মাটির পিঞ্জর পর্ব ২২
নূরায়েশা মাহনূর
সূর্যের ম্লান রশ্মি জানালার কাঁচ ছেদ করে মুখে এসে পড়তেই দৃষ্টির শরীর হালকা নড়েচড়ে উঠলো। অচেতন ঘুমের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে সে। শরীর নাড়াতেই বুঝলো কেউ তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। জ্বরের আগুন অনেকটাই স্তিমিত, তবু শরীর ভারে পাথরের মত। হঠাৎ এই ওজনদার আলিঙ্গনের কারণ কিছুতেই বুঝতে পারলো না দৃষ্টি। আবারও নড়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু চেষ্টা গড়িয়ে গেলো ব্যর্থতায়।
অবশেষে পিটপিট করে ধীরে ধীরে চোখ খুললো সে।চোখ মেলতেই দৃষ্টির দৃষ্টি গিয়ে থামলো এক অচেনা উষ্ণতার দৃশ্যে। একটা উজ্জ্বল শ্যামল বর্ণের গলা, যেখানে ফুলে থাকা রগগুলো নিঃশ্বাসের ওঠানামায় ধীরে ধীরে কেঁপে উঠছে। কিছুক্ষণ সেই দৃশ্যেই আটকে রইলো দৃষ্টি।
বহু কসরত করে ধীরে ধীরে নিজের হাতটা তুললো । কাঁপা আঙুল আলতো করে ছুঁয়ে দিলো সাইফের অ্যাডাম’স অ্যাপেল। ঠান্ডা স্পর্শে নিজের অজান্তেই ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক টুকরো হাসি। মাথা একটু পিছনে কাত করে তাকালো এবার। ঘুমে আচ্ছন্ন সাইফ। । চোখ বুজে থাকা সেই শান্ত, মায়াবী মুখটা দেখে দৃষ্টি নিজের হিতাহিত জ্ঞান ভুলে গেলো। বেহায়ার মতো স্থির হয়ে অপলক তাকিয়ে রইলো।
হাত বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁলো সাইফের গাল। তারপর ছুঁয়ে গেলো নাকের ঢগা, পাপড়ির মতো নরম চোখের পাতা। আঙুলের ডগায় একে একে ছুঁয়ে দিলো তার পুরো মুখের প্রতিটি রেখা।
তার আঙুলের স্পর্শে, আড়ালেই বাঁক নিলো সাইফের ঠোঁট। একটা মৃদু হাসি হাসলো সে । দৃষ্টির প্রতিটি ছোঁয়ায় সেও জেগে উঠেছে , তবু ইচ্ছাকৃতভাবে নিশ্চুপ পড়ে রইলো। হঠাৎ সাইফের সেই মিটিমিটি হাসিটা চোখে পড়তেই ধ্যান ভেঙে গেলো দৃষ্টির। ঝটকা খেয়ে বুক থেকে মাথায় উঠে গেলো রক্ত।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– এইইইইই! আপনি এখানে কি করছেন? এইভাবে আমাকে ঝাপ্টে ধরে আছেন কেনো?
তার আকস্মিক চিৎকারে ভড়কে গেলো সাইফ। এক লাফে উঠে এসে দৃষ্টির মুখ দু’হাতে চেপে ধরলো।
– প্লিজ বউ, এমন চিৎকার চেঁচামেচি করবেন না… সবাই ভাববে আপনার সাথে আমি কোনো সাংঘাতিক কাণ্ড করে ফেলেছি।
সাইফের কথা শেষ হবার আগেই তার হাতের উপর দাঁত বসিয়ে দিলো দৃষ্টি। ব্যথার ঝটকায় সাইফ হাত সরিয়ে নিলো তড়িঘড়ি করে।
– সাংঘাতিক কিছুই করেছেন আপনি! নাহলে এখানে কি করছেন, একসাথে এক বিছানায়? হায় আল্লাহ, কি সর্বনাশ হয়ে গেলো আমার!
বলে তাড়াহুড়ো করে ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে নিজের দিকে তাকালো সে। না, সব ঠিকঠাকই আছে। পোশাকে কোনো অঘটনের চিহ্ন নেই। তবু এই মুহূর্তে নিজের সমস্ত আতঙ্ক নিয়ে সাইফের দিকে তাকিয়ে রইলো দৃষ্টি।বিশ্বাস করতে পারছে না তাকে একটুও।
– আপনি আমার সাথে কি করেছেন, সত্যি করে বলেন!
কথার সাথে সাথেই আবারও গগনবিদারী চিৎকার ছুঁড়ে দিলো দৃষ্টি। সাইফের গলায় এক শুকনো ঢোক আটকে গেলো। কিছু বলার আগেই দৃষ্টি তীব্র রাগে সাইফের টিশার্টের কলার মুঠো করে টেনে ধরলো।
– এই! আপনি না পাঞ্জাবি পরে বেরিয়েছিলেন? এখানে ঢুকলেন কখন? পাঞ্জাবি গেলো কই? টিশার্ট পড়লেন কখন? রাতে কি… রাতে কি আপনি গোসল করেছিলেন?
শেষের কথাটা বলতে বলতে গলা ক্রমেই মিনমিনে হয়ে এলো তার। সাইফ নিজের ভেতরের অস্থিরতা গোপন করে দেহ সোজা করলো। ঠোঁটের কোণে এক গা ছাড়া ভেলকি হাসি খেলিয়ে দিলো। আর সেই হাসি দেখেই দৃষ্টির বুকের ভেতর থেকে শুরু করে সারা শরীর পর্যন্ত ঘামে ভিজে উঠলো আতঙ্কে। আস্তে আস্তে দৃষ্টি গিলে গিলে বললো,
– আপনি… কিছু করেননি তো? শুধু শুয়েছিলেন, তাই তো? আমাদের মধ্যে কিছুই… কিছুই হয়নি তাই না?
সাইফ এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে থামলো। ঠোঁটের কোণে খেলা করছে এক দুর্বিনীত হাসি।
– অনেক কিছুই হয়েছে, বউ।
চোখ মেরে সোজা উঠে দাঁড়ালো সাইফ । হাই তুলতে তুলতে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করার ভান করলো। পিছনে দৃষ্টির অবস্থা মরি-মরি। বুকের ভেতর কাঁপন ধরে গেছে।
– অনেক কিছু… মানে?
গলা শুকিয়ে এলো তার, কাপড়ের আঁচল মুঠো করে সাইফের উত্তরের অপেক্ষায় বসে রইলো। সাইফ গম্ভীর ভঙ্গিতে পেছনে তাকিয়ে বললো,
– আমি বলতে পারবো না… আমার লজ্জা লাগছে।
বলে মুখের দু’পাশে হাত রেখে লজ্জার অভিনয় শুরু করলো। তা দেখে দৃষ্টির শরীর জমে এলো।
– নাটক করছেন আমার সাথে? কিছুই হয়নি, আমি জানি। আমার নিজের উপর কন্ট্রোল আছে, বুঝেছেন? যখন-তখন এসব ইয়ে… আমি করে বসি না।
দৃষ্টি রাগে গজগজ করে বলে মুখ ঘুরিয়ে বসে পড়লো। অথচ মনে মনে এক অস্থির সংশয় খুঁটে খুঁটে খেতে লাগলো তাকে। সত্যিই যদি কিছু ঘটে থাকে? না না, কিছু হলে কি সে টের পেত না? কিন্তু জ্বরের ঘোরে কিছুই মনে নেই তার এই তো মহা বিপদ। পেছন থেকে সাইফের গলা ভেসে এলো, মোলায়েম স্বরে বলে উঠলো,
– আমি কেন নাটক করবো? আপনি নিজেই তো বলেছিলেন, আমাকে একটু ভালোবাসুন। আমিও তো একটু ভালোবেসেছি। আমার দোষটা কোথায়?
কথাটা কানে যেতেই ঝটকা মেরে তার দিকে তাকালো দৃষ্টি। চোখেমুখে কাদারঙা আতঙ্ক। পরক্ষণে খট করে সাইফের দিকে তেড়ে এল।
– অসম্ভব! আমি এমন কিছুই বলিনি। আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন আপনি!
বলেই খাট থেকে নামার সাথে সাথে পা মেঝে ছোঁয়ামাত্র দৃষ্টির মাথার ভেতর ঘূর্ণি তুললো অজস্র চক্কর। দুর্বল শরীর আর সইতে পারলো না। চোখমুখ ঝাপসা হয়ে আসতেই ধপ করে পড়ে যেতে নিলো। ঠিক সেই ক্ষণেই সাইফের দু’হাত এগিয়ে এসে তাকে জাপটে নিলো। অকারণে আঘাত লাগতে দিলো না কোথাও। তাকে আবারও আলতো করে শুইয়ে দিলো খাটে। একটা বালিশে হেলান দিয়ে চোখের ভেতর কঠোর শাসনের রেখা টেনে বললো,
– আপনার জ্বর কমলেও শরীর এখনো কাচের মতো দুর্বল। এইভাবে তেলাপোকার মত উড়োউড়ি করবেন না।
দৃষ্টি ধীরে ধীরে চোখ তুললো সাইফের দিকে। কাঁদায় ভেজা গলার স্বর ভেসে এলো,
– আমাদের মাঝে… তেমন কিছু হয়নি, তাই তো? আমি… আমি আপনাকে বিশ্বাস করি।
সাইফ প্রথমে বুঝতেই পারেনি দৃষ্টি কথাটাকে এত গভীরভাবে নেবে। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইলো তার চোখের দিকে, তারপর ধীরে ধীরে নেমে বসলো মেঝেতে। দৃষ্টির হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে উল্টো পিঠে একটা নীরব চুমু খেলো সে। তারপর হাতটাকে নিজের মুঠোর ভেতর আটকে রেখে খাটের ধার ঘেঁষে কনুই ঠেকালো, মাথা রাখলো সেই কনুইয়ের উপর।
অন্য হাতের আঙুলগুলো আলতো করে দৃষ্টির চুলে বুলিয়ে দিয়ে নরম স্বরে বললো,
– আপনার অনুমতি ছাড়া এমন কিছু করার দুঃসাহস আমার নেই। তাই এত ভয় পাবার কিছু নেই।
স্বস্তির এক দীর্ঘ শ্বাস গড়িয়ে এলো দৃষ্টির ভিতর থেকে।সাইফ এক চওড়া হাসি দিয়ে বললো,
– আর তাছাড়া… অচেতন পুতুলের মতো কারও সাথে রোমান্স করা যায় নাকি? আমরা তো করবো সজ্ঞানে… করবো না বলুন ?
বলে হালকা হেসে উঠলো সাইফ। তার দিকে চোখ কুঁচকে কটমট করে তাকালো দৃষ্টি। মুহূর্তেই ঝটকা মেরে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো।
– অসভ্য লোক কোথাকার! একটা অচেতন মেয়ের ঘরে ঢুকে কি না কি করেছেন, ছিঃ! আবার বুক ফুলিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন! লজ্জা করে না? বের হন এখান থেকে, নির্লজ্জ লোক!
সাইফ দুই হাত তুলে মাথার উপর ধরলো, হাসিমাখা স্বরে বললো,
– হাহ! নিজেই কাছে টেনে নিলেন, এখন আবার নিজেই অপবাদ দিচ্ছেন! হায়রে কপাল আমার…
বলেই দরজার দিকে হাঁটা ধরেছিল সাইফ। হঠাৎ পিছন থেকে দৃষ্টির কণ্ঠ ভেসে এলো,
– মাহি আপুকে কে মেরেছে আমি জানি!
পায়ের গতিই থেমে গেলো সাইফের। ঘুরে তাকালো তার দিকে। দৃষ্টির চোখও তীক্ষ্ণ হয়ে তাকিয়ে রইলো সোজা সাইফের চোখের গভীরে।
– আপনিও জানেন, তাই না? ওদের ব্যাপারটা… আপনি দেখবেন। আমি পুলিশকে বিশ্বাস করি না।
কিছুক্ষণ স্থির থেকে সাইফের ঠোঁট বাঁকলো এক অদ্ভুত হাসিতে।
– আপনাকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। আপনি অসুস্থ, এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। আমি দেখছি, কি করা যায়।
মাথার পেছন চুলকে নির্বিকার ভঙ্গিতে আরেকবার হাসলো সে, তারপর ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়ালো।দৃষ্টি গভীর মনোযোগে ডুবে গেলো নিজের ভাবনার ভেতরে। দরজার চৌকাঠে পৌঁছে সাইফ শেষবারের মতো একবার তাকালো তার দিকে। পরক্ষণেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
মাত্র দৃষ্টিকে খাইয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছে নীলিমা।
হাতে ভেজা জামাকাপড়ে ভরা বালতি। আজ রোদ উঠেছে তেজি, তাই এই ফাঁকে কাপড়গুলো ছাদে শুকোতে দেবে। কিন্তু সিঁড়ির কোণ ছুঁতেই থেমে গেলো তার পা।
কারণ আছে থামার। সিঁড়ির পাশের ঘর থেকে মাঝারি আওয়াজে ভেসে আসছে এক সুরেলা হিন্দি গানের ধারা, তার ফাঁকে ফাঁকেই ধপাধপ শব্দ। কেউ তাল মিলিয়ে শরীর চালাচ্ছে। নীলিমা কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইলো। শেষমেশ কৌতূহলের কাছে হার মানলো। হাত বাড়িয়ে আলতো করে ঠেলে দিলো দরজাটা।
দরজার চৌকাঠের ফাঁক গলিয়ে চোখ মেলে তাকাতেই নীলিমার শ্বাস আটকে গেলো। ঘরের ভেতর হিন্দি গানের বোল, আর তার সঙ্গে পাগলাটে ভঙ্গিতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একলা নৃত্যে মাতোয়ারা ইমন। হেংলা শরীরের ওপর পিন হয়ে বসা সাদা টিশার্ট, নিচে প্যান্ট । দু’হাত হাওয়ায় ছুঁড়ে, কোমরের হাড়ে হাড়ে দুলিয়ে দিচ্ছে তাল। সুর হাড়ের মজ্জায় ঢুকে তাকে বেসামাল করে ফেলেছে।
নীলিমার বিস্মিত চোখে তব্দা খেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে রইলো । এ কেমন অবাস্তব দৃশ্য! এই লোক কি পাগল হয়ে গেলো নাকি! পরে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না নীলিমা । বালতিটা সশব্দে মেঝেতে নামিয়ে হঠাৎ করেই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। হঠাৎ এই অট্টহাসির বিস্ফোরণে ইমনের শরীর বিদ্যুতের শক খেলো৷ ধুপ করে থেমে গেলো নাচ। ভয়ার্ত চোখে ঘুরে তাকাতেই দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা নীলিমার খোলা দাঁতের হাসি সারা ঘর দুলিয়ে দিলো।
নীলিমার হাসি কোনোভাবেই থামছে না। পেট ফেটে যাচ্ছে তার হাসিতে। মাথার ভেতর বারবার ঘুরছে মাত্র কিছুক্ষণ আগে দেখা দৃশ্যটা। লজ্জা আর অস্বস্তিতে তড়িঘড়ি করে সাউন্ডবক্সটা বন্ধ করে দিলো ইমন। তারপর ভ্রু কুঁচকে হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এলো নীলিমার দিকে।
– আপনি এখানে কি করছেন?
নীলিমার গলায় হাসি ঝরে পড়ছে , কথাটা শেষ হতে না হতেই যোগ করলো,
– চিংড়ি মাছের মত এমন লাফাচ্ছিলেন কেন, আগে সেটা বলেন! মাথার তার কি ছিঁড়ে গেছে নাকি?
বলেই আবারো হু হু করে হেসে উঠলো সে। ইমনের চোখ লালচে হয়ে উঠলো। মুহূর্তেই এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে তার মুখ চেপে ধরলো। ঝটকা দিয়ে ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়ে দেয়ালে ঠেসে বললো,
– এই! চুপ, একদম চুপ! দাঁত কেলিয়ে কি সারা বাড়ি মাথায় তুলবেন নাকি? আমার কি কোনো প্রাইভেসি নাই?
নীলিমা একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলো। এই আকস্মিক আগ্রাসী টানে কি ঘটলো মাথার ভেতর গুছিয়ে নিতে পারলো না সে। ইমনও বুঝতে পারলো, হাতের জোরে সে কি ঘটিয়ে ফেলেছে। নীলিমার চোখের চকচকে চাহনি গেঁথে বসলো তার চোখে। এক মুহূর্তে সমস্ত হাসি-ঠাট্টা থেমে গিয়ে বাতাস ভারি হয়ে উঠলো।
হুট করে ইমনও থেমে গেলো। দুইজনের চোখ একে অপরের চোখে গেঁথে গেলো। কাছে থাকা এই কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব এক অদ্ভুত মায়ায় থমকে রাখলো সময়কে।কী আশ্চর্য, কিছুক্ষন আগেও যে মেয়েটাকে বিরক্তিকর মনে হচ্ছিলো, এখন সেই মুখ, সেই চোখের গভীরে ইমন নিজের অজান্তেই ডুবে যেতে লাগলো।
নীলিমা হঠাৎই সামান্য নড়েচড়ে উঠলো। তাতেই টনক ফিরলো ইমনের।দ্রুত হাত সরিয়ে পিছিয়ে গেলো সে।কোনো কথা না বলে নীলিমা বালতি হাতে তুলে নিলো, পালানোর মতো ভঙ্গিতে তাড়াহুড়া করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো ছাদে। ইমন দাঁড়িয়ে রইলো জায়গায় জমে গিয়ে। মাথার ভেতর ঢেউয়ের মতো বাজতে লাগলো একটাই প্রশ্ন। এখন কি হলো আসলে? নীলিমা কিছু খারাপ ভেবে বসলো না তো?চুলে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করলো সে। উফফ… হুশ কই থাকে নিজের!নিজেকেই বিশ্বাস হয় না, এইমাত্র কি করে ফেললো সে।
– বাবা, দৃষ্টি আপুকে ভাইয়া নিয়ে এসেছে।
চা হাতে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কথাটা বললো নীলিমা।চেয়ারে হেলান দিয়ে কাজে ডুবে ছিলো তাজউদ্দীন।সকাল সকাল শহর থেকে ফেরা। পাঁচ দিন ধরেই বাইরে ছিলো। এখন বেলা গড়িয়ে এগারোটা। কথাটা কানে যেতেই হাতের সব কাজ থেমে গেলো।
– নিয়ে এসেছে মানে? ওই মেয়েকে এই বাড়িতে কেনো এনেছে?আমার অনুমতি নিয়েছে সে?
চেয়ারের হাতল ছেড়ে সজোরে উঠে দাঁড়ালো তাজউদ্দীন। তার কণ্ঠের রুক্ষতা শুনে চমকে হুড়মুড় করে দাঁড়িয়ে গেলো নীলিমাও।
– বাবা, শান্ত হোন। এটা তো হওয়ারই ছিলো। একদিন না একদিন তো আপুকে আসতেই হতো।
নীলিমার কণ্ঠে মৃদু অনুনয়।
– না! কখনোই না! ওই মেয়ের জায়গা এই বাড়িতে কোনোদিন হবে না। ইজতিহাদকে ডাকো এক্ষুনি!
– ডাকতে হবে না। কী হয়েছে বলুন।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো সাইফ। হাতে একটা ফাইল, মুখে শান্ত ভাব। সাইফকে দেখে নীলিমা আর দাঁড়ালো না,মাথা নিচু করে সরে গেলো সেখান থেকে।দরজার পাশে পৌঁছাতেই চোখে পড়লো ইমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তাকে না দেখার ভান করেই পাশ কাটিয়ে চলে গেলো নীলিমা। ইমন কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইলো। ভেতরে যাওয়া উচিত হবে না, তারচেয়ে বাহিরেই দাঁড়িয়ে সাইফের অপেক্ষায় থাকা ভালো।
– ইজতিহাদ, তোমার সাহস মাত্রা ছাড়াচ্ছে সেটা কি তুমি জানো?
তাজউদ্দীনের গলায় দপদপে ক্রোধ। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাইফ শান্ত গলায় বললো,
– কি করেছি আমি বাবা, যার জন্য আপনাকে এমন কথা বলতে হচ্ছে?
– তুমি নাকি ওই মেয়েকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছো?
কেনো?
সাইফের চোখে স্থির আগুন।মাপা স্বরে উচ্চারণ করলো,
– ‘ওই মেয়ে’ হিসেবে সম্বোধন করবেন না বাবা। উনি আমার স্ত্রী। এতে আমার অসম্মান হয়। তার একটা ভালো নাম আছে, ‘শেখ মাহেরা দৃষ্টি’।
গভীর গলায় শান্ত শীতল স্বরে সাইফের উচ্চারণ থেমে যেতেই তাজউদ্দীন কিছু মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। চোখে তীব্র সরু দৃষ্টি, ঠোঁটে জমাট বাঁধা ক্ষোভ। সাইফও সমান দৃঢ়তায় তাকিয়ে আছে। চোখের পলকও ফেলছে না। সংকোচের লেশমাত্র নেই চেহারায় ।
– এখন কাকে কিভাবে ডাকতে হবে,সেটাও কি আমার তোমার থেকে শিখতে হবে?
– অবশ্যই না, বাবা। তবে আমার স্ত্রীকে অসম্মান করে ডাকার অধিকার আপনার নেই। পূর্ণ বিধান মেনে, সবার সামনে আমি তাকে বিয়ে করেছি। তাই তার সব দায়ভার আমার। আপনি চাইলে ‘আমার স্ত্রী’ বলেই তাকে সম্বোধন করতে পারেন।
তাজউদ্দীনের বুকে জমাট বাঁধা রাগ শ্বাস হয়ে বেরিয়ে এলো। একটা দীর্ঘ, ভারী শ্বাস ফেলে কঠিন স্বরে বললেন,
– তোমার স্ত্রীর জায়গা এই বাড়িতে নেই। তাকে বলো, এক্ষুনি বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে।
– এটা তার নিজেরও বাড়ি, আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন।
– না, আমি ভুলে যাচ্ছি না। কিন্তু এই বাড়িতে তার কোনো অধিকার নেই। তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছো এই বাড়ি থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়েছিলো।
– সে আমার স্ত্রী হিসেবে এই বাড়িতে থাকার পূর্ণ অধিকার রাখে। আর আমি যেহেতু তাকে নিয়ে এসেছি, তাই সে এখানেই থাকবে।
– ইজতিহাদ!!
তাজউদ্দীনের বজ্রগর্জন সারা ঘর কাঁপিয়ে দিলো।বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ইমনও থরথর করে উঠলো সেই ধ্বনিতে। কিন্তু সাইফ বিন্দুমাত্র কাঁপলো না। শুধু মাথা খানিকটা ঝুঁকিয়ে ঠোঁটের কোণে টেনে তুললো এক অদ্ভুত হাসি।
– আমার কথার অবাধ্য হওয়ার ফলাফল নিশ্চয়ই তুমি জানো? ওই মেয়ে… মানে তোমার স্ত্রীকে বলো,এক্ষুনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। নাহলে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হবে।
সাইফ স্পষ্ট স্বরে উত্তর দিলো,
– ধন্যবাদ, বাবা। আপনাকে এত কষ্ট করতে হবে না। আমিই তাকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি।
কথা শেষ করেই পা বাড়ালো সে। পেছন থেকে বজ্রনাদে ভেসে এলো তাজউদ্দীনের কণ্ঠ,
– তুমি যাচ্ছো মানে? তোমাকে তো যেতে বলিনি!
সাইফ একবারও ফিরে তাকালো না। ধীর পায়ে এগোতে এগোতে বললো,
– যেই বাড়িতে আমার স্ত্রীর জায়গা নেই, সেখানে আমিও থাকতে চাই না।
– আমাদের থেকে এখন ওই মেয়ে তোমার কাছে বেশি?
সাইফ নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকালো বাবার চোখের দিকে। অনমনীয় গলায় বললো,
– আপনারা সবাই আমার আপন। আপনার স্থান আলাদা, সম্মানও আলাদা। আপনি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবেন, কিন্তু আমি আমার স্ত্রীকে ছাড়া থাকতে পারবো না। তাছাড়া, তার আমি ছাড়া আর কেউ নেই।
আর কোনো শব্দে জবাব না দিয়ে সাইফ পা বাড়িয়ে দরজার দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু দোরগোড়া পেরোনোর আগেই মাথার ভেতর রক্ত উথলে উঠলো।
– একটা ধর্ষিতা মেয়ের জন্য এত দরদ আসে কোথা থেকে তোমার ?
ধসে পড়ার মতো ধপ করে চোখ বন্ধ করলো সাইফ। আঙুলের অস্থি অব্দি শক্ত হয়ে গেলো মুঠোয়। ক্ষোভের উত্তাপে মুখমণ্ডল জ্বলতে লাগলো।
দরজার বাইরে ইমন কথাগুলো শুনে থরথর করে কেঁপে উঠলো। দুর্ভাগ্য, একই শব্দখণ্ড দৃষ্টির কানেও গিয়ে আঘাত করলো। দরজার পাশে, ইমনের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টি। ইমন আতঙ্কিত চাহনিতে তাকালো তার দিকে। কিন্তু দৃষ্টি নিস্পন্দ। না কোনো বিস্ময়, না কোনো চমক। নিস্তরঙ্গ সেই মুখখানা আরও গভীর যন্ত্রণার শূল হয়ে বিঁধলো ইমনের হৃদয়ে।
– ওকে ছেড়ে দাও। বিনিময়ে যা চাইবে তাই পাবে । চাইলে তোমার পুনরায় বিয়ের আয়োজনও আমি করে দেব।
সেই পর্যন্ত সহ্য করতে পারলো না সাইফ। রক্তাভ চাহিনি ছুঁড়ে ঘুরে দাঁড়ালো তাজউদ্দীনের দিকে।
– আমার স্ত্রীর প্রসঙ্গে আর একটি শব্দও যদি আপনার মুখ থেকে বেরোয়, আমি ভুলে যাবো আপনি আমার বাবা!
তাজউদ্দীনের ঠোঁটে ফুটলো তিক্ত হাসি।
– আর কত অধঃপতনের অন্ধকূপে নামবে তুমি, ইজতিহাদ?
রাগে ফেটে পড়লো সাইফ। তেড়ে যাচ্ছিল তাজউদ্দীনের দিকে। কিন্তু হঠাৎই এক দৃঢ় হাত তার বাহু চেপে ধরলো। আকস্মিক এই স্পর্শে থেমে গিয়ে ফিরে তাকাতেই চোখে পড়লো দৃষ্টিকে । এই অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে তাকে দেখে থেমে গেলো সাইফের হৃদস্পন্দন। সব শুনেছে কি দৃষ্টি? আতঙ্ক গোপন করতে না পেরে স্থবির চোখে তাকিয়ে রইলো সে।অবিচল, নির্বিকার দৃষ্টি তার হাত ছেড়ে নিজেই এগিয়ে গেলো তাজউদ্দীনের মুখোমুখি।
– এখনো সে আপনার মতো অঃধপতনের তলানিতে নামেনি। তাই এইসব শব্দ আপনার মুখে শোভা পায় না, চেয়ারম্যান সাহেব।
তাজউদ্দীন চোখ কুঁচকে তাকালো দৃষ্টির দিকে । কত বছর পর এভাবে মুখোমুখি দাঁড়ালো তারা। আর সেই মুখে ভেসে উঠছে ছোট ভাইয়ের অবয়ব। নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে উচ্চারণ করলো,
– এই রূপের জাদুতেই ইজতিহাদকে উন্মাদ বানিয়েছো তুমি, তাই তো? নাহলে তোমার আছে আর কী! অথচ লাভ কি, এই রূপও তো কলঙ্কিত!
মৃদু হাসি ছড়িয়ে মাথা নত করলো দৃষ্টি। নীরব সম্মতিতে স্বীকার করেও চোখের স্থিরতায় ফের বিদ্ধ করলো তাকে।
মাটির পিঞ্জর পর্ব ২১
– একদিন এমনই এক রূপের মোহে পড়ে আপনিও তো নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। স্মৃতি কি এত সহজে মুছে যায়, চেয়ারম্যান সাহেব?
– চলুন, এখান থেকে।
সাইফ এগিয়ে এসে দৃষ্টির হাত ধরে টেনে নিতে চাইলো,কিন্তু সে পাথরের মতো অটল। স্থির চোখে সাইফের দিকে তাকিয়ে শীতল স্বরে বললো,
– আমরা এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবো না, শেখ সাহেব। আপনার বাবার বাড়িতে হয়তো আপনার জন্য জায়গা নেই, কিন্তু আমার বাবার বাড়িতে আপনার জন্য জায়গা আছে ।
