রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৫
রিক্তা ইসলাম মায়া
রিদের শক্ত গলায় মায়া দমে যায়। মায়া মিনমিন করে বলল…
‘আমার বেবি চাই!
‘শোনো রিত। আমি বিয়ে করেছি শুধু নিজের জন্য। আগে আমাকে সময় দাও। বেবি নিয়ে আপাতত আমার কোনো প্ল্যানিং নেই। যদি কখনো বেবি নিতে হয় তাহলে সেটা পরে। যখন সঠিক সময় হবে তখন। নট নাউ।
মায়া রাগে রিদের হাতটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে কিচেন হতে চলে যায়। মায়ার কাজে রিদ রাগে দাঁতে দাঁত পিষে হাত বাড়িয়ে কিচেনের সেলফ টেনে ফ্লোরে ফেলে দেয়। তৎক্ষণাৎ মায়ার পিছনে চেঁচিয়ে বলে…
‘ রিত দাঁড়া তুই।
মায়া পালিয়ে যায়। রিদ মায়ার পিছনে দুবার চেঁচায়। বাড়িতে মানুষ থাকায় অনেকে দৌড়ে কিচেনে আসে ভাঙচুরের শব্দে। রিদকে রাগান্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেউ আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করে না। সুফিয়া খান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফ্লোরে এলোমেলো জিনিসপত্র দেখে এগিয়ে আসেন। রিদের ক্রোধিত মনোভাব দেখে প্রশ্ন করে বলেন…
‘কী হয়েছে বাবু? রেগে আছিস কেন? কোনো সমস্যা?
মায়ের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রিদ রাগে বেরিয়ে চলে যায়। মায়া ছাদে বসে সবার সাথে দু’হাতে মেহেদি শুকাচ্ছে। মিউজিকের গান চলছে। চারপাশে হইচই। টিয়া অনেকক্ষণ যাবত মিসিং। মায়া ব্যাপারটা মাত্র খেয়াল করেছে। মায়া আশেপাশে টিয়ার খোঁজ করে জুঁইকে বলে…
‘ জুঁই? টিয়াকে দেখেছিস কোথাও? টিয়া কোথায় রে?
জুঁই মায়ার মতোই মেহেদি রঙা জামদানি শাড়ি পরেছে। জুঁইয়ের হাতে মেহেদি পরা শেষ হয়নি। মেহেদি আর্টিস্ট জুঁইকে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে। জুঁই হাতের মেহেদির দিকে তাকিয়ে জবাব দিয়ে বলে…
‘টিয়া নিচে গেছে হয়তো।
‘কবে গেছে কিছু জানিস?
‘ হুম জানি, ঘণ্টা খানেক আগে গেছে।
বাড়ির সব মেয়েরা ছাদে বসে আছে। টিয়া একা নিচে এত সময় ধরে কী করছে? কোনো সমস্যা হলো কি? টিয়ার চিন্তায় মায়া আবার উঠে গেল। আসছি বলে জুইকে বলে আবার নিচে গেল। বসার ঘরে টিয়া নেই। মেহমানরা বসে আছে, কিচেনে সার্ভেন্ট আছে কিন্তু টিয়া কোথাও নেই। মায়া কী মনে করে বসার ঘর পেরিয়ে বাইরে গেল। খান বাড়িতে রিদের ছেলেরা মেহমানদের তদারকি করছে। বেশ কয়েকটা গরু-মহিষ একত্রে জ’বাই করা হয়েছে কালকের অনুষ্ঠানের জন্য। সাদা পাঞ্জাবি পরে ছেলেরা হাতে হাতে কাজ করছে। নিহাল খান, রাদিফ, আয়ন, আরাফ খান সেখানে দাঁড়িয়ে। রিদ, আসিফকে আশেপাশে কোথাও দেখা যায়নি। খান বাড়ির যে পাশটায় সবাই কাজ করছে মায়া তার বিপরীতে পাশে এগোয়। এত ছেলে মানুষের সামনে দিয়ে টিয়া কোথাও যাবে না। খান বাড়ির অপর পাশে বাগানে গেইটের পাশে কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছে হয়তো সেখানে টিয়া থাকতে পারে। চারপাশে বেশ লাইটিং করা তাই তেমন অন্ধকার নেই। ভালোই আলো আছে।
আসিফ টিয়াকে নিয়ে খান বাড়িতে ঢুকে। টিয়ার বাম হাতের কবজিতে ব্যান্ডেজ। টিয়া যখন ছাদ থেকে নেমেছিল, ওর হাতের ফোনটা তখন ছাদ থেকে নিচে পড়ে যায় অসাবধানতায় ছবি তুলতে গিয়ে। তাড়াহুড়োয় টিয়া ছাদ থেকে নেমে বাগানের পিছন দিকটায় দৌড়াতে গিয়ে ইটের সঙ্গে হুঁচট খেয়ে ডেকোরেশনের লাইটের উপর পড়ে যায়। কাচের লাইট ভেঙে টিয়ার বাম হাত রক্তাক্ত হয়। ভাগ্য সহায় থাকায় এদিকটায় তখন জেনারেটর চালু করেনি লোকজন, কারণ লাইটিংয়ে কী একটা সমস্যা ছিল—নাহলে শর্টসার্কিটে মারা যেত টিয়া। আসিফ, রিদ ওরা বাইরেই ছিল। টিয়ার পড়ে যাওয়ার চিৎকারে সকলে দৌড়ে আসে। আসিফ দৌড়ে টিয়াকে তুলে বসায়। হাত রক্তাক্ত হয় কাচে। রিদ আসিফকে দিয়ে টিয়াকে ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে তখন বাড়ির ভিতরে গিয়েছিল মায়ার সঙ্গে দেখা করতে। আসিফ, টিয়া দুজনই পাশাপাশি হাঁটছে। টিয়া গায়ের ওড়নায় শরীর ঢেকে, বাম হাত ওড়নার নিচে। ফেয়ারি লাইটে খান বাড়ি ঝলমল করছে। আসিফ অদূরে সবাইকে দেখল ব্যস্ত ভঙ্গিতে গরু কাটছে, রান্না-বান্নার আয়োজন করছে। টিয়াকে বাড়ির ভিতরে পৌঁছে সে রিদ ভাইয়ের কাছে যাবে। রিদ ভাই অলরেডি দুবার কল দিয়েছেন। হঠাৎ টিয়া নীরবতা ভেঙে মিহি সুরে বলে…
‘আপনাকে একটা প্রশ্ন করি?
আসিফের মনোযোগ ছেলেদের রান্না-বান্নার আয়োজনের মধ্যে ছিল। টিয়ার কণ্ঠে ফিরে তাকায়। সম্মতি দিয়ে বলে…
‘জি বলুন।
‘রাফাকে এখনো পছন্দ করেন?
আসিফ কপাল কুঁচকায়। টিয়া, রাফা দুজন মায়ার বান্ধবী হলেও রাফা চট্টগ্রামের আর টিয়া ঢাকার, দুজন দুজনের অপরিচিত। তাহলে টিয়া কীভাবে রাফার কথা জানল? মায়া ভাবী থেকে জেনেছে?
‘আপনি রাফাকে চেনেন?
‘জি চিনি। মায়ার বান্ধবী, সেই সূত্রে আমারও চেনা আরকি।
‘ওহ!
তারপর দুজনই নীরব। টিয়া ফের নীরবতা ভেঙে বলে…
‘আপনি বললেন না তো রাফাকে এখনো পছন্দ করেন কিনা?
‘ আমি এখন তাঁকে পছন্দ করলে কি সে আমার হবে?
‘ তা হবে না হয়তো। তারপরও জানতে ইচ্ছা করল তাই প্রশ্নটা করলাম।
আসিফ নিরব রইল। টিয়া ফের বলে….
‘রাফা প্রেগন্যান্ট।
‘জানি।
‘কষ্ট পান?
‘না।
‘ভুলে গেছেন?
‘হয়তো বা হ্যাঁ। কাউকে মনে রেখে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে তাঁকে ভুলে গিয়ে ভালো থাকাটা উত্তম নয় কি?
টিয়া ঝটপট উত্তরে বলে…
‘অবশ্যই উত্তম। তার মানে আপনি রাফাকে ভুলে এখন সিঙ্গেল আছেন তাই তো?
টিয়ার উৎফুল্লতায় আসিফ ঘুরে তাকাল। হাঁটা থামিয়ে কপাল কুঁচকে বলে…
‘আপনি আমার ব্যাপারে এত আগ্রহ দেখাচ্ছেন কেন? কারণ কি?
‘কারণ আছে বলেই তো আগ্রহ দেখাচ্ছি, কারণ ছাড়া কি কেউ জল ঘোলা করে বলুন?
‘ জল ঘোলা করার কারণটা শুনি তাহলে?
আসিফ কথায় কথায় প্রশ্নটা করেছে টিয়াকে। সে ভাবিনি টিয়া নিজের বিয়ের প্রস্তাব আসিফকে দিবে। আসিফ হতবাক বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। টিয়া বলে..
‘আমাকে বিয়ে করবেন? আমি কিন্তু বউ হিসেবে অনেক ভালো হব। করবেন বিয়ে আমাকে?
টিয়া ঝটপট কথাটা বলে ফেলল। আসিফ বাকরুদ্ধ হয়ে অস্বস্তি, লজ্জায় পড়ে যায়। জীবনের ফার্স্ট টাইম কোনো মেয়ে তাকে ভালোবাসা নয়, সোজা বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে। রাফাকে সে পছন্দ করেও বলতে পারেনি বলে রাফা আজ অন্য কারও বউ। অথচ টিয়া কেমন ঠাসঠাস আসিফকে মনের কথাটা সহজে বলে ফেলল। এতক্ষণ তাও আসিফ স্বাভাবিক কথাবার্তা বলেছে, এখন বলতে পারছে না লজ্জায়। টিয়া উৎফুল্লতায় আসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে। আসিফ লজ্জা, সংকোচ বোধে দৃষ্টি সরিয়ে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে জড়তায়। টিয়া ফের আসিফকে অস্বস্তিতে ফেলে বলে…
‘আপনি কি লজ্জা পাচ্ছেন? আরে লজ্জা পাইয়েন না। আপনি আর আমিই তো। আমরা আমরা ভবিষ্যৎ জামাই-বউ। আমাকে কিন্তু বউ সাজলে অনেক সুন্দর দেখাবে, তাই না?
কথাটা বলেই টিয়া মাথার ঘোমটা টেনে বউ সাজে। আসিফ অস্বস্তিতে পালিয়ে যেতে চেয়ে বলে…
‘আপনি ঘরে যান পাগল।
আসিফ তাড়াহুড়োয় চলে যেতে লাগল। টিয়া পিছন থেকে ডেকে গান ধরে…
‘বন্ধু একবার পিছন ফিরে চাও। একটা কথার জবাব দিয়ে যাও, ভালোবাইসা কেন আমারে কান্দাও!
রাত প্রায় একটার ঊর্ধ্বে। ক্ষুধার্ত রাদিফ নিহাল খানকে বলে বাড়িতে ঢুকে ডিনার করতে। সারাদিনের দৌড়াদৌড়িতে দুপুরেও খাওয়া হয়নি। এখন বেশ রাত হওয়ায় ক্ষুধার্ত রাদিফ থাকতে না পেরে সুফিয়া খানকে বলে খাবার দিতে। সুফিয়া খান রাদিফকে ডাইনিংয়ে বসতে বলে তিনি কিচেনে যান। সঙ্গে সার্ভেন্ট আছে। বসার ঘরে কয়েকজন মেহমান মহিলারা বসে আছে। বাকিরা সবাই ছাদে হইচই করছে। রাদিফ ডাইনিংয়ে চেয়ার টেনে বসতে শুভাকে দেখতে পেল, সে সাদা ভাত গরুর মাংস দিয়ে খাচ্ছে। রাদিফ শুভার মুখোমুখি চেয়ারে বসে। খুব স্বাভাবিকভাবেই শুভা এক পলক রাদিফকে দেখে পুনরায় খাওয়ায় মনোযোগী হয়। রাদিফ একটু কপাল কুঁচকে স্বাভাবিকভাবেই ফোন চালায়। দুজন দুজনকে নীরবে এড়িয়ে যায়। খানিক বাদে সুফিয়া খান মালাকে দিয়ে খাবার ডাইনিংয়ে রাখে। রাদিফের সামনে প্লেট দিয়ে তিনি তাতে ভাত বেড়ে, মাছ তুলে দেন। রাদিফের মাছ পছন্দ। এই বাড়িতে রাদিফ আর মায়াই মাছপ্রিয় মানুষ। রাদিফ খেতে শুরু করে। সুফিয়া খান রাদিফের পাশে চেয়ারে বসতে বসতে বলেন…
‘শুনলাম তুমি নাকি শুভাকে বলেছ ও তোমাকে বিয়ে করলে ওর পড়াশোনা ছাড়তে হবে। সেজন্য আমি ভাবলাম ওর পড়াশোনা শেষ হলেই তোমাকে না-হয় ওহ বিয়েটা করল। এমনিতেও তুমি পাঁচ বছর সময় চাচ্ছ। তোমাকেও সময় দিলাম। ফাঁকে ওর পড়াশোনাটাও শেষ হলো। ইন্টার্নশিপ না হয় তোমার বউ হয়েই করল। কী বলো?
রাদিফ চুপচাপ খাচ্ছে। শুভা খাবার রেখে মা-ছেলের দিকে তাকিয়ে। মায়ের দৃষ্টি বুঝে রাদিফ নত মস্তকে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। সুফিয়া খান ফের বলেন..
‘পারফেক্ট। তাহলে কিছুদিনের মধ্যে তোমাদের দুজনের বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করে ফেলি।
রাদিফ এবার খাবার থামিয়ে অবাক গলায় বলে..
‘বিয়ে করব বলেছি, তাহলে এখন আবার বিয়ের রেজিস্ট্রেশন কেন করতে হবে আম্মু?
সুফিয়া খান রাদিফকে বুঝিয়ে বলেন…
‘একটা মেয়ে আমাদের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করবে আর আমরা তাকে এতটুকু বিশ্বাস দেব না যে আমরা তার অপেক্ষার সম্মান করব, বিশ্বাসঘাতকতা করব না? তোমার কথা চিন্তা করে শুভাকে আপাতত আমাদের ঘরের বউ করে আনব না। কিন্তু শুভার পরিবার, সমাজ আছে; ওরা ওদের মেয়েকে কোনো ভরসা ছাড়া কেন বছরের পর বছর আমাদের কথায় বিয়ে ছাড়া বসিয়ে রাখবে? ওদের মেয়ের একটা জীবন আছে না? সেজন্য তোমার কথাও রইল, আবার শুভার দিকটাও বিবেচনা করে আপাতত তোমাদের আইনগতভাবে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করে রাখব। তোমরা সংসার করবে পাঁচ বছর পর। যেদিন তুমি নিজে এসে বলবে সেদিন তোমাদের ধর্মীয় মোতাবেক বিয়ে দেব, এর আগে নয়।
রাদিফ মায়ের কথা বুঝে বলে…
‘এর মানে এখন আমাকে হাফ বিয়ে করতে হবে?
‘তুমি যদি মনে করো এটা হাফ বিয়ে তাহলে হাফ বিয়ে, আবার তুমি যদি মনে করো এটা ফুল বিয়ে তাহলে তাই। সম্পূর্ণ তোমার উপর ডিপেন্ড করে যে তুমি বিয়েটাকে কীভাবে নিচ্ছ।
রাদিফ কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর ধীরে ধীরে খাবার চিবোতে চিবোতে সম্মতি দিয়ে বলে…
‘তোমার যেটা ভালো লাগে সেটাই করো আম্মু।
সুফিয়া খান তীক্ষ্ণ গলায় বলে…
‘আর ইউ সিওর?
‘জি।’
‘গ্রেট।
সুফিয়া খান উঠে দাঁড়িয়ে যান। মালাকে চলে যেতে বলে রাদিফ ও শুভা দুজনের উদ্দেশ্যে বলেন…
‘তোমাদের যদি কোনো কথা থাকে তাহলে নিজেদের মধ্যে ডিসকাশন করে নিতে পারো এখন।
সুফিয়া খান চলে যান। রেখে যান নিস্তব্ধ নীরবতা। রাদিফ, শুভা কেউ কারও সাথে কথা বলেনি আর না কেউ কারও দিকে তাকিয়েছে। এর মাঝে একবার শুভার গলায় খাবার আটকায়। রাদিফ নিজের পানির গ্লাসটা শুভার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে…
‘আস্তে খান।
‘জি।
ব্যাস, এতটুকুই দুজনের মাঝে বাক্য লেনদেন হয়েছে। তারপর আর একটা বাক্যও লেনদেন করতে শোনা যায়নি।
মায়া টিয়ার খোঁজে বাগানের পিছন দিকটায় হাঁটে। আশেপাশে তাকিয়ে টিয়াকে খুঁজছে, ডাকছে টিয়ার নাম ধরে…
‘টিয়া? এই টিয়া? কই তুই? টিয়া?
মায়া খান বাড়ির পিছনের গেটের দিকটায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই গেট দিয়েও যাতায়াত করা যায়। তবে এটা খান বাড়ির পিছনের গেট বলা হয়। এই গেটে পাহারাদার থাকে না। গেট সবসময় বন্ধ থাকে, আজ খোলা হয়েছে কারণ আজ লোকজন এই গেট দিয়ে যাতায়াত করছে কাজের জন্য। মায়া আশপাশে খুঁজে টিয়াকে না পেয়ে চলে যেতে নিলে হঠাৎ কেউ মায়াকে পিছন থেকে মুখ চেপে ঝাপটে ধরে। মায়া ভয়ে চিৎকার করতে চেয়ে হাত-পা ছুড়ছে। শক্তিতে মায়া পেরে উঠছে না। লোকটা মায়াকে পিছন থেকে ঝাপটে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পিছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে যেতে। মায়া রিদের গলা শুনতে পাচ্ছে, আসিফের সঙ্গে কথা বলছে বাড়ির সামনে। মায়া লোকটার হাত নিজের মুখ থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু জোরজবরদস্তিতে পারছে না। লোকটা মায়াকে পিছন থেকে মুখ চেপে নিয়ে যাচ্ছে। রিদ আসিফের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাড়ির দিকে ঢুকছিল। খান বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই পশ্চিম পাশের এরিয়া দেখা যায়। বিয়ে বাড়ি হওয়ায় লাইটিং বেশ করা হয়েছে। দিনের আলোর মতো আলোকিত। মায়া ক্রমাগত লাফাচ্ছে। হঠাৎ একজন কাজের লোক মাথায় বস্তা নিয়ে এদিকটায় আসছিল। একটা মেয়েকে কেউ তুলে নিয়ে যাচ্ছে দেখে লোকটা মাথার বস্তাটা ফেলে চিৎকার করে…
‘এই তুই কেডারে? কারে তুইল্লা লইয়া যাইতাছস? এই তুই কেডা?
লোকটার হইহই চিৎকারে রিদ, আসিফ দুজনই বেখেয়ালে পশ্চিম পাশে তাকাতেই দেখে মায়াকে একটা লোক পিছন থেকে মুখ চেপে জোরাজুরি করে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। কাজের লোকটার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে রিদও চিৎকার করে দৌড়ায় মায়াদের উদ্দেশ্যে…
‘এই হারামির বাচ্চা দাঁড়া তুই! এইইই…
রিদের দৌড়ানো দেখে লোকটা তৎক্ষণাৎ মায়াকে ধাক্কা মেরে ফেলে পিছনের গেট দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে যায়। লোকটার মুখ কালো কাপড়ে বাঁধা ছিল। মায়া মুখ থুবড়ে পড়ে ইটের উপর। হাতের কনুইতে ব্যথা পেয়েছে ব্যাস। রিদের চিৎকারে আশেপাশে লোকজন দৌড়ে আসে। রিদকে দৌড়াতে দেখে তারাও কাজকর্ম ফেলে রিদের পিছনে দৌড়ায়। মুহূর্তের মাঝে পুরো খান বাড়ির লোকজন দৌড়ে জড়ো হয় খান বাড়ির পিছনে। রিদ দৌড়ে এসে মায়াকে ঝাপটে ধরে উঠে দাঁড়ায়। আসিফ লোকটাকে ধরতে লোকটার পিছনে দৌড়ায়। আসিফের সঙ্গে তখনকার কাজের লোকটাও দৌড়ায়। আসিফকে দৌড়ে যেতে দেখে রিদের ছেলেপেলেও সেদিকে দৌড়ায়। রাদিফ খাওয়া ছেড়ে দৌড়ে আসে। সুফিয়া খান, নিহাল খানও এসেছেন। মায়া রিদকে জড়িয়ে কাঁদছে। ভয় পেয়েছে ভীষণ। রিদ রাগে চোয়াল শক্ত করে দু’হাত মুঠোয় পিষছে। সুফিয়া খান, নিহাল খান, রাদিফ, আয়ন সকলেই রিদকে প্রশ্ন করছে কী হয়েছে?
আসিফ দৌড়ে আবার গেট দিয়ে ঢুকে। বড় বড় শ্বাস ফেলে বলে…
‘ভাই, ভাবিকে কিডন্যাপ করতে চাওয়া লোকটাকে ধরতে পারিনি। ওরা গাড়ি নিয়ে এসেছিল। দেখে মনে হচ্ছে ওরা পরিকল্পিতভাবে এই বাড়িতে ঢুকেছিল ভাবিকে কিডন্যাপ করতে।
মায়াকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল কেউ—খবরটা শুনে নিহাল খান, সুফিয়া খান, রাদিফ, আয়ন, আরাফ খান, হেনা খানসহ উপস্থিত সকলেই হতবাক, বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। নিহাল খান মেজাজ দেখিয়ে বলেন…
‘কাদের এত বড় সাহস খান বাড়িতে ঢুকে মন্ত্রী নিহাল খানের ছেলের বউকে কিডন্যাপ করতে চায়? তাদের মুখ দেখেছ আসিফ?
‘না স্যার। ওরা সবাই মুখে কালো কাপড় পরে ছিল।মুখোশদারী।
রিদ রাগে রি রি করছে কিন্তু মুখে টু শব্দ করছে না। সুফিয়া খান রিদের রাগের আভাস পেয়ে মায়াকে নিজের কাছে টানতে চেয়ে বললেন…
‘ওকে আমার কাছে দাও রিদ। ভয় পাচ্ছে ও।
সুফিয়া খান হাত বাড়ান মায়াকে নিতে। রিদ মায়াকে নিজের কাছে টেনে নেয়। মায়ার হাত শক্ত করে চেপে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। মায়া কাঁদছে আর রিদের বড় বড় কদমের সঙ্গে দৌড়াচ্ছে। আজ একটু জন্য মায়া অনেক বড় বিপদের হাত থেকে বেঁচেছে। রিদ ঠিক এই বিষয়টার জন্যই কয়েক দিন ধরে মায়াকে নিষেধ করছিল একা বাইরে না যেতে। কিন্তু মায়া বিষয়টা জানত না। সে টিয়ার খোঁজে বেরিয়ে ছিল। বাড়িতে এত মানুষ থাকতে কেউ মায়াকে খান বাড়ির ভিতর থেকে কিডন্যাপ করতে চাইবে এই বিষয়টা মায়ার জন্য অকল্পনীয় ছিল। শুধু মায়ার জন্য নয় খান বাড়ির সবার জন্যই অকল্পনীয় ছিল।
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৪
রিদ মায়াকে টেনে ঘরে নিয়ে আসে। মায়াকে ধাক্কা মেরে দেয়ালে ফেলে, শক্ত হাতে মায়ার দু’গাল চাপে। মায়ার গাল দাঁতের মাড়িতে পিষে যেতে রিদ রাগে রি রি করে গর্জনে বলে…
‘ বেয়াদবের বাচ্চা, তোরে বলছিলাম না ঘরের বাইরে যাবি না, কেন গেলি? আমার কথা কানে যায় না? পাগল আমি? না করার পরও কেন বারবার অবাধ্য হস? জানের ভয় নাই? মরার যখন পাখ গজাইছে তখন আমিই মেরে দিই তোরে? দিই মেরে এখন?’
