Home যে পাখি মন বোঝে না যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৯

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৯

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৯
মুন্নি আক্তার প্রিয়া

পাত্রপক্ষ এসেছে কিন্তু পাত্রকে ছাড়াই। ছেলে নাকি অফিসে গিয়েছে। সরাসরি অফিস শেষ করে এখানে আসবে। বিষয়টা প্রীতির একদমই ভালো লাগল না। এত কীসের কাজের ব্যস্ততা? আর এতই যদি কাজ ইম্পোর্ট্যান্ট হয়ে থাকে তাহলে আজকে দেখতে আসার ডেইট ফিক্সড করার কী দরকার ছিল? যেই ছেলে এখনই কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না, সে আবার বিয়ের পর যে কতটা গুরুত্ব দেবে তা প্রীতির খুব ভালো করেই বোঝা হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে না এই বিয়েটাও আর আগাবে!

প্রীতি যখন বিষয়টা নিয়ে দোনোমোনো করছিল ঠিক তখনই ছেলে তার বাবাকে কল করেছে। কথা শেষ হওয়ার পর জানতে পারল, রাস্তায় অতিরিক্ত জ্যাম থাকার পর ছেলে নাকি আজ আসতে পারবে না। পরে বাহিরে কোথাও দেখা করবে। প্রীতির মেজাজ আরো চটে গেল এবং সে মনে মনে একদম ঠিক করে ফেলল যে, দুনিয়া এদিক-সেদিক হয়ে গেলেও সে এই ছেলেকে বিয়ে করবে না। যেভাবেই হোক এই বিয়ে সে ভাঙবে।
প্রীতির পরিচয় বলতে গেলে সে তার বাবা-মা ও দুই ভাইয়ের ভীষণ আদরের। বর্তমানে অনার্স তৃতীয় বর্ষে ইকোনোমিকস ডিপার্টমেন্টে অধ্যয়নরত আছে। সে যেমন বাড়িতে সবার আদরের আবার তেমনই ভীষণ জেদি। পারভীন বেগমের ভাষ্যমতে, বাবার এবং দুই ভাইয়ের অতিরিক্ত আদর ও ভালোবাসা পেয়েই নাকি প্রীতি এমন বিগড়ে গেছে। অথচ আপাত দৃষ্টিতে দেখতে গেলে পারভীন বেগম যতই রাগারাগি করুক না কেন; অন্তরালে তিনিই মেয়েকে সবচেয়ে এবং সবার থেকে বেশি ভালোবাসেন। কিন্তু প্রকাশ করেন না। কাউকে তো একটু প্রয়োজন ওকে শাসন করার জন্য।

প্রীতির আরো একটা পরিচয় আছে। তবে সেটা গোপন। কেউ জানে না। ও একজন লেখিকা। তবে ছদ্মনামে লেখে। ফেসবুকে অনেক ফ্যান-ফলোয়ার রয়েছে ওর। প্রীতির পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড হলো সবাই ওয়েল এডুকেটেড। বাবা ব্যাংকের ম্যানেজার, বড়ো ভাই ডাক্তার, ছোটো ভাই পুলিশ, ভাবি কলেজের টিচার। মা একসময় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। কিন্তু এখন পুরোদমে সে একজন পাক্কা গৃহিণী। সংসার সামলায়, প্রীতিকে সামলায় আর বড়ো ছেলের দুষ্টু একটা মেয়ে আছে, নাম টুম্পা। ওকে সামলায়। এভাবেই তার সময় কেটে যায়। এজন্য প্রীতিকে না চাইতেও ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনা নিয়ে খুব সিরিয়াস হতে হয়েছে। ভালো রেজাল্ট করতেই হবে এমন একটা মনোভাব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এজন্য তার ভয় হয়, পাছে বাসার সবাই বিষয়টা জানতে পেরে যদি রাগারাগি করে! তাই সে কাউকে এখনো কিছু জানায়নি। অনার্সটা শেষ হয়ে গেলে তারপর জানাবে।

বাইরে আজ ঘুম মেঘ করেছে। ঘনঘটা অন্ধকার মেঘ। প্রীতি জানালার কাছে বসে ছিল। বৃষ্টির চেয়েও তার বেশি ভালো লাগে বৃষ্টি আসার আগের মুহূর্তটুকু। প্রকৃতির সাথে এক অদৃশ্য প্রেম তার। কোথাও ঘুরতে গেলে, ট্যুরে গেলে সে অন্য সবার মতো সারাক্ষণ ক্যামেরা নিয়ে ছবি, ভিডিয়ো করায় ব্যস্ত থাকে না। উলটো ফোন সাইলেন্ট করে কোথাও একটা চুপচাপ বসে থাকে। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে। প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখেছে সে বাবার থেকে। বাবারও প্রকৃতি ভীষণ পছন্দ। ছোটোবেলায় কতশত অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প শোনাত বাবা। প্রীতি সেসব তার ছোট্ট বুকে ধারণ করে রাখত। তার কল্পনাশক্তি খুব ভালো। এক সময় কী মনে করে যেন ডায়ারিতে নিজের কল্পনাগুলো লিখা শুরু করেছিল। তারপর সেসব থেকে কাহিনি এলো মাথায়। আস্তে আস্তে ছোটো ছোটো অংশ মিলিয়ে ডায়ারিতে গল্প লিখত। তারপর একদিন খুব সাহস করেই একটা গল্পের গ্রুপে ছোট্ট গল্প পোস্ট করল সে। অনেক মানুষের সাড়া পেয়েছিল সেই গল্পে। সেখান থেকেই সে অনুপ্রেরণা পেয়ে একটা ফেইক আইডি খুলল এবং নিয়মিত গল্প লিখতে শুরু করল। তিন বছর হবে সে লেখালেখি করে। কত মানুষ তাকে না দেখে, না চিনেই তাকে ভালোবাসে! যেহেতু ছদ্মনামে লিখে তাই সে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঐ আইডিতে নিজের কোনো ছবিও দেয় না।

প্রকৃতির মাঝে ডুবে যেতে যেতেই প্রীতির হঠাৎ করে আবার ডায়ারির কথা মনে পড়ে গেল। প্রিয়তার কথা মনে পড়ছে। মাথায় ঘুরছে সেই অজানা প্রশ্নগুলো। সে আদৌ কি কখনো প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবে? সত্যি বলতে সম্ভাবনা একদম শূন্যের কোঠায়। সেই ঘটনার এখন প্রায় দশ বছর হয়ে গেছে। এই এত বছরে কী ঘটেছে না ঘটেছে সেসবের কিছুই আর লেখা নেই। এমনকি নেই কোনো যোগাযোগের মাধ্যমও। প্রিয়তা নিজের স্কুল, হোস্টেল নিয়ে অনেক কিছু লিখলেও কখনো স্কুলের কিংবা হোস্টেলের নাম লিখেনি। কিংবা কোথায় বাড়ি ছিল, স্কুল, হোস্টেল ছিল সেই ঠিকানাও লেখেনি। প্রীতি শুধু জানে, ঢাকাতেই থাকত প্রিয়তা। এই এত বড়ো ঢাকা-শহরে এত পুরনো ঘটনা কোথায় ঘটেছে সেসব জানা শুধু অসম্ভবই নয়, তারচেয়েও যদি বেশি কিছু থাকে তবে সেটাই। তবুও মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন রয়েই যায়, প্রিয়তা কেন আর কিছু লেখেনি ডায়ারিতে? ডায়ারি লেখা তো ওর শখ ছিল, সবচেয়ে পছন্দের কাজ ছিল।তবে? আচ্ছা কোনোভাবে কি এটা সম্ভব যে, প্রিয়তা ডায়ারিটা হারিয়ে ফেলেছিল? হ্যাঁ, এটাও তো হতে পারে।

“কী করছিস?”
প্রীতি পেছনে তাকিয়ে দেখে পারভীন বেগম এসেছেন। হঠাৎ চিন্তার মধ্যে মাকে দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেল সে। পারভীন বেগম কপাল কুঁচকে বললেন,
“কী হয়েছে তোর?”
“কিছু না।”
তিনি কাছে এগিয়ে কপালে, গলায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন,
“শরীর ভালো আছে?”
“হ্যাঁ, একদম। তুমি বলো না কিছু বলবে?”
“আজকে গিয়ে এই ছেলের সঙ্গে দেখা করে আয়। এই নে ঠিকানা।”
একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন তিনি। প্রীতি জিজ্ঞেস করল,
“এটা কে দিয়েছে?”
“তোর আব্বুকে কল দিয়েছিল। তিনি ঠিকানা আর ফোন নাম্বার এখানে লিখে রেখেছেন।”
“দেখা করে কী হবে মা?”
পারভীন বেগম চোখ রাঙিয়ে বললেন,
“আবার নখরামি?”

“কী আজব! তোমরা সবাই আমার বিয়ে নিয়ে কেন পড়েছ। অনার্স শেষ করেও তো বিয়ে করা যায়।”
“বিয়ের পরও পড়া যায়। দিনদিন তোমার যা জেদ বাড়ছে! এই বিয়েও যে কত বছর পর করো আল্লাহ্ ভালো জানেন। তোমার তো ছেলেই পছন্দ হয় না।”
“আমার এই ছেলেকেও পছন্দ হয়নি।”
পারভীন বেগম বিস্ময়ে হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“পছন্দ হয়নি মানে? তুই তো এখনো দেখাই করলি না।”
“এটাই তো সমস্যা। যেই মানুষ এখনই আমাকে গুরুত্ব দেয় না, টাইম মেইনটেইন করতে পারে না সারাজীবন সে কীভাবে আমাকে মেইনটেইন করবে বলো তো?”
“তোর এতসব ফালতু কথা তো আমি শুনতে চাই না, প্রীতি। এখন আমি যা বলব তা-ই হবে।”
“আমি কি আসলেই তোমার পেটের মেয়ে?”
“না, পিঠের মেয়ে। খুশি?”

কাগজটা প্রীতির হাতে ধরিয়ে দিয়ে তিনি চলে যাচ্ছিলেন। প্রীতির তখন আবার প্রিয়তার কথা মনে পড়ে গেল। তখন ও পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল,
“ও মা, আমার কি আর কোনো বোন ছিল?”
তিনি ভ্রু কুঁচকালেন। মেয়ের মাথা নষ্ট হয়েছে কিনা বুঝতে পারছেন না। বললেন,
“থাকলে তুই দেখতি না?”
“মানে এমন হতে পারে না যে ছোটোবেলায় হারিয়ে গিয়েছিল?”
তিনি এবার বিস্মিত হয়ে বললেন,
“হয়েছেটা কী তোর? মাথা ঠিক আছে?”
প্রীতি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলল,
“তাহলে ভাইয়ারাই সত্যি বলে?”
“কোন সত্যি?”
“এইযে আমাকে তোমরা কুড়িয়ে পেয়েছ।”
তিনি এবার খুব বিরক্ত হয়ে ধমক দিয়ে বললেন,

“এই জা’নো’য়ার নতুন নাটক শুরু করছিস? আমার মাথা নষ্ট করতে চাচ্ছিস? কোনো তাল-বাহানাতেই কাজ হবে না। ঠিক সন্ধ্যা ছয়টায় দেখা করতে যাবি।”
পারভীন বেগম চলে যাওয়ার পর প্রীতি মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। কিছুতেই কোনো হিসাব সে মেলাতে পারছে না। আর প্রিয়তা ও ডায়ারির বিষয়টা এমনভাবে মাথায় গেঁথে গেছে যে, সে অন্য কোনো কাজে মনও দিতে পারছে না। এমনকি গল্পও লিখতে পারছে না। অথচ তার এখনো পাণ্ডুলিপির অর্ধেকেরও বেশি লেখা বাকি। কী যে হবে এবার!

সন্ধ্যায় দেখা করার জন্য প্রীতি খুব সুন্দর করে সেজেগুজে বের হলো। সে অবশ্য কাউকে দেখানোর জন্য সাজে না। নিজের জন্য সাজে, নিজের স্যাটিসফাই হওয়ার জন্য সাজে। ওর আসলে নিজেকে সর্বদা পরিপাটি হয়ে সেজে থাকতে ভালো লাগে। বের হওয়ার আগে প্রীতির ভাবি টয়া বলল,
“ওখানে গিয়ে আবার ছেলেটাকে মেজাজ দেখিও না! ভালোমতো কথা বলবে কেমন?”
প্রীতি কিছু বলল না। আপাতত কথা সে বাড়াতে চায় না। নতুবা কখন আবার মা এসে নাটক শুরু করে দেবে। এমনিতেই তিনি ভীষণ চটে আছেন মেয়ের ওপর। তিনি বারবার করে বলার পরও প্রীতি শাড়ি পরেনি। এটাই তার মেজাজ খারাপের কারণ।
প্রীতি বের হওয়ার পর টয়া দরজা লাগিয়ে ড্রয়িংরুমে যাওয়ার পর পারভীন বেগম রুম থেকে বের হলেন। রাগীস্বরে বললেন,

“শাড়ি পরেনি না?”
টয়া শাশুড়ির রাগ দেখে হেসে ফেলল। এই মানুষটা পুরো সংসার সামলায়। একদম শুরু থেকেই। টয়া যখন এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছিল তখন সে মাত্র এইচএসসি দিয়েছে। শ্বশুর-শাশুড়ি এবং স্বামীর সাপোর্টের জন্যই সে অনার্স, মাস্টার্স শেষ করতে পেরেছে। টয়া ভাগ্য করে এমন একটা শ্বশুরবাড়ি পেয়েছে যে, যারা কখনো ওকে বাচ্চা নেওয়ার জন্যও প্যারা দেয়নি। মাস্টার্সে উঠে টয়া নিজেই বাচ্চা নিয়েছে। তবে সত্যি বলতে বাবুকে বেশিরভাগ সময় শাশুড়িই রাখত। রাতে যেন টয়ার পড়াশোনায় কোনো ডিস্টার্ব না হয় এজন্য তিনি বাবুকে নিজের কাছে রাখতেন। শুধু খাওয়ার সময় এই রুমে নিয়ে আসতেন এবং টয়া পড়া শেষ করে ঘুমাতে গেলে তখন বাবুকে দিয়ে যেতেন। এমনকি পরীক্ষার সময়গুলোতেও ওর শাশুড়ি বাবুকে নিয়ে ভার্সিটিতে গিয়ে বসে থাকতেন। পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট বের হওয়ার পর যখন টয়া বলেছিল, তার স্বপ্ন টিচার হওয়া তখন কেউ তার বিরুদ্ধে যায়নি। বরং সবাই উৎসাহ দিয়েছে। টুম্পার বয়স দুই বছর হওয়ার পর টয়া একটা প্রাইভেট কলেজে চাকরি নিয়েছে। তার জীবন অনেকটা স্বপ্নের মতো। নয়তো এরকম সাপোর্টিভ শ্বশুরবাড়ি কয়জন পায়? দেবর-ননদও ছোটো ভাই-বোনের মতো। কখনো কারো সঙ্গে দুটো কথা কাটাকাটিও হয়নি। টয়া নামাজ পড়ে প্রতিবারই শুকরিয়া আদায় করে এমন একটা পরিবার ওকে দেওয়ার জন্য। সবচেয়ে বেশি দোয়া ও পারভীন বেগমের জন্য করে। নিজের মায়ের পরে এই মানুষটাই বিয়ের পর ওকে আগলে রেখেছে বাচ্চার মতো। কিন্তু এত শক্ত মানুষটাও যখন মাঝে মাঝে বাচ্চা হয়ে যায়, বাচ্চাদের মতো জেদ করে টয়া তখন হাসি আর আটকে রাখতে পারে না। কে বলবে এই মানুষটাই নাকি আবার পুরো সংসার চালায়!
পারভীন বেগম টয়াকে নিরুত্তর ও হাসতে দেখে বিরক্ত হয়ে বললেন,

“হাসছ কেন?”
“আপনার বাচ্চামো দেখে। টুম্পার সঙ্গে থেকে দিনদিন আপনিও বাচ্চা হয়ে যাচ্ছেন।”
“তোমাকে কিছু বলাই বৃথা! ঘুরেফিরে তুমি যে তোমার আদরের ননদের পক্ষই নেবে তা আমি খুব ভালো করেই জানি।”
তিনি ফের রাগ করে রুমে চলে গেলেন। টয়াও তখন পিছু ছুটল শাশুড়ির রাগ ভাঙানোর জন্য।

আলো ঝলমলে রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল প্রীতি। লোকটা ওকে ফোনে টেক্সট করে জানিয়েছে, সে অলরেডি চলে এসেছে। তার পরনে একটা কালো শার্ট। একদম কর্ণারের টেবিলে আছে। খুঁজে না পেলে যেন কল দেয়।
প্রীতি মনে মনে মুখ ভেংচি দিল। এখন খুব ম্যানার্স দেখানো হচ্ছে! যেদিন সবাই মিলে বাড়িতে ওকে দেখতে গিয়েছিল সেদিন কোথায় ছিল এই ম্যানার্স? হাহ্! যা হোক, প্রীতি লম্বা একটা দম নিয়ে ভেতরে ঢুকল। কারণ সে কিছুটা নার্ভাস। এর আগে কখনো সে কোনো পাত্রর সঙ্গে আলাদা দেখা করেনি। কেউ ওকে দেখতে যাওয়ার পরপরই নিজেই ও না করে দিয়েছে, আবার কারো ছবি কিংবা বায়োডাটা দেখেই না করে দিয়েছে। এই প্রথম সে বাইরে কারো সাথে আলাদা দেখা করছে।

গুটিগুটি পা ফেলে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রীতি কর্ণারের টেবিলটার দিকে এগিয়ে গেল। পেছন থেকেই সে ছেলেকে দেখতে পেয়েছে। টেবিলের ওপর গোলাপ ফুলের একটা বুকে রাখা।
প্রীতি গিয়ে চুপচাপ সেখানে দাঁড়াল। ওর উপস্থিতি টের পেয়েই ছেলেটি এক পলক তাকিয়ে দাঁড়াল। প্রীতি সৌজন্যতামূলক মৃদু হাসল শুধু। চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
“বসুন।”
প্রত্যুত্তরে কানে এলো,
“প্রিয়তা!”
প্রীতি মাথা নাড়িয়ে বলল,
“উহু! প্রীতি।”
পরক্ষণেই প্রীতি একটা ঝটকা খেল। বিস্ময়াভিভূত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি এই মাত্র আমাকে কী নামে ডাকলেন? প্রিয়তা? প্রিয়তা কে? আপনার কী হয়?”
ছেলেটা এবার একটু ঘাবড়ে গিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। চেয়ারে বসে খুব ভালো করে প্রীতিকে নোটিশ করে বলল,
“সরি! আমি একচুয়ালি হঠাৎ করে আপনাকে দেখে গুলিয়ে ফেলেছিলাম। আ’ম এক্সট্রিমলি সরি!”
“কী গুলিয়ে ফেলেছিলেন?”
“আপনি দেখতে অনেকটাই হুবুহু আমার এক ফ্রেন্ডের মতো। কিন্তু ওর গালে একটা তিল ছিল। আপনার গালে নেই। আর আপনি ওর খুব ছোটোও হবেন।”
প্রীতি কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন কথা বলার ভাষার হারিয়ে ফেলল। ওর হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। গলাও কাঁপছিল। কথা বলতে পারছিল না। উত্তেজনা টের পাচ্ছিল সে। অনেকটা কাঁপান্বিত কণ্ঠে বলল,

“প্রিয়তা আপু আপনার ফ্রেন্ড?”
“প্রিয়তা আপু মানে! আপনি ওকে চেনেন?”
“আমি যদি ভুল না হই, তাহলে আপনি যার কথা বলছেন তাকে আমি চিনি!”
“চিনেন! কিন্তু কীভাবে সম্ভব?”
“আগে আপনার নামটা বলুন?”
“জীবন।” একটু থেমে বলল।
প্রীতি এবার হড়বড় করে বলল,

“আপনিই সেই জীবন, যে দশ বছর আগে প্রিয়তা আপুকে ভালোবাসতেন! আমি যদি ভুল না হই, তাহলে হয়তো এখনো ভালোবাসেন। আপুর একটা সার্কেল ছিল। তাদের নাম ছিল আকাশ, সুমন, সায়রা আর মিতু। আপুর রুমমেটের নাম ছিল অদিতি। সেই প্রিয়তার কথাই বলছেন না আপনি?”
জীবন এতটাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে যে, সে তৎক্ষনাৎ কোনো জবাবই দিতে পারল না। প্রীতি অস্থির হয়ে বলল,
“বলুন!”

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৮

“হ্যাঁ! কিন্তু আপনি এত কিছু জানলেন কীভাবে? ওকেই বা চেনেন কীভাবে?”
খুশিতে এবার বোধ হয় কান্নাই করে ফেলবে প্রীতি। চোখে পানি চিকচিক করছিল। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে আনন্দিত কণ্ঠে বলল,
“এই প্রথমবার… এই প্রথমবার আমি বিশ্বাস করলাম, পৃথিবীটা খুব ছোট্ট আর গোল। যেই বাকি সত্যটা ,গল্পটা জানার জন্য আমি হন্যে হয়ে ম’র’ছি’লাম সেই সত্য এখন আমার সামনে।”

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here