Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ৪১ (২)

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪১ (২)

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪১ (২)
সুহাসিনি ফাতেহা

ঘন্টার পর ঘন্টার সফর শেষে সকলেই বেশ ক্লান্ত। সেদিনের মতো আলাপ-আলোচনা বা গল্পগুজব করা হয়ে উঠেনি। মুক্ত করে রাখা কক্ষ গুলোতে যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়েছে। তিতলি ঝিলিক আর আয়েশার সাথে একরুমে ঘুমিয়েছিল। বেশ ভোর করেই ঘুম ভেঙে যায় তার। বলতে গেলে ঘড়িতে সকাল সাড়ে ছয়টা এখন। বিছানা ছেড়ে এসে জানালার পর্দা সরিয়ে দেয়। হুড়মুড়িয়ে একরাশ বাতাস ছুঁয়ে গেল সর্বাঙ্গ জুড়ে। আবেশে চোখবুঁজে রইলো। সে-কি অমায়িক দৃশ্য। তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করলো। দু’হাতে চুল খোঁপা করতে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো। ফ্রেশ হয়ে, কাপড়চোপড় পরিবর্তন করে একটু সাজুগোজু করে নিলো।একবার বিছানায় তাকিয়ে দেখল ঝিলিক আর আয়েশা এখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।
রাতে ইচ্ছে করেই ফারাজের কল রিসিভ না করে মেসেজ সিন করে মোবাইল অফ করে রেখেছিল।
ফারাজের নানু ছকিনা খাতুন রাতে তিতলিকে বলেছেন, “যেহেতু আসেনি ফোন কল এক্কেরে রিসিভ কইরো না নাতবউ। আমিও দেখমু কেমনে নো আইয়া থাকে।”

তিতলিও ছকিনা খাতুনের কথাটা মাথায় গেঁথে নিয়েছে। সেও একটু পরিক্ষা করে দেখবে কথাটা কতটুকু সত্যি হয়। ফারাজের মেসেজের রিপ্লাই করল না। উল্টো কলও দিলোনা। কিন্তু মন যেন মানছেই না।
বিছানার সামনে গিয়ে ঝিলিককে ডেকে ওঠাল। ঝিলিক নড়েচড়ে উঠে বসে আবারো হেলেদুলে বালিশে পড়ে গেল। তিতলি আবার ঝিলিকের পিঠ ঠেলেঠেলে পুনরায় ডাকে,
“ঝিলিক আপু উঠছো না কেন? অনেক সকাল হয়ে গিয়েছে।”
ঝিলিক হামি দিতে দিতে দেওয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে এখনো সকাল ছয়টা পঞ্চশ। এটাকে কিছুতেই অনেক সকাল বলা যায়না। তাও উঠে দুলতে দুলতে বাতরুমে চলে গেল। এই ফাঁকে তিতলি দরজা খুলে রুমের বাইরে উঁকি দিল। কেউ নেই! সম্পুর্ন নিস্তব্ধতা বিরাজমান চারপাশে। মনে হচ্ছে বাড়ির কেউ এখনো উঠেনি। ভালোই হয়েছে। এই সুযোগে সে আর ঝিলিক বিনা দ্বিধায় বাইরে চলে যেতে পারবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ঝিলিক বাতরুম থেকে এসে পুনরায় বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। তাকে আবারো ঠেলতে লাগলো তিতলি। ঝিলিক অস্পষ্ট ঘুমন্ত স্বরে বলল,

“আল্লাহর ওয়াস্তে একটু ঘুমাতে দাও তিতলি। সারারাত ঘুমাতে পারিনি তোমার ভাইয়ের..”
ঝিলিক অর্ধেক কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল। তিতলি ঝিলিকের কথাটা তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়ে বলল,
“বাইরে যাবে না? আমি অনেক এক্সটাইড সবকিছু ঘুরে দেখার জন্য।”
“এখনো অনেক সকাল। কেউ উঠেনি। হুশিয়ার নানা লাঠি দিয়ে ঘরে ঢুকাবে এখন বের হলে।”
বলতে না বলতেই ঝিলিকের মোবাইলে শব্দ করে বসলো। ঘুমুঘুমু চোখে স্ক্রিনে তাকাল। তুষারের মেসেজ।
“গুড মর্নিং আমার ঝিলমিল।”
ঝিলিক না দেখার ভান করে মরার মতো ঘুমিয়ে পড়লো। তিতলি অশান্ত মনে বিছানায় বসল। কই ভাবলো একটু বাড়ির আশেপাশে ঘুরবে হলো না। ১০০, ১০ ডিগ্রি দুঃখ নিয়ে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুমালো না। চোখ খুলে দুনিয়ার সব ভাবনা বাদ দিয়ে ফারাজকে নিয়ে ভাবতে বসলো।

ঘড়িতে সকাল সাড়ে নয়টা। ফারিন বেগম ছেলে যাবেন না শুনেই ঝটপট করে কয়দিনের জন্য বেশ কিছু নাস্তা ও রান্না-বান্না করে ফ্রিজে করে রেখে এসেছেন বাড়িতে। ফারাজ বাইরের খাবার তেমন খেতে পারেনা তাই। ফারাজ সেগুলো গ্যাসে একটু গরম করে সকালের নাস্তা খেয়ে নিয়েছে। কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হতে রুমে আসলো।
শার্ট প্যান্ট পরে রেডি হয়ে আয়নায় দাঁড়িয়ে মাথার চুল ঠিক করছে। রাতে তিতলি তার কল, মেসেজ ইগনোর করেছে দেখে রেগে আছে ভীষণ। দুহাতে মাথার চুল পেছনে ঠেলতে ঠেলতে হঠাৎ আশ্চর্যজনক ভাবে তিতলির প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখল। তিতলির কম্পিত অধরযুগল, মায়াবী চোখদুটো, পেলব মুখখানা, বলতে গেলে গোটা তিতলির সবকিছু যেন তার চোখের সামনে দেখছে সে। ঝটকা খেয়ে চোখদুটো খানিকটা ক্ষীণ করতেই আবার তা উধাও হয়ে গেলো। বিরক্ত হয়ে দাঁত ছোঁয়াল ঠোঁটের কোণে। মোবাইল নিয়ে তিতলিকে ভিডিও কল দিলো। কিন্তু ওপাশ থেকে কেটে গেলো। মোবাইল হাতে নিয়েই বসে আছে অথচ তার কল কেটে দিচ্ছে। ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে মেসেজ দিলো,

“ভিডিও কল ধরো।”
“কেন ধরবো আমি?”
“আমি বলছি তাই!”
“পারব না।”
“কেন’
“আপনি যেহেতু আমাদের সাথে আসেন নি সেহেতু আমিও আর আপনার কোনো কল ধরব না।”
“সিওর?”
“জ্বি সিওর!”
“লাস্ট বারের মতো বলছি কল রিসিভ করা হোক!”
“না বলেছি।”
“একটু দূরে আছি বলে খুব সাহস বেড়ে গিয়েছে না?”
তিতলি মেসেজ সিন করে রেখে দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে ভাবুক হয়ে রইল। কল কি রিসিভ করবে নাকি করবেনা সেটা ভাবছে। কিছুক্ষণ পর আবার টুং করে শব্দ করে উঠল। এবার লিখেছে,
“ইগনোর করা আমার পছন্দ নয়। নেক্সট টাইম থেকে আমাকে ইগনোর কিংবা রিজেক্ট করার দুঃসাহস দেখাবে না আর। কখনোই না।”

পরপর পাঁচটা রাগের ইমোজি।
তিতলিও তালেতালে মেসেজ দিলো,
“আপনি কলেজে যান। যে পুরুষ নিজের বউকে ছাড়া রাত কাটাতে পারে সে পুরুষের সাথে আমি কথা বলব না।”
“কেমন রাত কাটাবো সেটা তোমাকে কাছে পেলেই বুঝাবো স্টুপিড। দুদিন না হয় চারদিন তার পর তো সে-ই ঘুরেফিরে আমার খাঁচাতেই তোমাকে ফিরতে হবে , তখন সবকিছুর সুদ প্যাকটিক্যালি ভাবে নেবো। মাইন্ড ইট!”
বিড়বিড় করে কথাটা বলে তিতলির লাস্ট মেসেজ সিন করে ফারাজ অফলাইনে চলে গেলো।আকাশসম রাগ নিয়ে মোবাইলটা বিছানার একদিকে ছুঁড়ে মারবে মারবে ভাব। এই বউকে হাতের কাছে পেলে একদম ছাড়বে না সে। কাজেকর্মে বুঝিয়ে দেবে না তাকে ইগনোর করার ফল।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। ফারাজ রিসিভ করছে কি করেনি তার আগেই ওপাশ থেকে আলভী বলে উঠে,

“হ্যালো তোর বউ সকাল থেকে তিনবার বমি করছে নাস্তা খেতে বসে, মনে হয় এবার সুখবর শুনবো।”
ফারাজ হতভম্ব হয়ে যায় আলভীর কথা শুনে। এখনই তো মেসেজ করল। তার মুখের অভিব্যক্তি বদলালো না। একটু গভীরভাবে ধরল না, লাগালো না, ছুঁয়ালো না তার আগেই প্রেগন্যান্ট বাহ!
আলভীরা সবাই হুশিয়ার সাহেবের বাড়ির পেছনে পুকুর ঘাটে বসে আছে। মূলত মিথ্যা কথা বানিয়ে ছুড়িয়ে ফারাজকে এখানে আনার ফন্দি আটতেছে তারা। সবাই মোবাইলের সাথে কানখাড়া করে রেখেছে ফারাজ কি বলে সেটা শোনার জন্য। কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে ফারাজ বিষয়টা মাথায়ও নিচ্ছেনা এমন ভঙ্গিতে বলল,

“এসব বলতে কল করেছিস?”
ফারাজের কথা শুনে সকালের মুখ বোতা হয়ে যায়। কিন্তু আলভী মাথা চুলকে বলে,
“শেষমেশ নাদান শিশুটার সাথে ইয়ে করে ফেলেছিস? মিষ্টি নিয়ে আয় ডাক্তার চেকআপ করাতে আসছে এখন।”
টু টু করে কল কেটে গেলো। ফরহাদ পাশ থেকে বলল,
“ভাবছি চাচ্চু হবো কিন্তু ভাইয়া হতে দিবে না।”
“তুই তোর বউকে নিয়ে আয় তারপর আগেভাগে বংশের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেখিয়ে দে যে তোর মেশিন সবচেয়ে ফাস্ট আর ফারাজেরটা থার্ড!”
কথাটা বলতে না বলতেই হঠাৎ আলভী শব্দ করে একসাথে পরপর তিনটা বায়ু দূষণ করে বসল।
সবকটা হো হো কর হেসে নাক ঢাকতে ঢাকতে বলল,
“বাতরুম চাপলে তাড়াতাড়ি যা পেরত। ছিঃ ছিঃ কি গন্ধ!”
আলভী মোবাইল ফরহাদের কোলে ফেলে দৌড় দিলো। সত্যি তার আর্জেন্ট দুই চেপেছে। দৌড় দিয়েই যেতে হবে নাহলে মনে হয় পথেই ছেড়ে দিবে। হুশিয়ার সাহেবের বাড়ির ভালো ভালো রান্না খেয়ে পেট খারাপ হয়ে গিয়েছে।

তিতলি, ঝিলিক দুজনে সকালের নাস্তা খেয়েদেয়ে পুরো বাড়ি ঘুরতে আরম্ভ শুরু করলো। উনিশটা কক্ষ নিয়ে সাহেব বাড়ি। একেকটি কক্ষের বিশালতা প্রখর। সবাই ড্রয়িংরুমে গোল হয়ে উপস্থিত এখন। দেখতে লাগছে একটা জনসভা। বাড়ি ভর্তি মানুষ বলা যায়। ফারাজের মামাতো ভাই, বোনেরা মামিরা, খালারা, কমজোর ৪০-৫০ জন মানুষ আছে। কালকে মেজবান। হুশিয়ার সাহেবের ছেলেরা সহ আফজাল খানও আমরুল খান হাটে গিয়ে ছয়টা বড়বড় গরু কিনে এনেছে। আজকে নাছিমা বেগমের ছেলে রোহানও এসেছে। এসেই যেন তিতলিকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। এখনও তিতলির দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ বড়বড় করে মনেমনে বলে,
“বাহ একদম ঝাঁঝালো কচি মা*ল। এজন্যই তাহলে ফারাজ এই মেয়েকে খালামনির এককথায় বিয়ে করে নিয়েছে।”

লোভ জন্ম নিয়েছে হঠাৎ রোহানের মনে। তবে সেটা চোখমুখ কিছুতেই ধরা দিলো না। হেঁটে গিয়ে ভদ্র পুরুষের মতো তিতলির সাথে কথা বলতে এগিয়ে গিয়ে হ্যান্ডশাক করার জন্য হাত এগিয়ে দিয়ে বলল,
“হাই ভাবি? আমি ফারাজের কাজিন। মাই নেম ইজ রোহান।”
তিতলি ফারাজের মামাতো বোন হাশেম আলীর মেয়ে ময়না ও ঝিলিকের সাথে দাঁড়িয়ে। পরনে একটা হালকা রঙা গোল ফ্রক। গায়ে ওড়না ভালো করে জড়িয়ে নিয়েছে। চুলে বেনি করেছে। মুখে কোনোরকম কৃত্তিম সাজ নেই। শুধু একটু ক্রিম লাগিয়েছে। কিন্তু ঝিলিকদের দেখাদেখি ঠোঁটে একটু লিপিস্টিক দিয়েছে। খুব ভালো লাগছে ওকে এটুকুতেই। এখন পাশ ফিরে তাকায় রোহানের কথাটা শুনে।
সে আড়চোখে ঝিলিকের দিকে তাকায়। ছেলেটা নাকি নাছিমা বেগমের ছেলে তিতলি শুনেছে ঝিলিকের কাছে। নাছিমা বেগমের ছেলে মেয়ে সবাইকে তিতলি ঘৃণা করে। তাই ছোট করে উত্তর দিলো,

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪১

“ও।”
রোহান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়ে বাঁকা কন্ঠে বলল,
“কিছু বলবেন না? বিয়ের সময় যেতে পারিনি কাজ ছিলো বলে। একটু পরিচিত হয়ে নিই!”
তিতলি মনেমনে বলল,
“ভালোই করেছেন বিয়েতে না এসে।”
সরল মনে বলল,
“পরে পরিচিত হওয়া যাবে।”
রোহান ক্রুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অন্যদিকে চলে গেলো। মনেমনে একটা সুযোগ খুঁজছে। এতটুকু একটা মেয়ে তাকে পাত্তা দিচ্ছে না কতবড় সাহস মেয়েটার। এমনিতে মায়ের কথা শুনে এই মেয়ের উপর প্রচন্ড ক্ষোভ জমে আছে।
ঝিলিক পাশ থেকে রোহানের যাওয়া দেখে তিতলিকে বলল,
“ফারাজ ভাইয়ার কাজিন এটা ভালো না তিতলি। তুমি ওর সাথে কথা বলিয়ো না।”
“ঠিকাছে ঝিলিক আপু।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪২