মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৮
Tahmina Akhter
রিনির নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে মেঘালয়ের মাথার তীব্র যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি পেলো। মেঘালয় বিছানায় শুয়ে আছে। আর রিনি বিছানার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে থেকে হাত বাড়িয়ে মেঘালয়ের চুল টেনে দিচ্ছে। মেঘালয়ের চোখ জ্বালা করছে। তবুও অনেক কষ্ট করে চোখদুটো খুলে বলল,
— রিনি?
— বলো?
রিনি মেঘালয়ের ডাক শুনে থেমে যায়নি। উল্টো আরও যত্ন করে মেঘালয়ের চুলের ফাঁকে বিলি কেটে দিচ্ছে। মেঘালয় রিনির হাতটা সরিয়ে দিয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বসল৷ রিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সোজা হয়ে বসলো চেয়ারে। মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি ডাক্তার হয়ে নিজের শরীরের যত্ন নিয়ে অবহেলা করছো! তোমার রোগীদের তুমি কি সাজেস্ট করো? তোমার মতো রোগ পেলেপুষে বড় করতে বলো নাকি?
— তোমাকে আমি অনেকবার বারণ করেছি। আমার ঘরে হুটহাট আসবে না। আমার চুলে হাত রাখবে না। অথচ, তুমি?
মেঘালয়ের কথাগুলো শুনে রিনি মুখ ভেঙিয়ে বলল,
— আমি এই ঘরে কেন আসি? কারণ এটা আমার বাবার বাড়ি তাই আসি। আর তোমার চুলে অপ্রয়োজনে হাত দেয়ার কারণও নেই। কিন্তু তোমার মাথাব্যাথা কমানোর জন্য আমি এই ট্রিক ফলো করি। এত যন্ত্রণা সহ্য করো কি করে?
মেঘালয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অথচ রিনির কোনো হেলদোল নেই। রিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মেঘালয়কে উদ্দেশ্য করে বলে গেল, “কেউ যদি কফি খেতে চায় সে যেন নীচে চলে আসে!” রিনি চলে গেছে।
মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে রইল। চোখ বন্ধ করতেই আলোর হাসোজ্জল মুখটা ভেসে উঠলো মনের দৃশ্যপটে। ইচ্ছে করছে কাব্য ভাইয়ের কাছে কল করতে। কিন্তু… টনটনে ব্যাথায় দিনদুনিয়া বিষ বিষ লাগছে।
কফি খেয়ে একটা লম্বা ঘুম দিলে মাথাব্যাথাটা চলে যাবে৷ যেই ভাবা সেই কাজ। মেঘালয় বিছানা থেকে নেমে রুম থেকে বের হয়ে গেল। নীচে গিয়ে দেখল রিনি সবেমাত্র রান্নাঘর থেকে দুটো কফির মগ নিয়ে বের হয়ে আসছে। মেঘালয়কে দেখে রিনি মুচকি হেসে বলল,
— এসো এখানটায় বসো।
রিনি ড্রইংরুমের সোফায় বসলো। মেঘালয় রিনির হাত থেকে কফির মগটা নিয়ে অপজিট সোফায় গিয়ে বসলো। কফিতে চুমুক দিতেই মেঘালয় চোখ বন্ধ করে ফেলল। এত স্ট্রং ফ্লেভার!
রিনি কফিতে চুমুক দিয়ে নরম চোখে তাকালো। মেঘালয় তখন ঠোঁট গোল করে কফিতে ফু দিচ্ছে। তারপর যখন শব্দ করে কফিতে চুমুক দিচ্ছে ঠিক তখন রিনির হৃদয়ে কি যেন হৈচৈ ফেলছে! মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই রিনির দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি কেন যেন হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়! যেমন রিনির চলে গিয়েছে। খুব ছোটবেলা থেকে নিজের পরিবার বলতে বাবা-মাকে দেখে এসেছে। তার জন্মের আগেই তার বাবা এবং মা লন্ডনে শিফট হয়ে গেছে। তার বয়স যখন পনেরো বছর ঠিক তখন একবার বাংলাদেশে গিয়েছিল। সেবার দেশে গিয়ে মেঘালয়কে প্রথমবার দেখে তার কিছু একটা হয়েছিল! কি হয়েছিল সঠিক বলতে পারেনি। কারণ বয়স কম ছিল। অনুভূতির ঠিকঠাক বিশ্লেষণ সে জানত না। মাঝেমধ্যে বোকার মতো মেঘালয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবত, মেঘালয় তার কাজিন হয়। সিনিয়র কাজিন। যে কিনা আর ক’বছর পর ডাক্তার হয়ে বের হবে। তাছাড়া, রিনি তো খুব ছোট। এত ছোট মেয়েকে নিশ্চয়ই মেঘালয় বিয়ে করবে না। বিয়ে করলে ঠিক তার মতই দেখতে সুন্দর মেয়েকে বিয়ে করবে। যে কিনা পেশায় ডাক্তার হবে।
সেবার বাংলাদেশ ছেড়ে আসার পর রিনির বারবার ইচ্ছে করছিল বাংলাদেশে ফিরে যেতে। মেঘালয়কে ছাড়া তার দমবন্ধ হয়ে আসছিল। ক্ষনে ক্ষনে তার কান্না পাচ্ছিল। ভাতের লোকমা গলায় আঁটকে গিয়ে বিশ্রি অবস্থা হচ্ছিল। লেখাপড়ায় অমনোযোগী। রাতে ঠিকঠাক ঘুম হচ্ছিল না। মেয়ের এমন করুন অবস্থা দেখে রিনির মা ফায়জা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে গেলেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার রিনিকে একগাদা ভিটামিন’স দিলো। সঙ্গে এটাও বলে দিলো যেহেতু এখন বয়ঃসন্ধি চলছে। তাই একটু-আধটু মুড সুইং হবেই। ফায়জা ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এলো। কিন্তু, রিনি সেদিন প্রথমবারের মতো টের পেলো তার ভালো থাকার ঔষধ সে বাংলাদেশে ফেলে চলে এসেছে।
ধীরে ধীরে বয়স বাড়ছে কিন্তু মেঘালয়কে সে একরত্তি ভুলতে পারেনি। উল্টো দিনদিন মেঘালয় তার স্মৃতিতে ঠাঁই পাচ্ছে। লন্ডন ফিরে আসার দুইবছর পর একদিন খবর এলো মেঘালয় বিয়ে করেছে। ব্যস, সেই দিন রিনির যে কেমন কেটেছে! বারবার ইচ্ছে করছিল মেঘালয়কে কল করে বলতে, “ মেঘালয় আপনি কি জানেন, আমি আপনাকে কতটা চাই! আপনি বিয়ে করে ফেললেন! আচ্ছা, আপনি কি এতটাই দামি যে আপনি আমার হাতের নাগালের বাইরের রয়ে গেলেন! আপনাকে যদি না পাই তাহলে আপনার জন্য আমার হৃদয়ে এত কিসের মায়া?”
এই কথাগুলো কখনো মেঘালয়কে বলা হয়নি। কখনো বলতেও পারবে না হয়তো। মাঝেমধ্যে অনুভূতি যখন কন্ট্রোলের বাইরে চলে যায় তখন পাগলামি করে ফেলে। যার দরুন মেঘালয়ের বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে সে।
পুরনো কথা ভাবতে ভাবতেই রিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর কফির মগটা টি-টেবিলের ওপরে রেখে মেঘালয়ের দিকে ফিরে বলল,
— জীবন নিয়ে কি ভাবলে?
— জীবন নিয়ে ভাববার কি আছে? জীবন জীবনের মত করে চলছে।
মেঘালয় শক্ত গলায় জবাব দিলো। রিনি জানে মেঘালয়ের শক্ত খোলসের ভেতরে সফট একটা কর্ণার আছে। মেঘালয় তার শক্ত খোলসের ওপারে কারো অনুপ্রবেশ পছন্দ করে না।
— তোমার বউয়ের খবর কি? খোঁজ পেয়েছো?
— যে নিজ থেকে হারিয়ে যায় তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?
জবাব দিয়ে মেঘালয় উঠে দাঁড়ালো। রিনি মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— সম্ভব নয়। কিন্তু অসম্ভব তো নয়।
— পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ হচ্ছে মুখে যা মন চায় তাই বলা। কিন্তু মুখে বলার চেয়ে কাজ করে দেখিয়ে দেয়াটা বোধহয় কঠিন ব্যাপার।
রিনি বিস্মিত হয়ে যায়। মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলবে তার আগেই মেঘালয় হাত উচু করে রিনিকে থামতে বলল। রিনি হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বসে রইল।
– তার খোঁজ করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি রিনি। ক্লান্তি কমাতে ভিনদেশে চলে এসেছি আমি। অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য আমি কম চেষ্টা করিনি।
— যে তোমাকে ঠিকঠাকমতো কখনো চায়নি তার জন্য নির্বাসন গ্রহণ করে তুমি ঠিক কি বোঝাতে চাও?
রিনির প্রশ্ন শুনে মেঘালয় তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
— তুমি ঠিক যেই কারনে একাকিত্বে সাদরে গ্রহণ করেছো আমিও ঠিক সেই কারণেই নির্বাসন চেয়েছি।
রিনি অবাক হয়ে গেছে। মেঘালয়ের রহস্যময় কথা শুনে রিনি নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। যাকে ভালোবেসে তার দিনরাত হয়। অথচ জাহির করেনি কখনো। সেই মানুষটা কিনা সবটা জানে…..
— তুমি যদি কাউকে একতরফা ভালোবেসে পুরো এক জনম তার নামে উৎসর্গ করে একাকী কাটিয়ে দিতে পারো। তাহলে আমি কেন পারব না? আমার ভালোবাসার একটা নাম আছে, পরিচয় আছে, নয়মাস দশদিনের একটা সুখের সংসারের সুন্দর সুন্দর ক্যাপচার মোমেন্ট আছে। তাকে আমি ভুলব কি করে, রিনি?
— তাকে যদি সত্যি ভালোবেসে থাকো তাহলে সে কেন তোমাকে ফেলে চলে গিয়েছে?
রিনির প্রশ্ন শুনে মেঘালয় চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
— তার কাছে ভালোবাসার চেয়ে অভিমান বড়ো। তাছাড়া, তাকে আমার ভালোবাসা ঠিকঠাকমতো প্রকাশ করতে পারিনি বলেই তো চলে গেছে। যদি সঠিক সময়ে আমার ভালোবাসা ঠিকঠাকমতো প্রকাশ করতে পারতাম তাহলে আমি আর তার একটা সুখের সংসার হতো। আমাদের সুখের সংসারের একটা তাজমহল হতো।
এতবছর ধরে খুঁজে আসা সকল প্রশ্নের উত্তর আজ পেয়ে গেছে। রিনি উঠে দাঁড়ালো। তারপর মেঘালয়ের সামনাসামনি এসে দাঁড়িয়ে বলল,
— আজ থেকে ১৩ বছর আগে যদি আমিও তোমাকে আমার মনের অনুভূতি ব্যক্ত করতাম তাহলে তোমার আমার জীবন অন্যরকম হতে পারতো ; তাই না?
রিনির কথা শুনে মেঘালয় জবাব দেয় না। কারণ এখন রিনির কথার জবাব দেয়ার কোনো ভিত্তি নেই।
— জবাব দিচ্ছো না কেন? শুধু একবার বলো? আমি কি তোমার হতে পারতাম?
মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৭
— না, রিনি। তুমি কখনোই আমার হতে পারতে না। তুমি যদি আমারই হবার ছিলে তাহলে তুমি এতবছরে আমার হয়েই যেতে। কিন্তু,তুমি হতে পারোনি। কারণ, তুমি কখনোই আমার হতে পারবে না। কারণ, আমার আলো আছে। আমার মিথ্যাবতী আছে। যাকে ভালোবেসে কখনোই আমার ক্লান্তি আসে না। বিরক্ত হই না। বরং পৃথিবীতে আরও বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকতে স্বাদ জাগে।
কথাগুলো বলে মেঘালয় দ্রুত সেখান থেকে ফিরে যায় নিজের ঘরে। রিনি ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে।
