রাগে অনুরাগে পর্ব ১১
সুহাসিনি ফাতেহা
তিতলি পিছনে ফিরছে না। সে সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকবে। মুখ দেখাবে না। একদম দেখাবে না। এতক্ষণ যখন সে বারবার হেটে যাচ্ছিলো আসছিল তখন কি তাকিয়েছে? তিতলিও এখন তাকাবে না। অশ্রুসিক্ত নয়নে মেঝেতে তাকিয়ে নাক ফুসছে। অভিমানে মেয়েটার কন্ঠ আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে এলো,
”হাত ছাড়ুন।” আমার হাত ধরেছেন কেন?”
ফারাজ শুনলো,কি না কে–জানে। তৎক্ষণাৎ তিতলির হাত আরো জোড়ে চেপে ধরে
শক্ত মেজাজে বলল,
”পিচ্চি বয়সে মোবাইল হাতে কে দিয়েছে?”
”যে দিবেই দিক! আপনার কি? আপনি কি কিনে দিয়েছেন?”
ফারাজ বিরবির করে বললো,
”ছোট মরিচের ঝাঁঝ বেশি!”
”ব্যাথা পাই ছাড়ুন, ছাড়ুন ! আমি….আমি কিন্তু…”
”আমি কিন্তু কি? কি করবেন? ইঁদুরের দাঁত দিয়ে কা*মড় বসাবেন?”
তিতলি মূহুর্তেই ঘুরে তাকাল। তার চোখজোড়া লাল হয়ে গিয়েছে। হিসফিস করছে মুখশ্রী। ফারাজের দিকে তাকাচ্ছে না। একদম তাকাবে না! তবে শক্ত হাতের মুঠোয় ধরে রাখা নিজের হাতটার দিকে চেয়ে বলল,
”ছাড়ুন! আপনি ফারিন টারিন ম্যাডামের কাছে যান! আমাকে যেতে দিন!”
”এভাবে সাপের মতো ফেনা তুলছেন কেন? দেখতে বিচ্ছিরি লাগছে তো!”
তিতলির খুব কান্না পেলো। তাকে বিচ্ছিরি লাগবে তো? ফারিন ম্যাডাম আছে না। অভিমানে নাক টানলো। পিটপিট করছে আঁখিদুটি! মুখ খুললেই যেন কেঁদে দিবে ওমন ভাবে বলল,
”আপনার ওসব মেয়ে ভালো লাগে ৷ আমাকে ভালো লাগে না৷ আমাকে একটুও দেখতে পারেন না। ”
ফারাজ মেয়েটার নত মুখখানার পানে চাইলো সরাসরি। ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
”আপনার আব্বুকে বলবো এসব ।”
তিতলি ভয় পেয়ে গেল। যদি সত্যি আব্বুকে এসব বলে তিতলি অনেক কষ্ট পাবে। আব্বু অনেক বকা দিবে! তিতলি ভয়ে ভয়ে বলল,
” না…না …আর বলবো না হ্যাঁ? এগুলো একদম বলবো না৷ আপনি বাবাকে কিছুই বলিয়েন না। আর আপনার কাছে আসবো না। এবার আমার হাতটা ছাড়ুন!”
ফারাজ ধীর স্বরে ধমকে উঠলো,
”পিচ্চি মেয়ে পিচ্চির মতো থাকবে। বড়দের মুখের উপর তর্ক করবে মুখ সেলাই করে বন্ধ করে দিবো।”
তিতলি ত্যাড়া জবাব দিলো,
— ”৫০০ বার তর্ক করবো। আপনার সমস্যা?”
—”সমস্যা!”
—”আমি তর্ক করবো।”
—”করবেন না।”
—”করবো।”
—”নাথিং!”
”করবো মানে করবো।”
”সবার সাথে কি এভাবে বেয়াদবি করে বেড়ান?”
তিতলির সহজ সরল স্বীকারোক্তি,
” নাহহ! শুধু আপনার সাথে করি!” আপনি খুউব খারাপ লোক! আমাকে শুধু ধমক দেন! তাই আপনার সাথে করি! করবো!
ফারাজ কপালে সূক্ষ্ণ ভাজ নিয়ে তাকিয়ে আছে। দৃঢ় তার চাহনি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে অতঃপর গম্ভীর সুরে বলল,
”আমার সাথেও কেন করবে?”
অভিমানী তিতলি আঁড়চোখে চোখ তুলে তাকালো।
আসলে লোকটা তাকে দেখতে পারে না।
বুঝে ও না! ফারিন ম্যাডামের কাছে যাবে। তিতলি ও দেখতে পারবে না আজকে থেকে। শুধু ত্যাড়া কথা বলবে,
”আমি বলবো নাকি বলবো না সেটা আমার ব্যপার।’
”এত সকাল করে কলেজে কেন এসেছো?”
”কলেজের সুন্দর সুন্দর সিনিয়র ভাইয়াদের সাথে প্রেম করতে এসেছি ? আপনার সমস্যা? আপনি ফারিন….”
সম্পুর্ন কথা বলার পূর্বেই তিতলি একপ্রকার নিজের হাত টা টেনে হিঁচরে ফারাজের হাত থেকে কেড়ে নিলো। তিতলি হাতে অনেক ব্যাথা পেলো। দুঃখ করতে করতে সেখান থেকে চলে এলো। আজকে যদি এত সকাল না আসতো তিতলি এসব দেখতো ও না। দুঃখ পেতেও হতো না। কত খুশি মনে কলেজে এসেছে ভাল্লুক ফারাজ স্যারের আঁকা ছবিটা টাঙাবে। কিন্তু তিতলি এখন এসব করবে না।
“এই মেয়ে দাড়াও বলছি!”
তিতলি শুনলো না। কেন শুনবে?
পেছন থেকে গলা ছেড়ে দিয়ে বলল ,
“গিয়ে ফারিন ম্যাডামের কোলে বসে থাকুন!”
ফারাজ তীক্ষ্ণ চোখে তিতলির যাওয়ার পানে চেয়ে থাকে। বিরবির করে বললো,
“বেয়াদব একটা।”
সকাল ৯:৫০ মিনিট
তিতলি সে সময় ফারাজের সাথে অভিমান করে নিধির বাড়িতে এসেছিল। নিধিদের বাড়ি কলেজের একদম পাশেই। নিধি রেডি হতেই দুজনে বেরিয়ে এলো।
হাঁটতে হাঁটতে নিধি তিতলিকে বলল,
”মুখ এমন পেঁচার মতো করে রেখেছিস কেন রে?”
তিতলি নিধিদের বাড়ি গিয়েছে ঠিকই কিন্তু কোনো কথা বলছে না। ফারাজ কেন তাকে বললো না সে ফারিন ম্যাডামের কাছে যাবে না। তিতলি এতবার বলছে ফারিন ম্যাডামের কাছে যান। অথচ তিনি হ্যাঁ বা না কিছুই বলেন নি। নিরাবতা সম্মতির লক্ষণ! তার মানে সত্যি ফারিন ম্যাডামের কাছে যাবেন।
তিতলি ভাঙা গলায় বলল,
”আমি আর এই কলেজে পড়বো না।”
”কেন রে? তোকে কি ফারাজ স্যার কলেজে থেকে বের করে দিলো? আগেই বলছি স্যারের পেছন ছাড়! ছাড়লি না তো? এখন বুঝ মজা।”
”ওনি আমাকে একটুও দেখতে পারেন না। ফারিন ম্যাডামের সাথে প্রেম করে।”
”খুক খুক খুক——”
”আমার কথা শুনে তোর কাশি আসে।”
”স্যার এগুলো শুনলে তোকে এক থাপ্পড়ে আফ্রিকার জঙ্গলে পাঠাই দিবে৷”
– ”এভাবে বলবিনা৷ আমি কষ্ট পাই৷”
– ”আহারে আমার সোনাটা৷ কষ্ট তো পাবাই৷ ফাঁদে যে পড়ছ৷”
কথা বলতে বলতে ওরা কলেজের গেইটে চলে আসলো। ঘন্টাও বসে গেছে। তিতলি ঘন্টা করবে না বলে ওরা তিনজন ও করবে না। তাই পেছনের পুকুর পাড়ে বসে আছে।
সিয়াম, প্রিমা,নীলা ওরা সবাই আগে থেকে অপেক্ষা করছিলো। প্রথম ঘন্টা ফারাজ স্যারের। তাই আজকে তিতলি ফারাজ স্যারের ঘন্টা করবে না। একদম সামনে ও পড়বে না। ফারিন ম্যাডামের সাথে প্রেম করুক না হয় ড্রেম করুক তিতলির কি? মন মেজাজ ভালো না হলে তিতলি কারো সাথে কথা বলে না। নিধি,স্মৃতি,প্রিমা ওরা সবাই কথা বলছে অথচ তিতলির দিন দুনিয়ার কোনো খবর নেই। তিতলির ভাবনার মাঝেই সিয়াম আগ বাড়ি বললো,
”কেমন আছিস তেতুল গাছের পেত্নী?”
তিতলি চোখ তুলে তাকালো। ভাবলো সে কেন মন খারাপ করে থাকবে? একদম থাকবে না। আর সিয়াম তাকে তেতুল গাছের পেত্নী বলেছে এটা তিতলি কিছুতেই সহ্য করবে না সেও রেগে গিয়ে বলল,
তিতলি: ”তুই পেরত!”
সিয়াম: ”তুই।”
তিতলি: ”তুই জ্বিন!”
সিয়াম: ”তুই ভূত!”
তিতলি: ”তুই ”
সিয়াম: ”তুই ”
তিতলি: “তুই রানু মন্ডল।”
সিয়াম: “তুই ভুটকি!”
সিয়াম্মার বা*চ্চা তোর কান ছিড়ে ফেলবো বলে তিতলি উঠে এলো।
নিধি মাঝখান থেকে বলে উঠলো,
“থাম তোরা! পেত্নী পেরতের ঝগরা শুনতে শুনতে আমার কান পচে গেলো। ”
সত্যি তিতলি ফারাজের ঘন্টা করে নি। তিন ঘন্টা শেষে ওরা সবাই গেইটে দাড়িয়ে আছে। সিয়াম তিতলির কাঁধে কুনই দিয়ে ভর করে দাড়িয়ে আছে। তিতলি বারবার নামিয়ে দিচ্ছে। তো আবার দিচ্ছে।
তিতলি বিরক্ত হয়ে বলল,
“হাত নামা!”
“নামাবো না।”
“নামা।”
“না।”
“হাত ভেঙে দিবো।”
“দে। ”
ওরা দুজন এমনই। একসাথে থাকলেই ঝগরা। সে যাক গে! মূলত ওরা এখন যে যার বাড়ি চলে যাবে। তিতলি দাড়িয়ে আছে কারণ তাকে নিতে তুষার আসবেন।
তিতলি মুখটা অন্ধকার করে রেখেছে। এইযে সে মনেপ্রাণে একটা লোককে ভুলতে চাইছে, বাতিল করতে চাইছে মস্তিষ্ক থেকে। কিন্তু কোনোমতে পারছে না। বায়ুমন্ডলের ন্যায়ে ঘুরছে চারপাশে। এখন মনে হয় ফারিন ম্যাডামের সাথে প্রেম করে বসে বসে! করুক! তিতলির কী! বিয়ে করুক! বাচ্চা কাচ্চা হোক, হানিমুনে যাক, তাতে তিতলির কিছুই আসবে যাবেনা। কিন্তু মনের কোণে এটা আসলেই ম্যাটার করে। প্রচন্ড গরম লাগায় তিতলি এগিয়ে গিয়ে একটা ক্রোন আইসক্রিম নিলো। সেটা দাড়িয়ে দাড়িয়ে খাচ্ছে আর তুষারের আসার অপেক্ষা করছে। তখন হঠাৎ নিধি বলে উঠল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ১০
“এই তিতলি দেখ…দেখ ফারাজ স্যার আসতেছে! ”
তিতলি কোনোদিকে তাকালো না। কারণ সে ফারাজের দিকে আর কখনো তাকাবে না। তাই নিচের দিকে চেয়েই বড় গলায় বলল,
“তো আমি কি করবো। কোন ফারাজ স্যার আসুক না হয় টারাজ স্যার আসুক আমাকে কেন বলছিস?” গিয়ে বল ফারিন ম্যাডামের সাথে প্রেম কত দূর এগিয়েছে!
