রাগে অনুরাগে পর্ব ১৫
সুহাসিনি ফাতেহা
এর ভেতরে আরো দুদিন কেটে গেছে। আজকে বুধবার। দশটা থেকে তিতলির পরিক্ষা শুরু হবে। সকাল সকাল উঠে সব পড়া রিভিশন দিতে শুরু করেছে। ইংরেজি প্রথম পত্র। তিতলির কাছে মোটামোটি ভালোই লাগে। এক ফাঁকে আলেয়া শেখ চা দিয়ে গেছেন। তিতলি চায়ে চুমুক বসিয়ে পড়াশোনায় বিভোর। ঘড়ির কাঁটা নয়টা দশে যেতেই তৈরি হয়ে নিলো। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুঁছিয়ে ফাইল হাতে নিয়ে নিচে নেমে এসেছে। সে আজ যাবে তৌসিফ শেখের সাথে। তুষারের জরুরী কাজ থাকায় সকাল সকাল অফিসে চলে গেছে। মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৌসিফ শেখ বসে আছেন। তিতলি নিচে নেমে আসতেই সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাবা মেয়ে বাড়ি থেকে বের হলো। তৌসিফ শেখ মেয়েকে বললেন,
প্রিপ্রারেশন কেমন আম্মু? ‘
তিতলি মনে মনে ফারাজের কথা ভাবছিলো। সেদিন ফেসবুকে পোস্ট করার পর আর ফেসবুকে ডুকে নি। কলেজেও যায় নি। তিতলির এবার সত্যি ডাইরিয়া হয়েছিলো। তাই দুদিন যায় নি। ঘরে বসেই পড়াশোনা করেছে। বাবার কথায় মুচকি হেসে বলল,
-‘ ভালো আব্বু । ‘
-‘ ঠান্ডা মাথায় পরিক্ষা দিবে। ‘
-‘ জ্বি। ‘—— তিতলি বাবার কাছে বায়না ধরে বসলো,
যদি পরিক্ষায় ভালো করি একটা আইফোন কিনে দিবে আব্বু্!
ঠিক আছে! ভালোভাবে পরিক্ষা দিবে। রেজাল্ট ভালো হলে যা চাও তাই কিনে দিবো আম্মু!
তিতলির খুশিতে তর সইছে না। তার আব্বু এত ভালো কেন? পড়ালেখার বিষয়ে যদিও কড়াকড়ি দেয়। কিন্তু তিতলির কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রাখে না। এ জন্য তিতলি বাবাকে একটু বেশিই ভালোবাসে। তিতলির চিত্ত প্রফুল্ল,
আমার সুপার হিরো আব্বু!
তৌসিফ শেখ হাসলেন। গম্ভীর মুখে যেন তার মেয়েই হাসি ফুটাতে পারে। মাঝেমধ্যে অবসর সময়ে তিনি একটু হাসার জন্য মেয়ের সাথে গল্প করেন। এটা ওনার অভ্যাস।
তিতলি কলেজে পৌঁছাতে ঘড়ির টাইম ৯:৩০ মিনিট হলো । কলেজ বাড়ি থেকে তেমন একটা দূরে নয়। হেটে যেতে ত্রিশ মিনিট সময় লাগে। আর গাড়ি করে দশ মিনিটের রাস্তা। তৌসিফ শেখ মেয়েকে দিয়ে চলে গেলেন। তিতলি নিধি আর সিয়ামের সাথে ক্লাসে হেটে হেটে নিজেদের সিট খুঁজে নিলো। তিতলির সিট পড়লো তৃতীয় বেঞ্চে তিতলির খুউব দুঃখ লাগতেছে। তার পেছনে আবার সিয়াম পড়েছে। আজকে এই সিয়ামের জ্বালায় পরিক্ষা দিতে পারে কিনা সন্দেহ।
ঘন্টা বসতে আর বিশ মিনিট বাকি।
তিতলিরা করিডোরের মধ্যস্থে দাড়িয়ে আছে।
নিধি তিতলিকে অসহায় কণ্ঠে বলল,
কি কি শিখছোস? আমি তো সব ভুলে যাইতেছি রে! বাড়ি থেকে সব শিখে আসলাম। কিন্তু এখন যেন সব মাথার উপর দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে।
সিয়াম দাঁত বের করে হেসে নিধিকে বলল,
আমি নকল এনেছি। তুই চাইলে তোকে দেখাবো।
বাবা তোর নকল দেখার চেয়ে নিজে যা পারি তা লেখায় ভালো। পরে স্যারে পেপার সহ নিয়ে যাবে।
আরে স্যার কি দেখবে নে? স্যারেরা হচ্ছে কানা শুধু মেয়েদের দিকে চোখ দেয়। আমার দিকে চোখ দিলেই তো দেখতো।
তিতলি এতক্ষণ ওদের কথা শুনছে। এবার সে ও বলল,
“একদম ঠিক বলেছিস! স্যারদের কাজ মেয়ে কোনটা লিপিস্টিক দিছে কোনটা হাতে ঘড়ি দিছে এসব খুঁজে বেরানো। তুই কাজ টা খারাপ করিস নি ভালোই করেছ……”
তিতলির কথা আটকে যায়। কলেজের মাঠের বাইক রাখা জায়গায় বাইক থামিয়ে মাথা থেকে হেলমেট খুলছে ভাল্লুক ফারাজ স্যার। পরনে ধূসর রঙা শার্ট কালো প্যান্টে এই দৃশ্যটা দাড়ুন লাগতেছে। তিতলি মাঝেমধ্যে ভাবে মানুষটা এত সুন্দর কেন? কোনো মুভি দেখলে মুভির নায়ক কে ফারাজ নায়িকা কে নিজে ভাবতে থাকে মেয়েটা। কিন্তু পরক্ষনেই নিজের চোখ এমন ভাবে ঘুরিয়ে নিলো। যেন সে কোনো ফারাজের দিকে তাকায় নি।
নিধি সেটা দেখে বলল,
“আজকে মনে হয় স্যারকে বেশি সুন্দর লাগছে তাই না বেইবি?”
“মোটাও না ভাল্লুকের মতো লাগছে! ”
বাইক রেখে ঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে আসার সময় কথাটা কানে এলো ফারাজের। সাথে সাথেই চোখ তুললো উপরে। বেয়াদব মেয়েটাকে যে কথাটা তাকে বলছে এটা আর বুঝার উপায় নেই। রাগে চোয়াল শক্ত করে ফেলল মুহূর্তেই। একা পেলে বুঝাতে ভাল্লুক কি কি করতে পারে। কিছু বলবে নাকি এখন? বললেও তো উত্তর দেয় না! ফারাজের আজকাল কোনো কারণ ছাড়ায় শুধু রাগ হতে থাকে। রাগের একটাই কারণ এই প্রথম কেউ তাকে ইগনোর করছে! তাও এই বেয়াদব মেয়েটা! সে তো এর শেষ দেখেই ছাড়বে আর যদি হয় সেটা অকল্পনীয় কোনো কাজ তবে সে কাজই করবে। রেগে গিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
“ইগনোর কর! সমস্যা নাই যত ইচ্ছে উড়! তোর এই উড়ার সময়সীমা আর বেশিদিন পাবি না। যে ডানা দিয়ে উড়িস সে ডানার পাখনা ভেঙে ছাঁটায় করে দিবো।”
রাগে হিসফিস করতে করতে যুবক সিড়ি বেয়ে অফিসে চলে গেলো।
স্যার মনে হয় তোর কথা শুনতে পেয়েছে!
শুনলে আমার কি? যদি মনে করে আমি উনাকে বলেছি তাহলে উনি নিজেই মানে আসলে উনি একটা ভাল্লুক!
তুইও না একটা মেয়ে! সেদিন এটা কি পোস্ট করছিস? আমি তো দেখে দু ঘন্টার জন্য কোমায় চলে গেছিলাম।
সিয়াম মাঝখান থেকে বলল
এখনও কোমায় থাকতি! তাহলে আর কষ্ট করে পরিক্ষা দেওয়া লাগতো না।
ওদের কথার মাঝেই ঘন্টা বসে গেলো। সবাই ক্লাসে চলে গেল।
পরিক্ষা চলতেছে। ফারাজ স্যার হলে পড়ে নি। অন্য হলে পড়েছে। এ জন্য তিতলি না লিখে বসে বসে কিছুক্ষণ দুঃখ করলো। ভাবলো ভাল্লুক স্যার ক্লাসে আসবে আর সে ভাব নিয়ে থাকবে।
এই ভুটকি দুই নাম্বারে কি হবে? একটু দেখাস না
সিয়াম শুধু তিতলিকে পেছন থেকে খোঁচাচ্ছে। তিতলি বিরক্ত হয়ে বারবার পেছনে ঘুরছে। এবার রেগে গিয়ে বলল,
আমি কি জানি দুই নাম্বারে কি হবে? না পারলে বসে বসে ললিপপ খা।
দেখাবি নাকি!
দেখাবো না
দেখা
নাহহহ
দেখা বোইন নো আমার। আর একটু দেখা
ওখানে কি হচ্ছে এসব! —– ধমকের স্বরে বলতে বলতে যুবক এগিয়ে এলেন। সপ্তাদশী ভয়ে কেঁপে উঠলো। কণ্ঠসুর চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না। এই ভাল্লুক এখানে কি করছে? কই এতক্ষণ তো আসে নি তিতলি একদম ভদ্র হয়ে গেলো। উপরে তো তাকালোই না। মনেযোগ দিয়ে লিখছে।
যুবক এসে তিতলির বেঞ্চের পাশে দাড়িয়ে থাকলো। সিয়াম সাথে সাথে ও সোজা হয়ে গেলো।
ফারাজ গম্ভীরর কণ্ঠে বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ১৪
না লেখে কি নিয়ে কথা হচ্ছে?
তিতলি উত্তর দেয় না। সিয়াম ভদ্র হয়ে বলল,
কিছু না স্যার! আসলে আমার প্রশ্ন টা উড়ে ওর বেঞ্চের নিচে পড়ে গেয়েছিলো তো তাই।
ফারাজ তিতলির পাশে দাড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে…..”
