রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১২
ইয়ুশরা রিমু
ছাদে ফিরে এসে বেলা যেন ইচ্ছে করেই নিজেকে আগের সেই চেনা ভিড়ের মধ্যে ছুড়ে দিলো। সিঁড়ির দিক থেকে উঠে এসে এক মুহূর্তও এদিক-ওদিক না তাকিয়ে সে সোজা ইরা আর বিহানের দিকেই চলে গিয়েছিলো। ইরা তখনও বিহানের সঙ্গে ঝগড়া জুড়ে বসে আছে, আর বিহান হাতে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকা জড়িয়ে এমন ভাব করছে যেন বিশ্বকাপ জেতানো দলের অফিশিয়াল ক্যাপ্টেন সে-ই।
ইরা তখন বিহানের পাশে দাঁড়িয়ে হেসেই যাচ্ছে। বিহান এক হাতে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকাটা কাঁধে জড়িয়ে, আরেক হাতে মোবাইল উঁচিয়ে নিজের ভিডিও দেখে নিজেই উ’ত্তেজিত গলায় বলছে,
— দেখছো? এই যে, এই মুহূর্তটাই! আমি আগেই বলছিলাম, গোলটা হবেই! আমার প্রেডিকশন একদম অন পয়েন্ট ছিলো!
ইরা চোখ উল্টে বললো,
— আপনার প্রেডিকশন না, পুরো টিমের কঠোর পরিশ্রম ছিলো! আপনি এমন ভাব করছেন যেন মাঠে নেমে গোলটা নিজেই করিয়ে এসেছেন!
বিহান সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বললো,
— আমি মাঠে নামলে আরও দুটো গোল হতো।
ইরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
—- হ্যাঁ, অবশ্যই। পনি মাঠে নামলে বল দেখে প্রতিপক্ষই ভয়ে পালিয়ে যেত, তাই না?
—- একদম! অন্তত তুমি তো পালাতেই।
—আমি কেন পালাবো?
— কারণ তুমি আমার ট্যাকটিক্স বুঝতে পারতে না।
— আরে ধুর! আপনার ট্যাকটিক্স না, নাটকবাজি বুঝতে পারি না আমি মনে করেছেন!
দু’জনের এই খুনসুটি দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বেলা হেসে ফেললো। একটু আগের ভেতরটা কাঁপিয়ে দেওয়া মুহূর্তগুলোর রেশ যেন এখনও বুকের কোথাও রয়ে গেছে, কিন্তু মুখে সে তার একফোঁটাও প্রকাশ হতে দিলো না। বরং ইচ্ছে করেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ইরার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ইরা সঙ্গে সঙ্গে বেলার হাত টেনে বললো,
—এই তুই এসে দেখ, বিহান ভাই নিজের ভিডিও দেখে নিজেই প্রেমে পড়ে গেছে!
বিহান নাটকীয় ভঙ্গিতে মোবাইল বুকের কাছে চেপে ধরে বললো,
— এটা প্রেম না, সম্মান। একজন ফুটবলপ্রেমী হিসেবে আমার আবেগকে সম্মান করতে শেখো।
বেলা মুচকি হেসে বললো,
— তোমার আবেগ না, তোমার বাড়াবাড়ি দেখছি।
বিহান কপট দুঃখে বুক চাপড়িয়ে বলে,
— ওহ! এখন তুইও ওর দলে । আমি এতক্ষণ ধরে তোদের জন্য ছাদে উৎসবের জন্য সব করলাম, আর তোরা আমাকে এভাবে অপমান করছিস?
ইরা হেসে কুটিকুটি হয়ে বললো,
— হ্যাঁ করেছেন ঠিকি। কিন্তু নিজের গলা ফাটিয়ে পুরো পাড়া মাথায় তুলেছেন!
বিহান নাক সিটকে বললো,
— এটাই তো উদযাপন! আর্জেন্টিনা জিতেছে, মানে আজকে বাড়ির ছাদে ইতিহাস লেখা হবে। আর ইতিহাসে আমার অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।
বেলা এবার একটু বাড়িয়ে সায় দিয়ে বললো,
— হ্যাঁ, ইতিহাসে লেখা থাকবে। বিহান নামক এক অতিউৎসাহী ব্যাক্তি পুরো ম্যাচজুড়ে তিনবার লাফিয়ে হাত থেকে মোবাইল ফেলে দিয়েছিলো, আর পাঁচবার চিৎকার করে সবার কানের বারোটা করানোর উপক্রম করেছিলো।
ইরা হাততালি দিয়ে উঠলো,
— ওয়াহ! একদম ঠিক!
বিহান হতভম্ব হয়ে বললো,
— এই! তোরা দু’জন মিলে ষ’ড়যন্ত্র করছিস!
বেলা এবার এমনভাবে হেসে উঠলো, যেন তার ভেতরে কোনো ঝড়ই নেই। চোখদুটো উজ্জ্বল, ঠোঁটের কোণে স্বাভাবিক হাসি, কথাবার্তায় আগের চেনা ছটফট ভাব দেখে কেউ বুঝবে না, কিছুক্ষণ আগেও সে ভেতরে ভেতরে নিজেকে সামলাতে যুদ্ধ করেছে। সে খুব সচেতনভাবেই নিজেকে ভিড়ের মধ্যে মিশিয়ে দিলো। ইরার কাঁধে হালকা ভর দিয়ে দাঁড়ালো, বিহানের কথার পাল্টা জবাব দিলো, মাঝে মাঝে নিজেই নতুন করে খোঁচা দিলো। যেন একটু আগের সবকিছু সত্যিই ছিলো না, কিংবা থাকলেও এখন আর তার কোনো গুরুত্ব নেই।
দূরে দাঁড়িয়ে সায়র এই বদলটা খুব স্পষ্ট দেখছিলো। সে জানে, বেলা এমনিতেই চটপটে, হাসিখুশি মেয়ে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার স্বাভাবিক হয়ে ওঠাটা যেন একটু বেশিই সচেতন। যেন সে ইচ্ছে করেই নিজেকে আরও উজ্জ্বল, আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে, যাতে কেউ তার চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা কষ্টটুকু ধরতে না পারে। এই উপলব্ধিটা সায়রের বুকের ভেতর আবারও একটা চাপা অস্বস্তি ছড়িয়ে দিলো।
ওদিকে, রুপসা দাঁড়িয়ে ছিলো ছাদের একটু ডানদিকে, হাতে গ্লাস, ঠোঁটে সেই চেনা ভদ্র হাসি। কিন্তু তার চোখ খুব তীক্ষ্ণ। সে লক্ষ্য করলো ,বেলা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে, আর সায়র খুব নীরবে সেই বেলার দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখছে। এই দেখাটা তার ভালো লাগলো না। একদমই না।
এদিকে ,ছাদের হইচই ধীরে ধীরে একটু বদলে এলো। বাড়ির বড়রা একে একে নিচে নামতে শুরু করলেন। সারোয়ার খান বললেন,
—তোরা আর খুব বেশি রাত করিস না। বিহানকে কেক-টেক গুছিয়ে রাখতে বলে গেলেন। আবার শেষবারের মতো হেসে বলে গেলেন, আচ্ছা, আর্জেন্টিনা জিতেছে বুঝলাম, কিন্তু তোদের লাফালাফিতে ছাদ যেন ভেঙে না পড়ে!
মমতাজ বেগম নামার আগে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলেন। সেই দৃষ্টিটা খুব বেশি সময় কারও ওপর থামলো না, কিন্তু বেলার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় তাতে একটা অদৃশ্য কড়াকড়ি ছিলো। বেলা সেটা টের পেলো কি না বোঝা গেলো না। সে তখন ইরার সঙ্গে কী একটা নিয়ে হাসছিলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বড়রা সিঁড়ি বেয়ে নিচে মিলিয়ে গেলো। ছাদটা যেন আরও খোলামেলা হয়ে উঠলো। রাতের হাওয়া একটু ঠান্ডা, একটু স্বস্তির। ওপরে আকাশে মেঘের ফাঁক গলে দু-একটা তারা দেখা যাচ্ছে। চারপাশের বাড়িগুলোর ছাদেও কোথাও কোথাও হালকা আলো, কোথাও টিভির শব্দ, কোথাও আবার নিস্তব্ধতা। আর এই বাড়ির ছাদে এখন রয়ে গেল মূলত ওরাই রুপসা,বিহান, ইরা, বেলা, সায়র । বড়রা নিচে চলে যেতেই ছাদটা একরকম নিজেদের ছোট্ট রাজ্যে পরিণত করলো।
বিহান চারপাশে তাকিয়ে দুই হাত ঘষে বললো,
— এবার আসল অনুষ্ঠান শুরু।
বেলা ভ্রু তুললো,
— এতক্ষণ তাহলে কী হচ্ছিলো?
বিহান গম্ভীর ভঙ্গিতে বললো,
— ওটা ছিল ওয়ার্ম আপ। এখন বড়রা নেই, কেউ বকবে না, কেউ চুপ করো বলবে না। মানে এখন আমরা যা খুশি করতে পারি।
সায়র হেসে বললো,
— এই যা খুশি কথাটা তোর মুখে খুব সন্দেহজনক শোনাচ্ছে।
বিহান চোখ টিপলো,
— সন্দেহজনক না, রোমাঞ্চকর। আমরা একটা খেলা খেলবো।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহী হয়ে উঠলো,
— কী খেলা?
বিহান একটু ভেবে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো,
— আমরা খেলবো চ্যালেঞ্জ রাউন্ড।
বেলা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
— তুমি আবার কী খেলা আবিষ্কার করলে?
বিহান মোবাইলটা পকেটে গুঁজে বললো,
— খুব সোজা।আমি সবার জন্য ছোট ছোট টাস্ক দেবো। যে পারবে, সে পয়েন্ট পাবে। যে পারবে না, তাকে শা’স্তি।
ইরা হাত গুটিয়ে বললো,
—শা’স্তি মানে?কি রকমের?
বিহান রহস্যময় গলায় বললো,
— সেটা পরিস্থিতি বুঝে ঠিক করা হবে।
বেলা তৎক্ষণাৎ বললো,
–— না, আমি নাই। তোমার পরিস্থিতি বুঝে জিনিসগুলোই সবচেয়ে ভ’য়ংকর। ছোটবেলায় অনেক বিপদে পড়ছি তোমার কথা শুনে।
বিহান আপত্তি জানালো,
—আরে না রে! এত অবিশ্বাস করিস নিজের ভাইকে? আমি খুবই সুশীল একটা খেলা খেলাবো।
ইরা ফিসফিস করে বেলাকে বললো,
— এই সুশীল শব্দটা শুনেই আমারো ভয় লাগছে।আমিও এইসব খেলাতে নেই।
বেলা হেসে মাথা নাড়লো।
শেষ পর্যন্ত অনেক কথার পর খেলার নিয়ম দাঁড়ালো।বিহান একটা করে টাস্ক দেবে, সবাইকে সেটা করতে হবে। টাস্ক হতে পারে গান গাওয়া, কারও নকল করা, কোনো মজার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, কিংবা ছোট্ট কোনো চ্যালেঞ্জ। সবাই রাজি হয়ে ছাদের মাঝখানে গোল হয়ে বসলো। ইরা মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসলো, বেলা তার একপাশে। সায়র একটু দূরে হেলান দিয়ে বসলো, আর রুপসা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গিয়ে সায়রের কাছাকাছি জায়গাটা বেছে নিলো। যেন বিষয়টা একেবারেই স্বাভাবিক।পুরোনো বন্ধু বলে পাশে বসছে, এতে অস্বাভাবিক কী আছে?
বিহান প্রথম টাস্ক দিলো ইরাকে,
— তুমি আমাকে নকল করো।
ইরা হাততালি দিয়ে বললো,
— এ তো আমার ফেভারিট কাজ! কাউকে নকল করতে বেশ পারি আমি আর বেলা।
সঙ্গে সঙ্গে সে বুক ফুলিয়ে, কাঁধ পেছনে নিয়ে, কপাল কুঁচকে, গলা মোটা করে বললো,
—দেখো, ফুটবল একটা আর্ট। তোমরা সাধারণ মানুষ এটা বুঝবে না। আমার বিশ্লেষণ ক্ষমতা অন্য লেভেলের।
বিহান সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো,
— এই মেয়ে তো রীতিমতো আমাকে অপমান করছে!
বেলা এত জোরে হেসে ফেললো যে প্রায় ইরার গায়ে হেলে পড়লো,
— একদম সেইম হয়েছে!
ইরা থামলো না। এবার সে হাত নেড়ে নেড়ে যোগ করলো,
—আমি যদি মাঠে নামতাম, অন্তত হ্যাটট্রিক করতাম।
বেলা এবার হেসে কুঁকড়ে গেলো। বিহান নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো।
—আমি এই ছাদে আর থাকবো না। আমার সম্মান শেষ।
রুপসাও হেসে উঠলো, যদিও তার চোখের একাংশ তখনও সায়রের প্রতিক্রিয়া মাপছিলো। সায়র হালকা হেসে মাথা নাড়লো। কিন্তু তার দৃষ্টি বেশিক্ষণ কারও ওপর টিকলো না অদ্ভুতভাবে সেটা গিয়ে আবার বেলার হাসিমুখেই থামলো।
দ্বিতীয় টাস্ক এলো বেলার জন্য।বিহান আঙুল তুলে বললো,
— তুই এখনই দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনার জয়ের ওপর একটা ছোট বক্তৃতা দিবি। কমপক্ষে তিন লাইন।
বেলা মুখ কুঁচকে বললো,
— আমি পারবো না।
—পারতেই হবে।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে উসকে দিলো,
— তুই তো আর্জেন্টিনার একনিষ্ঠ ভক্ত। শুরু কর।
বেলা একটু গলা খাঁকারি দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। এক হাত বুকের ওপর রেখে বললো,
—আজকের এই ঐতিহাসিক রজনীতে আমি ঘোষণা করছি, আর্জেন্টিনা শুধু একটা দল না ।এটা একটা আবেগ, একটা অনুভূতি।আর যারা ব্রাজিল সাপোর্ট করে, তাদের জন্য আজকের রাত শোকের রাত।
কথাটি বলেই সায়রের মুখের দিকে তাকালো। ইরা আর বিহান তো একসাথে চেঁচিয়ে উঠলো। বিহান তো প্রায় মাটিতে গড়িয়ে পড়ে বললো,
— এই না হলে আমার বোন! কী ডায়লগ! বাহ্ বাহ্। সবাই করতালি দেও।
বেলা মাথা উঁচু করলো,
—অবশ্যই।
এভাবেই খেলা জমে উঠতে লাগলো। বিহানকে বলা হলো,
— তিরিশ সেকেন্ডে ছয়টা আর্জেন্টিনা প্লেয়ারের নাম বলতে। সে উ’ত্তেজনায় ছয় নম্বরে এসে আটকে গিয়ে নিজের মাথায় নিজেই চাপড় মা’রলো।
রুপসাকে বলা হলো,
—সবার মধ্যে কাকে সবচেয়ে নাটকবাজ মনে হয়?
রুপসা হেসে বিহানের দিকে আঙুল তুলতেই সবাই হেসে উঠলো।
কিছুক্ষণ পর বিহান দু’হাত ঘষে আবার বললো,
— এবার আসল মজা হবে। এই রাউন্ডে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বিহান ওদের সবাইকে উপেক্ষা করে নাটকীয় ভঙ্গিতে চারপাশে তাকালো। তারপর তার চোখ গিয়ে থামলো সায়রের ওপর। সেই দৃষ্টি দেখেই বেলার বুকের ভেতর কেমন হালকা ধাক্কা লাগলো। কারণ বিহানের মুখে এই ধরনের হাসি মানেই, এখন সে এমন কিছু বলবে যেটা নিয়ে সবাই মজা করবে। কি না কি বলে বসে। কে জানে।
বিহান আঙুল তুলে বললো,
—এবার টার্গেট সায়র।
রুপসা একটু সোজা হয়ে বসলো। তার ঠোঁটের কোণায় আগ্রহী হাসি ফুটে উঠলো। সায়র অবশ্য আগের মতোই শান্ত। সে মেঝেতে হেলান দিয়ে বসে ছিলো, এক হাঁটু ভাঁজ করা, এক হাত হাঁটুর ওপর রাখা। মুখে খুব বেশি ভাব নেই, কিন্তু চোখে সেই চেনা সতর্কতা আছে।যেন সে আগেই বুঝে গেছে, বিহান এখন কিছু একটা বাড়াবাড়ি করবেই।বিহান আর দেরি করলো না। হাত বাড়িয়ে বললো,
—তোর ফোনের শেষ তোলা ছবি দেখা।
এক সেকেন্ডের জন্য সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলো।বেলা প্রথমে কথাটা খুব স্বাভাবিকভাবেই শুনেছিলো। কিন্তু শেষ তোলা ছবি শব্দ দুটো কানে যেতেই তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে কেমন যেন করে উঠলো। কোনো কারণ ছাড়াই। কিংবা হয়তো কারণ ছিলো। সায়রকে নিয়ে এখন যেকোনো ছোট্ট বিষয়ই তার অকারণ অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠছে।
সায়র মাথা না তুলেই ঠান্ডা গলায় বললো,
— না।
বিহান যেন এই উত্তরটাই আশা করছিলো। সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয়ভাবে চেঁচিয়ে উঠলো,
—খেলায় না বলে কিছু নাই!
সায়র নির্বিকারভাবেই জবাব দিলো,
—এখন থেকে আছে।
ইরা হেসে ফেললো। আরে দেখেন দেখেন, আগেই ডিফেন্স নিয়ে বসে আছে স্যার!
বিহান মুখ কুঁচকে বললো,
—এই যে! এটা কোনো কথা হলো? সবাই টাস্ক করছে, আর তুই এসে সরাসরি না বলে দিবি? এভাবে খেলা চলে?
সায়র এবার মাথা তুলে খুব শান্ত চোখে তাকালো,
—চলে।
বিহান সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো,
—না, চলে না। একদমই চলে না। আমি এতক্ষণ ধরে সবাইকে বক্তৃতা দেওয়াচ্ছি, বিভিন্ন প্রশ্ন করছি আর তোর বেলায় এসে নিয়ম বদলে যাবে?
সায়র খুবই নির্লিপ্ত গলায় বললো,
— হ্যাঁ।
ইরা হেসে বেলার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বললো,
— তোর ভাইটার সাহস দেখ! সায়র স্যার কি করে দেখার পালা এবার।
বেলা ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে রাখলো, কিন্তু তার চোখ একবার অজান্তেই সায়রের মুখে গিয়ে থেমে গেলো। সায়রের গলাটা স্বাভাবিক, মুখটাও শান্ত কিন্তু তার এই “না” বলার ভঙ্গিটা আজ অদ্ভুত রকম দৃঢ়। যেন ফোনটা দেখানো কোনো সাধারণ অনীহা না, বরং এমন কিছু আড়াল করে রাখার জেদ, যেটা সে কোনোভাবেই কাউকে জানতে দিতে চায় না।
রুপসা এবার কথায় যোগ দিলো,
—আরে দেখালেই তো হয়। এমন কী আছে তোমার ফোনে? শেষ ছবি মানেই কি খুব সিক্রেট কিছু?
সায়র এবার তার দিকে তাকিয়ে খুব ছোট্ট করে বললো,
— আছে।
শব্দটা খুব ছোট, খুব সাধারণ। কিন্তু তাতে এমন এক চূড়ান্ত ভাব ছিল যে সবাই এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলো
ইরা ওহহো বলে চোখ বড় করে হেসে উঠলো। বিহান সঙ্গে সঙ্গে সামনে ঝুঁকে এলো।বিহান দু’চোখ চকচক করে বললো,
— ও মা! আছে মানে কী? মানে সত্যিই কিছু আছে? তা হলে তো আজকে ফোন দেখা আরও জরুরি।
সায়র কপাল কুঁচকালো।
— বিহান, বাড়াবাড়ি করিস না।
বিহান আহত মুখে বললো,
—-আমি বাড়াবাড়ি করছি? আমি তো শুধু সত্য উদঘাটন করতে চাইছি। তোর ফোনের লাস্ট ছবিতে কী আছে, সেটা এই সভ্য সমাজের জানার অধিকার আছে।
ইরা এবার হাসতে হাসতেই বললো,
—ঠিক কথা। আমরা সবাই এতক্ষণ সব করেছি। এবার আপনি ফোন দেন, সায়র স্যার।
সায়র গম্ভীর মুখেই বললো,
— দিবো না।
বিহান এবার সত্যিই উঠে বসলো,
— আচ্ছা, তুই এমন করছিস কেন? শেষ ছবি দেখে আমরা কি তোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড জেনে যাবো নাকি? একটা ছবি দেখাতেই তো হবে।
সায়র ঠান্ডা স্বরে বললো,
—হবে না।
বিহানও জেদ ধরে বললো,
—হবে।তুই নিজে না দেখালে আমি কিন্তু ফোন কেড়ে নেবো।
সায়র এবার হালকা ভ্রু তুলে বলে ,
—চেষ্টা করে দেখ।
এই স্বরটা এমন ছিল যে ইরা আবার হেসে উঠলো,
— বিহান ভাই, আপনি আজকে ভুল মানুষকে টার্গেট করেছেন।
কিন্তু বিহান ছাড়ার পাত্র নয়। সে আরও একটু এগিয়ে এসে বললো,
— এক কাজ কর, ফোনটা আমি হাতে নিবো না। তুই নিজেই স্ক্রিন খুলে আমাদের শুধু লাস্ট ছবিটা দেখিয়ে দিবি। ব্যাস। এতটুকু ব্যাপার নিয়ে এত নাটক কিসের?
এইবার বেলার বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠলো। কেন, সে নিজেও জানে না। তবু মনে হলো, সায়র যেন কোনোভাবেই ফোনটা খুলবে না। আর অদ্ভুতভাবে, তার নিজের মনও চাইছে না যে ফোনটা খোলা হোক। কেন এমন মনে হচ্ছে তার? সে বুঝতে পারছেনা।
রুপসা হালকা হেসে বললো,
— আমিও দেখতে চাই। এখন তো আমারও কৌতূহল হচ্ছে।
বিহান সুযোগ পেয়ে বলে উঠলো,
—দেখেছিস? শুধু আমি না, সবাই দেখতে চায়। কাজেই এত রহস্য করে লাভ নাই। ফোন বের কর।
সায়র এবার সত্যিই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। মুখে বিরক্তি নেই, কিন্তু এক ধরনের সতর্কতা আছে। যেন সে খুব দ্রুত মাথার ভেতর কিছু হিসেব করছে। চারপাশের সবার মুখে তখন কৌতূহল।ইরা মজা পাচ্ছে, বিহান উ’ত্তেজনায় ফেটে পড়ছে, রুপসা আগ্রহী হয়ে তাকিয়ে আছে।আর বেলা?সে চুপচাপ বসে আছে। মুখে হালকা হাসি রাখার চেষ্টা করলেও আঙুলের সাহায্যে ওড়নার প্রান্তটা মুচড়ে যাচ্ছে। সে নিজেই বুঝতে পারছে না কেন তার বুকের ভেতর এত অকারণ ধুকপুকানি। সায়রের ফোনের একটা ছবি দেখানো না-দেখানোয় তার এত অস্বস্তি হওয়ার কথা নয়। তবু হচ্ছে।শেষ পর্যন্ত সায়র ধীরে ধীরে পকেট থেকে ফোনটা বের করলো।
বিহান সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ীর হাসি হাসলো।
— এই তো! আমি জানতাম, শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতেই হবে।
সায়র তার কথায় কোনো জবাব দিলো না। ফোনটা হাতে নিয়ে সে স্ক্রিনের দিকে তাকালো। সেই এক সেকেন্ডে তার চোখে এক ঝলক এমন কিছু ফুটে উঠলো, যা অন্য কেউ খেয়াল না করলেও বেলার চোখ এড়ালো না। বেলা সায়রের ফোনে উঁকি দিতেই আঁ’তকে উঠলো।কারণ স্ক্রিনে ভেসে আছে তারই ছবি। বেলা হতবাক দৃষ্টিতে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইলো। চোখ কচলে আবারো ফোনে তাকালো কিন্তু এখন ছবিটা নেই। সে কি তবে ভুল দেখলো?
সন্ধ্যায় ইরার সঙ্গে যখন খুনসুটিতে মগ্ন ছিলো বেলা। ছাদের নীল-সাদা আলোয় তার মুখটা তখন অদ্ভুত রকম উজ্জ্বল লাগছিলো, আর কপালের পাশের এলোমেলো চুলগুলো হাওয়ায় উড়ে এসে বারবার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। চারপাশে সবাই যখন নিজেদের আনন্দে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সায়র অজান্তেই ফোন তুলে বেলার সুন্দর মুহূর্তটা ক্যামেরাবন্দি করে ফেলেছিলো। কেন বেলার ছবিটা তুলেছিলো সে নিজেও জানে না।
আর এখন সেই ছবিটাই তার ফোনের শেষ তোলা ছবি।
এক মুহূর্তে সায়রের ভেতরটা কেমন টনটন করে উঠলো। ফোনটা যদি এভাবেই দেখায়, তাহলে সবার আগে চোখে পড়বে বেলার মুখ। বিহান সঙ্গে সঙ্গে খোঁচা দেবে। ইরা অবাক হবে। রুপসা নিশ্চয়ই কি না কি ভেবে বসবে। আর বেলা? বেলা কী করবে, সে ভাবতেও চায় না।
কিন্তু এই সামান্য এক সেকেন্ডের অস্থিরতার ছিটেফোঁটাও সে মুখে ফুটতে দিলো না।খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আঙুলের হালকা স্পর্শে সে গ্যালারিটা একবার স্ক্রল করলো।এমনভাবে, যেন কেবল ফোন আনলক করছে। তারপর একেবারে ঠান্ডা মাথায় শেষ ছবিটার পরের একটা ছবি খুলে বের করলো। সেটা ছিল বিহানেরই। বিকেলে আগে পতাকা জড়িয়ে লাফাচ্ছিল, সেই সময়ের তোলা একটা বেখাপ্পা, হাস্যকর স্টাইলের।এরপর ফোনটা বিহানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
—এই নে। দেখে নে। আর শান্ত হ।
বিহান বিজয়ীর ভঙ্গিতে ফোনটা হাতে নিয়ে বললো,
—এই তো! এতক্ষণ ধরে না-না করার পর শেষমেশ।
কথা শেষ করতে না করতেই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে থমকে গেল, তারপর বলে উঠে ,আরে শালা! এটা তো আমার ছবি!
ইরা ঝুঁকে এসে দেখেই হেসে কুটিকুটি।
— ও মাই গড! আপনি এমন করে লাফাচ্ছিলেন কেন ?
বিহান ক্ষুব্ধ গলায় বললো,
— এইটা কে তুলছে? আর আমাকে এমন লাগছে কেন?
সায়র একদম নির্লিপ্ত স্বরে বললো,
— কারণ তুই এমনই ।
রুপসাও হেসে উঠলো,
— সত্যি, ছবিটা বেশ হয়েছে। একদম জয়ী দলের পাগল সমর্থক ভাইব।
বিহান মুখ বাঁকিয়ে বললো,
—একদমই না। এটা একটা ষড়যন্ত্র। তুই ইচ্ছে করে আমার সবচেয়ে বাজে এক্সপ্রেশনের ছবিটা তুলছিস। দ্রুত ডিলিট কর ছবিটা।
সায়র কাঁধ ঝাঁকালো।
—-আমি কিছু করিনি। তুই নিজেই এমন ছিলি।
ইরা হেসে বললো,
— না না, এই ছবি ডিলিট করা যাবে না। দারুন হয়েছে ছবিটা।
বিহান গজগজ করে বললো,
— একদম চুপ। সবাই মিলে আজকে আমার ই’জ্জত শেষ করে দিলি ।
চারপাশে আবার হাসির রোল উঠলো। কথাবার্তা, ঠাট্টা, খুনসুটি আবার আগের ছন্দে ফিরে গেলো। বিহান নিজের ছবিটা নিয়ে প্রতিবাদ করছে, ইরা আরও খেপাচ্ছে, রুপসা হাসতে হাসতে সায়রকে বলছে ছবিটা তাকে পাঠাতে হবে।
কেবল বেলা চুপ করে রইলো।বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই।সে আগের মতোই ঠোঁটে হালকা হাসি ধরে রেখেছে। কিন্তু তার চোখ একবার খুব ক্ষণিকের জন্য সায়রের হাতে ধরা ফোনটার দিকে গিয়েছিলো। আর তারপর সায়রের মুখের দিকে।সায়রও ঠিক তখনই একবার তাকালো তার দিকে।সেই দৃষ্টি খুব ছোট্ট। এক ঝলক। কিন্তু দৃষ্টিটা কেমন যেন যেন ছিলো।
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১১
বেলা দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো।সায়রও আর এক সেকেন্ড দেরি না করে ফোনটা বিহানের হাত থেকে নিয়ে আবার পকেটে ঢুকিয়ে ফেললো। মুখে আগের মতোই নির্লিপ্ত ভাব, যেন এই পুরো ঘটনায় তার বিন্দুমাত্র অস্বস্তি নেই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে খুব স্পষ্ট জানে । আর এক মুহূর্ত দেরি হলে, কিংবা আঙুলটা যদি এক সেকেন্ডও স্ক্রীনের এদিক ওদিক নড়তো, তাহলে আজ রাতের এই ছাদের বড়সড় একট গন্ডগোল বেঁধে যেতো।
