Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫১

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫১

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫১
jannatul firdaus mithila

“ ওকে ফাইন বেইব! তাহলে চল, দু’জনে মিলে হ্যাংকি-প্যাংকি করি। তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিই ঘরের! তারপর ক্লান্ত হয়ে গেলে নাহয় একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ব।ওকে?”
চোখদুটো বিস্ফোরিত রূপ ধরল সপ্তদশীর! চোখেমুখে লেপ্টে গেল ভড়কানো ছাপ। ভয় বাড়ল অন্তঃকোণে। সর্বাঙ্গে বইতে লাগল মৃদু ঝংকার। রূঢ় মানবের মুখো অভিব্যক্তি স্পষ্ট নয়। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে তীর্যক বাঁকা হাসির রেশ। সপ্তদশীর উদর বরাবর ছুঁয়ে রাখা তার শক্ত হাতের রুক্ষ তালুখানা ধীরে ধীরে গভীর করছে নিজেকে। আলগোছে খামচে ধরেছে মাহি’র পরনের পাতলা কুর্তাটা। সহসা কেঁপে ওঠে মাহি। চোখদুটো খিঁচে তক্ষুনি আঁকড়ে ধরে যুবকের পেশীবহুল ইস্পাত-দৃঢ় হাত। কন্ঠ খাদে নামিয়ে অস্বস্তি নিয়ে বলে ওঠে,

“ প্লিজ….হাত সরান।”
রূঢ় মানব নিস্পৃহ। নির্লিপ্ততা ছড়িয়েছে তার দৃষ্টে। মানবীর ওমন অনুনয়কে একপ্রকার দূরছাই করে দিয়ে, যুবক আগালো আরেকটু। বেপরোয়া হাতের স্পর্শ টানলো সপ্তদশীর জামার ফাঁক গলিয়ে। তার শক্ত হাতের রুক্ষ তালুর উষ্ণ পরশ পরপরই স্থির হলো, মানবীর মেদহীন মসৃণ উদরের চামড়ায়! মুহুর্তেই সর্বাঙ্গে ঝংকার দিয়ে ওঠে মাহি’র। নিঃশ্বাস আঁটকে যায় কন্ঠার সন্নিকটে। এক অদ্ভুত বিভীষিকাময় হাহাকারে কম্পিত হয় রমণীর হৃদ মাঝার। ক্ষুন্ন হয় নারী মর্যাদা! মানবী তক্ষুনি ধারালো দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করল নিজ অধর। চোখদুটো কুঁচকে নিজেকে শান্ত করবার প্রয়াস চালালো বেশ। এরইমধ্যে উদরের চামড়ায় দোল খেয়ে ওঠে নির্দয় মানবের শক্ত আঙুলগুলো। আশ্চর্য! মাহি থামালো না তাকে। উল্টো চোখদুটো খিঁচে, ঠোঁট কামড়ে নিরবে দিচ্ছে অশ্রু বিসর্জন।
আহত মানব ধীরে ধীরে মাথা উঁচায় সামান্য। নিস্প্রভ দৃষ্টিযুগল একত্রে নিক্ষেপ করল মানবীর ক্রন্দনরত মুখপানে। কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে রূঢ় মানব আলগোছে মাথা এগিয়ে আনলেন নিজের। আহত ঘাড়টা পেছনে রেখে আলতো করে নিজ মুখটা ঠেকিয়ে রাখল মাহি’র গলার কাছে। একহাতে সপ্তদশীর উদর ছুঁয়ে রেখে, অন্যহাতটা স্নিগ্ধ ভঙ্গিতে নিয়ে গেল মেয়েটার ঘাড়ের নিচ দিয়ে। অতঃপর এক অভেদ্য বেষ্টনে মানবীকে নিজের সঙ্গে সযত্নে আঁটকে রেখে নিশ্বাস টানল মুগ্ধ। মাহি’র গলার কাছে অসহনীয় কায়দায় নাক ঘষে টানলো জোরালো নিঃশ্বাস! কন্ঠে উদ্ভট মোহাবিষ্টতা ঢেলে হিসহিসিয়ে আওড়াল,

“ তোর ওপর একচ্ছত্র অধিকার কেবল আমার সিগনোরা! আর আমার সকল একচ্ছত্র অধিকারকে দখল করার কৌশল হিসেবে আমি কেবল — জোবরদস্তি বুঝি! ধৈর্য্য, নীতিবাক্য, ন্যায়-অন্যায় এভরিথিং আর জাস্ট ফা’কিং ননসেন্স টু মি। যা আমার, তা আজ হোক, কাল হোক কিংবা বছরের পর বছর হোক — তা কেবল আমারই থাকবে। আমি এমনই সিগনোরা! ছাড় দেয়া কিংবা ছেড়ে দেয়া আমার রুলসে নেই, আমি কেবল বুঝি কেঁড়ে নেয়া। যা একবার চোখে ধরবে — তা ছিনিয়ে নেয়া, হোক তা অন্যের কলিজার টুকরো কিংবা তারচেয়েও দূর্লভ্য কিছু! আমি কেবল বুঝি — নিজ দখলদারিত্ব স্থাপন করা, হোক তা কারো অনিচ্ছায়, জোরপূর্বক। তোকে আমার লাগবে সিগনোরা! ফর দ্য রেস্ট অফ ইউ্যর লাইফ। আমার জন্য হলেও তোকে আমার লাগবে! এজন্য তোর সঙ্গে জোরজবরদস্তি করতে হলেও করব — আই ডোন্ট হেভ আ মিনিমাম কেয়ার এবাউট দ্যাট। আর মাত্র ১০ দিন! তারপরেই তুই সম্পূর্ণ রূপে আমার হবি! শুধু আমার।”
এপর্যায়ে রমণীর ছলছল চোখজোড়া পর্দা সরালো নিজেদের। প্রস্তরখন্ডের ন্যায় সটান হয়ে রইল সে। হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ। গলার কাছে নাক ঘষছে মুগ্ধ! তবুও অনুভূতিহীন মাহি। আবেগশূন্য কন্ঠে আচমকা গুমরে উঠল মেয়েটা!

“ এতকিছু না বলে সোজাসাপ্টা বললেই পারতেন — আমায় পরিপূর্ণ রূপে ভোগ করাই আপনার একমাত্র লক্ষ্য!”
এক লহমায় স্থবির হলো মুগ্ধ। চট করে থামাল নিজ কার্য। তড়িঘড়ি করে মুখ উঠিয়ে রূঢ় দৃষ্টিতে তাকাল মাহি’র মুখপানে। রমণীর উদর হতে হাতখানা সরিয়ে এনে, অতি সন্তর্পণে রাখল মেয়েটার র-ক্তিম আভায় ছেয়ে থাকা কপোলে। দৃঢ় চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে আচমকা চিড়বিড়িয়ে বলল,
“ নাহ! একদম নাহ। তুই ভুল বললি সিগনোরা। তোকে ভোগ করাই যদি হতো আমার একমাত্র লক্ষ্য, তবে তুই এতদিন অব্ধি সুস্থ থাকতি না চাশমিস! আমি চাই — তোর দেহের সাথে তোর হৃদয়টাও আমার আধিপত্য স্বীকার করুক। তা যদি আগে দেহ থেকে শুরু হয়, তবে তা-ই হোক! দেহে দাগ পড়লে অন্তরে সে দাগের পরিস্ফুটন ঘটবেই!”
ধীরলয়ে চোখ তুলল মাহি। তার অশ্রুসিক্ত নয়ন জোড়া ফের ডোবালো রূঢ় মানবকে। কন্ঠে নিগূঢ়তার ছাপ তার, মুখাবয়বে হাহাকারের পরিতুষ্টি! অন্তঃকোণে সংঘটিত হাহাকার যেন ঠেলে বেরিয়ে এলো অধরের ফাঁক গলিয়ে,

“ আধিপত্য? কিসের আধিপত্য? অন্তর কখনো কারোর জোরপূর্বক আধিপত্য স্বীকার করে না অধীর রায়। দেহে অনিচ্ছাকৃত দাগ পড়লে অন্তরে জমে বিষাক্ত ক্ষত! যে ক্ষতের গভীরতায় পরবর্তীতে এক আকাশসম ভালোবাসা এবং আবেগের প্রলেপ লেপ্টালেও তা কোনোদিন মিটবে না। না মিটবে জোর করা মানুষটার প্রতি দুর্বোধ্য ঘৃণা! আপনি আমার দেহ চান, তা নিন। তবে দয়া করে আমার অন্তরে নিজের আধিপত্য চাইবেন না! তা আমি ম’রে গেলেও হতে দিব না।”
চোখ রেঙে গেল রূঢ় মানবের। মাহি’র মসৃণ গালে আগলে থাকা হাতটা পরক্ষণেই সহসা আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর নরম গ্রীবাদেশ। মাহি নিস্পৃহ! নিজেকে ছাড়ানোর কোনরূপ উচাটন নেই তারমধ্যে। চোখদুটো অটল। মুগ্ধ কেমন কটমট করছে দাঁত। পরপরই হিং স্র বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে বলে ওঠে,
“ অবাধ্য হোস না মেয়ে! নইলে ভাবাবেগের তীব্র দহনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিব তোকে।”
“ তা আপনি পারবেন বটে! তবে জেনে রাখুন, আপনি আমার দেহটাই পাবেন শুধু, অন্তরে ঠাঁই নয়।”
ঠোঁটের কোণে তীর্যক বাঁকা হাসির রেশ ফুটলো মুগ্ধের। দৃষ্টিতে নামল প্রগাঢ়তা। মুখভঙ্গিতে দৃঢ়তা বজায় রেখে নাক ঠেকাল মেয়েটার সরু নাকের ডগার সনে। সেথায় কিয়তক্ষন নাক ঘষে হাস্কি স্বরে আওড়াল,

“ আপাতত দেহটা হলেই চলবে মা’ই গার্ল! বাকিটা নাহয় পরবর্তীতে হাসিল করে নিব।”
মুখ কুঁচকায় মাহি। ঝাঁঝাল কন্ঠে প্রতুত্তর করল —
“ আই সয়্যার — ইউ্য আর আ ব্লা’ডি টক্সিক ফেলো।”
নিরবে ঠোঁট পিষে হাসল মুগ্ধ। ধীরলয়ে অধর আগালো মাহি’র তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠপুটের কাছে। রয়েসয়ে নিজ রুক্ষ অধরযুগল মেয়েটার নরম তুলতুলে ওষ্ঠপুটের সনে ঠেকিয়ে রেখে, মুগ্ধ খানিক অস্ফুটে আওড়াল,
“ দ্যান ইউ্য ক্যান কল মি ইউ্যর টক্সিক ড্যাডি সিগনোরা!”

ভ্রুজোড়া কুঞ্চিত হলো মাহি’র। বিহ্বলিত ভং ধরতেই আচানক সুপ্ত আবেগে তার নরম অধরজোড়া একত্রে আঁকড়ে ধরে রূঢ় মানব। উন্মত্ত গভীর চুম্বনে লিপ্ত হয়ে কুন্ঠিত করে মানবীকে। হাসফাস বাড়ল মাহি’র। সর্বচ্চ চেষ্টায় দু’হাত দিয়ে ঠেলতে লাগল মুগ্ধের প্রশস্ত রুক্ষ বক্ষভাজ। কিন্তু বালাই ষাট! পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষ টললোও না এপর্যন্ত। সে মত্ত নিজ কাজে। তার বেপরোয়া হাতদুটো ছন্নছাড়া হয়েছে আজ! বিশৃঙ্খল কায়দায় ছুঁয়ে দিচ্ছে রমণীর মেদহীন মসৃণ উদরঘেঁষা অঞ্চল। মাহি’র কুন্ঠিত! বুকের ওঠানামার গতি জোরালো তার। চোখ খিঁচে সহ্য করা ছাড়া আপাতত উপায়হীন সে।
প্রায় লম্বা সময় ধরে চলমান অধর কর্মের পথিমধ্যে হুট করেই জিহবায় ক্ষারীয় স্বাদ অনুভুত হলো রূঢ় মানবের। তৎক্ষনাৎ কুঁচকে গেল তার কপাল। চোখদুটো সহসা খুলে গেল পরপরই। দৃষ্টি তাক হলো ক্রন্দনরত রমণীর পেলব মুখপানে। মাহি’র নড়চড় নেই। প্রস্তরখন্ডের ন্যায় শক্ত হয়েছে তার ক্ষুদ্র বদন। তক্ষুনি হুঁশ ফিরল মুগ্ধের। তড়িঘড়ি করে মুক্ত করল সপ্তদশীর নরম তুলতুলে অধরযুগল। পেলব মুখখানার ওপর নিজ মুখটা সামান্য ঝুঁকিয়ে রেখে হাত ছোঁয়াল মসৃণ গালে। সেথায় আলতো আঙ্গিকে চাপড় বসিয়ে ক্ষীণ স্বরে ডাকল,

“ চাশমিস! হেই! লুক এট মি। চোখ খোল না চাশমিস।”
ক্ষীয়মান গতিতে শাস-প্রশ্বাস চলছে মাহি’র। চোখদুটোর কার্নিশ এখনো সিক্ত। বোধহয় ফের জ্ঞান হারিয়েছে দূর্বল মানবী! মুগ্ধ ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল তক্ষুনি। সে-ই নিশ্বাসের উষ্ণ ঝাপ্টা গিয়ে দোল খেলো মেয়েটার পেলব মুখখানায়। দৃষ্টি সরু করল মুগ্ধ। গভীর দৃষ্টে অবলোকন করতে লাগল নিস্তব্দ মেয়েটাকে। সপ্তদশীর তুলতুলে অধরযুগলের ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। সে-কি যাচ্ছে তা-ই অবস্থা তাদের! ঠোঁটের কোণে বসেছে গোটাকতক ক্ষতের চিহ্ন। র–ক্ত জমাট বেঁধেছে বহু জায়গায়। কালসিটে দাগ পড়বে বোধহয় সকাল হতে না হতেই। মুগ্ধ নিষ্প্রভতার সনে তাকিয়ে রইল সেদিকে। রুক্ষ হাতের বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিলো মেয়েটার আহত অধরযুগল। সেথায় খানিক আঙুল বুলিয়ে আনমনে বিড়বিড়ালো,
“ তুই এতটা শান্ত-শিষ্ট, দূর্বল বলেই হয়তো আমি এতোটা রূঢ়, বিষাক্ত! কেননা ইতিহাস সাক্ষী — প্রতিটি মানুষ তার বিপরীত ব্যাক্তিত্বের অধিকারীর ওপর ধাবিত হয়। এই যেমন আমি হলাম! তুই মান বা না মান, তুই সারাজীবন কেবল আমারই থাকবি সিগনোরা! একবার যেহেতু মস্তিষ্ক বলেছে তোকে আটকাতে, সেহেতু আজন্ম তোকে বন্দী করে রাখবই। তোর পুরো দুনিয়া জুড়ে কেবল আমার অস্তিত্বই থাকবে। বিপরীতে তোর আর আমার মাঝে যারাই আসবে — তাদের নিজ হাতে মৃ ত্যুর সাথে সাক্ষাৎ করাব আমি! সবার আগে — নিঃশেষ করব তোর পুরো পরিবার, পরিজনকে। যাতে আমাকে ছেড়ে যাবার চিন্তাও কোনোদিন তোর মাথায় না আসে।”

মসৃণ পাপড়ি বদ্ধ চোখদুটোতে ধীরলয়ে কম্পন ধরল সপ্তদশীর। দীর্ঘ নিদ্রার গভীর আবরণ হতে চোখদুটো একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে খুলছে সে। পিটপিট দৃষ্টে অন্যমনস্ক কায়দায় তাকাচ্ছে চারপাশে। গোলাকার মখমলি বিছানায় তার ডুবন্ত ক্ষুদ্র বদনখানি আড়মোড়া ভাঙতে ব্যস্ত। ঘুমন্ত মস্তিষ্ক সজাগ হতে লাগাচ্ছে বহুক্ষণ। তবে খানিক বাদেই মানবীর মস্তিষ্কে তড়াক করে উঠল গতকাল রাতের সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ। ওমনি ভড়কে গিয়ে পাশে ফিরে মাহি। কিন্তু পরক্ষণেই কুঞ্চিত হলো তার দৃষ্টি। পাশে কেউ নেই। রূঢ় মানব তো দূর, তার টিকিটাও নেই। মাহি কপাল গোছায়। কৌতুহলী ভঙ্গিতে ধীরলয়ে উঠে বসে শোয়া ছেড়ে। মাথাটা খানিক এদিক ওদিক বাড়িয়ে সর্তক দৃষ্টি বুলিয়ে নেয় চারপাশে। পরপরই সপ্তদশীর বোধগম্য হলো — রূঢ় মানব আশেপাশে নেই। এ সুযোগটাই কাজে লাগাতে তৎপর মাহি। চটজলদি বিছানা হতে পাদু’টো নামিয়ে ঠেকাল শীতল কাঁচের মেঝেতে। একটুখানি শীতল স্পর্শ পায়ের উষ্ণ তালু স্পর্শ করতেই শিরশিরিয়ে উঠে মানবীর ক্ষুদ্র কায়া। এক-আধবার পাদু’টো গুটিয়ে নিলেও পরক্ষণেই তা ফের ঠেকল মেঝেতে। চটপট কায়দায় টলমল দেহখানি হুট করেই ছুট লাগাল দরজার কাছে।

বন্ধ দরজার সম্মুখে এসে দাঁড়াতেই ফের থেমে গেল মাহি। হাত রাখল দরজার ডিজিটাল সেন্সরযুক্ত নবের গায়ে। শরীর জোরে তা টানতেই মানবীর বোধগম্য হলো — দরজাটা লক করা। নবের গায়ে আটঁকে থাকা সেন্সরের পর্দায় ইতোমধ্যেই ভেসে উঠেছে ফিঙ্গারপ্রিন্টের নকশা। অর্থাৎ নকশা বরাবর কাঙ্ক্ষিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট না বসলে খুলবে না এ দরজা! মাহি পড়ল বড্ড বিপাকে। অস্থিরতায় হাত চলে গেল ললাটে। কিভাবে কি করবে উপায় খুঁজতেই মানবী আনমনে নিজের বৃদ্ধা আঙুলখানা আলতো করে ছোঁয়াল নকশা বরাবর। ঠিক তখনি, তাকে এক আকাশসম হতবাকতায় ডুবিয়ে দরজাটা কেমন খট করে খুলে গেল। এহেন কান্ডে বিস্মিত মাহি! বোকা বনে তাকিয়ে রইল সদ্য খুলে যাওয়া দরজাটার পানে। প্রহর কাটল এরূপ হতভম্বতায়। পরপরই সপ্তদশীর সর্তক পদযুগল তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে।

গাঢ় নিস্তব্ধতায় মুড়িয়ে আছে প্রশস্ত করিডরটি। স্বচ্ছ কাঁচের তৈরী মেঝেতে বড্ড সর্তকতায় হাঁটছে সপ্তদশী! ভয়ার্ত দৃষ্টিযুগল এদিক-ওদিক ঘোরপাক খাচ্ছে বারংবার। কোনমতে একবার ঘরে ঢুকতে পারলেই হলো, আজ আর ভুলক্রমেও বাইরে বেরুবে না সে! এহেন পণ নিয়ে কাপত্রয়ী এগোচ্ছে। এরইমধ্যে পেছন থেকে একখানা শক্তপোক্ত হাতের রুক্ষ তালুর ঝাঁঝাল স্পর্শ এসে আচানক আঘাত হানলো বোকা মানবীর পৃষ্ঠদেশের সুডৌল স্পর্শকাতর অঙ্গে! ওমনি তীব্র ব্যথায় বিকৃত হলো রমণীর পেলব মুখখানা। কুঁচকে গেল নাক-মুখ! তক্ষুনি দু’হাতে নিজ সুডৌল ত্বকে হাত ডলতে ডলতে, মানবী শরীর ঘুরিয়ে তাকাল পেছনে। ওমনি মুখোমুখি হলো রূঢ় মানবের সনে! এলোমেলো চুল তার! কোনমতে টেনেটুনে ঝুটি স্বরুপ আঁটকে আছে পেছনে। গায়ে জড়ানো কালো রঙা ওভারকোট। ভেতরে পড়েছে একখানা কালো ফিনফিনে শার্ট, তার আবার সবগুলো বোতাম অলস্যে হা করে খুলে রাখা। বেশভূষা দেখে মনে হচ্ছে — মানব বোধহয় যাচ্ছে কোথাও। তবে পথিমধ্যে করে বসেছে নিজের উদ্ভট বেয়াদবি। পিয়ার্সিং করা ভ্রু-খানা উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে মাহি’র পানে। ঠোঁটের কোণে বসেছে ক্যানাইন দাঁতের পরশ। দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা লেপ্টে, মানব দু’হাত বাঁধল বুকের কাছে। তৎক্ষনাৎ মেজাজ খিচঁল মাহি’র। ঝাঁঝাল কন্ঠে আওড়াল —

“ লজ্জা করে না আপনার বেহায়া লোক? যখন-তখন আমার মতো হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে এমন বেহায়াপনা করতে?”
জিভের ডগায় গাল ঠেললো মুগ্ধ! দৈবাৎ শক্তিতে ঘাড়টা আনমনে কাত হলো তার। পায়ের অসামান্য গতিতে এক লহমায় এগিয়ে এসে এক হেঁচকা টানে আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর বাঁকানো কটিদেশ! হাতের জোরে মানবীর পাদু’টো ঝুলে গেল শূন্যে। আঁটকে গেল রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষভাঁজের সনে। সাপের ন্যায় মোচড়াচ্ছে মাহি। অস্বস্তি, ঘৃণায় লুটোপুটি খেয়ে দু’হাতে ঠেলছে লোকটাকে। অথচ মুগ্ধ নির্বিকার! একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মাহি’র পানে। ঠোঁটের কোণে এক টুকরো বাঁকা হাসির রেশ টেনে, মানবীর মুখের ওপর সামান্য ফু দিয়ে দুষ্ট কন্ঠে শুধালো —

“ লজ্জা? হোয়াট দ্য ফা’ক ইজ দিস বুলশিট? আমার জানামতে আমার ডিকশনারিতে এমন কোনো শব্দ এখনো আসেনি বান্দীর মেয়ে! আর না কোনোদিন আসবে। কজ আ’ম আ পিওর ইয়ার্নার উইথ আ শার্প এন্ড ডার্টি মাইন্ড হটি! সো বি প্রিপেইড।”
মুখ বাঁকায় মাহি। চিড়বিড়িয়ে প্রতুত্তর করে,
“ আপনি ইয়ার্নার না আলফা, তা জেনে আমি কি করব? নিজের ব্যাক্তিত্ব নিজ অব্ধি সীমাবদ্ধ রাখুন। আমি আপনার কোনোকিছু জানতে ইন্টারেস্টেড নই।”
নাটকীয় ভঙ্গিতে মুখ বানালো মুগ্ধ। অঘোষিত কায়দায় ভেংচালো মেয়েটাকে। তা দেখে মাহি রণমুর্তি ভাব ধারণ করতে গেলেই মুগ্ধ আগ বাড়িয়ে বলে ওঠে,
“ তারাতাড়ি ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ আয়। ব্রেকফাস্ট করবি! আ’ম ওয়েটিং।”
মুহুর্তেই শান্ত হলো মানবী। বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেবার উদ্দেশ্যে ত্রস্ত মাথা নাড়িয়ে শুধালো,
“ ওকে! নিচে নামান আমায়। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
এহেন শান্ত প্রতুত্তরে ভ্রু গোটায় মুগ্ধ। কিয়তক্ষন চুপ করে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। পরক্ষণেই সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,

“ কাহিনি কী? এতো তারাতাড়ি মেনে গেলি যে?”
তড়াক চোখ কুঁচকে তাকায় মাহি। অতিষ্ঠ গলায় বলে ওঠে,
“ আশ্চর্য! মানলেও সমস্যা, না মানলেও সমস্যা! আচ্ছা আপনি সত্যি করে বলুন তো, আপনি কি চান?”
মুখো অভিব্যাক্তি ধরা ছোঁয়ার বাইরে মুগ্ধের। দৃষ্টিতে নামল গভীরতা। একহাতে সযত্নে মেয়েটার পাতলা বাঁকানো কোমর আকঁড়ে রেখে, অন্যহাতটা আলতো করে উঠিয়ে আনলো মানবীর গাল বরাবর। কন্ঠে গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে পরপরই আওড়াল,
“ তুই এখন যেমনটা আছিস, সারাজীবন তেমনটাই থাকিস সিগনোরা! আমি কিছু বললে তর্ক করবি, ঘাড়ত্যাড়ামি করবি, ভয় পেলে আমার কাছে ছুটে আসবি। ব্যস এটুকুই চাই। ভুলেও কোনোদিন নিজের এহেন নরম স্বভাবের উর্ধ্বে গিয়ে কপটতা কিংবা ছলচাতুরীর ভান ধরবি না! যেদিন আমি এসব দেখব — সেদিন তোকে কিন্তু নিজ হাতে জ বা ই করব। মাইন্ড ইট!”
শুকনো ঢোক গিলে মাহি। শান্ত হয়ে পাদু’টো শূন্যে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল মানবের বক্ষ ভাঁজের কাছে। মুগ্ধ থামল খানিক। চোয়াল শক্ত করে নিশ্বাস ফেলল সহসা। মেয়েটাকে সেভাবেই একহাতে তুলে রেখে এগোলো সম্মুখে। গটগট পায়ে সিড়িঁ বেয়ে নামতে গেলেই হুড়মুড়িয়ে ওঠে মাহি। তড়িঘড়ি করে ব্যস্ত কন্ঠে আওড়ায়,
“ এ-কি! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়? নামান বলছি, আমি এখনো ফ্রেশ হইনি।”
“ তো?”
মুগ্ধের নির্লিপ্ত প্রতুত্তর। তা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই মুখে কুলুপ আটঁল মাহি। তর্ক করে লাভ নেই, লোকটা থোড়াই শুনবে তার কথাগুলো!

রাজকীয় ডাইনিং টেবিলে সেজেছে পাঁচ ধরনের বিশেষ নাস্তার এলাহি আয়োজন। সুঘ্রাণে মো মো করছে পুরো ডাইনিং এরিয়া। রূঢ় মানবের ব্যস্ত পদযুগল মাত্রই প্রবেশ করল সেথায়। ওদিকে তার উপস্থিতি টের পেয়ে তক্ষুনি তটস্থ হলেন সকলে। সরে গেলেন পাঁচ হাত দুরত্বে! মুগ্ধ নির্বিকারে এগিয়ে এসে বসল নিজ সিংহাসনের ন্যায় রাজকীয় আসনে। মেয়েটা তখনো তার হাতের বাঁধনে। ধীরলয়ে তাকে বসিয়েছে নিজ ইস্পাত-দৃঢ় উরুর ওপর। সম্পূর্ণ কান্ডে বিমূঢ় মাহি। মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে অন্যত্র। ততক্ষণে মুগ্ধের সামনে দেয়া হয়েছে রাশিয়ার বিখ্যাত সিরনিকি এবং ব্লিনি। একহাতে বড়সড় একখানা ফর্ক তুলে দক্ষ কায়দায় তুলতুলে প্যানকেক গুলো ছিঁড়ছে গম্ভীর মানব। রয়েসয়ে খাদ্যাংশটুকু ফর্কের ডগায় আঁটকে, তা আলগোছে বাড়িয়ে দিলো মাহি’র মুখের কাছে। গমগমে গলায় শুধালো,

“ মুখ খোল!”
তক্ষুনি অন্যত্র মুখ ঘোরায় মাহি। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলে ওঠে,
“ পারব না! আমি এখনো ব্রাশ করিনি। ইয়াক!!”
নিরবে শুনল মুগ্ধ! পরপরই হাতে থাকা ফর্কটা আলগোছে নামিয়ে রাখল প্লেটের এককোণে। ডানহাতে মাহি’র নরম তুলতুলে চোয়ালখানা আচমকা আঁকড়ে ধরে, মুখটা ঘুরিয়ে আনে নিজের দিকে। তার এহেন কান্ডে ভড়কায় মাহি! গোটানো কপালে মুখ খুলতেই যাবে ওমনি রূঢ় মানব করে বসল আরেক কান্ড! তক্ষুনি কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই অধর দিয়ে আঁকড়ে ধরল রমণীর তুলতুলে ওষ্ঠপুট। গভীর থেকে গভীর হচ্ছে সে-ই বেপরোয়া স্পর্শ! অধরসুধা পানে মত্ত রূঢ় মানব। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলছে বেশ! মাহি হতভম্ব। পেট গুড়গুড় করছে তার। গুলিয়ে উঠছে সর্বাঙ্গ! এই বুঝি মুখভরে বমি উগড়ে দিবে সে। অথচ লোকটাকে দেখো! সে-তো থামছেই না। মাহি’র অবস্থা বেগতিক হচ্ছে ক্রমশ। তা বোধহয় টের পেলেন রূঢ় মানব। কোনরূপ তাড়া না দেখিয়ে রয়েসয়ে ছাড়ল সপ্তদশীর অধর। এদিকে, ছাড়া পেয়ে যত্রতত্র নিজেকে সামলাতে তৎপর মাহি। তক্ষুনি দু’হাতের উল্টোপিঠে অনবরত ঘষতে লাগল নিজ সিক্ত অধরযুগল। বাঁকা চোখে তা অবলোকন করে ঠোঁট কামড়ে হাসল মুগ্ধ। বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে আলগোছে মুছে নিলো নিজ অধর কোণ। খানিক হাঁপাতে হাঁপাতে শুধাল,

“ এখনো ব্রাশ করতে হবে?”
তৎক্ষনাৎ বমি বমি ভাব ধরল মাহি। গা গুলিয়ে উঠার ন্যায় বুকের কাছে চাপলো হাত। অস্ফুটে বলেই বসল,
“ সিজনাল খবিশ একটা! ইয়াক! খচ্চর!”
বিড়বিড়িয়ে বলা কথাটাও বেশ শুনল মুগ্ধ। অলক্ষ্যে ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখে ফের ফর্ক তুলল হাতে। খাবারটুকু আবারও মাহি’র মুখের কাছে এগিয়ে দিয়ে, চেয়ে রইল কিয়তক্ষন। মাহি’র আর কি’বা করার! না চাইতেও গোমড়ামুখে আলগোছে মুখে তুললো খাবারটুকু। রূঢ় মানব দেখল তা। পরপরই একই ফর্কের আগায় খাবার তুলে নিজেও খেতে লাগল বড্ড গুছিয়ে। মাহি আড়দৃষ্টে দেখছে সব। মনে মনে লোকটার এহেন গুছিয়ে খাওয়া দেখে প্রশংসাও করল হয়তো। তবে মুখে ভাব ধরেছে গম্ভীর! মুগ্ধ ফের মেয়েটার মুখে খাবার তুলে দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলতে লাগল,
“ ক’দিন ঘর ছেড়ে বের হবি না। যা লাগবে জাস্ট অর্ডার দিবি, সামনে হাজির হয়ে যাবে। খাবার দাবার ঘরেই করবি।”
খাবার চিবুতে ব্যস্ত মাহি। গুছিয়েছে কপালের চামড়া। লোকটা হুট করে এসব কেনো বলছে? আগে তো বলেনি। কৌতূহলতায় বুদ মানবী। মুখ খুলে কিছু জিজ্ঞেস করতেই যাবে তার আগেই মুখগহ্বরে খাবার ঠেলে দিলো মুগ্ধ। গম্ভীর মুখে বলে উঠল,

“ পরে কথা বলিস! আগে খেয়ে নে।”
সহসা কথা থেমে গেল মাহি’র। আনমনে খাবার চিবুতে গিয়ে হুট করেই হেঁচকি উঠে গেল তার। অথচ তার এহেন সামান্য হেঁচকিতে তৎক্ষনাৎ অস্থির হলো মুগ্ধ। অস্থির কায়দায় দ্রুত বেগে সম্মুখ হতে পানিভর্তি গ্লাসটা আলগোছে তুলে দিলো মেয়েটার মুখের কাছে। অন্যহাতে মাহি’র পিঠ ডলতে ডলতে উদ্বিগ্ন স্বরে আওড়াল,
“ আর ইউ্য ওকে?”

লম্বা ঢোকে প্রায় অর্ধেকটা পানি গিলে থামল মাহি। হাঁপিয়ে উঠেছে মেয়েটা। তার ওপর লোকটার ওমন একের পর এক প্রশ্ন! মাহি মৌন। অথচ মুগ্ধ বিচলিত কায়দায় দু’হাতের রুক্ষ আঁজলায় তুলে রেখেছে মেয়েটার ক্ষুদ্র মুখ। এরইমধ্যে টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ায় আফ্রিকান পুরুষ মেইড। নতমুখে আরেকটু খাবার সার্ভ করছে মনস্টারের পাতে। ঠিক তখনি মাহি কেশে উঠে সামান্য। সে কাশির শব্দে আনমনেই দৃষ্টি উঠে গেল লোকটার। তাক হলো কাশরত মায়াবিনী রমণীর পানে। সাহায্যকারী সৌজন্যতাবশত আগ বাড়িয়ে টেবিল হতে একখানা রুমাল তুলে মাহি’র পানে ঠেলে এগিয়ে দেয় লোকটা। তা দৃশ্যমান হতেই থমকায় মাহি। কাশতে কাশতে ভুলবশত যে-ই না হাত বাড়িয়ে বাড়ন্ত রুমালটা তুলে নিবে ওমনি রূঢ় মানব নিজ উরু হতে আলগোছে নামিয়ে দাঁড় করালো তাকে। মাহি হতবুদ্ধির ন্যায় ভাব ধরল তক্ষুনি। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে মুগ্ধের মুখপানে তাকাতেই আঁতকে উঠে মেয়েটা! একি! লোকটার বাদামী চোখদুটো ওমন লাল হয়ে গেল কেনো? দৃঢ় চোয়ালটা ওমন থরথর করে কাঁপছে কেনো? ঘাড় এবং কপালের রগগুলো ওমন দগদগ করছে যে! সে-কি রেগে গেছে? ভয়ার্ত মানবী শুকনো ঢোক গিললো তৎক্ষনাৎ। ভয়ে সিটিয়ে গেল কদম জোড়া। ওদিকে সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে থাকা রূঢ় মানব আচমকা ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় হুংকার তুলে ঝাপিয়ে পড়ল পার্শ্ববর্তী লোকটার ওপর। ডানহাতের হিং স্র থাবায় লোকটার মুখখানা এক ঝটকায় টেবিলের গায়ের সঙ্গে আঁটকে রেখে, অন্যহাতে অনবরত হিং স্র আঘাতে থুবড়ে দিতে লাগল লোকটার অন্ধকার মুখাবয়ব। একের পর এক জোরালো পাঞ্চের হিং স্রতায় থেতঁলে যাচ্ছে মানবের মুখ , ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে মুখাবয়বের অস্থিকাঠামো। উষ্ণ তাজা লহুতে মেখে যাচ্ছে চারপাশ! লোকটা যেমন চিৎকার করে কাঁদছে ঠিক তেমনি হিং স্র গর্জন তুলছে মুগ্ধ!

“ হাউ ডেয়ার ইউ্য বাস্টা’র্ড? হাউ ডেয়ার ইউ্য? ওর দিকে রুমাল আগালি কোন সাহসে? ওর দিকে হাত বাড়ালি কোন সাহসে? কোন সাহসে তাকালি ওর দিকে? ইউ্য ব্লা’ডি এসহোল!”
মুগ্ধের ওমন জোরালো পাঞ্চে কয়েকপলেই বিকৃত হলো লোকটার মুখ। দেহ খাঁচা ছেড়ে প্রাণ পাখিটা বোধহয় উড়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে! ওদিকে এহেন দৃশ্য স্বচক্ষে কয়েক সেকেন্ড দেখতে পারলেও, পরমুহূর্তে দেখবার আর সাধ্যি পায়নি মাহি। তড়িঘড়ি করে দু’হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করছে মেয়েটা। কাঁপছে রূঢ় মানবের হিং স্রতায়।
মুগ্ধ থামল! সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে ছাড়ল লোকটাকে। পরক্ষণে লহুতে মাখামাখি হাতখানা সবেগে ঝাঁকিয়ে আলগোছে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় সে। অগ্নিদৃষ্টি জোড়া নিক্ষেপ করল কাঁদতে থাকা মাহি’র ওপর। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পাদু’টো এগিয়ে এসে দাঁড়াল তার। রয়েসয়ে হাঁটু ঠেকল মেঝেতে। নির্বিকার কায়দায় হাত উঁচিয়ে ক্রন্দনরত রমণীর মাথার ওপর স্পর্শ বসাতেই তক্ষুনি কেঁপে ওঠে মাহি। ভয়ার্ত ঢোক গিলে, মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে সহসা ছিটকে সরে যায় পেছনে। তার এহেন কান্ড দেখে কপাল গোছায় মুগ্ধ। নিজে থেকে হাঁটুতে ভর দিয়ে আরেকটু এগিয়ে এসে থমথমে কন্ঠে আওড়াল,

“ ভয় পাচ্ছিস কেনো? আমি তো এমনই।”
ভয়ার্ত ঢোক গিলছে মাহি! পেছাচ্ছে কয়েক হাত। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে আওড়াচ্ছে,
“ ছোঁবেন না আমায়! আপনি একটা পা গ ল।”
আচমকা সাইকোপ্যাথের ন্যায় ঘাড় কাত করে হাসল মুগ্ধ। আলগোছে আঙুলের ডগায় চুলকালো নিজ কপাল। পরপরই অতি শান্ত অথচ ভয়ানক কন্ঠে প্রতুত্তর করল —
“ হ্যাঁ জানি তো! তবে তুই হয়তো জানিস না — আমি কার জন্য পা গ ল।”
ভয়ার্ত মাহি ওতোকিছু বোঝার স্থিতিতে নেই। কাঁদতে কাঁদতে তক্ষুনি উঠে চলে যেতে চাইলেই বাঁধ সাধল মুগ্ধ। তৎক্ষনাৎ সপ্তদশীর পায়ের গোড়ালি বরাবর আঁকড়ে ধরল তার শক্তপোক্ত হাত। মাহি থমকায়। তটস্থলক্ষণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকে স্রেফ। মুহুর্ত ব্যয়েই তার পা ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় মুগ্ধ। পরপরই পেছন থেকে আঁকড়ে ধরে মেয়েটার সুদীর্ঘ কোমল কন্ঠা! মাহি দম খিঁচে দাঁড়িয়ে আছে। তন্মধ্যে কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের ভরাট কন্ঠ!

“ তোর দিকে হাত বাড়ানো মানে সাক্ষাৎ মৃ ত্যু — এটা কী তুই জানিস?”
শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলল মাহি। তা দেখে অলক্ষ্যে ঠোঁট কামড়ে হাসল মুগ্ধ। ত্বরিত মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল সম্মুখে। দু’হাতের রুক্ষ আঁজলায় রমণীর পেলব মুখখানা আলতো করে তুলে নিয়ে গমগমে গলায় বলল,
“ কলকাতা যাচ্ছি কয়েকদিনের জন্য! ফিরে আসব তোর বার্থডে তে। এ-ই ফাঁকে নিজেকে যথাসম্ভব তৈরি কর! এবার দুনিয়া এসপার উসপার হয়ে গেলেও, তুই আমার হাত থেকে ছাড়া পাচ্ছিস না জেনে রাখ!”
তড়াক চোখ তুলল মাহি। হতবিহ্বল কন্ঠে আওড়াল,
“ আপনি সত্যিই কলকাতা যাচ্ছেন?”
চোখের পলক ফেলল মুগ্ধ। বোধহয় এটাই তার উত্তর। ধীরলয়ে আলতো করে অধর ছুঁইয়ে দিলো রমণীর ললাটে। বেশ কিছুক্ষণ একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল মুগ্ধ। রয়েসয়ে মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ায় সে। পা বাড়ায় উল্টোপথে। ঠিক তখনি তার কর্ণকুহরে ভেসে এলো মাহি’র স্বস্তিভরা কন্ঠ!

“ আলহামদুলিল্লাহ!”
মুহুর্তেই থমকায় মুগ্ধের পদযুগল। ঘাড় বেঁকে যায় ফের। কপালের চামড়া গুটিয়ে সে কেমন সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ তুই কি বললি?”
হকচকায় মাহি! অনবরত কচলায় নিজ হাত। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়ায় কোনরকম,
“ না মানে! কই??”
এপর্যায়ে ঘুরে এসে দাঁড়ায় মুগ্ধ। ঘাড় কাত করে হাসল খানিক। মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে শুধালো,
“ আমি চলে যাচ্ছি বলে খুশি হলি?”
বোকার ন্যায় ওপর নিচ মাথা নাড়াতে গিয়ে সহসা থমকে যায় মাহি। পরক্ষণে নিজেকে শুধরে দুপাশে ঘাড় নাড়াতেই হাসি প্রগাঢ় হলো মুগ্ধের। ধীরেসুস্থে মুখখানা নিয়ে গেল মেয়েটার কানের কাছে। ফিসফিসিয়ে আওড়াল,

“ তোর বাদ বাকি জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে — আমার অভিশপ্ত কাল দৃষ্টি লাগুক!
আমি বিনে তোর সকল সুখ-শান্তিতে মহাপ্রয়াণের দহন জ্বলুক।”
বুক কেঁপে ওঠে মাহি’র! সন্দিষ্ট দৃষ্টিজোড়া উঁচিয়ে তাকাতেই রূঢ় মানব এক ঝটকায় একহাতে পাঁজা কোলে তুলে নিলো মেয়েটাকে। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় মাহি। পড়ে যাবার ভয়ে তক্ষুনি আঁকড়ে ধরে রূঢ় মানবের কাঁধ। মুগ্ধ নির্লিপ্ত চাহনি দিলো শুধু। একটুখানি ঝুঁকে এসে মেঝে হতে আলগোছে তুলে নিলো মাহি’র জুতোজোড়া। অতঃপর সপ্তদশীকে নিয়েই এগোলো সম্মুখে। মাহি হতভম্ব! হতভম্ব কন্ঠে আওড়াল,
“ কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?”
“ কলকাতা!”

এহেন নির্লিপ্ত প্রতুত্তরে আকাশ ভেঙে পড়ল মাহি। তাকিয়ে রইল বিস্ময় নিয়ে। পরমুহূর্তেই লোকটার ওমন উদ্দেশ্যকে সরাসরি নাকচ করবার পায়তারা না দেখিয়ে, উল্টো অধর ভিজিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গে বলল,
“ আমি কিউটিকে ছাড়া যাব না। ওকে এনে দিন আগে।”
মুগ্ধ হাঁটছে। পেন্টহাউজ ছেড়ে নামছে পাহাড়ি আঁকাবাকা পথ দিয়ে। নির্বিঘ্নে আচমকা অদ্ভুত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ওলে লে লে লে! আমার সোনা পাখিটা লে। কিউটিকে লাগবে সোনা?”
হা করে তাকিয়ে রইল মাহি। এ আবার কোন লোক? তবুও নিজের হতবাকতা সাইডে চাপিয়ে সে আওড়ায়,
“ হুম এনে দিন ওকে!”
“ ওক্কে গো! এনে দিব। কিন্তু তার আগে যে আমারও একটা শর্ত মানতে হচ্ছে তোকে বান্দীর মেয়ে।”
“ কি শর্ত?”
“ শর্ত হচ্ছে — ঐ বান্দীর ছেলেকে আনার পর তোকে একদিক দিয়ে কাটব, আরেকদিক দিয়ে ওকে কাটব। তারপর দু’জনকে একসঙ্গে বারবিকিউ করে প্রাডাকে খেতে দিব। বল এবার! শর্তে রাজী? থাকলে তুই রাজি, এক্ষুণি ডাকব কাজী।”
সহসা আঁতকে উঠে মাহি। মুখ গোমড়া করে বলে ওঠে,
“ থাক লাগবেনা।”

রানওয়ের পথ ধরেছে মুগ্ধ। মাহি এতক্ষণ চুপ থাকলেও আচমকা বলে উঠল,
“ আরেহ! আমাকে অন্তত একটা ব্যাগ তো নিতে দিন। শুধু হাত আর পা নিয়ে গেলে থোড়াই চলবে!”
সপ্তদশীর উদ্বিগ্ন বাক্যে নির্লিপ্ত রূঢ় মানব। পায়ের গতি সচল তার। শক্তপোক্ত হাতের বিশাল জোরে তুলে রেখেছে তুলোর সাদৃশ মানবীকে। অন্যহাতে নির্বিকারে ধরে রেখেছে সপ্তদশীর জুতো জোড়া। মাহি দু’হাতে জড়িয়ে রেখেছে মুগ্ধের ঘাড়। ইতস্তত কন্ঠে আওড়াচ্ছে এক-দু অক্ষর! রূঢ় মানব নিরবে শুনে যাচ্ছে সব। দূর্দম্য পায়ের গতি তার এগোচ্ছে অদূরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাইভেট জেটের পানে। নিষ্পাপ রমণী ফের ইতস্ততায় আওড়াল,
“ অন্তত পরার জন্য কিছু….”
বাক্যটুকু সিক্ত জিভ খসে বেরুনোর ফুরসত অব্দি পেলো না বোধহয়, তার পূর্বেই মাহি’র কর্ণকুহরে পৌঁছাল মুগ্ধের নির্লিপ্ত কণ্ঠ!

“ তুই কিছু না পরলেও আমার কোনো অসুবিধে নেই সিগনোরা! বরং এতে আমার অর্ধেক কষ্ট কমে যাবে! ইউ্য নো না? আই জাস্ট হেট ওয়েস্টিং টাইম।”
রূঢ় মানবের এহেন বেফাঁস প্রতিত্তোরে লজ্জায় মরি মরি অবস্থা মাহি’র। তক্ষুনি নত হলো তার ঘাড়। কপোলদ্বয়ে হুট করেই দেখা মিললো একরাশ লজ্জালু লালিমা। উপচে পড়া লজ্জাগুলোতে একপ্রকার ঢাকনা দিয়ে মানবী ত্বরিত ঝাঁঝ ঢালল কন্ঠায়! দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ আপনার মুখে কি একটুও লাগাম নেই নির্লজ্জ, বেয়াদব লোক?”
গালের ভাঁজে জিভ ঠেলল মুগ্ধ। পরপরই রুক্ষ দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করল পিয়ার্সিং করা নিজ নিম্নাংশের ঠোঁট। কন্ঠে দুষ্টুমির প্রলেপ লেপে আওড়াল,

“ শুধু মুখে নয়, আরও বহুকিছুতেই লাগাম নেই আমার। তুই চাইলে এক্সপেরিমেন্ট করিয়ে দেখাতে পারি!”
সহসা জিভের ডগায় দাঁত বসালো মাহি। আলগোছে চাপড়ালো নিজ কপাল। কোন কুক্ষণে এই লোকটার সঙ্গে কথা কথা বলতে এসেছিল সে! মাহি মুখ কুঁচকে নেয় বিরক্তিতে। খানিক বাদেই ফের গমগমে গলায় বলে ওঠে,
“ সেখানে গিয়ে পরবটা কী? কিছুই তো নিতে দিচ্ছেন না!”
তক্ষুনি পায়ের গতিতে রুখ টানল মুগ্ধ। পর্বত শৃঙ্গের ন্যায় সুউচ্চ দাম্ভিক ঘাড়টা বাঁকিয়ে তাকাল পরপরই। দৃষ্টি করল তীক্ষ্ণ। ঠোঁটের কোণে আচমকা এক চিলতে রহস্যময় বাঁকা হাসির রেশ টেনে, কন্ঠে একরাশ অহংকারী আভিজাত্য ঢেলে শুধালো,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫০

“ জাস্ট চিল মা’ই গার্ল! সামান্য কিছুর জন্য রুশদী’র সিগনোরার এতো চিন্তা মানায় না। তোর কাজ শুধু রানীর মতো থাকা! বিনিময়ে তোর পায়ের কাছে গোটা সাম্রাজ্যের সুখ এনে দেয়ার দায়িত্ব কেবল আমার। যখন যা লাগবে জাস্ট চোখ বুঁজে মনে মনে ভেবে নিবি একবার, চোখ খুললেই দেখবি — সামনে হাজির! এক্ষেত্রে কাপড় তো নেহাৎ হাতের ময়লা মাত্র! কলকাতার মাটিতে তোর কদম স্পর্শ করার পূর্বেই রায় জমিদার বাড়িতে গোটা একটা মার্কেট চলে আসবে সিগনোরা! সো…. ঐসব চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে জাস্ট ফোকাস অন মি!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here