Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫২

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫২

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫২
Tahmina Akhter

“ নীল রঙ আমার বড্ড অপছন্দ! আমার অপছন্দের রঙকে গায়ে জড়িয়ে রাখতে তোমার কষ্ট হয় না? অনুশোচনা হয় না?”
আলো শাড়ির আঁচল কাঁধে উঠিয়ে সেই যে আয়নায় তাকিয়ে ছিল। এখনও তাকিয়ে আছে। তার আসলে বিশ্বাস হচ্ছে না যে, তার থেকে মাত্র দুই ইঞ্চি দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে তার ব্যক্তিগত মানুষটা! আলো আয়নায় চোখ রেখে কাঁপা কন্ঠে বলল,
— আপনি আমার নিছক ভ্রম। মায়ার জগত থেকে আপনি এসেছেন ; তাই না?
আয়নায় ফুটে ওঠা আলোর ব্যক্তিগত মানুষটার প্রতিবিম্ব যেন গা দুলিয়ে হাসছে। আলো অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল। চোখের পলকও ফেলতে চাইছে না। কারণ, সে জানে আলো চোখের পলক ফেলা মাত্রই মানুষটা পালিয়ে চলে যাবে মায়ার জগতে।

— আপনি হাসছেন কেন?
— হাসছি আমি! কে বলল? আমি তো উপহাস করছি আমার ভাগ্য’র ওপর। যার জন্য আমার এত বছরের অপেক্ষা! যাকে ঘিরে আমার ধ্যান-ধারনা সে আমার অপছন্দকে কত আয়োজন করে আগলে রাখে!
আলো হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে থাকা দুঃখকে এক ঝটকায় পাঁজর থেকে টেনে এনে দূরে ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু, চাইলেই কি আদৌও সম্ভব? ডাক্তার সাহেব যদি কখনো তার বিরুদ্ধে অভিযোগের খাতা খুলে বসে। তবে আলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের খাতার পৃষ্ঠা ফুরিয়ে যাবে কিন্তু অভিযোগ শেষ হবে না হয়তো। পুরো পৃথিবী জুড়ে নারীরা অভিযোগ করে তাদের জীবনসঙ্গী তাদের ভালোবাসে না, সম্মান করে না, তাদের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনে না। কিন্তু আলোর বেলায় ঘটনা উল্টে গেল! তার স্বামী, তার জীবনসঙ্গী তাকে ভালোবেসেছে আগলে রেখেছিল। যখন অভিযোগ দেয়ার কথা ছিল তখন আদর করে তাকে বোঝাতে চেয়েছিল। কিন্তু, আলো??? মাঝেমধ্যে নিজের ওপর চরম বিরক্তি কাজ করে। কিন্তু, কোথাও না কোথাও নিজেকে ভুল সাব্যস্ত করতে ইচ্ছে হয় না। কারণ, মানুষ মাত্রই ভুল করে। তবে একটা ব্যাপার হলো সে তার জীবনের সকল রহস্য ভেদ করতে পারবে। কিন্তু তার জীবনের গত আটবছরের অর্নথক অপচয়ের পেছনের রহস্য সে কোনোদিনও করতে পারবে না।
আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর, আয়নায় ফুটে ওঠা মেঘালয়ের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল,

— আপনি তো কেবল অভিযোগ করতেই আমার কাছে আসেন! যখন আপনার কোনো অপছন্দের পোশাক পরি কিংবা আপনার অপছন্দের বই পড়ি। অথবা আপনার অপছন্দের গান গাই আপনি ঠিক তখন তখন আমার কাছে আসেন। আমার ওপর অভিযোগ আরোপ করেন। অথচ, আপনাকে ভেবে যখন আমি গুমরে কেঁদে ফেলি তখন আপনি আসেন না কেন? আপনাকে কল্পনায় ভাবতে ভাবতে যখন রাত কেটে ভোর হয় তখন আপনি কোথায় থাকেন?
আয়নায় ফুটে ওঠা মেঘালয়ের প্রতিবিম্ব হাসতে হাসতে বলল,
— আমাকে ভেবে তুমি তোমার রাত ক্ষয় করে ভোর দেখেছো কিংবা আমাকে ভেবে তুমি তোমার একজোড়া কৃষ্ণকালো চোখ অশ্রুশিক্ত করেছো এই ব্যাপারটাই তো আমার অজানা, মিথ্যাবতী। আমি তো তোমার সকল অভিযোগের অংশীদার। তোমার ভালোবাসায় আমার স্থান আছে, আমি তো জানতাম না!!! তুমিও তো মানতে চাইতে না আমি তোমাকে কতটা চাই? তোমার কাছে শুধু একবার “ভালোবাসি” শব্দটা জানতে চেয়েছিলাম অথচ তুমি… সেদিন বললে না তো।

মেঘালয়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে আলোর চোখের জল গাল গড়িয়ে ছাপিয়ে পড়তে লাগল। আলো খেয়াল করল তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হবার সাথে সাথে তার ডাক্তার সাহেবের প্রতিবিম্ব আয়না থেকে সরে যাচ্ছে। অবশেষে আলোর কল্পনা জগতের মেঘালয় তার দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে যাচ্ছে।
চোখের জল মুছতে মুছতে আলো জানালার ওপারে পশ্চিমের আকাশে ঢলে পড়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলল,
—সুখকে এত আয়োজন করে আঁটকে রাখা যায় না! অথচ, দুঃখকে না চাইতেও মাথায় সাজিয়ে রাখতে হয় !
আলো নিজেকে স্বাভাবিক করল। তারপর, আবারও আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। নীল শাড়ির আঁচল সুন্দর করে গুছিয়ে কাঁধে রেখে সেফটিপিন লাগিয়ে আয়নায় তাকিয়ে বলল,

— এই অসুন্দর আমিটাকে আপনি এত যত্ন করে ভালোবেসেছেন। আর আমার সঙ্গে জুড়ে থাকা আপনার অপছন্দের বস্তুদের কেন মেনে নিতে পারবেন না? আপনি আমাকে ঘিরে থাকা সবকিছুকে সহ্য করেন; আমি জানি। কিন্তু, আপনি কোনো না কোনোভাবে যাচাই করতে চান যে, আমি আপনার অপছন্দের কথা শোনার পর আপনার অপছন্দের মান রাখতে যেন সেইসব বস্তু থেকে নিজেকে দূরে রাখি। ট্রাস্ট মি ডাক্তার সাহেব আমি আপনার কাছে যতক্ষণ অব্দি পৌঁছাতে না পারছি ঠিক ততক্ষণ অব্দি আপনার সকল অপছন্দকে ইনজয় করব। কিন্তু, আপনার ঠিক বামপাশে খুব কাছাকাছি দাঁড়ানোর পর আমি আর আপনার কোনো অপছন্দের কাজ কিংবা বস্তুদের কাছে যাব না। কিংবা সেসবের নামও উচ্চারণ করব না। আপনার কাছে এবার আমার ফিরে যাওয়ার পালা। দীর্ঘ আট বছর আমার জন্য আপনার অপেক্ষার ভ্রমনযাত্রায় হয়তো আমার ওপর কখনো কখনো রেগে গিয়ে আপনি আমাকে গালমন্দ করেছেন। কখনোবা আমার নামটা ভুল যেতে চেয়েছেন।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই আলো থেমে যায়। তারপর, মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে গ্যালারি ঘেটে মেঘালয়ের একটা ছবি বের করে আঙুল ছুঁয়ে মেঘালয়ের ছবি স্পর্শ করতে করতে বলল,
—আমাকে দেখার পর হয়তো আপনি আমাকে সহজে মেনে নিতে নাও পারেন? আমাকে দুরছাই করতে পারেন? আমাকে অপমান করতে পারেন? তীব্র অভিমানের কারণে আমাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন? বিশ্বাস করুন এসব যদি আপনি করেন না তবুও আমি আপনার কাছ থেকে সামান্য নড়ব না। বরং আমি ভালোবেসে মিষ্টি চোখে তাকাব আপনার দিকে যেন আপনার আমার উদ্দেশ্য ছুঁড়ে দেয়া তীর্যক দৃষ্টি যেন ভালবাসা মেশানোর আদুরে চাহনিতে পরিণত হয়। I promise।

কথাগুলো শেষ করে মোবাইলের স্ক্রীনে ভেসে থাকা মেঘালয়ের ছবিতে চুমু খেলো আলো। তারপর, মোবাইল পার্সে রেখে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। ড্রইংরুমে পেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখা হয়ে গেলো তার মা এবং বাড়িওয়ালা কালাম শাহনেওয়াজের সঙ্গে। আলো সেই সঙ্গে আবিষ্কার করলো সেখানে শান্ত উপস্থিত। আলোকে দেখে কালাম সাহেব উচ্চস্বরে কাছে ডাকলেন। আলো মৃদু হেসে সালাম জানিয়ে প্রশ্ন করলো,
– কেমন আছেন, চাচা?
— এই তো মা আছি কোনোরকম! তোমার কি খবর? শুনলাম আগামী সপ্তাহে নাকি তোমার লন্ডনের ফ্লাইট?
কালাম সাহেব যখন কথাগুলো বলছিল ঠিক তখন শান্ত শান্ত চোখে আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। আলো শান্ত’র দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে কালাম সাহেবের কথার জবাব দেয়।
— জি চাচা। আগামী রোববারে ফ্লাইট।

কালাম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত’র দিকে একবার তাকিয়ে আবারও আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তিন বছর ধরে আমাদের বিল্ডিংয়ে আছো। তোমাকে আমি আমার মেয়ের মত দেখি। তোমার মত একটা মেয়ে এই এলাকায় খুব কম আছে। বাপ ছাড়া একটা মেয়ে উচ্ছন্ন না হয়ে কত চমৎকার ভদ্রভাবে মায়ের সঙ্গে মিলেমিশে থাকছো। ডাক্তারি লেখাপড়া শেষ জয়েন করলা হসপিটালে। কিন্তু, এখন আবার শুনছি স্কলারশিপ নিয়ে লন্ডনে যাচ্ছো!! তোমার মত একটা অসাধারণ কন্যাকে আমার হাতছাড়া করতে ইচ্ছে করছে না, মা। তুমি যদি রাজি থাকো তো আমি তোমার সঙ্গে আমার শান্ত’র বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরি করতে চাচ্ছি। আমার শান্ত তোমাকে পছন্দ করে। তাছাড়া, আমাদের পরিবারের সবাই তোমাকে পছন্দ করেছে। এখন তোমার একটা “হ্যা” কিংবা “না” এর ওপর ডিপেন্ড করছে সবকিছু।
কালাম সাহেব কথাগুলো শেষ করলেন আলো কটমট করে তাকালো শান্ত’র দিকে। শান্ত ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে ছিল আলোর মুখের দিকে। যার দরুন দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। আলো তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল। সিতারা গলা খাঁকারি দিয়ে কালাম সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

— আসলে ভাইজান, মেয়ে আমার জামাইয়ের কাছে যাচ্ছে। আলোর স্বামী লন্ডনে থাকে।
দু’টো বাক্য যেন বর্জ্রঘাতের ন্যায় পরল কালাম সাহেব এবং শান্ত’র ওপর। আলো খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। তারপর কালাম সাহেব এবং তার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্য বেরিয়ে আসে। আলো বেরিয়ে যাওয়দ মাত্রই শান্ত বের হয়ে আসে।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে আলো যখন রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠিক তখনি তার পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে তাকাতেই দেখতে পেলো উষ্কখুষ্ক চুলের, এলোমেলো আয়রণ করা ছাড়া শার্টের মালিক শান্ত’কে। আলো মৃদু হেসে বলল,

— আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? মি. শান্তকে আজ সত্যি সত্যি অশান্তের মতো দেখাচ্ছে।
— আমার জীবনের শান্তির ঘুড়িটা আজ সুতা ছিঁড়ে চলে গেছে আলো।
কথাগুলো বলতে বলতে শান্ত আচমকা আলোর পায়ের কাছে বসে পড়ল৷ রাস্তা ভর্তি মানুষের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু আলো এবং শান্ত। আলো “ছিহ’ বলেই পেছনে সরে গেল। শান্ত ওভাবেই বসে রইল। এমন সময় একটা খালি রিকশা আসতেই তাতেই উঠে বসল আলো।
— পালিয়ে যাচ্ছেন কেন? আমার কথাগুলো শুনবে কে? এই কালো ভ্রমর? Listen to me? I love you. Damn it.
চিৎকার করে কথাগুলো বলছিল শান্ত। শান্ত’র হাহাকার কিংবা দুঃখ যেন সামান্যতম স্পর্শ করতে পারল না। আলো রিকশাওয়ালাকে রওনা হবার জন্য অনুরোধ করার সঙ্গে সঙ্গে রিকশা চলতে শুরু করল।

সেই ঘটনার দু’দিন পেরিয়ে গেছে। শান্ত’র সঙ্গে আলোর দেখা হয়নি। এদিক দিয়ে আলো বেশ কম্ফোর্ট জোনে আছে। আজ চিটাগং থেকে কাব্য এবং ইতি আসবে। কারণ, আলোর অবর্তমানে আলোর মা একা হয়ে পড়বেন। তাই সেই বিবেচনায় সিতারা বেগমকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে কাব্য এবং ইতি। যতদিন না পর্যন্ত আলো এবং মেঘালয় দেশে না ফিরছে ঠিক ততদিন পর্যন্ত সিতারা বেগম চিটাগং-এ থাকবে।
দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষ করার পর আলো আজ ছাঁদে চলল। মনটা বেশ খারাপ। মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যাওয়ার আগ-মুহুর্তে হয়তো সবারই এমন মন খারাপ হয়? আলো ছাঁদে উঠার পর রেলিংয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় তারপর অদূর আকাশে তাকিয়ে থাকে।
— যেই মানুষটা তোমাকে ছাড়া গত আটবছর ধরে থাকতে পেরেছে সে তোমাকে ছাড়া বাকি জীবন অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারবে।
শান্ত’র কন্ঠ শুনে আলো পেছনে ফিরে তাকালো। আলো ভ্রু কুঁচকে বলল,

— আমি বিবাহিত। এই কথাটি কি যথেষ্ট নয় আপনার জন্য? বারবার আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে আপনার অস্বস্তি হয় না? আমার নিজেরই বিরক্তি লাগছে এখন।
— তুমি আমার দিকটা টের পাচ্ছো না কালোভ্রমর। তোমাকে আমি চাই। তুমি তোমার সো কল্ড হাসবেন্ডকে ডিভোর্স দাও। আমি তোমাকে বিয়ে করব….
— শান্ত……
আলোর ডাক শুনে শান্ত চুপ হয়ে গেছে। আলো রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে থরথর করে কাঁপছে। শান্ত আলোর কাছে আসার জন্য পা বাড়াতে গেলেই আলো হাত উঁচু করে বাঁধা দিয়ে বলল,
— আমার জীবনে ডাক্তার সাহেবের আগমন, তার স্ত্রী হবার সৌভাগ্য আমাকে কপালে কিভাবে জুটেছে আজ আপনাকে সব বলব। সবটা শোনার পর আপনি বলবেন, আমার কি করা উচিত?
শান্ত সত্যি সত্যি শান্ত হয়ে আলোর জীবনের অতীতের ঘটনা শুনছে। আলো যখন তার অতীত জীবনের কথাগুলো বলে শেষ করেছে। ঠিক তখনি আকাশের বুকে সন্ধ্যা নেমেছে। আলো দেখলো শান্ত নির্বিকার হয়ে বসে রইল। আলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— ডাক্তার সাহেবকে চট্টগ্রামে ফেলে সিলেট চলে আসার পরদিন সকাল হলো। খুব সাধারণ একটা সকাল। রোজকার ন্যায় পাশ ফিরে একটা চেনা শরীরকে খুঁজে ফেরার অহেতুক চেষ্টা করলাম! যার বুকের ভেতরে আমার নাক-মুখ ডুবিয়ে না রাখলে আমার ঘুম ভাঙে না। সেই মানুষটা আজ বিছানায় নেই। আশ্চর্য! অথচ, অবচেতন মন আমাকে বেমালুম ভুলিয়ে রাখল, মানুষটাকে ফেলে আমি ৩৭০কি.মি. দূরে চলে এসেছি। ঘাড় ঘুরিয়ে বামপাশের বারান্দায় চোখ বুলিয়ে খুঁজলাম তাকে। আশ্চর্য আমার শখের বারান্দা নেই। আমার মানুষটা নেই। তৎক্ষণাৎ মনে পরলো। আমি তাকে ফেলে চলে এসেছি নিজেকে ভালো রাখার আশায়। কিন্তু, আমার ভালো থাকাটাই তো সে ছিল। আমার জীবনের মন্দ-ভালো সবটা যে তার বৃত্তবিন্দুতে আঁটকে আছে আমি সেদিনই প্রথম টের পেলাম৷ একটা সাদামাটা সকাল আমার জীবনের ভয়াবহ পরিণতিতে পৈশাচিক আনন্দ পেলো বুঝি। আকাশফাঁটা রোদ জানালা পেরিয়ে আমার বিছানায় এসে ঠাঁই নিলো। আমি ঘেমে-নেয়ে বিছানা থেকে নামলাম, অস্থির ভঙ্গিতে তাকে খুঁজলাম। তাকে কোথাও পেলাম না। তারপর, চোখ বন্ধ করলাম তাকে খুঁজে পাওয়ার মিথ্যা আনন্দ জোগাড় করতে। অবশেষে তাকে খুঁজে পেলাম আমার স্মৃতির মাঝে। অথচ, সৃষ্টিরকর্তার কাছে তাকে চেয়েছি সে যেন সবসময় আমার ঠিক বামপাশে থাকে। আমার দোয়া কবুল হলো না কেন? আমার জীবনের সকল অধ্যায় কি অপূর্ণ থাকবে? ‘পূর্ণতা’ শব্দটা আমার সঙ্গে যায় না কেন? আমার নাম “আলো” বলে? কারণ আলো তো একসময় বিলীন হয়ে যায় আঁধারের বুকে। তাহলে আমার বিলীন হবার দিন আসবে কবে?
এতটুকু বলেই আলো থেমে যায়। শান্ত মাথা নীচু করে ফেলেছে।

— তারপর, একদিন একজন এসে আমার ভুলগুলোকে সংশোধন করল। আমি আমার ভুল বুঝতে পারলাম। সেই রাতে চট্টগ্রামে রওনা হলাম। গিয়ে দেখলাম আমার মানুষটা নেই। আমাকে ভুলে থাকার জন্য সে ভীনদেশে পড়ে আছে। আর আমি কিনা তাকে ভুল বুঝে এতদিন দূরে ছিলাম? শুধুমাত্র আমার ভুলের কারণে মানুষ এতগুলো বছর ধরে সাফার করছে। তাকে আমি কোনোভাবেই ঠকাতে পারি না। তাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়া উচিত নয় কি?
আলোর কথাগুলো শোনার পর আজ আর শান্ত’র কিছুই বলার রইল না। সে চুপচাপ ছাঁদ থেকে নেমে পরল। আলো আর তাকে পিছু ডাকল না। পুরো ছাঁদে সে এখন একাই। হঠাৎ মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি চেপে যায়। মোবাইল বের করে মেঘালয়ের কাছে একটা ইমেইল পাঠালো। ইমেইল পাঠানোর পর নিজেই একা একা হেসে ফেলল। তারপর ছাঁদ থেকে নেমে গেল।

“ আচ্ছা, আপনার বুকের বাম পাশে ওই যে কালো রঙের বড় তিলটা আছে না, ঠিক ওই জায়গাটা আমাকে ভীষণভাবে টানে! মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে আপনার সেই তিলের ওপর ছোট ছোট দুটো চুমু খেয়ে সরে আসি। পরক্ষণেই আমি এই ভেবে লজ্জা পাই যে, চুমু খেয়ে লজ্জা পাওয়ার পর আপনাকে এই মুখ দেখানোর চেয়ে বরং আপনার বুকে মুখ লুকিয়ে রাখা বড্ড ভালো!”
আট লাইনের সংক্ষিপ্ত ই-মেইল পড়ার পর মেঘালয়ের হাত-পা ঝিমঝিম করছে। আট লাইন যেন আটটি বোমার মতো তার মাথার ওপরে একের পর এক এসে আছড়ে পড়ছে।

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫১

—কি সাংঘাতিক কথাবার্তা! এমন কথা কেউ কিভাবে শব্দে লিখে প্রকাশ করে? আচ্ছা, আমার বুকের তিলের খবর ইমেইলের মালিক জানে কি করে?
মেঘালয় কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ছ্যাহ্, আজকের সকালটাই বরবাদ হলো। এমন শব্দ লেখার জন্য কার এমন দুঃসাহস হলো ; কে জানে?

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৩

3 COMMENTS

Comments are closed.