Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ১০

রাগে অনুরাগে পর্ব ১০

রাগে অনুরাগে পর্ব ১০
সুহাসিনি ফাতেহা

”কি আঁকছো তিতলি?”
তিতলি যখন নিজের ডায়েরীতে অভিমানে নাক ফুঁলিয়ে ভাল্লুক ফারাজ খান কে আঁকছিল প্রশ্নটা ধেয়ে এলো তখনি। মেয়েটা তটস্থ হয়ে দ্রুত ডায়েরীটা বন্ধ করে ব্যাগে ভরে ফেলল। মুখে সামান্য হাসি ফুঁটিয়ে বলল,
”কি–কিছু না কিছুনা। আমি তোমার আসার অপেক্ষা করছিলাম আপু।”
মেয়েটার নাম সামিয়া। তিতলিদের বাসার পাশের বিল্ডিংয়ের। পড়াশোনায় ও ভীষন ভালো। ঢাকায় ইউনিভার্সিটির সাইন্স বিভাগের স্টুডেন্ট। সামিয়া তৎক্ষণাৎ পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল,

”কেমন আছো?”
”আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো আপু?”
”ভালো।”
টুকটাক কথা বলে পড়ায় মনেযোগ দিলো। সামিয়ারও বেশ ভালোই লাগে তিতলিকে পড়াতে। এমন একটা মিষ্টি মেয়ে তারউপর একবার কিছু বুঝিয়ে দিলে সেটা খুব সহজেই পেরে যায়।
পড়ার ফাঁকে তিতলি হঠাৎ বলল,
”আচ্ছা আপু একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
”এটা আবার জিজ্ঞেস করে বলা লাগে নাকি? বলো কি বলতে চাও?”
তিতলি মুখমণ্ডল অন্ধকার করে রেখেছে। হাতের কলম টা আঙুল দিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে অবুঝ ভঙ্গিতে বলল,
”আপু স্যারেরা কি স্টুডেন্টদের উপর রাগ করে? মানে একদম দেখতেই পারে না টাইপ রাগ ?”
সামিয়া খাতা দেখতে দেখতে বলল,

”কেন? কোনো স্যার কি বকা দিয়েছে?”
”না…মানে এমনি জিজ্ঞেস করলাম।”
সামিয়া এবার তিতলির মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটার মুখটা কেমন অভিমানে ভরে আছে। চোখের কোণে কেঁদে দিবে এমন ভাব। সামিয়া ভীষন বুঝদার মেয়ে। ও ভেবেই নিলো তিতলি কলেজে স্যারদের সাথে ঝামেলা করেছে। তিতলি কে ও চিনে। পরক্ষনেই তিতলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে বলল,
” স্যারেরা রাগ করে যদি স্টুডেন্ট বেয়াদবি করে কথা না শুনে। যেসব স্যার একদমই দেখতে পারে না বলে ওরাই সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখে।”
সামিয়ার কথা গুলো যেন মেয়েটার মাথার উপর দিয়ে গেল। অবাক মুখে বলল,
”মানে?”
”মানে হলো যে স্যার বকা দেয় ধমক দেয় ওই স্যারই তোমাকে সবচেয়ে বেশি কেয়ার করে তোমার ভুল ধরিয়ে দেয় শাসন করে এটা নিয়ে কি তুমি মন খারাপ করে আছো?”

তিতলি চুপ হয়ে গেলো। ফারাজ তাকে ধমক দেয় বেয়াদব মেয়ে! দাঁত ফেলে দিবো! মেয়েটার সব মনে পড়লো। ওসব কি তাহলে কেয়ার করে বলে? লোকটা কি তাহলে খেয়াল রাখে ওর ? ভীষন ভাবনায় পড়ে গেলো মেয়েটা।
ওদের কথার ভেতরে সেখানে তুষার এলো। মূলত তিতলির জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই এনেছে। স্টাডি টেবিলে রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
”সব বই এনে দিয়েছি। এবার এটা বলবি না যে তোর এই বই নেই ওটা নেই সেটা নেই।”
ভাইয়ের কথা শুনে তিতলি ভয় পেয়ে গেল। তাদের কথা শুনতে পেলো না তো? যদি জানতে পারে সে পড়াশোনা না করে এসব বলছে তাহলে ভাই অনেক বকা দিবে ! বলবে এই শিক্ষা দিয়েছি তোকে? তিতলি ভাইকে ভয় পায় তাই সামিয়া কে বলল,

”আপু আমি একটু ওয়াশরুমে যাবো।” খুব ইমার্জেন্সি!”
”যাও!”
সামিয়ার বলতে দেরি ওর যেতে দেরি হলো না।
তুষার দেখলো সবটা। ফের সামিয়ার দিকে ফিরে গম্ভীর গলায়,
” দেখছো আমি এসেছি আর কিভাবে বাহানা দিয়ে চলে গেলো।”
সামিয়া মুচকি হেসে বলল,
”তিতলি খুব ভালো পড়ে আমি তো একবার বুঝিয়ে দিলেই ও সব পেরে যায় আপনি চিন্তা করবেন না ভাইয়া।”
”হুমম!”—– বলে তুষার সেখান থেকে চলে গেলো।

রাতে ঘুমাতে এসে তিতলির শুধু ফারাজের বুকে পড়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ছে। বালিশের এপাশ থেকে ওপাশ ফিরছে শুধু ফিরছে। যদি একটু কথা বলতে পারতো। যেই ভাবা সেই কাজ। পড়ার কথা বলে হলেও আজ তিতলি ফারাজকে রিয়েল আইডি থেকে মেসেজ দিবে। তৎক্ষণাৎ ফেসবুকের মেসেন্জারে ফারাজের আইডি সার্চ করে! কি পড়া জিজ্ঞেস করবে কিছুই মনে পড়ছে না। শেষমেষ লিখলো অন্য কিছু,
“”আমাকে একটু পড়া বুঝিয়ে দিবেন? ‘” ডিলিট
”আপনি কি সত্যি প্রেম করেন?” —-ডিলিট
”আপনি কি ঘুমাইতেছেন?”—-ডিলিট
আইডিতে এক্টিভ অথচ সিন করছে না তিতলির খুব রাগ হলো। তার খুব কষ্ট হয় যদি কেউ অনলাইনে থেকে ও মেসেজ সিন না করে। শেষে রাগ করে টাইপ করল,
”আপনি আসলেই একটা ভাল্লুক” —–এটা আর ডিলিট করলো না সেন্ড করে দিয়ে মোবাইল রেখে দিলো।

ফারাজ সবে রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসেছে। রাত অনেক হয়ছে। প্রায় বারোটার কাছাকাছি। এত রাতে মেসেজ এসেছে দেখে ফোন হাতে নিতেই
ফারাজ দাঁতে দাঁত চাপলো। জানাতে চাই এসব কেমন বেয়াদবি? বিরবির করে বললো,মন চাচ্ছে সবকয়টা দাঁত ফেলে দিতে। সামনে ফেলে তখন বুঝাবো আমি ভাল্লুক কিনা। বেয়াদব ছেলেমেয়ে!”

সকাল ৮:৩০ মিনিট। তিতলি ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে দেয়াল ঘড়িতে নজর বুলিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসল। খিদে পেয়েছে। তবে খেতে ইচ্ছে করছে না!এর থেকে বড়ো কোনো জ্বালা আছে বলে মনে হয়না। ড্রয়িংরুমে এসে তিতলি চেয়ার টেনে বসলো।
অগ্যতা তৌসিফ শেখ তৈরি হয়ে মেয়ের জন্য বসে। একসাথে ব্রেকফাস্ট করবেন। সাথে অফিসে যাওয়ার পথে কলেজের গেইটে নামিয়ে দিবেন। তিতলি এসে বসতেই বললেন,
” তুমি নাকি ঠিক মতো পড়াশোনা করছো না? ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছো?”
-‘ তিতলি ভয় পেয়ে গেল। সে তো শুধুমাত্র তিনদিন ক্লাস ফাঁকি দিয়েছে। এটা তার বাবার কানে এলো কি করে? অথচ তাও বলল, ‘

-‘ ‘এমন মিথ্যা কথা তোমাকে কে বলেছে আব্বু? আমি কি কখনো ক্লাস ফাঁকি দি? আমি কত ভালো না।”
তৌসিফ শেখ হাসতে হাসতে বললেন,
”আচ্ছা আমার ভালো মেয়ে। এবার ঠিক মতো নাস্তাটা করে পেলো। ”
-‘ জি আব্বু।”
কিছু একটা মনে করে তিতলি হঠাৎ আবদার করলো,
”আব্বু শুনো?”
”বলো আম্মু।”
”আমার নতুন জুতো লাগবে। কিছু ড্রেস ও লাগবে।”
”আচ্ছা।” নিয়ে আসবো নে।”
পাশ থেকে আলেয়া শেখ রেগে বললেন,
”এত জুতো ড্রেস দিয়ে কি করিস? এসব হাই হিল কেউ পড়ে? কোনদিন উষ্টা খেয়ে পা ভেঙে আনিস আল্লাহ জানে?”
”আব্বু দেখছো? আম্মু এসব কি বলছে? আমার জুতো লাগবে দেখে হিংসা করছে? থাক আমার জুতো লাগবে না।”
বলে নাক ফুঁলিয়ে চলে গেলো তিতলি। তৌসিফ শেখ ডাকলেও শুনে নাই। মেয়েটা বড্ড অভিমানি।

তিতলি রুমে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে নিধিকে কল করলো——
নিধি: ”আসসলামু আলাইকুম কেমন আছো বেবি?”
তিতলি: ”ভালো নাই তুই কেমন আছিস?”
নিধি: ”ভালো।”
”কলেজে কখন বেরোবি?”
তিতলি: ”রেডি হচ্ছি!”
”এত সকাল কেন?”
”আমার কাজ আছে।—–” তুই সকাল আয়”
বলে তিতলি হঠাৎ লজ্জা পাওয়ার ভান করল। বলল,
”একটা কথা শুনবি নিধি?”
নিধি: ”কি এমন বিশেষ কথা বলে পেল”
তিতলি যেন লজ্জায় বলতে পারছে না তেমন করে উত্তর করলো,
”না থাক কলেজে গিয়ে বলবো।”
”আচ্ছা।”
ওরা কথা বলে ফোন কাটলো।

সকাল সকাল রেডি হয়ে কলেজে গেল তিতলি।উদ্দেশ্য ক্লাসে নিজের আঁকা ভাল্লুক ফারাজ স্যারকে টাঙানো। কিন্তু কলেজে যেতেই দেখলো করিডোরের কর্ণারে ফারাজের সাথে এক সুন্দরী রমণী দাঁড়ানো। রমণীটি কলেজের নতুন টিচার। ফারিন ম্যাডাম! প্রচন্ড সুন্দরী। বয়স ২৩-২৪ হবে। হেসে হেসে ফারাজের সাথে কথা বলছে ওনিও তাল মিলাচ্ছেন। তিতলির রাগ হলো। কই তার সাথে তো কখনো সুন্দর ভাবে দুটো কথা বলে না। সবসময় ধমক দেয় অথচ এখন কত ডং করে কথা বলছে। সপ্তাদশীর চোখের কোণে জল জমেছে। নাক ফুসছে। যেন কেঁদে উঠবে। একদম খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দুই দুইজনকে পরখ করলো। হেটে একবার তাদের সামনে গেলো। আবার চলে আসলো আবার গেল। লোকটা কি কানা তাকে দেখছে না। তার দিকে তাকাচ্ছে না কেন? তিতলির খুব কান্না ফেলো। সে ফোঁসফাঁস করতে করতে চলে আসবে তখনি পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে এলো,
”এই মেয়ে এদিকে আসো?”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৯

তিতলি দাঁড়াবে না। একদম দাঁড়াবে না। যার সাথা ইচ্ছে কথা বলুক! তিতলির কী! প্রেম ও করুক! ইট ডাজে’ন্ট ম্যাটার। তিতলির কিছুই আসবে যাবেনা। তিতলি আর কখনো তাকাবেও না। তাই চলে আসবে
এই ভেবে বলেই তিতলি পা বাড়ায় চলে যাবার জন্য৷ কিন্তু বিধাবাম দু পা এগোতেই ফারাজ লম্বা কদমে ছুঁটে এসে তিতলির হাত চেপে ধরলো আচমকাই। খসখসে হাতের মুঠোয় তিতলির কোমল হাত চেপে ধরে বলল,
“পিচ্চি মেয়ের এত রাগ কই থেকে আসে হ্যাঁ?”

রাগে অনুরাগে পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here