Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩০

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩০

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩০
jannatul firdaus mithila

“ সুযোগ পেয়ে আমায় বিস্ট ডাকছিস বান্দীর মেয়ে? এখন যদি আমি না আসতাম, তখন? তখন বোধহয় খুব ভালো হতো তাই না? বাই দা হেল ইন দ্য মনস্টার’স ওয়ে — নিজের দিকে তাকিয়েছিস একবার? ওদের একবেলার খাবার হওয়ার যোগ্যতাও তো তোর নেই। সারা শরীরে হাড্ডি ছাড়া মাংস নেই এক ছটাক! তোর মতো কাঁকলাসকে খেতে গেলে ওদেরই জাত যেত বান্দীর মেয়ে!”
পেল্লব মুখখানায় আধার নেমে এলো সপ্তদশীর। সরু নাকের পাটাটা বোধহয় ফুললো খানিক। সুযোগ বুঝে তাকে চিকন বলে খোঁটা দেওয়া হচ্ছে! এ কি যেন-তেন কথা? অভিমানীনি গাল ফুলালো বেশ। ডান-হাতের তর্জনী উঁচিয়ে চোখে আটাঁ চশমাটা খানিক ঠেলেঠুলে বসে রইলো চুপচাপ। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর যুবক দাঁত খিঁচল ফের। মসৃণ কপালে গোটাকতক বিরক্তির ভাঁজ টেনে, দু’হাত কোমরের কাছে ধরে রেখে ঝাঁঝাল কন্ঠে আওড়াল,
“ এখনো এভাবে সঙের মতো বসে আছিস কেনো বান্দীর মেয়ে? মা’র খেয়ে শান্তি হয়নি? নাকি আর-ও দু’চারটে খাওয়ার রুচি হচ্ছে?”

সপ্তদশী ঢোক গিলল সামান্য। হাত দু’খানার নরম বাঁধনে খরগোশ ছানাকে চেপে রেখে উঠার প্রয়াস চালালো কোনোরকম। তবে বালাইষাট! সপ্তদশীর ডানপা-টা কেমন হুট করে অবশ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। হয়তো এতক্ষণ ধরে বরফের পুরু আস্তরণে পা দাবিয়ে রাখায় এই হাল হয়েছে বেচারির। গায়ের জোরে দু’পায়ে ভর দিতে গিয়ে আচমকা টলতে লাগল সপ্তদশীর দূর্বল কায়া। খানিকক্ষণ টলতে টলতে মেয়েটা কেমন তাল সামলাতে না পেরে আচানক ঢুলে পড়ল মুগ্ধের গায়ে। এহেন আকস্মিক কান্ডে সটান হলেন বলিষ্ঠ পুরুষ। আগ বাড়িয়ে ধরলেনও না মেয়েটাকে। সুদর্শন মুখখানায় ফোঁটাল একরাশ তিতিবিরক্তির ছাপ! দাঁতে দাঁত চাপলেন পরক্ষণেই। মাথার তালুতে কেমন অদৃশ্য আগুন জ্বলছে তার, চোয়াল ফুটেছে শক্তভাবে। মেয়েটার কতবড় সাহস তার গায়ের ওপর ঢুলে পড়ে?সৌজন্যবোধহীন নির্দয় মানব সেকেন্ড খানেক পেরুতেই হুট করে মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল নিজ গা থেকে। এদিকে তার ওমন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় মাহি। দূর্বল শরীরটা তৎক্ষনাৎ গিয়ে আছড়ে পড়ল বরফের কোলে। ভাগ্যিস গুঁড়ি গুঁড়ি বরফগুলো ছিল! নাহলে যে আজ নির্ঘাত মেয়েটার কোমর ভাঙত। ভড়কানো মাহি কেমন হতবাক দৃষ্টি তুলে সামনে তাকায়। পরমুহূর্তেই সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে থাকা মুগ্ধকে দেখে ফের হকচকায় বোকা মানবী। তৎক্ষনাৎ শুকনো ঢোক গিলে নজর ঝুঁকালো আলগোছে। এদিকে মুগ্ধ এবার ত্যাড়েফুঁড়ে এগোলো। উম্মুক্ত কোমরটা সামান্য বাঁকিয়ে, শক্ত হাতের হিংস্র থাবায় আচমকা চেপে ধরল মাহি’র নরম গ্রীবা। হাতের জোরে মেয়েটার নরম তুলতুলে মুখখানা হালকা উঁচিয়ে কেমন হুংকার ছুঁড়ল যুবক,

“ হাউ ডেয়ার ইউ্য টাচ মি উইদাউট মা’ই পারমিশন জানোয়ারের বাচ্চা? ঢুলে পড়ার হলে অন্য জায়গায় গিয়ে পড়তি! শুধু শুধু আমার গায়ের ওপর ঢুলে পড়ে আমায় নোংরা করলি কেন? ফা’কিং গ্লুপায়া!”
ছলছল করে উঠল মাহি’র হরিণী চোখদুটো। গোলাপের পাপড়ির ন্যায় নরম অধরযুগল কেমন কাঁপছে তিরতির করে। ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুচ্ছে চাপা কান্নার শব্দ। নির্দয় মানবের মন থোড়াই গললো তাতে! সে কেমন বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফের গর্জে বলল,
“ নেক্সট টাইম ভুলক্রমেও আমার শরীরে টাচ করতে এলে একদম জান নিয়ে ফেলব তোর! মাইন্ড ইট।”
বলেই সপ্তদশীর নরম চোয়ালখানা এক ঝটকায় ছাড়ল মনস্টার। শীরঁদাড়া সোজা করে দাঁতে দাঁত চেপে কিয়তক্ষণ মহা বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটার পানে। মাহি নাক টানছে কেমন! বাহাতের উল্টোপিঠ দিয়ে আলগোছে মুছে যাচ্ছে সিক্ত কপোল। তার ছোট্ট কোলে গা গুটিয়ে বসে আছে খরগোশ ছানা। বোবা প্রাণীটা কি বুঝছে কে জানে! কাঁদতে থাকা নিষ্পাপ সপ্তদশীর পানে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। মুগ্ধ বড্ড বিরক্ত! ধারালো ব্লেডের ন্যায় তীক্ষ্ণ হয়েছে তার চোয়াল। সে কেমন গটগটিয়ে মাহিকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল পেন্টহাউজের দিকে। পাদু’টোর গতি অব্যহত রেখে, গলা উঁচিয়ে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে মাহি’র উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,

“ ওহে কথায় কথায় নাকে কাঁদুনি! ওরা আর দু’মিনিটের মধ্যে ফিরে আসবে। এরপর নাহয় ওদের পেটে গিয়ে কাঁদিস। বাই দা হেল ইন দ্য মনস্টার’স ওয়ে — আগেভাগে বলে দিচ্ছি, তোর মাথাটা কিন্তু আমার প্রাডা খাবে, আর তোর পাদু’টো স্যান্ডির হবে। সাইকি খাবে হাতদুটো, বাকি তোর যা যা আছে সব নাহয় ড্যানি এবং হ্যালি খেয়ে নিবে। সো বসে থাক! খবরদার উঠিস না যেন। তোর তো আবার দয়ার শরীর! কারো কষ্ট দেখতে পারিস না, সো আমার ক্ষুধার্ত পেটদের ক্ষুধাটাও নাহয় আজ মিটিয়ে দে।”
চলে গেল মুগ্ধ! কারুকার্যময় বিশালাকার কাঁচের দরজাটা দিয়ে মাত্র ঢুকল ভেতরে। এদিকে তার ওমন কথায় দেহ ছেড়ে প্রাণ বেরিয়ে যাবার যোগাড় মাহি’র। মেয়েটা কেমন অস্থির হলো! তড়িঘড়ি করে বহুকষ্টে পাদু’টোয় ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল কোনরকম। তবে কপাল দেখো! এখনো পাদুকা কেমন শক্ত হয়ে আছে তার। মাহি কপাল কুঁচকে পায়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই দেখে — পাদু’টো কেমন নীলচে আকার ধারণ করছে ক্রমশ। শত হলেও নাতিশীতোষ্ণ দেশের মানুষ সে, হুটহাট এহেন বরফ ঠান্ডায় থোড়াই মানাতে পারবে! মাহি প্রয়াস চালালো হাঁটার। তবে অবশ পাদু’টো তার এক পা-ও নড়ল না জায়গা থেকে। বেচারি অসহায়ের ন্যায় এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে! একটা মানুষ যদি পেত সাহায্যের জন্য!

স্বচ্ছ ট্রান্সপারেন্ট কাঁচের দেয়ালের ওপাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ। বাহাত ঢিলেঢালা ট্রাউজারের পকেটে লুকনো, ডানহাতের তর্জনী এবং মধ্যমার ফাঁকে গুঁজে আছে জ্বলন্ত সিগার। গম্ভীর যুবক বারবার টান বসাচ্ছে সিগারে। বাদামী চোখদুটো একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বরফের জমিনে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি’র পানে। মেয়েটা নড়তে চাইছে তবে পারছেনা। অসহায়ের মতো তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে ভীষণ। তা দেখে এক চিলতে ক্রুর হাসির রেশ স্পষ্ট দেখা গেল নির্দয় যুবকের পিয়ার্সিং করা ঠোঁটের কোণে। মুখ ভর্তি করে সিগারের ধোঁয়া উড়াঁচ্ছেন তিনি, মুহুর্তেই ঢেকে গেল সুশ্রী মুখমণ্ডলের চারপাশ! ঠোঁটের সনে দাঁত পিষে আওড়াল,
“ বান্দীর মেয়ের কতবড় সাহস আমার মুখের ওপর আমাকেই বিস্ট ডাকে! বেয়াদবের বাচ্চা একটা!”
ভয়ার্ত মাহি ফের ব্যর্থ প্রয়াসে পাদু’টো নাড়াল খানিক। আর ওমনি বেচারি পায়ের ওপর জোর দিতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল বরফের কোলে। সঙ্গে সঙ্গে হাতের বাঁধন খসে বেরিয়ে গেল খরগোশ ছানাটা। মাহি হকচকায়! নিজের যাচ্ছে তা-ই অবস্থা থাকা স্বত্বেও মানবী একহাতে ফের টেনে ধরে খরগোশটাকে। দূর্বল কায়া খানিকটা নাড়িয়ে চাড়িয়ে যেইনা উঠতে যাবে ওমনি শুনতে পেল — হিং*স্র জন্তুদের হিসহিসানোর জোরালো শব্দ। তক্ষুনি থমকে গেল মাহি! মুহুর্তেই সর্বাঙ্গে ছুটে গেল ঘাম। ঘাড়টা সামান্য নাড়ানোর সাহস অব্ধি পাচ্ছে না বেচারি। কাঁপছে তার ক্ষুদ্র দেহটা। অদূরের স্বচ্ছ কাঁচ গলিয়ে বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ! চোয়াল শক্ত করে হাতের মুঠোয় পিষে যাচ্ছে জ্বলন্ত সিগারটা। তার বিচক্ষণ মস্তিষ্ক একবার বলছে,

“ থাক মরুক ঐ বান্দীর মেয়ে, হু কেয়ারস?”
অথচ বেঈমান মনটা তার গাইছে উল্টো বাক্য। ঘুষ খাওয়া প্রতারকের ন্যায় মনিবের বিরুদ্ধে গিয়ে বলছে —
“ না না! বেচারিকে বাঁচাতেই হবে!”
মন-মস্তিষ্কের দোলাচালে বড্ড বিরক্ত হলেন মাফিয়া মনস্টার। বাহাতের খসখসে চামড়া দিয়ে ঘাড়টা অনবরত ডলতে ডলতে , যুবক কেমন দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ জানোয়ারের বাচ্চা ম’রতে গিয়েও শান্তি দিচ্ছে না আমায়!”
কথাটা জিভ খসিয়ে বের হয়েছে সেকেন্ড খানেক হবে হয়ত, আর ওমনি যুবকের পায়ের গতি বেড়ে গেল ঝড়ের বেগে। সে কেমন গটগটিয়ে হাঁটা ধরল গার্ডেনের দিকে। হিং**স্র হায়না দুটো দাঁত বের করে হিসহিসাচ্ছে। লকলকে জিভটা বুঝি দু’হাত বেরিয়ে গেছে মানুষ দেখে। ড্যানি না এগোলেও হ্যালি এগোচ্ছে ধীরপায়ে। উবু হয়ে পড়ে থাকা মাহি কুঁচকে রেখেছে চোখমুখ। সে স্পষ্ট টের পাচ্ছে জন্তু দুটো এগোচ্ছে তার পানে। হ্যালিট ধারালো নখরযুক্ত পা-টা কোনরকম মেয়েটার গায়ে স্পর্শ করার আগেই এক শক্তপোক্ত পা এসে তক্ষুনি দূরে ছুঁড়ে ফেলল হায়নাকে। পরক্ষণে নিজেও বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে বলে,

“ রাজভে ইয়া নে স্কাজাল, ছতো আনা মাইয়া? ইশচো রাস পদাইদিয়োতে ক নিয় — ইয়া ভাস না কুস্কি।”
( বলেছিনা ও আমার? তাহলে কোন দুঃসাহসে ওর দিকে এগোলি তোরা? আর একবার এই দুঃসাহস দেখাতে এলে একদম টুকরো টুকরো করে ফেলব তোদের।)
হিং*স্র হায়নাদুটো তৎক্ষনাৎ পিছিয়ে গেল কয়েক-কদম। মুগ্ধ এবার শক্ত চোখে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মাহি’র পানে। কঠিন অভিব্যাক্তিতে সপ্তদশীর ডানহাতের কনুই চেপে তাকে জোর করে উঠিয়ে দাঁড় করালো কোনরকম। অতঃপর চোখেমুখে বিশাল বিরক্তি নিয়ে ঝাঁঝাল কন্ঠে শুধালো,
“ আমার মতো হ্যান্ডসামকে দেখলে বুঝি যখন-তখন তোর পা খারাপ হয়ে যায়? না-কি আমার টোনড বডি দেখলে মাথা গরম হয়ে যায় তোর? কোনটা?”
কানদুটো গরম হয়ে গেল মাহি’র। এই যে এক্ষুণি বুঝি ধোঁয়া বেরুবে কানের ছিদ্র দিয়ে। লোকটা এসব কি যা-তা বলছে! সে আবার এমনটা কখন চাইলো? মাহি হতভম্বের ন্যায় চোখ তুলে তাকাতেই ঘটল আরেক কান্ড। এক অদ্ভুত অধিকার বোধে বাজপাখির ন্যায় তীব্র ঝাপটায় হুট করে তাকে কাঁধে তুলে নিলো মুগ্ধ। যুবকের প্রশস্তে কাঁধে চড়তেই হকচকিয়ে ওঠে মাহি। পাদু’টো ছটফটিয়ে যাচ্ছে ভীষণ। ভড়কানো কন্ঠে বারংবার বলছে,

“ ছাড়ুঁন আমায়! নামান বলছি!”
দাঁত খিঁচে রূঢ় মানব। পায়ের গতি সম্মুখে টেনে কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ল,
“ বেশি নাটক করলে এক্ষুণি পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে ছুঁড়ে মা’রব বান্দীর মেয়ে।”
মুহুর্তেই স্থির হয়ে গেল মাহি! পা দু’টো শান্ত হলো কেমন। একহাতে এখনো ধরে রেখেছে খরগোশ ছানার ঘাড়। এদিকে মুগ্ধ মহাশয় কেমন কঠিন মুখে এগোচ্ছেন। আগ বাড়িয়ে মেয়েটার গায়ে হাত না রেখে, দু’হাত গুঁজে রেখেছে প্যান্টের পকেটে। লম্বা লম্বা কদমে বাড়িতে প্রবেশ করে, পা ঘোরালো সিঁড়ির দিকে। যেতে যেতে একবার ফের দাঁতে দাঁত চেপে ঠেস মে’রে আওড়াল,
“ যখন-তখন আমার মতো হ্যান্ডসামের কোলে উঠতে লজ্জা করেনা তোর বান্দীর মেয়ে? এ নিয়ে দু’বার রুশদী কিংয়ের কাঁধে উঠলি। এ-যে তোর চৌদ্দগোষ্ঠীর সৌভাগ্য! ”
মুখ কুঁচকায় মাহি। বিরক্তিতে তিক্ত হয়ে তেঁতো কন্ঠে বিড়বিড়ালো,

“ এমন একটা বিস্টের কাঁধে স্বেচ্ছায় উঠতে যাবে কোন পাগলে? আবার বলে চৌদ্দগোষ্ঠীর কপাল! হুহ্! আমার গোষ্ঠীর মানুষ থোড়াই পাগল!”
কপাল কুঁচকায় মুগ্ধ! পায়ের গতি অব্যহত রেখে, চোয়ালের পেশি টানটান করল পরক্ষণে। দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ গালি দিচ্ছিস না-কি বান্দীর মেয়ে?”
ভড়কায় মাহি। তৎক্ষনাৎ চোরের ন্যায় মুখ মুছে আমতা আমতা করে বলে,
“ ক-কই, না তো।”
গোটানো ভ্রু-দ্বয় শিথিল করল মুগ্ধ। আচমকা শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হাসল কেন যেন। রয়েসয়ে তাচ্ছিল্যের কন্ঠে বলল,
“ তুই আর তোর বাপ যে আমার তারিফ করবিনা তা আমি জানি! শত হলেও, রক্ত বলে কথা!”

একহাতে স্লাইডিং কাঁচ সরিয়ে কক্ষে ঢুকল মুগ্ধ। গম্ভীর মুখে ঝুলন্ত গোল বিছানার দিকে এগিয়ে এসে, চট করে মেয়েটাকে কাঁধ থেকে ছুঁড়ে ফেলল নরম তুলতুলে বিছানায়। হুটহাট এহেন আকস্মিক কান্ডে হকচকানোর সময় পায়নি মাহি। বেচারি খিঁচে রাখা চোখদুটো কোনমতে খুলতেই দেখল — সুদর্শন যুবক কেমন বাঁকা হেসে, ভ্রু উচিঁয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। শুকনো ঢোক গিলল মাহি। তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে পিঠ উঠাতে চাইলেই বাঁধ সাধল মুগ্ধ। বাঁকা চোখে তাকিয়ে থেকে, ঠোঁট কামড়ে ঝুঁকে আসতে লাগল মাহি’র ছোট্ট বদনের ওপর। মাহি ভড়কায়! শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে সরে যাবার প্রয়াস চালাতেই টের পেল — তার পাদু’টো আর নড়ছে না। নিজ অসহায়ত্বে মুষড়ে পড়ল সপ্তদশী। ভয়ার্ত কন্ঠে আমতা আমতা করে বলতে লাগল,

“ প্লিজ…সরে যান।”
কে শোনে কার কথা! এমুহুর্তে মুগ্ধ নামক সুদর্শন যুবকের চোখেমুখে স্পষ্ট দুষ্টু ভাবসাব। সে কেমন এগোচ্ছেই তো এগোচ্ছে। নিজের শক্তপোক্ত হাতদুটো বিছানার দুপাশে ঠেকিয়ে, মাহি’র ওপর ঝুঁকে রইল কেমন। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ টেনে হিসহিসিয়ে বলল,
“ তুই তো এখন নড়তে পারছিস না বান্দীর মেয়ে! তাহলে এই সুযোগটা হাতছাড়া করে কি লাভ বল তো? সো কাম! লেটস ডু সাম ওয়ার্কআউট।”
আকাশ ভেঙে পড়ল মাহি। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকাল মুগ্ধের পানে। গলায় স্বর নেই তার! নিঃশ্বাসটা বুঝি গলার কোথাও আঁটকে আছে ভীষণ। সপ্তদশী কাপাঁ কাঁপা কন্ঠে কেবল আওড়াল,
“ ক-কিসের ও-ওয়ার্কআউট?”

শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে একটুখানি হাসল মুগ্ধ। দাতেঁর সাহায্যে ঠোঁটের কোণ কামড়ে ধরে ইশারায় ইঙ্গিত করল মাহি’র নরম তুলতুলে অধরযুগলের পানে। শান্ত অথচ নিরেট কন্ঠে প্রতিত্তোরে বলল,
“ নো মোর ওয়ার্ডস, জাস্ট ফিল মা’ই টাচ। লেমমি শো ইউ্য — হাউ টু দিস।”
কথাটায় কি ছিলো কে জানে! একমুহূর্তের জন্য বুকে কাঁপন ধরে গেল মাহি’র। সর্বাঙ্গে বইতে লাগল মৃদু ঝংকার। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে কেমন! চোখদুটো নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে এখনো। এদিকে মুগ্ধ মহাশয়ের কি হলো আজ কে জানে। নিজের চিরচেনা খোলস ছেড়ে বেরুনোর কি বিশাল পায়তারা যুবকের। বাহাতের কনুইয়ের ওপর সম্পূর্ণ ভর দিয়ে মুখ নামিয়ে আনলো মাহির একদম মুখোমুখি। মাহি তৎক্ষনাৎ চোখমুখ খিঁচল। তা দেখে ফের বাঁকা হাসল মুগ্ধ। ডানহাতের শক্তপোক্ত আঙুল গুলো আলতো করে ছোঁয়ালো মাহি’র বাহাতের নরম ত্বকে। এহেন স্পর্শে কেঁপে ওঠে মাহি। এক অজানা ভয়ে পরক্ষনেই কেঁদে উঠে হাউমাউ করে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে অনুনয় জুড়ে বলে ওঠে,

“ প্লিজ এমনটা করবেন না! আমি.. ম’রে যাব।”
ক্রুর হাসির ছাপ দেখা গেল নির্দয় মানবের ঠোঁটের কোণে। একমুহূর্ত যেতে না যেতেই সে কেমন চট করে আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম গ্রীবা। কথা থামল মাহি’র, তবে গোঙানি বাড়ছে মেয়ের। সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ না দেখিয়ে মুখ এগিয়ে আনে মুগ্ধ। মাহি’র তুলতুলে ঠোঁটের দিকে এগোতে এগোতে হিসহিসিয়ে বলল,
“ মা’রতেই তো চাচ্ছি বান্দীর মেয়ে!”
কান্নার বেগ বাড়ল মাহি’র। চোখের কার্নিশ বেয়ে অবলীলায় গড়িয়ে পড়ছে নোনাজল। মুগ্ধ নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় এগোচ্ছে মাহি’র নরম গালের দিকে। সেথায় আলতো করে নাক ঘষতেই চিড়বিড়িয়ে ওঠে মাহি। গোঙানির শব্দ বেশ বাড়িয়ে নড়েচড়ে ওঠে বেচারি। মুগ্ধ ওতো তারাতাড়ি থামল না। মেয়েটার বা-গালে বারকয়েক নাক ঘষে দিয়ে অবশেষে থামল সে। ধীরেসুস্থে মুখ এগিয়ে আনলো মাহির মুখপানে। অতঃপর এক অদ্ভুত শান্ত কন্ঠে ডাকল সে,
“ চাশমিস!”

এক লহমায় জগৎ থমকাল সপ্তদশীর। বেয়াদব চোখদুটো আচমকা নিজেদের পর্দা সরিয়ে তাকাল সুদর্শন যুবকের মুখপানে। মুগ্ধ কেমন নির্লিপ্ত চোখে চেয়ে আছে। তার মুখখানা মাহি’র বড্ড নিকটে। মাহি’র নির্লজ্জ চোখদুটো আজ আবারও দিনদুনিয়া ভুলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল সম্মুখের নির্দয় মানবকে। লোকটা সে-কি ফর্সা! বড়সড় সুদর্শন মুখটার প্রতিটি নকশা যেন কোন নিখুঁত কারিগরের তৈরি। ঘনকালো ভ্রু-দ্বয় হালকা কুঁচকে আছে, ডান ভ্রু-য়ে ঝুলছে প্লাটিনাম রিং। নাক কি সুন্দর তীরের ফলার ন্যায় খাঁড়া। ধারালো চোয়ালে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির উপস্থিতি, ঠোঁটদুটো তামাকে পুড়ে বাদামী রঙে সেজেছে। নিচের ঠোঁটের বামপাশটাও পিয়ার্সিং করা। আশ্চর্য হলেও সত্যি , যুবকের ঠোঁট দুটো মারাত্মক আকর্ষণীয় ঠেকছে সপ্তদশীর কাছে। তার পুরো মুখ জুড়ে সে-কি মুগ্ধতা। যুবক বেশ টের পেল মেয়েটার মনোভাব। আচমকা ঠোঁট কামড়ে সপ্তদশীর কাঁদো কাঁদো মুখপানে তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে, দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ এতক্ষণ চোখ দিয়ে বন্যা বসিয়ে দিচ্ছিলি অথচ এখন কেমন নির্লজ্জ মেয়েছেলেদের মতো চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিস আমায়! ছ্যাহ! ছ্যাহ! বান্দীর মেয়ে।”
ঘোর ভাঙল মাহি’র। তৎক্ষনাৎ নিজের মুগ্ধ দৃষ্টি যুগল লুকতে ব্যস্ত হলো মেয়েটা। এদিকে মুগ্ধ মহাশয় ততক্ষণে মাহি’র ওপর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে। মুখাবয়ব থেকে এতক্ষণের নির্লিপ্ত ভাবস্রোত এক ঝটকায় সরিয়ে, সেথায় টেনেছে কঠিনতার ছাপ। অতঃপর দৃষ্টিতে একরাশ বিরক্তি লেপ্টে, দু’হাত পকেটে গুঁজে গটগটিয়ে দরজার দিকে এগোয় মনস্টার। গমগমে গলায় কেবল আওড়ে গেল,
“ চাল ওঠ বান্দীর মেয়ে! শরীর গরম হয়ে গেছে তোর। পা নড়ছে কিনা দেখ।”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই ফ্যালফ্যালিয়ে তাকায় মাহি। ছোট্ট মস্তিষ্কটা মনস্টারের ওমন মোটা কথার ঝাঁঝ ধরতে পারেনি তৎক্ষনাৎ। মনস্টার কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই হতবিহ্বলতায় বিছানা থেকে ওঠার প্রয়াস চালায় সপ্তদশী। আনমনে পা নাড়াতে গিয়ে টের পেল পা নড়ছে। পায়ে ওমন হুট করে সচলতা দেখে ভারী অবাক হলো সে। পাদু’টো না এতক্ষণ অবশ ছিল? তাহলে হুট করে পায়ে সচলতা ফিরল কি করে? সপ্তদশী মগজ খাটায় এপর্যায়ে। ভ্রু গুটিয়ে কিছু একটা ভাবতেই হঠাৎ কানে বাজল মনস্টারের বলে যাওয়া কথাটা —
“ শরীর গরম হয়েছে তোর!”

এতক্ষণে কথাটার ভাবার্থ বুঝতে পেরে লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানা। গালদুটোয় রঙ ধরেছে পাকাঁ টমেটোর ন্যায়। কানদুটো হুট করে ওতো গরম হয়ে উঠল কেন কে জানে! সপ্তদশী লজ্জায় গাল ফুলিয়ে বসে রইলো বিছানায়। নিজ কৃতকর্মে বড্ড ঘৃণা লাগছে তার। শেষে কি-না ঐ বিস্টটাকে ওমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল সে? মাহি নিজ ভাবনায় দাঁতে দাঁত চাপল। কিয়তক্ষন ঠায় বসে থাকতেই পায়ে স্পর্শ পেল নরম কিছুর। মাহি হকচকিয়ে তৎক্ষনাৎ ঘাড় নুইয়ে তাকায়। ওমনি দেখে তার পশমি খরগোশটা কেমন কুটকুট করছে তার পা ধরে। মুহুর্তেই মুখাবয়বে খানিক হাসির রেশ দেখা গেল মাহি’র। সে সামান্য ঝুঁকে এসে দু’হাতে তুলে নিলো খরগোশটাকে। আদুরে কায়দায় খরগোশের নাকের সাথে নিজের নাক ছুঁইয়ে মোটা কন্ঠে বলল,
“ তোমার আর আমার বড্ড মিল আছে জানো? তুমিও অসহায়, আমিও অসহায়। তোমার ওপর যেমন একদল হায়েনা এসে আক্রমণ চালিয়েছিল, আমার ওপরও যখন-তখন আক্রমণ চালায় হায়েনার মতো হিং*স্র একজন। তবে পার্থক্য হচ্ছে, তোমাকে বাঁচাতে আমি ছিলাম কিন্তু আমাকে বাঁচাতে কেউ আসেনি। কেউ বলতে কেউ না! না পরিবার, না পরিজন! অবশ্য কেউ এলে থোড়াই আমায় বাচাঁতে পারবে এ নরক থেকে, যে নরকের মালিক স্বয়ং মাফিয়া বিস্ট।”

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার যোগাড়। দুপুরের পর থেকে ঘন তুষারপাত হচ্ছে সেইন্ট পিটার্সবার্গের আকাশে। পেন্টহাউজের দ্য ক্রিমসন চেম্বার! বিশালাকার কক্ষটির চারপাশে সারিবদ্ধভাবে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র গার্ডস। কক্ষের একদম মাঝখানে দু’হাটুঁ গেড়েঁ বসিয়ে রাখা এক বন্দীকে। বন্দীর মুখমণ্ডল ঢেকে রাখা কালো কাপড়ে, হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। বন্দীর সারা শরীর কাঁপছে অনবরত। গলার স্বর হয়েছে মোটা! বেচারা হেঁচকি তুলতে তুলতে আওড়াচ্ছে,
“ আমি সত্যি কিছু করিনি। আমাকে টাকা দেওয়া হয়েছিল।”

অদূরের সম্মুখে থাকা সিংহাসনের ন্যায় চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে মাফিয়া মনস্টার। গায়ে তার চিরচেনা কালো রঙা ওভাররোভ। মাথায় বড়সড় গোল টুপি। সুদর্শন মুখখানা লুকিয়ে আছে টুপির ছত্রছায়ায়। ঠোঁটের কোণে গুঁজে রাখা জ্বলন্ত সিগার! মাঝেমধ্যে টান-টুন বসাচ্ছেন যুবক। আসনের একদম পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। সবার মতো তার মাথা অবশ্য নুইয়ে রাখা নয়। সে দু’হাত কোমরের পিঠে বেঁধে আরামে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা বড়ো গম্ভীর তার। এদিকে রয়েসয়ে ঠোঁটের ফাঁক থেকে সিগারটা সরিয়ে আনলেন মনস্টার। অতঃপর গম্ভীর অথচ রূঢ় কন্ঠে শুধালো,

“ ট্রাক এনেছিলি কার কথায়?”
কাঁপছে বন্দী ট্রাক ড্রাইভার। ভয়ার্ত ঢোক গিলে কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে,
“ সত্যি বলছি মনস্তার। আমি দেখিনি সে কে। পুরোটা সময় তার মুখে একটা ভূতুড়ে মাস্ক ছিল, আমায় সে ২৫০০০ রুবল দিয়েছিল তাই আমি….লোভে পড়ে..”

বাকিটা বলার সাহস হলোনা ড্রাইভার বেচারার। তার আগেই গলা ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো কান্নার প্রবল বেগ। বেচারা মনোকষ্টে হেঁচকি তুলে কাঁদছে কেমন। খানিকক্ষণ বাদে হুট করে কেউ একজন এসে আচমকা তার মুখমণ্ডল থেকে কালো কাপড়টা সরিয়ে দিলো একটানে। ড্রাইভার ভড়কায়! হকচকিয়ে সম্মুখে তাকাতেই দৃশ্যমান হলো কালো রঙা ওভাররোভ পরুয়া পাহাড়ের ন্যায় এক বলিষ্ঠদেহী পুরুষ। ড্রাইভারের নিশ্বাস আঁটকে গেল তৎক্ষনাৎ। বেচারা ফ্যালফ্যাল করে সম্মুখে তাকিয়ে থাকতেই হুট করে এক ধারালো কিছু এসে খচ করে ঢুকে গেল তার হৃৎপিণ্ড বরাবর। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকানোর সময় অব্ধি পাননি বেচারা। এক অদ্ভুত চিনচিনে ব্যথায় রয়েসয়ে ঘাড় নামিয়ে তাকালেন নিজ বুকে। ওমনি দেখলেন — ব্লেডের ন্যায় ধারালো এক ছু রি ক্রমশ ঢুকছে তার হৃৎপিণ্ডে। সম্মুখের বলিষ্ঠ পুরুষ একটু একটু করে ঠেলে দিচ্ছে তা। ড্রাইভার মুহুর্ত খানেক স্থবির রইলেন, পরক্ষণেই মারাত্মক যন্ত্রনায় এক বিকট চিৎকারে ফেটে পড়লেন তিনি। মাথাটা দু’ধারে ক্রমান্বয়ে নাড়িয়ে বুলি আওড়ালেন,
“ ম’রে যাচ্ছি! দয়া করুন, দয়া করুন মনস্তার।”

টুপির ছত্রছায়ায় লুকিয়ে থাকা মুখখানার কেমন অভিব্যক্তি ফুটেছে কে জানে। তবে পিয়ার্সিং করা ঠোঁটযুগলে ক্রুর হাসি ফুটেছে তা স্পষ্ট। সে তৎক্ষনাৎ এক ঝটকায় ড্রাইভারের বুক থেকে ছু রিটা বের করে এনে ফের খচ করে ঢুকিয়ে দিলো পুরোটা। সঙ্গে সঙ্গে ল হু তে ভিঁজে গেল বেচারা ড্রাইভারের দেহ। শরীরটা বড্ড ক্লান্তি এবং দূর্বলতায় মুষড়ে যাচ্ছে কেমন। এদিকে ক্ষিপ্ত মনস্টার ড্রাইভারের ওমন যন্ত্রণায় ক্রুর হেসে, কটমট করতে করতে আওড়ায়,
“ আমার কাছে ভুলের একমাত্র শাস্তি মৃ ত্যু বা স্টা র্ড! সো ভুল যেহেতু একবার করেছিস, শাস্তিতো পেতেই হবে। বাই দা হেল ইন দ্য মনস্টার’স ওয়ে — হেপি জার্নি।”

এহেন নৃ শং স তা য় কাঁপছে সবাই। মাথা নুইয়ে রাখা স্বত্বেও ভয়ে কাঠ সকলে। ওদিকে এডউইন কেমন নির্লিপ্ত চোখে চেয়ে আছে দেখো! যুবকের চোখেমুখে নেই তেমন উদ্যোগ, যেন এসব ঘটনা তার বহু দেখা। প্রায় মিনিট পাঁচেক ধরে এলোপাতাড়ি ছু রি -কা -ঘা ত করে লোকটার মৃ ত্যু নিশ্চিত করা মাত্রই থামলেন মনস্টার। তার শক্তপোক্ত হাতদুটো লহুতে কেমন মাখামাখি অবস্থা। সে সময় নিয়ে সটান হয়ে দাঁড়াল। শরীর ঘুরিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে আসতেই দু’জন গার্ড কেমন হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলেন তার নিকট। দু’জনেই একইসাথে একহাঁটু গেঁড়ে বসলেন মেঝেতে।মাথা নুইয়ে নিজেদের হাতদুটো উঁচিয়ে ধরলেন মনস্টারের নিকট। একজনের হাতে বিশাল এক ট্রে। সেথায় গামলা ভর্তি উষ্ণ পানি আর হ্যান্ডওয়াশ। আরেকজনের হাতে মোটা তোয়ালে। মনস্টার কঠিন মুখে হাতের র–ক্তা–ক্ত ছু রিটা আলগোছে রাখল ট্রের ওপর। পরক্ষণে নিজ হাতদুটো গামলাভর্তি আদ্র পানিতে ডুবিয়ে ঘষে ঘষে ধুঁতে লাগলেন কেমন। কাজ অব্যহত রেখে গুরুগম্ভীর কন্ঠে এডউইনকে জিজ্ঞেস করল,

“ ডিল কয়টায়?”
সটান হলেন এডউইন। তৎক্ষনাৎ কন্ঠে বিনীত ভাব ঢেলে আওড়াল,
“ ৮টায় মনস্তার।”
শুনল মনস্টার। মুখাবয়বে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না এনে আলতো করে মোটা তোয়ালে দিয়ে হাতদুটো মুছে নিলো কোনোরকম। অতঃপর নিরব ভূমিকা পালন করে সেখান থেকে সরে এসে কদম বাড়াল কক্ষের দরজার দিকে। গমগমে গলায় এডউইনকে আদেশ ছুড়ঁল,
“ চল!”
হুকুম তামিল করল এডউইন। তৎক্ষনাৎ হন্তদন্ত পায়ে হাঁটা ধরল মনস্টারের পিছুপিছু।

কঠিন চোয়ালে এগোচ্ছে মুগ্ধ। কানে এয়ারপড গুঁজে রেখে কথা বলছে কারো সাথে। ওপাশ থেকে যা-ই বলছে তার প্রতিত্তোরে তার কেবল হু নামক ছোট উত্তর। পেছনে সাগরেদ এডউইনও এগোচ্ছে একইসাথে। প্রশস্ত করিডর দিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে হাঁটছে দু’জন। কিছুটা পথ এগোতেই হুট করে গরম হলেন মনস্টার। লাইনে থাকা ওপাশের ব্যক্তিকে কেমন হুংকার ছুঁড়ে বলে উঠল,
“ আঁটকে রাখ ঐ বা’স্টার্ডকে! টেল হিম হিজ ড্যাড ইজ অন দা ওয়ে!”
এহেন ধমকে হকচকায় এডউইন। মনস্টার আবার কার ওপর গরম হলো কে জানে! বেচারা কাচুমাচু ভাব নিয়ে কয়েক কদম দুরত্ব বজায় রেখে এগোচ্ছে এবার। পাছে না মনস্টার আবার রাগের চোটে তাকেই শ্যুট করে বসে। মনস্টার মহাশয় দাঁত কিড়মিড় করতে করতে মাহি’র ঘরের পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। তবে মেয়েটার ঘর থেকে ভেসে আসা এক অদ্ভুত মোহনীয় কন্ঠে হুট করে থমকাল তার পদযুগল,
“ আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি.?”
থমকায় নির্দয় মানব। মুখাবয়ব থেকে এতক্ষণের কঠোর ভাবটা কেমন তড়িৎ বেগে ছুটে পালালো কোথায়। সে নিরবে দু-কদম পিছিয়ে এসে দাঁড়াল মেয়েটার কক্ষের দরজায়। স্লাইডিং দরজাটা একটুখানি ফাঁক হয়ে আছে, তা দিয়েই বোধহয় শোনাচ্ছে ওমন মোহনীয় কন্ঠ! মুগ্ধ কেমন ঠায় দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে। কানখাড়াঁ করে শুনতে লাগল ওমন সুরেলা কণ্ঠ!
এদিকে মাহি কেমন খিলখিলিয়ে হাসছে তার খরগোশকে কোলে নিয়ে। পশমি আদুরে ছানার গায়ে খানিক হাত বুলিয়ে ফের বলে,

“ আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি?
বলবে কে আর এমন করে…ভালোবাসি!”
বুক কাঁপছে দুরুদুরু! এই প্রথম নির্দয় মনস্টারের বুকের খাঁচায় লুকায়িত অঙ্গটা বুঝি নৃত্য তুলতে ব্যস্ত হলো। তার কানদুটোয় মিলছে অদ্ভুত স্বস্তি। সর্বাঙ্গ জুড়ে অসারতা ছেয়ে গেছে ব্যস্ত যুবকের। গুরুগম্ভীর মুখখানায় দেখা মিলেছে মুগ্ধতার রেশ! মনস্টারের গোটানো ললাটখানা শিথিল হচ্ছে ক্রমশ। দরজার বাইরে এতক্ষণ যাবত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানব এবার খানিকটা আঙুল ঢোকালো দরজার ফাঁকে। পরক্ষণে নিঃশব্দে দরজাটা সামান্য খুলে যেতেই, দরজার পাশে কনুই ঠেকিয়ে দাঁড়ালেন কেমন। সরু চোখে ঘরের দিকে তাকালেন পরক্ষণে। মোমবাতির নরম আলোর এক নৈসর্গিক আবহে মুদে আছে কক্ষ! অদূরের স্বচ্ছ কাঁচের মেঝেতে হাঁটু ভেঙে বসে আছে সপ্তদশী। দু’হাতে তুলে রেখেছে তার আদুরে সখাকে। খিলখিলিয়ে হাসছে সে, পশমি সখার গায়ে খানিকটা নাক বুলিয়ে ফের সুর তুললো কোকিলা কন্ঠে।

❝ ~ আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি?
বলবে কে আর এমন করে? ভালোবাসি!❞
নির্দয় মানবের বুকটা হঠাৎ মোচড়ে উঠল কেমন! সে তৎক্ষনাৎ মেজাজ খিঁচে চেপে ধরে নিজ বুকের বাঁপাশ। এই বেয়াদব অঙ্গটা আজ ওমন জ্বালাচ্ছে কেন তাকে। তার অনুমতি ছাড়া কেমন হুটহাট মোচড়াচ্ছে দেখো! তার সাধ্যিতে থাকলে সে এক্ষুণি বেয়াদব অঙ্গটাকে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলত, তবে তা থোড়াই হয়! ওদিকে কানে গুঁজে রাখা এয়ারপোডে অনবরত ডাকছে কেউ। এহেন কান্ডে মনস্টার বুঝি বড্ড বিরক্ত হলেন নিজ মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। সে কেমন দাঁত খিঁচে চাপা স্বরে দিলো এক ধমক!
“ শাট আপ ইউ্য বা’স্টার্ড!”
বলেই কান থেকে এয়ারপোডটা একটানে খুলে নিয়ে অদূরে ছুঁড়ে ফেলল মনস্টার। দৃষ্টি তার ঠায় মেয়েটাতে নিবদ্ধ। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এডউইন বেচারা ভয়ে ভয়ে ঢোক গিলছে কেমন। একবার উদ্যোত হয়েছিল মনস্টারকে ডাকতে। তবে মনস্টারের এহেন ধমকে গলার কাছে স্বর এসেই থমকে গেল তার। সে এবার কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখল। সময় খুব বেশি নেই তো, ঘড়ির কাঁটা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে — ৭টা বেজে ২০ মিনিট। এমুহূর্তে গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে না বেরুলো সময়মত পৌঁছান দুষ্কর। এডউইন ফাপাঁ ঢোক গিলল সামান্য। সময় নিয়ে চাপা স্বরে থেমে থেমে বলল,

“ ম-মন- মনস্তার! উই আর গেটিং লেট!”
কথাটা আদৌও শুনলেন মনস্টার? তার মুখাবয়ব দেখে তো তা বোঝার জো নেই। এডউইন খানিক দোটানায় পড়ল। সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে ফের ডাকল মনস্টারকে,
“ মনস্টার! ডিল ফাইনাল করতে.. ”
কথাটা কেবল জিভ খসেছে আর ওমনি সম্মুখ থেকে ভেসে এলো মনস্টারের কড়া কন্ঠধ্বনি!
“ ক্যানসেল ইট!”
ভড়কায় এডউইন! ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় সম্মুখে। ছেলেটার চোখেমুখে সে-কি হতবাকতা। ভাবখানা ধরেছে এমন — এই বুঝি আকাশ ভেঙে টপকালো সে। নিজ কানকে বিশ্বাস করল না এডউইন। অবিশ্বাস্যে তড়িঘড়ি করে বা-হাতের তর্জনী ঢোকালো কানের সরু ছিদ্রে। সেথায় আঙুলখানা খানিকক্ষণ নাড়িয়ে চাড়িয়ে,চোখ খিঁচে ফের মিনমিনিয়ে আওড়াল,

“ ক-কি?”
এবার আর প্রতিত্তোর করেনি মনস্টার। নিখাঁদ চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। তার এখন দিনদুনিয়ার খেয়াল আছে থোড়াই আছে! মনস্টারের এহেন ভাবসাব দেখে মুখাবয়বে অস্থির ছাপ ফোটালো এডউইন। খানিকক্ষণ দোনোমোনো করে নতমস্তকে ফের জানালো,
“ বাট মনস্তার! দ্য ডিল ইজ এবাউট ফাইভ থাউজ্যান্ড মিলিয়ন ডলারস।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই সম্মুখ থেকে ধেয়ে এলো এক হিংস্র থাবা। যার আক্রমণ গিয়ে পড়ল এডউইনের কন্ঠায়। বেচারা এডউইন হকচকিয়েছে বেশ। নজর ঝুঁকিয়ে রাখতেই কর্ণকুহরে পৌঁছাল মনস্টারের দাঁত কিড়মিড় কন্ঠ!
“ আই সেইড, জাস্ট বাজ অফ দ্যাট ফা’কিং ডিল। আ’ম বিজি নাউ!”
এক ঝটকায় এডউইনের কন্ঠা ছাড়ল মুগ্ধ। ফের মনোযোগ নিবেদন করল মেয়েটাতে। ভেতরে মাহি গান গাইছে। কি মোহনীয় তার কন্ঠ! যে কন্ঠ চোখবুঁজে শুনছে মুগ্ধ। যুবকের মুখাবয়বে সে-কি প্রশান্তির ছাপ! ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বিড়বিড়িয়ে আওড়াচ্ছে,
“ এই কন্ঠ! খুব চেনা, ঠিক শ্যামৌপ্তি দেবীর মত!”
মুগ্ধ আজ নিজ মুগ্ধতায় ডুবে আছে। মাহি’র সুরেলা কণ্ঠে সে খুঁজে পেয়েছে তার বহু পরিচিত মানুষটাকে। যুবক একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করতে উদ্যোত হতেই মাহি’র হাসিমাখা কন্ঠ শুনল! মেয়েটা তার খরগোশকে বলছে,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৯ (২)

“ আজকে থেকে তুমি আমার কিউটি! বলো তোমার নাম কি? কিউটি! আর আমার নাম — মাহিরা এহসান।”
❝ মাহিরা এহসান❞ নামটুকু শুনতেই যুবকের এতক্ষণের মুগ্ধতার ডোর হুট করে ছিঁড়ে গেল কেমন। মানসপটে আচানক ভেসে উঠল অতীতের তীক্ত স্মৃতি! সেই নববধূবেশী শবদেহ! আলতা রাঙা পদযুগল। তৎক্ষনাৎ শরীর ঝাঁকিয়ে ওঠে মুগ্ধের। পাদু’টো সরে এলো আগের জায়গায়। মসৃণ ললাটের রগগুলো ফুটে উঠল আচমকা। চোয়ালের পেশি টানটান হলো কেমন! চোখদুটোয় হঠাৎ জ্বলে উঠল আগুন। দাঁতকপাটির কটমট বাড়ল ক্রমশ। চোখেমুখে ছেয়ে গেল মেয়েটার প্রতি থাকা একরাশ ঘৃণা। সে নিরবে কদম পেছালো। প্রশস্ত করিডর দিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে চিবিয়ে চিবিয়ে আওড়াল,
“ মাহিরা এহসান! দ্য ডটার অফ দ্যাট ফা’কিং রেপিস্ট এন্ড মার্ডারার।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩১

3 COMMENTS

  1. প্লিজ এটা পর্ব দিয়েন ৩১ নাম্বার ৩২ নাম্বার পর্ব প্লিজ 😭😭😭😭😭👏👏👏👏

Comments are closed.