রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৭
ইয়ুশরা রিমু
বাইকটা ধীরে ধীরে বাড়ির গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলো। বিকেলের শেষ আলো তখন বাগানজুড়ে ছড়িয়ে আছে। বাতাসে শিউলি ফুলের হালকা ঘ্রান।
বেলা তাড়াতাড়ি বাইক থেকে নেমে পড়লো। যেন আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলে কেউ তার বুকের ভেতরের অস্থিরতার শব্দ শুনে ফেলবে। ব্যাগটা কাঁধে তুলে একবারও সায়রের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।ঠিক তখনই সায়রের শান্ত গলা ভেসে এলো,
—এত তাড়া কীসের?
বেলা থামলো, কিন্তু পেছনে ফিরলো না।
—কিছু না।
—কিছু না হলে পালিয়ে যাচ্ছিস কেন?
বেলা এবার ধীরে ঘুরে তাকালো। মুখটা আগের মতোই গম্ভীর করে বলে,
—আমি পালাচ্ছি না।
সায়র বাইকের চাবিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে কয়েক মুহূর্ত ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,
— আচ্ছা, ধীরে ধীরে যাস।
বেলা কোনো উত্তর দিলো না। শুধু ভ্রু কুঁচকে আবার হাঁটতে শুরু করলো।বারান্দায় পা রাখতেই নাজনীন সুলতানা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে সুধালো,
— এসে গেছিস? এত দেরি হলো কেন?
বেলা দ্রুত জবাব দিলো,
—কলেজ থেকে বের হতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিলো আম্মু।
ঠিক তখনই সায়রও ভেতরে ঢুকলো।নাজনীন সুলতানা দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,
—ভালোই হয়েছে, একসঙ্গেই ফিরেছিস। আজকাল রাস্তাঘাটের যা অবস্থা, একা না ফেরাই ভালো।
বেলা স্বস্তিতে চোখ নামিয়ে ফেললো।সায়র শুধু মাথা নেড়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো।দূরের করিডোরে দাঁড়িয়ে সবকিছু নীরবে দেখছিলেন মমতাজ বেগম।সে সায়রদের আগেই বাসায় এসে পড়েছে। তার মুখে কোনো কথা নেই। কিন্তু চোখের দৃষ্টি আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।বেলা মাথা নিচু করে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।
অন্যদিকে, নিজের রুমে ঢুকে শার্ট পাল্টাতে পাল্টাতে সায়রের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠলো। আজ বেলার সাথে সকল মুহুর্ত মনে পড়তেই। বিশেষ করে বাইকের পুরো পথটা মনে পড়তেই অদ্ভুত ভালো লাগে বয়ে গেলো পুরো মন জুড়ে।
তার অজান্তেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মমতাজ বেগমের ছেলের হাবভাব দেখে চোখ মুখ কঠিন হয়ে উঠলো।তিনি দরজার ফাঁক দিয়ে ছেলের মুখের সেই চাপা হাসিটুকু স্পষ্ট দেখলেন।এক মুহূর্তের জন্য তার বুকটা ধক করে উঠলো।সায়রকে তিনি খুব ভালো করেই চেনেন। এই ছেলেটা অকারণে হাসে না। বিশেষ করে কোনো মেয়েকে নিয়ে তো নয়।তার মুখের কঠোরতা আরও গাঢ় হয়ে উঠলো।মনে মনে তিনি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন,
—না, আর দেরি করা যাবে না। এর আগেই আমাকে কিছু একটা করতে হবে।
রাতের খাবার শেষ হতে হতে বাড়িটা আবারও ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। সারাদিনের ব্যস্ততার পর সবাই যে যার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। নাজনীন সুলতানা রান্নাঘর গুছিয়ে নিচ্ছেন, বিহান সোফায় আধশোয়া হয়ে ফোনে ভিডিও দেখছে, আর বেলা করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে ।তার মনটা অদ্ভুতভাবে অস্থির।বিকেলে বাইকে ফেরার পুরো ঘটনাটা বারবার মনে পড়ছে। যতই নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে এসবের কোনো অর্থ নেই, ততই যেন সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো,
— এত রাতে একা দাঁড়িয়ে কী ভাবছিস?
বেলা চমকে ঘুরে তাকালো।সায়র হাতে কফির মগ, পরনে সাদা টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। মুখে সেই স্বাভাবিক শান্ত ভাব।বেলা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে,
— কিছু না।
সায়র বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো।
— সবসময় কিছু না করিস কেন?
— কারণ জিজ্ঞেস করেন খুব বেশি।
— তাই ?
বেলা কোনো উত্তর দিলো না।সায়র মগে চুমুক দিয়ে মৃদু হেসে বললো,
—আজকে কিন্তু পুরো রাস্তা একটা কথাও বলিসনি।
— খুব শান্তি পেয়েছেন নিশ্চয়ই।
— না।
বেলা অবাক হয়ে তাকালো।সায়র খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,
—তুই চুপ থাকলে বাড়িটাও কেমন চুপচাপ লাগে। বেশি কথা না বললে মনে হয় তুই ডিপ্রেশনে আছিস।
কথাটা শুনে বেলার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
—আপনি না মাঝে মাঝে খুব আজব কথা বলেন। আমি কার জন্য বা কিসের জন্য ডিপ্রেশনে থাকবো। উল্টো ডিপ্রেশনে আমাকে নিয়ে ভাবে।
সায়র হেসে ফেললো,
— তা ঠিক।তুই হাসলে বাড়িটা অন্যরকম আলোকসজ্জায় ভরা লাগে। আর তুই চুপ করে থাকলে অদ্ভুত একটা শূন্য শূন্য লাগে।
বেলা কিছু বলতে গিয়েও পারলো না।কথাগুলো এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে, উত্তর খুঁজে পেলো না। সায়র ইদানিং তাকে নিয়ে বড্ড বেশি ভাবে।বেলার আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হলো না।সে আর কোনো কথা না বলে খুব আস্তে বললো,
— আমি রুমে যাচ্ছি।
সায়র শুধু মাথা নাড়িয়ে বলে,
— আচ্ছা। বেশি রাত জাগিস না।
বেলা কোনো উত্তর দিলো না। শুধু খুব ধীরে পা বাড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলোরুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করতেই সে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেললো। পিঠটা দরজার সঙ্গে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।জানালা দিয়ে চাঁদের ম্লান আলো বিছানার ওপর এসে পড়েছে। হালকা বাতাসে পর্দাগুলো দুলছে।বেলা ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে বসলো।আজ সারাদিনে ঘটে যাওয়া প্রতিটা মুহূর্ত যেন একে একে চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো। সব কিছু তার স্বপ্নের মতো লাগছে। যে সায়রের বাইকে উঠে কলেজে যাওয়া ওর ড্রিম ছিলো । আজ যেন খুব সহজেই সে স্বপ্নের পূর্ণতা পেলো।
সকাল আটটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। ডাইনিং টেবিলজুড়ে তখন সকালের চিরচেনা ব্যস্ততা। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম গরম পরোটার ঘ্রাণ। নাজনীন সুলতানা একের পর এক প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন। বিহান আধো ঘুম চোখে বসেই হাই তুলতে তুলতে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। সারোয়ার খান আর বাশার খান খবরের কাগজ ভাঁজ করে পাশে রেখে নাস্তা শুরু করেছেন। পুরো ঘরজুড়ে একেবারে স্বাভাবিক, পরিচিত সকালের পরিবেশ।
কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার মাঝেও একজনের ভেতরে আজ যেন অদ্ভুত এক নিঃশব্দ অস্থিরতা।
বেলা আজও সবার শেষে এসে ধীরে ধীরে নিজের চেয়ারটা টেনে বসলো। মুখে কোনো কথা নেই। চোখদুটো নিচু। যেন আশপাশে কী হচ্ছে, কারা কী বলছে এসবের প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সে শুধু প্লেটে একটা পরোটা আর সামান্য সবজি তুলে নিলো। ছোট ছোট টুকরো করে ছিঁ’ড়ছে।
কিছুক্ষণ পর সায়রও এসে চেয়ার টেনে বসলো।বসার আগে খুব স্বাভাবিকভাবেই একবার চোখ গেল বেলার দিকে। গত ক’দিন ধরে মেয়েটার আচরণে যে অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে, সেটা তার চোখ এড়ায়নি। আজও একই রকম নিশ্চুপ। একই রকম গুটিয়ে থাকা।
বেলা সেই দৃষ্টি টের পেলেও একবারও মুখ তুললো না।
সায়র খুব ধীর নিঃশ্বাস ফেললো। কিছু বলতে গিয়েও বললো না। নীরবে নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইলো।ঠিক তখনই মমতাজ বেগম খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
—কালকে মার্কেটে রুপসার মায়ের সঙ্গে বেশ অনেকক্ষণ কথা হলো।
সারোয়ার খান মুখ তুলে তাকালেন।
—তাই নাকি? কেমন আছেন উনি?
—ভালো আছেন। তবে রুম্পা একটা কথা বলছিল। রুপসাকে তো তোমরা সবাই চেনো। রূপে-গুণে, ব্যবহার-আচরণে সত্যিই অনন্যা একটা মেয়ে।
নাজনীন সুলতানা হালকা হেসে বললেন,
—সেটা ঠিক। মেয়েটা খুব ভদ্র। শিক্ষিত, মার্জিত। বড়দের সম্মান করতে জানে। দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়।
মমতাজ বেগম মাথা নাড়লেন,
—আজকাল এমন মেয়ে খুব একটা দেখা যায় না।
বেলা খুব ধীরে পরোটার একটা ছোট্ট টুকরো ছিঁড়লো।
হাতটা বাইরে থেকে স্বাভাবিকই লাগছে, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করেই অকারণে ভারী হয়ে উঠছে। কেন জানি কথাগুলো শুনতে ভালো লাগছে না। অথচ এমন তো হওয়ার কথা নয়।সে নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করলো,
—এসব নিয়ে আমার ভাবার কী আছে? কিন্তু নিজের মনই যেন তার কথা শুনলো না। রুপসা কে নিয়ে কোনো কথা তার সহ্য হয় না।
মমতাজ বেগম এবার চায়ের কাপে আরেক চুমুক দিয়ে বললেন,
—আসলে আমি একটা কথা ভাবছিলাম। রুম্পাও একই কথা বলছিলো।
বিহান আগ্রহ নিয়ে তাকালো।
—কী কথা?
মমতাজ বেগম এবার সোজা সায়রের দিকে তাকালেন,
—সায়রের বয়স তো কম হলো না। আমার মনে হয়, রুপসার মতো মেয়ে এই বাড়ির বউ হলে খুব ভালো মানাবে। সত্যি বলতে কী, রুপসার মতো মেয়েই এই বাড়ির বউ হওয়ার যোগ্য।আর সায়র আর রুপসাও দুজন দুজনকে বহু বছর ধরে চেনে।
কথাটা বলেই তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে আবার পরোটা ছিঁড়তে লাগলেন।কিন্তু সেই একটুকরো বাক্য যেন নিঃশব্দে পুরো ডাইনিং রুমকে স্তব্ধ করে দিলো।বেলার হাতে ধরা চামচটা মাঝপথেই থেমে গেলো।চোখের পাতা খুব আস্তে কেঁপে উঠলো।কেউ বুঝলো না।কেউ দেখলো না।শুধু তার বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে গেলো।মনে হলো, কেউ অদৃশ্যভাবে এসে বুকের ঠিক মাঝখানে একটা ভারী পাথর চাপিয়ে দিয়েছে।সে মাথা আরও নিচু করে ফেললো।চোখের সামনে প্লেটটা ঝাপসা হয়ে আসছে।কেন?কেন এমন হচ্ছে?সে কি কাঁদতে চাইছে?না তার কাঁদার কোনো অধিকার নেই।নিজেকেই মনে মনে ধমক দিলো সে,
—তুই এমন কেন অনুভব করছিস? তোর কষ্ট পাওয়ার কী আছে? ঠিকই তো বলেছে রুপসা ই সায়রের জীবনসঙ্গী হিসেবে যোগ্য। তুই তো একটা বাঁচাল ,অসভ্য মেয়ে । সায়র তোকে এগুলোই বলে। তোর মতো মেয়েকে সায়র ভাই কেন বিয়ে করবে? নিছক স্বপ্ন বুনিস অন্তরে। এবার দেখ কেমন লাগে।
কিন্তু যতই নিজেকে বোঝাতে চাইছে, বুকের ভেতরের চাপাটা ততই বাড়ছে।সারোয়ার খান শান্ত গলায় বললেন,
—এসব বিষয়ে আগে সায়রের মতামত নেওয়াই উচিত।
মমতাজ বেগম দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
—মতামত অবশ্যই নেব। কিন্তু মা হিসেবে আমি এটুকু বুঝি, কোন মেয়ে আমার ছেলের জন্য ভালো হবে। আর সায়রও আমি যা বলবো, সেটাই মানবে।
তিনি একটু থামলেন।তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—রুপসাকে আমরা অনেকদিন ধরেই দেখছি। ওর পরিবার, শিক্ষাদীক্ষা, ব্যবহার সবকিছুই আমাদের সঙ্গে মানানসই। এমন মেয়ে সহজে পাওয়া যায় না। সময় থাকতে ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
নাজনীন সুলতানা মৃদু হেসে বললেন,
—আমারও মেয়েটাকে খুব ভালো লাগে।
বাশার খান নিঃশব্দে শুনে গেলেন সকল কথা। চাচা হিসেবে কোনো মতামত দিলেন না।
মমতাজ বেগম এবার আরও দৃঢ় গলায় বললেন,
—আমি চাই, যত দ্রুত সম্ভব ওদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হোক। শুভ কাজে দেরি করতে চাই না।
এই কথাটুকু যেন সরাসরি এসে বেলার হৃদয়ে আ”ঘাত করলো।সে ধীরে ধীরে পরোটার টুকরোটা মুখে দিলো।কিন্তু গিলতে গিয়েই মনে হলো গলায় যেন কাঁ’টার মতো কিছু আটকে গেছে।পানি খেলো।তবুও কষ্টটা কমলো না।
খাবারের কোনো স্বাদই সে আর অনুভব করতে পারছে না।তার চোখদুটো অদ্ভুতভাবে জ্বা’লা করছে।মনে হচ্ছে, আর এক সেকেন্ড এখানে বসে থাকলে হয়তো চোখের পানি সামলাতে পারবে না।সে প্রাণপণে নিজেকে সামলে রাখলো।কারও সামনে দুর্বল হওয়া যাবে না।কেউ যেন কিছু বুঝতে না পারে।কিন্তু অজান্তেই তার আঙুলগুলো গ্লাসের গায়ে এত জোরে চেপে বসেছে যে আঙুলের গিঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে।তার শ্বাস-প্রশ্বাসও আগের তুলনায় ভারী হয়ে গেছে।চারপাশে সবাই এখনও স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছে।কেউ তার ভেতরের ঝড়টা দেখতে পেলো না।শুধু একজন ছাড়া।সায়র।প্রথম থেকেই সে খুব কম কথা বলছিলো।কিন্তু এখন তার পুরো মনোযোগটাই বেলার দিকে।সে লক্ষ্য করলো বেলা খাচ্ছে না।শুধু খাবার নাড়াচাড়া করছে।মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে।
সায়রের ভ্রু অদৃশ্যভাবে কুঁচকে উঠলো।তার মনে হলো,
–মেয়েটা কি কাঁদছে?
না, সে তো মুখই তুলছে না।তবু কেন যেন তার মনে হচ্ছে, বেলা নিজের ভেতরে ভেঙে পড়ছে।অদ্ভুত এক অস্থিরতা সায়রের বুকেও ধীরে ধীরে জমতে লাগলো।
মমতাজ বেগমের প্রতিটা কথার পরই সে একবার করে বেলার দিকে তাকাচ্ছিলো।আর প্রতিবারই বেলাকে আগের চেয়ে একটু বেশি নিস্তেজ লাগছে। তাহলে সে যা ভেবেছিলো তাই বেলা সায়কে পছন্দ করে।এটি সে পুরোপুরি নিশ্চিত হলো।
হঠাৎ বেলা খুব ধীরে গ্লাসটা নামিয়ে রাখলো।নিজেকে জোর করে সামলে ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি আনার চেষ্টা করলো।সেই হাসিটা এতটাই কৃত্রিম ছিল যে, বাইরে থেকে না বোঝা গেলেও সায়রের চোখ এড়ালো না।খুব আস্তে বললো,
—আমি কলেজে যাচ্ছি।
নাজনীন সুলতানা বিস্মিত হয়ে বললেন,
—এই তো সবে বসেছিস! এতটুকু খেয়ে কীভাবে যাবি মা? আর সায়র তো যাচ্ছে, ওর সঙ্গেই যা। তুই একা গেলে আমি চিন্তায় থাকি।
বেলা মাথা নাড়িয়ে বলে,
—খিদে নেই। পরে কিছু খেয়ে নেব। আমি রিকশায় চলে যাব। বাইকে আমি ঠিকমতো বসতে পারি না।
— শরীর খারাপ লাগছে নাকি ? খিদে নেই কেন?
বেলা এক মুহূর্ত থেমে খুব আস্তে বললো,
–না আমি ঠিক আছি।
মিথ্যেটা উচ্চারণ করতেই বুকের ভেতরটা আরও মোচড় দিয়ে উঠলো।সে ঠিক নেই।একদমই ভালো নেই।কিন্তু সেটা বলার মতো মানুষ কি এই মুহূর্তে তার আছে?সে দ্রুত ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলো।কারও দিকে তাকালো না।বিশেষ করে সায়রের দিকেও নয়।কারণ সে জানে, একবার যদি সেই চোখদুটোর দিকে তাকায়, তাহলে হয়তো এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা চোখের পানিটা আর ধরে রাখতে পারবে না।ধীর পায়ে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে গেল বেলা।
সায়রের চোখ দরজার দিকেই স্থির রইলো।বেলা যতক্ষণ না চোখের আড়াল হলো, ততক্ষণ সে একবারও অন্যদিকে তাকালো না।
সারোয়ার খান সায়রের উদ্দেশ্য বললো,
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৬
— সায়র তোর কি মতামত বল?
সায়র তড়িঘড়ি হয়ে উঠে বললো,
— কলেজ থেকে ফিরি তারপর এই বিষয়ে কথা বলবো।আমি যাই কেমন?বেলা একা একা চলে যাবে না হয়। আজকালকার যুগের অবস্থা তো জানোই মেয়েদের জন্য কতটা রি’স্ক রাস্তাঘাটে। মেয়েটা কেমন ঘাড়ত্যাড়া জানোই তো । যদি পারি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আমার সঙ্গেই নিয়ে যাব। দেখি যদি রাস্তায় কোথাও পাই।শেষ কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাইকের চাবিটা হাতে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল সায়র।
