Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ১৩

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৩

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৩
সুহাসিনি ফাতেহা

নাস্তা করা শেষে তিতলি সোজা নিজের রুমে চলে এলো। মন মেজাজ সব খারাপ! শেষে কিনা তার ভাই ভাল্লুক স্যারের সাথে কথা বলবে। যদি বলে কলেজে নাকি ভাল্লুক আছে? এটা শুনলে নিশ্চয় ওই লোক তার ভাইকে সব বলে দিবে? তিতলি এটা কিছুতেই হতে দিবে না। রুমের এপাশ-ওপাশ পায়চারি শুরু করল। পরক্ষনেই কিছু একটা ভেবে ভাইয়ের রুমের উদ্দেশ্য গেলো।
তুষারের রুমের সামনে থেমে ভেতরে উঁকি দিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,
“ভাইয়া ও ভাইয়া….”
না সাড়া নেই। আজকে শুক্রবার হওয়ায় অফিস কলেজ সব বন্ধ। বাবা হয়তো বাজারে গেছে। ভাইয়ের রুমে থাকার কথা। তিতলি আবার ডাকতে যাবে ঠিক তখনি মাথায় টোকা অনুভব করলো। মেয়েটা ভরকায়! হচকচিয়ে উঠে বলল,

“উফফ মাথায় টোকা দিলো কেরে”
তুষার বোনের দিকে তাকিয়ে সন্দেহের গলায় বলে,
“আমার রুমের ভেতরে এভাবে কি দেখছিস?”
তিতলি ঠোঁঠের কোণে হাসি ফুঁটালো। ভাইকে হাতের মুঠোয় করার টিপস করতে হবে। যাতে ভাই কিছুতেই ফারাজের কাছে না যায়। নরম তুলতুলে কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে খুঁজছিলাম ভাইয়া। ”
তুষারের বোনের মতিগতি ঠিক লাগছে না।
তাও সন্দেহের গলায় বলল,
“তো বল কি বলবি ?”—- বলতে বলতে তুষার রুমের ভেতর ডুকে গেলেন।
তিতলিও পেছন পেছন পেছন ডুকতে ডুকতে বলল,
“আসলে ভাইয়া আমি মজা করছিলাম কলেজে কোনো ভাল্লুক নেই।”
“কি বলতে চাস ক্লিয়ার করে বল?”
তিতলি কি বলবে আগে থেকেই ভেবে রেখেছিল। তাই ইনিয়েবিনিয়ে মিনমিন করে বলল,
“ভাল্লু….অর্ধেক বলতে গিয়ে থেমে গেলো মেয়েটা। ঢোক গিলে ফের বলল,
“ফারাজ স্যারের সাথে কথা বলা লাগবে না। ফারাজ স্যার আমাদের কোনো ক্লাসই করায় না।”
“তো এখন? তাহলে কোন স্যার ক্লাস করায় তার নাম বল?”
তিতলি জানে তার ভাই অনেক চালাক! যদি তার মিথ্যা কথা ধরে ফেলে তাহলে সর্বনাশ!
তাই সে বলল,

“বলতেছি আমি নিজে থেকেই কলেজে যাবো হে। তোমাকে যাওয়া লাগবে না।”
“এইতো এবার বুদ্ধিমানের মতো কথা বললি? আমি তো আরো ভাবছিলাম জ্বরের ঘোরে আজেবাজে বকছিস?”
মেয়েটা স্বস্থির নিশ্বাস ছেড়ে কথা ঘুরিয়ে বলল,
“আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে ভাইয়া? নিধিও সাথে যাবে? প্লিজ না বলো না। একা একা ভালো লাগে না আজকে তো তোমার অফিস বন্ধ।”
তুষার বোনের আবদার ফেলতে পারে না। আসলে বোনকে ঘুরিয়ে আনলে মন্দ হয় না।
তাই গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“রেডি হয়ে থাকিস বিকেলে।”
“নিধিও যাবে ভাইয়া।”
” গেলে যাবে।”
তিতলি খুশি মনে রুমে চলে আসে।

বিকেল প্রায় তিনটা বাজে। তিতলি রেড, এমব্রয়েডারি করা কূর্তি-পাজামা পড়েছে। আয়নার সামনে দাড়িয়ে মুখে হালকা মেকআপ দিচ্ছে তখনি ফোন বেজে উঠে! স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে নিধি ভিডিও কল করেছে। ও ফোন তুলে সাউন্ড বাড়িয়ে দিয়ে ড্রেসিন টেবিলের সামনে রেখে ঠোঁঠে একটু লিপবাম দিতে দিতে বলল,
“রেডি হয়েছিস? ”
“আমি রেডি গেছি। বলে তিতলির সাজগোজ দেখে নিধি বলল,
“তুই মনে হয় ফারাজ স্যার কে ভুলে গেছিস। এত্ত ভালোবাসা কই গেলো রে? আমি তো ভাবছিলাম তুই আর এই জনমে ভুলতে পারবি না।”
“যে আমাকে তো দেখতে পারে না তাকে মনে করে আমি ফ্লোরে পড়ে কাঁদবো নাকি ? তোর মন চাইলে আমার বদলে তুই কাঁদ । আমার কি?”
নিধি: “ফারাজ স্যার ক্লাসে তুকে খুঁজেছে।”
তিতলি হাসার ভার ধরলো। সে একদম ফারাজের জন্য কষ্ট পাবে না কাঁদবে না। ভুলে যাবে। তাই বলল,
” এত দরদ বেড়ে গেলো। ডং দেখে বাঁচি না।”
নিধি হতাশ ভঙ্গিতে বলল,

“এবার তাহলে একটু বুদ্ধি টুদ্ধি হয়েছে তোর। ”
“এই তিতলি রেডি হয়েছিস?”
তিতলি যখন নিধি কে কথাটা বলল প্রশ্নটা ধেয়ে এলো তখনি। মেয়েটা কল কেটে দিয়ে দরজা খোলে দিলো।
“আমি রেডি ভাইয়া।”
তুষার একবার বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চল।”
সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো। নিধি ওদের বাড়ির রাস্তায় দাড়াবে। সেখান থেকে উঠবে। গাড়ি একটানে নিধিদের রাস্তায় থামতেই তুষার গাড়ি থামালো।
নিধি দাড়িয়ে আছে তিতলির মতো করে সামান্য সেজেছে। আড়চোখে মেয়েটা তুষারের দিকে তাকালো। তুষার গাড়ি থেকে নেমে পেছনের দরজা খোলে দিয়ে বলল,
“কেমন আছো নিধি?”
“ভালো আপনি কেমন আছেন ভাইয়া?”
“ভালো।”
নিধি গাড়িতে উঠতেই তুষার উঠে গাড়ি স্টার্ট দিলো।

পার্কে বসে তিতলি আর নিধি ফুঁচকা খাচ্ছে। তুষার তাদের পাশেই দাড়িয়ে আছে। নিধি হঠাৎ করেই তুষারের উদ্দেশ্য বলল,
“আপনি খাবেন ভাইয়া? ”
“না আমি এসব আনহেলদি খাবার খায় না তোমরা খাও।”
তিতলি চোখ তুলে তাকালো। ঝালে মেয়েটার চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। তাও খাচ্ছে। হঠাৎ চোখ গেলো কিছুটা দূরে চেনা চেনা কেউ একজন দু হাত প্যাকেটে গুঁজে তার দিকে তাকিয়ে আছে । মেয়েটার চিনতে অসুবিধা হয় না। তিতলি তাকাতেই অন্যদিকে ঘুরে গেলো। তবে সেখানেই দাঁড়ানো। তিতলি পাত্তা দেয় না। সে ফারাজ নামে কাউকে চিনে না। এই পুরুষের পেছনে তিতলি আর দৌড়াবে না। মনে হয় ফারিন ম্যাডামের সাথে ঘুরতে এসেছে ? আসুক! তিতলির কিছু আসবে যাবে না।
তিতলির ভাবনার মাঝেই নিধি অবাক হয়ে বলল,

“এই দেখ এটা ফারাজ স্যার না?”
“তো আমি কি করবো? আমাকে কেন বলছিস?”
“এখানে কি করছে ?”
” ফারিন ম্যাডাম কে নিয়ে ঘুরতে এসেছে।”
“আহারে আমার বান্ধুবি টা অকালে ছ্যাকা খাইলো।”
“আমি ছ্যাকা খায়না বুঝছিস? আমি ছ্যাকা দি!”
“তাহলে তুই ফারাজ স্যারকে ছ্যাকা দিছোস?”
তিতলি কিছু না বলে তুষার কে বলল,
“ভাইয়া একটু পানি খাবো।”
তুষার ফুচকা মামা কে বলল,
“ভাই আপনার কাছে পানি আছে?”
“পানি তো শেষ হয়ে গেছে ভাই । ওদিকে গেলে পাবেন।”
তুষার তিতলিদের সাবধানতার হুকুম দিলো,
“এখানে দাড়া একটু্ও নড়বি না। আমি ওদিক থেকে নিয়ে আসি। ওদিকে গিয়ে তুষারের সাথে দেখা মিললো ফারাজের। তুষারের ভদ্রতায় জিজ্ঞেস করলো,

“কি খবর ভাই? আপনি এখানে?”
“এমনি ঘুরতে আসলাম। তুমি এখানে কি করছো?”
ফারাজ এমন ভাবে প্রশ্ন করলো যেন সে এখন তুষার কে দেখেছে।
তুষার বলল,
“আসলে তিতলিকে নিয়ে এসেছি।”
“ওহ! ”
তুষার কিছুক্ষণ পর বলল,
“ভাই তিতলি পড়ালেখায় মনেযোগ দিচ্ছে তো? দুদিন জ্বর থাকায় যেতে ও পারে নি। কাল গেলে আগের পড়া গুলো একটু নোট করে দিয়েন।”
ফারাজ ঘাঁড় ঘুরিয়ে সরাসরি মেয়েটার মুখ পানে চাইলো। বড় শীতল সে চাহনী। মুখটা আগের চেয়ে শুকনো শুকনো লাগছে? তাকে দেখেও দেখছে না যেন। তাকাচ্ছে না। ফারাজের ভীষন রাগ হলো। অজানা কারণে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
“না কোনো সমস্যা নেই। ” করে দিবো। ”
“আচ্ছা ভাই তাহলে যায়। ভালো থাকবেন।”
তুষার পানির বোতল নিয়ে সেখান থেকে চলে আসলো।

পরেরদিন তিতলি কে তুষার কলেজে নিয়ে এলো। তিতলি কাল এত করে বলল তাও এলো। তিতলির খুব ভয় করছে। যার সামনে পড়তে চাই না তার সামনে কেন তাকে বারবার পড়তে হয়। থাক পড়লে পড়বে কিন্তু তিতলি কোনো কথা বলবে না। তুষার অফিসে যাবে তাই একটু সকালই এসেছে তেমন ছাত্রছাত্রী আসে নি।
হাঁটতে হাঁটতে তুষার তিতলিকে বলল,
“আর যদি শুনি তুই কলেজ ফাঁকি দিচ্ছিস সোজা বিয়ে দিয়ে দিবো।”
“তোমাকে কে বলছে আমি কলেজ ফাঁকি দি? আমি কখনো কলেজ ফাঁকি দি নাই এসব মিথ্যা কথা তোমাকে কে বলে?”
“আমি না শুনলে বলি! তুই নাকি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পুকুরের আমতলায় এসে বসে থাকিস?”
তিতলি কিছু বলার কথা খোঁজে পেলো না। আসলে সে ক্লাস ফাঁকি দিয়েছে। তাও শিকার করা যাবে না।
তাই বলল,
“যে বলছে সে নিজেই ক্লাস ফাঁকি দেয়।”
“ফারাজ ভাই আসলে তার কাছে যাবি। ভাই তোকে গত দু দিনের নোট দিবে।
তিতলির মুখটা অন্ধকার হয়ে গেলো। সবাই তার শক্র। কেউ তাকে বুঝে না। শুধু ভাল্লুকের কাছে পাঠায়। তিতলি ওই লোকের থেকে কোনো নোট নিবে না। শুধু যাওয়ার ভান করবে। নোট টা নিয়ে ময়লার ড্রেনে ফেলে দিবে। একদম নিবে না।

“এবার তুই যা আমার অফিসের লেট হয়ে যাচ্ছে। বলে তুষার চলে গেলো।”
তিতলি এদিক ওদিক তাকিয়ে কলেজের করিডোরে ঢুকলো। কোথায় ও তেমন কাউকে দেখছে না। এত সকাল কলেজে আসার কোনো মানেই হয় না। নিধিদের বাড়িতে গেলে মন্দ হয় না। তিতলি ঘুরতে গেল,সহসা কারো প্রসস্থ বুকে ঠুকে গেল নাকটা। মেয়েটা থমকালো ভরকালো। হচকচিয়ে পড়তে নেয় ফ্লোরে। ত্রস্ত ডান হাতটা টেনে ধরলো যুবক। টালমাটাল তিতলিকে সোজা দাঁড় করিয়ে বলে,

রাগে অনুরাগে পর্ব ১২

“সামান্য ধাক্কা সামলাতে পারো না আবার আমাকে সামলানোর চিন্তা ভাবনা মাথায় আসে কিভাবে?”
তিতলি নাক ডলছে। এত লেগেছে এখানে। তবে ওমন কণ্ঠ কানে আসতেই মেয়েটা মাথা নত করে ফেললো। সে প্রতিজ্ঞা করেছে মানে সে কোনো ফারাজ টারাজের দিকে তাকাবে না। একদম তাকাবে না। তাই পাশ কাটিয়ে চলে যায়। অজানা কারণ বসত ফারাজের মস্তিষ্ক জ্বলে উঠল। মুহুর্তেই তিতলির সামনে চলে এলো। শক্ত মেজাজে দাঁতে দাঁত চাপলো। তার পাতলা ঠোঁট জোড়া কাঁপছে ধমক দেবার জন্য। গলায় ধমক আটকে রেখে হুকুম ছাড়লো,
“আমার কথা না শুনে আর এক পা সামনে এগানোর সাহস করো না। আমার চোখের দিকে তাকাও! যা জিজ্ঞেস করবো উত্তর দাও ।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here