Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৪ (২)

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৪ (২)

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৪ (২)
Tahmina Akhter

আলো আর মেঘালয়ের মধ্যে টুকটাক আলাপ চলল মধ্যরাত পর্যন্ত। আলাপের কোনো এক ফাঁকে আলো সোফার কুশন কোলে নিয়ে সোফায় গা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আর মেঘালয় তাকিয়ে রইল তার মিথ্যাবতীর দিকে। কতটা স্নিগ্ধ লাগছে প্রেয়সীর মুখটা! লন্ডনে যেদিন আলো ফিরে এসেছিল সেদিন রিনির সঙ্গে তাকে জড়িয়ে আলো যেই ভয়টা পেয়েছিল সেই ভয়টা যেন আলো আর কোনোদিন না পায় এটাই একমাত্র আর্জি সৃষ্টিকর্তা কাছে। আলো’র অসহায় চাহনি, চোখভর্তি দুঃখ মেঘালয়ের হৃদয়কে ভেঙেচুরে দিয়েছে সেদিন। আলোকে আট বছর আগে শেষবার যেদিন দেখেছিল ঠিক সেদিনও আলোর অসহায় চাহনি আর চোখভর্তি দুঃখদের অনুভব করার পর মেঘালয় সেদিনও আলোকে দুটো শক্ত কথা বলে কষ্ট দেয়নি। জোর করে কাছে রাখতে চায়নি। আলোকে সময় দিতে চেয়েছিল। ভেবেছিল বাবার বাড়িতে গেলে বউটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হবে তখন না-হয় সব বুঝিয়ে বলবে। কিন্তু, না সেই রাতে নিজেই আলো’র কাছে যেতে পেরেছিল আর না আলোকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিল। সেই রাতে আলো তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। জীবনের প্রদীপ নিভে গেলে যেমন দেহের দাম থাকে না ঠিক তেমনি ভালোবাসার মানুষ জীবনে না থাকলে জীবনের শত অনূভুতিদের মূল্য থাকে না। আলোকে ছাড়া তার জীবন মূল্যহীন হয়ে পরল। প্রতিটা রাত কেমন করে কাটিয়েছে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা জানে।

পুরনো স্মৃতি ভাবতে গিয়ে মেঘালয়ের চোখ ভিজে যাচ্ছে। কতটা ভয়াবহ ছিল সেই রাত! সেই রাতের ব্যাপারটা নিয়ে আলোকে বলা উচিত। নয়ত আলো’র ভুল ভাঙবে না। আলো ভেবে নেবে সেই রাতে তার ডাক্তার সাহেব তাকে অপেক্ষা করিয়েছে ঠিকই তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে আসেনি।
মেঘালয় উঠে দাঁড়ালো। তারপর, ঘুমন্ত আলো’র সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মেঘালয়ের অস্থির দৃষ্টি আলোর চেহারায় কি যেন খুঁজে বেড়ায়! শ্যামবর্ণ মুখটায় এক জোড়া ডাগরআঁখির ঘন পল্লব, সরু নাকে জ্বলজ্বল করা লাভ শেইপের নোজপিন, গোলাপি আভা ছড়ানো ঠোঁটজোড়ার কাছে এসে মেঘালয়ের দৃষ্টি স্থির হয়। মেঘালয় দুটি শুকনো ঢোক গিলে বেসামাল নিজেকে সামলে ফেলল। হাত বাড়িয়ে আলোকে কোলে তুলল। আলো টের পেলো কি! ঘুমের ঘোরে আলো হাত বাড়িয়ে মেঘালয়ের গলা জড়িয়ে ধরল। ব্যস এতটুকুতেই যেন মেঘালয়ের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। আলোকে কোলে নিয়ে ধীরে ধীরে রিনির ঘরের দিকে রওনা হলো। ব্যস্তপায়ে হেঁটে যাবার ফাঁকে আলো’র মুখের দিকে বেশ কয়েকবার তাকায়। কে বলেছে তাদের জীবন থেকে আটটি বছর হারিয়ে গেছে? আলোকে দেখলে এখনও অষ্টাদশী মনে হয়। অষ্টাদশী আলো’র বিরক্তিভরা চাহনি যেন এখনও চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। মানুষের বয়স পেরিয়ে যায় কিন্তু স্মৃতি যেন বয়সটাকে আঁটকে রাখার দারুণ ক্ষমতা রাখে ।

রিনির ঘরের দরজা খুলে আলোকে বিছানায় শুয়ে দেয়ার পর আলোর গায়ে কম্বল জড়িয়ে দেয়ার পর চলে আসার জন্য পা বাড়াতে গিয়ে থমকে যায় মেঘালয়। পেছনে ফিরে আলো’র মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও ঘুমন্ত আলো’র কাছে ফিরে যায়। সামান্য ঝুঁকে আলোর কপালে দীর্ঘ চুমু খেয়ে তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
মেঘালয় চলে যাওয়ার পরপরই আলো তার চোখজোড়া খুলে ডানহাতটা রাখল সেখানে যেখানে মেঘালয়ের চুমু দিয়ে গেছে। কপালে হাত রেখে মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল,
— এতটা যত্ন করে ভালোবাসেন কেন আমায় বলুন তো? আমায় যে আপনার এত এত ভালোবাসার ঋণে জর্জরিত করছেন আমি কি এই ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করতে পারব?

মেঘালয়কে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই আলো আবারও ঘুমের রাজ্য পাড়ি জমায়। অথচ সেই রাতে মেঘালয়ের ঘুম এলো না। চোখ বন্ধ করলে বারবার আলোর মুখটা ভেসে উঠছে। বারবার উঠে ছুটে যেতে ইচ্ছে করছিল আলোর কাছে। কিন্তু, চাইলে কি আর যাওয়া সম্ভব? এবার আর নিজেকে খোলা বইয়ের মত উন্মুক্ত করে রাখবে না আলোর সামনে। আলো যদি তাকে পড়তে চায়, জানতে চায় তবেই মেঘালয় নিজ থেকে ধরা দেবে। তার আগে নয়।
শেষরাতে মেঘালয় ঘুমিয়ে পড়ল। এদিকে আলো’র মোবাইলে এলার্ম বাজছে। ফজরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। ঘুম ঘুম চোখে মোবাইল হাতে নিয়ে এলার্ম অফ করল। তারপর, কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি করে চোখের ঘুম কমালো। চোখ থেকে ঘুম নেমে যাবার পর আলো বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর, সোজা ওয়াশরুম গিয়ে ফ্রেশ হলো, ওযু করল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে রুমে এসে জায়নামাজ বিছিয়ে আল্লাহ’র সামনে হাজির হলো। একাগ্রতা নিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করলো। নামাজ আদায় শেষ করার পর সোজা বিছানায় গিয়ে বসল তবে বইখাতা নিয়ে। কিছুক্ষণ পড়াশোনা চলুক। আলো যখন পড়াশোনায় ব্যস্ত ঠিক তখনি ধরনীর বুকে আঁধার কেটে আলোর দেখা মিলছে। আকাশের ঘন কালো মেঘ কেটে যাচ্ছে। প্রকৃতি তার সুন্দর রুপে ফিরছে। পূর্ব আকাশে সূর্যকে উঁকি দিতে দেখা যাচ্ছে। সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করামাত্রই আলো ঘাড় ফিরিয়ে বারান্দায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। হঠাৎ করে ইচ্ছে করল লন্ডনের সকালে বাইরে গিয়ে হেঁটে বেড়াতে। কিন্তু, একা একা… আলোর ভীষণ মন খারাপ হলো। ডাক্তার সাহেব নিশ্চয়ই ঘুমাচ্ছে। তাছাড়া মানুষটা এখনই এত সহজে তার কাছে ধরা দেবে না। তাই তাকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে বের হবার স্বপ্ন এখনই দেখা উচিত নয়। তবুও তো মনকে বোঝাতে পারছে না। অগত্যা মনের ইশারাকে সাড়া দিয়ে আলো চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ধীরপায়ে হেঁটে সিঁড়ি পাড় হবার পর ড্রইংরুমে আসতেই তৌহিদ সাহেবের মুখোমুখি হলো আলো। আলো তৌহিদ সাহেবকে দেখে জিভের ডগায় কামড় দিয়ে মনে মনে বলল,

— ধরা খেলি তো!!!
— এত সকালে তুমি নীচে এসেছো কেন বউ মা?
— আসলে চাচা হয়েছে কি… ইয়ে মানে… আমি একটু বাইরে হাঁটতে যেতে চাচ্ছি। এখানকার সকালের পরিবেশ কেমন লাগে….
আলোর কথা শুনে হো হো করে হেসে ফেললেন তৌহিদ সাহেব। আলো লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে ফেলল। তাছাড়া এটা ভাবছে চাচা শ্বশুর নামক মানুষটা তাকে নিয়ে আপাতত কি ভাবছে??
— তুমি যদি আপত্তি না করো তবে আমি তোমার ভ্রমন সঙ্গী হতে পারি। কি বুড়ো মানুষ নিয়ে ভ্রমনে যেতে আপত্তি আছে তো?
তৌহিদ সাহেবের কথা শুনে আলো প্রথমে বিস্মিত হয়ে পরক্ষনেই কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলল,

— বুড়ো মানুষটাকে যদি আমি আমার পিতার স্থানে বসিয়ে তার পায়ের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলতে পারি তাতেও আমার আপত্তি নেই। বুড়ো মানুষটা কি আমায় তার মেয়ে হিসেবে ভাববে?
আলো’র কথা শুনে তৌহিদ সাহেব মুচকি হেসে আলোর মাথা পরম আদরে হাত রেখে বলল,
— আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে তোমাকে রোজ সকালে আমার ভ্রমণসঙ্গী হতে হবে। অনেক বছর হলো সকালে একা একা হাঁটতে বের হই। আমার সঙ্গে কেউ এলে আমার মোটেও মন্দ লাগবে না। বরং আনন্দ পাব ।
তৌহিদ সাহেব আর আলো হাঁটতে বের হলো। রাস্তার কোল ঘেঁষে দু’জনে হাঁটছে। তৌহিদ সাহেব তার জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক অনেক গল্প ইতিমধ্যে বলে ফেলেছে। কিছু গল্প যেমন চোখের জল এনেছে ঠিক তেমনি কিছু গল্প শুনে অনেকে হেসেছে। রাস্তায় লোকদের আনাগোনা বাড়ছে তাই দুজনেই এবার বাড়িতে ফেরার জন্য রওনা হলো।
বাড়িতে ফেরার পর আলো হাতমুখ ধুয়ে এসে সকালের নাশতা বানানোর জন্য আয়োজন শুরু করল। আলুভাজি, ডিমের ওমলেট, সাদা রুটি আর চা। নাশতা বানাতে পাক্কা একঘন্টা সময় ব্যয় হলো।

নাশতা বানিয়ে ঘরে এসে গোসল করে গোলাপি রঙা কামিজ আর সাদা রঙের পাজামা, ওড়না। ভেজা চুল টাওয়ালে বাঁধা। চোখে কাজলরেখা টেনে আয়নায় আরও একবার নিজেকে দেখল। না এভারেজ দেখতে লাগছে। নিজের শ্যামরাঙা রুপ নিয়ে ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলো নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেল মেঘালয়ের ঘরের দরজার সামনে। দরজায় নক করলো কয়েকবার কিন্তু সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না বিধায় আলো দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। বিশাল এক খাটের মধ্যে মেঘালয় উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে। আলো ধীরে ধীরে জানালার কাছে এগিয়ে যায়। তারপর, টান দিয়ে জানালার পর্দা খুলে দেয়। মুহুর্তের মধ্যে পুরো ঘরের অন্ধকার কেটে যায়। আলো বিছানার ওপর দৃষ্টি রাখতেই দেখতে পেলো, কালো চাদরের ফাঁকে মেঘালয়ের ফর্সা উন্মুক্ত পিঠ দেখা যাচ্ছে। আলো মেঘালয়ের বিছানায় গিয়ে বসে।

তারপর, তর্জনী আঙুল দিয়ে মেঘালয়ের পিঠে ” I Love You” আকিঁবুকিঁ শুরু করে। আলো এতটা বেখেয়ালি ছিল যে তার মনে একবারও খেয়াল আসেনি যে মেঘালয় জেগে উঠতে পারে।
পিঠে সুড়সুড়ি অনুভব হচ্ছে বিধায় মেঘালয় ঘুম ভেঙে যায়। পুরোপুরি ঘুম কেটে যাবার পর চিরচেনা পরিচিত একজনের গায়ের সুগন্ধি এসে নাকে লাগে। “সত্যি কি সেই মানুষটা এই মূহুর্তে এই ঘরে আছে!” মেঘালয়ের মস্তিষ্কে এই বাক্য আসা মাত্রই মেঘালয় স্থির হয়ে যায়। পিঠের আঁকিবুঁকিটা কি নিয়ে হচ্ছে তা নিয়ে অনুভব করে বোঝার চেষ্টা করে! প্রথমে “I” তারপর “Love” সবশেষে “You”। পরপর কয়েকবার তিনটি শব্দ রিপিট লেখা হচ্ছিল। মেঘালয়ের মনে আজ শত প্রজাপতির ডানা মেলে ঝাপটাতে শুরু করে। অবশেষে তার মিসেস তাকে….

মেঘালয়ের ইচ্ছে করল পুরো পৃথিবীকে জানিয়ে দিতে যে, তার মিথ্যাবতী অবশেষে তাকে ভালোবাসতে পেরেছে। পরক্ষণেই ভাবে এত তাড়া কিসের? ইশারায় ভালোবাসা বুঝে নিতে হবে কেন? মুখে বলতে হবে। আলো তো এই বাহানা দিয়ে তার কাছে এতবছর দূরে ছিল। যাইহোক এবার আলোকে একটু বাজিয়ে দেখা হোক।
আচমকা শোয়া থেকে উঠে বসল মেঘালয়। আলো হকচকিয়ে পিছিয়ে যায়। তারপর যা অঘটন হবার ঘটতেই যাচ্ছিল। ঠিক তখনি মেঘালয় আলোর হাত টেনে ধরে। আলোর হৃদয়ের হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে। বাপ রে! যদি পরে যেত নীচে? মেঘালয় আলোর হাত টান দিয়ে সোজা করে বসালো বিছানায়। আলো’র হাতটা এখনও তার হাতের মুঠোয় বন্ধ। এদিকে আলো অস্বস্তির কারনে মাথা উঁচু করে তাকাতে পারছে না। ডাক্তার সাহেব এর উন্মুক্ত বুকটা যেন আলোকে কাছে টানছে। বারবার ইচ্ছে করছে এই বুকের মালিকটাকে জাপটে ধরতে।

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৪

— আমার ঘরে কি করছো? আর আমার পিঠে কি আঁকিবুঁকি করছিলে?
মেঘালয়ের প্রশ্ন শুনে আলো খতম। এবার কি জবাব দেবে?
এদিকে গোলাপি আর সাদা সংমিশ্রণের রঙে জড়িয়ে থাকা শ্যামাবতী আলোকে দেখে মেঘালয়ের কেমন নিজেকে উল্টাপাল্টা লাগছে। আচমকা আলো তার চোখের দিকে তাকাতেই মেঘালয়ের ইচ্ছে করল আলোর কাজল টানা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে। কি আছে ওই চোখে! হিপনোটাইজ করার কি দারুন ক্ষমতা আছে এই চোখ জোড়ার!!

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৫