Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪০

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪০

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪০
jannatul firdaus mithila

অতীতঃ-
“ হু আর ইউ্য পিচ্চি?”
প্রপাত কুন্ডের স্বচ্ছ জলরাশীর অভ্যন্তরে শরীর ডুবে আছে মুখোশধারী অচেনা মানবের। ইস্পাত-দৃঢ় প্রশস্ত বক্ষ বরাবর পেঁজা তুলোর ন্যায় লুটিয়ে আছে নিস্তেজ কিশোরী। সফেদ রঙা ফুল মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা যুবকের বাদামী চোখদুটো কেমন কুঁচকে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। কঠিন মুখাবয়বে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট যুবকের। খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে আবৃত চোয়ালখানা ফুটে উঠেছে তীক্ষ্ণ ব্লেডের ন্যায়। মসৃণ ললাটের চামড়া সংকুচিত, ভ্রুযুগলের মধ্যকার ফারাকে দেখা দিয়েছে তিতিবিরক্তিতার ভাঁজ। যুবকের দাঁতকপাটি একে-অপরের সনে রুষ্ট চাপে মত্ত। তুলছে কটমট শব্দ! জলরাশীর অভ্যন্তরে দোদুল্যমান শরীরখানা কোনমতে স্থির রেখে, একহাতে নিজ বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে আছে অচেতন কিশোরীকে। অন্যহাতে সাঁতরাচ্ছে সে।দক্ষ সাঁতারুর কায়দায় অবশেষে গা ভাসিয়ে চলে আসে তীরে। যুবক বড়ো নির্দয়! নিজ চিরচেনা খোলসে আবির্ভূত হতে খুব একটা সময় লাগেনি তার।

একহাতের জোর দেখিয়ে তক্ষুনি অচেতন কিশোরীর নিস্তেজ দেহটাকে তুলে এনে রাখল একখানা বিশালকার পাথরের ওপর। কিশোরীর হুঁশ নেই! না আছে নিশ্বাসের গতি। যুবক কপাল গোছালো তক্ষুনি। সরু দৃষ্টে কিশোরীর পানে তাকাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো — সিক্ত নারী কায়ার পানে। কিশোরীর পরনে একখানা ধূসর রঙা কুর্তি, সঙ্গে পরেছে জিন্স! গলায় গোল হয়ে ঝুলে আছে একখানা সফেদ রঙা স্কার্ফ। ভেজা কাপড়গুলো কেমন আঁটসাঁট হয়ে আঁটকে আছে কিশোরীর সিক্ত দেহে। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে লাফ দেবার এক অভিন্ন প্রয়াসে মত্ত কিশোরীর সিক্ত দেহ। যুবক তক্ষুনি গোটানো ললাটে নজর ঘোরায় অন্যত্র। পরক্ষণে একহাতে গা থেকে হুডিটা একটানে খুলে এনে আলগোছে ছড়িয়ে দিলো কিশোরীর নিস্তেজ দেহে। অতঃপর সময় নিয়ে ঘাড় সোজা করল অচেনা যুবক। মসৃণ ললাটে গোটাকতক ক্ষোভের ভাঁজ ফেলে, ডানহাতটা এগিয়ে নিলো অচেতন কিশোরীর গৌরবর্ণা বা-গালের পানে। মেয়েটার মসৃণ ফর্সা কপোলে নিজ রুক্ষ আঙুলের একের পর এক রুষ্ট চাপড় বসিয়ে, যুবক কেমন চিড়বিড়িয়ে আওড়াল,

“ এ্যাই পিচ্চি এ্যাই! চোখ খোল! চোখ খোল বলছি। আগে আগে ম’রতে হবে না। আমি তোকে নিজ হাতে মা’রব, ওঠ পিচ্চি! উঠে বল তুই কি কি দেখেছিস।”
নিস্তেজ কিশোরী কি আর কথা কয়? তবুও যুবক নাছোড়বান্দা! শক্ত হাতের রুষ্ট স্পর্শে পিষ্ট করে নেয় কিশোরীর তুলতুলে কপোলখানা। যুবকের হাতদুটো বড়ো শক্ত! আলতো করে চাপড় বসালেও তা বোধহয় লেগেছে বড্ড জোরালো ভাবে। তাইতো ঘুমন্ত কিশোরীর গালখানা রঙ ধরেছে টমেটোর ন্যায়। গোলাপি আভায় ছেয়ে থাকা অধরযুগল ক্রমশঃ ফ্যাকাশে হচ্ছে! যুবক থামল এবার। শক্ত হাতখানা রয়েসয়ে গুটিয়ে নিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টে তাকাল মাহি’র মুখপানে। মুহুর্তেই থমকায় যুবক! বাদামী চোখদুটোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রঙ পাল্টে ডুব দিলো গভীরতায়। সেথায় এবার আকস্মিকভাবে ভর করল এক ছটাক মায়া। মেয়েটা একটা পিচ্চি! সে আদৌও বেঁচে আছে তো? বিচক্ষণী মস্তিষ্কের এহেন সচল প্রশ্নে খানিকটা উদ্বেগ জন্মালো যুবকের মনে। সে তড়িঘড়ি করে হাত এগিয়ে নিলো কিশোরীর নাকের পাটার সম্মুখে। সেথায় দু-আঙুল ছড়িয়ে বুঝতে চাইল — কিশোরী নিশ্বাস ফেলছে কি-না। তবে বালাইষাট! বেচারির নিশ্বাসের গতি নেই। যুবক তক্ষুনি অন্যহাতে চেপে ধরল মাহি’র ডানহাতের কব্জিসন্ধি। দু-আঙুল কব্জির শিরা বরাবর কিয়তক্ষন দাবিয়ে রেখে যেই দেখল কিশোরীর পালস রেট বড্ড ক্ষীণ ওমনি যুবক কেমন বাঁকা চোখে তাকাল মেয়েটার মুখপানে। চোখেমুখে একপ্রকার অসন্তোষের ছাপ ফুটিয়ে খিটখিটে কন্ঠে শুধালো,

“ এ দেখি কৈ মাছের প্রাণ! এতক্ষণ পানি খেয়েও ম’রেনি! বাট নো প্রবলেম, আমি আছি কি করতে?”
বলেই নির্দয় মানব সহসা ছেড়ে দিলো মাহি’র কব্জিসন্ধি। শক্ত হাতদুটো তার পরক্ষণেই এগিয়ে গেল কিশোরীর কন্ঠার পানে। গলায় ঝুলে থাকা স্কার্ফের ওপর দিয়েই আচানক চেপে ধরল নিস্তেজ মাহি’র কন্ঠনালী। সে-কি জোর যুবকের হাতে! ধীরে ধীরে কন্ঠা বরাবর চাপ বাড়তেই কিশোরীর নিস্তেজ দেহটা খানিক দুলে উঠল মনে হচ্ছে! প্রদীপের শেষ বাতিটুকু যেমন ধড়ফড়িয়ে উঠে শেষকালে ঠিক সেভাবেই ধড়ফড়াচ্ছে কিশোরীর ছোট্ট বদন। নির্দয় মানবের মুখাবয়বে মায়ার লেশমাত্রও নেই! আছে কেবল একরাশ ক্রুরতা। ক্রুরতায় মুদে থাকা তার বাদামী চোখদুটো আচমকাই কিশোরীর মুখপানে নিবদ্ধ হলো। মাহি’র মায়াবী চোখদুটো রঙ হারাচ্ছে! কোনো এক দক্ষ শিল্পীর হাতে আকাঁ অপরুপ গঠনের তুলতুলে ঠোঁটদুটো জরাজীর্ণতায় ডুব দিতে চাচ্ছে! সরু নাকের ডগাটা রঙ ধরেছে লাল টুকটুক। মাংসের অভাবে মুদে থাকা গালদুটোয় ছেয়ে গিয়েছে লালিমা। ফর্সা মসৃণ ললাটের এককোণে লেপ্টে আছে একগোছা ভেজা চুল। ডান চোখের ভ্রুয়ের কাছে জ্বলজ্বল করছে লাল রঙা তিলটা! মুহূর্তেই যুবকের বুকখানা এক অজানা কারণে মোচড়ে উঠল কেন যেন! অদ্ভুতভাবে বিশালাকার বলিষ্ঠ দেহখানা সহসাই নিজেদের ভর হারিয়ে ফেলল। মস্তিষ্ক হয়ে গেল ফাঁকা! অচেনা মানবের শক্ত হাতদুটো হতবিহ্বলতায় আলগা হলো খানিক। সে হতভম্বতায় ডুবেছে! তার বুকটা কেমন মোচড়াচ্ছে দেখো! যন্ত্রনায় ধড়াস ধড়াস শব্দ তুলছে হৃৎপিণ্ড। দেহে হুটহাট এহেন পরিবর্তনে হতবাক যুবক, তৎক্ষনাৎ হতভম্বতায় ছিটকে পড়ল পেছনে। একহাতে শক্ত করে চেপে ধরল বুকের বাঁপাশ! উদ্দেশ্য ছিলো ধড়াস ধড়াস শব্দ তোলা অবাধ্য হৃৎপিণ্ডটাকে একটানে দেহ থেকে খুলে আনতে, তবে সুযোগের অভাবে আপাতত সে ইচ্ছেয় জল পড়ল মানবের। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে স্রেফ নিজেকে প্রশ্ন ছুড়ঁল —

“ হোয়াট দ্য হেল ইজ রং উইথ মি? ফা’ক! এমন লাগছে কেনো?”
আপনমনে উত্থাপিত এরূপ প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখনো পায়নি যুবক। তার মনটা বড়ো অস্থির হচ্ছে! বারবার চাইছে মেয়েটাকে বাঁচাতে। তবে যার হাতে এপর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে সহস্রাধিক মানুষ, সে কি করে একটা পিচ্চিকে বাঁচাবে? একি আদৌও তার শানের সঙ্গে যায়? যুবক টালমাটাল! দ্বিধাগ্রস্ত মনে অবশেষে আলগোছে ঝুঁকে এলো কিশোরীর পানে। সময় পেরিয়েছে বেশ। মেয়েটার বেঁচে থাকা নিয়ে রয়েছে একরাশ সন্দিগ্ধতা! তবুও যুবক শেষ প্রয়াস চালালো। তড়িঘড়ি করে দু’হাতে শক্ত করে ভর দিলো কিশোরীর নরম তুলতুলে উদরে। এক-দুবার চাপ দিয়েও লাভের লাভ হলো না। যুবক বুঝল —মেয়েটাকে ইমার্জেন্সি সিপিআর দেয়া জরুরী। কিন্তু সেটা দিবে কে? অচেনা মানব ত্বরিত গতিতে ঘাড় ঘোরায় এদিক-ওদিক। হন্যে দৃষ্টে খুঁজতে থাকে একটি উপকারী প্রাণকে। তবে কান্ড দেখো! উল্টো পাহাড়ের প্রপাতকুন্ডে অবস্থান করায় আশেপাশে একটি কাকপক্ষীও নেই। যুবক এবার অসহায়!

শেষমেশ কোনরূপ উপায়ন্তর না পেয়ে একটানে নিজের মুখাবয়ব উম্মুক্ত করল সফেদ রঙা ফুল মাস্কের আড়াল হতে। মুহুর্তেই দৃশ্যমান হলো ভিনদেশী এক সুদর্শন! বাদামী চোখদুটো যেন এক ঘনজঙ্গল, দৃষ্টি হার মানাবে বাজপাখিকে। শক্ত চোয়ালে তেজী ভাব স্পষ্ট! উন্নত নাসারন্ধ্র ছাপ ফুটিয়েছে ব্রিটিশি। তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটযুগলের নিম্নাংশে ঝুলছে প্লাটিনাম রিঙ। বা-দিকের আইভ্রোতেও একই কাজ দৃশ্যমান। যুবক ধীরে ধীরে নিস্তেজ কিশোরীর মুখপানে ঝুঁকিয়ে আনে নিজ মুখ। এই প্রথম! হ্যাঁ ঠিক এই প্রথম কোনো মেয়ে জাতিকে নিজ অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্পর্শ করতে যাচ্ছে যুবক। এ যেন এক মহাপ্রলয়! তার রুক্ষ বাদামী ঠোঁটজোড়া প্রায় ছুঁই ছুঁই কিশোরীর ফ্যাকাশে অধরযুগল। ধীরে ধীরে দুরত্ব মিটছে তাদের! সেই সঙ্গে যুবকের বুকের কোনো এক অচিন জায়গায় বয়ে চলেছে ঝড়! এক অদ্ভুত প্রলয়ঙ্কারী ঝড়! যে ঝড়ের তীব্রতায় কাঁপছে রূঢ় মানবের রুক্ষ অধরযুগল।

যুবক তক্ষুনি কুঁচকে নিলো নিজ চোখ। অতঃপর এক ঝটকায় ওষ্ঠপুট ছোঁয়ালো নিস্তেজ কিশোরীর তুলতুলে অধরযুগলের সনে। মুহুর্তেই যুবকের মেরুদণ্ডের উন্নত হাড়জুড়েঁ নেমে গেল এক শীতল স্রোতের প্রবাহ। বুকের ধড়াস ধড়াস শব্দ বেড়ে গেল বহুগুণ! বেয়াদব মনটা চাইছে অন্যকিছু! তবুও যুবক বিচক্ষণী মানুষ। ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে শ্বাস আদান-প্রদানে মত্ত হলে নিস্তেজিনীর সঙ্গে। গাল ফুলিয়ে নিশ্বাস দিচ্ছে যুবক! বেশ ক’বার নিশ্বাস দিয়ে অধর ছাড়িয়েছে পরক্ষণে। উদ্বেগী সত্তায় ফের কিশোরীর পেটে ভর দিয়ে পানি বের করার প্রয়াসে জুড়ল। একই কান্ড পুনরাবৃত্তি ঘটল তিন-তিনবার! অবশেষে শেষবার কিশোরীর পেটে ভর দিতেই মুখ ভরে পানি বেরুলো কিশোরীর পেট থেকে। খুকখুক কাশিতে মত্ত হলো পরক্ষণেই! যুবক এতক্ষণে স্বস্তি পেলো বোধহয়। কেমন স্বস্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেয়েটার পানে। মাহি চোখ খোলেনি, দূর্বলতায় অসারতা নামলো তার সম্পূর্ণ বদনে। এবার বুঝি মেয়েটা জ্ঞান ফিরে পেয়ে ডুব দিয়েছে ঘুমের রাজ্যে। নাক দিয়ে টানছে ফোঁস ফোঁস নিশ্বাস! যুবক কেমন গভীর অবলোকন করে যাচ্ছে মেয়েটাকে। আশ্চর্য! একটা পিচ্চিকে দেখতে এতো শান্তি পাওয়ার কি আছে?

জলপ্রপাতের পাহাড়খানার ঠিক উল্টোপাশে ঘনজঙ্গল। স্থানীয়রা ভয়ে কদম রাখেনা সেথায়! পর্যটকদের যেথায় প্রবেশ নিষিদ্ধ। ঠিক এমন একটা দূর্গম জায়গায় খুঁটি গেঁড়েছে অচেনা মানব! তাঁবু টানিয়েছে নিজের। প্রকৃতিতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে বেশ আগে! অচেনা মানবের দক্ষ পদযুগল এগোচ্ছে তাঁবুর পানে। হাতে তার একখানা জ্বলন্ত মশাল! প্রশস্ত কাঁধে ঝুলছে ঘুমন্ত মাহি। মেয়েটার নরম-সরম কব্জিসন্ধি দু’টো আঁটকে আছে পরনের সফেদ রঙা স্কার্ফের অবাধ গিঁটে। যুবক হাঁটছে! মাথার ওপর আকাশ ডাকছে! বোধহয় যেকোনো সময় আকাশভাগ চিঁড়ে নেমে আসবে বারিধারা। অথচ যুবক নির্বিকার! গটগট পায়ে চলে আসে তাঁবুর কাছে। হাতে থাকা মশালটা তাঁবুর বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে, সে আলগোছে ঢুকল ভেতরে। মাঝারি আকারের তাঁবুটায় একখানা রোল মেট্রেস! বিছিয়ে রাখা আগে থেকেই। যুবক সেদিকে এগিয়ে এসে আলগোছে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিলো ঘুমন্ত মাহি’কে। সম্পূর্ণ তাঁবুখানায় আপাতত রাজ্যের আঁধার বিরাজমান। অচেনা মানব ত্বরিত গতিতে বাইরে থেকে মশালটা নিয়ে এসে পা রাখল ভেতরে। মশালের উত্তপ্ত আগুনের লেলিহান শিখায় আলোকিত হলো তাঁবুর ভেতরাংশ। সে আলোর ঝলকানিতে তকতক করে উঠল ঘুমন্ত মাহি’র নিষ্পাপ মুখশ্রী।

যুবক নিরবে এগিয়ে এসে বসল মাহি’র মাথার কাছে। চোখদুটোতে এক পশলা আবেগ জমেছে তার! যে আবেগের নাম যুবকের নিজের কাছেও অজানা। মুখখানায় লেপ্টেছে ভিন্ন প্রশান্তির ছাপ। মানব আলগোছে নিজের বাঁহাতটা বাড়িয়ে দিয়ে উম্মুক্ত করতে লাগল মাহি’র আবদ্ধ হাতদুটো। নরম-সরম হাতদুটো স্কার্ফের বাঁধন ছাড়া হতেই তারা কেমন গড়িয়ে পড়ল দুপাশে। যুবক ক্ষীণ হাসল বোধহয়! যে হাসি ঠোঁটের বদলে ফুটল সুদর্শনের বাদামী চোখদুটোতে। সে কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। তার অবাধ্য বাঁহাতখানা ইতোমধ্যেই এগিয়ে গিয়েছে কিশোরীর মসৃণ ললাটে। তার বাঁহাতের তর্জনী আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে মাহি’র ললাট, সরিয়ে দিচ্ছে সেথায় এসে ভীড় জমানো অবাধ্য চুলগুলোকে। যুবকের মুখাবয়ব বড়ো শান্ত! ঘাড়টা সামান্য হেলে আছে ডানদিকে। সে কেমন অদ্ভুত আধিপত্য ভরা কন্ঠে বিড়বিড় করে আওড়াল,

“ অনিচ্ছা সত্ত্বেও দ্য রুশদী কিংয়ের অভিশপ্ত ছোঁয়ায় রেঙেছো তুমি পিচ্চি! আজ থেকে তুমি তবে আমার হলে। কারণ — আমি আমার ছোঁয়া লাগা কিছুতে অন্য কারোর স্পর্শ সহ্য করিনা! হোক সে “ কিছু” আমার পছন্দের কিংবা অপছন্দের! যেটায় আমার স্পর্শ লেগেছে, তা আমরণ কেবল আমারই থাকবে।”
থামল রুশদী কিং ওরফে শ্যাডো মনস্টার। মেয়েটার মুখপানে নিবদ্ধ থাকা গভীর দৃষ্টিযুগল ধীরে ধীরে নেমে এলো বিছানার পাশে, যেথায় অবহেলায় পড়ে আছে সফেদ রঙা স্কার্ফটা। তা দেখামাত্রই বাঁকা হাসল মনস্টার। তক্ষুনি একহাতে স্কার্ফটা তুলে আলগোছে পেঁচিয়ে নিলো নিজ গলায়। অতঃপর সটানভাবে দাঁড়াল সে। মেয়েটার পানে একপলক দৃষ্টি ফেলে পরক্ষণেই হাঁটা ধরল বাইরে।

ঝুম বৃষ্টিতে কুপোকাত ধরণী! টলটলে পানিতে থৈথৈ করছে চারপাশ। তাঁবুর ঠিক পেছনে বসে আছে নির্দয় মাফিয়া মনস্টার। গায়ে পূর্বের কালো রঙা হুডি, মুখে সফেদ রঙা ফুল মাস্ক! গলায় পেচিয়ে রাখা কিশোরীর চিহ্ন। একহাতের রুক্ষ মুঠোয় চেপে আছে একখানা ধারালো চা কু। ধারালো অস্ত্রের গা থেকে চুইয়ে পড়ছে লোহু! বৃষ্টির ফোঁটা ধুয়ে দিচ্ছে তার গা। সামনেই পড়ে আছে এক মধ্যবয়স্কের বিচ্ছিন্ন ম স্ত ক। সদ্য বিচ্ছিন্ন হয়েছে বলে লোহু রং বড্ড গাঢ়। যুবক নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় ঘাড় ফোঁটাচ্ছে! ফর্সা পদযুগলের রুক্ষ পদতল ডুবিয়ে রেখেছে লোহুর গায়ে। মানসিক শান্তি বড়ো প্রয়োজন তার! এসব না করলে কি আর চলে? যুবক রয়েসয়ে সম্মুখের বিচ্ছিন্ন ম স্ত কের তালুর চুলগুলো চেপে ধরে উঠে দাঁড়ায়। দাম্ভিক কদমজোড়া উল্টোপথে বাড়িয়ে আচানক ঘাড়ের পেশি কুঁচকে মুখ তুলে তাকায় আকাশপটে। সেথায় সে কি দেখছে কে জানে! তবে এরইমধ্যে সে গান ধরল! এক দক্ষ কন্ঠের করুণ সুরে গাইতে লাগল,

“ যে পথে এগিয়েছে পা!
সেও আমায় চেনে না।
আমিতো ফিরে যেতে চাই,
আমাকে ফিরিয়ে নাও।”
কিশোরীর তন্দ্রার ঘোর ভেঙেছে বহুক্ষণ আগে। অন্ধকারাচ্ছন্ন অচেনা জায়গায় নিজেকে আবিষ্কার করে এমনিতেই ভয়ে তটস্থ বেচারি, তন্মধ্যে ওমন করুণ সুর! ভয়ার্ত মাহি তৎক্ষনাৎ পা বাড়ালো অন্ধকারে। হাতড়ে হাতড়ে কোনমতে বেরিয়ে গেল অন্ধকারাচ্ছন্ন তাঁবুর মধ্য থেকে। ঝুমবৃষ্টি মাথায় নিয়েই বোকা মানবী পা ঘোরালো শব্দের উৎসের পানে। শঙ্কিত মনে দু-কদম এগিয়ে এসে যেই না উঁকি দিলো তাঁবুর পেছনে, আর ওমনি মেয়েটা কেমন স্তব্ধ বনে গেল ভয়ে। অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে এক রহস্যময় মানব, দেখা যাচ্ছে তার একাংশ! তবে ভয়ার্ত মাহির দৃষ্টি গিয়ে থমকাল যুবকের হাতের দিকে। গোলাকার বল জাতীয় কিছু একটা। অন্ধকারে স্পষ্ট নয় তা। মাহি দৃষ্টি ক্ষীণ করল। ঠিক তখনি আকাশভাগে দেখা গেল বিদ্যুৎ ঝলকানি! সে ঝলকানির মৃদু আলোয় স্পষ্ট হলো যুবকের নৃ শং স তা। ভয়ে নিশ্বাস আঁটকে গেল মাহি’র। কাঁপা কাঁপা বদনে পিছু সরতে গেলেই আচানক ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকায় রূঢ় মানব। তক্ষুনি মেয়েটার পানে নিবদ্ধ হলো তার ক্রুর দৃষ্টি। মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাদামী ঠোঁটের কোণে আচমকা ফোটালো এক চিলতে মুচকি হাসির রেশ। সে আলগোছে মাহি’র দিকে বাড়িয়ে দিলো এক হাত। ফের দক্ষ কন্ঠে গাইতে লাগল,

“ আমি যে কে তোমার, তুমি তা বুঝে নাও…!” (২)
যুবকের বাড়ন্ত হাত দৃষ্টিগোচর হওয়া মাত্রই ভয়ে সিটিয়ে গেল মাহি’র ক্ষুদ্র তনু। কাঁপা কাঁপা পদযুগলের হাঁটু কম্পিত! বৃষ্টির মাত্রাতিরিক্ত রুষ্টতায় দোদুল্যমান ক্ষুদ্র বদনখানি নিয়ে কিশোরী পেছালো কয়েক কদম। ওদিকে যুবক কেমন ঘাড় কাত করে তাকিয়ে আছে তার পানে। যেন সে দেখতে চাইছে মেয়েটার বাড়ন্ত সাহস! মাহি থামেনি। তক্ষুনি শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ছুট লাগালো পেছন পথে। এরইমধ্যে জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে আসছে একদল লোক। প্রত্যেকের মুখে কেবল একটাই ডাক —
“ মাহি! মাহি কোথায় তুমি?”
আতঙ্কে জর্জরিত ছোট্ট কিশোরী তক্ষুনি আওয়াজ তুলল কন্ঠায়! চেঁচিয়ে বলল,
“ আমি এখানে, এই যে আমি!”

কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির সাড়া পেয়ে তক্ষুনি ছুটে আসেন প্রত্যেকে। ঝড়-বৃষ্টি মাথা নিয়েই একযোগে এগিয়ে এলেন সবাই। ভয়ার্ত মাহিও ছুটল সে পথে। এক অদম্য মনোবলে দৌড়াচ্ছে মানবী, এর আগে এত শক্তি তার পদযুগলে কোনদিন ছিলো না। সে দূরদম্য গতিতে ছুটল! একটা সময় গিয়ে আছড়ে পড়ল অতি পরিচিত মেডামের বক্ষে। হাউমাউ করে কান্না জুড়ে নিজ ভয়গুলো জাহির করতে ব্যস্ত মানবী। এদিকে চিন্তিত মেডাম কেমন মরিয়া হলেন মেয়েটাকে শান্ত করতে। নিজ দুহাতে মেয়েটার পিঠে হাত বুলিয়ে আওড়ালেন,
“ তুমি এখানে কিভাবে এলে মাহি?”
কান্নার ক্রুরতা বাকরুদ্ধ মাহি। চোখমুখ খিঁচে রেখেছে তখন থেকে। তার কল্পনার মানসপটে এখনো ভাসছে নির্দয় মানবের নৃ শং স তা। কানে বাজছে ঐ করুণ সুর!
“ আমাকে ফিরিয়ে নাও….
আমি যে কে তোমার, তুমি তা বুঝে নাও….! ”
তক্ষুনি দু’হাতে নিজ কানদুটো চেপে ধরে মাহি। আর্তচিৎকারে মত্ত থেকে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে,
“ না! না, আমি শুনতে চাইনা ঐ কন্ঠ। উনাকে থামতে বলুন। আমার সহ্য হচ্ছে না এ গান, আমি ম’রে যাচ্ছি! আমার দমবন্ধ লাগছে। মা…..”

বর্তমানঃ-
এক বিকট চিৎকারে তক্ষুনি ঘুম ছুটল সপ্তদশীর। সর্বাঙ্গ কাঁপছে তার, ঘামছে দরদর করে। আতঙ্কে সিটিয়ে গিয়েছে তন-মন। কন্ঠায় নেমেছে বহু পুরনো খরা। সপ্তদশী এদিকওদিক নজর ঘোরালো। ভোরের আলো এখনো ফুটেনি, বাইরে হচ্ছে ঝুমবৃষ্টি! তারমানে? সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল? আবারও ঐ তিন বছর পুরনো অভিশপ্ত দিনটার কথা মনে পড়ল? শুকনো ঢোক গিলছে মাহি। হরিণী চোখদুটো ঝরাচ্ছে নিরব অশ্রু। মেয়েটা তৎক্ষনাৎ দু’হাতে আঁকড়ে ধরে নিজ কানদুটো। বুক ভাসিয়ে আওড়ায়,
“ আবার কেন শুরু হলো এসব? আর কতদিন ধরে চলবে এ অভিশাপ? আর কতগুলো রাত আমার এভাবে ভয়ে ভয়ে কাটাতে হবে? আর কতগুলো রাত? তিনটে বছরও কি কম ছিল?”

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল এক কক্ষ! ছোট খাটো খেলার মাঠ বললে জাত যাবে না অবশ্য। একজোড়া দাম্ভিক কদম মাত্রই ঢুকল কক্ষে। পায়ের গতিতে জোর নেই তার, যেন ফ্লোরকে কষ্ট না দেয়ার পায়তারায় মত্ত সে। দাম্ভিক কদমের মালিক এগোচ্ছে! দুয়ার থেকে কক্ষের অন্যপাশে যেতে লেগেছে পাক্কা মিনিট পাঁচেক। কক্ষে সাজিয়ে রাখা সব এন্টিক আসবাবপত্র। মাফিয়া হবার সুবাদে কতকিছুই যে জনাব হাসিল করেছে তার আর ইয়ত্তা নেই। যুবক নিরবে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো কক্ষের ডানপাশের দেয়ালের সম্মুখে। সম্পূর্ণ কাঁচের তৈরী দেয়ালখানা, যার সামনে বেশ কয়েকটা বিশাল মাপের বুক শেলফ। যুবক হাত বাড়িয়ে বুকশেলফের তিন নম্বর সারির দু নম্বর কলমে থাকা একখানা সবুজ বই ধরে মৃদু টান বসাতেই আচমকা বুকশেলফ গুলো সরে গেল দুপাশে। উম্মুক্ত হলো এক গোপন কামরা! অন্ধকারে বুদ হয়েছে কামরাটি। যুবক পা বাড়ায় সম্মুখে। কিছুটা পথ এগিয়ে দেয়ালে থাকা সুইচবোর্ডে আঙুল চাপা মাত্রই মুহুর্তেই আলোকিত হলো সম্পূর্ণ গোপন কক্ষটি! সে-কি আলোকিত রুপ বেরিয়েছে তার। হলদেটে আলোর ছটা সম্পূর্ণ কক্ষের কাঁচের দেয়ালে ঠিকরে পড়তেই চকচক করছে কেমন! রূঢ় মানব এগোলেন সম্মুখে।

প্রশস্ত পথ দিয়ে বা-দিকে মোড় নিয়েছেন জনাব। দেখা মিলল একখানা ক্লজেটের দরজার। মনস্টার মহাশয় আলগোছে হাত রাখলেন দরজার গায়ে। এক ঝটকায় স্লাইডিং দরজাটা খুলে দিতেই সেথায় উম্মুক্ত হলো — এক বিশাল আলোকিত স্থান। যেথায় অতি-সযত্নে রাখা হয়েছে একটি সাদা স্কার্ফ। তার পাশেই পড়ে আছে একটি কালো রঙা হেয়ার বেন্ড। মুগ্ধ ক্ষীণ হাসল। বাদামী ঠোঁটের নিম্নাংশ আলগোছে পিষ্ট হলো রুক্ষ ক্যানাইন দাঁতে চাপায়। সে হাত বাড়িয়ে বড্ড যত্নে আঁকড়ে ধরল কিশোরী মাহি’র বছর পুরনো স্মৃতিটা। অতঃপর তা মুখের কাছে এগিয়ে এনে স্কার্ফের অভ্যন্তরে আলগোছে নাক ডুবালো সুদর্শন। এক লম্বা টানে কিশোরীর গায়ের সুঘ্রাণ টানতে টানতে চোখ বুঁজে নিলো নিরবে। ঠিক একই ঘ্রাণ! আজও মনে হয় নতুন। যুবক ক্রমশ মাতাল হচ্ছে! যখন তার মতো বেপরোয়া পুরুষকে অতি শক্তিশালী মাদকও শান্ত করতে পারেনা, ঠিক তখনি এ কাজে স্বস্তি মিলে তার। কিশোরীর গায়ের সুঘ্রাণে মাতাল হয় সে। মস্তিষ্ক হয় ঠান্ডা! আজও মুগ্ধ অস্থির! বুকটায় দরকার প্রশান্তি। তাইতো যুবক নিশ্বাস টানছে ঘনঘন। চোখদুটো আগের ন্যায় বুঁজে রেখে আপনমনে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“ যখন তোকে প্রথম দেখলাম, আমার সেদিনই বোঝা উচিত ছিলো পিচ্চি — একদিন তুই আমার মারাত্মক নেশায় পরিণত হবি!”

মাথার ওপর ঝুম বৃষ্টি! গায়ে দোলা খাচ্ছে ঝড়ো হাওয়া। একজোড়া ব্যস্ত কদম হেঁটে আসছে চেরি ব্লসম গার্ডেনের পথ দিয়ে। গায়ে তার পুরনো একখানা কালো রঙা হুডি। তবুও হুডির গা দেখে বোঝবার জো নেই — এ যে বড়ো পুরনো। মনস্টারের মুখ আজও ঢাকা সফেদ রঙা ফুল মাস্কে। গলায় পেঁচানো কিশোরীর চিহ্ন! বাহাতের কব্জিসন্ধিতে আঁটসাঁট হয়ে বেঁধে আছে কিশোরীর ফেলে যাওয়া হেয়ার ব্যান্ড। ডানহাতের মুঠো চেপে রাখা সদ্য বিচ্ছিন্ন কয়েদির ম স্ত ক। যুবকের ব্যস্ত কদম এসে থামল প্যালেসের দোতলার সম্মুখে। ঘাড়ের মাংসল জায়গাটুকু সামান্য কুঁচকে সে মুখ তুলে চাইল। কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে সপ্তদশীর খোলা জানালার পানে তাকিয়ে থেকে আচমকা গলায় সেই পুরাতন করুণ সুর টেনে বলল,

“ আমিতো ফিরে যেতে চাই….
আমাকে ফিরিয়ে নাও….”
ঘুম নেই সপ্তদশীর চোখে! দাঁড়িয়েছিল জানালার বড্ড কাছে। বৃষ্টি পড়ার দরুন মুখ বার করেনি সে, তবে চোখবুঁজে বারিধারার নির্মল অনুভবে মত্ত ছিলো। এরইমধ্যে হুট করে সে-ই পুরনো করুণ সুর কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই চমকে উঠে মাহি! তক্ষুনি কেঁপে ওঠে ক্ষুদ্র বদনখানি। নিজেকে সামলে সে তক্ষুনি উঁকি দিলো জানালা দিয়ে। আর ওমনি দৃষ্টিগোচর হলো — সে-ই একই রহস্যময় মানবকে। সে আজও একই ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে। ধীরে ধীরে বাড়াচ্ছে নিজের বাহাত। কন্ঠে ফের সুর তুলে বলে ওঠে,
“ আমি যে কে তোমার, তুমি তা বুঝে নাও…!”

আতঙ্কে নিঃশ্বাস আটকালো গলার কাছে সপ্তদশীর। বিভ্রমে ডুবেছে অক্ষিপুট। কপালে দেখা মিলেছে ভয় আর সন্দিগ্ধতার ছাপ! ভয়ে কাঁপছে তার নরম অধরযুগল। সর্বাঙ্গ কাঁপছে মৃগী রোগীর ন্যায়। সপ্তদশীর গায়ে জোর নেই আর। মস্তিষ্ক ধরেই নিয়েছে — সম্পূর্ণটা তার কল্পনা! সে এখনো ঘুমিয়ে আছে। ধীরে ধীরে দৃশ্যপট ঝাপ্সা হচ্ছে মাহি’র। শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে ছড়িয়েছে শীতল ভাবস্রোত। জ্ঞান হারানোর পূর্ব লক্ষ্মণ দেখা দিতেই সপ্তদশী ছিটকে সরে এলো জানালার কাছ থেকে। কাঁপা কাঁপা হাতদুটো দিয়ে নিজ সর্বাঙ্গ আঁকড়ে আতঙ্কিত কন্ঠে শুধিয়ে গেল,
“ না না! এই লোক! এ আমার কল্পনা। এটা হতে পারে না।আমি আমি…”
জিভ খসে বহু বাক্য বেরুচ্ছে সপ্তদশীর তবে কিছু কিছু বাক্য অস্ফুট! ধীরে ধীরে নিশ্চল হচ্ছে বেচারি। মস্তিষ্ক থামালো কার্যক্রম। সম্মুখের দৃশ্যপট ঝাপ্সা থেকে হয়ে গেল নিবুনিবু। একটা সময় পুরোপুরি বন্ধ হলো সপ্তদশীর চোখের পর্দা!

এদিকে মুগ্ধ এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে জানালার দিকে মুখ করে। তার বাড়ন্ত হাত গুটিয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ। মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাদামী ঠোঁটজোড়া কেমন বাঁকা হাসছে দেখো! পিয়ার্সিং করা অক্ষিপুট তীক্ষ্ণ হয়েছে বেশ। যুবক এবার রয়েসয়ে গম্ভীর অথচ রাশভারী কন্ঠে বিড়বিড়ালো,
“ দুনিয়া গোল পিচ্চি! যার নেশাতে কাটিয়েছি গোটা তিনটে বছর, ভাগ্যের জোরে সে-ই কি-না ছিলো আমারই শত্রুর বীজ। এবার দেখার পালা এহসানের বেটি, তোর প্রতি আমার শত্রুতা জিতে নাকি আমার নেশা! তবে যেটাই জিতুক, রিমেম্বার দিনশেষে তা তোর ওপর খুব মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলবে! এন্ড আ’ল মেক শিওর অফ ইট! বাই দ্য হেল ইন দা মনস্টার’স ওয়ে — তোর ওপর কর্তৃত্ব আগেও আমার ছিল, যতদিন তুই বেঁচে থাকবি ততদিনও আমারই থাকবে। তোর ঐ হরিণী চোখ, যে চোখের দৃষ্টি আমাকে আটকিয়েছে, সে চোখে আমি বাদে অন্য যার প্রতিচ্ছবি দেখব — তাকে এ পৃথিবীতে থেকে সরিয়ে ফেলার দায়িত্ব আমার। তোর ঐ ঠোঁট! যে ঠোঁটে আমার স্পর্শ লেপ্টেছে — সে ঠোঁটের আগায় আমি বাদে অন্য যার নাম উঠবে — তাকে আমি ধ্বংস করে ফেলব। তুই আমার, মানে তোর পায়ের নখ থেকে শুরু করে মাথার চুল অব্ধি সবটা আমার! এন্ড রুশদী কিং কখনোই তার অধিকারত্বে অন্যের হস্তক্ষেপ সহ্য করেনা।

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৯

— হেপি কাল দৃষ্টি পিচ্চি ওরফে বান্দীর মেয়ে —
আজ তোর আর আমার কালদৃষ্টির তিনটে বছর ফুরলো। আমি নামক গোটা অভিশাপে জড়ালো তোর বাকিটা জীবন। এবার বল আমি আসলে কে? আ বিস্ট? অর তোর খুব অপছন্দের কেউ?”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here