Home রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৭

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৭

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৭
রিক্তা ইসলাম মায়া

আজ শুক্রবার। খান বাড়িতে ব্যস্ততার হৈচৈ সবার মাঝে। বাবুর্চিরা রাত জেগে রাতভর রান্নার কাজে ব্যস্ত। রান্নাবান্নার কাজ এখনো শেষ হয়নি, আরও ঘণ্টা খানেক সময় লাগবে। খান বাড়ির মেজবানে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে প্রায় দশ হাজার মানুষের মতো। তাদের রান্নাবান্নার আয়োজনটাও বিশাল। বাদ পড়েনি কেউ—গ্রামবাসী, নিহাল খানের রাজনৈতিক দলের মানুষ, খান পরিবারের কর্মরত কোম্পানি কিংবা গার্মেন্টস কর্মচারীরা; সবাই আমন্ত্রিত রিদ খানের বিয়ের মেজবানে।

এত মানুষ খাওয়াতে দুটো হল বুকিং করা হয়েছে। খান পরিবারের আত্মীয়-স্বজন কিংবা পরিচিত মানুষজন খান বাড়িতে খাবে। বাকি কোম্পানির কর্মচারী কিংবা রাজনৈতিক দলের মানুষগুলোকে ভাগাভাগি করে খান বাড়ির বাইরের হলে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই আয়োজনে নিহাল খানের সঙ্গে আসিফও রাতভর জেগে তদারকি করছে। রান্নাবান্নার কাজ প্রায় শেষে দিকে। দশটা থেকে মানুষজন আসতে শুরু করবে। এর মাঝে বাড়ির ছেলেদের ভাগাভাগি করে তিন জায়গায় উপস্থিত থাকতে হবে। আয়োজন বিশাল, দায়িত্বও বেশি। বাড়ির ছেলেরা শেষ রাতের দিকে দুই-তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে সকাল সকাল গোসল করে রেডি হয়ে নিচ্ছে। সময় তখন সকাল ৮:১৩ মিনিট। খান বাড়ির মেহমানদের সকালে নাস্তা দেওয়া হয়েছে। ফাঁকে ফাঁকে বাড়ির মেয়েরাও গোসল করে রেডি হয়ে নিচ্ছে।

অথচ রিদ তখনো ঘরে। মালা দুবার এসে ডেকে গেছে। মায়া আয়নার সামনে কালো জামদানি শাড়ি পরে বসে আছে। একটু পর মেয়েরা আসবে মায়াকে রেডি করতে। অসময়ে মায়া চুল ভেজানোতে বিপদে পড়েছে। লম্বা ঘন চুল ভেজালে সহজে শুকাতে চায় না। মায়া রিদের ভয়ে হেয়ার ড্রায়ার নিয়ে চুল শুকাতে পারছে না। মেশিনের ভসভস শব্দে রিদ বিরক্ত হয়; অতিরিক্ত শব্দে সে রেগে যায়। তাই মায়া লম্বা চুলগুলো পিঠে ছেড়ে আয়নার সামনে বসে আছে। রাতে খুলে রাখা গোল্ডের গহনাগুলো পরছে।
রিদ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হয়। এই সময়ে সে গোসল করেনি। রাতে সন্ধ্যায় একবার আর শেষ রাতের দিকে একবার, দুবার গোসল করায় সে এখন আর গোসল করেনি, অসময়ে বারবার গোসল করলে তার জ্বর আসতে পারে। শেষ রাতের গোসলের কারণে এখনো তার চুল ভেজা। রিদ হাতের তোয়ালে কাঁধের পেছন মুছতে মুছতে মায়ার পিছনে দাঁড়ায়। আয়নাতে মায়াকে কালো শাড়ি পরে বসে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকাল। কালো শাড়িতে মায়ার রুপ যেন চকচক করছে। গোল্ডের গহনাপত্রে সেই রুপ দ্বিগুণ উজ্জ্বলতা বাড়াচ্ছে। রিদ বিরক্ত হয়। এখন তার হাতে সময় নেই। বাহিরে সবাই অপেক্ষা করছে অথচ বউকে দেখে তার মত বদল হচ্ছে। রিদ দেয়ার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবারও সময়টা দেখে নিলো। অসময়ে মনের চাওয়াকে দমিয়ে বিরক্তি ভঙ্গিতে হাতের ভেজা তোয়ালেটা মায়ার মাথার উপর ফেলে বলে—

‘ সরো ইডিয়ট।
কাজে বাধা পাওয়ায় মায়া মাথার তোয়ালে টেনে আয়নার ভেতরে রিদের দিকে তাকিয়ে বলে—
‘ পারব না। আপনার আগে আমি বসেছি। আজ আমার বিয়ে, আমি অনেক ব্যস্ত। আপনি সরেন।
মায়ার কথায় রিদের কপাল কুঁচকে আসে। সে তীক্ষ্ণ চোখে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলে—
‘বিয়ে? কিসের বিয়ে?
‘কিসের আবার? আমার আর আপনার বিয়ে।
‘ ওইটা বিয়ে না মেজবান, স্টুপিড!
মায়া দমে না গিয়ে নিজের হয়ে সাফাই গেয়ে আয়নায় তাকিয়ে কানের দুল পরতে পরতে বলে—
‘যেটাই হোক, সেটা তো আমাদের জন্যই, তাই না?
‘তো?
রিদকে তীক্ষ্ণ গলায় পাল্টা প্রশ্ন করতে দেখে মায়া বিরক্তিতে বলে..

‘তো কি? আমি সাজব না?
‘না।
রিদের কথায় মায়া অবাক চোখে তাকিয়ে বলে..
‘ না মানে? কেন সাজব না আমি?
‘আমার পছন্দ না, তাই।
মায়া রেগে ঠাস করে উঠে দাঁড়ায়। রাতে সবকিছু ঠিকঠাক ছিল, এখন আবার মায়াকে সাজতে নিষেধ করছে কেন এই লোক! মায়া খুব আফসোস করে বলে—
‘ আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো, আম্মু আপনাকে পেটে নিয়ে এমন কী খেয়েছিল যার জন্য আপনি সিঙ্গেল এক পিসই জন্ম নিয়েছেন পুরো খান বংশে? আমি আপনার মতো এত ত্যাড়া লোক ইহজন্মে দুটো দেখিনি। আপনার বাপ, দাদা, ভাই, চৌদ্দ গোষ্ঠীর মানুষ সবাই কত ভালো সহজ সরল শুধু আপনি বাদে। সবাই উত্তরে গেলে আপনি দক্ষিণে হাঁটেন। সবাই রাইট বললে আপনি রং বলেন। আর মেজাজ তো মাশাল্লাহ! পোলা তো নয়, যেন আগুনের গোলাবারুদ!

‘ তো?
‘ তো কি? এত গোলাবারুদ নিয়ে সংসার করা যায়?
রিদের দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা স্পষ্ট। ভ্রুর কুঁচকে বলে…
‘ আমাকে বিয়ে করার সময় মনে ছিল না এটা, বিয়ের পর মনে হচ্ছে আমি গোলাবারুদ।
রিদের কথায় এক আকাশ সমান হতাশা দেখে গেল মায়ার মাঝে। মায়া ভিষণ হতাশা বলে…
‘ বিয়ের আগে আমি জানতাম নাকি যে আপনি এমন হবেন। কাজী সাহেব বিয়েতে আমার মর্জি কই জানতে চেয়েছিলেন তিনি তো সোজা আমাদের বিয়ে পড়িয়ে ক্ষান্ত হয়েছিলেন। মনে নেই আপনার?
‘ আছে।
‘ তাহলে?
রিদ কপালের এক পাশ চুল্কে বলে…
‘ ধরো তুমি আগে জানতে আমি কেমন, বিয়েতেও তোমার মর্জি জিজ্ঞেসা করা হলো। তখন তুমি কি করতে? বিয়ে করতে না আমায়?
রিদের কথাটা শেষ করতে দেরি মায়ার উত্তর আসতে দেরি হলো না। মায়া এক সেকেন্ড সময় নিলো না রিদের মুখের উপর ঠাস করে বিয়ের জন্য না করতে…

‘ না! বিয়ে করতাম না।
‘ কেন?
‘ আপনার মতো মেজাজী মানুষকে কে বিয়ে করতে চাইবে? আমি তো ভাই সহজ সরল দেখে কাউকে বিয়ে করতাম। সুখে কে না থাকতে চাই বলুন?
রিদ এবার সত্যি সত্যি রেগে গেল। তার বউ তার সাথে সুখী নয় সেটা সে এতদিনে শুনছে। রিদ শক্ত চোয়ালে বলে…
‘ তুমি বলতে চাচ্ছো তুমি আমাকে বিয়ে করে সুখী নও? দুঃখী?
‘ অবশ্যই আপ…
রিদের শক্ত চোয়াল দেখে মায়া জিভে কামড় দেয়। কথায় কথায় মায়া অনেক কিছুই রিদকে বলে ফেলেছে, যেটা মায়ার রিদকে মোটেও বলা উচিত হয়নি। মায়া আমতা আমতা করে বোকা হাসি হাসে। রিদের কাছে নিজের সাফাই গেয়ে বলে…

​’ আপনি ভুল ভাবছেন। আমি কিন্তু বিয়ে আপনাকেই করতাম বুঝেছেন। আল্লাহ আমাদের জোড়া লিখে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন? না করার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। না করলেও আল্লাহ আমার কথা শুনতেন না। যার জোড়া যেখানে, তাকে কিন্তু সেখানেই যেতে হয়। আপনার সাথে তো আমার উপর থেকেই ফিক্সড হওয়া ছিল। তাই আমার ‘না’ করাতে কিছুই হতো না। বউ কিন্তু আমি আপনারই হতাম।
রিদ তখনো চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে। মায়ার সাফাই দেওয়া কথায় যে রিদ গলেনি, সেটা স্পষ্ট। মায়া এই মুহূর্তে রিদকে রাগাতে চায় না, তাই আবদার করে বলে…
​” আপনি পাষাণ হলেও আমার জন্য অনেক ভালো মানুষ। আমি তো আপনাকে ভালোবাসি, তাই না? তাহলে আপনার জন্য বউ সাজলে সমস্যা কোথায়? জুঁইও তো বউ সাজবে।
রাগান্বিত রিদ মায়ার বসার টুলটি পা দিয়ে সরিয়ে মায়ার মুখোমুখি দাঁড়ায়। ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে সোজাসাপ্টা বলে—

‘শুনো রিত, তোমাকে কিছু কথা বলি। আমার লাইফে সবাই ম্যাটার করে না, আর না সবাই আমার পছন্দের তালিকায় আসে। যারা আমার পছন্দের তালিকায় আসে, মূলত তারাই আমার জীবনে ম্যাটার করে। আর আমি যাদের পছন্দ করি, তাদের সবকিছুতেই হস্তক্ষেপ করি। যেমন আমার বউ পছন্দ, কিন্তু বউয়ের উগ্র বেপরোয়া চলাফেরা নয়। আমার বউ শুধুই আমাতে সীমাবদ্ধ থাকবে। তোমার আনুষ্ঠানিক বিয়ে চাই— তাই আয়োজন করেছি; তোমার সমাজের সামনে আমার বউ হিসেবে স্বীকৃতি চাই—সেটাও দিয়েছি; শাড়ি, গয়নাগাটি, মেকআপ এভরিথিং দিয়েছি। কিন্তু এসব পরে সেজেগুজে বাইরে লোকজনের সামনে ঘুরে বেড়াবে, সেই স্বাধীনতা দিইনি। আমি বউকে ভালোবাসি নিজের জন্য, লোক দেখানোর জন্য নয়। তাই আমার কথার অবাধ্য হয়ে কিছু করলে এবার আর ক্ষমা করব না, সোজা ট্রিগার চেপে উপরের টিকিট ধরিয়ে দেব। গট ইট?

মায়ার মুখটা ছোট হয়ে এলো। বিয়ের জন্য রিদ মায়াকে কত শাড়ি, চুড়ি, গহনা কিনে দিল, অথচ এখন বলছে মায়া নাকি এসব পরে বউ সাজতে পারবে না! মানুষ জানে রিদ-মায়ার তিনবার বিয়ে হয়েছে, অথচ মায়ার একবারও বউ সাজা হলো না স্বামীর জন্য। মায়া মন খারাপ করে বলল—
‘ তাহলে কি আমি বউ সাজব না?
‘সাজতে মন চাইলে সাজবে, বাধা দিয়েছে কে?
‘ আপনি তো মাত্রই নিষেধ করলেন।
‘ আমি তোমাকে বউ সাজতে নিষেধ করিনি, বউ সেজে বাইরের মানুষের সামনে প্রেজেন্ট হতে নিষেধ করেছি। বাড়ির ভেতরে একশ বার বউ সাজো; কিন্তু সেজেগুজে বাইরে যাওয়া নট অ্যালাউড।
মায়া রিদের কথায় সম্মতি দিয়ে আবদার জানিয়ে বলে—

‘ঠিক আছে, বাইরে যাব না। কিন্তু আপনি আমার সাথে ছাদে আমাদের বিয়ের ফটোশুট করবেন। আমাদের এতবার বিয়ে হলো, অথচ বিয়ের একটা ছবি পর্যন্ত নেই। বলা তো যায় না, আবার কোথায় কোন অঘটন ঘটল, তারপর দেখা গেল প্রমাণের অভাবে আবার কেউ আমাকে বিয়ে করে নিতে চাইলো…
রিদ রাগে তৎক্ষণাৎ মায়ার গাল চেপে মুখোমুখি ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলে—
‘জবান বেশি চলে না? সামনে দাঁড়িয়ে আছি দেখেও অন্য পুরুষের নাম নিস?
মায়া দু’হাতে টেনে রিদের হাত থেকে নিজের গাল ছাড়িয়ে বলে…
‘আরে ধুর, আপনি কিছু বোঝেন না। আজকে আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান, কোথায় শখ করে বউকে দু-চারটা চুমু খাবেন, তা না করে শাসাচ্ছেন! বুইড়া ব্যাড়া সরেন।

জুঁই প্রেগন্যান্ট। অনুষ্ঠানের মাঝেই জুঁইকে নিয়ে হৈচৈ পড়ে যায় হঠাৎ সে অজ্ঞান হওয়াতে। মায়া ও জুঁই দুজনই ছাদে স্টেজে বউ সেজে বসে ছিল। ফটোশুট ও মানুষের ভিড়ের মাঝেই জুঁই হঠাৎ জ্ঞান হারায়। সবাই ভাবে অনুষ্ঠানের চাপে না খাওয়া আর ঘুম না হওয়া থেকে জুঁই জ্ঞান হারিয়েছে। পারিবারিক ডাক্তার দেখানোর পর তিনি জুঁইয়ের সুখবর ঘোষণা করেন। বিষয়টা মুহূর্তের মাঝে খান বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। বউ দেখার সঙ্গেই জুঁইকে সবাই সাধুবাদ জানাচ্ছে অনাগত বাচ্চার জন্য। খান বাড়ির সবাই খুশি।
মায়ার মা রেহেনা বেগম এবং ফিহাকে নিয়ে খান বাড়িতে এসেছিল আরিফ। সুফিয়া খান বিশেষভাবে তাদের দাওয়াত করেছিলেন। সুফিয়া খানের কথার মান রাখতে আরিফ পেছনের সবকিছু ভুলে বোনের শ্বশুরবাড়িতে আসে। জুঁইয়ের প্রেগন্যান্সির বিষয়টাতে সবাইকে বেশ উৎফুল্ল দেখায়। ফিহা নিজেও পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ফিহার দেখাশোনা রেহেনা বেগমই করেন। সকালে সবাই ভিড় জমায় আয়নের ঘরে। জুঁই শুয়ে রেস্ট নিচ্ছে। বাড়ির আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আয়নের বাবা-মায়ের হাসিমুখটা দেখার মতো। বাড়িভর্তি মেহমানদের জন্য আয়নের বাবা মিষ্টি আনতে লোক পাঠান।

আয়ন নিহাল খানের সঙ্গে সেন্টারে ছিল, মেহমানদের খাবার-দাবার তদারকি করছিল। ব্যস্ততার শেষ নেই। জুঁইয়ের অসুস্থতার ব্যাপারে প্রথমে তার ধারণা ছিল না। বাবার ফোন পেয়ে সে তৎক্ষণাৎ সবকিছু ফেলে ছুটে আসে খান বাড়িতে। বাবা হওয়ার আনন্দ ও উৎফুল্লতা আয়নের মাঝে স্পষ্ট।
উপস্থিত এত মেহমানের মাঝেও মায়া নীরব। কয়েক ঘণ্টার জন্য মায়ার মাথা থেকে মা হওয়ার বিষয়টা ছুটে গিয়েছিল, কিন্তু জুঁইয়ের প্রেগন্যান্সির খবরটা শুনে তার মনের কষ্টগুলো আবারও তাজা হলো। এমন না যে জুঁই প্রেগন্যান্ট বলে সে কষ্ট পাচ্ছে; মায়া জুঁইয়ের জন্য ভীষণ খুশি, কিন্তু সে নিজের জন্য দুঃখ পাচ্ছে। মায়ার পরে বিয়ে হয়েও একে একে সবাই বাবা-মা হচ্ছে, শুধু রিদ আর মায়া বাদে। মায়া বোঝে না—সবাই বেবি কনসিভ করতে পারলে মায়া কেন পারছে না? মায়া কি বেবি নিতে অক্ষম?
মায়ার ভেতরকার কষ্টগুলো দলা পাকিয়ে কান্না চলে আসে। মায়া এতদিন রিদকে দোষ দিত—রিদের জন্য মায়ার বেবি হচ্ছে না বলে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দোষ মনে হয় মায়ারই হবে, যার জন্য সে বেবি নিতে পারছে না।

আয়ান বাবা হবে—এই আনন্দের মিষ্টি সবাই খাচ্ছে। রিদকেও তার ভাগ দেওয়া হয়, কিন্তু রিদ মুখে মিষ্টি তোলে না; বরং বিরক্তিতে কপাল কুঁচকায়। এবার নিশ্চয়ই মায়া রিদকে শান্তি দেবে না এই নিয়ে? রিদের সারাদিন কাটে ব্যস্ততায়। কথা ছিল রিদ মায়ার সঙ্গে বিয়ের ফটোশুট করবে, অথচ রিদ ব্যস্ততায় বাসায় ফিরতে পারেনি। মায়ার সঙ্গে একটা কাপল ছবিও তোলা হলো না। মায়া রিদের অপেক্ষাতেও নেই, সে রেগেমেগে ফায়ার হয়ে আছে।
রিদ বসার ঘরে ঢুকে মানুষের ভিড় দেখতে পেল জুঁইকে ঘিরে। জুইকে পুনরায় বসার ঘরে বসানোর হয়েছে সবাই সাদুবাদ জানাচ্ছে বলে। রিদ সেদিকে মনোযোগী না হয়ে ক্লান্ত চোখে মায়ার সন্ধান করল। পেয়েও গেল—বসার ঘরে ডাইনিং টেবিলের কোণায় দাঁড়িয়ে রিদের দিকে তাকিয়ে আছে টলমল চোখে। রিদ মায়ার কান্না ও অভিযোগমাখা মুখ দেখে সেদিকে এগুলো না। এই মুহূর্তে মায়ার কাছে যাওয়া মানে রিদের জন্য বিপদ। রিদ কাউকে কিছু না বলে গম্ভীর মুখে নিজের ঘরে গেল। ঘর লক না করে জাস্ট চাপিয়ে রাখল। রিদ জানে তার আধা-পাগল বউ নিশ্চয়ই এখন রিদের পিছন পিছন আসবে নিজের দুঃখ নিয়ে। হলোও তাই। রিদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঘড়ি খোলার মধ্য দিয়েই মায়া ঠাস করে ঘরে ঢোকে। রিদের পিছনে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত ভঙ্গিতে বলে—

‘ আমার বেবি চাই।
‘ দারাজে অর্ডার করো।’
‘আপনি কবে দেবেন, সেটা বলুন।
‘কাল।
‘আমি কিন্তু সিরিয়াস।
‘মি টু।
রিদের খেয়ালিপনায় মায়া রেগেমেগে রিদের হাত টেনে কামড়ে ধরে। মায়ার শক্ত দুপাটি দাঁত রিদের হাতের চামড়া ছিঁড়ে বসে যেতেই রিদ তেতে ওঠে। মায়াকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে—
‘বাল! কামড়াকামড়ি করছিস কেন? ব্যথা পাচ্ছি না আমি? সাহস বেড়েছে? তাহলে দাঁত ভেঙে ডাস্টবিনে ফেলে দেব বেয়াদব।

রিদের ধাক্কায় মায়া দেয়ালে আঘাত পায়। মায়া দেয়াল ধরে দাঁড়ায়, রাগে-জিদে চোখ টলমল করছে পানিতে। রিদের দিকে সে জিদি দৃষ্টিতে তাকিয়ে। রিদ মায়াকে ধমকে আরও কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় মায়ার চোখের পানি দেখে। বউটা তার খুব শখের নারী, কিন্তু এই নারী রিদকে বাদে সবাইকে গুরুত্ব দেয়। এই যে ‘বেবি চাই, বেবি চাই’ বলে রিদকে বিরক্ত করছে—এই নারীর বেবি হলে তখন রিদের গুরুত্ব আরও কমে যাবে তার কাছে। এখন সন্তান নেই, কোনো ঝামেলা নেই, অথচ এখনই রিদকে বুঝতে চায় না; সন্তান হলে তো আরও বুঝবে না। এমন না যে রিদের বেবি চাই না। রিদের বেবি চাই, তবে সেটা সঠিক সময়ে—আর চার-পাঁচ বছর যাক, তারপর। কিন্তু এই নারীর জন্য রিদের কোথাও শান্তি নেই। সংসার শুরু করার আগেই ‘বেবি চাই, বেবি চাই’ বলে তার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। রিদ মায়াকে কাঁদতে দেখে নমনীয় হয়ে আসে। হাত বাড়িয়ে মায়াকে কাছে ডেকে বলে—

‘কাছে এসো।
রিদ হাত বাড়ালেও মায়া পিঠ মুড়ে বলে—
‘না।
রিদ মায়ার বাহু টেনে নিজের কাছে আনে। মায়ার গায়ে ভারী কাজের লাল লেহেঙ্গা, মাথায় লাল হিজাব, গলায় হিজাবের উপর দিয়ে গোল্ডের জুয়েলারি পরা। মায়াকে এতসব ভারী গয়নাগাটিতে সেজেগুজে থাকতে দেখে রিদ মায়ার হিজাব খুলতে সাহায্য করল। মায়া ঘেমে গেছে; চোখে পানি, নাকের পানিতে মেকআপ নষ্ট হয়েছে কিছুটা। রিদ টিস্যু দিয়ে মায়ার চোখের পানি মুছে দেয়। ফের হাত চালায় মায়ার মাথার হিজাব খুলতে। মেয়েলি জিনিসপত্রের ওপর রিদের তেমন ধারণা নেই। মায়াকে হিজাব পরাতে গিয়ে মেয়েরা কোথায় কোথায় পিন মেরেছে, রিদ বুঝতে পারছে না। সে যত পিন খুলছে, ততই আরেকটা নতুন পিনের সন্ধান পাচ্ছে। রিদ রাগে অধৈর্য হয়ে মায়ার মাথার হিজাব টেনে খুলতে চেয়ে বলে—

‘বাল! কী পরেছিস এতসব? খোলাখুলিই শেষ হচ্ছে না। খোল এসব!
রিদ অধৈর্য হয়ে মায়ার হিজাব ও ওড়না ধরে টানে। পিনে লেগে মায়ার হিজাব-ওড়না ছিঁড়ে যাচ্ছে, মায়াও ব্যথা পাচ্ছে। মায়া রিদকে সরিয়ে নিজের পিন নিজে খুঁজে খুঁজে বের করছে। হিজাব ও ওড়না খোলে টুলের উপর রাখল। রিদ ড্রেসিং টেবিলের ওপর টিস্যু বক্স থেকে ফের টিস্যু নিয়ে যত্ন সহকারে মায়ার মুখ ও গলার ঘাম পরিষ্কার করতে করতে বলে—
‘শুনো রিত, বাড়াবাড়ি কোনো কিছুই আমার পছন্দ না। তোমাকে স্পষ্ট জানাচ্ছি, আমার এখন বেবি চাই না। এরপর এসব নিয়ে আর কোনো কথা হবে না। ক্লিয়ার?

‘না ক্লিয়ার না। আপনি বেবি না চাইলে আমাকে বিয়ে করেছেন কেন?
‘সংসার করতে।
‘আপনার সংসারের মধ্যে কি বেবি আসে না?
‘না।
‘তাহলে কী আসে?
‘ বউ।
‘আমি কি আপনার বাইরে গিয়ে কিছু চাচ্ছি? আমি তো আপনার সন্তানই চাচ্ছি। একটা বেবি নিলে সমস্যা কোথায়?
রিদ মায়ার সাথে তর্কে জড়াতে চাইলো না। সে মায়াকে সম্মতি দিয়ে বলে…
‘ঠিক আছে, আগে পড়াশোনাটা শেষ করো, তারপর দেখা যাবে।
মায়া অধৈর্য্যের নেয় বলে…

‘ ইন্টারের পর?
‘ না অনার্সের পর।
‘ আমার অনার্স পাস করতে আরও পাঁচ-ছয় বছর লাগবে। এত বছর বেবির অপেক্ষা করার পর যদি না হয়, তখন?
রিদ বিষয়টা পাত্তা না দিয়ে দায়সারা জবাবে বলে…
‘না হলে নাই। আমি কি বউ ছেড়ে দেব?
‘আপনি বুঝতে পারছেন না, আম…
মায়াকে বারবার একই কথা পেঁচাতে দেখে রিদ মেজাজ হারায়। মায়াকে আর বলতে না দিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে তেতে উঠে বলে—
‘বাল! একই কথা কয়বার বলব আমি? বলছি না আমার বেবি চাই না? এরপর এত কাহিনি কিসের? তুই আমার উপর ফোকাস কর। তোর লাইফে আমি ছাড়া বাকি সব অপশনাল, বুঝেছিস?
‘আপনি…
‘শাট আপ!

মায়া ধরধর করে দু চোখের পানি ছাড়ে। রিদ মায়ার কান্না উপেক্ষা করে ওয়াশরুমে চলে যায়। সে সব করতে রাজি কিন্তু এই মুহুর্তে তার বেবি চাই না। বউ কাঁদছে কাঁদুক। একটু পর এমনই ঠিক হয়ে যাবে। রিদ ছেলেমানুষী নয়। সবাই বাবা হচ্ছে বলে যে তাঁকেও বাবা হতে হবে এমন কোনো বিধান নেই। রিদ তার নিজের নিয়মে চলে। কাউকে অনুসরণ করে নয়।
আসিফের ক্লান্ত ও ঘুমহীন মুখশ্রী টিয়া লক্ষ করেছে। সারাদিন আসিফকে টিয়া খান বাড়িতে দেখতে পায়নি। সেই সকালে রিদের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একটুখানি দেখেছিল, তারপর আর দেখা হয়নি। রিদ না ডাকলে আসিফ খান বাড়ির ভেতরে বেশ একটা আসে না। সে খান বাড়িতে আসলে বাড়ির সামনের কোয়ার্টারে থাকে, সেখানে আসিফের জন্য আলাদা রুমের ব্যবস্থা করা আছে। খাওয়া-দাওয়া সে খান বাড়ির ভেতরেই করে, আবার মাঝেমধ্যে কোয়ার্টারে বসেও সেরে ফেলে।
আসিফকে রেস্ট নিতে সুফিয়া খান বলেছেন। সারাদিন অনেক ধকল গেছে, শরীর ছেড়ে দিচ্ছে ক্লান্তিতে। আসিফ খান বাড়ির ড্রয়িংরুম ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পথ আটকায় টিয়া। আসিফকে পেছন থেকে ডেকে বলে—

‘এই যে শুনছেন? চলে যাচ্ছেন বুঝি?
টিয়ার ডাকে আসিফ পেছন ফিরে তাকায়। টিয়াকে দেখা গেল একটা মেরুন রঙের থ্রি-পিস পরে দাঁড়িয়ে থাকতে। মেরুন রঙটা টিয়ার ফর্সা গায়ে বেশ মানিয়েছে। যদিও ব্যাপারটা আসিফ তেমন লক্ষ করেনি, তবে সে ভদ্রতা বজায় রেখে বলে—
‘জি, কিছু বলবেন?
‘ জি, আমি বললে আপনি রাখবেন?
‘কথা তো হলো শোনার, তাহলে রাখার প্রসঙ্গ কেন আসছে মিস?
‘আমার কথা শুনলে রাখতে হয়। আপনি শুনতে চাইলে অবশ্যই তা রাখতে হবে।
‘তাহলে থাক। আপাতত প্রয়োজন নেই। আমি গেলাম।
আসিফ ক্লান্তিতে চলে যেতে নেয়। টিয়া ফের পেছন থেকে ডেকে বলে—
‘আপনি কি আমাকে ইগনোর করছেন?
‘না।
‘তাহলে চলে যাচ্ছেন কেন?
‘আমি ক্লান্ত, তাই রেস্ট নিতে চাচ্ছি।

টিয়া আসিফের মুখের দিকে তাকিয়ে খানিকটা চুপ থেকে রয়েসয়ে বলল—
‘আমি কাল চলে যাব। যাওয়ার আগে আপনাকে আমার ব্যাপারটা জানিয়ে গেলাম। এরপর কী হবে, সেটা আপনি ঠিক করবেন। আপনি চাইলে পরবর্তীতে আমাদের দেখা হবে, আপনি না চাইলে দেখা হবে না। আমি ঢাকা ফিরে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব না, তবে আপনার অপেক্ষায় থাকব। আশা করছি আপনি আমাকে বেশি অপেক্ষা করাবেন না।
‘আপনি আমার অপেক্ষায় থাকবেন না মিস। আমি আপনার চাওয়া রাখতে পারব না।
‘ওকে।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৬

টিয়া শান্ত স্বরে, শান্ত দৃষ্টিতে উত্তরটা আসিফকে দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। পেছন ফিরে আর তাকায় না আসিফের দিকে। আসিফ বুঝতে পারে না সে কি তার কথা দ্বারা টিয়াকে কষ্ট দিল? মেয়েটি কেমন শান্ত ছিল তার কথার প্রত্যুত্তরে! আসিফ বেশ কিছুক্ষণ টিয়ার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে কোয়ার্টারে চলে গেল। আসিফের আর কোনো নারীর প্রতি মন টানে না। এমন না যে সে এখনো রাফাকে মনে রেখে বসে আছে; রাফাকে সে ভুলে মুভ অন করেছে, কিন্তু তার মনের শূন্যস্থানটাতে বসানোর মতো ফিলিংস কারও প্রতি আসে না। মূলত আসিফের এই উদাসীনতা থেকেই সে আজ টিয়াকে ফিরিয়ে দিল।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here