Home র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৮

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৮

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৮
ইয়ুশরা রিমু

বাড়ির গেটটা পেরিয়ে মূল সড়কে উঠতেই সায়র খুব স্বাভাবিক গতিতেই বাইকটা এগিয়ে নিয়ে গেলো। সকালের আলো তখন ধীরে ধীরে চারপাশকে উজ্জ্বল করে তুলছে। রাস্তার দুই পাশে দোকানপাট একে একে খুলছে, কোথাও ভাপ ওঠা চায়ের কাপে ধোঁয়া পাক খেয়ে ওপরে উঠছে, কোথাও আবার স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দল হাসতে-গল্প করতে করতে নিজেদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। চারপাশের সবকিছুই যেন একেবারে সাধারণ, একেবারে প্রতিদিনের মতো।
কিন্তু সায়রের মনটা আজ অস্বাভাবিকভাবে অস্থির।
বাইক চালানোর সময়ও বারবার তার চোখ রিয়ারভিউ মিররে চলে যাচ্ছে, যদিও সেখানে দেখার মতো কিছু নেই। তবুও যেন অজান্তেই সে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই মুখটাকে, যে মুখটা আজ সকাল থেকে একবারও ঠিকমতো তার দিকে তাকায়নি।

ডাইনিং টেবিলের দৃশ্যটা বারবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার চোখের সামনে।বেলার নিচু হয়ে থাকা মুখ।খাবারের প্লেটে অন্যমনস্কভাবে হাত নাড়ানো।পানি খাওয়ার সময় অকারণে কেঁপে ওঠা আঙুল আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে সেই কৃত্রিম হাসিটা।যে হাসির ভেতরে আনন্দের লেশমাত্র ছিল না।বরং ছিল বুকভা’ঙা কষ্টকে লুকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা।সায়র ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।নিজের মনকেই প্রশ্ন করলো,
—মেয়েটার আসলে হয়েছে কী?
হঠাৎ সামনের মোড়ে চোখ পড়তেই দূরে একটা পরিচিত অবয়ব দেখতে পেল।সাদা কলেজ ড্রেস।কাঁধে কালো ব্যাগ।ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে হাঁটছে বেলা।সায়রের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে গেলো।সে অজান্তেই বাইকের গতি একটু কমিয়ে দিলো। বেলা রিকশায় ওঠেনি।একা একাই হেঁটে যাচ্ছে।তার হাঁটার ভঙ্গিটাও আজ অন্যরকম।
সায়র ধীরে ধীরে বাইকটা তার ঠিক পাশে এনে থামালো।বাইকের শব্দে বেলা মাথা তুললো।সায়রকে দেখেই মুখের ভাবটা আরও গম্ভীর হয়ে গেলো।সায়র হেলমেটের কাঁ’চটা ওপরে তুলে শান্ত গলায় বললো,

— রিকশা পাচ্ছিস না?
বেলা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো,
—পেয়েছিলাম।
— তাহলে হাঁটছিস কেন?
— ইচ্ছা করছে।
— কলেজে যেতে লেট হবে।
— সমস্যা নেই।
— উঠে বস।
বেলা এক মুহূর্তও দেরি না করে মাথা নাড়িয়ে বলে,
— না।
সায়র ভ্রু কুঁচকালো,
— না মানে?
—-আমি চলে যেতে পারবো।
— সেটা আমি জানি।
— তাহলে?
— তবুও বলছি, উঠে বস। অনেক রোদ উঠেছে আজ।
বেলা এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালো।চোখদুটো লালচে।যেন অনেক কষ্টে নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলো আটকে রেখেছে।সে খুব শান্ত স্বরে বললো,

— আপনি দয়া করে জোর করবেন না।
সায়র কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে গেলো।আজ বেলার কণ্ঠে রাগ নেই।অভিমানও নেই।বরং এক ধরনের ক্লান্তি আছে।যে ক্লান্তি মানুষের শরীরে নয়, মনে বাসা বাঁধে।সায়র ধীরে ধীরে বাইক থেকে নেমে দাঁড়ালো।বাইকটা রাস্তার একপাশে রেখে কয়েক পা এগিয়ে এলো।বেলা একটু অবাক হয়ে তাকালো।সায়র খুব ধীর স্বরে বললো,
—আমার দিকে একবার তাকাবি?
বেলা তাকালো।কিন্তু সেই দৃষ্টি মাত্র এক মুহূর্ত স্থায়ী হলো।পরক্ষণেই আবার চোখ নামিয়ে ফেললো।সায়র লক্ষ্য করলো আজ বেলার চোখের নিচে হালকা কালচে ছাপ।মনে হচ্ছে, রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি।ঠোঁটদুটোও শুকিয়ে আছে।মুখের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতাটুকুও যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।এই কয়েকটা ছোট্ট পরিবর্তনই সায়রের ভেতরে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি তৈরি করলো।সে অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললো,

— শরীর খারাপ?
বেলা মাথা নাড়লো।
— না।
— মন খারাপ?
— না।
—তাহলে?
— কিছু না।
সায়র হালকা হেসে ফেললো।সেই হাসির ভেতরে আনন্দ ছিল না।ছিল অসহায়ত্ব।
বেলা ঠোঁট কা”মড়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো।কেন জানি আজ সায়রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।কারণ মানুষটার প্রতি যত্নটা সে প্রতিদিন একটু একটু করে অনুভব করছে।আর সেই যত্নটাই আজ তার কাছে সবচেয়ে বেশি নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে।যে মানুষটাকে নিয়ে একটু আগেই তার বিয়ের কথা আলোচনা হয়েছে।যে মানুষটার পাশে অন্য একজনের নাম এত স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণ করা হয়েছে।সেই মানুষটাই এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন চোখে তার খোঁজ নিচ্ছে।এই বৈপরীত্যটাই যেন সহ্য করতে পারছে না সে।সে খুব আস্তে বললো,

—আমি ঠিক আছি।
সায়র উত্তর দিলো না।শুধু স্থির চোখে বেলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।তার অভিজ্ঞতা বলছে।মেয়েটা ঠিক নেই।একদমই ঠিক নেই।আর ঠিক এই কারণেই তাকে একা ছেড়ে দিতে তার মন সায় দিচ্ছে না।
সায়র বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বেলার মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার দৃষ্টিতে কোনো জোর ছিল না, কোনো রাগও ছিলো না। ছিল শুধু নিঃশব্দ এক উদ্বেগ, যা সে চাইলেও লুকিয়ে রাখতে পারছে না। বেলার চোখের নিচের ক্লান্তির ছাপ, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখ আর বারবার চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টাগুলো যেন তাকে আরও নিশ্চিত করে দিচ্ছে মেয়েটা মুখে যতই বলুক সে ঠিক আছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে একদমই ভালো নেই।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সায়র খুব শান্ত স্বরে বললো, —অনেক হয়েছে। এবার উঠে বস।
বেলা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো।

— না, আমি হেঁটেই চলে যাব।
—-হেঁটে নয়।
—আমি পারবো।
—আমি জানি তুই পারবি। কিন্তু তবুও তোকে একা যেতে দেব না।
বেলা এবার বিরক্ত গলায় বললো,
— কেন দেবেন না? আমি কি ছোট বাচ্চা?
সায়র ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বললো,
—ছোট বাচ্চা বলেই তো মনে হয় কখনো কখনো। একটু মন খারাপ হলেই জেদ ধরা শুরু করে দিস।
—আমি জেদ করছি না।
—তাহলে যা বলছি, সেটাই কর।
— করবো না।
দুজনের মাঝখানে দুজনের ছোটখাটো ঝগড়া লেগে গেলো।রাস্তার পাশ দিয়ে একের পর এক রিকশা চলে যাচ্ছে, কয়েকটা কলেজবাসও হর্ন বাজিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো। তাদের সাইটে দাঁড়াতে বললো। কিন্তু তাদের দুজনের যেন সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই।সায়র এবার একটু কাছে এসে খুব নিচু স্বরে বললো,

— বেলা, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
— হোক।
— আমার ক্লাস আছে। তোর দেরিতে গেলে সমস্যা নেই কিন্তু আমার আছে।
–তাহলে আপনি চলে যান। আমি পরে আসছি।
সায়র মাথা নাড়লো,
—তোকে রেখে আমি কোথাও যাচ্ছি না।
বেলা অবাক হয়ে তাকালো।
—আপনি এত জেদি কেন?
সায়র শান্ত গলায় বললো,
— সেটা পরে ভাবা যাবে। এখন উঠে বস।
—আমি বলেছি না…
বেলার কথা শেষ হওয়ার আগেই সায়র মৃদু হেসে বললো,

— আর আমি বলছি, আজ তোকে আমার বাইকেই কলেজে যেতে হবে। এই বিষয়টা নিয়ে আর কোনো আলোচনা নেই।
বেলা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। সে বুঝে গেলো, মানুষটা আজ কিছুতেই নিজের সিদ্ধান্ত বদলাবে না। আরও তর্ক করলে শুধু সময়ই নষ্ট হবে।অবশেষে খুব অনিচ্ছায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বাইকের দিকে এগিয়ে গেলো।সায়রের মুখে অজান্তেই স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠলো।সে বাইকটা স্টার্ট দিতে দিতে বললো,
— এই তো, এতক্ষণে ভালো মেয়ের মতো কথা শুনলি।
বেলা মুখ গোমড়া করে পেছনের সিটে বসে বললো,
—আমি আপনার কথা শুনিনি। সময় ন’ষ্ট করতে চাইনি।
সায়র মৃদু হেসে ফেললো।
— ঠিক আছে, সেটাই ধরলাম।

বাইকটা ধীরে ধীরে আবার রাস্তার ভিড়ে মিশে গেলো।আজ পুরো পথটাই অস্বাভাবিক নীরব।প্রতিদিন বেলা কিছু না কিছু নিয়ে কথা বলে, কখনো কোনো অভিযোগ, কখনো কোনো অকারণ রাগ, কখনো আবার ইরাকে নিয়ে হাজারটা গল্প। আর সায়রও মাঝেমধ্যে দু-একটা কথা বলে তাকে খোঁচা দেয়।‌কিন্তু আজ দুজনের কেউই কোনো কথা বলছে না।শুধু বাতাসের শব্দ আর বাইকের ইঞ্জিনের মৃদু গর্জন তাদের নীরবতার সঙ্গী হয়ে আছে।সায়র কয়েকবার কথা বলতে চেয়েও থেমে গেলো।কিছুটা পথ যাওয়ার পর বেলা হঠাৎ খুব আস্তে বললো,
—একটা কথা বলবো?
সায়র সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো,
— বল।
— কলেজ গেটের একটু আগে আমাকে নামিয়ে দেবেন?
সায়র ভ্রু কুঁচকে রিয়ারভিউ মিররে তাকালো।
— কেন?
বেলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
— এমনি…
— এমনি মানে?
বেলা ইতস্তত করে বললো,

— আপনার সঙ্গে গেট পর্যন্ত গেলে আমার ক্লাসমেটরা অনেক প্রশ্ন করবে।
সায়র মৃদু হেসে বললো,
—প্রশ্ন করবে তো উত্তর দিয়ে দিবি।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো।
—না, আপনি জানেন না ওরা কেমন। সারাদিন খোঁচা দেবে। বলবে, স্যারের সঙ্গে আবার একসঙ্গে আসা শুরু হয়েছে? তারপর সারাদিন আর শান্তিতে থাকতে পারবো না।
সায়র কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে আর কিছু বললো না।খুব স্বাভাবিক গলায় শুধু বললো,
—আচ্ছা।
কলেজ থেকে একটু দূরে এসে সে ধীরে ধীরে বাইকের গতি কমিয়ে রাস্তার একপাশে থামালো।বেলা নেমে দাঁড়ালো।ব্যাগটা ঠিক করে কাঁধে তুলে একবারও সায়রের চোখের দিকে না তাকিয়ে বললো,
—ধন্যবাদ।
সায়র তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
—ক্লাস শেষ হলে অপেক্ষা করিস। একসঙ্গেই ফিরবো।
বেলা এক মুহূর্ত থেমে শুধু অস্পষ্টভাবে মাথা নাড়লো। সম্মতি দিলো কি দিলো না, সেটাও বোঝা গেলো না।তারপর ধীরে ধীরে কলেজ গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।সায়র কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তার চলে যাওয়া দেখলো।বেলা কলেজের ভেতরে ঢুকে চোখের আড়াল হয়ে যেতেই সে আবার বাইক স্টার্ট দিলো।কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাইকটা কলেজের প্রধান গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো।

কলেজের প্রধান গেট পেরিয়ে বাইকটা ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের পরিচিত কোলাহল কানে ভেসে এলো। মাঠজুড়ে ছেলেমেয়েদের ছোট ছোট দল দাঁড়িয়ে গল্প করছে, কেউ ক্লাসের দিকে দৌড়াচ্ছে, কেউ আবার করিডোরে দাঁড়িয়ে হাসিঠাট্টায় মেতে আছে। প্রতিদিনের মতোই পুরো ক্যাম্পাস প্রাণচঞ্চল।কিন্তু আজ সায়রের চোখ যেন কাউকেই খুঁজছে না।তার দৃষ্টি একবার অজান্তেই দুলায় করিডরের দিকটায় চলে গেলো। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে বেলাকে ধীরে ধীরে হেঁটে যেতে দেখেছিলো, সেই জায়গাটা এখন একেবারে ফাঁকা নিজেকে অকারণই অদ্ভুত লাগলো তার।মনে মনে নিজেকেই ধমক দিলো,
—আমি আসলে কী করছি? সকাল থেকে বারবার শুধু ওর কথাই ভাবছি কেন? বেলার বিষয়ে এতো ভাববো কেন আমি?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললো,
—না এসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে।
কথাটা ভেবেই মাথাটা হালকা ঝাঁকিয়ে বাইকটা নির্দিষ্ট জায়গায় পার্ক করে চলে গেলো নির্দিষ্ট কাজে।

প্রথম ঘণ্টা পড়তেই ধীরে ধীরে পুরো কলেজ ভবনটা আবারও তার প্রতিদিনের পরিচিত ছন্দে ফিরে এলো। কিছুক্ষণ আগেও যে করিডোরজুড়ে শিক্ষার্থীদের হাসি, দৌড়ঝাঁপ আর গল্পের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো, ঘণ্টার তীক্ষ্ণ আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করলো। একে একে সবাই নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পড়লো। কোথাও শিক্ষক উপস্থিতি নিচ্ছেন, কোথাও বোর্ডে মার্কার পেনের খসখসে শব্দ ভেসে আসছে।
জানালার ধারের বেঞ্চটায় চুপচাপ বসে আছে বেলা। সামনে খোলা বই, পাশে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা খাতা আর কলম। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, সে মনোযোগ দিয়েই ক্লাস করছে। কিন্তু তার চোখের গভীরে একবার তাকালেই বোঝা যায়, সে এই শ্রেণিকক্ষে থাকলেও তার মন অনেক দূরে কোথাও হারিয়ে আছে।
শিক্ষকের কণ্ঠ ভেসে আসছে, বোর্ডে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লেখা হচ্ছে, পুরো ক্লাসের সবাই মনোযোগ দিয়ে নোট তুলছে।অথচ বেলার খাতার একই পাতায় কলমটা অনেকক্ষণ ধরে এক জায়গাতেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। অজান্তেই একই শব্দের ওপর বারবার দা’গ টেনে যাচ্ছে সে। কখন যে পুরো লাইনের কালিটা ঘন হয়ে গেছে, সে নিজেও খেয়াল করেনি।তার কানে এখনও স্পষ্টভাবে বাজছে সকালের সেই কথাগুলো,

—রুপসার মতো মেয়েই এই বাড়ির বউ হওয়ার যোগ্য।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
কথাগুলো যেন শুধু কানে নয়, বুকের ভেতরেও প্রতিধ্বনি তুলছে।সে নিজের অজান্তেই খুব ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।মনে মনে নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করলো,
—এসব নিয়ে আমি এত ভাবছি কেন? উনি আমার কে? উনি যাকেই বিয়ে করুন, তাতে আমার কী আসে যায়?
কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তার নিজের মনই তাকে দিলো না।বরং প্রতিবার নিজেকে বোঝাতে গেলেই বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা যেন আরও একটু করে বেড়ে উঠছে।ঠিক তখনই পাশে বসে থাকা ইরা খুব আলতো করে তার কনুইয়ে ধাক্কা দিল।বেলা চমকে উঠে তাকালো।
— কী হয়েছে?
ইরা কয়েক সেকেন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।তারপর নিচু গলায় বললো,
–স্যার তিনবার তোর নাম ধরে ডাকলেন। তুই একবারও শুনলি না।
বেলা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সামনের দিকে তাকালো।শিক্ষক ইতোমধ্যে অন্য একজনকে প্রশ্ন করছেন।লজ্জায় তার মুখটা হালকা লাল হয়ে উঠলো।সে ছোট্ট করে বললো,

— খেয়াল করিনি।
ইরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।এটা সেই বেলা নয়, যে ক্লাসে সবার আগে উত্তর দেয়, মাঝেমধ্যে ভুল উত্তর দিয়ে পুরো ক্লাসকে হাসিয়ে ফেলে, আবার নিজেই নিজের ভুল নিয়ে হাসতে থাকে।আজকের বেলা যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ।ইরা আবারও ফিসফিস করে বললো,
— তোর শরীর খারাপ?
বেলা মাথা নাড়লো।
— না।
—তাহলে মন খারাপ?
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বেলা খুব আস্তে বললো,
— না রে তেমন কিছু না।
ইরা এবার আর জোর করলো না।তবুও তার চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ।কারণ সে খুব ভালো করেই জানে
—বেলা যখন সত্যিই ভালো থাকে, তখন পুরো ক্লাসটাই তার হাসিতে সরগরম হয়ে থাকে।
আজ সেই হাসিটাই নেই।বরং এমন এক নীরবতা আছে, যেটা বেলার স্বভাবের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
সময় নিজের গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু বেলার মন যেন সময়ের সঙ্গেই এগোতে পারছে না।মাঝে মাঝে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।কলেজ মাঠের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা জারুল গাছটার দিকে।হালকা বাতাসে ফুলগুলো দুলছে।বেলা নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করলো,
—না আর ভাবা যাবে না। যত ভাববো, তত কষ্ট বাড়বে।

রিকশাটা ধীরে ধীরে কলেজের প্রধান গেট ছেড়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো। দুপুরের রোদ তখন আগের চেয়ে অনেকটাই তীব্র হয়ে উঠেছে। রাস্তার দু’পাশে মানুষজন যে যার কাজে ব্যস্ত। কোথাও দোকানের সামনে ভিড়, কোথাও আবার যানজটের কারণে একটার পর একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে এত কোলাহল, এত মানুষের আনাগোনা।তবুও বেলার কাছে যেন সবকিছুই নিস্তব্ধ লাগছে।
রিকশার একপাশে মাথাটা হেলিয়ে চুপচাপ বসে রইলো সে। বাতাসে তার হিজাবের একপাশ বারবার উড়ে এসে মুখের ওপর পড়ছে। সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে সেটা সরিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তার মন যেন অন্য কোথাও আটকে আছে। এখনো সকালের প্রতিটা ঘটনা বারবার মনে পড়ছে।ডাইনিং টেবিলে বসে মমতাজ বেগমের দৃঢ় কণ্ঠে বলা কথাগুলো।
বেলা চোখ বন্ধ করে খুব আস্তে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
নিজেকে যতই বোঝাতে চাইছে যে, এসব ভাবার কোনো অধিকার তার নেই, ততই যেন বুকের ভেতরের কষ্টটা আরও গভীর হয়ে উঠছে।সে মনে মনে নিজেকেই বললো,

—-এভাবে আর চলতে দেওয়া যাবে না। আমাকে স্বাভাবিক হতে হবে। উনার কাছ থেকে একটু দূরে থাকলেই হয়তো সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে।
কিন্তু এই কথাগুলো উচ্চারণ করলেও তার নিজের মন যেন সেগুলো মানতে রাজি নয়।রিকশাটা ধীরে ধীরে বাড়ির গেটের সামনে এসে থামলো।বেলা ব্যাগটা কাঁধে তুলে ভাড়া মিটিয়ে খুব ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো।
নাজনীন সুলতানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাপড় মেলছিলেন। বেলাকে একা ঢুকতে দেখে অবাক হয়ে বললেন,
—আরে, তুই একা চলে এলি? সায়র কোথায়?
বেলা এক মুহূর্ত থেমে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বললো,
—আমার একটু আগে ছুটি হয়ে গিয়েছিলো। তাই চলে এসেছি।
নাজনীন সুলতানা মৃদু অবাক হয়ে বললেন,
–তোদের তো প্রায় একই সময় ছুটি হয়।
বেলা শুধু ছোট্ট করে মাথা নাড়লো।

— হুম।আজ একটু আগে বের হয়েছি।
কথাটা বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। কারণ সে জানে, আর একটু দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো আরও প্রশ্ন আসবে, আর আজ কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো শক্তি তার ভেতরে নেই।সে সোজা নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলো।ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করতেই যেন এতক্ষণ ধরে শক্ত করে ধরে রাখা মুখোশটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়লো।ব্যাগটা বিছানার ওপর রেখে সে নিঃশব্দে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
জানালার বাইরে আকাশটা একেবারে পরিষ্কার। সাদা মেঘগুলো অলস ভঙ্গিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। অথচ তার নিজের ভেতরের আকাশটা যেন ক্রমেই কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে।সে জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরে খুব আস্তে চোখ বন্ধ করলো।একফোঁটা গরম অশ্রু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে।সে তাড়াতাড়ি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে ফেললো।

—না।এভাবে কাঁদলে চলবে না।কেউ যদি দেখে ফেলে?
নিজেকে সামলে নিয়ে সে বিছানায় গিয়ে বসলো। সামনে পড়ে থাকা বইটা খুললো, আজকের নোটগুলো গোসলের আগেই লিখতে চাইলো।কিন্তু এক লাইনও লিখতে পারলো না।পাতার অক্ষরগুলো বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।বইটা আবার ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিলো।তার মনে হলো, আজ যেন পৃথিবীর সব শব্দ, সব রঙ, সব আনন্দ কোথাও হারিয়ে গেছে।শুধু বুকের ভেতরে রয়ে গেছে একরাশ অজানা শূন্যতা।আর সেই শূন্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার ভেসে উঠছে একটাই মুখ । সে হলো সায়র।

রাতের খাবারের টেবিলজুড়ে তখন একেবারে পরিচিত পারিবারিক পরিবেশ। নাজনীন সুলতানা সবার প্লেটে গরম গরম ভাত আর তরকারি তুলে দিচ্ছেন। সারোয়ার খান দিনের বিভিন্ন কাজের কথা বলতে বলতে খাবার খাচ্ছেন। বাশার খান মাঝেমধ্যে কথায় সায় দিচ্ছেন। বিহানও দু-একটা মজার কথা বলে পরিবেশটা আনন্দে মাতিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।সবাই স্বাভাবিক থাকলেও আজ দু’জন মানুষ যেন সেই স্বাভাবিকতার বাইরে।বেলা আর সায়র।
বেলা সারাদিনের মতো এখনও চুপচাপ। মাথা নিচু করে খুব ধীরে ধীরে ভাত মেখে খাচ্ছে। প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও বলছে না। অন্যদিকে সায়রও আজ খুব বেশি কথা বলছে না। মাঝেমধ্যে বাবার কোনো প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, তারপর আবার নীরবে খাওয়ায় মন দিচ্ছে।কিছুক্ষণ নীরবতার পর মমতাজ বেগম খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
—সায়র???
সায়র মুখ তুলে তাকালো।
–জি, আম্মু?
মমতাজ বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,

—সকালে তোকে বিয়ের ব্যাপারে যে কথাটা বলেছিলাম সেটা নিয়ে কিছু ভেবেছিস?
কথাটা শুনেই বেলার হাতটা থেমে গেলো।হাতটা ভাতের ওপরই স্থির হয়ে রইলো।সে ধীরে ধীরে মাথাটা আরও নিচু করে ফেললো। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই কেমন ধক করে উঠলো। অথচ বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে নিজের মুখের কোনো পরিবর্তন যেন কেউ বুঝতে না পারে।ডাইনিং টেবিলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এলো।সারোয়ার খানও ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাশার খান খাওয়া থামিয়ে অপেক্ষা করছেন সায়র কী উত্তর দেয়, সেটার জন্য।
সায়র ধীরে ধীরে পানির গ্লাসটা হাতে তুলে এক চুমুক খেলো। তারপর গ্লাসটা নামিয়ে মায়ের দিকে তাকালো।তার চোখে-মুখে কোনো বিরক্তি নেই, কোনো দ্বিধাও নেই। বরং ছিল এক ধরনের গভীর শ্রদ্ধা।খুব শান্ত কণ্ঠে বললো,
—ভেবেছি, আম্মু।
মমতাজ বেগমের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটলো,

— তাহলে বল, তোর কী মত?
সায়র কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ রইলো।তারপর ধীরে ধীরে বললো,
— তুমি যেটা ভালো মনে করবে সেটাই করো, আম্মু।
একটু থেমে আবার শান্ত গলায় যোগ করলো,
—তোমার সিদ্ধান্তের ওপর আমার কোনো আপত্তি নেই। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত তুমি আমার জন্য যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছ, সবই আমার ভালোর জন্য। আমি জানি, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
কথাগুলো বলার সময় সায়রের কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক কোমলতা।এই পৃথিবীতে মমতাজ বেগমই তার সবচেয়ে আপন মানুষ। বাবার পাশাপাশি মায়ের অসংখ্য ত্যাগ, ভালোবাসা আর সংগ্রামের সাক্ষী সে নিজে। সে জানে, মায়ের একমাত্র ছেলে মায়ের কথা মান্য করা তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে মায়ের মুখের হাসিটাই তার কাছে সবসময় বেশি মূল্যবান।ছেলের উত্তর শুনে মমতাজ বেগমের মুখে স্পষ্ট তৃপ্তির ছাপ ফুটে উঠলো।
তিনি মৃদু হেসে বললেন,

— আমি জানতাম, আমার ছেলে আমাকে কখনো নিরাশ করবে না।
সারোয়ার খানও ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন,
—আগে দুই পরিবারের সঙ্গে কথা হোক। তারপর ধীরে-সুস্থে বাকি সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
নাজনীন সুলতানা ও সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন। কিন্তু বাশার খান নিঃশব্দে বেলার দিকে তাকিয়ে রইলেন।চারপাশে আবার কথাবার্তা শুরু হয়ে গেলো।কিন্তু সেই শব্দগুলো আর বেলার কানে পৌঁছালো না।মনে হলো, চারপাশের সবকিছু হঠাৎ করেই ঝাপসা হয়ে গেছে।
—তুমি যেটা ভালো মনে করবে সেটাই করো, আম্মু।
সায়রের বলা এই একটি বাক্যই যেন বেলার বুকের ভেতর তীরের মতো আ’ঘাত করেছে।
সে এতক্ষণ ধরে যতটা শক্ত হয়ে বসেছিলো, সেই শক্তিটুকুও যেন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে লাগলো।হঠাৎ তার মনে হলো, আর এক মুহূর্তও এখানে বসে থাকলে হয়তো চোখের জল আটকে রাখতে পারবে না।সে খুব ধীরে গ্লাসটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালো।নাজনীন সুলতানা অবাক হয়ে বললেন,
—কী হলো মা? এত তাড়াতাড়ি উঠে যাচ্ছিস?
বেলা মুখ না তুলেই খুব আস্তে বললো,

—খাওয়া হয়ে গেছে, আম্মু।
তার গলাটা অস্বাভাবিক রকমের ভারী শোনালো।কিন্তু কেউ সেটা খেয়াল করলো না।কেউ না।বেলা দ্রুত উঠে দাঁড়ালো।কারও দিকে তাকালোও না। খুব ধীর অথচ তাড়াহুড়ো মেশানো পায়ে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো।ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করতেই এতক্ষণ ধরে শক্ত করে আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা হঠাৎ করেই বেরিয়ে এলো।পিঠটা দরজার সঙ্গে ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়লো সে।চোখদুটো শক্ত করে বন্ধ করে রাখার চেষ্টা করেও পারলো না।দু’ফোঁটা অশ্রু নীরবে গড়িয়ে পড়লো তার গাল বেয়ে।সে দ্রুত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে ফেললো।না কাঁদা যাবে না।এই কষ্ট, এই অভিমান কোনোটারই তো কোনো অধিকার তার নেই।তবুও বুকের ভেতরটা বারবার একই প্রশ্নে উতলে উঠছে,

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৭

—যদি শেষ পর্যন্ত সত্যিই সায়রের পাশে অন্য নারী দাঁড়ায় ।তাহলে আমি কীভাবে নিজেকে সামলাবো? প্রতিদিন তাকে অন্য কারও পাশে দেখে দেখার শক্তি কি আমার আছে? কীভাবে নিজের বুকের ভেতর ভেঙে পড়া এই অনুভূতিগুলোকে লুকিয়ে বেঁচে থাকবো? যে মানুষটাকে নিজের অজান্তেই এতটা ভালোবেসে ফেলেছি, তাকে অন্য কারও হয়ে যেতে দেখার মতো শক্তি কি সত্যিই আমার আছে? নাকি সেদিন আমার ঠোঁটে হাসি থাকলেও, ভেতরে ভেতরে আমি প্রতিটি মুহূর্তে একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে যাবো?

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৯