রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১১
ইয়ুশরা রিমু
আর্জেন্টিনার জয়ের উচ্ছ্বাসে তখন পুরো ছাদ যেন এক অদ্ভুত আলোড়নে কাঁপছে। নীল-সাদা পতাকা দুলছে, বিহানের চিৎকারে ছাদের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত মুখর হয়ে উঠছে, সে একবার আনন্দে লাফিয়ে উঠছে, মোবাইলে ভিডিও করছে, আবার গোলের মুহূর্তটা নিয়ে নতুন করে উ’ত্তেজিত আলোচনায় মেতে উঠেছে। চারদিকে এত এত শব্দ, এত হাসি যেন রাতটা আর স্রেফ একটা রাত নেই, ছোট্ট এক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু সেই উৎসবের মাঝখানেই বেলা যেন অদৃশ্য হয়ে যেতে চাইছিলো। সে দাঁড়িয়ে ছিল ভিড়ের সামান্য বাইরে, ঠোঁটের কোণে খুবই ক্ষীণ একটু’করো হাসি টেনে। আর্জেন্টিনা জিতেছে যে মেয়েটা এই জয়ের অপেক্ষায় গতকাল থেকে ছিলো, গোল হলেই যে সবার আগে চেঁচিয়ে উঠার কথা, সেই মেয়েটার মুখে আজ আনন্দের সেই স্বতঃস্ফূর্ত আলো নেই। তার ভেতরের ঝড় যেন বাইরের সব উল্লাসকে মুছে দিয়ে একরাশ ক্লান্ত, নীরব, ভারী শূন্যতা এনে বসিয়েছে।
আর ঠিক সেই কারণেই, আরও কিছুক্ষণ এই ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিলো না।ইরা তখনও বিহানের সঙ্গে খুনসুটিতে ব্যস্ত। বিহান পতাকা নেড়ে চিৎকার করে বলছে,
— আজকে কিন্তু কেউ ঘুমাবে না! আর্জেন্টিনা জিতেছে, মানে আজকে ছাদে উদযাপন চলবে রাতভর!
এই কোলাহলের ভেতর বেলা খুব ধীরে, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সবার দৃষ্টি এড়িয়ে একটু একটু করে সরে এলো।
তার বুকের ভেতরটা কেমন শক্ত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, আর এক মুহূর্ত যদি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে হয়তো এই জোর করে ধরে রাখা হাসিটুকুও নিঃশেষ হয়ে যাবে। সে ধীরে ধীরে চারপাশে তাকালো কেউ তাকে খেয়াল করছে কি না দেখার জন্য। তারপর ওড়নার একপ্রান্ত বুকের কাছে চেপে ধরে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকেই হাঁটা দিলো।
তার পায়ের শব্দ খুব মৃদু। মুখে স্বাভাবিক ভাব রাখার চেষ্টা আছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে যেন পালিয়ে যাচ্ছে।সিঁড়ির মুখে পৌঁছে একবারও পেছনে তাকালো না বেলা। কারণ সে জানে, যদি একবারও পেছনে তাকায়, যদি কারও চোখে চোখ পড়ে যায়, যদি কেউ প্রশ্ন করে,
—কোথায় যাচ্ছিস? তাহলে হয়তো আর নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না। তাই মাথা নিচু করে সে দ্রুত প্রথম ধাপটায় পা রাখলো।
দোতলার ল্যান্ডিংয়ে পা রাখতেই বেলা থেমে গেলো।এখানে আলো অনেক নরম। করিডরের হলুদাভ লাইটে চারপাশে একটা শান্ত, স্থির আবহ তৈরি হয়েছে। উপরের উল্লাসের শব্দ এখানে ভেসে আসছে ঠিকই, কিন্তু অনেক দূরের মতো। যেন অন্য কোনো জগতের আওয়াজ। এই নিস্তব্ধতা যেন বেলার বুকের ভেতরে জমে থাকা চাপা আর্তনাদটাকে আরও স্পষ্ট করে তুললো।
সে খুব ধীরে একপাশের দেয়ালে হাত রাখলো। বুকভর্তি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু সেই শ্বাসটাও কেমন ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে এলো। চোখের কোণে জমে থাকা জ্বা’লাটা আবারও ফিরে এসেছে। এতক্ষণ জোর করে চেপে রাখা কান্নাটা যেন সুযোগ পেয়েই আবার গলা পর্যন্ত উঠে আসতে চাইছে।না। কাঁদা যাবে না।নিজেকে শক্ত করে বোঝালো বেলা। এই বাড়িতে, এই রাতে, এই আনন্দের মধ্যে সে আর একবার ভেঙে পড়তে চায় না। কারও সামনে নয়। বিশেষ করে সায়রের সামনে তো নয়ই।সে ধীরে ধীরে করিডর পেরিয়ে পাশের ছোট বারান্দাটার দিকে এগিয়ে গেলো। এই বারান্দাটা বাড়ির দোতলায়, ছাদের সিঁড়ির বাঁদিক ঘেঁষে। খুব বড় কিছু নয়। সামান্য জায়গা, সামনে অন্ধকার রাত, দূরে রাস্তার অস্পষ্ট আলো, আর উপরের দিক থেকে ভেসে আসা আনন্দের শব্দ। কিন্তু এই মুহূর্তে বেলার কাছে জায়গাটা পরম আশ্রয়ের মতো মনে হলো।
রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই রাতের ঠান্ডা বাতাস এসে তার মুখে লাগলো। বেলা চোখ বন্ধ করলো। বাতাসটা যেন গরম, জ্বা’লা করা চোখের পাতায় সামান্য শান্তি ছুঁইয়ে দিলো। সে দুহাতে রেলিং শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। মনে হচ্ছিলো, ভেতরের সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে না, অথচ বুকের ভেতর ভার জমে আছে এমনভাবে, যেন কেউ পাথর বসিয়ে দিয়েছে।
সায়র ভাই।মনে মনে নামটা উচ্চারণ করতেই বেলার চোখের কোণটা আবারো পুনরায় জ্ব’লে উঠলো। না, এভাবে ভাবা যাবে না। সে তো ঠিক করেই ফেলেছে। আজ থেকে আর নয়। কোনো বাড়তি কথা নয়, কোনো অকারণ খুনসুটি নয়, কোনো অদ্ভুত আশাও নয়। নিজের অনুভূতিগুলোকে নিজের কাছেই আটকে রাখতে হবে। এটাই ভালো। এটাই নিরাপদ।
কিন্তু মন কি এত সহজে মানে?যতই নিজেকে বোঝাতে চায়, ততই সন্ধ্যার সেই মুহূর্তগুলো চোখের সামনে ফিরে আসে। রুপসার পাশে দাঁড়ানো সায়র, রুপসার সঙ্গে তার স্বাভাবিক কথা বলা, পরিবারের সবাইর স্বাভাবিক গ্রহণযোগ্যতা।সবকিছু মিলিয়ে বেলার বুকের ভেতরে তখন যে ব্যথাটা জন্মেছিলো, সেটা এখনও একইরকম ধা’রালো। আর তার থেকেও বড় য’ন্ত্রণা। এই কষ্টটা সে কাউকে বলতে পারবে না। কারও কাছে না। এমনকি ইরার কাছেও না।
—কারণ কী বলবে সে?বলবে যে সে নিজের অজান্তেই এমন একজন মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছে, যাকে ভালোবাসার কোনো অধিকার তার নেই?না। কোনো কথাই বলা যাবে না।
বেলার চোখের কোণ থেকে এবার সত্যিই একটা উষ্ণ অশ্রু বিন্দু গড়িয়ে পড়লো। সে দ্রুত হাত তুলে মুছে ফেললো। তারপর আরেকবার নিজেকে শক্ত করার জন্য গভীর শ্বাস নিলো। ঠিক তখনই খুব মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট সিঁড়ির ওপর থেকে আরেক জোড়া পায়ের শব্দ ভেসে এলো।ধীর, স্থির।বেলার পুরো শরীর যেন এক মুহূর্তে জমে গেলো।বেলার আঙুলগুলো রেলিংয়ের ওপর আরও শক্ত হয়ে বসলো। বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। সে পেছনে তাকালো না, কিন্তু কেন সে বুঝে গেলো কে এসেছে।
সেই পদশব্দ ধীরে ধীরে কাছে নামতে লাগলো। সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে থামলো। তারপর করিডর পেরিয়ে আরেকটু এগিয়ে এলো। বেলা এখনও মুখ ফেরালো না। মনে হচ্ছিলো, যদি এখনই ঘুরে তাকায়, তাহলে এতক্ষণে কষ্ট করে জোড়া লাগানো নিজেকে আর সামলাতে পারবে না।
কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা।তারপর পেছন থেকে খুব পরিচিত, নিচু, স্থির একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
— একা একা নিচে এসেছিস কেন?
শব্দগুলো খুব সাধারণ। অথচ বেলার বুকের ভেতর যেন কেউ একমুঠো আ’গুন ছুড়ে দিলো। সে চোখ বন্ধ করে এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে পেছন ফিরলো।সায়র দাঁড়িয়ে আছে।দোতলার নরম আলোয় তার সাদা পাঞ্জাবিটা আরও ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। মুখে সেই পরিচিত গম্ভীরতা আছে ঠিকই, কিন্তু চোখদুটো আজ অস্বাভাবিক রকমের তীক্ষ্ণ। সেখানে নিছক কৌতূহল নেই। আছে স্পষ্ট উদ্বেগ, আছে প্রশ্ন, আছে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা। যেন সারারাত ধরে সে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে, আর এখন আর নিজেকে থামাতে পারেনি। তাই চলে এসেছে। বেলা চোখ নামিয়ে বলে,
—এমনি এলাম।
সায়র কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বারান্দার রেলিংয়ের কাছ থেকে খানিকটা দূরে থামলো। খুব বেশি কাছে নয়, আবার এত দূরেও নয় যে কথার ভেতরের টানটা কমে যায়।তার গলায় খুব হালকা প্রশ্নের সুর,
—এমনি?
বেলা গলাটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলে,
—হ্যাঁ। একটু মাথা ধরেছিলো।
সায়র এবারও সঙ্গে সঙ্গে কিছু বললো না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। সেই দৃষ্টিটা বেলার অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিলো। কারণ সে বুঝতে পারছে, সায়র তার কথাটা বিশ্বাস করেনি।সায়র অবশেষে বললো,
—মাথা ধরেছে, নাকি অন্য কিছু?
বেলা একটু কেঁপে উঠলো। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
— আরে না, সত্যিই একটু ভিড় লাগছিলো। তাই নিচে এলাম।
— হইচই তো শুরু থেকেই ছিলো।আর তোর তো এইসব হইচই উল্লাস-ই পছন্দ।
এই একটুকু বাক্যেই বেলা বুঝে গেলো। সায়র আজ খুব সহজে ছেড়ে দেবে না। তার ভেতরের জেদি, অনুসন্ধানী মানুষটা আজ জেগে আছে।বেলা চোখ তুললো না। ধীরে বললো,
— আতশবাজির এত শব্দে। একটু অস্বস্তি লাগছিলো।
সায়র আনমনে বলে উঠে,
—আর সেই অস্বস্তিটা হঠাৎ করে রুপসা আসার পরেই হলো?
বেলা এবার চুপ হয়ে গেলো।প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে করা, কিন্তু এর ভেতরে যে সরাসরি সন্দেহ লুকিয়ে আছে, সেটা বুঝতে তার অসুবিধা হলো না। সে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে অন্যদিকে তাকালো। সামনের অন্ধকারে চোখ রেখে বললো,
—আপনি উপরে যান। সবাই খুঁজবে। আর রুপসা আপু আসাতে আমার কিছু যায় আসে না। ওনি আপনাদের আত্মীয়। ওনার এবাড়িতে আসার যথেষ্ট অধিকার আছে।
সায়র নড়লো না।বরং আরও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
— সবাই খুঁজলে খুঁজুক। আমি আগে জানতে চাই, কী হয়েছে । তাহলে বল আমাকে কি কারনে তুই আপসেট?
বেলার বুকের ভেতরটা ধপ করে উঠলো।এই মানুষটা কেন এমন করছে? কেন বারবার একই প্রশ্ন করছে? কেন তার ভেতরের সবকিছু এত কষ্টে লুকিয়ে রাখার পরও সেগুলো তুলে আনতে চাইছে?সে খুব আস্তে বললো,
— কিছু হয়নি।
— মিথ্যে।
শব্দটা খুব নিচু গলায় বলা, কিন্তু তীক্ষ্ণ। বেলা মাথা তুলে তাকিয়ে ফেললো। সায়রের চোখ তখন সরাসরি তার চোখে। সেখানে কোনো রাগ নেই, কিন্তু এমন এক অস্বীকারহীন দৃঢ়তা আছে ।যে বেলার গলা শুকিয়ে এলো।নিজের কণ্ঠস্বরটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল সে,
—আমি মিথ্যে বলছি না। সব একদম সত্যি।
সায়র এক মুহূর্তও দৃষ্টি সরালো না।সায়র আবার বললো,
—বিকেলে তুই অন্যরকম ছিলি। হাসছিলি, কথা বলছিলি, সবার সঙ্গে তর্ক করছিলে, বিহানের সঙ্গে ঝগড়া করছিলি। তারপর হঠাৎ করে তুই একদম চুপ হয়ে গেলি। আমি ডাকলাম, ঠিকমতো উত্তর দিলি না। খেতে বসে প্লেটের দিকে তাকিয়ে বসে রইলি। আর্জেন্টিনা জিতলো, তবু তোর মুখে সেই আগের মতো আনন্দ নেই। আর এখন সবার মাঝখান থেকে লুকিয়ে নিচে নেমে এলি। এতকিছুর পরও যদি বলিস কিছু হয়নি। তাহলে সেটা আমি বিশ্বাস করবো কীভাবে?
প্রতিটা শব্দ যেন বেলার বুকের ভেতর গিয়ে বিঁ’ধতে লাগলো।সে বুঝতেই পারেনি সায়র তাকে এতটা খেয়াল করেছে। তার চুপ করে থাকা, ঠিকমতো না খাওয়া, চোখ না তুলে কথা বলা সব? এই ভাবনাটাই তাকে আরও দুর্বল করে দিলো। কারণ যতই সে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে, সায়রের এই খেয়াল রাখা ততই তার ভেতরের প্রতিরোধকে ভেঙে দিতে চাইছে।বেলা খুব কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
—আপনি এত কিছু ভেবে ফেলছেন। আসলে তেমন কিছু না।
সায়রের চোয়াল শক্ত করে বলে,
—তাহলে কেমন কিছু?
—কিছুই না।
—বেলা।
তার নামটা এত ভারী স্বরে উচ্চারিত হলো যে বেলার বুক কেঁপে উঠলো। মনে হলো, এই একটি ডাকেই কতো অপ্রকাশিত কথা মিশে আছে বিরক্তি, উদ্বেগ, দাবি, প্রশ্ন সবকিছু।সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে,
— দয়া করে আপনি উপরে যান।
— তুই কি কাঁদছিলি?
প্রশ্নটা এত হঠাৎ এলো যে বেলার নিঃশ্বাস যেন মাঝপথে আটকে গেলো। তার আঙুলগুলো রেলিংয়ের ওপর আরও শক্ত হয়ে গেলো। চোখে হাত দিতে গিয়েও থেমে গেলো সে। না, এই মুহূর্তে চোখ ছোঁয়া মানেই ধরা পড়ে যাওয়া।
— না।
—আবার মিথ্যে বলছিস।
—আমি কাঁদিনি।
—তাহলে তোর চোখ লাল কেন?
বেলা এবার আর উত্তর দিতে পারলো না।কী বলবে? বলবে যে এই লালচে চোখের কারণ আপনি নিজেই? বলবে যে তারই অজান্তে, তারই কয়েকটা স্বাভাবিক আচরণে, তারই কিছু সম্পর্কের দৃশ্যে বেলার বুক ভেঙে গেছে? বলবে যে সে চেষ্টা করেছে স্বাভাবিক থাকতে, কিন্তু পারছে না? না। কিছুই বলা যাবে না।সে খুব ধীরে বললো,
— মাথা ব্যথায় চোখে জ্বা’লা করছে।
সায়রের ঠোঁট শক্ত হয়ে গেলো। স্পষ্ট বোঝা গেলো, এই উত্তরেও সে সন্তুষ্ট নয়। সে আরও এক পা এগিয়ে এলো। এখন তাদের মাঝখানের দূরত্ব আরও কম। তবু সে কোনো সীমা অতিক্রম করলো না। শুধু তার উপস্থিতিটাই যেন বেলার চারপাশে চাপা একটা আবরণ তৈরি করে ফেললো। নরম স্বরে বলে,
— আমার দিকে তাকা।
বেলার বুক ধক করে উঠলো।সে তাকালো না। বরং আরও নিচের দিকে চোখ নামিয়ে বললো,
— দরকার নেই।
—আছে।
— নেই।
–আছে, বেলা। মা’র খাস না আমার হাতে।
এইবার তার গলায় এমন এক অনড় দৃঢ়তা ছিলো, যা বেলার সব প্রতিরোধকে ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দিলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে ধীরে ধীরে মাথা তুললো। চোখে চোখ পড়তেই যেন চারপাশের সব শব্দ একে একে মিলিয়ে গেল উপরের উল্লাস, বাড়ির আলো, রাতের স্নিগ্ধ বাতাস, সবকিছু। সেই মুহূর্তে শুধু নীরবতায় বাঁধা পড়ে রইলো। দুটো দৃষ্টি, মুখোমুখি, স্থির, অস্বস্তিকরভাবে গভীর।
সায়রের চোখে প্রশ্নের চেয়ে উদ্বেগ বেশি। আর সেই উদ্বেগটাই বেলার জন্য সবচেয়ে বি’পজ্জনক। কারণ কেউ যদি শুধু রাগ করতো, বা জেরা করতো, তাহলে হয়তো সে সহজে নিজেকে শক্ত রাখতে পারতো। কিন্তু এই উদ্বেগ এই অকারণ, অনুচ্চারিত, অনাহূত খেয়াল এটাকেই তো সে ভুল করে নিজের জন্য ভেবে ফেলেছে এতোদিন। এটাকেই তো সে মনের ভেতর যত্ন করে বড় করেছে।তাই চোখ মেলামাত্রই বেলা আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। তার কণ্ঠস্বর এবার আরও নিচু, আরও ক্লান্ত ভাবে বলে,
—সবকিছু আপনার জানার দরকার নেই, সায়র ভাই।
সায়রের ভ্রু কুঁচকে বলে,
— আমার দরকার আছে।
বেলা একরকম অসহায় বিস্ময়ে তাকিয়ে ফেললো,
— কেন?
প্রশ্নটা বেরিয়ে যাওয়ার পরই সে বুঝলো, বলা ঠিক হয়নি। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।সায়র থেমে গেলো। যেন সেও নিজের ভেতরে উত্তরটা খুঁজে পাচ্ছে না। কেন? খুব ছোট একটা প্রশ্ন, অথচ তার ভেতরেই যেন অজস্র অস্বস্তি লুকিয়ে আছে। সে কি সত্যিই জানে, কেন তার এত দরকার হচ্ছে? কেন বেলার এই নীরবতা তার নিজের ভেতরেও এমন চাপা অস্থিরতা তৈরি করছে?কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে শুধু বললো,
—কারণ তোকে এভাবে দেখতে আমার ভালো লাগছে না।
বেলার বুকের ভেতরটা হঠাৎই মোচড় দিয়ে উঠলো।এত সহজ একটা কথা। এত সাধারণ। অথচ এই মুহূর্তে এই কথাটাই তার জন্য সবচেয়ে অসহনীয় হয়ে উঠলো। কারণ সে জানে । এই কথার ভেতরে হয়তো কোনো প্রেম নেই, কোনো আলাদা দাবি নেই, কোনো নাম না-দেওয়া সম্পর্ক নেই। আছে শুধু একটা আন্তরিক খোঁজ, হয়তো বড় ভাইসুলভ দায়িত্ব, হয়তো স্বাভাবিক স্নেহ। কিন্তু বেলার দুর্বল মন তো তাও শুনে ফেলবে অন্য অর্থে। আবারও ভুল করবে। আবারও আশা করবে।না। সেটা হতে দেওয়া যাবে না।সে দ্রুত নিজের মুখ শক্ত করে বললো ,
–আমি ঠিক আছি।
— তুই ঠিক নেই
বেলা এবার খুব ধীরে, গলা কাঁপলেও নিজেকে শক্ত রেখে বললো,
— প্লিজ, আমাকে আর এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আমি সত্যিই এখন কিছু বলতে পারবো না।
সায়র স্থির হয়ে রইলো।বেলার চোখে আবারও পানি চিকচিক করছে। সে মরিয়া হয়ে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো, যাতে সেটা দেখা না যায়। কিন্তু সায়র দেখেছে। খুব স্পষ্টভাবেই দেখেছে। আর সেই দৃশ্যটা তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অসহায় রাগ তৈরি করলো। কার ওপর, সে নিজেও জানে না। বেলার ওপর? নিজের ওপর? নাকি সেই অদৃশ্য কারণটার ওপর, যেটা বেলাকে কাঁদিয়েছে?সে খুব নিচু গলায় বললো,
–কেউ কিছু বলেছে তোকে?
বেলা মাথা নাড়িয়ে বলে,
—না।
— তাহলে?
বেলা এবার চোখ বন্ধ করলো। না, আর না। এই প্রশ্নোত্তর যদি আরও এক মিনিট চলে, তাহলে সে ভেঙে পড়বে। আর সে সায়রের সামনে কাঁদতে চায় না। কোনোভাবেই না।তাই নিজেকে জোর করে সামলে নিয়ে সে একধাপ সরে দাঁড়ালো,
—আমি উপরে যাচ্ছি।
সায়র খুব স্বাভাবিকভাবে পথ ছেড়ে দিতে পারতো। কিন্তু সে নড়লো না। শুধু দাঁড়িয়ে রইলো। এমনভাবে নয় যে বেলাকে আটকে দিচ্ছে, কিন্তু এমনভাবেই যে তাকে পাশ কা’টিয়ে যেতে হলে এক মুহূর্তের জন্য খুব কাছ দিয়ে যেতে হবে।সে মাথা নিচু করে খুব ধীরে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো। ঠিক সেই সময় সায়র ওর কো’মড় ধরে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে দাড় করায়, আচমকা এমন টানে বেলা ভ’য় পেয়ে যায়। সে পিটপিট করে সায়রের মুখের দিকে তাকায়। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত গতিতে চলছে। সায়র তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
— তুই যদি কাউকে কিছু বলতে না চাস, ঠিক আছে। জোর করবো না। কিন্তু মন খারাপ করে থাকবি না।
এটুকু বলেই ছেড়ে দিলো বেলাকে। বেলা ছাড়া পেয়ে কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত সিঁড়ির দিকেই হাঁটা দিলো।সায়র পেছন থেকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
বেলা সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখলো, তারপর দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয়। উপরের আলো ধীরে ধীরে তার গায়ে পড়তে লাগলো। কিন্তু তার আগেই সে হাতের পিঠ দিয়ে দ্রুত চোখ মুছে নিলো। ছাদে ওঠার আগে নিজের মুখটাকে আবারও যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে নিতে হবে। কেউ কিছু বুঝতে পারবে না। কেউ না।সায়র নিচে দাঁড়িয়েই সেটা দেখলো
তার বুকের ভেতর কেমন ভারী একটা অনুভূতি জমে উঠলো। বেলা তাকে কিছুই বলেনি, তবু তার নীরবতা যেন অনেক কথার চেয়েও বেশি কিছু বলে গেলো। সে বুঝতে পারছে, এখানে এমন কিছু আছে, যা বেলা মরিয়া হয়ে আড়াল করতে চাইছে। আর অদ্ভুতভাবে, সেই গোপন কষ্টটার সঙ্গে নিজের একটা সম্পর্ক আছে কি না? এই প্রশ্নটাও এখন তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।কয়েক সেকেন্ড পর সেও ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগোলো। আর ঠিক তখনই, ছাদের ওপর দুই ভিন্ন প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুই জোড়া চোখ আবারও সেই দৃশ্যটা ধরে ফেললো।রুপসা আর মমতাজ বেগম।
রুপসা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো, হাতে আধখাওয়া গ্লাস। বিহান কিছু একটা বলছিলো, আশপাশে সবাই হাসছিলো, কিন্তু তার মন আর সেখানে ছিলো না। সিঁড়ির দিকেই তার নজর বারবার চলে যাচ্ছিলো। প্রথমে সে দেখল বেলাকে ওপরে উঠতে। মুখে জোর করে হাসি টেনে, খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বেলা ছাদে ফিরলো। তারপর মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে সায়রও সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলো।এই দৃশ্যটা দেখার পর রুপসার চোখ মুখের ভঙ্গি বদলে যায়।
সে খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলো বেলা কারও দিকে তাকাচ্ছে না, সরাসরি ইরার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। আর সায়র ওপরে উঠেও একবার চারপাশে তাকিয়ে নিলো, যেন নিজেকে খুব স্বাভাবিক দেখাতে চাইছে। কিন্তু রুপসার চোখ এড়ালো না ।সেই এক ঝলক দৃষ্টি, যেটা উঠেই সায়র বেলার দিকে ছুড়ে দিয়েছিলো। খুব ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু যথেষ্ট।রুপসার আঙুলগুলো গ্লাসের গায়ে শক্ত করে ধরলো।তার ঠোঁটে একটা ভদ্র হাসি ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই হাসির ভেতর আর উষ্ণতা নেই। বুকের ভেতর ঈ’র্ষা আর বিরক্তির কাঁ’টা একসঙ্গে বিঁধে উঠলো।মনে মনে ভাবলো,
— ওরা কি এক সঙ্গে ছিলো? কী কথা ছিল এতো ওদের ?আর এমন কী হয়েছে যে ওর পেছন পেছন নিচে নামতে হলো? আবার এক সঙ্গে ছাদে এলো।
অন্যদিকে মমতাজ বেগমও সবকিছু লক্ষ্য করছিলেন। নিজের স্বভাবসিদ্ধ নীরব সতর্কতায়। তার চোখ খুব বেশি কিছু প্রকাশ করলো না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ইতোমধ্যেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছেন। বেলার এই অকারণ গুরুত্ব পাওয়া, সায়রের তার প্রতি বাড়তি খেয়াল, একসঙ্গে নিচে যাওয়া সবকিছুই তার ভালো লাগছে না। তিনি মুখ শক্ত করে তাকিয়ে রইলেন বেলার দিকে।
মেয়েটা ফিরে এসেছে, কিন্তু তার মুখের ভেতরের ভাঙা ভাবটা পুরোপুরি চাপা পড়েনি। আর সায়র? সেও আগের মতো স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু চোখের গভীরে একরকম চাপা অস্থিরতা স্পষ্ট। এই সামান্য কয়েক মিনিটে কী কথা হয়েছে, তিনি জানেন না। কিন্তু এটুকু বুঝতে তার অসুবিধা হলো না। এই কাহিনী এখানেই থামানো দরকার। নইলে সামনে ঝামেলা আরও বাড়বে।
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১০
ছাদের ওপর আবারও উল্লাস চলছে, হাসি চলছে, ছবি তোলা চলছে, বিহান নতুন করে সবাইকে জড়ো করে কেক কা’টার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু এই সমস্ত শব্দ, আলো, হাসির আড়ালে নিঃশব্দে আরেকটা স্রোত বইতে শুরু করেছে । অস্বস্তি, ঈর্ষা, লুকোনো কষ্ট আর অপ্রকাশিত প্রশ্নের স্রোত।আর সেই স্রোতের একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বেলা।আর এদিকে যে দু’জোড়া চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বেলার প্রতিটা পদক্ষেপ পর্যাবেক্ষন করে যাচ্ছে । সেটা সে বুঝতেও পারলো না।
