মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৮
নূরায়েশা মাহনূর
সকাল সকাল ক্লাবের উদ্দেশ্য ঘর থেকে বের হলো সাইফ । আজ এক জরুরি বৈঠক আছে। এই এলাকার নাম মায়াপুর। দারুণ বিস্তৃত মায়াপুর একটা অদ্ভুত গড়নের জনপদ। আধা শহুরে , আধা মাটির গন্ধে মোড়া গ্রাম্য প্রাণ । এই বৈচিত্র্যময় এলাকায় সাইফের পরিচয় শুধু চেয়ারম্যানের সন্তান বলেই সীমাবদ্ধ নয়, সে এই জনপদের ছাত্রসংগঠনের দলনেতা ।
মেধাবী ছাত্র হওয়ার পাশাপাশি কৌশলী সংগঠক সাইফ। আর তারচেয়েও বড় কথা, জন্মসূত্রে নেতৃত্বের রন্ধ্রে গড়া ছাপ তার মাঝে। ছোট থেকেই তার চারপাশে জমে উঠেছে ভক্তিময় ভিড়। ক্ষেত্র বিশেষে তার চরিত্র কেমন যেনো বদলে যায়। মাঝে মাঝে ভিষণ গম্ভীর, আবার মাঝে মাঝেই খুব সাবলীল হাসিখুশি একটা ছেলে। হুটহাট নিজের মন মস্তিষ্ক কন্ট্রোল করে ফেলা তার বা হাতের কাজ ।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এই জন্যই এলাকার ছেলেরা চোখ বুঁজে বিশ্বাস করে তাকে । সকলেই দারুণ ভক্ত তার। ছোটবেলা থেকেই সাইফ বুকে লালন করেছে একটা স্বপ্ন, মায়াপুরকে গড়তে হবে, অন্য রকম করে। এই জনপদের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দল থাকলেও, বাস্তব রূপ দাঁড় করায় ছাত্র সংগঠন।
তবে এই শক্ত ভিত গড়া ছাত্রসংগঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে বহুদিন ধরেই। বিভিন্ন প্রভাবশালী দলগুলোর কাছে এরা এক বিপজ্জনক কাঁটা। কারণ এই ছেলেপুলেদের জন্য মায়াপুরে প্রকৃত অর্থে কেউই একক রাজত্ব কায়েম করতে পারে না।
সরকার নির্ধারিত অর্ধ শতাংশ উন্নয়নমূলক প্রকল্প, সে শিক্ষার হোক কিংবা স্বাস্থ্যের, বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয় এই সংগঠনের তদারকিতে। কারণ সংগঠনটি কোনো দলের প্রতি আনুগত্যপ্রসূত নয়, বরং জনমতের প্রয়োজনে নিরপেক্ষ পথ বেছে নেয়।
এখানেই যত বিষ। তাই একের পর এক দল চেষ্টা করেছে প্রলোভন, ভয়ভীতি, কৌশল কিংবা আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এই সংগঠনের রাশ নিজেদের হাতে আনতে। কিন্তু এখানেই ভরসার জায়গা মায়াপুরবাসীর। তারা জানে, রাজনৈতিক পতাকার নিচে ঢুকলেই শুরু হবে ভাগাভাগি, আর ভাগাভাগি মানেই দুর্নীতির কষাঘাত।।তাই জনসাধারণ নিজেদের অবস্থান থেকে সরতে নারাজ। তারা চায় না ছাত্রসংগঠন দলীয় হোক। তারা চায়, এটি থাকুক জনগণের প্রতিনিধি হয়ে।
আজকের বৈঠকের বিষয় খুবই স্পর্শকাতর।মায়াপুরের দক্ষিণ প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিস্তৃত এক বালুমাঠ নিয়ে। এখানে প্রতিদিন ছেলেপুলেরা খেলাধুলা করে আর কিছু গরীব মানুষ ছোট খাটো দোকান দিয়ে নিজেদের পেট চালায়। সেই মাঠকে ঘিরেই এখন জমে উঠেছে ধূর্ত হায়েনার আসর।
চকচকে শহুরে মুখোশের আড়ালে কিছু প্রভাবশালী দৃষ্টিপাত করেছে এই নিভৃত মাঠের দিকে। পরিকল্পনা, গার্মেন্টস নির্মাণ। মুখে বুলি, এলাকার গরীবদের কর্মসংস্থান করে দিবে, কিন্তু বাস্তবে ছদ্মবেশে জমি দখলের ন”গ্ন আয়োজন।
গার্মেন্টসের নাম করে গোপনে জমি কেনাবেচা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। নেপথ্যে হাত বদলের প্রস্তুতি চলছে, এবং বলা বাহুল্য, এখানে কেবল একটি কারখানা নয়, উঠবে একটি দানবের কঙ্কাল। যা গিলে ফেলবে গরীবের দোকান, খেলাধুলার প্রান্তর।
কিন্তু ছাত্রসংগঠনের ছেলেরা খবর পেয়ে গেছে অনেক আগেই। এই তথাকথিত ‘গার্মেন্টস প্রকল্প’-এর আড়ালে জমি কিনে ধীরে ধীরে তা হস্তান্তরের চুক্তি হয়ে গেছে বহিরাগত ব্যবসায়ীদের হাতে। আজকের বৈঠকে সেই মাঠ নিয়েই আলোচনায় বসবে সবাই। সাইফ এখানকার মুখ্য কণ্ঠস্বর। তার পাশে থাকবে ছাত্রসংগঠনের সকল ছেলেরা। আর উপস্থিত থাকবে এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে কিছু বিত্তশালী ভূমিখোরও।
বাড়ির চৌকাঠ পেরোতেই ইমনের নেতৃত্বে কয়েকজন তরুণ উঠে এলো সামনে। ভগ্নসুরে বললো,
– ভাই আজকে কিছু একটা গড়বড় হইতে পারে মনে হয়।
সাইফ কোনো উত্তেজনায় গা ভাসালো না। বাকিদের আগে পাঠিয়ে নিজে চুপচাপ চড়ে বসল ইমনের পেছনে বাইকে।
– কার এত সাহস?
– সাইদুলই হবে ভাই। জমির ডিলে যদি মোহর পড়ে, সবচেয়ে মোটা কমিশনটা তার পকেটেই ঢুকবে।
সাইফের দুহাত উঠলো মাথায়, আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে চুলগুলো পিছনে ঠেলে দিলো একপ্রকার দৃঢ় ভঙ্গিমায়। বাইকের লুকিং গ্লাসে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। খোঁচা খোঁচা চাপদাড়ির উপর একবার হাত বুলিয়ে নিলো।
– বল তো আজকে আমাকে কেমন লাগতেছে?
হ্যান্ডেলের উপর দৃঢ়ভাবে দুই হাত রেখেই ইমন এক ঝলক পেছনে ফিরে চাইল,মাত্র দুই সেকেন্ডের জন্য।তারপর চোখ ফেরাল সামনে, হালকা হেসে বলল,
– সেই লাগতাছে ভাই, পুরাই নায়ক।
সাইফ গলায় খুনসুটির সুর টেনে বলল,
– আচ্ছা ইমইন্না, তুই তো আমার সব খবর জানিস। বল তো, তোর ভাবির কাছে আমারে ভালো লাগে? তোর ভাবি তো পরীর মতো, আর আমি পরীর পাশে দাঁড়ালে, জ্বীনের মতো ভয়ংকর লাগে না তো?
ফিক করে হেসে দিলো ইমন।
– কি যে বলেন ভাই! আপনে হইলেন তামিল ছবির নায়কের মতো, যার মুখ দেখেই সবার হুঁশ উড়াইয়া যায়। ভাবির পাশে যেই ভাবে আপনি জুতসই, আর কেউ হইতেই পারে না।
একটু থেমে আবার বললো,
– মেয়েগুলারে দেখেন না ভাই? আপনেরে দেখলেই কেমন পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে আসে। আপনার একটু পাত্তা পাওয়ার জন্য কত কি করে! কি যে পছন্দ করে তারা আপনারে
– হোপ বেটা, অন্য মেয়েদের পছন্দ দিয়ে আমি কি করবো ? আমি লয়াল… তোর ভাবির পছন্দই আমার চূড়ান্ত মাপকাঠি। ভাবছি, জিমে ভর্তি হবো, কী বলিস?
এই কথার মাঝেই ইমন আচমকা বাইক থামিয়ে দিলো।
– ভাই, নামেন।
সাইফ কিছু না বলে নেমে দাঁড়ালো। ইমনও বাইক থেকে নেমে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ করেই ইমন সাইফের কাঁধ থেকে চাদরটা টেনে নিলো। তারপর একবার ঘুরে ঘুরে দেখে নিলো সাইফের পুরো শরীর। সাইফ মুহূর্তে থমকে গেলো। বুঝে উঠতে পারছিল না, ইমনের আচরণের এই নাটকীয়তা কী উদ্দেশ্যে।ইমন এবার সাইফের বুকের উপর দুহাত বুলিয়ে বললো,
– দেখেন ভাই দেখেন, কি স্ট্রং বডি আপনার, একেবারে পিটানো বডি । দেখলেই মনে হয় বহু কসরত কইরা এই শরীর বানাইছেন। এক্কেরে ফিটফাট। কসম ভাই, এই শরীর দেখেই ভয় পাইছে কতজন।
একটুখানি থেমে আবার বলে উঠলো,
– আপনের জিমে ভর্তি হওয়ার দরকারটা কী? এই শরীর তো এমনিতেই রণক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত।
সাইফ গভীর এক শ্বাস ফেলে হঠাৎই চড় বসিয়ে দিলো ইমনের গালে, ঠাস করে। শব্দটা বাতাস ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। ইমন থমকে গালে হাত রেখে তাকিয়ে রইলো হতভম্বের মতো।
– এই কচুকথা বলার জন্যই তুই এতটা সময় নষ্ট করলি?
– নিজেই তো কইছিলেন ভাই…
– ইমইন্নার বাচ্চা, মাথায় রাখ, আমরা এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাচ্ছি।
– ওহ! হ, হ, হ্যাঁ ভাই, ভুলে গেছিলাম!
মুহূর্তেই হুঁশ ফিরলো ইমনের। সাথে সাথে সাইফের চড়ের কথা তার মন মস্তিষ্ক থেকে এক লাথিতে সরিয়ে দিলো। তড়িঘড়ি সাইফের চাদরটা তুলে আবার গায়ে জড়িয়ে দিলো। ডার্ক কফি রঙা পাঞ্জাবীর উপর সাদা চাদরের আবরণ সাইফকে এক দৃঢ় মহিমায় মুড়ে ফেললো।
– ভাই, একেবারে ধুন্ধুমার লাগতেছেন! দেখলেই সবাই হা কইরা থমকাইয়া চাইয়া থাকবো । টাস্কি খাইবো সবাই। চলেন!
সাইফ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বললো,
– সবাই থমকাইয়া টাস্কি খাইলে চলবে না, যদি কোনোভাবে তোর ভাবির চোখে বিস্ময়ের ঝলক ফুটিয়ে টাস্কি খাওয়াইতে পারি, তাহলেই জীবন স্বার্থক।
ইমন কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুচকি হেসে বললো,
– ভাই, ওটা তো ভাবি আগেই খাইছে শুধু স্বীকার করে না, এটুকুই ব্যাস।
সাইফের চোখে প্রশংসার হাসি খেলে গেলো।
– এই জন্যই তোরে বকশিস দেওয়া হবে, ব্যাটা… চল!
গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্রে চোখ বুলাচ্ছিল উজান। কাগজের প্রতিটি পাতার ভাঁজে তার অতীত ঘোরাফেরা করছে। তার বাবার একসময় রাজসিকভাবে গড়ে তোলা বিশাল ব্যবসা ছিলো। ছিলো বলাটা ভুল হবে ব্যবসাটা আজও আছে, কিন্তু প্রাণহীন।
উজান কখনোই এই ব্যবসার ঘেরাটোপে নিজেকে আটকে রাখতে চায়নি। তার মাথায় বরাবরই একটাই মানচিত্র আঁকা ছিল উচ্চশিক্ষা, বিদেশে যাওয়া, এবং ক্যারিয়ারের নির্মোহ শৃঙ্খলায় নিজেকে গড়ে তোলা।পাঁচ বছরের অধ্যবসায়ে সেই লক্ষ্য ছুঁয়েও ফেলেছিল সে। বিদেশে চাকরি, মর্যাদা, আর নিখুঁত জীবনরুটিন… কিন্তু কোথাও একটা গিয়ে সব ধুলোয় মিশে গেলো।
তার অভ্যস্ত জীবনটা ধীরে ধীরে রূপ নিলো রোবোটিক এক কাঠিন্যে। সকাল, খাওয়া, অফিস, ফিরতি নিঃশ্বাস সবকিছু এতটাই নিয়মমাফিক, যে সে আর মানুষ নেই, নিছক একটা সময়সাপেক্ষ প্রোগ্রাম হয়ে গেছে।একঘেয়েমির গাঢ় চাদরে ঢাকা পড়ে যেতে লাগলো তার প্রাণ। জীবনে রোমাঞ্চের, ঝুঁকির, প্রাণের ছোঁয়া নেই, এমন কাঠিন্যে বেঁচে থাকা উজানের পক্ষে আর সম্ভব নয়।
সেই সিদ্ধান্ত থেকেই তার এই প্রত্যাবর্তন। এবার সে তার বাবার ব্যবসা নতুনভাবে দাঁড় করাবে। ছাইয়ের নিচে যে অঙ্গার এখনো ধিকিধিকি করে জ্বলছে, তাকে সে আগুনে রূপ দেবে। এরপর সেই ব্যবসার একটা ব্রাঞ্চ শিফট করবে জার্মানিতে।
যদিও বহুবার তার বাবা চেয়েছিলেন উজান বড় হয়ে যাতে পারিবারিক ব্যবসায় মন দিক, দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিক; কিন্তু সেসব কথা বাতাসেই মিলিয়ে গিয়েছিলো।উজান তখন ভেবেছিলো, সে স্বপ্নের পথে হাঁটবে, নিজের মতো করে গড়ে তুলবে এক তার নিজের নতুন পৃথিবী।
আজ যখন সেই পৃথিবীটা নির্মম বাস্তবতায় ফাঁপা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন বাবার সেই ডাকগুলো হৃদয়ে অনুরণন তোলে। তবুও কিছুই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বাবা নেই। এই নিঃসঙ্গতার ভেতর, উজান নিজের ছায়ার সাথেই ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে সেখানে যে মানুষটিকে দেখে, তাকে ভালোবাসার মতো কাউকে এখন আর খুঁজে পায় না সে।
অবশ্য, একটা প্রাণ এখনো তাকে ছুঁয়ে থাকে যার নাম অরুনা। কিন্তু এই সম্পর্কের মাঝে জমে উঠেছে বহু বছরের গুমোট অভিমান। অভিমানের পাহাড়, যেটা ভাঙতে হলে দরকার ধৈর্য, ভালোবাসা আর নতজানু প্রতিজ্ঞা। তবু উজান ভাবেছে এখনো সবকিছু শেষ হয় নি। সময় এখনো আছে। জীবন তাকে এই ভাঙনের প্রান্তে দাঁড় করিয়ে নিরব এক শিক্ষা দিচ্ছে ।
এবার সে বাঁচতে চায়। প্রাণ খুলে, হাসিমুখে। কিন্তু এই যুদ্ধে সে একা পারবে না। এই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ব্যবসাটাকে আগের জায়গায় তুলতে হলে চাই অরুনার সাহায্য। অরুনা খুবই বুদ্ধিদীপ্তি একজন মহিলা। একসময় তার বাবার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবেও ছিলেন। তাই আপাতত অরুনার বিকল্প কেউ নেই।
তবে সমস্যাটা একটাই অরুনাকে রাজি করাতে হবে। আর অরুনাকে রাজি করাতে পারে শুধুমাত্র একজনই।
– দৃষ্টি আপু, তোমাকে উজান ভাই ডাকছে।
– কেনো?
পড়ার টেবিলের সামনে বসেছিলো দৃষ্টি। আজকে ক্লাস নেই তাই কলেজ যাওয়া হয়নি। তাই বলে বসে থেকেও লাভ নেই। এই কয়েকদিনে পড়ায় তার কিছুটা গ্যাপ পড়েছে সেগুলো আবার পূরণ করতে হবে। সে জন্যই বসে পড়ছিলো সে। কিন্তু এমন সময় এই ডাক কেমন একটা অনাহূত ঝঙ্কারের মতো ঠেকলো ওর কানে।
– বলছে জরুরি ব্যাপার, ছাদে যেতে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে চোখ নিচু করলো দৃষ্টি। উজান এখন কেনো ডাকছে তাকে? ঠোঁটে জমে থাকা প্রশ্নটা গিলে ফেললো।
– আচ্ছা, তুমি যাও।
ইশিতা চলে গেলো। দৃষ্টি ধীরে বই বন্ধ করলো। গায়ের আচলটা গুছিয়ে নিরব অভ্যেসেই ছাদের দিকে এগিয়ে গেলো।
— ডেকেছিলেন?
– হু..!
উজান ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। মুখে গভীর ভাবনা । দৃষ্টির কণ্ঠে প্রশ্ন শুনেই চমকে তাকালো।
– একটু কথা ছিলো তোর সাথে । বস, এখানে।
ছাদের এক কোণে রাখা একটা পুরনো কাঠের বেঞ্চ। অবসরের আড্ডার আসন হিসেবেই দেয়া হয়েছিলো। দৃষ্টি বসে পড়লো। মুখে কেমন এক নির্লিপ্ত ভাব, না রাগ, না উৎসাহ। এক ধরনের ভেতরখাওয়া নিরাসক্তি। উজানকে নিয়ে কখনো আগ্রহ জন্মায় না তার, তেমনি বিরক্তিও হয় না। অনুভূতির কোনো সংজ্ঞা সেখানে স্থির হয় না। সব সময় কেমন অনুভূতি শূন্য থাকে দৃষ্টি। উজান সামান্য সময় নিয়ে বললো,
– দৃষ্টি, আমি বাবার হস্তশিল্পের কারখানাটা আবার চালু করতে চাই। ব্যবসাটা নতুন করে শুরু করবো।
কথাগুলো বলে থেমে গেলো উজান। ভেতরে কেমন এক অস্থিরতা, অথচ বাইরে মুখটা বরাবরের মতো শান্ত। দৃষ্টি কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। উজান আর ব্যবসা? তাও দেশে থেকে? এই মানুষটা তো বরাবর বিদেশমুখী । এখন সে ফিরতে চাইছে এই মাটির টানে?
– কেনো?
ছোট করেই প্রশ্নটা ছুড়ে দিলো দৃষ্টি।
– বাবার শেষ অবলম্বনটা আঁকড়েই আমি আবার শুরু করতে চাই দৃষ্টি। এই যন্ত্রচালিত, নিঃস্ব জীবন আমার সহ্য হচ্ছে না আর।
– ওহ।
– তোর সাহায্য দরকার।
– আমি? আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করবো?
উজান সরাসরি তার চোখে তাকালো। নিজের স্বভাবের বাহিরে গিয়ে অনুনয় করে বলে উঠলো,
– মাকে রাজি করাতে হবে। মা এখন আমার উপর তেমন বিশ্বাস করে না। বাবার গড়া এত বড় কিছু, যদি আমি নষ্ট করে ফেলি! মা কিছুতেই ব্যবসা আমার হাতে তুলে দেবে না।
– বড় মা যদি আপনার কথা না শোনে, তাহলে আমার কথা শুনবেন?
– অবশ্যই শুনবেন। মা তোর সব কথা শোনে সেটা তুই জানিস। আর যেভাবে তুই বোঝাতে পারবি, আমি তা কোনোদিন পারবো না। দৃষ্টি, এই একটা হেল্প কর আমাকে… প্লিজ।
দৃষ্টি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো। ছাদের ওপরে পাখির ছায়া উড়ে গেলো, দূরে কোথাও একটা কাক ডাকলো। তারপর গভীর এক নিশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে বললো,
– আমি কি আপনাকে বিশ্বাস করতে পারি? যদি আপনি আংকেলের কষ্টে গড়া নাম, সম্মান, সেই শেকড়টাই নষ্ট করে ফেলেন… তখন এর দায়ভার কি শুধু আপনার থাকবে? আমার উপরও এসে পড়বে।
উজান ধপ করে বসে পড়লো দৃষ্টির পাশে। চারপাশে এক পশলা বাতাস বয়ে গেলো।
– আমি এই ব্যবসার জন্য ডেস্পারেট, দৃষ্টি। অনেক ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছি। আমি কথা দিচ্ছি, নিজের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করবো।
দৃষ্টি হালকা একটু হাসলো। খুব সযত্নে গুটিয়ে রাখা একটা অনুভব মুখচোরা হয়ে বেরিয়ে এলো তার ঠোঁটে। আসার পর, এই প্রথমবার উজান ওকে এত স্বাভাবিক, এত জীবন্তভাবে হাসতে দেখলো।
– ঠিক আছে, আমি বড় মায়ের সঙ্গে কথা বলবো। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, আমি আশা করি… আপনি আপনার দেওয়া কথাটা রাখবেন।
– থ্যাঙ্ক ইউ, দৃষ্টি।
– আচ্ছা, আমি যাই।
বলেই উঠে দাঁড়ালো সে। তবে পেছন থেকেও আচমকা গলা উঠলো উজানের,
– বিয়ের কথাটা একবারও বলিসনি কেনো আমায়?
থেমে গেলো দৃষ্টি। পা থেকে শব্দ সরে গেলো। মাথা সামান্য নামিয়ে শান্ত স্বরে বললো,
– জানানোর মতো কিছু ছিলো না।
কণ্ঠে কোনো আবেগের তরঙ্গ নেই তার। উজানের গলায় এবার হালকা আক্ষেপ, না বলা অনেক কথার টান,
– জানালে… ভালো হতো না?
– আমি তো এখন আপনার সাথে ঘর বাধানোর চিন্তা ভাবনা করিনি যে না জানানোটা কোনো ঘোর পাপ বলে গণ্য হবে! তাছাড়া সত্যি কখনো চাপা থাকে নাকি? এটা তো জানার মতই কথা। আমার থেকে না হলেও কারো না কারো থেকে তো জেনেছেন৷
– তবুও তোর মুখ থেকে শুনলে ভালো লাগতো!
উজানের এই শেষ বাক্যটা কেমন থেমে থাকা হাহাকার হয়ে ঝরে পড়লো শূন্যে…
– আমি আপনাকে আর অপরাধবোধের বিষে পুড়িয়ে রাখতে চাইনি। যা ঘটেছে, তা আমার জীবনের গহ্বরে। সেই ধ্বংসস্তূপের দায় আমি অন্য কারো কাঁধে চাপিয়ে মুক্তির অভিনয় করতে পারি না, তাই না?
উজান নির্বাক। কী বলবে সে? শব্দেরা একে একে গলায় জমাট বাঁধা কষ্ট হয়ে ঝুলে রইলো। তথাপি, ভেবে দেখলো , ঠিকই তো। যদি সত্যিটা দৃষ্টির মুখ থেকেই শুনতো, তাহলে লজ্জার সেই ঢেউ হয়তো বুক চিরে আরও ভেঙে দিত তাকে।
দৃষ্টির জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো বিষাক্ত ঠোঁটে কটাক্ষ ছুড়ে, ক্রোধের ভাষায় অনুযোগ জানাতো অনেক আগেই। কিন্তু দৃষ্টি তা করেনি। সে থেমে থেকেছে, সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়েছে সমস্ত ব্যাখ্যার ভার । সময়ই তার হয়ে হিসাব নিকেশ করেছে।
উত্তাল হয়ে সাইদুলের সাজানো গুন্ডাপাণ্ডাদের পেটাচ্ছে সাইফ। চোখের কোণে ঘাম জমে পাগল নদীর মতো গড়িয়ে পড়ছে।
মাত্র কিছুক্ষণ আগে ক্লাবঘরে সিদ্ধান্ত হয়েছিলো বালুরমাঠ থাকবে যেমন আছে, তেমনই। সন্ধ্যার শিশুরা সেখানে দৌড়াবে, বিকেলের গরিব মানুষগুলো খুদে দোকান পেতে দু’মুঠো ভাতের আশায় বসবে। এই মাটি কোনো ধনী অহংকারের সিংহাসন হবে না, হবে না দরিদ্রের অধিকার হরণ।
সবাই মেনেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের নেতারাও সায় দিয়েছে, কারণ লোকদেখানো নৈতিকতা প্রদর্শনের এ সুযোগ হাতছাড়া করা চলে না। এখন সকলেই নিজেদের বীর সাজিয়ে, নিজেরাই নিজেদের গুনগান রচনা করবে।
কিন্তু ক্ষতির গ্লানি গিলে রাখতে পারেনি সাইদুল।সাইফের এক চতুর চালেই উবে গেছে মোটা অঙ্কের কমিশনের স্বাদ। এ অপমান সে চুপচাপ গিলবে এমন বোকা সে নয়। তাই প্রতিশোধের ছক কষে, শহরের কিছু ছেলেপুলে পাঠিয়েছে সাইফকে শিক্ষা দিতে।
মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৭
কিন্তু যাকে ঘিরে ফাঁদ, সে তো শিকার নয়, শিকারি।সাইফ আগেই আঁচ করেছিল সাইদুল এমন নোংরা খেলায় নামবে। কারণ এই ছেলেমানুষী এর আগেও সে দেখেছে তার থেকে। তাই নিজের ছেলেপুলেদের আগেভাগেই সতর্ক করে রেখেছিল।
ক্লান্ত নিঃশ্বাসে থামল সাইফ। বাকি কাজটা ছেলেদের হাতে তুলে দিলো। কার কেমন শাস্তি প্রাপ্য, সেটা বুঝিয়ে দিল নিখুঁতভাবে। আর তারপর সরে গেলো সে।
