মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৪
Tahmina Akhter
রিনির সঙ্গে কথা শেষ হবার পর থেকে মেঘালয়ের মেজাজ খারাপ। মুড ভালো করার জন্য নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে নীচতলায় আসার জন্য পা বাড়ায় ঠিক তখনি রিনির ঘরের সামনে এসে মেঘালয় থমকে দাঁড়ায়। কারণ, দরজার ওপাশে যে তার হৃদয়ের বন্দিনীর অস্তিত্ব আছে। মেঘালয়ের একবার ইচ্ছে করে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতে পরক্ষনেই আবার নিজের মনটাকে কঠিন শাসন করে। মন আর মস্তিষ্কের যুদ্ধে মস্তিষ্কের জয় হলো। মেঘালয় নীচতলায় নেমে আসে। ওমা নীচে এসে অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয়। কারণ, আলো এখনও নীচতলায় ড্রইংরুমে বসে আছে। আলোর মুখটা খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করার পর যা বোঝা গেল আলোর মন ভালো নেই। মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনমনে বলল,,
— তোমার রাগ করা, মুড অফ কিংবা মেজাজ খারাপ যাই হোক না কেন আর কয়েকটা দিন পরে করলে হয় না? আমি তো এখন চাইলেও তোমার মন ভালো করার কারণ হতে পারব না। সবসময় কি আমারই ভালোবাসার পরীক্ষা দিয়ে যেতে হবে? তুমি কেবল আমার ভালোবাসা পেয়ে যাবে? আমার কি ইচ্ছে করে না তোমার ভালোবাসা পেতে?
আবোলতাবোল চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের মনটাকে কঠিনভাবে শাসিয়ে মেঘালয় আলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আলো মেঘালয়ের উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা উঁচু করে তাকায়। মেঘালয় আলোর মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল। তারপর, কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করল ,,
— এতরাতে এখানে বসে থাকার কারণ কি?
— একা একা ভালো লাগছে না। তাই….
কথাগুলো বলতে বলতে আলো মেঘালয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল ,,
— আপনি এখনও ঘুমাননি কেন?
আলো’র প্রশ্ন শুনে মেঘালয় যতটা না অবাক হয় তারচেয়ে বেশী অবাক হয় আলোর শুকনো ঠোঁটজোড়া দেখে। তারমানে কি আলো রাতের খাওয়াদাওয়া সম্পূর্ণ করেনি? মেঘালয় রাতের খাবার খাওয়ার সময়কার দৃশ্য ভাবতে গিয়ে খেয়াল এল যে আলো তখন দাঁড়িয়ে ছিল। তৌহিদ চাচা আলোকে খাবার খাওয়ার জন্য একবার বলেছিল কিন্তু আলো মানা করে দেয়। আচ্ছা আলো কি তবে মেঘালয়ের একটি ডাকের অপেক্ষায় ছিল!
লজ্জার ভারে মেঘালয় নুইয়ে পড়ে। আলোর সঙ্গে তার মিছে রাগের অভিনয় আজ সত্যি সত্যি আসল রুপে রুপান্তরিত হলো। আলোকে ছাড়া আজ সত্যি সত্যি তার গলা দিয়ে খাবার নেমেছে। অথচ, গত আটদিন ধরে আলোকে নিয়ে প্রত্যেকবেলার খাবার খেয়েছে। যদিও তখন তাদেট সম্পর্ক জটিল অবস্থায় ছিল। আজ এত সহজ সম্পর্কে থাকার পরও কিভাবে এমন ভুল হলো? এতদিন রিনি ছিল আলোর খেয়াল রাখার জন্য। আজ যখন রিনি নেই ঠিক তখনি মেঘালয় আলোর খেয়াল রাখতে ব্যর্থ হলো!!
পুরো ব্যপারটা ক্লিয়ার হবার পর মেঘালয় “শিট ম্যান” বলেই ডানহাত দিয়ে কপালের চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে আলো’র হাত ধরে টেনে দাঁড় করাল। আলো বোকার মতো তাকিয়ে রইল। আসলে কি থেকে কি হচ্ছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। মেঘালয় আলোর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ডাইনিং টেবিলের ওখানে। একটা চেয়ার টেনে আলোকে বসিয়ে রেখে মেঘালয় হাঁটা শুরু করলে আলো প্রশ্ন করে,
— কি করছেন আপনি?
— আমার যা করা দরকার।
কথাটি বলে মেঘালয় রান্নাঘরে ঢুকে একটা প্লেটে ভুনা খিচুড়ি আর ছোট বাটিতে গরু মাংস নিয়ে সোজা চলে এল আলোর সামনে। আলো প্লেট আর বাটির দিকে একবার তাকিয়ে মেঘালয়ের দিকে ফিরে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
— আপনি কি করে টের পেলেন যে , আমি না খেয়ে আছি? আমি তো আপনাকে একবারও বলিনি!
আলো’র কথার কোন জবাব না দিয়ে মেঘালয় আলোর পাশের চেয়ার টেনে বসল। তারপর চোখের ইশারায় আলোকে আদেশ করল খাবার খাওয়ার জন্য। মেঘালয়ের ইশারা আলো’র জন্য যথেষ্ট। মানুষটা যে তার বড্ড চেনা। মানুষটা মুখে যতটুকু বলে ততটুকু সহজ সাবলীল। কিন্তু যখনই মুখে কোন কথা বলবে না কিংবা চোখের ইশারায় বোঝাবার চেষ্টা করে ঠিক তখনি এসব কিছুর আড়ালে মানুষটার রাগ জমে আছে বলে ভেবে নিতে হবে। মানুষটার রাগ নেই বললেই চলে। তবে যখনই রেগে থাকে তখনই তাকে সামলানো বড্ড কষ্টকর। যেমন গত আটদিন ধরে মানুষটার রাগ হজম করতে হয়েছে।
আলো মাথা নীচু করে খিচুড়ির প্রথম লোকমা মুখে তুলল। খিচুড়ির অতুলনীয় স্বাদের কারণে আলো চোখ বন্ধ করে বলেই ফেলল,
— এত সুস্বাদু খিচুড়ি আমি কখনোই খাইনি! আপনার হাতে কি জাদু আছে?
আলো’র কাছ থেকে প্রশংসাবাক্য শুনে মেঘালয় কোনো রিয়াকশন করল না। অথচ ভেতরে ভেতরে মেঘালয় ভীষণ খুশি হলো এই ভেবে যে তার মিসেস এর খিচুড়ি পছন্দ হয়েছে। যাক এবার বউটাকে রোজ যেই কয়েকটা প্রিপারেশন শিখেছে সেগুলো রান্না করে খাওয়াবে। রিনিটা কয়েকদিন শ্বশুর বাড়ি থেকে এলেই হতো। রিনির অনুপস্থিতিতে হোক কিংবা সময়ের অনূকূলে আলোর সঙ্গে হাজারটা বাহানায় কথা বলার, সময় কাটানোর সুযোগ মিলছে।
মেঘালয় নিজের মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢু মারল। সে যখন স্ক্রল করতে ব্যস্ত ঠিক তখনি আলো খাবার খাওয়ার ফাঁকে ডাক্তার সাহেবকে দেখতে ব্যস্ত। ব্লু রঙা টিশার্ট আর সাদা জিন্সের মাঝে মানুষটার গায়ের রঙ কেমন চোখে লাগছে! কপাল জুড়ে লেপ্টে থাকা সিল্কি চুলগুলোকে এলোমেলো করার উদম্য বাসনায় আলো’র অস্থির লাগছে! একবার খালি দুজনের সব কিছু মিটে যাক। সবার আগে মানুষটার চুলগুলোর ওপর হামলে পরবে। এত চমৎকার চুল কেন পুরুষ মানুষের থাকতে হবে!!
— আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে নিশ্চয়ই পেট ভরবে না? তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করো।
মেঘালয় ফোনের স্ক্রীনের ওপর দৃষ্টি রেখেই আলোকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলল। আলো এই কথা শুনে কি যে লজ্জা পেলো? পানিভর্তি গ্লাস হাতে নিয়ে ঢকঢক করে পান করতে গিয়ে বিষম খেলো। ব্যস নাকেমুখে পানি উঠে ভয়াবহ অবস্থা!! মেঘালয় মোবাইল রেখে উঠে এসে আলোর মাথায় একহাত রেখে বলল,
— আরে কি হলো তোমার? সাবধানে চলবা না তুমি?
কাশতে কাশতে আলোর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে গাল ভিজে যায়। ধীরে ধীরে কাশি থেমে যায়। আলো স্বাভাবিক হয়৷ মেঘালয় স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে চেয়ার বসল। আলো একহাত কপালে রেখে শান্ত হয়ে বসে। মেঘালয় খেয়াল করল আলো ঘেমে গেছে। বউটার জন্য কেমন অস্থির লাগছে? ইশশ্! কেন যে ওভাবে লজ্জা দিতে গেল?
মেঘালয় আলোকে কোনো কথা বলার সাহস পায় না। আলো নিজেকে আরেকটা স্বাভাবিক করে তুলুক। মিনিট পাঁচেক অতিক্রম হবার পর আলো উঠে দাঁড়ালো। বেসিন থেকে হাত ধুয়ে টাওয়াল দিয়ে হাত মুছে এসে এটো প্লেট আর বাটি রান্নাঘরে রেখে এলো। ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে মেঘালয়কে বসে থাকতে দেখে আলো ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কারণ, অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকের ডাক্তার সাহেব বড্ড চেনা চেনা লাগছে। আগে যেমন যতক্ষণ বাড়িতে থাকত ঠিক ততক্ষণ তার পাশে থাকত। আলো মুচকি হেসে মেঘালয়ের পাশের চেয়ারটার ওপরে হাত রেখে দাঁড়ায়। মেঘালয় আলোর মুখের দিকে তাকায়। আলো খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেঘালয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
— রাত জাগবেন?
— কেন? তুমি কি রাত জাগবে?
— হ্যা। রাত জাগব। বাংলাদেশের সময়ের নিয়মকানুন থেকে এখনও নিজেকে টেনে তুলতে পারছি না। দিন-রাত এর হেরফের এর কারণে দিনে আমার ঘুমে চোখ ভেঙে আসে আর রাত হলে জেগে থাকতে হয়।
— এখানকার সময় অনুসারে অভ্যাস তৈরি করতে হবে না?
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো সরল ভঙ্গিতে হেসে বলল,
— অভ্যাস কি তৈরি করা যায়? অভ্যাস আপনাআপনি গড়ে ওঠে। যেমন করে আমি আপনার অভ্যাস হয়ে গেলাম আর আপনি আমার। পৃথিবীর যেই কোণায় গিয়ে আমরা অবস্থান করি না কেন, আমরা দুজন ঠিকই দু’জনের জন্য হাহাকার করি। অপেক্ষা করি। ভালোবেসে যাই।
আলো’র কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় মেঘালয়। আলো যে এই ব্যাপার নিয়ে কথা বলবে মেঘালয় কল্পনা করেনি। মেঘালয়ের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আলো বুঝতে পারল এই বিষয়টি নিয়ে ডাক্তার সাহেব আলোচনা করতে চায় না। তাই আলো এই ব্যাপারটা নিয়ে কিছু না বলার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এমন গুমোট পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য আলো জিজ্ঞেস করল,
— চা খাবেন?
মেঘালয় জবাব দেয় না। তবে একই ভঙ্গিতে বসে আছে। আলো জবাব পেয়ে গেছে। চট করে উঠে দাঁড়ালো। তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে গিয়ে একটা ছোট পাতিলে আড়াই কাপ পানি দিয়ে চুলায় বসিয়ে দেয় মাঝারি আঁচে। পানি গরম হয়ে এলে চার চা চামচ চা-পাতা দিয়ে চায়ের লিকার সম্পূর্ণ ফুটে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। লিকার ফুটে আসার মিনিট চারেক পর চায়ের লিকার তৈরি হয় গেছে। এবার দুই কাপে পরিমান মতো চিনি আর গুঁড়ো দুধ নিয়ে তাতে চায়ের লিকার ঢেলে চামচ দিয়ে নাড়তেই তৈরি হয়ে গেল দুধ চা।
মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৩
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আলো দেখল মেঘালয় নেই। মেঘালয় নেই দেখে আলো’র যে কি মন খারাপ হলো! কিন্তু, আলোর ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে মেঘালয় ফিরে আসে ল্যাপটপ হাতে নিয়ে। আলো’র হাত থেকে একটা চায়ের কাপ নিয়ে তাতে চুমুক দিলো মেঘালয়। সামান্য একটা দৃশ্য! অথচ আলো’র মনটা আনন্দে ভরে উঠল। সুখের দিনগুলো ফিরে আসছে বলে। আনন্দে আলোর চোখের কোণে আনন্দ অশ্রুরা এসে ভিড় জমাচ্ছে।
