Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ৩০

মৌটুসী পর্ব ৩০

মৌটুসী পর্ব ৩০
ঋতস্বিনী মাহবিশ

​শীত যেন আজ হুট করেই বিদায়ের ঘোষণা দিয়েছে। আজকে সকাল থেকেই রোদের তাপ একটু বেশি, দুপুরের দিকে তা খড়খোরে রূপ নিয়েছে। বাতাসেও কোনো শীতলতা নেই। প্রকৃতি নীরব ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছে—ঋতুর পালাবদল শুরু হয়েছে; গরম আসতে আর বেশি দেরি নেই।
​পড়ন্ত বিকেলের নরম আলোয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বরে এসে থামল একটা রিকশা। মৌ সাবধানে চড়ুই আর বীরকে রিকশা থেকে নামাল, তারপর টাইটানের ঝুড়ি আর হাঁস-ছানার খাঁচাটা হাতে নিয়ে নিজেও একপাশে নেমে দাঁড়াল। বীর-চড়ুইয়ের জেদে এই তিন পান্ডবকেও তুলে নিয়ে আসতে হয়েছে মৌকে। রিকশাচালককে ভাড়া বুঝিয়ে দিয়ে সোজা শহীদ মিনারের সামনের সবুজ চত্বরে এসে দাঁড়াল তারা।
​ততক্ষণে পড়ন্ত বিকেলের সোনাঝরা রোদে শহীদ মিনারের চারপাশটা তরুণ-তরুণীদের প্রাণবন্ত আড্ডায় জমে উঠেছে। কেউ সবুজ ঘাসের উপর, তো কেউ মিনারের সিঁড়ির ওপর বসে বাদামেট খোসা ছাড়তে ছাড়তে আলাপচারিতায় মেতেছে।
বীর আর চড়ুইয়ের কী যে আনন্দ! তাদের নন-স্টপ কথপোকথন আর খিলখিল হাসি চলতেই আছে। একপর্যায়ে চড়ুই শহীদ মিনারের দিকে তর্জনী তাক করে বলল,
“বীর বন্ধু এটা কি বলো তো?”

​—”কী এটা?”—বীর পিটপিট চোখে সেদিকে তাকিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে বলল।
​”এটা হলো, শহীদ মিনার। তুমি এর আগে আসো নি এখানে?”
​”না, আমি এখানে আসিনি। আমি পাপাল সাথে পাল্কে গিয়েছি, অনেকবার। ওখানে অনেক সুন্দল সুন্দল খেলনা আছে। তোমাকেও নিয়ে যাব।”
​”আচ্ছা যাব! আর শোনো এটা আমার মাম্মার ভার্সিটি, মাম্মা আগে এখানে পড়াশোনা করত, তাই আমি এখানে অনেকবার এসেছি। এখনো আসি।”
​”মাম্মাল ভাল্সিটি? আমাল আলোয়া ফুপুমনি আল সাফান চাচ্চুও ভাল্সিটিতে পলে।”
​দুই পুচকোর এমন নানান আধা পাকনা কথা শুনতে শুনতে মৌ ব্যাগ থেকে একটা সাদা চাদর বের করে বিছিয়ে দিল সবুজ ঘাসের উপর। বীর আর চড়ুই টুক করে বাবু হয়ে বসে পড়ল সেখানে। টাইটানের ঝুড়ির মুখটা খুলে দিতেই সেও ‘মেও মেও’ করে লেজ নাড়াতে নাড়াতে বেরিয়ে এসে যোগ দিল ওদের সঙ্গে।
​এদিকে হাঁস-ছানা দুটোও কিচকিচ করে তাদেরকেও মুক্ত করবার তাগিদ দিতে লাগল মৌকে। কিন্তু মৌ খাঁচার দরজা খুলে দিল না, চড়ুই বলল, “মামা আমার বন্ধুদের কেউ বের করে দাও! ওরাও খেলা করবে।”
​”না চড়ুই পাখি! ওরা এদিক ওদিক চলে যাবে। তখন আর ধরতে পারবে না।”
তবুও ​নাছড়বান্দা চড়ুই জেদ করে বলল,

“যাবে না, খুলে দাও। ওরাও আনন্দ করবে।”
​মৌটুসী আবার বলল,
“টাইটান যদি আবার ওদের খামচে দেয়!”
​এবার বীর দৃঢ় ভাবে বলল,
“না মাম্মা, দিবে না। টাইটান গুড বয়, আল খামচে দিবে না। হাস বন্ধুদেল খাঁচা খুলে দাও। আমলা সবাই মিলে খেলা কলব।”
অগত্যা মৌটুসী খাঁচার দরজাটাও খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে হাঁস-ছানাদুটো খুশিতে আপ্লুত হয়ে হেলেদুলে বেরিয়ে আসতে লাগল। সাধারণত হাঁস মুরগির বাচ্চাদের জন্য বিড়াল বিপদজনক। টাইটানও এদের প্রথম দেখায় কিছুটা আক্রমণাত্মক আচরণ করেছিল। তবে পোষ্য পার্সিয়ান বিড়াল হওয়ায় সে কিছু সময় যেতেই এখন অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছে। এছাড়াও বীরের সাথে ওদের সখ্যতা দেখে বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ওদেরকে আপন করে নিয়েছে টাইটান নিজেও।

বীর আর চড়ুই প্লাস্টিকের ব্লক দিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে মনমতো বাড়ি-গাড়ি বানাতে ব্যস্ত। আর মৌটুসী দুই হাঁটু ভাজ করে বসে হাঁটুতে থুতনী ঠেকিয়ে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে। উৎফুল্ল তরুন শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে কী সুন্দর গল্প করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে!
এমন হুল্লোড়ভরা ফ্রেন্ড সার্কেল দেখতে মৌয়ের ভীষণ ভালো লাগে। তবে সে তার ইউনিভার্সিটি লাইফে এই তারুণ্যের উন্মাদনা উপভোগ করার সুযোগ কখনো পায়নি বললেই চলে। তখন তো চড়ুই একেবারে দুধের শিশু। ওকে বাসায় রেখে এসে ক্লাস করতে হতো, কোনোমতে ক্লাস শেষ করেই আবার হুড়মুড় করে বাসায় দৌড়াতে হতো! এর মাঝেই আবার টিউশনিও করাতে হতো নিয়মিত। এই কারণে তার বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। আসলে সময় না দিতে পারলে কোনো বন্ধুত্বই টিকে না। তবুও কেমনে কেমনে যেন শুধু আলিফটা শেষ পর্যন্ত রয়ে গেল, কেন গেল? স্বার্থেই!
​পূর্বের ফেলে আসা স্মৃতির চারণ করতে করতেই কোথাও যেন হারিয়ে গেল মৌ। তার ধ্যান ভাঙল হঠাৎ এক তরুণীর মিষ্টি কণ্ঠস্বরে—

​—”হাই আপু, এখানে একটু বসতে পারি?”
​মৌটুসী চকিতে সোজা হয়ে বসল। তাকিয়ে দেখল, সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। মৌটুসীও মুখে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে চাদরের ওপর তাদের জায়গা করে দিল—
​—”হ্যাঁ, অবশ্যই আপু। বসো।”
​তরুণীটো মৌয়ের পাশেই বসল। তাদের মধ্যে একজন খেলারত বীর আর চড়ুইয়ের দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল—
​—”ওরা কি আপনার বেবি, আপু?”
​মৌটুসী ওপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল—
​—”হ্যাঁ।”
​—”ইশ, কী কিউট! জমজ ভাই-বোন, তাই না?”
​তরুণীর মুখে এই কথা শুনে মৌ এবার একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল! কী বলবে সে এখন? একটু আমতা আমতা করে মুখ ফস-কে বেরিয়ে এল—
​—”না, না… জমজ নয়। তবে পিঠাপিঠি।”

​পাশের তরুণীটি তখন বেশ জোর দিয়েই বলে উঠল—”কিন্তু দেখতে একদম জমজের মতোই লাগছে! কী মিষ্টি! আমি সবসময় দোয়া করি, আমার যেন একটা ছেলে একটা মেয়ে জমজ হয়।”
​তরুণীর এমন কথায় মৌটুসী মুচকি হাসল। তবে তার বান্ধবী সঙ্গে সঙ্গে টিপ্পনী কেটে বলে উঠল—
​—”এখনো একটা ঠিকঠাক বয়ফ্রেন্ডই জুটতে পারলি না, আর তলেতলে কি-না বিয়ের পরের ফ্যামিলি প্ল্যানিংও করে ফেলেছিস, বাপ্রে!”
​দ্বিতীয় তরুণীটি সঙ্গে সঙ্গে কপট রাগ দেখিয়ে বান্ধবীর পিঠে দুম করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে ফোঁস করে উঠল—
​—”এটাকে ফ্যামিলি প্ল্যানিং বলে না, গর্ধব! আমি জাস্ট আমার মনের একটা শখের কথা বললাম।”
​—”তো সেটা কি মুখে বলা যেত না? সবসময় হাত চলাতে হবে তোর?”
​মৌটুসী ওদের ঝগড়া-খুনসুটি দেখে মৃদু হেঁসে বলল,
“আচ্ছা ঝগড়া থামাও, তোমরা কি এখানকারই ছাত্রী?”
​”জ্বি আপু।”
​”কোন ডিপার্টমেন্ট?”
​”বাংলা।”

​তরুণীদ্বয় কিছুক্ষণ মৌয়ের সাথে গল্প শেষে বীর চড়ুইকে আদর করে চলে গেল। মৌটুসী সময় কাটাতে ব্যাগ থেকে দুইটা সেন্টার ফ্রুট বের করে একসাথে মুখে ঢুকিয়ে চিবুতে লাগল।
এরপর বীর আর চড়ুইকেও স্ট্রবেরি পেস্ট্রি, আর ফুলকপির পাকরা খাওয়াল। মৌ বাড়ি থেকেই বক্সে করে কিছু স্নেকস নিয়ে এসেছিল ওদের জন্য। খাওয়া শেষ করে আবারো খেলায় মত্ত হয়ে পরল পুঁচকো দুটো।
এদিকে মৌ একটু থিতু হয়ে বসতেই এবার ওর ফোনটা ব্যস্ত হয়ে উঠল যেন। সশব্দে বেজে উঠল রিংটোন। সে ফোন হাতে নিয়ে দেখল, মি. জেন্টেলম্যানের কল। রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ​ভেসে এল পরিচিত চটপটে একটা কণ্ঠস্বর,
“হ্যালো মৌ? বীরকে নিয়ে গলির মাথায় আসুন।”
​মৌটুসী অবাক হয়ে শুধাল,
“আপনি কি বীরকে নিতে চলে এসেছেন?”
​”হুম।”

​”কিন্তু আমি তো ওদেরকে নিয়ে রাজশাহী ভার্সিটির দিকে এলাম একটু। আপনি যে বললেন আসতে সন্ধ্যা হবে!”
​”হুম, কিন্তু কাজ তো শেষ হয়ে গেল। তাই চলে এলাম।”
​”আচ্ছা, একটু ওয়েট করুন আসছি আমরা।”
​”আরে না না ওখানেই থাকুন, আমিই আসছি। আচ্ছা ভার্সিটির কোথায় আছেন আপনারা এখন?”
​”শহীদ মিনারের সামনে বসে আছি।”
​”ওকে, ওয়েট আ ফিউ মিনিটস।”
​চড়ুই, বীর আর টাইটান একটু দূরে ঘাসের উপর বসে মন দিয়ে সেখানে কিছু একটা করছে। সম্ভবত নিজেদের মতো কিছু খুঁজছে। মৌ ঠিক ধরতে পারল না, তবে দৃষ্টি আর মন সজাগ রাখল সেদিকেই। তন্মধ্যেই পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে সে আস্তে করে ঘাড় ঘুড়াল।
​কোনো রকম অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ধপ করে মৌয়ের পাশের ফাঁকা জায়গাটিতে বসে পড়ল যুবক। খুব ক্যাজুয়ালি বসে মাথাটা অল্প নিচু করে হাতের আঙুল দ্বারা কপাল থেকে সামনের চুলগুলো হালকা নেড়েচেড়ে পেছনে ঠেলে দিল। সেই সঙ্গে যুবক প্রকৃতির উপর চরম বিরক্ত প্রকাশ করে নিজ মনেই বলে উঠল,

—”উফ! এই অসহ্য গরম আবারো ফিরে আসছে!”
​ইশ! লোকটা তার কাছে এসে এমন করছে কেন? সে কি জানে না, ছেলেদের এই ছোট-খাটো ম্যানারিজমগুলো মেয়েদের চোখে খুব বেশি অ্যাট্রাক্টিভ লাগে? মৌ-ও তো রক্তমাংসের একটা মেয়ে, তারও তো হৃদস্পন্দন আছে, না-কি!
​মৌ শক্ত একটা ঢোক গিলল। দেখল, লোকটার পরনের ঢিলেঢালা সাদা শার্টটার পিঠের দিকটা ঘেমে আধভেজা হয়ে উঠেছে। কপাল ও চিবুকের দুপাশেও ফোঁটা ফোঁটা ঘামের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এতটুকু উত্তাপেই ফর্সা বরণের মুখটা কেমন লাল হয়ে উঠেছে। নবাবজাদা চব্বিশ ঘন্টা এসিতে থেকে অভ্যস্ত কি-না!
​”এই যে মৌটুসী পাখি, পানি আছে?”
​বোরাকের নৈমিত্তিক কথায় সম্মোহন ফিরে পেল মৌ। চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের দৃষ্টি লুকাবার চেষ্টা করল সে। এরপর রোবটের মতো শিরদাড়া টানটান করে ব্যাগ থেকে পানির পট বের করে বোরাকের দিকে এগিয়ে দিল।
​বোরাক বোতলটা হাতে নিয়ে মুখটা একটু আকাশের দিকে তুলে ঢকঢক করে পানি খেতে লাগল। মৌটুসী আড়চোখে সেদিকে একবার তাকিয়ে বুক চিপে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তবে সরাসরি আর সেদিকে তাকানোর দুঃসাহস করল না।
​পানি খাওয়া শেষে বোতলের ঢাকনা লাগাতে লাগাতে বোরাক স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করল—

​—”তারপর বলুন, হঠাৎ এখানে আসতে মন চাইল কেন?”
​”ছেলেকে এনেছি বলে বলছেন?”
​মৌটুসীর এমন ত্যাড়া প্রতিউত্তরে চোখ ছোট ছোট করে ওর দিকে তাকাল বোরাক। বিরক্তের সুরে বলল, “মেয়েদের এই এক সমস্যা, সবসময় এক লাইন বেশি বুঝতে হবে তাদের!”
​মৌটুসী এবারে মৃদু হেঁসে আলতো স্বরে বলল।
“সরি। আসলে, এটা আমার প্রিয় জায়গা। প্রায় প্রায় চড়ুইকে নিয়ে আসা হয়।”
​বোরাক বুঝতে পারার মতো করে মাথাটা একটু ঝাঁকাল।
“ওওও! রাবিয়ান না-কি?”
​”হুম।”
​”বাহ্! কোন ডিপার্টমেন্ট ছিল আপনার?”
​”ফিলোসোফি।”
​চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য সরু হয়ে এল বোরাকের। একটু থমকে অবাক কন্ঠে বলে উঠল,

“হোয়াট আ টুইস্ট, ম্যান!”
​”কিসের টুইস্ট?” কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইল মৌ।
​”বলছি। তার আগে বলুন আপনার সেশন কত?”
​”বিশ-একুশ।”
​কপালে দুই আঙুল ঠেকিয়ে অদ্ভুত সুন্দর একটা হাসি দিল বোরাক। এরপর বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে থাম্বস আপ দেখিয়ে বলল—
—”গুড, গুড। ভেরি গুড!”
বোরাকের এমন অদ্ভুত কর্মকাণ্ড আর কথার আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারল না মৌ। বিরক্ত হয়ে ভ্রূ কুঁচকে বলল সে, “এত রহস্য করছেন কেন?”
​”রহস্য! ওটা তো আপনার রক্তে বহমান। বাই দ্য ওয়ে, নাইস টু মিট ইউ, ডিয়ার জুনিয়র!”
​এবার যেন সত্যি সত্যি টনক নড়ল মৌটুসীর। চট করে পুরো ব্যাপারটা তার পরিপক্ক মস্তিষ্কে ক্যাচ খেল যেন। একটু থেমে চোখ বড় বড় করে বলে উঠল ও—
​—”তার মানে… আপনিও?”
​বোরাক উপর নিচ মাথা নাড়ল।
“হুম। আমরা চৌদ্দ-পনেরোর ব্যাচ।”
​”মানে বিশে আমরা ভর্তি হয়েছি, আর আপনারাও ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নিয়েছেন।”
​”হুম।”
​”আসলেই, হুট করে অনাকাঙ্ক্ষিত একটা টুইস্ট সামনে চলে এল।”
​”সত্যিই অনাকাঙ্ক্ষিত। আমি ভাবতেই পারি নি তুমি এত জুনিয়র একটা মেয়ে, অলমোস্ট সিক্স ইয়ার্স দ্যান মি!”
​বোরাককে হঠাৎ তুমি সম্বোধন করতে দেখে ভ্রূ কুঁচকাল মৌ। একটা কারণ পাওয়া মাত্রই আপনি থেকে একেবারে তুমিতে নেমে এসেছে লোকটা!? ইয়ো ইয়ো! বাট, নট ব্যাড!
​মৌটুসীকে এভাবে থমকাতে দেখে বোরাক হেঁসে বলল, “টেক ইট ইজি মৌ। জুনিয়রকে আপনি সম্বোধন করা ঠিক না।”

​মৌটুসী চট করে বলল,
“ইটস ওকে। কোনো সমস্যা নেই। এমনিতেও আপনিতে আমার অস্বস্তিই হতো। তুমি-ই বেটার।”
​”আবার তুমি যেন সিনিয়রের খাতিরে আমাকে ভাইয়া-টাইয়া ডাকতে যেও না, বুঝলে?”
​মৌটুসী চোখ ছোট ছোট করে বোরাককে একটু ঘাটাতে বলল,
“কেন? সিনিয়রদের তো ভাইয়াই ডাকে! এটাই তো নিয়ম!”
​”কিসের নিয়ম? সুন্দরীর মুখে ভাইয়া সম্বোধন আমাদের ইগো হার্ট করে, তুমি বুঝবে না ওসব।” বলেই আলগোছে চোখ টিপ দিল বোরাক।
​মৌটুসী এবারে বিরক্ত হয়ে চোখ উল্টে অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে নিল। মনে মনে বিড়বিড় করতেও ছাড়ল না, “হাহ্! আসছে মৌয়ের সাথে ফ্ল্যাট করতে!”
​এদিকে বীর আর চড়ুই খেলায় এতটাই মত্ত যে, আশেপাশের দিকে তাকানোর কোনো হুঁশই নেই তাদের। পাপা এসেছে, তা খেয়াল করার ফুরসতটুকুও পায় নি পুচকো দুটো। সবুজ ঘাসের ওপর বাবু হয়ে বসে খুব মন দিয়ে ব্লক সাজাতে ব্যস্ত তারা, তাদের মাঝখানটিতে চুপটি করে বসে পরম আগ্রহে খেলা দেখছে টাইটান। আর হাঁস ছানা দুটো ওদের আশেপাশেই ঘুরে বেরিয়ে ছোট ছোট ঘাস ঠুকরে খাচ্ছে।
​”তারপর? তুমি তো তাহলে মাস্টার্স করছ এ বছর, তাই না?”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর বীর-চড়ুইয়ের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই বলল বোরাক।
মৌটুসী আলতো করে মাথা নেড়ে প্রতিউত্তর করল—

—”হ্যাঁ, ভর্তি চলছে।”
​”এখান থেকেই করবে, না-কি অন্যকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে?”
​”না, এখান থেকেই করব।”
​”ভালো। আচ্ছা বসো তুমি, আমি একটু বাচ্চাদের কাছে যাই।”
বলেই উঠে কয়েক ধাপ এগিয়ে বীর চড়ুইয়ের কাছে চলে গেল বোরাক।
​”আমার বাচ্চাদুইটা কী করছে?”
চড়ুই বীর চট করে মাথা তুলে তাকাল। পাপাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে সমস্বরে চেচিয়ে উঠল দুজন, “পাপা!”
​বোরাকও এবার ওদের পাশে ঘাসের উপর ধপ করে বসে পড়ল। আর মুহূর্তেই বীর-চড়ুই নিজেদের জায়গা থেকে উঠে এসে ওর দুই উরু দু’জন দখল করে নিল। বোরাকও পরম মমতায় দুই হাতে দুই দিক থেকে আগলে নিল ছোট্ট প্রাণ দুটোকে।

​খুশিতে গদগদ চড়ুই পাপার গলা জড়িয়ে আদুরে স্বরে বলল, “পাপা তুমি এসেছ! কখন এসেছ?”
​বোরাক মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম হেসে বলল—”এই তো মামনি, মাত্রই এসেছি।”
​এদিকে মিষ্টি বীরও গাল ভর্তি মিষ্টি হেসে বলল, “পাপা বীল আজকে অনেক খুশি খুশি!”
​বোরাক মন ভরে দেখল তার প্রাণের প্রাণবন্ত উজ্জ্বল ছোট্ট মুখখানা। হাজারো খুশির তারা ঝলমল করছে সেখানটায়। বোরাকের পিতৃমন পুলকিত হয়ে উঠল। পেয়ে গেল একরাশ তৃপ্ততা। ছেলের কপালে চুমু এঁকে আপ্লুত হেঁসে বলল সে,
“আমার কলিজা আজ অনেক খুশি খুশি, বাবা?”
​আলতো মাথা নেড়িয়ে সায় দিল ছেলে তার—”হুম। আমরা অনেক খেলা করেছি।”
​চঞ্চল চড়ুই আর ধৈর্য ধরতে পারল না। আজকে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটা ঘটনা গড়গড় করে পাপার কাছে উগড়ে দিতে লাগল—

“পাপা জানো টাইটান আমাদের একটা হাঁস বন্ধুকে পা দিয়ে খামচে দিয়েছিল। হাঁস বন্ধু ব্যথা পেয়েছে আর শরীর থেকে কয়েকটা পাখনাও পড়ে গেছে। পরে মাম্মা ওদের খাঁচায় ঢুকে টাইটানকে বকা দিয়ে বলে দিয়েছে ওরা আমাদের বন্ধু। ওদেরকে ব্যথা না দিতে। এখন আমরা সবাই বন্ধু হয়ে গেছি।”
একনাগাড়ে সব কথা শেষ করে তবেই থামল চড়ুই। বোরাকও খুব মনোযোগী শ্রোতার মতো মেয়ের প্রতিটি কথা একমনে শুনে মৃদু হেসে বলল—
—”তাহলে তো টাইটান আজকে অনেক বড় অপরাধ করেছে, মা! স্পেরোর হাঁস বন্ধুকে ব্যথা দেওয়া? জোর পানিশমেন্ট দিতে হবে ওকে।”
​সঙ্গে সঙ্গে বীর মাথা নেড়ে অসম্মতি করে বলল,
“না পাপা। টাইটান এখন গুড বয় হয়ে গেছে। আল ব্যথা দেয়নি হাঁস বন্ধুদেল।”
​এদিকে নিজের নামের এই অভিযোগের ঝুড়ি টাইটান বেচারা কতটুকু আর বুঝল কে জানে! অভিমানে তুলোর শরীরটা একটু কুঁকড়ে নিল সে, গাল ফুলিয়ে ‘মেও মেও’ করে লেজ নাড়াতে লাগল সজোরে। যেন মালিকের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে বলতে চাইছে—আমি কিন্তু ভোলাভালা একটা ভালো বেড়াল, লর্ড! অপরাধ কি আমি বুঝিই না।
​টাইটানের এই অভিমান দেখে বোরাক হাত বাড়িয়ে একটুখানি ওর নরম শরীরটা বুলিয়ে দিল। এতেই অবলা প্রাণীটির সব অভিমান গলে পানি, লেজ নাড়িয়ে বোরাকের কাছে আরেকটু সেঁটে বসল সে। বোরাক মৃদু হেসে চড়ুই আর বীরের দিকে তাকিয়ে প্রবল কৌতূহলী গলায় বলল—

​—”আচ্ছা! তোমাদের হাঁস বন্ধুদের নাম তো বললে না আমাকে। ওদের নাম কী?”
​প্রতিউত্তরে চড়ুই বলল,
“হাঁস বন্ধুদের নাম তো হাঁস বন্ধুই! অন্য নাম নেই। তুমি ওদের নাম রাখবে পাপা?”
​”আমি? না বাবা। কিন্তু শোনো, তোমরা এখন মাম্মাকে গিয়ে বলো, ওদের জন্য দুইটা সুন্দর নাম ঠিক করে দিতে, তোমাদের মাম্মা পারবে। অনেক যাও। দৌড় দাও।”
​বোরাকের কথামতো দু’জন একছুটে মৌয়ের কাছে এসে হাজির হলো। চটপটে চড়ুই সোজা মায়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ধরে বসল ওকে—
“মাম্মা আমাদের হাঁস বন্ধুর জন্য দুইটা সুন্দর নাম ঠিক করে দাও।”
​”নাম? ওদের আবার কিসের নাম?” অবাক চোখে মেয়েকে দেখে বলল মৌ।
​চড়ুই এবার বেশ হতাশ ভঙ্গিতে কপাল চাপড়ে বিজ্ঞদের মতো করে বলল,
“মাম্মা তুমি কিচ্ছু বুঝো না! নাম আবার কিসের হয়? আমার নাম যেমন চড়ুই, বীর বন্ধুর নাম বীর, হাঁসের ওরকম সুন্দর নাম দাও।”

ফের মৌটুসীর পাশে এসে বসল বোরাক। ওর হতভম্ব মুখটার দিকে তাকিয়ে বোরাক হাসি চেপে বেশ বলল—
“আরে মৌটুসী মা পাখি, তুমি এত ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন? হাঁসের বাচ্চারই নাম ঠিক করতে বলা হয়েছে, মানুষের বাচ্চার নয়। বলে দাও দুই-একটা মাথায় যা আসছে!”
​মৌ বিরক্ত হয়ে বোরাকের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল,
“আমি মৌ, মি. বোরাক। নট মৌটুসী।”
​বোরাকও নাছোড়বান্দার মতো ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে ঘাড় নাচিয়ে বলল,
“কিন্তু আমি তো তোমার স্থলেও মৌটুসী পাখিকেই দেখতে পাই, মৌটুসী! এতে কি আমার দোষ, বলো?”
​মৌটুসী হার মেনে হতাশ ভঙ্গিতে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর বেশ খানিকটা সময় নিয়ে ভেবে ভেবে কিছুটা দ্বিধা নিয়েই বলল—

​—”আচ্ছা, বীর-চড়ুইয়ের নামের অক্ষরের সাথে মিলিয়ে ‘বাটার’ আর ‘চিজ’ দেওয়া যায় কী?”
​মৌয়ের কথা শেষ হতেই ফিক করে সশব্দে হেঁসে উঠল বোরাক। এদিকে পাপার তালে তাল মিলিয়ে বীর চড়ুইও অবুঝের মতো হাসতে শুরু করল।
​সবার এমন হাসিতে মৌ কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেল। আসলেই তো, বাটার-চিজ এগুলো কেমন নাম? এমন উদ্ভট নাম তার মতো আজাইরা মাথাতেই আসা সম্ভব। সো ব্লেম টু ইউ মৌ!
​কিন্তু মৌটুসী নিজের এই দুর্বলতা আড়াল করে গেল, উল্টো কপট রাগ দেখিয়ে তেজী কন্ঠে বলল,
​—”দেখুন, একদম হাসবেন না! এই মুহূর্তে এর চেয়ে ভালো কোনো নাম আমার মাথায় আসছে না। পছন্দ না হলে স্রেফ রিজেক্ট করে দিন, তারপর নিজেই খুঁজে বের করে রাখুন!”

​বোরাক এবার একচোট হাসি থামিয়ে মেকি গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, “রাগ করছ কেন মৌটুসী মা পাখি? তোমার নাম দুটো একটু বেশিই সুন্দর, সাথে বেশ কার্যকরীও। বাটার-চিজের পটি দিয়েই দেশের বাটার-চিজের চাহিদা পূরণ করা যাবে সহজেই। আচ্ছা, এই অসাধারণ কাজের জিনিসগুলো শুধু তোমাদের মেয়েদের মাথাতেই আসে কিভাবে, বলো তো? একটু সিক্রেট ফর্মুলা তো আমাদেরও ধার দিতে পারো!”
​বোরাকের এমন সরাসরি টিজ করা দেখে মৌটুসী ভেতর ভেতর চাপা রাগে ফুটতে লাগল। এই লোককে সে যতটা ভদ্র, সভ্য ও শান্ত প্রকৃতির মানুষ ভেবেছিল, তার এক সিকিভাগও সে নয়। বরং আস্ত একটা আটেকড়ে বাঁদর!
​মৌটুসী কটমট চোখে তাকিয়ে চড়ুইয়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “চড়ুই পাখি, হাঁসের নাম তোমার ইন্টেলিজেন্ট পাপাকেই রাখতে বলো। আমি পারব না।”
​মায়ের কথা শুনে ছোট্ট চড়ুই গাল ফুলিয়ে অভিযোগের সুরে বলে উঠল, “কেউ আমার হাঁস বন্ধুদের নাম রাখছে না! ভালো লাগে না!”
​বোরাক এবারে একটু কেসে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে সিরিয়াস হয়ে বলল,
“আমাদের বীর-চড়ুইয়ের হাঁস বন্ধুদের চূড়ান্ত নামকরণ করা হলো, বাটার আর চিজ।”

​বীর আর চড়ুইকে নিয়ে পার্সিয়ান রোডের দিকে হাঁটতে গেল বোরাক। তবে মৌ যায় নি তাদের সাথে, ও হাঁসের বাচ্চাগুলোকে ধরে খাঁচায় পুরে সেখানেই বসে চুপচাপ বসে রইল। খানিকবাদে পেছনের শহিদ মিনারের বেদির দিক থেকে ভেসে এল গিটারের টুংটাং সুর।
​মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে…
​পরিচিত সুর কানে যেতেই মৌটুসী আনমনা হয়ে পেছনে ফিরে তাকাল। শহিদ মিনারের বেদির উপর গোল হয়ে বসেছে কয়েকজন তরুণ। একজনের হাতে গিটার, আরেকজনের হাতে ট্যাম্বুরিন। বাকিরা চোখ বুজে, আপনমনে গলা মিলিয়ে গেয়ে চলেছে—
​মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে…
দেওয়ানা বানাইছে,
কী জাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে।
বসে ভাবি নিরালায়,
আগে তো জানি না বন্দের পিরিতের জ্বালা…

​দুই হাঁটুর ওপর চিবুক রেখে, একপাশে মাথা কাত করে নিষ্পলক দৃষ্টিতে শহিদ মিনারের দিকে চেয়ে আছে মৌ। রোদ ঝরা পড়ন্ত বিকেলের চরাচর জুড়ে ছড়িয়ে পড়া চেনা সুরের মূর্ছনাটি হুট করেই মৌয়ের কাছে খুব অচেনা ঠেকতে লাগল। গান থেমে গেল একসময়। গিটারের শেষ তারটাও ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতায় মিলিয়ে গেল। কিন্তু মৌটুসীর ভেতরের ভাবনারা থামল না। বরং নিস্তব্ধতার বুক চিরে হঠাৎই ভেসে এল আরেকটি কণ্ঠ—স্বচ্ছ, গভীর, অদ্ভুত মায়াময়।

মৌটুসী পর্ব ২৯

​কে তুমি মেয়ে,
অবগুণ্ঠনে ঢেকেছ মুখ!
লুকাতে যদি চাও তো, এসো না—
সুখের দুয়ার উন্মুখ!

মৌটুসী পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here