Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩১

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩১

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩১
সিমরান মিমি

সরদার মঞ্জিলের দ্বিতীয় তলা। বুঝ হবার পর থেকেই সিঁড়ির কোনার ঘরটাতে আর্শিয়া থাকে। মায়ের ঘর এটা। আগে সোনালীর সাথে ঘুমালেও পঞ্চম শ্রেণি থেকে এখানেই ঘুমায়। কখনো ছোট্ট মেয়েটা ভয় পাবে বলে সোনালী মাঝরাতে তার পাশে এসে ঘুমাতো। কখনো বা শামসুল সরদার এসে চেয়ার পেতে বারান্দায় বসে থাকতেন, মেয়েকে পাহাড়া দিতেন।
বাইরে কনকনে ঠান্ডা। হিমশীতল বাতাস। ক-দিন ধরে সূর্যের দেখাটাও নেই। আর্শিয়া কম্বলের মধ্যে গুটিশুটি দিয়ে শুয়ে আছে। মনের ভেতরটা খচখচ করছে পাভেলের বিষয়ে জানার জন্য। কিন্তু পারছে না। কলেজে থাকাকালীন প্রেমার রাগী মুখ, জেদ নিয়ে চলে যাওয়া সবকিছুই ভাবাচ্ছে। সারাদিন ভেবেছে সে ব্যাপারে। অবশেষে বুঝলো, প্রেমা সোভাম সরদারের প্রেমে পড়েছে। এটা তো মন্দ কাজ নয়। কিন্তু আর্শি তখন ওভাবে রিয়াক্ট কেনো করলো? সোভাম তো তার কাছের কেউ নয়। তাকে প্রেমা ভালোবাসুক বা ঘৃণা করুক, এতে তার কি এসে যায়? বরং তাকে দিয়ে যদি পাভেলের খুঁটিনাটি তথ্য জানা যায়, তাতে আপত্তি কিসের?
অবশেষে অনেক ভেবে-চিন্তে প্রেমার নম্বরে কল লাগালো আর্শিয়া। রিসিভড হওয়ার পর বললো,

—তুমি কি রাগ করেছো?
প্রেমা অবাক হয়ে গেছে আর্শির ফোন পেয়ে। তার নিজের মনের মধ্যেই তো খচখচ করছিলো। হুট করে ওমন ভাবে রিয়াক্ট করা উচিত হয়নি ভেবে বিকেল থেকে কল দেওয়ার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু লজ্জায় পারছিলো না। রাগের কথা জিজ্ঞেস করায়, এখন অসস্তি হচ্ছে। নিচু গলায় বললো,
— না।
প্রেমার ছোট্ট একটা উত্তর পেয়ে আর্শির আরো খারাপ লাগলো। সে ক্রমশ চেষ্টা করলো রাগ ভাঙানোর। কিন্তু কি বলবে রাগ ভাঙাতে? এই মেয়ের রাগ না ভাঙিয়ে হুট করে তো পাভেলের খবরাখবর জানতে চাওয়া যায় না। আর্শি হাসার চেষ্টা করলো। বললো,
— তুমি কালকে ছোট্ট একটা টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে আইসো। আমি দিয়ে আসবো ভাইয়াকে।
প্রেমা চমকে উঠলো। কথা বলতে পারলো না। হতভম্ব হয়ে বসে রইলো খানিকক্ষণ। একটু খুশি খুশিও লাগছে। কিন্তু তা কি প্রকাশ করা উচিত হবে? উৎফুল্ল হয়ে ‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ আনবো’ বলে সায় জানানোটা বেহায়ার চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে। সে গম্ভীর হলো। বললো,
— না থাক, তোমার খারাপ লাগলে দরকার নেই।
—প্রেমা?
আর্শি মলিন কন্ঠে ডাকলো। এখন এসব খারাপ- ভালো লাগার কথা জানার দরকার নেই। এসব জানতে গেলে ঘটনা ঘেটে যেতে সময় লাগবে না। শেষে যতটুকুও বা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেছে, তাও বিফলে যাবে। আর্শির ডাক শুনে প্রেমা চমকালো। কি না কি জিজ্ঞেস করবে তা ভেবে হিমশিম খেলো। ছোট্ট করে বললো,

— বলো।
— সোভাম ভাইয়াকে তুমি পছন্দ করো, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তার সাথে সখ্যতা বাড়ানোর জন্যই যেচে আমার সাথে কথা বলছো, সেটাও জানি। শুধু একটা সত্যি কথা বলবে? তোমার ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ের ব্যাপারে ফ্যামিলিতে আলোচনা করেছে — এ কথা কি সত্যি? নাকি শুধু মাত্র আমাকে খুশি করার জন্য বলেছো।
— না না। বিশ্বাস করো, আমি একদমই মিথ্যা কথা বলি নি। তোমার আর ভাইয়ার আচার-আচরণ লক্ষ্য করেই আব্বু- আম্মু আর বড় ভাইয়া এ ব্যাপারে আলোচনা করেছে। নির্বাচনের পরেই হয়তো তোমাদের বাসায় যাবে সম্বন্ধ নিয়ে। এটা একদম সত্যি কথা।
আর্শি হুট করেই নিশ্চুপ হয়ে গেলো। ভেতরের প্রাণ পাখিটা আহ্লাদে প্রজাপতির ন্যায় পাখা মেলে উড়ছে। উত্তেজনায় সারা শরীর কাঁপছে। হুট করেই শীত যেনো বেড়ে মাইনাসে চলে গেলো। সে ফোনটাকে হাতের মুঠোয় চেপে শরীর ছেড়ে দিলো বিছানায়। জ্ঞানহীনের মতো পড়ে রইলো চোখ বন্ধ করে।
— আর্শি, এইই আর্শি?
—হু
—কথা বলছো না কেনো?
— শুনছি।
প্রেমা আবারো ঠোঁট ফুলালো। আর্শি নিশ্চিত তার কথা বিশ্বাস করছে না। এজন্যই হয়তো কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। সংকোচ নিয়ে বললো,

— হুট করে এমন নিশ্চুপ হয়ে গেলে কেনো?
আর্শি দুহাতে মুখ চেপে ধরলো। অস্ফুটস্বরে বললো,
— আমার ভীষণ লজ্জা করছে।
শব্দ করে হেঁসে উঠলো প্রেমা। আরো কিছুক্ষণ আর্শিকে লজ্জা দিতে লাগলো নানা কথা বলে। অবশেষে সেসব বাদ দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— তোমাদের মধ্যে কি ঝগড়া হয়েছে?
আর্শি ভ্রু কুচকে বললো,
— আমাদের তো কথাই হয় না তেমন।
— ওহহহ! জানিনা, আজকাল পাভেল ভাইয়ার মন অনেক খারাপ। সারাক্ষণ মুখ মলিন করে বসে থাকে। খুব একটা জ্বালায়ও না।
ব্যাপারটা খুব একটা ভালো লাগলো না আর্শির। পরিচিত হলেও কাছের নয় পাভেল। তবুও আজ তার জন্য দুশ্চিন্তা বাড়লো। একবার মনে বললো – লোকটা অসুস্থ। পরক্ষণেই মস্তিষ্ক জুড়ে নানা প্রশ্নের আলোড়ন তৈরি হলো। কি হয়েছে তার? – জ্বর! নাকি মাথাব্যথা? নাকি অন্য কোনো রোগ। আর্শিয়া হুট করেই ছটফট করে উঠলো। প্রিয় মানুষটাকে নিয়ে জানার আগ্রহ অনেক। ভণিতা না করে সরাসরি প্রশ্ন করে বসলো।

— উনি কি অসুস্থ? ডাক্তার দেখিয়েছো? প্রেমা, ওনার গায়ে মনে হয় জ্বর এসেছে। খুব শীত পড়েছে তো, ঠান্ডাও লাগতে পারে।
প্রেমা হাসলো। বললো,
— আচ্ছা, আচ্ছা! তোমার এতো ব্যস্ত হতে হবে না। আমি দেখছি।
তাদের দুজনের কথা ফুরালো। প্রেমা কল কাটতে যাবে তখনই আর্শিয়া আবারো কথা বলে উঠলো। ধীর স্থির হয়ে, শান্ত কন্ঠে বললো,
— তুমি কাল ভাইয়ার জন্য খাবার নিয়ে আইসো। আমি দিয়ে দেবো। আর আমার তরফ থেকে এক্ষুনি তোমার ভাইয়াকে এক কাপ কফি বানিয়ে দাও। তাহলেই বরাবর!
এরপর’ই সংযোগটা বিচ্ছিন্ন করে দিলো। লাইনে থাকলে হয়তো এতোক্ষণে দু-চার টা মশকরা করে ফেলতো প্রেমা। ইচ্ছে করেই লজ্জায় ফেলতো আর্শিয়াকে। কিন্তু সেসব হজম করার মতো সাধ্যি কি আর্শির আছে? সে তো লজ্জায় গুমরে মরতো। তার চেয়ে না শোনাই উত্তম। ফোন টাকে পুণরায় অযত্নে ফেলে দিলো পাশে। নিরিবিলি, নিশ্চিন্তে বালিশে মাথা দিয়ে তাকিয়ে রইলো ছাদের দিকে। দীর্ঘসময় বিষাদে ডুবে থাকা ডাগর ডাগর চোখ দুটোতে আজকাল আশার ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে না। লজ্জার আভাসে নিমজ্জিত হচ্ছে পাপড়িগুলো।

“বিষয়টা একটু কেমন হয়ে গেলো না?”
পরশের ভ্রুঁ দ্বয় কুচকানো। চোখে -মুখে বিরক্তির আভাস নেই, রয়েছে কিছু জানার আকাঙ্ক্ষা। স্পর্শী গা ছাড়া ভাব নিয়ে চেয়ারে বসলো। মুখের মাস্ক টা খুলে টেবিলের উপর রেখে দুহাতে নাক এবং মুখ টা ঘঁষে নিলো। বিরক্তিকর কন্ঠে বললো,
—উফফ! এইসব মাস্ক-টাস্ক পড়ে শ্বাস নিতে পারি না আমি। তবুও বাধ্য হয়ে পড়তে হচ্ছে।
পরশ নিরুত্তর। তাকিয়ে আছে একভাবে। মুখশ্রীতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। স্পর্শীয়া তা দেখে মিহি হাসলো।
— হ্যাঁ, তা কি যেনো জিজ্ঞেস করছিলেন?
— ঠিক চারটায় দেখা করার কথা ছিলো। অথচ সাতাশ মিনিট পার হয়ে যাবার পর তুমি এসেছো। ব্যাপারটা কি মেনে নেওয়ার মতো?
— অবশ্যই মেনে নেওয়ার মতো। আরে এটাই তো চিরন্তন নিয়ম। বয়ফ্রেন্ড সব সময় গার্লফ্রেন্ডের জন্য অপেক্ষা করবে। ঘন্টার পর ঘন্টা, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর! সেখানে মাত্র সাতাশ মিনিটেই আপনি ধৈর্য্যহারা হয়ে যাচ্ছেন?

ওয়েটার দুটো কফি দিয়ে গেলো। পরশ মুখের মাস্ক খুলে কফির মগ হাতে নিলো। উনত্রিশ বছর বয়সী এক তাগড়া যুবকের প্রথম অভিজ্ঞতা। ভালো লাগছে না। চোখে মুখে কোথায় আনন্দের ছাঁপ নেই। শুধু কিছু জেদের প্রতিফলন রয়েছে। যার কারনে আজ এখানে আসা। নাহলে সবচেয়ে অপছন্দের মেয়েটাকে নিয়ে কফিশপে আসার মতো ভয়ংকর কাজ সে কখনোই করতো না। এখন তো আফসোস হচ্ছে। আদৌ কি এই জেদ ধরে বসে থাকাটা তার ঠিক হয়েছে? শামসুল সরদার তো গোঁ ধরে উল্টোপাল্টা কথা বলতেই পারেন। তিনি মানুষটাই এমন উল্টোপালটা। কিন্তু সেই কথার রেশ ধরে জেদ নিয়ে অপছন্দের কারো সাথে সম্পর্ক শুরু করা অযৌক্তিক। শুধু অযৌক্তিক নয়, অপরাধও বটে। আবার এই সম্পর্ক বিয়ে অবধি নিয়ে যাবে, এমনটাও ভেবে বসেছিলো সে। ছিহ!
স্পর্শী খেয়াল করলো পরশ কোনো কথা বলছে না। এমনকি তার ভাবভঙ্গিমা ও ঠিক নেই। দেখে মনে হচ্ছে বিরক্ত। অথচ দেখা করার কথা এই লোকই সেধে সেধে বলেছিলো কাল রাতে। কলে কত বেহায়াপনা — সম্পর্ক শুরুর আগে সামনাসামনি একটা বোঝাপড়া করা উচিত, একে-অপরের সাথে পরিচিত হওয়া উচিত, কত কিছু! অথচ এখন দেখো? মুখ দেখলে মনে হবে কেউ নিমপাতা ডলে দিয়েছে মুখে।

— আপনি কি কোনো কারনে বিরক্ত?
কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে বাঁধা পেলো পরশ। আনমনে বলে উঠলো,
—হু, না।
— আসলে সত্যিকার অর্থে আমি ঠিক টাইমেই এসেছিলাম। শুনেছি, বয়ফ্রেন্ড কে অপেক্ষা না করালে সম্পর্ক মধুর হয় না। তাই কফিশপের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো পরশ। মেয়েটা ইচ্ছে করে তাকে অপেক্ষা করিয়েছে। খামখেয়ালি করে বাইরে বসে ছিলো, ভাবতেই নিজেকে সস্তা মনে হলো। সে ভেতরে বসে এমন ভ্যাবলার মতো অপেক্ষা করছিলো — এটা যতবার মনে আসছে, ততবার’ই চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। নিজের ভেতরের রাগকে প্রশ্রয় না দিয়ে ধীর- স্থির হয়ে বললো,
— তোমাকে আমার স্বাভাবিক মানুষ মনে হয় না।
স্পর্শী হাসলো।
— আমি মানুষ নই। আমি পরী, সরদার বাড়ির পরী।
পরশ উত্তর না দিয়ে তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসলো। তা লক্ষ্য করতেই জ্বলে উঠলো স্পর্শী। বললো,
— পরী বলায় আপনি হেঁসেছেন কেনো? আজব! আমার প্রশংসা সহ্য করতে পারবেন না, তাহলে কিসের বয়ফ্রেন্ড আপনি?
পরশ মুহুর্তেই ধমক মারলো। আশেপাশের সকলের দিকে তাকিয়ে আওয়াজ নিচুতে নিয়ে বললো,

— শাট আপ! আমি তোমার বয়ফ্রেন্ড নই। এসব হ্যাংলা সম্বোধন করা বন্ধ করো।
স্পর্শী চমকে উঠলো। তার পরিকল্পনার সাথে তো কিছুই মিলছে না। বরং সব উল্টোপাল্টা ঘটছে। ভেবেছিলো, প্রথম দেখায় লোকটা খুব নমনীয় হয়ে ভালোবাসার কথা বলবে। এভাবে দশ-পনেরো দিন রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টা কথা বলে চট করে মায়ায় ফেলে দেবে। কিন্তু ঘটনা তো তার উলটো। মায়ায় তো দুর‍, লোকটার মুখ চোখ দেখলে মনে হচ্ছে পেছনে হুল ফোটাচ্ছে কেউ। স্পর্শীয়া এ পর্যায়ে সিরিয়াস হলো। গমগমে স্বরে বললো,
— দেখুন, আপনি আমায় এভাবে ডেকে অপমান করতে পারেন না? নিজে থেকে ডেকেছেন, বলেছেন এক সাথে সময় কাটাবেন। এমনকি সরাসরি বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছেন।
পরশ নিরব হয়ে শুনলো। কফিতে শেষ চুমুক বসিয়ে মাস্ক পড়ে নিলো। সময় নিয়ে, ভেবে-চিন্তে ঝরঝরে কন্ঠে বললো,

— আমি মাত্র’ই কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছি। স্পর্শীয়া, সেদিন তোমার বাবা আমাকে খুব বাজেভাবে অপমান করেছে। আমার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বলতে গেলে ওই অপমানের রেশ ধরেই আমি হুট করে এই সিদ্ধান্ত টা নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, তোমায় বিয়ে করে তবেই তোমার বাবার মুখের উপর জবাবটা দেবো। একপ্রকার জেদ নিয়ে বসে ছিলাম। কিন্তু আজ উপলব্ধি করলাম, তোমার প্রতি আমার কোনো অনুভূতি কাজ করে না। এক কথায়, মানুষটা তুমি আমার কাছে বড্ড অপছন্দের। সেখানে জেদ নিয়ে এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া নিতান্তই ভুল। এজন্য আমি অনুতপ্ত। আমার প্রতি যদি তোমার কোনো ভালো লাগা বা অনুভূতি কাজ করে থাকে, তাহলে সেসব মোহ ভুলে যাও। আমার প্রতি কোনো আশা রেখো না।
পরশের বলা শেষ। তাই স্পর্শীর থেকে কোনো রকম প্রত্যুত্তর আশা না করেই উঠে যাচ্ছিলো। এরই মধ্যে বাঁধা পেলো স্পর্শীর হাসি দেখে। ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে রইলো খানিকক্ষণ। স্পর্শীয়া হাসি থামিয়ে বললো,
— আরে কথা না শুনেই চলে যাচ্ছেন? বসুন, বসুন। কফিটা তো শেষ করুন।
পরশ পুণরায় চেয়ারে বসলো। মুখশ্রী জুড়ে জিজ্ঞাসু চাহনি। স্পর্শীয়া নিজেকে সামলে কন্ঠে কড়া তাচ্ছিল্যের সুর আনলো। একপ্রকার অপমান করে বলে উঠলো,

— আপনি জেদ নিয়ে আমায় বিয়ে করবেন, আর আমি নাঁচতে নাঁচতে কবুল বলবো — এটা আপনি ভাবলেন কি করে? কল্পনায়’ই বা কিভাবে আনলেন? আপনাকে তো আমি বুদ্ধিমান ভাবতাম, এখন দেখছি পুরোটাই ফাঁকা। এতোটুকু জ্ঞান শক্তি নিয়ে আবার শামসুল সরদারের বিপক্ষে রাজনীতিতে নেমেছেন। হাস্যকর!
এক্সকিউজ মি, মিস্টার পরশ শিকদার! আপনি ভাবলেন কি করে আপনার প্রতি আমার অনুভূতি কাজ করে? আমার বলা দু-চার টা কথাতেই গলে গেলেন? কি মুশকিল! কিন্তু আপনাকে তো আমি ঘেন্না করি। শুধু আপনি না, আপনার পুরো পরিবারকে আমি প্রচন্ড ঘৃণা করি। আপনার ভাগ্য অত্যন্ত ভালো যে বিষয়টা এখানেই শেষ করছি। নাহলে রাস্তার পাগল না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হোতাম না। অন্তত শিকদার বাড়ির মেয়েদের মতো তো আমি চরিত্রহীন না, আর না তো ছলনাময়ী।
পরশ নিরুত্তর, নিশ্চুপ। মুখশ্রী জুড়ে শান্ত ছোঁয়া। কোথাও নেই কিঞ্চিৎ আশ্চর্য! যেনো সবটাই জানতো। অথচ ভেতরটা স্তব্ধ হয়ে গেছে। এই মেয়েটা দিনের মধ্যে কতশত বার তাকে জ্বালিয়েছে। প্রথমে মজা ভাবলেই পরবর্তীকালে সত্যি ভেবেই বসে ছিলো পরশ। মনে হয়েছিলো, প্রেমে পড়া তো খারাপ নয়। আর নাতো কারোর হাতে থাকে। অথচ সেসব জেদ ছিলো। শুধুই জেদ! চরিত্রহীণ শব্দটা সরাসরি পরশের বুকে গেঁথেছে। তার ফুপিকে উদ্দেশ্য করে এ কথাটা বলেছে স্পর্শী। ভেতরটা রাগে ফেটে গেলেও তাকে এখন নিশ্চুপ থাকতে হবে। নাহলে পরবর্তী ঝামেলা বাঁধতে সময় লাগবে না। তবুও একেবারে চুপ থাকতে পারলো না। শান্ত কন্ঠে বিষাক্ত তীর টা ছুঁড়ে মারলো স্পর্শীয়া সরদারের দিকে। তাচ্ছিল্য করে হেঁসে বলল,

— এই চেহারা নিয়ে পরশ শিকদারকে রাস্তার পাগল বানানোর পরিকল্পনা করেছো? সো ফানি!
মাথাটা দপদপ করে জ্বলে উঠলো। এই কথার মানে কি? পরশ স্পর্শীয়ার চেহারা নিয়ে মজা করলো? তাকে অসুন্দর বললো? উফফফ! ফুটন্ত পানির ন্যায় টগবগ করছে স্পর্শীয়ার রক্ত। এতোক্ষণ যাই ছিলো! কিন্তু তাই বলে তার চেহারা নিয়ে তাচ্ছিল্য করবে এই বেয়াদব লোক! এক মুহুর্তের জন্য রাগ সামলে উঠতে পারলো না। কফির অবশিষ্ট পানীয়জল ধরে ছুঁড়ে মারলো পরশের মুখে। রাগে হাত কাঁপতে থাকায় নিশানা দিকভ্রষ্ট হলো। কফি গিয়ে পড়লো পরশের গলায় এবং কলারে। তবুও শান্তি পেলো না স্পর্শীয়া। তেলে – বেগুনে জ্বলে উঠে বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩০

— বাড়িতে গিয়ে আয়নায় আগে নিজের চেহারা টা দেখে নিবেন। এরপর অন্যকে কথা শোনাবেন, অসভ্য লোক।
ফোন হাতে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো স্পর্শী। কয়েক কদম গিয়ে আবারো ফিরে আসলো। টেবিলের উপর হাত দিয়ে থাবড় মেরে রাগে গিজগিজ করতে করতে বললো,
— এটা শামসুল সরদার না যে ভেবেচিন্তে কাজ করবে। কখনো আমার গাড়ির সামনে পড়লে, একদম পিষে মেরে ফেলবো — অভদ্র কোথাকার!

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩২