। অবশ্য এটা সে সবার সাথেই করে। কিন্তু সবাই বিষয়টাকে নূরজাহানের বার্ধক্যজনিত সমস্যা ভেবে এড়িয়ে গেলেও,পাপড়ি তা মানতে নারাজ। যথারীতি এক কথায়, দুই কথায়,দুজনের বেশ কথা-কাটাকাটিও হয়। আবার দিনশেষে একজন আরেকজনের খোঁজখবর না নিয়েও বাঁচতে পারেনা।
এদিকে কেনীথ তার উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক স্বরেই আওড়ায়,
“সেদিন ফোনটা তুমিই ধরেছিলে?”
পাপড়ি তার ধ্যান হতে বেরিয়ে এসে, মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
“হুম,হুম।”
কেনীথ মৃদু মলিন হেসে পুনরায় বলল,
“কিসে পড়ো তুমি?”
পাপড়ি ঝটপট আক্ষেপের সুরে উত্তর দেয়,
“আমি পড়াশোনা করিনা,ভাল্লাগে না। বিয়া করতে চাই,কিন্তু আমারে কেউ বিয়া দেয় না।”
পাপড়ির এহেন কথা শুনে কেনীথ স্তব্ধ। ভ্রু উঁচিয়ে কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যের সহিত হাসে সে। কিন্তু পাভেল নিজেকে আটকাতে না পেরে, হো হো করে হেসে ফেলে। অন্যদিকে নূরজাহান বেশ বিরক্ত হয়ে,নিজের কুঁচকে যাওয়া নরম হাত দিয়ে তার পিঠে দুম করে কিল মে’রে বলল,
“খোদা তুমি রহম করো। এ ছেমড়ির মাথা থেকে বিয়ার ভুত যায় না কেন!”
নিমিষেই পাপড়ি কপাল কুঁচকে পিঠ সোজা করে বসলো। যদিও ওমন হাতের চ’ড়-থাপ্পড়ের কোনোটাই গায়ে লাগে না। কিন্তু তবুও সে মিনমিনিয়ে আওড়ায়,
“বুড়া বয়সে ভীমরতি দেখতে বাঁচি না! নাতীরে বয়ফেন্ড বানায়। সুইটহ্যাট, হ্যাটবিট,কইলজ্জা অ্যাটাক সহ আরো কত কি বানায়, তখন কিছু না। খালি আমার বিয়া দিতেই সমস্যা!”
ঘড়ির কাঁটায় এখন প্রায় রাত সাড়ে আটটা।এতোবছর পর ছেলেকে পেয়ে,হুঁশ ধ্যান সব মিলিয়ে গেলেও—কাশফিয়া নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে রান্নার কাজে লেগে পড়েছিল। অতঃপর অল্প সময়ের মাঝেই বেশ ভালোমন্দ রান্না করে, দু’জনকে পেট ভরে খাইয়ে সে ক্ষ্যান্ত হয়েছে। কিন্তু এখনও ভাহিদের কোনো দেখা নেই। ছেলে এতো বছর পর ছেলে ফিরেছে,অথচ বাবা হয়ে তবুও সে কাজের ব্যস্ততায় ডুবে রয়েছে।
কেনীথের সাথে সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক সম্পর্ক হলো তার বাবার। এমন নয় যে সে তার ছেলেকে ভালোবাসে না৷ কিন্তু সেই ভালোবাসাতেও এক বড়সড় খাদ রয়ে গিয়েছে। ভাহিদ চাইলেও আজ অব্দি কেনীথকে পুরোপুরি মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। কারণ যতবারই সে এটা করতে গিয়েছে,ততবারই যেন নিজের বিবেকের দংশনে দংশিত হয়েছে। মনে হয়েছে,এটা ঠিক না। অথচ তবুও সে আর সবার মতো স্বাভাবিক থাকারই চেষ্টা করে। এছাড়া উপায়ও নেই। যত যাই হোক, তারই ছেলে তো!
এক্ষেত্রে ভাহিদ আর তারেক এহসানের মাঝের বিষয়টা প্রায় একই। তারেক যেমন আনায়াকে ভালোবেসেও তা প্রকাশে অনীহার। তেমনি ভাহিদও তাই। তারা অতীতের কোনো এক বিশেষ কারণে,আজ অব্দি স্বাভাবিক হতে পারেনি।
পাভেল আর কেনীথ খাবার শেষে বাড়ির বাগানের চারপাশে পায়চারি করছে। পাভেলের পরনের হুডি, প্যান্ট।কেনীথ অবশ্য কালো রঙের সাধারণ এক টিশার্ট পড়েছে। দূরের রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলো কিংবা বাড়ির চারপাশের প্রাচীর সংলগ্ন লাইটগুলোর রঙিন আলোয় এই রাতের বেলাতেও, আশেপাশের সবটাই বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
বর্তমান আবহ বর্ষা আর শরৎ এর মাঝামাঝি পর্যায়। বাগানের চারপাশের সকল গাছপালাই বেশ সতেজ। বিশাল বড় বিস্তীর্ণ জায়গার উপর বাড়িটির অবস্থান। একইসাথে চারপাশের বাগান জুড়ে রয়েছে নানান রকমের ফুল-ফলের গাছপালা। বাড়ির মাঝবরাবর এক বিশাল আকারের ফোয়ারা। যদিও তা দেখতে বেশ পুরোনো ও অচল মনে হচ্ছে। তবে কেনীথের মানসপটে এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে সেই পুরোনো দিনের কিছু স্মৃতি।
সে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে, ঘাড় অব্দি একগোছা বড় বড় চুলগুলো কোনোমতে এলোমেলো ভাবেই মেসিবান করে,আনমনে হেঁটে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে পাভেল একের পর এক নানান পুরোনো আলাপ গেয়েই চলেছে।
একটা পর্যায়ে পাভেল কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“ব্রো! ইমুকে সাথে আনলে বেশ ভালো হতো। সুতা কিরমীটাকে মিস করছি।”
এই বলেই সে খিলখিল করে হেসে উঠল। কেনীথও তার কথায় আনমনে হাসল। এদিকে পাভেল তার ফোন বের করতে করতে আবারও বলল,
“ফোন দেই একটা। এখনো ঠিকঠাক মতো কথা বলা হয়নি।”
এই বলতে না বলতেই,সে নায়রাকে ফোন করে। অন্যদিকে কেনীথ তার কাছ থেকে সরে এসে, অন্যান্য জায়গা গুলোয় আনমনে হেঁটে হেঁটে দেখতে লাগল। বাগানের একপাশে বিশাল এক দোলনা। দূরে বড়সড় আকারের এক চেরি ফলের গাছ। বাগানের অন্যপ্রান্তের কোণায় এক বড় আকারের তেঁতুল-আমলকিরও গাছ রয়েছে।
এরিমধ্যে কেনীথের কি যেন একটা বিষয় মনে পড়তেই, সে দৃঢ় পায়ে চেরি গাছটার দিকে এগিয়ে যায়। বেশ বড়সড় হয়েছে গাছটা। এই সময় যদিও ফল আসেনি,তবে পাতা গুলো কেমন যেন শুকিয়ে গিয়েছে। কিন্তু কেনীথ মোটেও এই বিষয়টা নিয়ে বিচলিত নয়। সে চেরি গাছের আশেপাশে একটা বেলীফুলের গাছ খুঁজছে। বিশেষ করে ডান পাশটায়—যেন এখানেই একটা বেলীফুলের গাছ থাকা আবশ্যিক।
কিন্তু সে বারংবার খুঁজেও এমন কিছুই পেল না। বরং খেয়াল করে দেখল,এই সারি হতে বাড়ির চারপাশে গোলাপ ফুলের অসংখ্য গাছ। কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে সরে আসতে নেবে,তৎক্ষনাৎ তার হুঁশ হলো—এটা সে কি করছে? এখানে আদতে সে কি খুঁজতে এসেছে? নিজের কাজকর্মেই বেশ অবাক হলো সে।
এরিমধ্য আচমকা পেছন হতে কেউ বলে ওঠে,
“ভাইয়া!”
কেনীথ চমকে পেছনে ফিরে তাকায়। পাভেল দূরের এক গাছের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার আশেপাশে তো কেউ নেই। কিন্তু এই মূহুর্তে যে বাচ্চার কন্ঠস্বর শোনা গেল—তবে সেটা কি ছিল?
—“ভিভিয়ান!”
তার এই ভাবনাচিন্তার মাঝে আচমকাই আবারও এক কন্ঠস্বর শুনতে পেল সে। তবে এটা কোনো এক প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের। নিমিষেই কেনীথের চোয়াল শক্ত হলো। তার আর বোঝার বাকি নেই,এখানে কি হচ্ছে। সে দ্রুত পায়ে বাগান থেকে বাড়ির ভেতরের দিকে যেতে লাগল। আর ততই যেন চারপাশ হতে বিভিন্ন পরিচিত মানুষের আওয়াজগুলো প্রকটভাবে তার কানে বাজতে লাগল। কখনো পেছনে বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে। কখনো তাদের হাসিখুশি উল্লাসের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। আবার কখনোই শুনছে তাদের তীব্র কান্নার আওয়াজ। কখনো বা এক রমণীর সাথে তার কথোপকথন কিংবা কখনো বাইকের শব্দ। সবমিলিয়ে কেনীথ মূহুর্তেই অস্থির হয়ে ওঠে।
সে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে, মাথাটা নিচের দিকে খানিক ঝুঁকিয়ে দৃঢ় পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে লাগল। অন্যদিকে বিষয়টা পাভেলের নজরে পড়তেই সে দূর থেকে চিল্লিয়ে বলে,
“ব্রো! কোথায় যাচ্ছো? তোমার সুইঠি তোমার সাথে কথা বলবে…”
পাভেলের কথা কেনীথ শুনতে পেলেও, সে তা একপ্রকার তোয়াক্কা না করেই সোজা বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। ড্রইং রুমে এই সময় কেউ ছিল না বিধায়,সে সহজেই সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে যায়। তার এই রুমে প্রবেশ করা মাত্রই সে আরো বেশি অস্থির হয়ে ওঠে। চারপাশে একপলক চোখ বুলিয়ে, সে নিজেকে তটস্থ করে। এবং তৎক্ষনাৎ নিজেকে শান্ত-স্বাভাবিক রেখে ব্যাগ থেকে কিছু মেডিসিন বের করে।
টি-টেবিলে থাকা পানির জগ হতে, তড়িঘড়ি করে গ্লাসে পানি ঢেলে সে সবগুলো মেডিসিন একবারে মুখে পুরে খেয়ে নেয়। কিছুটা সময় হাত মুষ্টি বদ্ধ করে, চোখ খিঁচে নিজেকে শান্ত করতে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“কাম ডাউন, ভিকে। নাথিং হ্যাপেন্ড। জাস্ট কাম ডাউন।”
তবে কেনীথ নিজেকে পুরোপুরি শান্ত করতে পারেনা। তার মস্তিষ্কে এখনোও সেসব ঘুরপাক খাচ্ছে। এখনও সে দূর-দূরত্ব হতে একই আওয়াজ গুলো শুনতে পারছে। কেনীথ আক্রোশে নিজের মাথার চুলগুলো দু’হাতে খিঁচে ধরে। তবুও সে শান্ত হতে পারছে না৷ এরিমধ্যে আচমকাই সে চোখ খুলে,সামনে থাকা পানির কাঁচের জগটা হাতে তুলে নেয়। এবং অনিমেষেই তা ছুঁড়ে ফেলতে চায়। কিন্তু ঠিক তৎক্ষনাৎ পেছন হতে দৌড়ে এসে পাভেল তাকে আঁটকায়।
—“ব্রো! এসব কি করছো?”
পাভেলকে দেখে কেনীথ থমকায়। নিজেকে কোনো মতে শান্ত রেখে, তার দিকে নিঃশব্দে তাকায়। কেনীথের চাহনিতে পাভেল ঘাবড়ে যায়। চোখজোড়া র’ক্তিম হয়ে উঠেছে। তবুও সে তাকে নিজের যথাসাধ্য চেষ্টায়, স্বাভাবিক থাকতে বলে।
—“ব্রো! স্বাভাবিক হও। কোনো প্রবলেম হচ্ছে? মেডিসিন নিয়েছো তুমি?”
কেনীথ আর কথা বাড়ায় না। জগটা পাভেলের হাতে দিয়ে, পাশে ঘুরে ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“এসব নিয়ে যা। একা থাকতে দে আমায়।”
পাভেল আর কেনীথকে বিরক্ত করতে চায় না। তার সত্যিই এখন একা থাকা প্রয়োজন। নিশ্চিত এখানে এসে কোনো কিছু একটা হয়েছে। এই ভাবনায় সে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নেবে,ঠিক এমন মূহুর্তেই সে পুনরায় পেছনে ফিরে তাকায়। কেনীথ ডিভানে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে আছে। তার হাত দুটোর কনুই, হাঁটুতে ঠেকানো,আর আঙ্গুলগুলো মাথার পেছনের দিকের চুলের গোছায় মুঠোবন্দি।
এদিকে পাভেল কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়েই বলল,
“ব্রো!”
কেনীথ ওভাবেই আনমনে গম্ভীর স্বরে জবাব দেয়,
“হুম!”
মহামায়া পর্ব ৪
—“কাল সকাল সকাল রাঙ্গামাটি যাওয়ার প্ল্যান করেছি। ওখানে একরাত থেকে সোজা সাজেকে চলে যাব। আ… তুমি যাবে?”
কেনীথ কিছু বলে না। পাভেল কিছু সময়ের জন্য থেমে আবারও বলল,
“এখানে হয়তো তোমার প্রবলেম হচ্ছে। যদি ওসব করে টাইম পাস করি,তাহলে অনায়াসেই দুই-থেকে তিনদিন পার হয়ে যাবে। এরপর তো আমরা চলেই যাব। আই থিংক,দিস উইল বি আ গুড অপশন।”
এই বলেই পাভেল চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে,কেনীথের জবাবের আশায়। কেনীথ খানিকটা সময় নিয়ে আওড়ায়,
“ঠিক আছে।”
