মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৩
jannatul firdaus mithila
“ এক্ষুনি আমার জন্য আইস বাথের ব্যবস্থা কর! ওহ…ফা’ক তারাতাড়ি!!!!!”
রূঢ় মানবের বিকট হুংকার! যার ঝাঁঝ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে রায় জমিদার বাড়ির প্রতিটি দেয়ালের কোণে। নিজ আরাম কক্ষে আলোচনায় মত্ত থাকা কর্তা এবং কর্তাগিন্নি কেমন হুট করেই চমকে উঠলেন এহেন হুংকারে। খানিকক্ষণ বেভুলার ন্যায় একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন দুই মানব-মানবী। হতভম্ব কর্তাগিন্নি স্বামীর পানে তাকিয়ে থেকে আগ বাড়িয়ে অস্ফুট কন্ঠে আওড়ালেন,
“ এটা অধীরের গলা না? ও এমন হুংকার দিচ্ছে কেনো?”
একইরকম হতভম্বতার সাগরে গলা অব্দি ডুবে আছেন হিমাংশু রায়। চোখদুটোতে সন্দিষ্ট প্রতিচ্ছবি! পরপরই গম্ভীর মুখাবয়বে সন্দিগ্ধ কন্ঠে প্রতুত্তর করলেন,
“ আমারও তো তাই মনে হচ্ছে! চলো তো গিয়ে দেখি, আবার কার কপালে শনি লেগেছে।”
বাক্যটুকু ব্যায় হতে সময় লাগলেও কর্তা বাবুর পায়ে গতি টানতে সময় হলো না যেন। তিনি তড়িৎ বেগে ছুটলেন কক্ষের বাইরে। পিছুপিছু তার লেজ ধরেছেন সুদীপা রায়। ব্যস্ত পদযুগলে দোতলার কাঠের বারান্দায় এসে খানিক উঁকি দিতেই দৃষ্টি ঠেকল অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গনে। যেথায় সারিবদ্ধ আকারে ছুটছে বেশ কতক কালো পোশাকধারী সশস্ত্র গার্ডস। মুহুর্তেই কপাল গোছালেন হিমাংশু রায়। গম্ভীর মুখাবয়বে রেলিঙের দ্বার ঘেঁষে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালেন তিন তলার দিকে। ওমনি দৃশ্যপটে আটঁকালো রূঢ় মানবের লাল হয়ে আসা সুদর্শন মুখখানা। অজানা অস্থিরতায় কাঁপছে তার পাহাড়সম দেহটা। বাজখাঁই কন্ঠে ফের হুংকার ছুঁড়ল —
“ ডু ইট ফাস্ট বাস্টা’র্ডস!”
সর্বাত্মক গতিতে ছুটছে গার্ডস। দাঁড়াবার একমুহূর্ত ফুরসতও নেই তাদের নিকট। হিমাংশু রায় পা বাড়ালেন এবার। গম্ভীর মুখে গটগটিয়ে এগোলেন সিঁড়ির পানে। পাদু’টো বাঁকা পথে মোড় নিতেই যাবে ওমনি তিন তলার প্রশস্ত কাঠের সিঁড়িগুলো বেয়ে ধুপধাপ শব্দ তুলে নেমে আসে মুগ্ধ। পেটানো দেহখানা বড্ড ঘর্মাক্ত তার। মাথাভর্তি বাদামী রঙা ওলফ-কাট দেয়া চুলগুলো এলোমেলো! চোয়ালের পেশি টানটান করে যুবক নামছে সিঁড়ি বেয়ে। হিমাংশু রায় তাকে দেখেই খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন। দু’টো বাক্য আওড়ানোর উদ্দেশ্যে ঠোঁট নাড়াবেন তার পূর্বেই মুগ্ধ একপ্রকার উপেক্ষা করে বসল তাকে। দেখেও না দেখার ভান ধরে মোড় টানল পায়ের গতিতে। অতঃপর চোখের পলকে দৃশ্যপট হতে আড়াল হলো রূঢ় মানব। হিমাংশু রায় কেবল হা করে তাকিয়ে রইলেন। পেটে আসা বাক্যটুকু জিভের ডগায় আনার পূর্বেই তা গিলে ফেললেন বিনা জলে।
রায় জমিদার বাড়ির সুবিশাল অন্দরমহল হতে প্রায় খানিকটা দূরে বহু আগে নির্মিত হয়েছে একখানা ছোট্ট একতলার দালান। লাল ইটের মোটা মোটা দেয়াল তার, শ্যাওলা ধরা চুনসুরকির গা! সময়ের ক্ষয়ে বিবর্ণ হয়েছে খিলানগুলো। নান্দনিক কারুকার্যের সুবিশাল দরজার গা হতে প্রায় ২৬ বছর পর খুলেছে তালার আবরণ। সরু ইট বিছানো পথ দিয়ে দালান পানে এগোচ্ছে টালমাটাল দুটো বলিষ্ঠ কদম। পথের দুপাশে আজ্ঞাকারীর ন্যায় নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে মনস্টার’স গার্ডস। মুগ্ধ ছুটছে একপ্রকার। অস্থির পাদুকা তার, স্নানকক্ষের দালানে প্রবেশ করতেই তটস্থ হলেন বাদবাকি গার্ডেরা। তক্ষুনি নতমুখে সিটিয়ে দাঁড়ালেন কক্ষের একপাশে। রূঢ় মানব সেদিকে বেখেয়ালি। চটজলদি স্নানকক্ষের পানিভর্তি বিশাল চৌবাচ্চার পানে এগিয়ে এসে দিলেন একঝাঁপ! মুহুর্তেই তার পাহাড়সম দেহের ভারে পানির একাংশ কেমন উপচে পড়ল চৌবাচ্চার দেয়াল হতে। বড়ো বড়ো বরফ খন্ড ভাসছে পানিতে, ফলে পানির তাপমাত্রা হয়েছে বরফঠান্ডা!
সে-ই হাড় হিম করা ঠান্ডা পানিতে মাথা শুদ্ধ পুরো বদন ডুবিয়ে দক্ষ কায়দায় সাঁতরাচ্ছে মুগ্ধ। থামল খানিকবাদে। বিশাল চৌবাচ্চার অপর প্রান্তে গা ঘেঁষে দাঁড়ায় মুগ্ধ। এক’হাতে আলগোছে কপাল হতে পেছন দিকে ঠেলে দেয় সিক্ত বাদামী চুলগুলো। লম্বা লম্বা নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে চোখদুটো বুঁজে এলো আপনাআপনি। হিমশীতল পানির সংস্পর্শে এসে কয়েক মুহূর্তেই স্নায়ুতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ খানিকটা প্রশমিত হলো রূঢ় মানবের। সংকুচিত হলো ত্বকের র*ক্তনালী। অস্বাভাবিক অস্থিরতা খানিকটা নিয়ন্ত্রণে এলো তার। স্তিমিত হলো কিছুক্ষণ আগে জাগ্রত হওয়া নিষিদ্ধ অস্থিরতার আভাস। স্বাভাবিক হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ! ধীরলয়ে চোখের পর্দা সরায় সুদর্শন। ফুলেফেঁপে থাকা বলিষ্ঠ হাতদুটো আলগোছে তুলে দেয় চৌবাচ্চার দেয়ালের গায়ে। পানির তলে দোদুল্যমান দেহখানি টানটান করে রেখে আচমকা বাঁকা হাসে মুগ্ধ। মুহুর্তেই হালকা খাঁজযুক্ত দৃঢ় চোয়ালখানা খানিক নড়ল তার। দাঁত বসল পিয়ার্সিং করা অধরের কোণে। শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে কন্ঠ ফুঁড়ে বেরুলো —
“ সামান্য একটা ডিপকিসে-ই এ হাল আমার বান্দীর মেয়ের? তাহলে তো পুরো হ্যাংকি-প্যাংকি এপ্লাই করতে গেলে খুঁজেই পাওয়া যাবে না তােকে! উফফফ.. সো স্যাড।”
বাক্যটুকু আওড়ে ফের সম্মুখে এগোলেন রূঢ় মানব। ডোবালেন নিজ বলিষ্ঠ দেহ। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে চিৎ হয়ে সাঁতার কাটছে এবারে।
মুগ্ধের সিক্ত গা! পেটানো উম্মুক্ত গা হতে চুইয়ে পড়ছে পানিরকণা। ভি-শেইপের মেদহীন কোমরের বেশ নিচে আঁটকে আছে ঘিয়ে রঙা ঢিলেঢালা ট্রাউজারের গা। সিক্ত বাদামী চুলগুলো কেমন এলোমেলো আকারে লেপ্টে আছে সুদর্শনের ফর্সা কপালে। ঘাড় বেয়ে চুইয়ে পড়ছে পানি। ভাবলেশহীন পায়ের ভঙ্গি মুগ্ধের। পাইথন ট্যাটু শৈলীতে অঙ্কিত ফুলেফেঁপে থাকা বলিষ্ঠ হাতদুটো প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। ঠোঁটের ফাঁকে চেপে আছে জ্বলন্ত ক্রুটস নিকারাগুয়ান। যার কলুষিত ধোঁয়া উড়ছে মানবের সুশ্রী গৌরবর্ণ মুখের চারপাশে। তার পিছুপিছু একঝাঁক প্রশিক্ষিত গার্ডস। দুরত্ব রয়েছে দু-হাতের।
র*ক্তলাল আবরণে সুসজ্জিত নিরুর ভাসা ভাসা চোখদুটো। ভঙ্গুর হৃদয়ের ছাপ বসেছে কাঞ্চা সোনা গড়নের সুশ্রী মুখমণ্ডলে। খানিকটা বোঁচা অথচ মায়াবী নাকের ডগাটায় জমেছে লালিমা। দু’হাতে তার আঁকড়ে ধরা একখানা সফেদ রঙা তোয়ালে। গা লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অন্দরমহলের নিচতলার গোলাকার ভিম ঘেঁষে। পাশেই সুদীপা রায়। সর্তক দৃষ্টি উঁচিয়ে তাকাচ্ছেন এদিক-ওদিক। যেন তার চোখদুটো কারো অপেক্ষায় অপেক্ষায়িত। সময়ের দৈর্ঘ্য খুব একটা প্রশস্ত হলো না বোধহয়। কর্তাগিন্নির অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অন্দরমহলে পা পড়ল মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার খ্যাত অধীর রায়ের। তাকে দেখামাত্রই কর্তাগিন্নি উদ্বিগ্ন হলেন। তড়িঘড়ি করে মেয়ের ডানহাতের বাহু আঁকড়ে তাকে একপ্রকার ঠেলতে ঠেলতে আওড়ালেন,
“ যা যা! তারাতাড়ি যা। হাতের তোয়ালেটা দিয়ে আয় অধীরকে। পারলে একটু-আধটু কথা বলিস।”
নিরু মুখ কুঁচকায়। কপালে ঘৃণার ছাপ ফুটিয়ে চাপা স্বরে আওড়ায়,
“ পারব না আমি মা! তুমিই নিয়ে যাও তোয়ালেটা।”
তড়াক চোখ পাকিয়ে তাকালেন সুদীপা রায়। দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলেন দু’টো কটু বাক্য আওড়ানোর উদ্দেশ্যে। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলালেন তিনি। বড্ড বিচক্ষণিক্ষণি কৌশলে খানিকটা এগিয়ে এলেন মেয়ের সন্নিকটে। মুখ নামিয়ে চাপা স্বরে শুধালেন,
“ আহা! হবু বরের সঙ্গে কথায় কথায় ওতো রাগ করতে নেই মা। আমিতো বললাম, অধীরের সঙ্গে ঐ যাচ্ছে তা-ই দু’দিনের মেয়েটার কোনো সম্পর্ক নেই। বিশ্বাস নাহলে তোর বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। তুই ঘর ছেড়ে যাবার পর অধীর নিজের মুখে আমাদের বলেছে — মেয়েটার সাথে ওর কোনো সম্পর্ক নেই। কি একটা কাজের জন্য না-কি ওকে কলকাতায় এনেছে। ক’দিন পর ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে ওকে। তাছাড়া তুই তো জানিস নিরু, অধীর কোনো নারীর সান্নিধ্য পছন্দ করেনা। তারপরও নিজের হবু বরের বিরুদ্ধে কিভাবে ওমন উল্টাপাল্টা চিন্তা করিস বলতো?”
সপ্তদশীর অবুঝ মন। গর্ভধারিনীর আওড়ানো বাক্যগুলো বড্ড সহজে বিশ্বাস করল বুঝি। মুহুর্তেই অদৃশ্য পাথরটা বুকের ওপর থেকে সরে গেল তার। ঘাড় বাকিয়ে তাকাল মায়ের মায়াবী মুখপানে। কন্ঠে নামালো অদ্ভুত শঙ্কা!
“ সত্যি বলছো মা?”
কন্ঠায় হুট করেই ব্যাথা অনুভব করলেন কর্তাগিন্নি। অপরাধবোধে এলোমেলো ভঙ্গিতে লুকোলেন দৃষ্টিজোড়া। বুক ফুলিয়ে লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলে চোখ খিঁচে বলে উঠলেন,
“ হ্যাঁ!”
অবুঝ মেয়েটার সুখ দেখে কে! চোখদুটোর কার্নিশে মুহুর্তেই হানা দিলো কয়েক দানা অশ্রু। চটপট হলো পায়ের গতি। একপ্রকার ব্যগ্র ভঙ্গিতে প্রায় উড়ে এসে মুহুর্ত ব্যয়েই দাঁড়াল রূঢ় মানবের সম্মুখে। তক্ষুনি পায়ের গতিতে রুখ টানল মুগ্ধ। শক্ত চোয়ালে ভ্রুযুগল কুঁচকে তাকাল মেয়েটার পানে। একহাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে তোয়ালে বাড়িয়েছে নিরু। নতমস্তকে, শর্মিলা কায়দায়। মিনমিনে স্বরে বলে ওঠে,
“ ভেজা গায়ে বেশিক্ষণ থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে আপনার! নিন, তারাতাড়ি তোয়ালেটা দিয়ে গা মুছে ফেলুন।”
কটমট শব্দ তুললো রূঢ় মানবের দাঁতকপাটি। মুখাবয়বে ফুটে উঠল একরাশ বিরক্তির ছাপ। সে তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকিয়ে গলা টানল। মুখভর্তি একদলা থুতু এনে আচমকা ফেলে দিলো নিরুর ঠিক পাশে। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় নিরু। গুটিয়ে নেয় নিজ বাড়ন্ত হাতখানা। জড়সড়ভাব ধরতেই সম্মুখ থেকে ভেসে আসে রূঢ় মানবের রুক্ষ কন্ঠস্বর।
“ ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার কাম ইন ফ্রন্ট অফ মি। নয়তো নেক্সট টাইম থুতুটা মাটিতে নয়, তোর মতো বালপাকনার মুখ বরাবর ফেলব। মাইন্ড ইট!”
সহসা আহত দৃষ্টি তুলে সুদর্শনের মুখপানে তাকায় নিরু। অথচ তার ওমন হাবভাবে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ না দেখিয়ে পা ঘোরায় মুগ্ধ। গটগটিয়ে হেঁটে চলে যায় সিঁড়ির পানে। এদিকে তার চলে যাওয়ার পথে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নিরু। ঢোক গিলে বোধহয় থামাতে চাইছে নিজ উপচে পড়া কান্নাগুলো!
নিস্তব্ধতায় মোড়ানো তিনতলার একদম কর্নারের কক্ষটি। মুগ্ধের দাম্ভিক কদমজোড়া মাত্রই প্রবেশ করল ভেতরে। পূর্বের ন্যায় দাম্ভিক ভাবখানা বজায় রেখে এগোচ্ছে বিছানার দ্বারে। অচেতন মানবী কেমন নিস্তেজ আকারে পড়ে আছে মখমলি বিছানার কোলে। রূঢ় মানব একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার ঘুমন্ত মুখপানে। বলিষ্ঠ ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে ঠোঁটের কোণ হতে নামিয়ে আনলো সিগারটা। অতঃপর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে ধীরলয়ে ঘাড় ঝুঁকিয়ে দাঁড়াল মাহি’র মুখের ওপর। দুষ্ট কন্ঠে শুধালো,
“ আমার মতো আস্ত একটা অশান্তির গোডাউনকে জাগিয়ে রেখে, নিজে কি করে ওতো শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছিস বান্দীর মেয়ে? আমার দুচোখ যে আর নিতে পারছেনা তোর এতো শান্তি, স্বস্তি!”
ঘুমন্ত মাহি থোড়াই শুনল এসব। সে যে ক্লান্ত! পরিশ্রান্তিতে মুদেছে দু-চোখ। তার ক্ষুদ্র মুখখানা কেমন অদ্ভুতভাবে লাল হয়ে উঠেছে। গভীর ক্ষততে সজ্জিত নরম তুলতুলে অধরযুগলের বেগতিক দশা। মুগ্ধ নিষ্পলজ চেয়ে আছে সেদিকে। আনমনে তর্জনীর ডগা উঁচিয়ে মেয়েটার অধরযুগল একটুখানি ছুঁতেই কপাল কুঁচকে গেল সুদর্শনের। গম্ভীর হলো মুখাবয়ব। বাড়ন্ত হাতখানা তক্ষুনি বিচলিত ভঙ্গিতে উঠে এলো রমণীর মসৃণ ললাটে। ওমনি মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল মুগ্ধের। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে মেয়েটার। তারজন্যই বোধহয় মুখটা ওমন লালাভ আবরণ ধরেছে। মুহুর্তেই মুগ্ধের অস্থিরতা আকাশ ছুঁলো। পাগল প্রায় ভাব ধরল দ্য শ্যাডো মনস্টার। অস্থিরতায় গলা শুকিয়ে কাঠ তার। দু’হাতের রুক্ষ আঁজলায় তক্ষুনি চোয়াল তুললো মাহি’র। বিচলিত কন্ঠে ডাকল —
“ এ্যাই! সি-সিগনোরা। সি-সিগনোরা। আর ইউ্য ওকে? কি হয়েছে তোর? এ্যাই মেয়ে! চোখ খোল। তোর জ্বর এলো কেনো? কি করে এলো? তোর কষ্ট হচ্ছে না? তাকা আমার দিকে। তোর কষ্ট হচ্ছে না?”
মানবীর মসৃণ মুখখানায় ফ্যাকাশে প্রলেপ বসছে ক্রমশ। তা অবলোকন হতেই হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা বাড়ল মুগ্ধের। তড়িঘড়ি করে নরম টানে সপ্তদশীকে এক ঝটকায় তুলে নিলো পাঁজা কোলে। রমণীর উষ্ণ দেহখানা নিজ শীতল দেহের সনে লেপ্টে রেখে ফের আওড়াল,
“ তাকা না সিগনোরা! ওঠ। উঠে গালি দে আমায়। দেখ তোকে আমি কোলে নিয়েছি। মুখ ঝামটি দে! ঝামটি দিয়ে অসভ্য ডাক একবার। ডাক না সিগনোরা! এ্যাই! এ্যাই মেয়ে, আমার বুক কাঁপছে। ডোন্ট… ডোন্ট ডু দ্যাট। তারাতাড়ি ওঠ! স্ট্রেঞ্জ! আমার নিশ্বাস আঁটকে যাচ্ছে সিগনোরা।”
অদ্ভুত অশান্তিতে মুড়িয়ে গেল রূঢ় মানব। খেয়াল করল — তার নিশ্বাস আঁটকে আঁটকে যাচ্ছে। প্রথমবার গলার কাছে নিশ্বাস আঁটকে যাবার বিদঘুটে অনুভূতি টের পেলেন মাফিয়া বিস্ট। বুকের খাঁচায় লুকিয়ে থাকা অঙ্গটির ধড়াস ধড়াস তো আছেই। সে তক্ষুনি টলমল পায়ে এগোলো দুয়ারের কাছে। মেয়েটাকে কোলে নিয়েই করিডরের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফের গর্জে উঠে বলল —
“ ওখরানা!!”
(গার্ডস!)
বিদ্যুৎ বেগে ছুটে এলেন পাহারারত রক্ষীদের দল। ঘাড় নুইয়ে প্রশস্ত অঙ্গনে পা রাখতেই ফের শোনা গেল মনস্তারের কঠিন হুংকার!
“ চেরেজ ত্রিদ্ৎসাত মিনুত। দাস্তাভতে স্যুদা লুচশিখ ভ্রাচেই কালকুত্তি। পাভতারাইউ: উ ভাস ফ্সিভো ত্রিদ্ৎসাত মিনুত।”
(আধঘন্টার মধ্যে কলকাতার সেরা ডাক্তারদের তুলে নিয়ে আয় এখানে। আই রিপিট, জাস্ট আধঘন্টা!)
হুকুম তামিলে মত্ত হলেন সকলে। যথাসম্ভব দ্রুত বেগে ছুটলেন উল্টোপথে। মুগ্ধ উদ্বেগ নিয়ে মেয়েটাকে নিজ রুক্ষ বক্ষভাঁজের সনে চেপে রেখেছে আলগোছে। এ দৃশ্য অন্য কেউ না দেখলেও অদূরের দোতলার করিডর থেকে স্পষ্ট দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন হিমাংশু রায়। স্পষ্ট বুঝলেন মুগ্ধের বলা রাশিয়ান কথাগুলো। পরপরই মুখটা বড্ড গম্ভীর হলো তার। কোমরের পিঠে বেঁধে গেল হাতদুটো। গম্ভীর কন্ঠফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ একটা সামান্য মাশুকার জন্য এতোটা উদ্বেগ? এ-ই মেয়ে আসলেই রুশদী’র মাশুকা তো? না-কি তারচেয়েও বেশিকিছু?”
গভীর রাত! পুরনো রায় জমিদার বাড়ির পেছন পথ দিয়ে একে একে প্রবেশ করানো হচ্ছে চিকিৎসকদের। একজন নয়, দুজন নয়— কলকাতার একাধিক নামকরা চিকিৎসক! নিরাপত্তার শক্ত বলয়ে ঘিরে আনা হয়েছে তাদের। কারো চোখ বাঁধা কালো পট্টি দিয়ে, কারো আবার হাতদুটো! কারোর মুখে স্কচটেপ। ঘুম ঘুম চোখে কেউই টের পেলো না — তারা এমুহূর্তে কোথায় যাচ্ছে , কার কাছে যাচ্ছে। অন্দরমহলের সিড়িঁ বেয়ে অন্ধের ন্যায় উঠতে উঠতে ব্যপক আগ্রহ মিশ্রিত কৌতুহলে একজন চিকিৎসক হুট করেই জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ দাদারা! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা নাহয় না-ই বললেন, কিন্তু কার ওমন জরুরি তলবে ধরে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছেন, তা অন্তত বলুন।”
তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর আসেনি তেমন। ধীরলয়ে পেছন থেকে শোনা গেল কারোর গম্ভীর কন্ঠস্বর। আমেরিকান একসেন্টে আওড়ালেন,
“ কে ডেকেছে তার বিষয়ে জানতে না চেয়ে, বলেন — গু লি করে মে’রে দিই। আপাতত শুধু এটুকু জেনে রাখুন যে মানুষটি আপনাদের ডেকেছে, তার আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা কলকাতার খুব কম মানুষেরই আছে। শত হলেও শ্যাডো মনস্তার বলে কথা!”
মুহুর্তেই সর্বাঙ্গে ঝংকার দিয়ে উঠল সকলের। বিভিন্ন ডার্ক ওয়েবসাইটে ট্রেন্ডিং হট টপিকে থাকা বিশেষ নাম — দ্য আন্ডারওয়ার্ল্ড শ্যাডো মনস্তার, তার খবর জানেনা এমন কে আছে শুনি? তার হিং স্রতার নিত্যনতুন খবরাখবর ব্লগ আকারে পেশ করাই থাকে, বিভিন্ন এজেন্টের আকর্ষণের শীর্ষে। সেদিক থেকে মনস্টারের বিষয়ে টুকটাক অবগত সকলে।
বিশাল কক্ষের বাইরে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চিকিৎসকেরা। কাঁপছে তাদের হাঁটু! হাতদুটো জমে যাচ্ছে ভয়ে। ঘাড় যে সে-ই কখন থেকে ঝুঁকিয়েছেন তার হিসেব নেই। সকলে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন একে একে। মাঝেমধ্যে কক্ষ থেকে ভেসে আসে হুটহাট শ্যুট করার বিকট শব্দ! তা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই মুখাবয়বে ভয়ের ছাপ বাড়ে সকলের।
সময় পেরুলো মিনিট পাঁচেক। ভেতর থেকে হুট করেই বার্তা এলো — একযোগে ঢোকার। ওমনি সকল চিকিৎসকেরা ধীরলয়ে প্রবেশ করলেন কক্ষে। অদূরের বিশাল কাউচে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন মাফিয়া বিস্ট! তার ঠিক পদতলে অবহেলিত আকারে পড়ে আছে দু’দুটো মানবদেহ৷ লহুতে মাখামাখি অবস্থা তাদের। সদ্য গু লি লাগায় প্রাণ পাখি উড়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। মানবের গা ঢাকা তার চিরচেনা অবয়বে। মুখটা আড়াল করা কালো রঙা গোলাকার টুপির আড়ালে। মাস্কের ওপর দিয়েই অনবরত ফুঁকছে সিগার। আচমকা শক্ত কন্ঠে আওড়াল
“ ওর চিকিৎসা কর!”
একমুহূর্ত স্থির থেকে সকলের দৃষ্টি ঠেকল অচেতন মাহি’র পানে। ওমনি নিজেদের অবস্থান ভুলে গিয়ে চিকিৎসাধর্মে লিপ্ত হলেন সবাই। উদ্বিগ্ন হলেন রোগীকে নিয়ে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বিশাল কক্ষে আগে থেকেই আনা হয়েছে চিকিৎসার সকল প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, মেশিন! যত্রতত্র এগোলেন সবাই। লেগে পড়লেন যার যার কাজে। অদূর থেকে রূঢ় মানব ঠায় দৃষ্টে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে।
সময় পেরুলো মিনিট বিশেক! ওমনি অস্থিরতায় ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল রূঢ় মানবের। সহসা শক্ত চোয়ালে কটমট কন্ঠে হুংকার ছুঁড়লেন,
“ আর কতক্ষণ লাগবে ওর জ্বর কমতে? আর কতক্ষণ লাগবে ওর জ্ঞান ফিরতে বাস্টা’র্ডস? এখনো ওর জ্ঞান ফিরল না কেনো? কিসের ডাক্তার হয়েছিস তোরা?”
তৎক্ষনাৎ ঘাবড়ে গেলেন সকলে। সাহসী একজন আগ বাড়িয়ে শুষ্ক ঢোক গিলে আমতা আমতা করে শুধালেন,
“ স্যার…না মানে..মনস্টার উনি…!”
বাক্যটুকু জিভ খসানোর পূর্বেই সম্মুখ থেকে একখানা শক্তপোক্ত হাতের হিং স্র থাবা ছুটে এসে আচানক আক্রমণ বসালো বেচারা ডাক্তার সাহেবের অমসৃণ গ্রীবাদেশে। মুহুর্তেই ভয়ে সটান হলেন সবাই। পিছিয়ে গেলেন দু-কদম। এদিকে হাতের সে-কি জোর রূঢ় মানবের! ধীরলয়ে চিকিৎসকের গ্রীবা আঁকড়ে পাদু’টো তুলছে শূন্যে। চিকিৎসক পাতলা মানুষ। গলায় ফাঁস অনুভব হচ্ছে তার। এক্ষুণি বোধহয় ভেঙে গুড়িয়ে যাবে বেচারা ডাক্তার সাহেবের কন্ঠনালীর নরম হাড়। সম্মুখের রূঢ় মানব তখন মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিজ দৃঢ় চোয়ালখানা নাড়িয়ে চাড়িয়ে ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে আওড়াল —
“ ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টু কল অর মেনশন হার! জাস্ট ফোকাস অন হার ট্রিটমেন্ট।”
তৎক্ষনাৎ শুকনো ঢোক গিললেন সবাই। বাচাঁর প্রয়াসে আগে-ভাগেই ব্যগ্র হয়ে ছুটলেন এদিক-ওদিক। এরইমধ্যে দু’জন অভিজ্ঞ ডাক্তার এগিয়ে এসে কি যেন একটা বলতে চাইলেন মাফিয়া বিস্টকে। তবে তা আর হতে দিলেন না মাফিয়া বিস্ট। উল্টো শক্ত চোয়ালে ফের হুংকার ছুঁড়ে শুধালো,
“ নো মোর ওয়ার্ডস! প্রাণে বাঁচতে চাইলে এজ সুন এজ পসিবল ওকে সুস্থ কর। ওর অসুস্থতা আমার গায়ে কাঁটার ন্যায় বিঁধছে। যে তীক্ষ্ণ কাঁটার আঘাত মোটেও সহ্য হচ্ছে না আমার।”
থমকে গেলেন চিকিৎসকেরা। থমকে গেল তাদের অভিব্যক্তি। যথাসম্ভব দক্ষ এবং শান্ত মেজাজে ফের উদ্বেগী হলেন মেয়েটার চিকিৎসায়। রূঢ় মানব তক্ষুনি ছেড়ে দিলো ডাক্তারের সুদীর্ঘ কন্ঠনালী। ছাড়া পেতেই পাতলা মানুষ একপ্রকার আছাড় খেলো মেঝেতে। কাশতে কাশতে চেপে ধরলেন বুক! আরেকটু হলেই মরণ নিশ্চিত ছিল তার। মুগ্ধ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল নিজ জায়গায়। এবার আর পেছালো না সে। অপলক তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে।
গুনে গুনে পার হলো আর ১০ মিনিট। অস্থিরতার চরম শিখরে পোঁছেছে মুগ্ধ। রাগে গজগজ করতে করতে আচমকা কোমরের পিঠ থেকে বের করে আনলো রাশিয়ান মডেলের ব-ন্দু-কটা। যার শীতল ধাতব নলখানা গিয়ে ঠেকল ডাক্তারদের পিঠ বরাবর। মুহুর্তেই স্থির হয়ে গেলেন সকলে। রূঢ় মানব হুংকার ছুঁড়ে আওড়ালেন,
“ এখনো ওর জ্ঞান ফেরাতে পারলি না কেনো বাস্টা’র্ডস? প্রাণের মায়া নেই তোদের?”
কন্ঠ শুকিয়ে কাঠ হলো বেচারাদের। তন্মধ্যে বয়স্ক এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন মনস্টারের পেছনে। মিনমিনে স্বরে ডাকলেন,
“ ম-ম-মনস্তার!”
তক্ষুনি পিছু ঘুরল মুগ্ধ। হাওয়ার বেগে বন্দুকের নলটা গিয়ে আচানক ঠেকল বয়স্কের কপাল বরাবর। সহসা ভড়কে গেলেন লোকটা। দূর্বল পায়ে হুট করেই হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লেন জমিনে। কন্ঠে ভয়ের ছাপ থাকা স্বত্বেও ধীরস্বরে শুধালেন,
“ মনস্তার! পেশেন্টের ব্লাড প্রেশার, পালস রেট, অক্সিজেন স্যাচুরেশন, চোখের পিউপিল, স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া, ইভেন ইলেকট্রোলাইট চেক করা শেষে, এজ আ নিউরোলজিস্ট আমি শতভাগ নিশ্চিত — দ্য পেশেন্ট হেজ সাইকোজেনিক সিউডোসিনকোপ! অর্থাৎ এটি কোনো শারীরিক অসুখ নয়, বরং ট্রমা-সম্পর্কিত ডিসোসিয়েটিভ স্টুপর।”
বোধগম্যহীন ছাপ ফুটল মুগ্ধের মুখাবয়বে। সন্দিহান কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো —
“ মানে?”
খানিক শান্ত হলেন চিকিৎসক। শুকনো অধরের কোণ জিভ ঠেলে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে ফের আওড়ালেন,
“ আ’ম শিওর, পেশেন্ট হেজ আ ট্রমাটিক পাস্ট মনস্তার। পেশেন্টের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তিনি আজ প্রথমবার নয়, বরং এর আগেও কয়েকবার অতিরিক্ত মানসিক চাপ, কষ্ট কিংবা ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। সাইকোজেনিক সিউডোসিনকোপ সিনড্রোমে আক্রান্ত পেশেন্টরা খুব ছোটবেলাতেই কোনো না কোনোভাবে মারাত্মক ট্রমার শিকার হয়ে থাকে। যার রেশ তাদের মধ্যে বড় হলেও থেকে যায়। যার দরুন, হুটহাট প্রচন্ড মানসিক চাপ, ভয়, কিংবা আতঙ্কিত হলেই এদের নার্ভ স্লো হয়ে যায়। কখনো কখনো তাদের অচেতন থাকার সময় পরিধি ১ ঘন্টা, ২ ঘন্টা কিংবা এর বেশিও হতে পারে। তবে অতিরিক্ত মানসিক চাপ পেয়ে গেলে এদের অবস্থা বেগতিক হতে পারে। এমুহুর্তে ঠিক যেমনটা হচ্ছে পেশেন্টের সঙ্গে। উনি নিশ্চয়ই মানসিক আঘাত পেয়েছে, অথবা গুরুতরভাবে ভয় পেয়েছে বলে আমার ধারণা!”
সহসা পাহাড়সম দেহটায় ঝংকার অনুভূত হলো রূঢ় মানবের। মস্তিষ্ক হলো ফাঁকা। তার সিগনোরার সাইকোজেনিক সিউডোসিনকোপ আছে? মেয়েটা তবে এতো দূর্বল? ছোট থেকেই ট্রমাটিক পাস্ট বহন করে চলেছে? মুগ্ধ নিস্তব্ধ হলো! তার কল্পনার মানসপটে আচানক ভেসে উঠল তারই করা পূর্ব কার্যকলাপ! মেয়েটার গায়ে দিনের পর দিন পশুর মতো হাত তোলা, সারারাত ব্যথায় জর্জরিত থেকে পিচ্চিটার কান্না করা, অতিরিক্ত ভয়ে হুটহাট জ্ঞান হারানো! সবটা… সবটা তো ওর চোখের সামনেই হতো। তারপরও কিচ্ছু টের পেলো না কেনো রুশদী কিং? সে না বিচক্ষণ? আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড়ো বিচক্ষণ উপাধিতে ভূষিত মানব কি করে বুঝলো না মেয়েটার দূর্বলতা? কি করে টের পেলো না তার অন্তরের খবর? প্রতিশোধের নেশায় সত্যিই কি তবে পুরোপুরিভাবে অন্ধত্ব বরণ করেছিল দ্য মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার? আত্ম উপলব্ধিতে জর্জরিত রূঢ় মানব। পা গ ল প্রায় দশা তার। মোটা কন্ঠে কেবল আদেশ ছুঁড়ল!
“ গেট আউট!”
একটিমাত্র বাক্যব্যয়ে কাজ হলো। মিনিট খানেকের মধ্যেই ঘর হলো নিরব, জনমানবশূন্য। এবার বোধহয় নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না মাফিয়া বিস্ট। তক্ষুনি উম্মাদের ন্যায় ছুটে এসে দুয়ার আটকালো ঘরের। অন্তঃকোণের অসহ্য যন্ত্রণায় একটানে গা থেকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে খুললো নিজের পোশাকী আবরন। উম্মুক্ত হলো পেটানো দেহখানা! সুশ্রী মুখমণ্ডলে তার লেপ্টে গেল অপরাধবোধের বিশাল ছায়া। পাদু’টোতে রাজ্যসম ভার নিয়ে রূঢ় মানব গুনে গুনে এগিয়ে এলো মাহি’র বিছানার ধারে। মেয়েটার পাশে একটুখানি জায়গা। বসবে, না-কি বসবে না তা নিয়ে ইতস্তত রূঢ় মানব। ভঙ্গুর ভাবস্রোতে বারেবারে জিভ ঠেলছে গালে। মেয়েটার পানে চেয়ে আছে অপলক। এই মায়াবিনীর ওপরেই এতদিন পশুর ন্যায় অত্যাচার করেছে সে! কি করে মেয়েটার সম্মুখে দাঁড়াবে এ মুখ নিয়ে? ভঙ্গুর ভাবস্রোতে দোনোমোনো করতে করতে অচেতন মেয়েটার পাশে বসল মুগ্ধ। পা গ ল প্রায় দশায় চুলের গোড়া চুলকাতে লাগল অনবরত। বারবার জিভ ঠেলছে সে। বলতে চাইছে অনেককিছু। তবে কান্ড দেখো! অপরাধবোধের শেকলে আটকা পড়েছে রূঢ় মানবের কন্ঠস্বর। তবুও বোধহয় অস্ফুটে কোনমতে বেরুলো,
“ আমি-হ….আমি-হ!”
দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের কন্ঠস্বর কম্পিত ! অদ্ভুতভাবে বাদামী চোখদুটোর কার্নিশদ্বয়দ্বয় চিকচিক করছে ল্যাম্পশেডের মৃদু আলোয়। মস্তিষ্কের কড়া অনুমতির অভাবে নিজ চিরচেনা খোলস পাল্টাতে অপারগ মাফিয়া বিস্ট। নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে অচেতন মানবীর পানে। চোখদুটো ক্রমশ ভরে আসছে তার। আশ্চর্য! মাফিয়াদের কাঁদতে নেই। দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের তো আরও আগে নেই। মুগ্ধ তক্ষুনি নজর ঘোরালো অন্যত্র। নিশ্বাস নিতে না পারার কষ্টে মুখ হা করে রাখল কিয়তক্ষন। গলার উঁচু হাড়খানা সামান্য নাড়িয়ে চাড়িয়ে ঢোক গিলছে মুগ্ধ। ধীরলয়ে ফের তাকাল মেয়েটার পানে। তার শক্ত হাতের রুক্ষ তর্জনীখানা আলগোছে বাড়িয়ে দিলো সে। ছুঁয়ে দিলো রমণীর তুলতুলে গাল। মুহুর্তেই রূঢ় মানবের সুদর্শন মুখাবয়বে অস্তিত্ব ফুটল এক অভিন্ন আত্মগ্লানির। নাকের পাটা ফুলছে বেশ। কন্ঠে ভারী ভঙ্গুর ভাবস্রোত!
“ আমি-হ বোধহয় আর মানুষ হলাম না সিগনোরা! বোধহয় আর ২য় বার মানুষ হলাম না। দ্য গ্রেট রুশদী কিং ওরফে দ্য শ্যাডো মনস্টার হতে গিয়ে আমি বোধহয় ভুলেই গিয়েছি সিগনোরা — আমার গায়ে মানুষের খোলস রয়েছে। অধীর রায়ের নামের সঙ্গে যে-ই মনস্টার নামক পদবীটা লেগেছে, তা হয়তো এখন আমার ব্যাক্তিত্বে মিশে গেছে সিগনোরা। দেখ… আমি হয়তো সত্যি সত্যি মানুষরূপী রাক্ষস হয়ে গিয়েছি! নয়তো একটা সাধারণ মানুষ থোড়াই একটাদিন মানুষের র**ক্তের ঘ্রাণ, স্পর্শ না পেলে পা গ ল হয়?”
থামল মুগ্ধ! একমুহূর্ত স্থবির থেকে আচমকা অচেতন মানবীকে হেঁচকা টানে টেনে নিলো নিজ বুক পিঞ্জরের মধ্যিখানে। বাহুবন্ধনের সস্নেহ পরশে একপ্রকার দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে ঘুমন্ত রমণীকে। নিজ রুক্ষ অধরযুগলের শুকনো স্পর্শে ভরাচ্ছে মাহি’র মাথার অগ্রভাগ। চোখের কোটর বেয়ে ততক্ষণে টুপ করে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা নোনাজল! তা গিয়ে গড়ালো রমণীর তুলতুলে কপোলে। রূঢ় মানব হুট করেই দৃষ্টি ফেলল অদূরের দেয়ালে টানানো মায়ের ছবির পানে। এবারে চোখদুটোতে আর বাঁধ সইলো না তার। নিজ চিরচেনা খোলস ভুলে গিয়ে চিৎকার করে শুধালো,
“ আম্মাআআআআ! ও আম্মাআআআ! কি বানিয়ে দিয়ে গেলেন আমায় আম্মা? কেন বানালেন এমন জানোয়ার? কিভাবে হলাম এতটা পশু? আপনার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আবারও হারতে বসেছি আমি আম্মা! দেখেন কি করেছি আমি! হৃদয় যাকে চেয়েছে, মস্তিষ্ক তাকে আঘাত করতে বলেছে! আমি জানোয়ার আম্মা, জানোয়ারের ন্যায় দুমড়েমুচড়ে দিয়েছি আমার অনুভুতিকে। আমার পিচ্চিকে!”
কাঁদছে মুগ্ধ! একদম অচেনা মানবের ন্যায়। কি করুণ সে কন্ঠ। দু’হাতের আলতো ছোঁয়ায় আবারও ঘুমন্ত মাহি’কে টেনে আনলো মুখের সম্মুখে। মুখপানে অপলক তাকিয়ে থেকে অধর ছোঁয়াল মেয়েটার ফ্যাকাশে ললাটে। কাঁদতে কাঁদতে আবারও আওড়াল,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫২ (২)
“ আমি নিষ্ঠুর, নিকৃষ্ট, রূঢ় তা আমি জানি! আমি হৃদয়ের কথা শুনতে অপারগ, তা আমি জানি! আমি ভীষণ খারাপ পিচ্চি। আমি ভীষণ খারাপ! বাট ট্রাস্ট মি, এই আমি নামক খারাপ মানুষটার সকল নিষ্ঠুরতা, নিকৃষ্টতা, হিং স্রতার অবসান — একমাত্র তোর সন্নিকটে এলেই হয়। একমাত্র তোর সন্নিকটে! আ’ই উইশ…তুই কোনোদিন আমার না বলা কথাগুলো বুঝতি।”
