Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩০

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩০

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩০
নূরায়েশা মাহনূর

অবহেলায় কাপড় ভাঁজে মগ্ন দৃষ্টি। সামনের কাউচে বসে সাইফ ব্যস্ত নিজের কাজ নিয়ে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারবার গোপনে আড়চোখে তাকাচ্ছে দৃষ্টির দিকে । কিন্তু দৃষ্টি স্বপ্নিল শূন্যতায় ডুবে আছে। তার মন অন্য কোনো অচেনা দিগন্তে ভাসছে। দৃষ্টিকে এমন বিভর থাকতে দেখে ধীর পদক্ষেপে সাইফ এগিয়ে এসে দাঁড়াল দৃষ্টির পিঠের ঠিক পেছনে। বিস্ময়কর ব্যপার, দৃষ্টি টেরই পেল না! আশ্চর্য! সাধারণত দৃষ্টির সতর্ক অনুভূতি সবকিছু সহজেই ধরে ফেলে। অথচ এতখানি প্রলম্বিত ছায়া তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তবু সে কোনো টের পেলো না? সাইফ গভীর নিশ্বাস টেনে নিল, তারপর হাত বাড়িয়ে দৃষ্টিকে কোমল আবেষ্টনে বন্দি করে নিলো। হঠাৎই হুড়মুড়িয়ে শিউরে উঠল দৃষ্টি । সাইফের চিবুক নেমে এল দৃষ্টির কাঁধে, স্বর নামল অদ্ভুত শান্ত গহ্বরে,

– কী হয়েছে? কোন ভাবনায় হারিয়ে গেছেন আপনি?
– কি… কিছুনা।
তোতলানো স্বরে কথা শেষ করেই তড়িঘড়ি নিজের কাজে আবার ডুবে গেল দৃষ্টি। সাইফ এক দৃষ্টিতে তাকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত গোপনে মাপতে লাগল। বসন্তের রঙ গায়ে জড়ানো আটসাট একখানা বাসন্তী শাড়ি পরা। মাথার চুলগুলো উঁচু করে তোলা, একখানা কাঠির ফাঁদে বন্দি। কাঁধ বেয়ে চিকন ঘামের রেখা ফর্সা দেহে ঝিলিক জাগাচ্ছে। মাঝে মাঝে হাতের আঙুল কপালের অবাধ্য কেশ সরিয়ে আবার কাজে মন দিচ্ছে। সযত্নে ভাঁজ করে কাপড় সাজিয়ে রাখছে ওয়ারড্রোবে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

এই সাধারণ দৃশ্যেই সাইফকে অদ্ভুত মায়াজালে আবদ্ধ করে ফেলছে দৃষ্টি। দৃষ্টি স্বাভাবিকতার অন্তরালে লুকোনো এক অচেনা বিস্ময়। অবলীলায়, অজান্তেই, চারপাশকে নিজের প্রভাবলতায় ডুবিয়ে ফেলার এক অদৃশ্য ক্ষমতা আছে তার। অন্য নারীদের থেকে দৃষ্টি পরিপূর্ণ ব্যতিক্রম। নিখাদ স্বতন্ত্রতা, অস্বীকারহীনভাবে সবার থেকে একেবারেই আলাদা।
সাইফ কোনো কথা না বলে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। অল্প কিছুক্ষণ পর ট্রাউজার আর টি-শার্টে ভেজা-ভেজা সতেজ দেহে ফিরে এলো। কিন্তু ঘরে দৃষ্টি নেই। বুঝল, নিশ্চয়ই গেছে খাবারের আয়োজন সামলাতে। তাই সেও নীরবে সেদিকে গমন করল।

আয়নার সামনে বসে চুলে বেনুনি গাঁথছে দৃষ্টি। আঙুলের পর আঙুলে ঝরে পড়ছে কেশের স্রোত। হঠাৎই পেছনে সাইফ এসে দাঁড়াল। দরজা টেনে নরম পায়ে এসে খাটের কিনারে বসল। আয়নার ফ্রেমে সেই প্রতিচ্ছবি ধরা পড়তেই দৃষ্টি একফালি মুচকি হাসি ছুঁড়ে আবার মন দিল নিজের কাজে। কিছুক্ষণ গাঢ়ভাবে দৃষ্টির হাতের খেলা দেখল সাইফ। বিনুনির মাঝপথে সে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দিলো দৃষ্টিকে । বিস্ময়ে ভেজা দৃষ্টি ঘুরে তাকাল প্রশ্নমুখর চোখে।

– আমি করে দিই, বউ?
শিশুসুলভ আবদারের স্নিগ্ধতা মিশে এলো সাইফের কণ্ঠে। দৃষ্টি হেসে ফেলে আলতো করে বিনুনি টেনে নিলো শেষ পর্যন্ত।
– পারবেন না আপনি।
সাইফ নিরলস অনুনয়ে ভিজিয়ে দিল স্বর,
– প্লিজ বউ, করতে দিন না…

আবারও একই কোমল সুরে অনুনয়ের স্রোত ছড়িয়ে দিতেই দৃষ্টি মৃদু হাসিতে মাথা নেড়ে সায় দিলো। তাতেই সাইফের চোখে ঝিলমিল আলো নেচে উঠল। মুহূর্তেই এক হাত বাড়িয়ে দৃষ্টির টুলটা টেনে কাছে নিয়ে এলো সে। তারপর একেবারে দক্ষ কারিগরের ভঙ্গিতে শুরু করল বেনুনি গাঁথা।
দৃষ্টি অবাক মুগ্ধতায় তাকিয়ে রইল। লোকটা নিপুণভাবে কাজ করছে, কোথাও বিন্দুমাত্র ত্রুটি নেই। প্রতিটি চুল তার আঙুলে অনুগত হয়ে বাঁধা পড়ছে। দৃষ্টি চুপচাপ মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতেই থাকল তাকে। বেনুনি শেষ হতেই সাইফ রাবার দিয়ে চুলটা বেঁধে দিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে দিলো এক প্রশস্ত হাসি। দৃষ্টি আলতো হাত বাড়িয়ে সাইফের কপালের উপর পড়ে থাকা চুল সরিয়ে দিল। তারপর বেনুনিতে হাত বুলিয়ে নরম হাসি ছুড়ে বলল,

– ভালো হয়েছে।
সাইফের মুখের উজ্জ্বলতা বাড়লো । দৃষ্টি একটু ঝুঁকে এলো, আঙুল বাড়িয়ে টেনে দিলো সাইফের নাক। ঠাট্টাচ্ছলে চোখ মিটিয়ে বলল,
– অনেকগুলা ধন্যবাদ।
সাইফও হেসে উঠল,
– উঠে আসুন, ঘুমাবো…
দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
– না, আজকে আমাকে গান শুনান। অনেকদিন হলো আপনার গান শুনি না।
সাইফ গাম্ভীর্যে ঠোঁট বাঁকিয়ে উত্তর দিল,

– আমি অনেক টায়ার্ড, এখন কোনো গান শুনাতে পারবো না। ঘুমাই আসুন।
দৃষ্টি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। অবিশ্বাস্য ! সাইফ কিনা তাকে মানা করছে? যে মানুষটা কোনোদিন ভুলেও তাকে না বলতে জানে না আজ সে সত্যিই মানা করছে? দৃষ্টির মনে হলো হয়তো সত্যিই ক্লান্ত। তাই আর জেদ করল না।
– আচ্ছা, আপনি শুয়ে পড়ুন। আমি একটু পর আসছি।

শান্ত স্বরে বলেই বারান্দার দিকে পা বাড়ালো দৃষ্টি। খোলা বাতাসে এসে শরীর এলিয়ে দিল। বর্ষা বিদায় নিয়েছে কিছুদিন আগে; আবহাওয়া এখন অদ্ভুত রকমের অস্থির। মাঝে মাঝে গরম, আবার কখনো হিমেল শীতলতা। তবে এই মুহূর্তের হাওয়া কোমল, প্রশান্তির স্পর্শে ভরপুর। বারান্দায় দাঁড়াতেই মন জুড়িয়ে গেল। লম্বা বিনুনি কোমরে দুলে উঠছে। কাপড়ের আচল হাওয়ার ছোঁয়ায় কাঁপতে কাঁপতে দেহে জড়িয়ে আসছে। তখনই দৃষ্টির কানে ভেসে এলো গিটারের টুংটাং সুর। দৃষ্টির ঠোঁটে ঝলকে উঠল একরাশ হাসি। তবুও চোখ অদূরের অচেনা অন্ধকারে গেঁথে রাখলো ।

~ তোমার গায়ে তাতের শাড়ি,
চুল বাঁধা লাল ফিতায়…
রাগ কইরো না, রঙিন আলতা দিয়া দিমু পায়…
সাইফের সুরেলা কণ্ঠ বাতাস ছেদ করে দৃষ্টির কানে এসে বাজতেই পিছন ফিরে তাকাল সে। চোখের গভীরতায় থমকে গেল। সাইফ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। ঘর থেকে ফোঁটা ফোঁটা ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে আসছে, বাইরে চাঁদের আলো ছিটকে পড়ছে প্রশান্তিময় অন্ধকারে। আলো অর্ধেক, ছায়া অর্ধেক তবুও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সাইফের দৃষ্টি নিবিড় হয়ে গেঁথে আছে কেবল তার উপরেই।
~ তুমি আমার মরা গাঙ্গে হঠাৎ আসা বান…
অপলক চাহনি মেলে তাকিয়ে রইল দৃষ্টি। সাইফের কণ্ঠে ভেসে আসা সুর মায়াবী জাল বুনে তাকে একরাশ আবেশে আচ্ছন্ন করে দিল।

~ সোনা বউরেএএএএএ
তোমার লাগি বাঁধলাম এই গান…
সোনা বউরেএএএএএ
তোমার লাগি গাইলাম এই গান…
গান শেষ হতেই দৃষ্টি ঠোঁট বাঁকিয়ে চোখ কুঁচকাল। মাথা দুলিয়ে মৃদু অভিমানী স্বরে বলে উঠল,
– আপনি তো বললেন গাইবেন না? এখন গাইলেন কেনো?
সাইফ ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এসে দৃষ্টির একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়াল।
– বাহ রে আমার সোনাবউ গান শুনতে চাইবে, আর আমি গাইব না এ আবার হয় নাকি!
দৃষ্টি হেসে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই সাইফ আলতো করে হাত টেনে তাকে বসিয়ে দিল বারান্দার শীতল মেঝেতে। দুজন মুখোমুখি হেলান দিয়ে বসে পড়লো । গিটারের তারে আবারো ধ্বনি তুলল সাইফ,

~ আসমানে যাইও নারে বন্ধু
ধরতে পারবো না তোমায়…
পাতালে যাইও নারে বন্ধু
ছুঁইতে পারবো না তোমায়…
~ আসমানে যাইও নারে বন্ধু
ধরতে পারবো না তোমায়…
পাতালে যাইও নারে বন্ধু
ছুঁইতে পারবো না…
~ তুমি বুকের ভিতর রইও রে বন্ধু
বুকের ভিতর রইও…
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও…

– তুমি…
বাকিটুকু গাওয়ার আগেই মাঝপথে সুর টেনে নিলো দৃষ্টি। অনিমেষ তাকিয়ে থেকে সুরের মাঝেই গেয়ে উঠলো,
~ ও বন্ধু রেএএএএ
দূর আকাশে চান্দের পাশে
জ্বলমল করে তারা…
আমার কেউ আর নাই রে বন্ধু
কেবল তুমি ছাড়া…
~ তুমি দয়াময়ী হইও রে বন্ধু
দয়াময়ী হইও…
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও…
চোখ ভিজে এলো দৃষ্টির। টলটলে অশ্রু চিকচিক করে উঠল চোখের কোণে। সাইফ মৃদু হাসি ছুঁড়ে শেষ প্রহরে সুর মেলাল তার সাথে। দুজনের কণ্ঠ মিশে গেল এক গহিন আবেশে। একইসাথে গেয়ে উঠলো,

~ তুমি ছাড়িয়া না যাইও রে বন্ধু
ছাড়িয়া না যাইও…
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও…
তুমি বুকের ভিতর রইও রে বন্ধু
বুকের ভিতর রইও…
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও…
সুর থেমে আসতেই সাইফ এক হাতে মুছে দিল দৃষ্টির ভেজা চোখ। পরক্ষণেই তাকে টেনে নিল নিজের অন্তরঙ্গ বুকে। দৃষ্টি মাথা রাখল সাইফের প্রশান্ত কাঁধে।
– আমাকে কখনো একা করে দিবেন না দয়া করে। এই দুনিয়ায় আপনি ব্যতীত আমার আর কেউ নেই।
– জানি!
ছোট করে উত্তর দিলো সাইফ। দৃষ্টি আরেকটু গা ঘেষে বলে উঠলো,

– চাইলে ইচ্ছেমত কষ্ট দিতে পারেন, আমি সয়ে নিবো। কিন্তু আমাকে একা করার কথা কখনো ভাববেন না। যেই মুহূর্তে আপনি আমার পাশ থেকে সরে যাবেন তার আগ মুহূর্তটুকু পর্যন্তই আমি বাঁচতে চাই।
সাইফ মৃদু ভাবে চুমু খেলো দৃষ্টির চুলের উপর মাথার মধ্যে । তারপর গভীর অভিব্যক্তিতে বলল,
– আমি আপনাকে আপনার কল্পনার চেয়েও বেশি ভালোবাসি। শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত ভালোবেসে যাব। আমিও ঠিক ততক্ষণ বাঁচতে চাই যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আমার পাশে থাকবেন।
দৃষ্টি এবার সাইফের বুকের কাছটায় এসে ঠেকলো। সযত্নে মাথা রাখলো সাইফের বুকের উপর । সাইফ প্রাণভরে একবার শ্বাস নিলো প্রিয়তমার শরীরের।এরপর স্নিগ্ধ আঙুলে দৃষ্টির কেশের রেখা ছুঁয়ে সাইফ নরম কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল,

– আপনি তখন গভীর মনোযোগে কিছু একটা ভাবছিলেন। কি হয়েছে বলুন তো?
দৃষ্টি ক্ষণিক নীরব থেকে ধীরে বলল,
– দুপুরে আমি গিয়েছিলাম বাগানে। পোড়া চিলেকোঠার কাছে মাটির ভেতর থেকে লোহার মতো একটা কি যেন বস্তু উঁকি দিচ্ছিল।
সাইফ তৎক্ষণাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল,
– আপনি কি বুঝতে পেরেছেন সেটা আসলে কী?
দৃষ্টি মুখ তুলল তার চোখের দিকে, মাথা না-বোধক দোলাল দুদিকে,
– না, কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। তার আগেই জেঠু সেখানে চলে এসছিলো।
চমকে উঠল সাইফ,

– বাবা! উনি কখন এলো বাড়িতে? আপনাকে দেখতে পেয়ে আবার কোনো কিছু বলেনি তো?
– সেটাই তো জানি না কখন এলেন। আমি অবাক হয়েছিলাম ওনাকে সেখানে দেখে। তাছাড়া…
কপালে ভাঁজ ফেলে সাইফ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
– তাছাড়া কী?
দৃষ্টি দ্বিধা নিয়ে গলার স্বর ছোট করে বলে উঠলো,
– তখন উনি অস্বাভাবিক কোমলতায় কথা বললেন আমার সঙ্গে। বললেন উনি নাকি তাঁর ছেলের বউয়ের ক্ষতি চান না। তাই আমাকে ডেকে নিলেন ভেতরে। অথচ এ অপ্রত্যাশিত মমতাই আমার সন্দেহ বাড়াচ্ছে। এতো সৌজন্য হঠাৎ কেন আমার জন্য ? আমাকে সেখান থেকে সরিয়ে আনার জন্যে নয় তো?
সাইফ থমকে গেল, চিন্তার গভীরে ডুবে রইল। তার নীরবতা ভাঙতে দৃষ্টি কাঁধ ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,

– কি হলো? কী ভাবছেন আপনি?
সাইফ তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
– কিছু না… কিছুই না।
– আপনার সন্দেহ হচ্ছে না ব্যাপারটা নিয়ে?
– হ্যাঁ… হচ্ছে তো।
– তাহলে কী করা যায়, বলুন তো?
সাইফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
– এখন কিছুই করতে হবে না। আপাতত আমাদের ঘুমানো উচিত। বাকিটা পরে দেখব… চলুন।
কথা শেষ করে সাইফ হঠাৎ দৃষ্টিকে আলতো করে পাজাকোলে তুলে নিল। দৃষ্টি অবাক হয়ে কিছু বলার আগেই তার হাতে থাকা গিটারটা নিয়ে বারান্দার দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেলো। তারপর নিভু আলোয় খাটে শুইয়ে দিল প্রিয়তমাকে। নিজেও দরজা টেনে আঁধারের ভেতর শুয়ে পড়ল তার পাশেই।

অতি সতর্ক পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে কেউ একজন। অন্ধকারে তার হাতে কেবল একটি ক্ষুদ্র টর্চ, যার কুণ্ডলী আলো আঁধার ভেদ করে কাঁপতে কাঁপতে ছুটে বেড়াচ্ছে চারদিকে। লোকটা বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে কেউ যাতে দেখে না ফেলে!
অবশেষে এসে থমকে দাঁড়াল পোড়া চিলেকোঠার ঘরটার সম্মুখে। দুই হাতে আগাছার ভারী ঝোপ সরিয়ে উন্মুক্ত করলো জংধরা লোহার ভারী টুকরো।আশেপাশে আরেকবার নিখুঁত নজরে দেখে নিলো চারদিক, তারপর টেনে তুললো সেই অংশটুকু। কেঁপে উঠে খুলে গেল লুকোনো এক পুরনো দরজা।
অপর প্রান্তে উন্মুক্ত হলো একটা পথ। পাকা ইটের গন্ধমাখা অন্ধকার সুড়ঙ্গ। বিন্দুমাত্র দেরি না করে ছায়ামূর্তি ঢুকে গেল ভেতরে, আর ধীরে ধীরে দরজাটাকে টেনে দিল ভিতর থেকে । তারপর কেটে গেল দীর্ঘ এক সময়। নিস্তব্ধতা আবারো জমাট বাঁধল চারদিকে।

ঘুমের আবেশে এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎ দৃষ্টি টের পেল তার পাশের শূন্যতা। যেখানে সাইফ থাকার কথা, সেখানে এখন কেবল ঠান্ডা বিছানা। হাত বাড়িয়ে আরেকবার ছুঁয়ে দেখতেই ঘুম পুরোপুরি উড়ে গেল। সত্যিই সাইফ নেই!
চোখ মেলে পিটপিট করে চারদিক দেখল সে, তারপর সোজা হয়ে উঠে বসল খাটে। হাত বাড়িয়ে টেবিল লাইট জ্বালাতেই মৃদু আলোয় দেখা গেল ঘড়ির কাঁটা দাঁড়িয়ে আছে রাত ২টা ৩৬-এ। বুকের ভেতর অজানা শঙ্কার কাঁপুনি বয়ে গেল। এতো রাতে কোথায় গেল সাইফ?
দৃষ্টি অস্থিরভাবে নিজের কাপড় ঠিকঠাক করে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। হাত বাড়িয়ে দরজা খোলার সাথে সাথেই হুড়মুড় করে সাইফ এসে উপস্থিত হলো । দুজনেই একে অপরকে দেখে থমকে উঠল এক মুহূর্তের জন্য। সাইফ বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো,

– বউ কোথায় যাচ্ছিলেন আপনি?
দৃষ্টি কপালে ভাঁজ ফেলে স্থির দৃষ্টিতে লক্ষ্য করল তাকে। সাইফের কপাল বেয়ে চুলের ফাঁক থেকে জল ঝরছে; খোচা খোচা দাড়ি বেয়ে টুপটুপ করে পড়ছে ফোঁটা। সদ্য ধোয়া মুখ থেকে বয়ে আসছে উজ্জ্বলতা । দৃষ্টি ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
– আপনাকে পাশে না পেয়ে খুঁজতে উঠেছি। এত রাতে কোথায় গেলেন?
সাইফ হালকা হাসার চেষ্টা করে উত্তর দিল,

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৯

– ওহ আচ্ছা… বাইরে একটু হাঁটতে গিয়েছিলাম। ঘুম আসছিল না, তাই বেরিয়েছিলাম।
দৃষ্টি চোখ কুঁচকে তাকালো। সন্দেহের ছায়া নেমে এলো তার চাহনিতে। দৃষ্টি কতটুকু বিশ্বাস করেছে তার কথা বুঝতে পারছে না সাইফ। কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি ঠোঁটে টেনে আনল এক নিখাদ হাসি।
– আমি তো ভয়ে অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম। দয়া করে রাতবিরেতে এমন করে বেরোবেন না।
এ কথা বলেই হাই তুলতে তুলতে ধীর পায়ে ফিরে গিয়ে শুয়ে পড়লো দৃষ্টি। সাইফ নিস্তব্ধ মুখে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দৃষ্টিকে জড়িয়ে নিয়ে তার পাশেই শুয়ে পড়লো ।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩১