মাটির পিঞ্জর পর্ব ৯
নূরায়েশা মাহনূর
চিঠিটা হাতে নিয়ে থমকে গেল দৃষ্টি। ঠোঁটের কোণে জমে থাকা নিঃশ্বাসটা হঠাৎই ভারি হয়ে এলো।কাগজের পাতায় কারো অদৃশ্য ছায়া এখন চোখে সজীব হয়ে ওঠেছে। তার মানে সত্যিই কেউ ছিলো ওখানে! কিন্তু… কে? উজান?
নাহ, এটা যদি উজান হয় তাহলে সে এভাবে চুপিচুপি যাবে কেন? এমন আচরণ তো তার নয়! তাহলে কে? নাকি উজানই!
“উফ্! মাথা কাজ করছে না,” কপালে হাত ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বললো দৃষ্টি। তার ভেতরে সন্দেহের একটা পোকা বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। অজানা আতঙ্কে বুকের ভেতর ধুকপুক করছে অস্থিরতা। সাবধানে থাকতে হবে এখন, খুব সাবধানে। কেউ তারই ঘরে এসে এইভাবে চিরকুট রেখে যাচ্ছে আর সে আন্দাজ করতে পারছে না। না, না কিছুতেই না।
অতঃপর, আর কিছু না ভেবে সেদিনকার মতো নিজেকে গুটিয়ে নিলো দৃষ্টি । একটু ঘুম দরকার তার।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রবিবারের সকাল।
শহরের গায়ে রোদ মেখে নেমে এসেছে অলসতা, কিন্তু দৃষ্টির গায়ে আজ তার ছোঁয়া নেই। তাদের কলেজে আজ একটা অনুষ্ঠান আছে। নিয়ম মেনে, বাঁধা ছকে সাজানো এক সাংস্কৃতিক আনুষ্ঠানিকতা। শুরু হবে ঠিক এগারোটায়। তাই আজ দৃষ্টি একটু কম তাড়াহুড়ো করছে। তার চোখেমুখে কোনো উৎসাহ নেই, এইসব অনুষ্ঠানে তার মন বসে না কখনোই।
আসলে তেমন কিছুতেই আর মন বসে না আজকাল। এই ধরনের আয়োজনে দৃষ্টির নিজেকে মানিয়ে নিতে খুব একটা ভালো লাগে না। সাধারণত কোনো কঠোর নির্দেশনা না পেলে সে যেতই না আজকে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি অন্য। না গেলে নাকি জরিমানা! আরো ভয়ংকর কথা এক্সামে মার্ক কেটে দেওয়া হবে! দৃষ্টির মনে হয়, এটা কোনো নোটিশ না,
এটা আধুনিক কায়দায় জালিয়াতি।
তার যুক্তির ভাষায়, যার ইচ্ছে হবে সে যাবে, না গেলে কেনো বাধ্য করা হবে বুঝি না । দৃষ্টি এখন একটি সরকারি কলেজে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক করছে। দ্বিতীয় বর্ষে তার পথচলা। একসময় পড়ালেখায় ভালোই ছিলো সে। কিন্তু একটা ধাক্কা, একটা অনিয়ন্ত্রিত ঝড়, তার জীবনের বহু কিছু উলোটপালোট করে দিয়েছে।
তারও স্বপ্ন ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে সে। বিশাল ক্যাম্পাসে হাঁটবে মাথা উঁচু করে। নিজের এক স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিচয় বানাবে। নিজের নামে গড়া এক পূর্ণতা তারও হবে যার পেছনে থাকবে কেবল তার নিজস্ব পরিশ্রমের ঘাম, তার নিজের পথচলার দাগ।
কিন্তু…সব স্বপ্ন তো পূর্ণতা পায় না। জীবন কখনো কখনো এমনভাবে মোড় নেয়, যেখানে স্বপ্নগুলো একে একে পিছলে পড়ে যায়। ঠিক যেমন নদীর পাড় ভাঙে নীরবে, ধসের কোনো আগাম সংকেত ছাড়াই।
তারও হয়নি। দৃষ্টি জানে সব কিছুর পরেও বেঁচে থাকতে হয়। ঘড়ির কাঁটার মতো চলতে হয়, থামা যায় না। থেমে গিয়ে হাল ছেড়ে দেওয়া তার ধাত নয়। বাংলা সাহিত্যের প্রতি তার ঝোঁকটা ভিন্ন। এক ধরনের ঘোর, এক ধরনের আত্মীয়তা কাজ করে তার ভেতরে। তাই এই বিষয়টাই বেছে নিয়েছে সে।
ধীরলয়ে তৈরি হচ্ছিল দৃষ্টি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিখুঁতভাবে নিকাবটা গুঁজে নিচ্ছিল মুখে। এমন সময় হঠাৎ করেই ঘরের দরজায় এসে দাড়ালো আফরা।
– আসবো?
দৃষ্টির চোখে এক ঝলক বিস্ময়ের রেখা খেলে গেল। নিকাবটা লাগাতে লাগাতে পিছন ফিরে তাকালো।
– আরে আপু, আসুন না।
– কলেজে যাচ্ছো?
– হ্যাঁ আপু।
আফরা একগাল হেসে বললো,
– আমাদেরকেও নিয়ে চলো না। বাড়িতে বসে থাকতে থাকতে বোর হয়ে যাচ্ছি।
দৃষ্টি কিছুটা থমকে গেল। একটু অপ্রস্তুত ও হলো বটে।
এই প্রস্তাবটা সে আশা করেনি। একা একা যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি ছিল পুরোমাত্রায়। আফরার চোখে-মুখে জমে থাকা হাঁসফাঁস ভাবটা দেখে বুকের ভেতর একটা কোমল ঢেউ খেলে গেল তার। নিয়ে গেলে খারাপ হয় না এমনিতে সে নিজেও একাই।
– সত্যি যাবেন?
– হ্যাঁ।
– আচ্ছা, চলুন।
শুনেই আফরা আনন্দে এক লাফ দিলো । খুশিতে হুট করে জড়িয়ে ধরলো দৃষ্টিকে। এমন অকস্মাৎ আদরে দৃষ্টিও হেসে উঠলো।
– তুমি ৫ মিনিট অপেক্ষা করো, আমি আর তুবা এক্ষুনি তৈরি হয়ে আসছি!
বেশ কিছুক্ষণ পর, ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো দৃষ্টি। নিচে পৌঁছাতেই প্রায় একই সময়ে নেমে এলো আফরা আর তুবাও।
আফরার চোখেমুখে রোদ উঠেছে। একটা নির্মল উচ্ছ্বাসে সে চমৎকার দেখাচ্ছে । কিন্তু তুবার মুখে একটা গম্ভীর চাপা ভাব। ঠোঁটদুটো রাগে শক্ত করে রাখা। তাকে দেখে মনে হচ্ছে আফরাই জোর করে টেনে এনেছে তাকে।
তুবাকে দৃষ্টির ভালো লাগেনি। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছিল না, তবু একটা চাপা অস্বস্তি কাজ করছিল ভেতরে। মেয়েটার চোখে একটা স্থায়ী হিংসা লেপ্টে আছে। কথা বলে না, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয় প্রতিনিয়ত কারো উপর বিদ্বেষ ছুঁড়ে দেয়। চেহারার গড়নে এক ধরনের স্থবিরতা।
তবে আফরা ঠিক তার উল্টো। খোলা হৃদয়ের এক রোদেলা সকাল। কয়েকদিনেই আফরা অনেক আপন হয়ে উঠেছে তার। মনে হয় বহু বছরের চেনা। মিষ্টি করে কথা বলে, ছোটখাটো বিষয়ে হাসে, কারো পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করে না একটুও। একটা মানুষের ভেতরে এতটা আলো থাকতে পারে দৃষ্টি সেটা প্রথম অনুভব করলো ওর সঙ্গে থেকে। আফরাকে সে পছন্দ করেই ফেলেছে। অবচেতনে, নীরবে, নিঃশব্দে।
– আপু, হয়েছে আপনাদের?
– হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো।
আফরা তড়াক করে উত্তর দিলো তুবাও মুখ ভার করে পাশে দাঁড়ালো। তারা হাঁটা ধরতেই পেছন থেকে ভেসে এলো একটুখানি গাঢ় গলা,
– কোথায় যাওয়া হচ্ছে, শুনি?
আচমকা থমকে গেল পদক্ষেপ । দৃষ্টির পা-জোড়াও স্থির হলো কিন্তু সে ফিরেও তাকাল না। উজান! সেই গম্ভীর, একরোখা কণ্ঠস্বরের মালিক। আফরা নিজের স্বভাবসুলভ উচ্ছ্বাসে বলে ফেললো,
– আমরা দৃষ্টির সাথে কলেজে যাচ্ছি। ওর কলেজে আজ অনুষ্ঠান আছে। এরপর একটু ঘোরাঘুরি করবো ভাবছি।
– আমরাও যাবো।
উজানের পাশে দাঁড়িয়ে এবার মুখ খুললো নয়ন।তারপর তাল মিলিয়ে জিদানও বললো,
– হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরাও যাবো।
দৃষ্টি চোখে মুখে একটা কুণ্ঠিত বিরক্তি টের পেলেও কিছু বললো না। আফরা জিদানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আজব তো, ওর কলেজে তোরা গিয়ে কী করবি?
জবাবে জিদান চোখ কুঁচকে বলে উঠলো,
– তোরা গিয়ে কী করবি?
উজান এবার সবার কণ্ঠ চেপে নিযে বলে উঠলো,
– আমরাও যাবো তোদের পাহারা দিতে। ওইদিন যা ঘটেছে, এরপর তোদের একা পাঠানো মানে সমস্যা ডেকে আনা। কোনো চিন্তা নেই, কলেজে ঢুকবো না আমরা বাহিরে থাকবো।
– কিন্তু…
– আর কোনো কিন্তু না।
এইদিকে চরম বিরক্ত হচ্ছে দৃষ্টি। কি এক উটকো ঝামেলা। মেয়েরা মেয়েরা যাবে সেখানে নাকি আবার বডিগার্ডের মত তাদের ও যেতে হবে। যত্তসব পাগলের দল। দৃষ্টি আর কিছু না বলে আফরাকে বেরিয়ে আসার ইশারা দিয়ে সে বেরিয়ে গেলো। একটু হকচকিয়ে গেল আফরা। পাশ থেকে একরাশ হতাশা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। তারপর তুবার হাত চেপে ধরে সে-ও বেরিয়ে এলো দৃষ্টির পেছন পেছন।
দৃষ্টিরা তিনজন দৃষ্টি, আফরা আর তুবা আগে আগে হাঁটছে । আর ঠিক পিছনেই, নির্ধারিত নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে উজান, নয়ন আর জিদান। তিনজন সশস্ত্র প্রহরী তারা।
উজানের মেজাজ আজ অদ্ভুত ফুরফুরে। হয়তো কারণ, তার চোখের নাগালে দৃষ্টি আছে। এই ছেলেগুলো যদি আবার আসে… খবর আছে। ভেতরে জমে থাকা প্রতিজ্ঞার গরমে উজানের চোখ জ্বলছিল শীতল আগুনে। মুখে কিছু না থাকলেও মনে মনে সে পুরোদস্তুর যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে।
কলেজের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দৃষ্টিরা সরু ফটক দিয়ে ঢুকে গেলো ভেতরে। উজান, নয়ন, আর জিদান এরপর পাশের টং দোকানে গিয়েই জায়গা দখল করে বসল।
কলেজটা আজ অন্যরকম লাগছে। শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান উপলক্ষে সাজিয়ে তোলা হয়েছে পুরো প্রাঙ্গণ। মাঠের একপাশে রঙিন কাপড়, ব্যানার আর ফুলের সমাহারে তৈরি করা হয়েছে একটি ছোট মঞ্চ। বিদায়ের বিষণ্নতা ঢেকে দেওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস।
দৃষ্টিরা তিনজন এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো ঠিক ফুলে ভরা সেই অংশটাতে। আফরার চোখে মুগ্ধতা, তুবার চোখে অভিমান আর দৃষ্টির চোখ… ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একধরনের নির্লিপ্ত অবলোকন, আবার কোথাও ভেতরে কিছু নড়াচড়া করছে।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে…
আফরা আর তুবা নিজেদের রঙিন জগতে বিভোর।মোবাইল ঘুরিয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত। আর তাদের একটু দূরে পিলারের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে দৃষ্টি। অবশ্য অন্যসময় এমন রঙ্গমঞ্চ দেখতে তার বিরক্তি লাগলেও ওদের দুজনকে দেখতে ভালো লাগছে।
আফরা আর তুবা দুজনেই নিঃসন্দেহে রূপবতী। ওদের মুখের রেখায়, চোখের কোণে, ঠোঁটের নড়াচড়ায় একটা জৌলুস খেলা করে। সেটা শুধু প্রসাধনীর নয়। বংশ, পুঁজি, পরিচয়ের এক সূক্ষ্ম দম্ভ ছড়িয়ে আছে ওদের চেহারায়।
বড় ঘরের ছেলেমেয়েদের মুখে একটা আলাদাই দীপ্তি থাকে, এটাই বোধহয় দারিদ্র্যের বিপরীতে চেহারার একটা জ্যোতিষ্ক। আফরা আর তুবাও ঠিক এমন। দৃষ্টির মনে হয় শতজনের ভিড়েও এই দুজনকে আলাদা করে টেনে তোলা যাবে। ওদের সাজে, পোশাকে এক ধরনের শহুরে আভিজাত্য আছে। প্রচলিত সৌন্দর্যের গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলে কিছুটা কাঁচে বাঁধানো অভিজ্ঞান।
পিলারের গা ছুঁয়ে ঠান্ডা দেওয়ালের স্পর্শে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি চুপচাপ তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। তার ভাবনার পর্দায় শব্দেরা পাখি হয়ে উড়ে যাচ্ছে একের পর এক।
– আসসালামু আলাইকুম ভাবি, টুকি…
হঠাৎ করেই পিলারের আড়াল থেকে উদ্ভূত হলো এক গম্ভীর টানটান কণ্ঠ। কোনো নাটকের চূড়ান্ত দৃশ্যে খলনায়কের আগমন হলো বটে! দৃষ্টি চমকে উঠলো। শরীরটা নিজের অজান্তেই ঘুরে গেলো শব্দের উৎসের দিকে।
আর ঠিক তখনই, শটান! একটা চড় গিয়ে বসলো ইমনের গালে। গালটা ঢলে পড়লো, মনে হলো বাঁধ ভেঙে পড়েছে নদীর তীরে। ইমন ব্যথার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয় মিশিয়ে বলে উঠলো,
– সালাম দিলেও মার খেতে হবে ভাবি? আপনার এই হাতগুলো এত দ্রুত চলে কেন? কোন ব্যাচের ক্যারাটে সনদ নিয়ে ঘুরাফেরা করেন আপনি বলবেন একটু?
কথা শেষ হতে না হতেই, শটান!! দ্বিতীয় চড়টা ঠিক সময়মতো বেহালার সুর হয়ে পড়লো অন্য গালে । এবার আর ইমনের দাঁতের ফাঁক দিয়ে কথা বের হলো না। শুধু দু’পায়ে পিছিয়ে গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে দাঁড়াল।
তবে ব্যাটাছেলেটার অভিনব সাহস, মুখে হালকা হাসি রেখে এবার পিছন থেকে দুটো ফুল বের করল। তারপর গলার স্বর কোমল করে হাত বাড়িয়ে বলল,
– এই নিন ভাবি, ভাই আপনার জন্য আপনার পছন্দের ফুল পাঠাইছে। ভালোবাসার ফুল, ধরেন।
দৃষ্টির চাহনি এবার গিয়ে স্থির হলো ইমনের হাতে ধরা দুটো ফুলে। একটা নরম হলুদ গোলাপ, আরেকটা শুভ্রতার প্রতীক সাদা গোলাপ। এই দুইটি ফুল ঠিক দৃষ্টির হৃদয়ের দুটো দিক। একটি উষ্ণতা, অন্যটি প্রশান্তি। এমন প্রিয় ফুল দেখে মুহূর্তে দৃষ্টির চোখে খেলে গেল এক ঝলক খুশি…তারপরেই মুখটা আবার নিঃস্পৃহ হয়ে গেলো।
সে ধীরে দু’হাত ভাঁজ করলো বুকে। চোখ দুটি এবার স্থিরভাবে আটকে রইলো ইমনের চোখে। ইমন ততক্ষণে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে কাচুমাচু ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। এক হাতে গাল চেপে ধরেছে। গালটা এখনো কম্পন তুলছে আগের চড়ের প্রতিধ্বনিতে।
দৃষ্টি ধীরে এগিয়ে এলো, এক ধাপ মাত্র। ইমন ভেবে ফেললো, এ তো চড়ের আগাম ভূমিকাই বুঝি! সেই এক ধাপেই সে পিছিয়ে গেল আরেক ধাপ। দৃষ্টি এবার ঠোঁটের এক কোণে অলক্ষ্যে এক তীক্ষ্ণ হাসি ছুড়ে দিলো। কিন্তু নিকাবের আড়ালে তা ইমনের চেহারায় ধরা পড়লো না। দৃষ্টি এবার মাথা হালকা দুলিয়ে ইশারায় ডাকলো ইমনকে।
ইমন প্রথমে একটু দ্বিধা করলো … তারপর ধীরে এক ধাপ এগোল। ভেবেছিল বোধহয় এবার আর মার খেতে হবে না। কিন্তু নিয়তির যে নিজের প্লট টুইস্ট থাকে!
শটান!! তৃতীয় চড়টা নিখুঁতভাবে এসে পড়লো তার গালে। ইমন এবার একহাতে ফুল, আরেকহাতে গাল ধরে বলে উঠলো,
– ভাবি, এটা কিসের জন্য ছিলো…?
অনেকটা দেরিতে বহু চড়-চাপড়-ধৈর্যের পর মুখ খুললো দৃষ্টি। মেয়েটা আসলেই মুখে কম বলে, কিন্তু হাতের ভাষায় তার ব্যাকরণই আলাদা। হাতটা মুখের তুলনায় একটু বেশিই চলে তার। ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গ মেশানো ঠান্ডা হাসি নিয়ে সে বলল,
– এটা ছিলো কষ্ট করে ফুল আনার জন্য।
ইমন বোকার মতো হা করে আহাম্মক হয়ে তাকিয়ে আছে। কষ্টের প্রতিদান এভাবে কেউ দেয়? জীবনেও শুনেনি সে। এটা কি কোনো নতুন সরকারি নীতিমালা? বুঝতে পারছে না ইমন। মাথাটা ইতিমধ্যেই চক্কর দিচ্ছে। হঠাৎ দম নিয়ে একটা কষ্ট-গিলে-ফেলা শ্বাস ফেলতে না ফেলতেই, শটান!!
আরেকটা চড় দিয়ে সেই শ্বাসটাকেই থামিয়ে দিলো দৃষ্টি। তথাপি আজকের জন্য শেষ চড়।
– ভাবিইইইই!!
ইমন এবার প্রায় কান্নার দোরগোড়ায়।চড়ের আবেগে নয়, চমকের ধাক্কায়। সত্যি, যেদিন সে দৃষ্টির হাতে পড়ে সেদিন ভাগ্যের ঘড়িটা শুধু চড়ের আলার্ম দিয়ে চলে।এবার নিজের গলা খাদে ঢুকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলো,
– এটা আবার কিসের জন্য ছিলো?
দৃষ্টি ঠাণ্ডা ভঙ্গিতে নিজের হাতটা ঝেড়ে বললো,
– এটা হলো এনাম। যে ব্যক্তি এত কষ্ট করে এই ফুল পাঠিয়েছে, তাকে আমার পক্ষ থেকে এই এনামটা দিয়ে দিয়েন। কেমন?
দূর থেকে পুরো দৃশ্যের নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাইফ। দৃষ্টির হাতে ইমনের চড় খাওয়ার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো সে দেখে চলেছে দর্শক হয়ে! একইসাথে নিজের দু’গালে দু’হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে নিজের ভবিষ্যতের জন্য প্রার্থনা করছে।
মাটির পিঞ্জর পর্ব ৮
মূলত এই চটাং চটাং শব্দটাই তার অন্তরের গভীরে স’ন্ত্রাসের শিহরণ তোলে। এই ভয়েই সে নিজে কখনো দৃষ্টির সামনে যাওয়ার সাহস রাখে না। বারবার বলির পাঠা বানিয়ে ইমনকেই পাঠিয়ে দেয় সামনের লাইনে।
ইমন বেচারা যেতে চায় না। বেঁচে থাকতে কেউ কি নিজের ইচ্ছেতে এমন চড় খেতে চায়? তবুও তার না যাওয়ার উপায় নেই। না গেলে সাইফের হাত থেকে এমন ব্যাঘ্র থাব্রা আসে, যা সরাসরি হৃদয় স্পন্দনের সঙ্গে লড়াইয়ে নামে।
ইমন ভাবতে ভাবতেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে, সাইফের পুরুষালি হাতের তেজি থাব্রা খাওয়ার চেয়ে,দৃষ্টির মেয়েলি হাতের শিল্পসুলভ চড় খাওয়া অনেক বেশি দার্শনিক আর কিছুটা কম বেদনাদায়ক!
