Home যে শ্রাবণে প্রেম আসে যে শ্রাবণে প্রেম আসে শেষ পর্ব 

যে শ্রাবণে প্রেম আসে শেষ পর্ব 

যে শ্রাবণে প্রেম আসে শেষ পর্ব 
তোনিমা খান

সন্তান নিয়ে কাড়াকাড়ির সেই দ্বন্দ্বের স্থায়ীত্ব হয় দীর্ঘ ছয় মাস। দীর্ঘ এই ছয় মাসে বাচ্চা সমেত ইরা আর শ্রেয়ানকে কতোবার কোর্টে হাজিরা দিতে হয়েছে। কখনো আশার আলো দেখেছে তো কখনো আশাহত।
রাত এগারোটা। চৌধুরী বাড়ি জুড়ে আলো ঝলমল করছে। তবে সেই আলোতেও ঘরটা কেমন অনুজ্জ্বল, উদাসীনতা, মূর্ছনা গুমোট ভাব স্পষ্ট। সমীরনে ভরপুর ক্লেশ। আগামীকাল কোর্ট সর্বশেষ শুনানি দেবে। যেই শুনানিতে তথাকথিত বায়োলজিক্যাল ফাদার এর জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা আশিভাগ। কেননা ইরফান ইরার সাথে যাই করুক না কেনো! কিন্তু সন্তানের প্রতি দায়িত্বে কখনো হেলা করেনি। দুনিয়ার কাছে দায়িত্ব জিতে যায় বাবার ভালোবাসা থেকে। তাদের কছে দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বাবার ভালোবাসা না পাওয়ার যে শূন্যতা—সেটা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই তো ইরফান দিন শেষে জিতে যাচ্ছে। আর হেরে যাচ্ছে শ্রেয়ান! দিনশেষে একটা জায়গায় সে আঁটকে যায়—সৎ বাবা। কোর্টকাছারিতে ভালোবাসা খুব একটা জায়গা পায় না বোধহয়। এমনি ভ্রান্ত ধারণা শ্রেয়ানের মনে আজ জেঁকে বসেছে।
বরাবরের মতো বাবার শার্টের কলার গম্ভীর মেয়েটির মুঠোবন্দী। কাঁধে তার গরম নিঃশ্বাস আঁছড়ে পড়ছে। ঘুমিয়েছে পাঁচ মিনিট হবে। এখনো হাত ঢিলে হয়নি।
আগামীকাল সকাল দশটায় কোর্টে উপস্থিত থাকতে হবে সকলকে। এক সপ্তাহের ছুটিতে শ্রেয়ান আজ বাড়িতে রয়েছে। খাবার ঘরে সুমনা আর সুস্মিতা মলিন মুখে খাবার বাড়ছে। সুমনা শ্রেয়ানকে ডেকে বলল,

–“শ্রেয়ান খেতে আয়।”
লালচে দৃষ্টি লুকিয়ে শ্রেয়ান মিহি স্বরে জবাব দেয়,
–“খিদে নেই মামনি। তোমরা খাও।”
–“ইরা খাবে না? ওকে ডাক! সকাল থেকে পানি ছাড়া আর কিছু খায়নি।”, সুমনা আবার বলল। শ্রেয়ানের জবাব আসে না। কেননা ততক্ষণে ইরাম ঘুম জড়ানো চোখ তুলে দাদির দিকে তাকায়। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“দাদ্দা!”
সুমনা ছলছল নয়নে তাকায় নাতনির দিকে। সাড়ে চৌদ্দ মাসের মেয়েটা এখন কতোকিছু বলে! সবাইকে ডাকতে পারে। মা, পাপা, দাদ্দা, ফুপিকে ডাকে ফুফি! আর মিলাকে ডাকে মিনা। পুরো ঘর তার আধো আধো কথায় মেতে ওঠে।
শাহেদ চৌধুরী খেতে বসেছিলেন কিন্তু খেতে পারলো না একমুঠো ভাত। উঠে যায় চেয়ার ছেড়ে। হাত ধুয়ে নাতনির কাছে এগিয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে বলে,

–“দাদ্দা আসবে, দাদুমনি?”
ইরাম চোখ পিটপিট করে একবার দাদা আর বাবার দিকে তাকায়। বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
–“পাপ্পা!
কিয়ৎকাল থেমে আবার দাদাকে দেখিয়ে বলে,
–“দাদ্দা!”
শ্রেয়ান লালচে টলমলে চোখে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকায়। বলে,
–“হ্যা মা, দাদ্দা। যাবে দাদার কাছে?”
ইরাম নাকমুখ কুঁচকে মাথা নেড়ে বলল,
–“নো!…পাপ্পা!”
শ্রেয়ানের চোখ থেকে টপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। সে বাবার কাছ থেকে যাবে না। কর্মক্ষেত্র থেকে যতোটুকু অব্যাহতি পায় ততটুকু সময় পুরোটা এই গম্ভীর মেয়েটাকে দিতে হয়। নয়তো রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ঘর ভাঙচুর করে। অথচ পৃথিবীর নিয়ম কি নির্দয় এই মেয়েটি তার কাছে আর একটা রাত আছে। ভাবতেই শ্রেয়ান শব্দ করে কেঁদে উঠলো। বসার ঘরের সকলে হকচকায় শ্রেয়ানের কান্নার শব্দে। মেয়ের ঘাড়ে মুখ গুঁজে হাঁউমাঁউ করে কাঁদছে শ্রেয়ান। সুমনা ছুটে এসে ছেলেকে আগলে নেয় বুকে। শ্রেয়ান ক্রন্দনরত গলায় আর্তনাদ করে উঠে বলে,

–“আমি ওকে দেবো না মামনি। কাউকে দেবো না। ও আমার মেয়ে। আমি ওর সৎ বাবা নই। ওকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো মামনি? কার জন্য সুন্দর সুন্দর ফ্রক কিনবো? কার জন্য ব্যাগ ভরে বেরি আনবো? তুমি কিছু করো না মামনি? পাপাকে বলোনা কিছু করতে! কেনো তারা আমার মেয়েকে নিয়ে যাবে আমার থেকে? আমি…আমি বরং ওকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাই। তাহলে কেউ ওকে আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।”
শাহেদ চৌধুরী আর সুস্মিতার চোখ ভরে উঠলো শ্রেয়ানের আহাজারিতে। সোফার এক কিনারায় চুপসে বসে থাকা মিলাও কেঁদে উঠলো নাক টেনে। ইরাম অবাক নয়নে বাবাকে দেখছে। বাবা কাঁদছে বুঝতে পেরেই তার চোখ বড়বড় হয়ে যায়। চোখ টলটল করে উঠলো। দ্রুত বাবার গালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। আর অস্ফুট স্বরে বলতে লাগলো,
–“ভায়োওও…ভায়োওও…আদো আদো!”
সুমনা ছলছল নয়নেও হেসে ফেললো ইরামের কথায়। সে সুর টেনে টেনে বলছে ভালো ভালো…আদর..আদর। এমন করে তারা সকলে তাকে আদর করে তাই সেও এটা শিখে নিয়েছে। শ্রেয়ান কান্নারা আরো বৃদ্ধি পায় মেয়ের আদরে। মেয়ের চোখেমুখে আদর করে দিয়ে বলে,
–“পাপাকে ছেড়ে যেও না মা। পাপা তোমার আদর না পেলে খুব কষ্ট পাবো।”
বাবা চুমু দিয়েছে তাই ইরামের ও চুমু দিতে হবে। সে বাবাকে হাত দেখিয়ে কাছে ডাকে, আর আধো আধো কণ্ঠে বলে,

–“পাপ্পা! তিসি তিসি…নোজ”
শ্রেয়ান অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে শুধায়,
–“পাপ্পাকে নোজে কিসি দেবে? দাও।”
শ্রেয়ান নাক এগিয়ে দেয়। ইরাম একগাল হেসে নাকে চুমু দেয়। আবার আধো আধো কণ্ঠে বলে,
–“চিক!”
শ্রেয়ান অশ্রুসিক্ত নয়নে হেসে ফেললো। মেয়ে তার সব পারে। নোজ, এয়ার, লিপ আইজ এগুলো সব শিখিয়েছে সে। বলল,
–“গালেও দেবে? দাও!”
গাল এগিয়ে দিতেই ইরাম গালেও শব্দ করে চুমু খায়। আর হাত তালি দিয়ে বলে,
–“তিসি, পাপ্পা তিসি।”
–“হ্যা, আমার মা! পাপ্পাকে কিসি দিয়েছে।”
বাবা হেসেছে দেখতেই ইরাম আবার কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। একহাত বাবার শার্ট ভেদ করে বুকের লোমগুলো টানছে। এটা ইরামের একটা অভ্যাস! বদ অভ্যাস না কি! বলা যায় না। তবে শ্রেয়ানের খুব পছন্দের একটা বিষয় এটা। মেয়ে তার কাছে আসলেই বুকের উপর বসে বুকের লোম টানবে। সকলে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে বাবা মেয়ের আহ্লাদ দেখে।

ইরামকে নিয়ে শ্রেয়ান ধীরপায়ে নিজের ঘরে ঢুকলো। কিন্তু কাঙ্খিত মানুষটির দেখা পেলোনা। বারান্দায় উঁকি দিলে, অন্ধকারে বেতের চেয়ারে বসা একটি উদাসীন অবয়ব ভেসে উঠলো। আঁচলের নিচে থাকা ছেলের চুক চুক করে দুধ খাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। শ্রেয়ান পা বাড়ায় না। কোন সাহসে বাড়াবে? একদিন যে কতো জোর গলায় ওয়াদা করেছিল তার বুক খালি হতে দেবে না। সে পারলো না ওয়াদা রাখতে। শ্রেয়ান মুখ লুকিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো। অলস দেহ বিছানায় এলিয়ে দেয়। বুকের উপর মেয়েকে শুইয়ে তার চুলে অলস গতিতে হাত বুলাতে লাগলো। মেয়ের চুল এখন অনেক বড়ো হয়েছে। মাথার দুই পাশে দু’টো তালগাছ করা যায়। ভেবেই ম্লান হাসলো শ্রেয়ান! নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ করেই তার ফোনটা বেজে উঠলো। শ্রেয়ান অনাগ্রহে ফোনটা কানে তুললো। বলে,
–“আসসালামুআলাইকুম! কে বলছেন?”
–“ওয়ালাইকুমুসসালাম! আমি নিহার বলছি।”
নিহার! এই নামটিকে এই ছয় মাসে শ্রেয়ান চিনে গিয়েছে। অনাগ্রহে, দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–“জি, বলুন।”
–“ইরামকে লালন পালন করার মতো সময় আর ইচ্ছা আমার নেই। আমি জব করি, আমার পর্যাপ্ত সময় নেই একটা বাচ্চার দেখাশোনা করা। আমার মনে হয় ইরাম আপনার কাছে অনেক যত্নে আর সুখেই আছে। একটা বাচ্চার অযত্ন হোক এটা আমি চাই না। আপনি যদি ইরামকে চিরদিনের জন্য নিজের কাছে রাখতে চান তবে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”
মৃতপ্রায় আত্মা যেনো হঠাৎ ই প্রাণ ফিরে পেলো। শ্রেয়ান চকিতে উঠে বসতে নিলেই ঘুমন্ত মেয়ে, চোখ মুখ কুঁচকে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে ওঠে,

–“পাপ্পাহ!”
শ্রেয়ান হড়বড়িয়ে বলে,
–“স্যরি মা! স্যরি। তুমি ঘুমাও।”
ইরাম আবার ঘুমিয়ে পড়ে। সেই অন্ধকার রাতটা যেনো শ্রেয়ানের কাছে প্রজ্বলিত দ্বীপশিখার ন্যায় জ্বলজ্বল করে উঠলো নতুন আশার আলোয়।
পরদিন সুপ্রভাতটি হয় রৌদ্রজ্জ্বল। চারিদিকে কেমন খুশির আভাস। কোর্টে উপস্থিত দুই পক্ষের এক পক্ষের মাঝে পূর্বাভাস ছাড়াই আঁছড়ে পড়লো দুঃসংবাদের লহরী। আইনজীবী যখন কোর্টে নিহারের প্রেগনেন্সি কমপ্লিকেশনের রিপোর্ট আর নিহারের কিছু বক্তব্য সাবমিট করলো তখন ইরফানের মুখশ্রী বিবর্ণ হয়ে পড়ে। এতোদিন নিহারকে ডিভোর্সের ভয় দেখিয়ে কোর্টে বয়ান দিতে বাধ্য করেছিল সে!
নিজের বক্তব্যে নিহার জানায়, সে ঐ বাচ্চার লালন পালনের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নেয়নি তাকে জোর করা হয়েছে। আর সে নিতে চায় না বাচ্চাটির দায়িত্ব। এটাও জানায় ইরফান শুরুতে ইরামকে নিজের কাছে নিতে চায়নি; কিন্তু যখন জেনেছে তার গর্ভধারণে সমস্যা রয়েছে তখনি ইরামকে নিজের কাছে আনার সিদ্ধান্ত নেয়‌।
সেই বয়ানে পুরো কেসের গতিবিধি পাল্টে গেলো। একটা মিরাকেলের মতো, কোর্টের নির্দেশে ইরাম চিরদিনের মতো শ্রেয়ানের হয়ে গেলো। মাসে একবার ইরফান দেখা করতে পারবে ইরামের সাথে, চাইলে কিছু সময় ও কাটাতে পারবে। পিতৃত্বের স্থান থেকে মেয়ের জন্য ভালোবেসে কিছু দিতে চাইলে সেটাও পারবে।
কোর্টে থেকে বের হয়েই ইরফান রাগে ফেটে পড়লো। কষিয়ে এক চড় বসিয়ে দিলো নিহারের গালে। নিহার অগ্নি দৃষ্টিতে তাকায় বলে,

–“তুমি কি আমায় রোজ রোজ ডিভোর্সের হুমকি দাও—আমিই তোমায় ডিভোর্স দেবো। আমার গায়ে হাত তোলার স্পর্ধা কি করে হয় তোমার?”
ইরফানের রাগ দমে যায় নিহারের হুমকিতে। তাকে কোন প্রকার কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নিহার গটগট করে চলে যায়। ইরফান ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তার পিছু নিলো। দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে ইরা শ্রেয়ান বুকভরা নিঃশ্বাস নিলো। পুরো চৌধুরী বাড়িতে সুখ আঁছড়ে পড়লো। মেয়েকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে পেয়ে শ্রেয়ান আবেগে কেঁদে ফেললো। আর নেই কোন সন্তান হারানোর ভয়। সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলো ইরার জীবনের প্রাপ্তির খাতাটিতে। ছেলেকে কোলে নিয়ে ইরা চোখ মুদে নেয় শ্রেয়ানের কান্নারত মুখটি। অন্যের সন্তানের জন্য মানুষটার এই কান্না! সুবিশাল এই পৃথিবীতে এমন একজন পুরুষের সান্নিধ্য সে পাবে, এটা অকল্পনীয় ছিল। সেদিনের পর থেকে আর কোনকিছুর জন্য পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি ইরা, শ্রেয়ান, শ্রবণ আর ইরামের।
পরিশিষ্টঃ
কখনো ব্যাঙ, কখনো ভুত, কখনো লক্ষ্মী টেরা তো কখনো গরু, ছাগল! এতোকিছুর অভিনয় করেও যখন পাশের গম্ভীর মুখটিতে হাসি ফোটাতে ব্যর্থ হলো শ্রবণ—তখন সে ফোঁস করে বিরক্তি মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেললো। বেঞ্চে গা এলিয়ে দিয়ে শ্রবণ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

–“ইরেটেটিং! হাসতে কি টাকা লাগে মেরি বেহেন? নাকি হাসলে দশ তালা বিল্ডিংটা ধ্বসে পড়বে? নাকি আপনার কিডনি খসে পড়বে?”
চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের অধিকারী রোগা পাতলা একটি মেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকায় নিজের পাশে থাকা ক্লাস ফিলোর বেশে নিজের ছোট ভাইয়ের দিকে। যে কি-না হাত মুখ নেড়ে নেড়ে লাগাতার পকর পকর করে যাচ্ছে। সে গম্ভীর গলায় শাসিয়ে বলল,
–“শ্রবণ!”
–“আমি জানি আমার নাম শ্রবণ চৌধুরী। বারবার মনে করিয়ে দেয়ার কি প্রয়োজন?”, শ্রবণ কাঁধ ঝাঁকিয়ে রিল্যাক্স মুডে বলল।
ইরাম রাগান্বিত চোখে তাকায়। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
–“ইউ আর আ জোকার! ইট’স সাউন্ড’স সো গুড দ্যান অ্যান অ্যাথলেট।”
শ্রবণের চোয়াল জুড়ে বড়োসড়ো এক হা। বিস্ময়ে তার হেলান দেয়া রোগা দেহ সোজা হয়ে গেলো। নিজের দিকে আঙুল তাক করে বিস্ময় নিয়ে শুধায়,
–“কি বললে তুমি? আমি জোকার? আমি একজন ক্রীড়াবিদ এটা শুনতে খারাপ লাগে? তুমি এটা বলতে পারলে?”

শ্রবণ একটু আধটু খেলাধুলা করে, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। আর তাতেই সে নিজেকে এথলেট বলে দাবি করে। ইরাম গম্ভীর গলায় বলল,
–“আমি সত্য বলতে কখনো পিছুপা হই না।”
–“ওরে আমার সাহসী, মহিয়সি নারী! টিকটিকি দেখলে লাফিয়ে আমার কাঁধ জড়িয়ে থাকে কে? ভীতুর ডিম! আবার নিজেকে সাহসী বলতে চাইছো। হাসি পাচ্ছে আপনার কথা শুনে, হি হি হি!”,নানা আঙ্গিভঙ্গি করে বলেই শ্রবণ দাঁত কেলিয়ে হাসলো। ইরাম দাঁতে দাঁত চেপে তাকায়। বলে,
–“ইউ আর আ ইরেটেটিং গাই!”
–“নিজের প্রসংসা নিজের করছো কেনো, বেহেন? আমি জানি তুমি একটা ইরেটেটিং গাই।”, শ্রবণ সয়তানি হাসি দিয়ে বলল। ইরাম রাগে চাপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো,
–“শ্রবণণণণ!”
–“আরে আমি জানি আমার নাম শ্রবণ।”, শ্রবণ বিরক্তি নিয়ে বলল।
–“শ্রেয়সী এন্ড শ্রবণ হোয়াট হ্যাপেন টু ইউ?”, মিসের জলদগম্ভীর আওয়াজ শুনতেই শ্রেয়াসী ওরফে ইরাম আর শ্রবণ সোজা হয়ে বসে যায়। ভীত চোখে তাকায় কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মিসের দিকে। মিস রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“তোমরা দু’জন প্রতিটা ক্লাসে ঝগড়া করো। আমি আর নিতে পারছি না। বোথ অব ইউ, জাস্ট গেট আউট!”

শ্রবণ চোখ বড়বড় করে তাকায় মিসের দিকে। তীব্র আক্রোশ নিয়ে বলে,
–“ম্যাম আই ডিড নাথিং। শি ইজ দ্যা মেইন কালপ্রিট!”
ইরাম ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় ভাইয়ের দিকে। তেতে উঠে বলে,
–“ম্যাম নো! হি ইজ আ লায়ার। হি ইজ দ্যা মেইন কালপ্রিট!”
–“জাস্ট শাট আপ! তোমরা বের হও। আর একটা কথা যদি বলতে হয় তবে আমি তোমাদের হেড টিচারের কাছে নিয়ে যাবো।”
পরমুহূর্তে ইরাম এবং শ্রবণের জায়গা হয় ক্লাসের বাইরে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ইরাম রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকায় পাশে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইয়ের দিকে। শ্রবণ ঘাড় কাত করে বোনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। মুখ বিকৃত করে বলল,
–“আপা, আপনার এই রাগান্বিত মুখ দেখতে দেখতে আমার জীবন ছেঁড়া জুতো হয়ে গিয়েছে। এখন একটু হাসুন। অঙ্গ খসে পড়ে যাবে না, আই সোয়্যার!”
ইরাম নিরুত্তর দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইল। সাত বছর সাত মাস এর ইরাম এবং সাত বছর তিন মাস এর শ্রবণ বর্তমানে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সেকেন্ড স্টান্ডার্ডে পড়ে। কাগজপত্রে শ্রেয়সী চৌধুরী নামের মেয়েটির ডাক নাম ইরাম। তবে স্কুলে সবাই তাকে শ্রেয়সী নামেই চেনে। কিন্তু সবার সাথে ইরামের সুসম্পর্ক বজায় থাকলেও ভাইয়ের সাথে তার আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক। শ্রবণের কাজ ইরামকে বিরক্ত করা আর ইরামের কাজ শ্রবণের কাজে বিরক্ত হওয়া।

–“আ’ম লিটল বিট হাংরি!”, শ্রবণের বলহীন কণ্ঠে ইরাম চট করে চোখ খুললো। কোনপ্রকার প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সে ক্লাসের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বিনীত অনুরোধ করে ম্যামকে বলে,
তার স্কুল ব্যাগটা থেকে টিফিন বক্স নেয়ার অনুমতি দিতে। ম্যাম অনুমতি দিলে সে টিফিন বক্সটা নিয়ে আসে। পুনরায় আগের জায়গায় বসে মিটিমিটি হাসতে থাকা ভাইয়ের হাতে টিফিন বক্সটা ধরিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
–“ইট।”
শ্রবণের গতরে হাড্ডি মাংস খুব একটা চোখে না পড়লেও ছেলেটা প্রচুর পেটুক। কিন্তু স্বাস্থ্য দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। তার একটু পর পর খিদে পায়। আর এই খিদের সম্পূর্ণ খেয়াল ইরাম রাখে। শ্রবণ টিফিন বক্স হাতে নিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
–“মাত্র চার মাসের বয়সের ব্যবধানে’র কারণে তুমি যদি আমার থেকে আপা ডাক শুনতে পারো; তবে আমি তোমার থেকে বড় আপার মতো আচরণ আশা করতে পারি না? অবশ্যই পারি। খাইয়ে দাও বলছি, নয়তো পাপাকে বলে‌ দবো, পাপার লাডলি কি কি করে বেড়ায় আমার সাথে।”

–“অসহ্য!”
বলেই ইরাম রাগে গজগজ করতে করতে টিফিন বক্সটা হাতে নেয়। চামচ সহ টিফিনে দেয়া চাওমিন ভাইয়ের মুখে তুলে দিতেই সে গপগপ করে খেয়ে ফেলল। একে একে পুরো বাটি শেষ করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললো শ্রবণ। খেয়েদেয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–“তুমি খাবে কি?”
–“সেটা তোমার চিন্তার বিষয় নয়। তোমার পেট ভরেছে না? এখন একটু উল্লুকের মতো আচরণ করা বন্ধ করো।”
–“উল্লুকের বড়ো বোন—বড়ো উল্লুক!”, শ্রবণ মুখ বাঁকিয়ে বলল। ইরাম তেঁতে উঠবে তার আগেই শ্রবণ তার মুখের সামনে একটা কিটক্যাট তুলে ধরলো। সহসা ইরাম শান্ত হয়ে গেলো। থমথমে মুখে ভাইয়ের থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিলো কিটক্যাটটা। শ্রবণ গা দুলিয়ে হাসলো। কিটক্যাট বোনের অতিশয় প্রিয় একটা চকলেট। অদূরে ইন করা সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয়ান গাল ভরে হাসলো ছেলে মেয়েদের দেখে। চোখেমুখে একজন দায়িত্ববান পরিপূর্ণ পিতৃত্বের সৌন্দর্য এবং বয়সের ছাপ স্পষ্ট! তবে কর্মস্বার্থের কারণে ফিটনেসের কোন খামতি নেই। ফ্লাইট থেকে নেমে সোজা এখানে এসেছে। এই দু’জনকে না ছুঁয়ে দেখলে তার অন্তঃস্থলের উত্তপ্ততা, অস্থিরতা কমে না। কপালের ঘাম মুছে কয়েকপা এগিয়ে যেতেই চকলেট খেতে থাকা ইরামের, দৃষ্টি পড়লো তার দিকে। শ্রেয়ান হাসলো। ইরাম বড়ো বড়ো নেত্রে দেখছে অনাকাঙ্ক্ষিত মুখটিকে। যেই মানুষটার জন্য সে সর্বদা ব্যাকুল হয়ে থাকে। আচমকাই ইরাম চকলেট ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পাপ্পা বলে চেঁচিয়ে উঠলো। এক ছুটে গিয়ে লাফিয়ে পড়লো বাবার বুকে। হাঁটু গেড়ে বসা শ্রেয়ান আঁছড়ে পড়া দেহটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। মৃদু হেসে শুধায়,

–“আমার মা কেমন আছে?”
তবে প্রশ্নের জবাব আসলো না। আলিঙ্গনটা নিরবেই কেটে গেলো। কিয়ৎকাল বাদ নাক টানার শব্দ কনে আসতেই শ্রেয়ান মেয়ের চুলের গোছায় চুমু দিয়ে আদুরে গলায় বলে,
–“পাপা তো এসে গিয়েছি মা। কাঁদছো কেনো?”
ইরাম নাক টানতে টানতে বলল,
–“আই মিসড ইউ সো মাচ।”
–“পাপা অলসো মিসড ইউ। এখন আর মিস করতে হবে না। পাপা অনেক দিনের জন্য তোমার সাথে থাকবো, পুরো একমাস!”
ইরাম চট করে কাঁধ থেকে মাথা তুলে তাকায় বাবার দিকে। চেহারায় খুশির ঝিলিক স্পষ্ট। প্রফুল্ল চিত্তে শুধায়,
–“সত্যি?”
শ্রেয়ান মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বলল,
–“তিন সত্যি, মা।”
–“আই লাভ ইউ পাপ্পা!”, ইরাম বাবার গালে শব্দ করে চুমু খেয়ে হাসিমুখে বলল। শ্রেয়ান মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে তার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল,

–“আই লাভ ইউ ঠু।”
ততক্ষণে হেলতে দুলতে আসা শ্রবণ গতিরোধ করে বাবার সামনে। বাবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর পর্যবেক্ষকের মতো করে বলল,
–“পাপা! আমি বলি কি, চলো আমরা আপাকে নিয়ে ইন্ডিয়া যাই। স্টার জলসার অডিশন দেওয়াই। দেখবে একবারেই চান্স পেয়ে যাবে। তারপর আমরা রাতারাতি সেলিব্রিটি হয়ে যাবো তার সাথে সাথে।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই শ্রবণের কান মলে দিলো শ্রেয়ান। বলে,
–“পাজি ছেলে! পাপার সামনেও আপনার দুষ্টুমি কমে না? আপাকে জ্বালাতে খুব মজা?”
শ্রবণ এক গাল হেসে বলল,
–“ওহ্, পাপা! ইট’স হার্টিং।”
শ্রেয়ান ছেড়ে দেয়। হাত বাড়িয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নেয়। মাথায় চুমু দিয়ে বলে,
–“কেমন আছেন চ্যাম্প? পাপা এতোদিন পর এসেছি— অথচ আপনার মাঝে একটুও আগ্রহ নেই পাপার বুকে আসার।”
–“কারণ আমি তো তোমার বুকেই থাকি। আর যারা বুকে থাকে না তারাই তো কবুতরের মতো প্যা প্যা করে উড়তে উড়তে আসে। এই যেমন তোমার ন্যাকা মেয়ে!”
ইরাম দাঁতে দাঁত চেপে তাকায় ভাইয়ের দিকে। বাবার কাছে বিচার দিয়ে বলে,
–“দেখেছো? কি বলছে ও?”

শ্রেয়ান অতিষ্ট হয়ে ডানে বামে মাথা নেড়ে ছেলে মেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে আসে। টিচারের অনুমতি নিয়ে তাদের বাড়িতে নিয়ে যাবে। গাড়িতে বসে শ্রেয়ান মেয়ের হাতে একটা হট ডগ তুলে দেয়। সে জানে মেয়ের টিফিন প্রতিদিন তার ছেলেই খায়। নিজেরটাও খায়, বোনের টাও খায়, আবার কিনেও খায়। কিন্তু শ্রেয়ানের বুঝে আসে না এতো খাবার যায় কোথায়? ছেলের দেহে তো হাড়ে মাংস খুব কম! সে ছেলের দিকে একটা ইলেক্ট্রোলাইট ড্রিঙ্কস এগিয়ে দিলো। কিন্তু শ্রবণ অনাগ্রহ প্রকাশ করে বলল,
–“এসব ইলেক্ট্রোলাইট ড্রিংকে আমার কিছু হবে না। আমার শক্তিশালী ইলেক্ট্রোলাইট তো বাড়িতে।”
শ্রেয়ান হাসে। ছেলের এই শক্তিশালী ইলেক্ট্রোলাইট আর কেউ নয় বরং তার মা। বাড়িতে ঢুকতেই শ্রবণ টাই খুলতে খুলতে ছুটে গেলো রান্নাঘরে। কাঙ্খিত মানুষটিকে পেতেই বিলম্বহীন পেছন থেকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজলো। তবে ছোট হাত দুটিতে বৃহৎ স্ফিত উদর আঁকড়ে ধরতে কষ্ট হলো। নারীটির ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো। চোখে মুখে আভিজাত্য, যত্নের ছাপ সুস্পষ্ট। মাতৃত্বের চমৎকার চোখ ধাঁধানো সেই সৌন্দর্য নিয়ে ইরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ছেলের দিকে। তোয়ালেতে হাত মুছে ছেলেকে পেছন থেকে সামনে টেনে নেয়। দু’হাতে জড়িয়ে ধরতেই শ্রবণের মাথা ঠেকলো মায়ের স্ফিত উদরে। শ্রবণ সেখানে টোকা দিয়ে বলল,
–“নক! নক! তুমি কি শুনতে পাচ্ছো, নাকি ঘুমাচ্ছো? ভাই স্কুল থেকে এসে গিয়েছি, এখন ওঠো। আজ তোমার বড়ো বোন কি করেছে জানো? একটাবার একটু হাসেনি, আমি কতোকিছু করলাম তবুও হাসেনি। আগামী সপ্তাহে তুমি যখন এখান থেকে বেরিয়ে আসবে— তখন ইচ্ছা মতো বকে দিও। ঠিক আছে? ভাই তোমার অপেক্ষায় আছি। তোমার সাথে খেলবো।”

যেই মানুষটার কাছে আগে পুরো পৃথিবী নিস্তব্ধ ছিল। সেই মানুষটা আজ সব শুনতে পায়। চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে ইরা এখন সব শুনতে পায়। বিদেশে নিয়ে গিয়ে তার উন্নত চিকিৎসা করানো হয়। কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট নামক অস্ত্র পাচারের মাধ্যমে ইরার কানে একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র বসানো হয়। যার দ্বারা সে শুনতে পারে। কিন্তু এখনো পুরোপুরি স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে না। তার স্পিচ থেরাপি চলছে। একটু আধটু অনেক কথাই বলে সে ইদানীং।
নয় মাসের গর্ভবতী ইরা শুনলো ছেলের সব কথা। শুনে গা দুলিয়ে হাসলো। দীর্ঘ এক রজনী পার করার পর ইরা এবং শ্রেয়ানের মনে হলো, এখন তাদের একটা অংশ আসলে খুব একটা খারাপ হয় না। তাই এই ছোট্ট আরেক সদস্যের আগমন ঘটছে চৌধুরী বাড়িতে। এর মধ্যে সুস্মিতা ও এক ছেলে সন্তানের মা হয়েছে। সে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে একটা চুমু দিল। বহুকষ্টে উচ্চারণ করে বলল,
–“পা…নি।”
মায়ের আধাআধুরা কথার মানে শ্রবণ বোঝে। সে বলল,

–“পানি খেয়েছি মাম্মা। তোমার মেয়েকে আজ একটুও হাসাতে পারিনি। এমন কেনো? বিরক্তিকর!”
শ্রবণ বিরক্ত হয়ে বলল। শ্রেয়ান লম্বা লম্বা পা ফেলে রান্নাঘরে ঢুকতেই দেহ শ্রান্ত হয়ে গেলো তার। ঢিলেঢালা গোলাপী ফ্রক আর ঢিলেঢালা সেলোয়ারে আবৃত মেদ যুক্ত দেহটি দেখে সে মুগ্ধ হয়। এক হাতে পেট আঁকড়ে ধরে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকা মুখটি দেখে অস্ফুট স্বরে শ্রেয়ান মাশাআল্লাহ বলে উঠলো। মাতৃত্বকালীন সৌন্দর্য এতো মোহনীয় কেনো? ঢিলেঢালা পোশাক ঠিকরে তার আরেকটি ছোট্ট অংশ স্পষ্ট নিজের অস্তিত্ব বোঝাচ্ছে। বোঝাচ্ছে সে এখন অনেক বড়ো হয়ে গিয়েছে। শ্রেয়ান সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“শ্রবণ, ড্রেস চেইঞ্জ করে হাত মুখ ধুয়ে তারপর মাম্মার কাছে আসো।”
–“ওকে।” , বলেই শ্রবণ চলে যায়। শ্রেয়ান এগিয়ে যায় স্ত্রীর কাছে। রান্নাঘর তখন শূন্য। মৃদু হেসে দাঁড়ায় স্ত্রীর সন্নিকটে। ইরা প্রগাঢ় হাসলো! শ্রেয়ান মৃদু হেসে আলগোছে মেয়েটির কপালের ঘাম মুছে দিয়ে, ঢিলেঢালা হাত খোঁপাটা ভালো করে বেঁধে দিলো। অতঃপর পরম যত্ন আর আহ্লাদে দু’হাতের আজলায় মেদ যুক্ত মুখটি নিয়ে কপালে দীর্ঘ সময় নিয়ে চুমু দিয়ে বলে,

–“কারোর নজর না লাগুক আমার বিবিজানের উপর।”
মানুষটার এই ডাকটির উপর ইরা মন হারায়। একদা যার কথা শোনার জন্য সে তরপাতো এখন তার কথা শুনে সে লজ্জা পায়। শ্রেয়ান স্ফিত উদর আঁকড়ে ধরে ডেকে ওঠে অনাগত সন্তানকে,
–“এই যে পাপার পিচ্চি জান! আপনি আর কতো সময় নিবেন? অনেক বড়ো হয়েছেন, এখন বেরিয়ে আসুন। বাকিটা পাপা যত্ন করে বড়ো করে নেবো। আমার যে আর তর সয় না আপনাকে দেখতে।”
ইরা হেসে উঠলো। শ্রেয়ানের চুলে হাত গলিয়ে দিতে লাগলো। লোকটাকে দীর্ঘ পঁচিশ দিন পর দেখেছে সে। আগামী সপ্তাহে তার ডেলিভারির ডেট। এর জন্য একমাসের ছুটি নিয়ে এবার এসেছে শ্রেয়ান।
–“সব ভালোবাসা বেবিকে দিয়ে দিচ্ছো?”
মেয়ের কণ্ঠে শ্রেয়ান হেসে ফেললো। হাঁটু গেড়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে দেয় মেয়ের দিকে। ইরাম গম্ভীর থমথমে মুখে বাবার হাতটি ধরতেই মেয়েকে এক পাক ঘুরিয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয় শ্রেয়ান। বলে,

–“পাপাদের ভালোবাসা’র কখনো ভাগ হয় না, মা। সবার জন্য সমান ভালোবাসা থাকে। এসো বেবি তার আপাকে মিস করছে। পাপাকে মাত্র বললো। আদর করে দাও।”
–“মিথ্যে কথা! বেবি তার ভাইয়াকে বেশি মিস করছে। পাপা বলো বলো! বেবি আমায় বেশি মিস করছে?”, টিশার্ট জড়াতে জড়াতে ছুটতে ছুটতে আসা শ্রবণ চেঁচিয়ে বলল। ইরাম রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকায় ভাইয়ের দিকে। গম্ভীর গলায় বলে,
–“নো, বেবি আমায় বেশি মিস করেছে।”
–“তোমার মতো গম্ভীর মেয়েকে বেবি কেনো মিস করবে? বেবি আমায় মিস করবে।”
–“পাপ্পা?”, ইরাম চেঁচিয়ে উঠলো। শ্রেয়ান আর ইরা হেসে উঠলো তাদের মিষ্টি কলহ দেখে। দু’জনে হাত বাড়িয়ে ছেলে মেয়েকে নিজেদের সাথে জড়িয়ে ধরে। শ্রেয়ান, ইরাম আর শ্রবণকে অবাক করে দিয়ে ইরা অস্পষ্ট কণ্ঠে বলে উঠলো,
–“বে..বি ছবাইকে মি..স করচে।”

শ্রেয়ান চমকে উঠলো ইরার কণ্ঠে দীর্ঘ এক লাইন শুনে। ইরাম আর‌ শ্রবণের চোখেমুখেও বিস্ময়। ইরা কখনোই এতো দীর্ঘ লাইন উচ্চারণ করেনি আগে। ইরা অপ্রস্তুত লাজুক হাসলো সকলের হতভম্ব দৃষ্টি দেখে। দরজায় দাঁড়ানো সুমনা আর শাহেদ প্রশান্তি ভরা হাসি হাসলো পরিপূর্ণ সুখি পরিবারটি দেখে। বলল,
–“সব ভালোবাসা রান্নাঘরে বসেই হবে নাকি বের হবেন। ইরা বের হও এই অবস্থায় আর রান্নাঘরে থাকার দরকার নেই। মেয়েটা বড্ডো জেদি। কোন কথা শোনেনা।”
শ্রেয়ান স্ত্রীর হাত ধরতে গিয়েও ধরলো না, কেননা ছেলে মেয়ে মায়ের হাত দু’টো আঁকড়ে ধরে ইতিমধ্যেই হাঁটা দিয়েছে। তার অবর্তমানে এই দু’জন ই মায়ের খেয়াল রাখে। সাত বছরের এই বাচ্চা দুটি রাতে না ঘুমিয়ে মায়ের ফুলে টসটসে হয়ে থাকা পা টিপে দেয়। তাই সবক্ষেত্রে তাদেরকেই আগে রাখে। তবে ঘন্টা দুই পার হতেই চৌধুরী বাড়িতে হুলুস্থুল কাণ্ড বেঁধে গেলো, যখন দেখলো সময়ের আগেই ইরার ডায়ালেশন শুরু হয়। তবে ইরার মাঝে কোন ভয় দেখাগেলো না। সে একদম শান্ত। উদ্বিগ্ন শ্রেয়ান স্ত্রীর এমন শান্তভাবে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। তারা হাসপাতালে পৌঁছায়। তবে কিছুটা সময় গড়াতেই ইরার লেবার পেইন বাড়তে লাগলো। মায়ের অস্ফুট চিৎকারে ইরাম আর শ্রবণ কেমন মিইয়ে গেলো। তার চঞ্চলতা গায়েব হয়ে গিয়েছে। ইরাম দেখে তার দুষ্টু চঞ্চল ভাইয়ের মিইয়ে যাওয়া। চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে আদর করে মিষ্টি হেসে বলল,

–“চিন্তার কিছু নেই। আল্লাহ মাম্মাকে শিঘ্রই সুস্থ করে দেবে।”
শ্রবণ বিবর্ণ মুখ নিয়ে বোনের হাসি দেখলো। যেই হাসির জন্য সে সারাদিন কতোকিছুই না করে। এবং দীর্ঘ ছয় ঘন্টা পর বাবা মায়ের কোল আলো করে একটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে। তোয়ালে হাতে বসা শ্রেয়ানকে ডাক দিলে শ্রেয়ান ছুটে যায়। একজন নার্স বাচ্চাটিকে তার কোলে এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“মেয়ে হয়েছে, অভিনন্দন!”
শ্রেয়ান উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“আমার স্ত্রী?”
–“সেও সুস্থ আছে। একটু দূর্বল আছে। ছয়টার দিকে তাকে নরমাল কেবিনে দেয়া হবে।”
–“আচ্ছা, ধন্যবাদ।”
বলেই শ্রেয়ান হাস্যোজ্জ্বল দৃষ্টিতে তাকায় লালচে আবরণে আবৃত ছোট্ট ছোট্ট হাত পায়ের ঠিকযেনো হাতেগড়া এক পাপেট। সে ছলছল নয়নে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো। শাহেদ চৌধুরী, সুমনা আর সুস্মিতা ঝাঁপিয়ে পড়লো বাচ্চাটির উপর। শাহেদ চৌধুরী ছেলেকে বলল,
–“দাদুভাইয়ের কানে আজান দাও।”

শ্রেয়ান মৃদু হেসে মেয়ের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে, মেয়ের কানে আজান দিলো। অতঃপর ছেলে মেয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করে। যারা চুপটি করে অদূরে দাঁড়িয়ে আছে। সে এগিয়ে যায়। তোয়ালেতে মোড়ানো মেয়েকে গিয়ে হাঁটু গেড়ে তাদের সামনে বসে এবং মেয়েকে এগিয়ে দেয় তাদের দিকে। ইরাম আর শ্রবণ পিটপিট করে সরু নয়নে অবলোকন করে বোনকে। শ্রেয়ান ছলছল নয়নে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“বোনুকে নাও। ও হলো একমাত্র তোমাদের দায়িত্ব! ওর ভালো মন্দ সব তোমরা দেখবে। পাপাকে কথা দাও দেখবে? কখনো কোন ক্ষতি হতে দেবে না। সবসময় আগলে রাখবে।”
শ্রবণ আর ইরাম স্মিত হেসে বলল,
–“সবসময় আগলে রাখবো। কখনো কোন ক্ষতি হতে দেবো না।”
–“এই তো আমার সাহসী বাচ্চারা! নাও, এখন বনুকে আদর করে ওয়েলকাম জানাও।”
তারা সানন্দে বোনকে কোলে তুলে আদর করলো। দীর্ঘ চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে লাগাতার হাসপাতালে আসা ইরফান আর নিহারের গতিরোধ হলো সেই দৃশ্য দেখে। ইরফানের ভেতর থেকে এক চাপা যন্ত্রনাদ্বায়ক নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। বুকের ভেতর কেমন সূক্ষ্ম ব্যথা হয়। সৃষ্টিকর্তা আজো তার ঘরে কোন নেয়ামত পাঠায়নি। অথচ জৈবিক সুখের কারণে একদিন যাদের নিজের থেকে দূরে করে দিয়েছিল তারা আজ কতোটা সুখি। বোনকে দেখতে দেখতেই ইরামের চোখ পড়ে ইরফানের দিকে। শ্রেয়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো তারা। শ্রেয়ান সদ্য জন্মানো মেয়ে আর ইরামকে নিয়ে এগিয়ে গেলো। ইরামকে বলল,

–“পাপাকে সালাম দাও মা।”
ইরামের ছোট্ট এই পৃথিবীতে অদ্ভুত এক বিষয় হলো তার দু’জন বাবা। এর এক্সপ্লেনেশন কখনো বাবা মা দেয় নি। আর না সে চেয়েছে। হয়তো সময় হলে একদিন নিজেই বুঝে যাবে। ইরফানের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হয় ইরামের। বাবার ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ইরাম। কোনদিক থেকে খামতি নেই। বাবার কথায় ইরাম পুতুলের মতো করে বলল,
–“আসসালামুয়ালাইকুম পাপা!”
ইরফান হাঁটু গেড়ে বসলো। মৃদু হেসে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নেয়। জিজ্ঞাসা করে,
–“আমার মা কেমন আছে?”
ইরাম কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–“ভালো আছি। বোনু এসেছে এখন আরো বেশি ভালো আছি।”
ইরফান ম্লান হাসলো। শ্রেয়ান মেয়েকে ইরফানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–“আমার মেয়ে, শ্রেয়া চৌধুরী।”
ইরফান মৃদু হেসে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নেয়। দোয়া করে দিয়ে বলে,
–“আপনার উপর আল্লাহ তায়ালার রহমত আরো বৃদ্ধি পাক। আমার রহমত থেকেও নেই, আর আপনার ঘরে ভরপুর রহমত।”

নিহার চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ইরফানের কথার কোন প্রভাব তার মধ্যে পড়ছে না। নিহারকে নির্বিকার দেখে ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেললো এটা তার কর্মের ফল! তারা চলে যায় সেখান থেকে। শ্রেয়ান মেয়েকে নিজের সাথে আগলে এগিয়ে চলে। এই জীবনটাতে ছোট্ট ছোট্ট এই সঙ্গগুলোই তার অর্জন।
দীর্ঘসময় বাদ যখন ইরা চোখ খুললো তখন শ্রেয়ানের হাস্যোজ্জ্বল মুখ ভেসে উঠলো। শ্রেয়ান মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে লম্বা সময় নিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। ললাটে ললাট ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
–“ধন্যবাদ বিবিজান। সবকিছুর জন্য। সৃষ্টিকর্তার কাছে ধন্যবাদ আপনাকে আমার করে দেয়ার জন্য। আপনি এমন একজন মানুষ যাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, আপনার কাছে আমার পুরো জীবনের সব ভালোবাসা, ভালোলাগা, যত্ন, ইচ্ছা-অনিচ্ছা জিম্মি করে রাখা যাবে। আর আপনি সম্মান আর যত্নের সাথে আমার ভালোবাসা গুলো আগলে রাখবেন। দেখুন আমার বিশ্বাস জিতে গিয়েছে। আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষটা আমি।”

ইরা দূর্বল দেহে শুনলো সেই অনুভূতির পঙ্ক্তিমালা গুলো। ততক্ষণে দরজা খুলে শ্রবণ বোনকে কোলে নিয়ে এক প্রকার ছুটতে ছুটতে আসলো। তার পিছু পিছু শাহেদ চৌধুরী, সুমনা , সুস্মিতা, মোজাম্মেল আর ইরাম ও আসলো। শ্রবণ শ্রেয়াকে দেখিয়ে তীব্র আক্রোশ নিয়ে বলল,
–“পাপা! মাম্মা! দেখো দেখো আমার দিকে কিভাবে তাকাচ্ছে? জন্মানোর সাথে সাথে আমার দিকে কড়া চোখে তাকাচ্ছে। ঠিক তোমার বড়ো মেয়ের মতো। এ তো আরেকটা গম্ভীর পুতুল। এতো এতো রাগ সামলাতে গিয়ে তো আমি চিকন হয়ে যাবো। এই মেয়ে এতো গুলো মাস তোমার সাথে মিষ্টি মিষ্টি গল্প করেছি এই কারণে? জন্মানোর সাথে সাথে বোনের মতো আমার দিকে কড়া চোখে তাকাচ্ছো? কেনো, হাসতে পারলে না? হাসলে কি তোমাদের দু বনের অঙ্গ খসে পড়বে? ইয়া আল্লাহ! দু দু’টো গম্ভীর বোন দিয়ে আমি কি করবো? কে খেলবে আমার সাথে? আল্লাহ্ বাঁচাও আমায়!”

যে শ্রাবণে প্রেম আসে পর্ব ১০

শ্রবণ আহাজারি করতে লাগলো। উপস্থিত সকলে হো হো করে হেসে উঠলো। শ্রেয়ান আর ইরা মুগ্ধ চোখে নিজেদের অংশদের দেখে। সমাপ্তি বলতে কি বুঝি আমরা? ভালোবাসা, সংসার, মাতৃত্ব পিতৃত্বের কোন সমাপ্তি হয় নাকি? হয় নাতো! এগুলো তো এভাবেই সব দুঃখ, ঝড় ঝাপটা, পরীক্ষা উত্তীর্ণ করে সুখের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। আজ ইরা আর শ্রেয়ান ও জীবনের সকল ঝড়ঝাপটা, ক্লেশ , পরীক্ষা উত্তীর্ণ করে সুখের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। যেখানে নেই কোন অপ্রাপ্তি! শুধু সুখ আর সুখ!

যে শ্রাবণে প্রেম আসে সারপ্রাইজ পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here