মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২
jannatul firdaus mithila
পুরনো ইউরোপিয়ান স্থাপত্য এবং আধুনিক ডিজাইনের মিশেলে তৈরী — ❝ মনস্টার প্যারাডাইস ❞। বাড়ির প্রবেশ দুয়ারে রয়েছে বিশাল লোহার গেট! কালো রঙের উপর সূক্ষ্ম খোদাইয়ে নির্মিত এ গেটের চারপাশে জড়ানো বৈদ্যুতিক তাঁর। গেটের দু-পাশে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু পাথরের স্তম্ভ। গেটের ভেতর পা রাখতেই জমিনে দেখা মিলবে — ছোট ছোট মার্বেল পাথরের পথ, যার দু’ধারে নাম না জানা বিভিন্ন শোভাবর্ধক গাছ। গাছগুলো কি সুন্দর ছেঁটে রাখা! যেন কেউ রোজ নিয়ম করে পরিচর্যা করে তাদের। প্রায় ১০০ মিটার লম্বা ওয়াকওয়ে পেরিয়ে তারপর মনস্টার প্যারাডাইস অব্ধি যাবার সৌভাগ্য মিলে। ওয়াকওয়ের দুপাশে দুধরণের নিদর্শন। ডানপাশের জমিনটা ছোট ছোট সবুজ ঘাসে পরিপূর্ণ। তার সম্পূর্ণ অংশ জুড়ে তৈরী করা হয়েছে হেলিপোর্ট।
মনস্টারের ব্যাক্তিগত হেলিপোর্ট! গেটের সামান্য দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা তিন-চারটে চার-হুইলের গাড়ি। ওতো বড় ওয়াকওয়ে, তা থোড়াই হেঁটে হেঁটে যাওয়া সম্ভব? কেউ যদি এ পথে গাড়ি ছাড়া হেঁটে হেঁটে আসতে চায় তাহলে নির্ঘাত তার হাত থেকে সময় ফসকাবে বেশ! অন্যদিকে, ওয়াকওয়ের বাঁপাশটা বেশ সুন্দর! একপাশে বানানো ব্যাক্তিগত পুকুর। পুকুরের চারপাশটা চকচকে পাথরে পরিপূর্ণ! পুকুরের একদম মাঝ বরাবরের ন্যায় সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকে বিদেশি ভাস্কর্য। যা মূলত রাখাই হয় মনস্টারের ভাঙার উদ্দেশ্যে। পুকুর হতে সামান্য দূরে বাড়ির লনইয়ার্ড, যেখান থেকে বাড়ির ফ্রন্টইয়ার্ড শেষ এবং ব্যাকইয়ার্ড শুরু। জায়গাটা পরিপূর্ণ বিভিন্ন নামি-দামি ফ্লাওয়ার প্লান্টসে। একটু দূরে হাঁটলেই পড়বে বাড়ির পেছনের বাগানটা!যেথায় ওক গাছ হতে শুরু করে চেরি ব্লসম ট্রি অব্ধি দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসের হালকা দুলুনিতেও চেরি ব্লসম গাছ থেকে দুয়েকটা পাতা উড়ে উড়ে আসছে জমিনে। পায়ের নিচের জমিনটা চেরি ব্লসমের পাপড়িতে কি সুন্দর আবৃত হয়ে আছে! পুরো বাড়ির চারপাশটা এতো চমৎকারভাবে সুসজ্জিত! যেন কেউ এক দেখাতেই বলে উঠতে বাধ্য — এ-তো পৃথিবীর বুকে একটুকরো স্বর্গ!
কালো জগতের মোস্ট পাওয়ারফুল নেম — দি শ্যাডো মনস্টার। যার বজ্র কন্ঠ শুনেছে সবাই, শুনেছে হুংকারও! তবে আজ অব্ধি কেউ এক নজর দেখার সুযোগ পায়নি মানুষটাকে। যতবার মনস্টার কোথাও বেরিয়েছে, ঠিক ততবার সে নিজেকে আড়াল করেছে কালো মাস্ক, লম্বা হুডি আর স্কার্ফে। তার চারপাশে সশস্ত্র বডিগার্ডেরা থাকলেও তার বাহ্যিক রুপের পরিবর্তন হয়নি কখনো। এ লোকের মুখ না দেখলেও তার সিগনেচার বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হওয়া মাত্রই সকলে বুঝতে বাধ্য — এ যে আর কেউ নয় স্বয়ং মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার! মনস্টারের বাম হাতে সর্বদা একখানা কালো টাইটেনিয়ামে তৈরী মোটা, ভারী ব্রেসলেট ঝুলে থাকে। যার ভেতরে খোদাই করে নকশা আকাঁ ব্ল্যাক প্যান্থারের। প্যান্থারের নিচেই দগদগে অক্ষরে লিখে রাখা — মনস্টার! এই ব্রেসলেট শুধুমাত্র একজনের জন্যই বানানো। যা অন্য সবার জন্য একপ্রকার নিষিদ্ধ বৈকি! তাছাড়া যিনি এই ব্রেসলেটের শিল্পী ছিলেন, তার হাতদুটোও তো কেটে ফেলা হয়েছে! কজ মাফিয়া মনস্টার ডাজনট ওয়ান্না শেয়ার এনিথিং টু এনিওয়ান!
মাহির নরম মোলায়েম হাতের কনুই ধরে টানছে মুগ্ধ! মুখখানা তার সে-কি গম্ভীর! গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির উপস্থিতিতে, লম্বাটে চোয়ালখানা কেমন তীক্ষ্ণ হয়েছে ব্লেডের ন্যায়। বলিষ্ঠ পুরুষ তার লম্বা লম্বা কদমে হাঁটছে জোরালো গতিতে। অথচ পাশে থাকা মাহি মেয়েটা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে ব্যাটার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে। একে-তো ছোটখাটো মানুষ সে, তারওপর ক্লান্ত। পায়ে ওতো জোর আসবে কোত্থেকে শুনি? গতকাল থেকে পেটে আদৌও একটুকরো দানা পরেছে? পরেনি তো! মাহি এবার আর হাঁটল না। পায়ের গতি বাড়িয়ে দৌড়াতে লাগল রীতিমতো। হাতটা ছাড়ানোর বেশ চেষ্টা হয়েছে ইতোমধ্যে, তবে বেয়াদব লোকটা কী আর ওতো সহজে ছাড়ে? মাহি দৌড়াতে দৌড়াতেই একবার মিনমিনে কন্ঠে বললো,
“ একটু আস্তে হাঁটুন! আমার কষ্ট হচ্ছে!”
মুগ্ধ শুনলো কি-না কে জানে! সে তৎক্ষনাৎ পায়ের গতি বাড়ালো আরেকধাপ। শক্ত মুখাবয়বে কঠিন গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ মরবিনা এতো সহজে, চল!”
অগত্যা এমন কথায় চুপ করে গেল মাহি। একরাশ কষ্ট হওয়া স্বত্বেও পা মিলিয়ে দৌড়াতে লাগলো কেমন। এদিকে তাদের পেছন পেছন গম্ভীর মুখে হেঁটে আসছে সিদ্ধার্থ। দু-পকেটে দু’হাত গুঁজে আরামসে হাঁটছে সে। সরু চোখে কেবল ঘুরে ঘুরে দেখছে মাহিকে। মনে মনে বারবার আওড়াচ্ছে,
“ মেয়েটাকে কেনো তুলে আনলো মনস্টার? ওকেও কী তবে বাকি মেয়েদের মতো….”
আর ভাবতে পারলোনা সিদ্ধার্থ! নিজের নরম-সরম মনটাকে একদফা বোঝাতে লাগল — এপর্যন্ত বাদবাকি মেয়েদের সাথে যা হয়েছে, এই নতুন মেয়েটার সাথেও তো তা-ই হবে! এ-তো জানা কথাই। তা নিয়ে মন খারাপ করে রাখলে কিভাবে হবে শুনি? নিজ ভাবনায় মত্ত থেকে ই মাহির করুণ ভবিষ্যতের কথা টের পেয়ে এক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল সিদ্ধার্থ। পরক্ষণে পায়ের গতি বাড়িয়ে হাঁটা ধরলো উল্টোপথে।
সুবিশাল কাঠের দরজার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছেন দু’জন বডিগার্ড। মার্বেল পাথরে বুনা সিঁড়িতে মুগ্ধের পা পরতেই দু’জনে কেমন হালকা ঝুঁকে কুর্নিশ জানায় তাকে। এতে গম্ভীর পুরুষের কোনরুপ ভাবান্তর হলোনা। সে একইভাবে টানছে মাহিকে। এবারেও মাহি মেয়েটার সঙ্গে ঘটলো আরেক অঘটন! মুগ্ধ সামনে দু-সিড়িঁ ওপরে, আর মাহি এখনো দু-সিড়ি নিচে। লং কুর্তির সঙ্গে পা বেজে মেয়েটা আবারও হোঁচট খেলো সম্মুখে। পাশ থেকে দায়িত্বরত বডিগার্ডেরা ত্রস্ত মেয়েটাকে আগলে ধরতে নিলেই, মুগ্ধ মহাশয় গর্জন তুলে বলল,
“ স্টে ব্যাক!”
ত্বরিত থেমে গেল বডিগার্ডেরা। দু-কদম পিছিয়ে গেল বাধ্যদের ন্যায়। চোখ তুলে সম্মুখের মানুষটার দিকে তাকায়নি একবারও। এদিকে মাহি পরতে পরতে বাঁচল। শুকনো ফাঁকা ঢোক পাশে তাকাতেই ভড়কায় আরেকদফা। মুগ্ধ তাকিয়ে আছে আগুন চোখে! এই বুঝি তার বাদামী চোখদুটোর আগুনে ঝলসে দিবে তাকে। মাহি কেমন ভয়ার্ত ঢোক গিলল তা দেখে! তক্ষুনি মুগ্ধের আগুন চোখ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে মাথা নুয়াতেই শুনলো মুগ্ধের চিড়বিড় করা কন্ঠ!
“ বেয়াদবের বাচ্চা!”
হতভম্ব মাহি! এবারেও বুঝলোনা মুগ্ধের এরূপ কথার কারণ। মস্তিষ্কে আরেকটু জোর দিতে গেলেই হাতের কনুইয়ে টান পরলো আবার। মুগ্ধ এবার সদর দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকছে। মাহির কি হলো কে জানে! সে আড়দৃষ্টিতে একটু-আধটু দেখতে লাগলো বাড়ির ভেতরটা। মুহুর্তেই চমকালো সে! বাড়ির প্রবেশপথেই প্রায় ২২ ফুট উঁচু ছাদ, যার মাঝ বরাবর ঝুলছে এক বিশাল কালো ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি। মাহি চলন্ত পা জোড়া একটাবার থামতে চাইলো। দেখতে চাইলো প্রবেশপথের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যটা। তবে তা কি আর সম্ভব? লোকটা তো হাঁটছে তাকে নিয়ে। সে-ই কখন থেকে হাঁটছে তাঁরা অথচ এখনো কি-না বাড়িতেই ঢুকলোনা! এটা বাড়ি না-কি গোলকধাঁধা?
মাহি চুপচাপ তাকায় সম্মুখে। প্রবেশপথ ছেড়ে তাকে নিয়ে আসা হয়েছে বিশাল এক লিভিং রুমে। একমুহূর্তের জন্য মাহির চোখদুটো স্থির হয়ে গেল কেমন! মাথার ওপর বেশ উঁচু সিলিং। বাড়ির এ জায়গাটা মনে হচ্ছে গোলাকার। লিভিং রুমেও ধরা দিয়েছে আরেক সৌন্দর্য! গোলাকার লিভিং রুমটার মাঝখানে বেশ জায়গাজুড়ে নিচু সিঁড়ি করা হয়েছে। সিঁড়ি ডিঙিয়ে নামতে হবে নিচে, যেথায় বসার জায়গা! পায়ের তলায় স্পষ্ট সুইমিংপুল, হাঙরের মতো বড় বড় মাছ নড়ছে তাতে। তারওপর বসিয়ে রাখা দামী মখমলের সোফাসেট। মাহির গাকাঁটা দিয়ে উঠল এহেন লিভিং রুম দেখে! মেয়েটা ভয়ে জড়সড় হয়ে যেইনা পিছু হটবে ওমনি মুগ্ধ তাকে টানতে টানতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামালো। মাহি এবার জোরাজোরি করছে নিজের হাতটা ছাড়াতে, সে কিছুতেই পা রাখবেনা ঐ হাঙরের লিভিং রুমে। দাড়ালেই যদি কাচঁ ভেঙে পড়ে যায় সুইমিংপুলে তখন? মাহি এবার ভয়ে কেঁদেই দিলো। কাঁদতে কাঁদতে অনুনয় করে বলল,
“ প্লিজ আমি নিচে নামবোনা। আমার ভয় করছে… ”
মুগ্ধ কি আর ওতো কথা শোনে? সে তক্ষুনি এক হেঁচকা টানে মাহিকে ছুঁড়ে ফেলল লিভিং রুমের স্বচ্ছ কাঁচের মেঝেতে। মাহি উপুড় হয়ে পড়ল মেঝেতে। পরমুহূর্তে চোখ খুলেই দেখল তার ঠিক নিচে সবগুলো মাংসাশী হাঙর কেমন একজোট হয়েছে তাকে দেখে! মাহি বাকরুদ্ধ ভয়ে। হাওরগুলোর তীক্ষ্ণ দন্ত চক্ষুগোচর হতেই কাঁপতে লাগল সপ্তদশী। একমুহূর্ত স্থির থেকে পরক্ষণেই দিলো এক বিকট চিৎকার। কোনমতে মেঝে থেকে উঠে বাচ্চাদের মতো দু’হাতে ভর দিয়ে সরে গেল অন্যত্র। মুগ্ধ দেখল, ক্রুর হাসি লেপ্টালো ঠোঁটের কোণে। পকেট থেকে ফের একখানা মোটা সিগার বের করে এনে ঠোঁটে গুঁজল আয়েশে। লাইটার দিয়ে সিগারের শেষ ভাগ ধরিয়ে দিলো এক লম্বা টান। সে-ই টানে কি যে সুখ পেল ছেলেটা… যার দরুন স্বস্তিতে চোখদুটো বন্ধ হয়ে এলো তার। মুখের দূষিত ধোঁয়াটুকু বেশকিছুক্ষন মুখগহ্বরের আঁটকে রেখে, গম্ভীর গলা উঁচিয়ে ডাকলো,
“ মেইডেন!”
ব্যস! একটা ডাক। যা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই গাকাঁটা দিয়ে উঠল বাড়ির সকল মেইডদের। মিনিটের ব্যাবধানে প্রায় ২৫জন কেমন ত্রস্ত পায়ে ছুটে এলেন তক্ষুনি! সবচেয়ে বুজুর্গ মেইড ইরা, বৃদ্ধ বয়সী নাদুসনুদুস গায়ের গড়নের মহিলাটি এগিয়ে এসেই হালকা ঝুঁকে কুর্নিশ জানায় মুগ্ধকে। মুগ্ধ এবারেও প্রতিক্রিয়াহীন! সুদর্শন মুখখানায় ভারী গাম্ভীর্যের ছাপ। আঙুলের ভাঁজে থাকা সিগারে আরেকটা টান বসিয়ে, তীক্ষ্ম চোয়ালখানা নাড়িয়ে গমগমে গলায় আদেশ ছুড়ল,
“ ওকে আজ রাতের জন্য তৈরী করুন। আ’ম হাঙ্গরি!”
কথাটা বলে আর একমুহুর্তও দাঁড়াল না মনস্টার। তৎক্ষনাৎ গটগট পায়ে হাঁটা ধরল উল্টোপথে। এবার তার নিজের আস্তানায় যাওয়ার পালা। কতদিন হলো যায় না সে! এদিকে তার চলে যাওয়ার পরও সব মেইডরা কেমন স্থির হয়ে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধা ইরা কেবল দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো। ধীরে ধীরে নিজের কুঁচকে যাওয়া চামড়ার হাতদুটো সামনে ধরে ভাবতে লাগলেন,
“ এ হাতদুটো দিয়ে ঠিক কতগুলো মেয়েকে তৈরী করলাম আমি? ঠিক কতগুলো?”
“ মেইডেন!”
ইরার ধ্যান ভাঙল পেছন থেকে ধেয়ে আসা সিদ্ধার্থের কন্ঠে। তিনি তক্ষুনি পেছনে ঘুরলেন। ফর্সা মুখখানায় আঁধার নেমেছে তার। চোখদুটো হয়ে গিয়েছে ছলছল। সিদ্ধার্থ একমুহূর্ত চুপ থেকে বোঝার চেষ্টা করল ইরার মনোভাব। তবে কিছুই তেমন বোধগম্য না হওয়ায় সে প্রশ্ন করেই বসল,
“ কি হয়েছে তোমার? এভাবে মুখে আঁধার নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেনো?”
ইরা ফোপাঁতে লাগলেন কেমন। দু’হাতে নিজের ঘাড় সমান হলদেটে চুলগুলো চেপে ধরে, কাঁদো কাঁদো মুখে বলতে লাগলেন,
“ রাক্ষসের ক্ষুধা পেয়েছে সিড! আজ আবারও রাক্ষসের ক্ষুধা পেয়েছে।”
ভড়কায় সিদ্ধার্থ। তৎক্ষনাৎ হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ মানে? আই মিন টু সে, কাকে চাইছে আজ?”
ইরা ফোপাঁতে ফোপাঁতে আলতো করে আঙুল তাক করলেন অদূরের লিভিং গ্রাউন্ডে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে থাকা মাহির পানে। মেয়েটা অতিরিক্ত ভয়ে আবারও জ্ঞান হারিয়েছে। সিদ্ধার্থ কেমন বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় মেয়েটার পানে। হতবাক সুরে বিরবিরিয়ে বলে,
“ ওহ নো!”
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হিমশীতল কক্ষ! মখমলের বিছানায় একটুকরো গোলাপের পাপড়ির ন্যায় পড়ে আছে মাহি। ঘন কারুকার্যের কাঠের খাট, যার চারকোনার স্ট্যান্ডে ঝুলছে পাতলা ফিনফিনে পর্দা। ঘরের একমাত্র বিশালকার জানালা যার পরিধি পুরো একটা দেয়াল জুড়ে, সেখান থেকে চাঁদের মিষ্টি আলো এসে আছড়ে পড়ছে পুরো রুমে। পুরো কক্ষে লাইটের আলো না থাকলেও সম্পূর্ণ কক্ষ জুড়ে ছেয়ে আছে চাঁদনীর উপস্থিতি! বিছানায় পড়ে থাকা মাহির এতক্ষণে জ্ঞান ফিরল বোধহয়। সে পিটপিট করে চোখদুটো মেলতে লাগলো। সারাটাদিন না খেয়ে থাকায় শরীরটা আর দিচ্ছে না তার। সর্বাঙ্গে জুড়েছে তীব্র ব্যথা! মাথাভর্তি ভোতা যন্ত্রনার কবলে পড়ে চোখমুখ কুঁচকে যাচ্ছে মেয়ের। তবুও সে কোনমতে নিজের চোখদুটো খুলল। ঝাপসা দৃষ্টিতে সম্মুখে হঠাৎ এক অপরিচিত বয়স্ক মুখ দেখেই লাফিয়ে উঠলো ভয়ে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিতেই যাবে ওমনি পৌঢ়া এসে মুখ চেপে ধরে মাহির। মাহি বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কেমন! এদিকে পৌঢ়া তখন ফিসফিসিয়ে বলে,
“ ভয় নেই। আমি ইরা, তোমার মেইডেন।”
ভয়ার্ত মাহি কি বুঝলো কে জানে! সে কেবল চুপ করে শুনলো কথাটা। পৌঢ়া মাহিকে স্থির হতে দেখে আলতো করে নিজের হাত সরালেন মাহির মুখের ওপর থেকে। চাঁদের অল্প আলোয় পৌঢ়ার মাথাভর্তি হলুদ চুলগুলো কেমন চিকচিক করছে দেখো! বৃদ্ধ হলেও সৌন্দর্যে যেন কোনো কমতি নেই তার। মাহি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো মানুষটার দিকে। পৌঢ়ার চোখেমুখে স্পষ্ট রাগ। তিনি খানিকক্ষণ মৌন থেকে হঠাৎ মাহির একহাত ঝাঁকিয়ে উঠলেন ভীষণ রাগে। মাহি হতচকিত কন্ঠে ব্যাথাতুর শব্দ তুলে সামান্য। এদিকে পৌঢ়া তখন দাঁত খিঁচে বলে,
“ কেনো এলে এখানে? কি এমন অসহায়ত্ব ছিল তোমার, যার দরুন এই জেলখানায় এসে উঠলে? এরচেয়ে কয়েকগুণ ভালো হতো যদি তুমি নিজেই ম*রে যেতে।”
বৃদ্ধার এহেন রহস্যময় কথায় হতবাক মাহি। একমুহূর্তের জন্য নিজের সকল ব্যাথা ভুলে গিয়ে, সন্দেহাকুল কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ কি বলছেন আপনি? জেলখানা মানে?”
পৌঢ়া ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললেন মেয়েটার এহেন অবোধ ভাবস্রোতে। তিনি রয়েসয়ে মাহির হাত ছেড়ে দিলেন। আনমনে ঠোঁটের কোণে ব্যাথাতুর হাসি টেনে, মোটা হয়ে আসা কন্ঠে আওড়াতে লাগলেন,
“ জেলখানাই তো! যেখানে আমরা সবাই কয়েদি। হয়তো মৃত্যুর আগে এখান থেকে বেরুনোর পথ নেই আমাদের। সেক্ষেত্রে এটা জেলখানা নয়তো কী?”
অবোধ মাহি প্রতিক্রিয়া জানাতে ভুলে গেল এবার। কন্ঠরুদ্ধ হয়েছে অজানা ভয়ে। পৌঢ়া তাকে আরেকধাপ বিস্ময়ে বুদ করে দিয়ে বললেন,
“ তুমিও নিশ্চয়ই মনস্টারের শত্রুপক্ষের কেউ?”
মাহি আশ্চর্য বনে গেল এবার। উনি কি করে জানলেন তার বিষয়ে? এদিকে মাহিকে ওমন চমকাতে দেখে আহত হাসলেন ইরা। বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন,
“ হয়তো ভাবছো আমি কিভাবে জানলাম তাই-না? আসলে এ জেলখানাতে কেবল মনস্টারের শত্রু পক্ষের দূর্বলতাগুলোই আসে। কারণ এখানে জন-সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ! হোয়াটএভার.. শোনো মেয়ে,”
একটু থামলেন ইরা। কিছু একটা ভেবে ফের জানালেন,
“ প্রস্তুত হও। সে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে।”
“ কে আসবে?”
মাহির পাল্টা প্রশ্নে থমকালেন ইরা। কপালে গোটাকতক ভাঁজ ফেলে শুধালেন,
“ কে আবার? মনস্টার!”
হকচকায় মাহি। তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে ওঠে বসলো বিছানায়। গা থেকে ব্ল্যাঙ্কেট সরে যাওয়ায় আচমকা নিজের দিকে চোখ পরতেই বিস্ময়ে চোখদুটো গোলগােল হয়ে গেল তার। একি! তার গায়ে এসব খোলামেলা কাপড় কেনো? মাহি তৎক্ষনাৎ ভয়ে-অস্বস্তিতে ব্ল্যাঙ্কেটটা টানতো লাগল নিজ গায়ে। নিজের অর্ধ-উম্মুক্ত দেহখানা ঢাকতে ঢাকতে ইতস্ততার সুরে বলল,
“ আমার কাপড় কোথায়? এগুলো… এগুলো কে পরালো আমায়?”
“ আমি পরিয়েছি!”
“ কেনো?”
“ কারণ আজ রাতটা তোমার জন্য দীর্ঘ হতে চলছে। মনস্টার আসবে তোমার কাছে, তার হিংস্র, পৈ*শাচিক রুপ দেখাতে।”
এহেন কথায় নিশ্বাস আঁটকে গেল মাহির। চোখদুটোর কার্নিশ ভরে উঠল মুহুর্তেই। বদনে বয়ে গেল মৃদু ঝংকার। ইরা স্পষ্ট দেখল সব। একবার চাইলো, মেয়েটাকে একটু বুকে জড়িয়ে স্বান্তনা দিতে তবে পরক্ষণেই ভাবলো,
“ কি দরকার? স্বান্তনা দিলেই কী আর রাক্ষসটা ছেড়ে দিবে তাকে?”
ইরা নিজেকে শক্ত রাখলো কোনমতে। চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েও হঠাৎ থামলো কেন যেন। আচমকা পিছনে না তাকিয়েই বলল,
“ পারলে ম*রে যাও, তাও ঐ মনস্টারের হাতে পরতে যেও না। ও কিন্তু চোখের পলকে জাহান্নাম দেখিয়ে আনবে।”
কথাটা বলে আর একমুহূর্তও দাঁড়ালেন না ইরা, তৎক্ষনাৎ চলে গেলেন দ্রুত কদমে। এদিকে বিচলিত মাহি নিজেকে নিয়ে বড্ড চিন্তায় পরলো যেন। এবার কি করে বাঁচবে সে? কি করে নিজেকে বাঁচাবে ঐ রাক্ষসের হাত থেকে? অস্থির মাহি উদ্ভ্রান্তের ন্যায় এদিক ওদিক মাথা ঘোরায়, খুঁজতে থাকে বাঁচার শেষ সম্বলটুকু। এরইমধ্যে হঠাৎ তার নজর আঁটকায় বিছানার চারপাশের স্ট্যান্ড গুলোর দিকে, যা উচ্চতায় বেশ উঁচু! স্ট্যান্ডের গায়ে ঝুলছে সফেদ রঙা পর্দা। মাহি একমুহূর্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। তার অবচেতন মস্তিষ্ক বারবার বলছে — তুমি যেটা ভাবছো তা একেবারে ভুল, অন্যায়! কিন্তু অবোধ মনটা তার বলছে অন্যকথা। তারা যদি কথা বলতে জানতো তাহলে হয়ত বলতো,
“ ম*রে যা মাহি! একটা শয়তানের হাতে নিজেকে এতে সহজে বিলিয়ে দিস না।”
মস্তিষ্ক এবং মনের দোটানায় আটকা পড়েছে মাহি। সঠিক সিদ্ধান্তে এখনো উপনীত হতে পারেনি মেয়েটা। একবার ইচ্ছে করছে মস্তিষ্কের কথা শুনতে আরেকবার ইচ্ছে করছে মনের! মাহি তৎক্ষনাৎ নিজের মাথাটা চেপে ধরে দু-হাতে। কাঁদতে কাঁদতে বিরবির করে বলে,
“ সম্ভব না! ঐ শয়তানের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া সম্ভব না! আমি থাকব না.. আমি..আমি ম*/রে যাব। হ্যাঁ আমি তাই করব!”
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১
অবশেষে মস্তিষ্ক পরাজিত হলো মনের জোরের কাছে। সপ্তদশী টলমল শরীরে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ায় মখমলের বিছানায়। পরক্ষনে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে স্ট্যান্ডে ঝোলানো পর্দাগুলো একটানে ছিঁড়ে এনে, একাংশ গাঁট বাঁধে স্ট্যান্ডের আগায়। তারপর আরেকাংশ গোলাকার গাঁট বেঁধে হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“ আ’ম সরি আব্বু! আমি নিজের গায়ে কোনো কলঙ্ক নিয়ে বে*চেঁ থাকতে পারবোনা।”
