মেজর কারদার পর্ব ৩
ফিনারা ঝুমুর
রাত কেটে ভোরের আলো ফুটতেই কারদার বাড়িতে শুরু হয়ে গেছে এক এলাহী কাণ্ড। আজ নিরব আর তিথির বৌভাত। চারদিকে সাজসাজ রব, লাইটিংয়ের ঝলকানি আর বাবুর্চিদের রান্নার সুবাসে পুরো বাড়ি ম ম করছে। বাড়ির সবাই ব্যস্ত নতুন কনে তিথিকে দেখার জন্য আর মেয়েবাড়ির মেহমানদের আপ্যায়নের তদারকিতে।
দোতলার বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে নিচে সবার এই তুমুল ব্যস্ততা দেখছিল মেঘালয়া। গতকাল রাতের ঝড়ঝাপটার পর তার মনে এখনো এক ধরনের কুয়াশাচ্ছন্ন ভয় জমে আছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, গতকাল রাতে জ্ঞান ফেরার পর মেজর কারদার তাকে আর তেমন কোনো জ্বালাতন করেনি। অত্যন্ত ভদ্র ও ঠান্ডা মাথায় তাকে পর্যাপ্ত রেস্ট নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। সাক্ষাৎ যমদূতের এমন আকস্মিক রূপবদল মেঘের কাছে এক মস্ত বড় ধাঁধার মতো লেগেছে।
“মেঘু! চল চল, জলদি চল, রেডি হবি। একটু পরই ভাবির বাড়ি থেকে মেহমানরা সব এসে পড়বে!”
ভাবনার মাঝেই কোত্থেকে যেন মিথিলা হুট করে উড়ে এসে জুড়ে বসল। এক ঝটকায় মেঘের হাতটা খপ করে ধরে সে টানতে টানতে নিজের রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
মেঘ নিজেকে সামলে নিয়ে একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
“আরেহ, বেলা হতে তো এখনও অনেক দেরি। এতো আগে রেডি হয়ে আমি কী করব?”
মেঘের এমন অলস প্রশ্নে মিথিলা চরম বিরক্ত হয়ে পিছু ফিরে তাকাল। চোখ রাঙিয়ে তেঁতে উঠে বলল,
“একদম চুপ থাকবি! একটা কথাও বলবি না। যা বলছি, তা কর!”
অগত্যা, মিথিলার সেই জাঁদরেল আদেশের সামনে মাথা নত করে মেঘ তার রুমে ঢুকে গেল।
প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর মিথিলার রুমের ভারী কাঠের দরজাটা খুলে বাইরে পা রাখল মেঘালয়া। আজকের দিনের জন্য সে বেছে নিয়েছে হালকা বেইজ রঙের একটি চমৎকার সিল্কের শাড়ি, সাথে মানানসই কাটের একটি স্লিভলেস ব্লাউজ। মুখে একদমই হালকা, স্নিগ্ধ সাজ আর চুলগুলো আলগা করে পিঠে ছেড়ে দেওয়া। এই সাধারণ রূপেই শ্যামবর্ণের মেয়েটাকে আজ এতটাই নজরকাড়া আর অপ্সরার মতো লাগছে যে, যে কেউ এক পলক দেখলে চোখ ফেরাতে পারবে না। ঠিক ওই মুহূর্তেই, নিজের কোনো এক জরুরি কাজে সেই করিডোর দিয়ে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছিল মেজর শীর্ষ কারদার অঙ্কন। কিন্তু হুট করে মেঘের দিকে চোখ পড়তেই সে যেন এক লহমায় পাথরের মতো থমকে দাঁড়িয়ে গেল! তার সেই তীক্ষ্ণ, গম্ভীর চোখ জোড়া ল্যাভেন্ডার গার্ল থেকে বেইজ সিল্কের শাড়ি পরা এই মায়াবী রূপসীর ওপর গিয়ে আটকে গেল।
মেঘের এই সম্মোহনী রূপের দিকে তাকিয়ে শীর্ষ এতটাই আনমনা হয়ে পড়েছিল যে, নিজের পায়ের হদিসটাই সে ভুলে গেল। হাঁটার গতি না কমিয়ে আনমনে পা সামনে বাড়াতেই ঘটল বিপত্তি! সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দিতেই তার বুট জুতোটা পিছলে গেল। তবে ডিফেন্সের তুখোড় অফিসার বলে কথা, ভারসাম্য হারিয়ে নিচে গড়াগড়ি খাওয়ার বদলে সে অত্যন্ত চটজলদি ‘ধপ’ করে সিঁড়ির ওপর বসে পড়ল এবং এক হাত দিয়ে শক্ত করে সিঁড়ির মেটালের হাতলটা চেপে ধরল।
পুরো ঘটনাটা ঘটল এত দ্রুত আর মেঘের অলক্ষ্যে যে, মেঘালয়া টেরও পেল না তার এক ঝলক রূপের আগুনে স্বয়ং মেজর কারদার মাটিতে বসে পড়েছে! শীর্ষ দ্রুত আশেপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো কেউ এই দৃশ্য দেখেনি তো! নিজের এই অভূতপূর্ব ও লজ্জাজনক পতনে রাগে, ক্ষোভে তার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠল। সে মনে মনে মেঘালয়াকে এক হাত দেখে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করল এবং মনে মনেই তাকে ধুয়ে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ওরে আল্লাহর বান্দী! তোরে যে শাড়িতে দেখে পিছলা খাইলাম, সেই শাড়ি পড়া যদি বন্ধ না করেছি; তবে আমার নামও ❝শীর্ষ কারদার অঙ্কন❞ নয়!
সিঁড়ি থেকে উঠে নিজের ব্লেজারটা টেনেটুনে সোজা করে নিচে নেমে এল শীর্ষ। তার তীক্ষ্ণ চোখ এড়াতে পারেনি যে, মেঘালয়া আবার মিথিলার রুমের ভেতর ঢুকে গেছে। মনে মনে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সে যাক, ওই মারণাত্মক লুকে মেয়েটাকে এখনও সে ছাড়া বাড়ির অন্য কেউ দেখেনি।ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের ওপাশ থেকে মেঘের মা আলেয়া বানু আর কাকি পিংকির গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। পিংকি তার বড় আপাকে বলছিলেন,
“এবার তুই আর দুলাভাই যেয়ে রেডি হয়ে নে আপা। ওনারা তো মনে হয় এলো বলে।”
দুই বোনকে কথা বলতে বলতে এই করিডোরের দিকেই আসতে দেখে মেজর শীর্ষ কারদারের মাথায় এক চরম কুবুদ্ধি খেলে গেল। ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসিটা চেপে সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে কোনো কল না থাকা সত্ত্বেও ফোনটা কানের কাছে চেপে ধরে গম্ভীর গলায়, বানিয়ে বানিয়ে ওপাশ থেকে কথা শোনার ভান করে বলতে শুরু করল,
“হ্যাঁ, গালিব বলো। কী খবর?”
শীর্ষর গলার গম্ভীর আওয়াজ পেয়ে আলেয়া বানু আর পিংকি দুই বোনই চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর্মির মেজরের মুখে কোনো অফিশিয়াল ক্রাইমের খবর শুনে ওরা কৌতুহলী হয়ে কান খাড়া করল। শীর্ষ ওদেরকে না দেখার ভান করে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আরও একটু জোরে বলতে লাগল,
“কী বললে! বান্দরবানে গতরাতে একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে এই অবস্থা করেছে কয়েকজন? কিন্তু মেয়েটাকে একা পেল কোথা থেকে?”
সে একটু থামল, যেন ওপাশ থেকে গালিব নামের কেউ উত্তর দিচ্ছে। তারপর কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে অত্যন্ত চিন্তিত ও রাগী গলায় বলল,
“কী বলছ! স্লিভলেস করা ড্রেস পরে রাতের বেলা পার্টি থেকে বাড়ি ফেরার মুখে এই অঘটন ঘটেছে? ওহ গড! আজকালকার মেয়েদের কোনো সেন্স নেই! ওরা বুঝে না, পর্দাশীল মেয়েরাই নিরাপদ নয়, আর ওরা তো ওয়েস্টার্ন পড়ে ঘুরছে। কেয়ারলেস!”
হাওয়ায় এই কাল্পনিক কথোপকথন শেষ করে শীর্ষ ফোনটা পকেটে পুরল। তারপর দুই বোনকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে, যেন সে কিছুই খেয়াল করেনি এমন একটা ভাব নিয়ে হনহন করে বাড়ির বাইরে চলে গেল।
এদিকে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা আলেয়া বানু আর পিংকির মুখের রক্ত যেন এক পলকে চুষে নিল কেউ। আলেয়া বানু এমনিতেই মেঘালয়াকে নিয়ে সারাক্ষণ এক বুক দুশ্চিন্তা বুকে চেপে রাখেন। মেয়েটা বড্ড দশ্যি, জেদি আর বাউন্ডুলে স্বভাবের। চট করে কখন কী আকাজ করে বসে, তার কোনো ঠিক নেই। আর সেই কারণেই তিনি সবার সামনে মেঘকে একটু বেশি গালমন্দ করেন, যাতে অন্য কেউ তার মেয়েকে বকার সুযোগ না পায়। মা তো, শাসন করার আড়ালে ওইটুকু আগলে রাখাই তার স্বভাব।
কিন্তু এখন শীর্ষর মুখে এই ধর্ষণের নির্মম পরিণতির কথা শুনে আলেয়া বানুর কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। তিনি পিংকির দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বললেন,
“আচ্ছা, আমরা যাচ্ছি রেডি হইতে। তুইও যা, জলদি রেডি হয়ে নে। আমি একটু মেঘুরে দেখে আসি।”
পিংকিকে বিদায় দিয়ে আলেয়া বানু আর এক মুহূর্ত দেরি না করে হন্তদন্ত হয়ে দোতলার দিকে ছুটলেন। মেঘালয়া কোথায় আছে তা নিশ্চিত না হলেও, আন্দাজে মিথিলার রুমের দিকে পা বাড়াতেই তার কান খাড়া হয়ে উঠল। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে মেঘের খিলখিল হাসির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আলেয়া বানু আর কোনো সৌজন্যতার ধার ধারলেন না। এক ঝটকায় মিথিলার রুমের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন তিনি। আর ভেতরে ঢুকেই তার চোখের মণি ছানাবড়া হয়ে গেল! হালকা বেইজ রঙের সিল্কের শাড়ির সাথে মেঘালয়ার পিঠ খোলা, স্লিভলেস ব্লাউজটা জ্বলজ্বল করছে।
মেয়ের এই রূপ দেখা মাত্রই আলেয়া বানুর চোখের সামনে বান্দরবাগত রাতের সেই কাল্পনিক ভয়ঙ্কর দৃশ্য ভেসে উঠল। তিনি রাগে আর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন,
“আরু”
“আম্মা, তুমি এভাবে চিৎকার করছো কেন?”
মায়ের এমন আচমকা রণচণ্ডী রূপ দেখে মেঘালয়া চমকে উঠে শাড়ির কুচিটা হাত দিয়ে চেপে ধরে এই প্রশ্ন করল। কিন্তু মেয়ের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় তখন আলেয়া বানু ছিলেন না।
তিনি হন্তদন্ত হয়ে মেঘের দিকে এগিয়ে এলেন। কোনো কিছু না ভেবেই মেয়ের স্লিভলেস হাত দুটো খপ করে ধরে ঝাঁকিয়ে অত্যন্ত দ্রুত আর ব্যাকুল গলায় বললেন,
“এভাবে শাড়ি পড়েছিস কেন, বল? কোন আক্কেলে এই হাতকাটা ব্লাউজ পরলি? জলদি এই সাজ বদলা! একদম সাধারণ পোশাক পরবি, যাতে হাত-পা সব ঢাকা থাকে। জলদি কর বলছি!”
মায়ের এমন অদ্ভুত আর অযৌক্তিক জেদ দেখে মেঘ হা হয়ে গেল। সে আমতা-আমতা করে বলল,
“কিন্তু আম্মা– নতুন ভাবির বাড়ির লোক আসবে, সবাই কত সুন্দর সেজেছে, আর আমি–”
মেয়ের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আলেয়া বানু আবার মৃদু চিৎকার করে উঠলেন,
“কী বলছি তোর কানে ঢুকতাছে না? তোরে বলছি না এই শাড়ি বদলে অন্য পোশাক পরবি! এই মিথিলা–”
পাশেই ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে লিপস্টিক দিচ্ছিল মিথিলা। খালাম্মার এমন চিল-চিৎকার শুনে সেও হাতের লিপস্টিক ফেলে থতমত খেয়ে তাকাল। আলেয়া বানু মিথিলাকে লক্ষ্য করে হুকুমের সুরে বললেন,
“মিঠু, তুই ওর এই হাতকাটা সাজ এখনই বদলিয়ে দে। দরকার হলে তোর আলমারি থেকে কোনো ভালো থ্রি-পিস বা সারারা-ঘারারা এনে ওরে পরিয়ে দে। কিন্তু এই পোশাকে ও রুম থেকে এক পা-ও বের হবে না!”
কথাটা শেষ করেই আলেয়া বানু আর মেঘের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকালেন না। বুক ঢিপঢিপানি নিয়ে যেভাবে হন্তদন্ত হয়ে এসেছিলেন, সেভাবেই গজগজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন। রুমে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। মেঘালয়া আয়নার দিকে তাকাল। দুই ঘণ্টা ধরে এত মন দিয়ে করা সাজটা এক নিমিষে মাটি হয়ে গেল! সে অবুঝের মতো মিথিলার দিকে তাকিয়ে বলল, “আম্মার হঠাৎ কী হলো রে মিথু? আম্মা হঠাৎ এমন ব্যবহার করলো? আগে তো এমন করেনি।”
মিথিলাও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“খালাম্মার কখন যে কী হয়, আল্লাহ মালুম! বাদ দে, বাঘের ওপর রাগ করা যায় কিন্তু মায়ের ওপর তো আর করা যায় না। চল, তোরে আমার সেই পাউডার ব্লু সারারাটা বের করে দেই। ওটার হাতাও ফুল হাতা, খালাম্মাও শান্তি পাবে।”
মিথিলা আর কোনো ঝুঁকি নিল না। সে নিজের আলমারি ঘেঁটে পাউডার ব্লু রঙের একটি জমকালো সারারা বের করল, যার পুরো জমিন জুড়ে সোনালি আর রুপালি সুতোর চমৎকার কারুকাজ। মেঘকে জোর করে শাড়ি থেকে নামিয়ে সেই সারারাটা পরিয়ে দিল সে। এরপর মেঘের আলগা চুলগুলোকে সুন্দর করে একটা স্টাইলিশ খোঁপা করে সেট করে দিল মিথিলা। দুই ঘণ্টা আগের সাজটা মাটি হলেও, এই নতুন পোশাকে মেঘালয়াকে যেন আরও বেশি মায়াবী আর রাজকীয় দেখাচ্ছে। মেঘের সাজ শেষ করে মিথিলা নিজেও জলদি রেডি হয়ে নিল।
দুই বোন যখন রুমের দরজা খুলে বাইরে বের হলো, ঠিক তখনই করিডোরের ওপাশ থেকে কিঞ্জা সেজেগুজে ওদের দিকেই আসছিল। মেঘ আর মিথিলার এই জমকালো রূপ দেখে কিঞ্জা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারপর দুই হাত গালে ঠেকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলে উঠল,
“মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ! কী সুন্দর লাগতাছে তোমাদের দুজনকে!”
মেঘালয়া তার ম্লান হওয়া হাসিটা ফিরিয়ে এনে বলল,
“তোমাকেও অনেক সুন্দর লাগছে, কিঞ্জা আপু।”
তিন রূপসী এবার একসাথে হাত ধরাধরি করে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল। এদিকে নিচে ড্রয়িংরুমের কোণে সোফার কুশন ঠিক করার কাজ করছিল আদর আর রাহাত। সিঁড়ি দিয়ে তিনজনকে নামতে দেখেই দুই ভাইয়ের ভেতরের শয়তানিটা আবার চাড়া দিয়ে উঠল।
রাহাত আর আদর একে অপরের দিকে তাকিয়ে একযোগে টিপ্পনী কেটে বলে উঠল,
“আরে দেখ দেখ ! আসমান থেকে পরীর বদলে এক ঝাঁক কাইল্লা পেত্নী নেমেছে রে! একবার যদি একা পায়, তবে ঘাড় মটকে কাঁচাই খেয়ে ফেলব!”
ওদের এমন ফাজলামো শুনে কিঞ্জা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে সিঁড়ির মাঝপথেই দাঁড়িয়ে চিল-চিৎকার করে বলে উঠল,
“কী বললি তুই, আদর ভাইয়া ? আমাদের পেত্নীর মতো লাগছে? তোর এত বড় সাহস!”
বোনদের এভাবে খ্যাপাতে পেরে রাহাত আর আদরের মুখে যেন বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। ওরা হাই-ফাইভ করার ভান করল।
এবার মিথিলা কোমরে হাত দিয়ে তড়পিয়ে উঠে বলল,
“আমরা যদি পেত্নী হই, তবে তোরা হলি আস্ত গরুর গোবর! তোরা নিজেরা আয়নায় মুখ দেখছিস কখনো? দেখিস না, তোদের গা থেকে চব্বিশ ঘণ্টা কেমন গোবর গোবর গন্ধ বের হয়? ইয়াক থু–!”
মিথিলার মুখে ‘গরুর গোবর’ শুনে রাহাতের এতক্ষণের হাসিমুখটা এক ঝটকায় কপাল কুঁচকে কুচকুচে কালো হয়ে গেল। কিন্তু আদর দমবার পাত্র নয়, সে ওদের আরও বেশি খ্যাপানোর জন্য বুক ফুলিয়ে বলল,
“আরেহ! আমরা গোবর হলেও তো জমিতে সার হিসেবে কাজে লাগি! কিন্তু তোরা? তোরা তো সাত বালতি আটা-ময়দা মেখেও শেষমেশ সেই পেত্নীই থেকে গেলি! কোনো লাভ হইলো না!”
ঠিক তখনই, ড্রয়িংরুমের মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল মেজর শীর্ষ কারদার অঙ্কন। যদিও সে একা ছিল না। তার পাশে ছিলেন তার বাবা জুবায়ের কারদার। দুই বাপ-বেটা মিলে আজ সন্ধ্যার বৌভাতের অনুষ্ঠানে কোন কোন বিশেষ অতিথি এবং ডিফেন্সের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন, তাদের প্রোটোকল আর আপ্যায়নের তদারকি নিয়েই গভীর আলোচনায় মগ্ন ছিলেন।
কিন্তু ড্রয়িংরুমের মাঝখানে আদর আর রাহাতের ওই উচ্চবাচ্যের টিপ্পনী আর মেয়েদের চিল-চিৎকার জুবায়ের সাহেব আর শীর্ষ দুজনের কানেই গিয়ে পৌঁছাল। জুবায়ের কারদার কথা থামিয়ে একটু অবাক হয়ে সামনে তাকালেন। শীর্ষও তার বাবার সাথে কথা বলা বন্ধ করে ভ্রু কুঁচকে সেদিকে তাকাল।
কিন্তু সামনে তাকাতেই মেজর শীর্ষ কারদারের সেই কুঁচকে থাকা কঠিন কপাল মুহূর্তের মধ্যে শিথিল হয়ে গেল। সিঁড়ির গোড়ায় বেইজ সিল্কের সেই পিঠ-খোলা, স্লিভলেস শাড়ির বদলে এখন পাউডার ব্লু রঙের ফুল হাতা, জমকালো সারারা পরে দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয়া। চুলগুলো সুন্দর করে খোঁপা করা, বুক-পিঠ-হাত সব শালীনতায় ঢাকা। তার এই নতুন রূপটা দেখা মাত্রই শীর্ষর মনের ভেতর এক তীব্র সন্তুষ্টির হাওয়া বয়ে গেল।
জুবায়ের সাহেব হেসেই ফেললেন ওদের কাণ্ড দেখে,
মেজর কারদার পর্ব ২
“এই ছেলেমেয়েগুলো যেখানেই জড়ো হবে, সেখানেই একটা হাট বসিয়ে দেবে!”
জুবায়ের সাহেব হেসে অন্য মেহমানদের দিকে এগিয়ে গেলেও শীর্ষ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। শীর্ষ মেঘের আপাদমস্তক আরও একবার দেখে নিয়ে, তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর কিন্তু এক চিলতে রহস্যময় কণ্ঠে বলল,
“হুম, বাচ্চাকে এখন অন্তত বাচ্চার মতোই লাগছে। এটাই পারফেক্ট।বাচ্চাদের এতো দ্রুত বড় হতে নেই। খুব সমস্যা হয় এতে!”
